03/11/2026 ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা—শিক্ষার তেলেসমাতি: আমলাতান্ত্রিক জাদুকরি না কি উন্নয়নের তামাশা?
Dr Mahbub
১১ March ২০২৬ ১৩:০৯
—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০–এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। কিন্তু দেড় দশক পেরিয়েও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন এবং নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে শিক্ষাবিদদের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের স্বপ্ন কেন ভেস্তে গেল? আমলাতন্ত্র, প্রকল্প রাজনীতি এবং শিক্ষানীতির নানা তেলেসমাতি ঘিরে এই বাস্তবতার বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
'তেলেসমাতি' শব্দটির সাথে আমাদের পরিচয় রূপকথার পাতায়। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন এবং এর সংস্কার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, রূপকথার চেয়েও বড় জাদুর খেলা চলে সচিবালয়ের এসি রুমে। বিশেষ করে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব— 'প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীতকরণ' নিয়ে গত দেড় দশকে যে তেলেসমাতি কারবার আমরা দেখলাম, তা একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আমাকে হাসতে হাসতে লুটেপুটি খেতে বাধ্য করে। তবে এ হাসি আনন্দের নয়, বরং এক গভীর বিষাদ ও বিদ্রূপের।
সহজ সমীকরণ বনাম জটিল পরিকল্পনা
শিক্ষার এই সংস্কারটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মানবিক এবং সামাজিক। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বাল্যবিবাহ একটি অভিশাপ। একটি মেয়ে যখন ৫ম শ্রেণি শেষ করে মাধ্যমিকে পা দেওয়ার সন্ধিক্ষণে থাকে, তখনই সে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের ঝুঁকির মুখে পড়ে। তৎকালীন শিক্ষা সচিব এন আই খানের উপস্থিতিতে ঢাকার একটি এনজিও নেটওয়ার্কে দেওয়া আমার এক 'কী নোট পেপারে' আমি দেখিয়েছিলাম— এই ঝুঁকি রুখতে হলে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
সমাধানটি ছিল অত্যন্ত সহজ:
এখানে কোনো নতুন ভবনের প্রয়োজন ছিল না। যে শিক্ষার্থী যেখানে পড়ছে, সে সেখানেই পড়বে। কেবল প্রশাসনিক তদারকি এবং আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করলেই কোটি কোটি মেয়েকে আরও ৩ বছর পড়াশোনার সুযোগ দিয়ে বাল্যবিবাহ রুখে দেওয়া সম্ভব ছিল।
এসি রুমের 'হাতুড়ে ডাক্তার' ও ওপেন হার্ট সার্জারি
কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারক আমলারা সহজ পথে হাঁটতে নারাজ। কারণ সহজ পথে কোটি কোটি টাকার 'বাজেট' নেই। শুরু হলো এক মহা কর্মযজ্ঞ। কক্সবাজারের বিলাসবহুল রিসোর্টে এসি রুমে বসে কর্তাব্যক্তিরা মিটিংয়ের পর মিটিং করলেন। লক্ষাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশাল অবকাঠামোগত পরিবর্তনের এক অবাস্তব ছক তৈরি করা হলো।
অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যেন— এক হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে ওপেন হার্ট সার্জারি করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেখানে শুধু একটি আইনি কলমের খোঁচায় সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল, সেখানে তারা ইট-পাথর আর সিমেন্টের ইমারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর হলেন। কারণ ইমারত গড়লে কমিশন আছে, বিদেশ সফরের সুযোগ আছে, আর আছে বিশাল অংকের বাজেটের নয়ছয়।
আমলাতন্ত্রের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন
এই আমলাতান্ত্রিক তেলেসমাতির শেষ পরিণতি কী হলো? কোটি কোটি টাকা খরচ আর কাগজের ওপর পাহাড় সমান বাজেট তৈরি হলো ঠিকই, কিন্তু মূল উদ্যোগটিই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ল। আজ ১৫ বছর পরও প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীতকরণের বিষয়টি সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। মাঝখান দিয়ে আমলাদের পকেট ভারী হয়েছে, কিন্তু গ্রামের সেই মেয়েটির বাল্যবিবাহ ঠেকানো যায়নি।
শেষ কথা: মায়া জাল ছিঁড়বে কে?
শিক্ষার সংস্কার যখন কেবল ফাইলবন্দি মিটিং আর অবকাঠামোর ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন তাকে আর শিক্ষা বলা যায় না; তা হয়ে দাঁড়ায় 'তেলেসমাতি'। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আমার প্রশ্ন— আমরা কি আদৌ শিশুদের মেধা আর জীবন রক্ষা করতে চাই, নাকি শিক্ষার নাম করে কেবল বড় বড় প্রকল্পের ধান্ধা করতে চাই?
যদি সত্যি আমরা পরিবর্তন চাই, তবে আমাদের এসি রুমের বিলাসিতা ছেড়ে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়াতে হবে। নীতিনির্ধারণে আমলাদের চেয়ে মাঠপর্যায়ের শিক্ষাবিদদের গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায়, শিক্ষার এই জাদুর খেলায় দেশ হয়তো সনদধারী শিক্ষিত হবে, কিন্তু মেধা আর মানবিকতায় আমরা আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাব।
একটি আইনি সংশোধনেই কোটি মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠেকানো যেত—কিন্তু আমরা বেছে নিলাম প্রকল্প, বাজেট আর আমলাতন্ত্রের জাদু ।
—ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র, odhikarpatranews@gmail.com
#PrimaryEducation #শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষানীতি #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষা_সংকট #শিক্ষার_তেলেসমাতি #PolicyFailure #Bureaucracy #PublicPolicy #DevelopmentDebate #EducationCrisis