03/10/2026 দুর্নীতির কালো থাবায় মেরুদণ্ডহীন শিক্ষা: মগজ চাষের আজব কিচ্ছা
Dr Mahbub
১০ March ২০২৬ ০৭:২৯
অধিকারপত্র | শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
দেশে শিক্ষার নামে যেন এক অদ্ভুত ম্যাজিক শো চলছে। কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ দুর্নীতির মতো উইপোকা কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কুরে কুরে খাচ্ছে, কীভাবে স্কুল ভবন নির্মাণে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটছে, কিংবা পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে শত শত কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ উঠছে—এসব নিয়েই এই অনুসন্ধানধর্মী ফিচার। ‘মগজ চাষের আজব কিচ্ছা’ আসলে শিক্ষাঙ্গনের গভীরে প্রবেশ করা দুর্নীতির এক রোমহর্ষক ময়নাতদন্ত।
মগজ চাষের খামারবাড়ি: মেধাশূন্য জাতি গঠনের জাদুকরী রেসিপি!
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া কিছু পিলে চমকানো দুর্নীতি ও অনিয়মের নির্মোহ ময়নাতদন্ত। শিক্ষার নামে দেশে একি আজব ম্যাজিক শো চলছে? কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর নিয়োগ দুর্নীতির উইপোকা কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কুরে কুরে খাচ্ছে; কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ৪০০ কোটি টাকার লুটপাট চলছে—তা জানতে চোখ রাখুন এই বিশেষ প্রতিবেদনে। এটি শিক্ষাঙ্গনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতির এক রোমহর্ষক চালচিত্র।
বন্দনা ও পটভূমি: খামারের ইতিকথা
শুনুন সুধীজন, মগজ চাষের এক আজব কিচ্ছা বর্ণনা করি। এক দেশে ছিল এক বিশাল ‘মগজ চাষের খামার’। সেই খামারের মালি থেকে শুরু করে সদর দপ্তরের পাহারাদার—সবারই লক্ষ্য এক: কীভাবে চারাগাছগুলোকে (শিক্ষার্থী) ফাঁকি দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করা যায়। গত কয়েক বছরে এই খামারে এমন সব কাণ্ডকারখানা ঘটেছে যা শুনে ইবলিশও তওবা করবে, আর বাঘা বাঘা জাদুকররাও লজ্জায় মুখ লুকাবে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও যেন আগেভাগেই এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই দীর্ঘ ১৮ মাস তিনি এই রুগ্ন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফলে অসুস্থ মেরুদণ্ডটি বিনা চিকিৎসায় পচনের সুযোগ পায়। এ যেন এক পরিকল্পিত মগজ ধোলাইয়ের খেলা। আসুন, সেই মগজ-ধোলাইয়ের রাজ্যে দুর্নীতির যে মহোৎসব চলেছে, তার একখানা সচিত্র ময়নাতদন্ত করা যাক।
প্রকৌশলবিদ্যার অষ্টম আশ্চর্য: রডের বদলে ‘কচি বাঁশ’!
নির্মাণবিজ্ঞানের সব কিতাবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক জাদুকরী ঠিকাদার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে লোহার রডের পরিবর্তে ব্যবহার করলেন কচি বাঁশের ফালি! তার যুক্তি হয়তো ছিল গভীর আধ্যাত্মিক— "বাঁশ পরিবেশবান্ধব, আর জাতি যখন চারদিকে বাঁশ খাচ্ছে, তখন দালান কেন খাবে না?" ফলস্বরূপ, কোমলমতি শিশুদের মাথার ওপর ঝুলে রইল একখানা কংক্রিটের মরণফাঁদ। এটি কেবল চুরি নয়, এটি ছিল জ্যান্ত মানুষকে কবরে পাঠানোর এক মহোৎসব। মাটির তলার সেই বাঁশগুলো আজও যেন হাসছে আর বলছে, “জাতক, তোমার শিক্ষার ভিতটাই যে ফোঁপা!”
বদলি শিক্ষক বা ‘প্রক্সি’ মাস্টারি
গ্রামের অনেক পাঠশালায় এক অদ্ভুত প্রথা চালু হয়েছে। সরকারি বেতনভুক্ত পণ্ডিত মশাই নিজে স্কুলে না গিয়ে নিজের জায়গায় একজন ‘স্থানীয় বেকার যুবক’কে নামমাত্র বেতনে নিয়োগ দেন ক্লাস নেওয়ার জন্য। আসল শিক্ষক শহরে ব্যবসা করেন বা রাজনীতিতে সময় দেন, আর ভাড়াটে শিক্ষককে সামান্য কিছু বকশিশ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন। এই জাদুকরী পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা শুরুতেই শেখে—নিজে না খেটেও কীভাবে অন্যের পাতে ভাগ বসানো যায়। এটিই হয়তো তাদের ভবিষ্যৎ দুর্নীতির হাতেখড়ি!
পরিদর্শন যখন ‘উৎকোচ-উত্সব’
স্কুল পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল কারিকুলাম বাস্তবায়ন ও শিক্ষার মান যাচাই করা। কিন্তু পরিদর্শকদের আগমন মানেই প্রধান শিক্ষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। ভালো খাসির মাংসের আয়োজন থেকে শুরু করে খামের ভেতর মোটা অঙ্কের ‘নজরানা’—সবই ঠিকঠাক থাকলে তবেই পরিদর্শন রিপোর্ট ‘সবুজ’ হয়। অন্যথায় সামান্য ত্রুটিও হিমালয় সমান করে দেখানো হয়। এই ‘পরিদর্শন বাণিজ্য’ আজ এক ওপেন সিক্রেট, যেখানে জ্ঞানের বদলে খামের কদর বেশি।
পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ‘দরবেশ’ ও ৪০০ কোটি টাকার ভেলকি
এনসিটিবি বা পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অন্দরমহলে একবার এক ‘দরবেশ’ উদয় হলেন। তিনি এমন এক তসবিহ ঘুরালেন যে, এক ঝটকায় ৪০০ কোটি টাকা স্রেফ কর্পূরের মতো হাওয়া হয়ে গেল! বই ছাপানোর টেন্ডার থেকে শুরু করে কাগজের মান নিয়ন্ত্রণ—সবখানেই ছিল তার অদৃশ্য হাতের ছোঁয়া। জাতি যখন নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়ার অপেক্ষায় বিভোর, তখন সেই দরবেশ আর তার সিন্ডিকেট ব্যস্ত ছিল মুদ্রণ যন্ত্রের আড়ালে নোট ছাপানোর উৎসবে। তারা আসলে পকেট ভরার মন্ত্রই জপেছিলেন।
রিটায়ারমেন্ট ট্যুর: কবরের আগে বিলেত ভ্রমণ!
শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠানো হয়—যাকে বলা হয় ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তালিকায় নাম থাকে তাদের যাদের অবসরে যেতে আর মাত্র তিন মাস বাকি! এই প্রশিক্ষণ আসলে জাতির কোনো কাজে লাগে না, কারণ প্রশিক্ষিত মগজটি কয়েকদিন পরেই পেনশনের ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এটি আসলে সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণের এক চমৎকার ফন্দি মাত্র, যেন মরার আগে শেষবারের মতো আইফেল টাওয়ার দেখে নেওয়া!
গবেষণাগারের আকালে গবেষকদের ম্যাজিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দের চিত্র আরও করুণ। বাজেট দেওয়া হয় বছরের শুরুতে, কিন্তু সেই অর্থ ছাড় করা হয় অর্থ বছরের একদম শেষে। ফলাফল? এক বছরের দীর্ঘ গবেষণার কাজ শেষ করতে হয় মাত্র তিন মাসে! এই তাড়াহুড়োয় নতুন কোনো জ্ঞান সৃষ্টি হয় না, শুধু কাগজের স্তূপ আর বিল-ভাউচারের মেলা বসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চা-নাস্তা বা ডেকোরেশনের নামে টাকা খরচ করে বাজেট শেষ করা হয়। মাইক্রোস্কোপে ভাইরাস দেখা যাক না যাক, ঠিকাদারের ব্যাংক ব্যালেন্স ঠিকই দেখা যায়।
মগজচাষের খামারবাড়ি: ফুটো বালতি ও জাদুকরী সারের ইতিকথা
দেশের নীতিনির্ধারকরা একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন, এই খামার থেকে এমন সব তরতাজা মগজ উৎপাদিত হবে যা দিয়ে দেশ মঙ্গলে পৌঁছে যাবে। কিন্তু বছর পেরোতেই দেখা গেল, রকেট তো দূরে থাক, খামারের ঠেলাগাড়িটাই কাদায় আটকে গেছে! কারণ উইপোকা আর ঘুণপোকারা মিলে সব সাবাড় করে দিয়েছে।
ক. গোড়ায় গলদ (প্রাথমিক স্তর): মিড-ডে মিলের পুষ্টিকর খাবারগুলো যেন কোন এক অলৌকিক ইঁদুরে খেয়ে সাবাড় করে দিল। ফলে গোড়াতেই চারাগুলো পুষ্টিহীনতায় ধুঁকতে ধুঁকতে ভাবল—বড় হয়ে চুরি করাটাই আগে শিখতে হবে!
খ. জাদুর পাইপলাইন ও ‘ভিটামিন-টি’র মহিমা (কোচিং বাণিজ্য): শিক্ষকদের একটি অংশ সরকারি পাইপ দিয়ে গাছে পানি না দিয়ে সেই পানি নিজেদের বাড়ির পেছনের ‘প্রাইভেট নার্সারি’ (কোচিং সেন্টার)-তে নিয়ে গেলেন। ক্লাসরুমে তারা গাছেদের কানে কানে ফিসফিস করে বলে এলেন, "আসল সিনেমা দেখতে হলে বিকেলে আমার কোচিংয়ে এসো। সাথে করে ‘ভিটামিন-টি’ (টাকা) আনতে ভুলো না যেন!"
গ. মালি যখন কাঠুরে (নিয়োগ বাণিজ্য): যেখানে মেধার মূল্যায়ন হওয়ার কথা, সেখানে চলল নিলাম। পকেটে ‘নোটের বস্তা’ আর মাথার ওপর ‘ক্ষমতাবান চাচার ছাতা’ থাকলে যে কেউ মালি হয়ে যাচ্ছে, যারা হয়তো গাছের পাতাই চেনে না।
২০২৪-এর ঝড় ও ‘হাইব্রিড ঘুণপোকা’র উদয়
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ঝড়ে পুরনো পাহারাদাররা পালিয়ে গেল। সবাই ভাবল এবার বুঝি খাঁটি সার পড়বে। কিন্তু ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে দেখা যায়, পুরনো উইপোকাদের জায়গায় নতুন কিছু ‘হাইব্রিড ঘুণপোকা’ বাসা বেঁধেছে।
লিকুইড লাভ ও পরীক্ষা ছাড়া পাসের ‘হিরোইজম’
সমাজবিজ্ঞানী জাইগমুন্ট বাউম্যানের ‘লিকুইড লাভ’ বা তরল ভালোবাসার ধারণাটি এখন আমাদের শিক্ষার ধূসর বাস্তব। সম্পর্কগুলো এখন আর নোঙর করা শক্ত জাহাজ নয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় সংযোগ (Connection) আছে প্রচুর, কিন্তু সম্পর্ক (Relationship) নেই। এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়। 'পরীক্ষা ছাড়া পাস' করার এক অদ্ভুত হিরোইজম তৈরি হয়েছে। পরীক্ষায় ফেল করালে শিক্ষাবোর্ড ভাঙচুর করা হচ্ছে। গভীর সাধনার বদলে এই যে তাৎক্ষণিক তৃপ্তির নেশা, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এক ‘অনিয়মে ভাঙা হাড়ের’ মতো নাজুক অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মব (Mob) কালচারের স্রোতে গা ভাসিয়ে সাফল্য পেতে চাওয়া আসলে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে জাতিকে।
চূড়ান্ত প্রশ্ন: মালি বদলাবেন নাকি নিয়ম?
গম্বুজ আছে, কিন্তু মগজ নেই—আমাদের কাঠামোগত উন্নয়নের চিত্রটা এমনই। বাইরের চাকচিক্যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কিন্তু ভেতরে মগজের ঘরে শুধুই শূন্যতা। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে আমাদের দরকার ছিল এক ‘মানসিক বিপ্লব’। ক্ষমতার গদিটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, এটি স্রেফ সাবলেট নেওয়া বাসা। কিন্তু দম্ভের বশবর্তী হয়ে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন, তাদের জন্য মহাজাগতিক সতর্কবাণী— "সাধু সাবধান!"
মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে যে বালির বাঁধ আপনারা তৈরি করেছেন, মাজলুমের একটা দীর্ঘশ্বাসই তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সময় থাকতে সাবধান হওয়া ভালো। গম্বুজ গোনার আগে আসুন মগজের চর্চা করি। কারণ দিনশেষে প্রকৃতির নিজস্ব দাঁড়িপাল্লায় কোনো ভিআইপি কোটা নেই।
সার্বিক মূল্যায়ন
শিক্ষাব্যবস্থা একটি সভ্যতার মেরুদণ্ড। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষকে মানুষ করে তোলার প্রক্রিয়া। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মেরুদণ্ড সোজা করে দেয়, তাকে সত্য ও সততার শক্তিতে দাঁড়াতে শেখায়। কিন্তু আমরা যদি সেই মেরুদণ্ডের রডের জায়গায় বাঁশ বসিয়ে দিই, তাহলে ভবিষ্যতের প্রজন্ম দাঁড়াবে কীভাবে? কিন্তু আমরা যদি সেই মেরুদণ্ডের রডের জায়গায় বাঁশ বসিয়ে দিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দাঁড়াবে কীভাবে? মগজ চাষের খামারে যদি উইপোকাদের উৎসব চলতেই থাকে, তবে খামার থাকবে, ভবন থাকবে, সার্টিফিকেটও থাকবে—কিন্তু কেবল মগজটুকুই থাকবে না। আর তখন আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবব—রকেট কেন মঙ্গল পর্যন্ত গেল না!
—ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র, odhikarpatranews@gmail.com
#EducationSystem #Bangladesh #CorruptionNews #EducationReform #SystemicCorruption #শিক্ষাব্যবস্থা #দুর্নীতি #মগজ_চাষের_কিচ্ছা #বাংলাদেশ #শিক্ষা_সংবাদ #জুলাই_বিপ্লব #মেধার_মূল্যায়ন #রডের_বদলে_বাঁশ #SaveEducation #AcademicIntegrity #ZeroToleranceToCorruption #FutureGeneration #EducationCrisisBD
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দৈনিক সমূহে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথিপত্র।