নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে এমন গুজবে দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় এবং কৃত্রিম সংকটের মুখে শক্ত অবস্থান নিয়েছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং নতুন করে আমদানির প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মজুত ও আমদানির বর্তমান চিত্র
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে। এছাড়া মার্চ মাসের চাহিদা মেটাতে আরও ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার কিছু অংশ ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র একনজরে:
- ডিজেল: মজুত ও আমদানিব্যবস্থা মিলিয়ে মার্চ মাসে সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। প্রতিদিনের গড় চাহিদা ১২-১৩ হাজার টন হলেও বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে বিপিসি।
- পেট্রোল ও অকটেন: এই দুটি জ্বালানি দেশীয় উৎস থেকেই উৎপাদিত হয়, তাই এগুলো আমদানির ওপর নির্ভরশীল নয় এবং মজুতও সন্তোষজনক।
- এলএনজি (গ্যাস): কাতার থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও খোলাবাজার থেকে বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা চলতি মাসেই দেশে পৌঁছাবে।
জ্বালানি বিক্রিতে নতুন সীমা ও নজরদারি
ভোক্তাদের মধ্যে 'প্যানিক বাইং' বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা রোধ করতে বিপিসি সাময়িকভাবে জ্বালানি সরবরাহে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী:
- মোটরসাইকেল: ট্রিপ প্রতি সর্বোচ্চ ২ লিটার।
- প্রাইভেট কার: সর্বোচ্চ ১০ লিটার।
- বাস ও ট্রাক: যাতায়াতের দূরত্ব অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন শেষে জানান, একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। আমাদের পর্যাপ্ত মজুত আছে। যারা অবৈধভাবে তেল মজুত করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার সময় ক্রেতাদের অবশ্যই তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করা ক্রয় রশিদ সংগ্রহ করতে হবে এবং পরবর্তী কেনাকাটার সময় আগের রশিদ প্রদর্শন করতে হবে।
সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান ও সরকারের ১১ দফা নির্দেশনা
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জ্বালানি সাশ্রয়ে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান।
- অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসি-র তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা।
- সব ধরণের আলোকসজ্জা পরিহার করা।
- রান্নার কাজে গ্যাসের অপচয় রোধ করা।
বেসরকারি খাতের ভূমিকা
রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মেঘনা গ্রুপসহ (এমজিআই) বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও চীন থেকে বিকল্প উপায়ে এলপিজি আমদানি অব্যাহত রেখেছে। আমদানিকারকদের ঋণপত্র (LC) খোলার জটিলতা নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞ অভিমত:
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, "সংকট মোকাবিলায় শুধু সাধারণ মানুষের ওপর বিধিনিষেধ না চাপিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও মিতব্যয়ী হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এপ্রিল মাসের জন্য আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যাতে যুদ্ধের প্রভাব দেশের অর্থনীতি বা জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: