01/30/2026 হরমুজ থেকে তেহরান: মার্কিন হামলায় কোন পথে যাবে ইরান
Special Correspondent
২৯ January ২০২৬ ২৩:৫৫
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত এমন ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে উল্লেখযোগ্য শক্তি মোতায়েন করেছে। এখন প্রশ্ন একটাই যদি শেষ মুহূর্তে তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে? বিশ্লেষকরা বলছেন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে ধারণা থাকলেও হামলার ফলাফল অত্যন্ত অনিশ্চিত। নিচে এমন সাতটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হলো-
১. সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, শাসনব্যবস্থার পতন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর
এই আশাবাদী দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC), বাসিজ বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নির্ভুল হামলা চালাবে। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সীমিত থাকবে। এর ফলে দুর্বল হয়ে পড়া বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ইরান ধীরে ধীরে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নেয়। তবে বাস্তবতা বলছে, ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র নয় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ডেকে এনেছিল। সে তুলনায় ২০২৪ সালে নিজস্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা সিরিয়া তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
২. শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, কিন্তু নীতিতে নমনীয়তা আসে
বিশ্লেষকরা একে ভেনেজুয়েলা মডেল বলছেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী হামলার পরও ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে যায়, তবে নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। এই ক্ষেত্রে ইরান আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমাতে পারে, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন কিছুটা শিথিল হতে পারে। তবে ৪৭ বছর ধরে অনমনীয় অবস্থানে থাকা এই শাসনব্যবস্থার হঠাৎ পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
৩. শাসনব্যবস্থার পতন, ক্ষমতায় সামরিক সরকার
অনেকে এটিকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিনের আন্দোলনে সরকার দুর্বল হলেও ইরানের শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো এখনো অক্ষত। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় IRGC নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণতন্ত্র নয় আরও কড়াকড়ি সামরিক শাসনের মুখে পড়তে পারে দেশটি।
৪. ইরানের পাল্টা হামলা: মার্কিন ঘাঁটি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তু
ইরান ইতোমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে মার্কিন হামলার জবাব দেওয়া হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাহরাইন, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায়। এ ছাড়া ইসরায়েল, জর্ডান বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও লক্ষ্য হতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের এই দুর্বলতাই তুলে ধরেছিল।
৫. হরমুজ প্রণালিতে মাইন পুঁতে দেওয়া
ইরান-ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি ও এক চতুর্থাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এখানে নৌ-মাইন বসায়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৬. মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া
ইরানের নৌবাহিনী সোয়ার্ম অ্যাটাক কৌশলে প্রশিক্ষিত একসঙ্গে অসংখ্য ড্রোন ও দ্রুতগামী নৌকা দিয়ে হামলা। এই ধরনের হামলায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সামরিক ও রাজনৈতিক অপমান হবে। যদিও সম্ভাবনা কম, তবে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
৭. চরম অরাজকতা ও গৃহযুদ্ধ
সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা হলো ইরান লিবিয়া বা ইয়েমেনের মতো অরাজকতায় ডুবে যেতে পারে। ক্ষমতার শূন্যতায় কুর্দি, বেলুচসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। ৯ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ভয়াবহ মানবিক ও শরণার্থী সংকট ডেকে আনবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন দেখতে চায়, বিশেষ করে ইসরায়েল। তবে কেউই চায় না অঞ্চলটির সবচেয়ে জনবহুল দেশটি চরম বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হোক। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক চাপ ও মুখরক্ষার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্র হামলার পথে হাঁটলে এমন এক যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার কোনো স্পষ্ট শেষ নেই।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র