04/22/2026 শিশুর হাসির ভেতর লুকানো রাষ্ট্র:প্রা ক-প্রাথমিক শিক্ষা, ELDS ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে শৈশবের প্রথম পাঠশালায় স্বপ্ন, সংকট ও সম্ভাবনার এক অনুসন্ধান
Dr Mahbub
২২ April ২০২৬ ০০:২৬
—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও ELDS-এর কাঠামো এক নতুন শিক্ষাদর্শের সূচনা করলেও বাস্তবায়নের পথে রয়ে গেছে বৈষম্য, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং নীতির সঙ্গে বাস্তবতার গভীর ব্যবধান। এই বিশেষ ফিচার নিবন্ধে উঠে এসেছে শৈশবের প্রথম হাজার দিনের গুরুত্ব, ECCD-এর বহুমাত্রিক বাস্তবতা, এবং ELDS-এর নীরব বিপ্লবের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ও সম্ভাবনা।
ভোরের প্রথম আলোয় যখন একটি শিশু পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখে, তখন সে কেবল একটি দিনের সূচনা করে না—সে শুরু করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের যাত্রা। তার কৌতূহল, তার খেলা, তার হাসি—এসবই অদৃশ্যভাবে গড়ে তোলে জ্ঞান, বোধ ও মানবিকতার ভিত্তি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই শৈশবকে আমরা দেখেছি অবহেলার চোখে—যেনো শিক্ষার মূল অধ্যায় শুরু হয় কেবল বিদ্যালয়ের দরজায়। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনা কাঠামো, ECCD নীতি এবং ELDS-এর মতো ধারণা আমাদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—শিক্ষা কি কেবল বইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ, নাকি শিশুর প্রতিটি অভিজ্ঞতাই এক একটি শিক্ষণ মুহূর্ত?
এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এখানে শৈশবের গল্প আছে, রাষ্ট্রের নীতি আছে, বাস্তবতার কঠিন চিত্র আছে, আর আছে এক গভীর দ্বন্দ্ব—স্বপ্ন ও বাস্তবতার, কাগজ ও মাঠের, প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োগের।
ভোরের প্রথম আলো যখন মাটির ঘরের জানালা ছুঁয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে, তখন একটি শিশুর দিন শুরু হয় নিঃশব্দ অথচ গভীর এক জিজ্ঞাসা নিয়ে। তার চোখে পৃথিবী নতুন, তার হাতে ধরা প্রতিটি বস্তু একেকটি আবিষ্কার। সে যখন প্রথমবার নিজের নাম উচ্চারণ করে, কিংবা মায়ের কণ্ঠে শোনা ছড়ার সুরে হাসে—সেই মুহূর্তগুলোই অদৃশ্যভাবে নির্মাণ করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। অথচ এই সূক্ষ্ম, কোমল, অনির্বচনীয় সময়টুকু দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় ছিল উপেক্ষিত, ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উদ্যোগের ভেতরে বন্দী।
বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গল্পটি তাই কেবল একটি শিক্ষানীতির গল্প নয়; এটি এক দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনের কাহিনি, যেখানে একটি জাতি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছে—শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয় বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে নয়, বরং তার অনেক আগেই, শিশুর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছরে। এই উপলব্ধিরই একটি সুসংগঠিত প্রকাশ ঘটেছে ২০০৮ সালে প্রণীত Operational Framework for Pre-Primary Education-এ, যা দেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত ।
এই কাঠামোর জন্ম হঠাৎ করে নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং উপলব্ধির স্তরীভবন। একসময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে “বেবি ক্লাস” নামে যে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল, তা মূলত শিশুদের বিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করানোর একটি প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু সেখানে ছিল না কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম, ছিল না প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ছিল না শিশুর বিকাশের বৈজ্ঞানিক ধারণা। যেনো এক অনিয়ন্ত্রিত নদী—যার প্রবাহ আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই।
এমন এক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র উপলব্ধি করল—শৈশবকে আর এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ, গবেষণা এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শুধু শিশুর প্রাথমিক শেখার ক্ষমতাকেই উন্নত করে না, বরং পরবর্তী জীবনে তার শিক্ষাগত সাফল্য, সামাজিক আচরণ, এমনকি কর্মজীবনের সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করে। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের যে সংবেদনশীল সময়কাল জন্ম থেকে বিদ্যালয়ে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত, সেই সময়টুকুতে যদি যথাযথ উদ্দীপনা ও সহায়তা প্রদান করা যায়, তবে তার শেখার ভিত্তি হয়ে ওঠে দৃঢ়, সুসংগঠিত এবং টেকসই ।
এই উপলব্ধি কেবল জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একই সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। “Education for All” আন্দোলন, ডাকার ফ্রেমওয়ার্ক, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—সবগুলোই প্রারম্ভিক শৈশব যত্ন ও শিক্ষার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে নিজস্ব প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে রাষ্ট্রীয় নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতার সম্মিলনে গড়ে ওঠে এই পরিচালনা কাঠামো, যা একদিকে যেমন একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করে, অন্যদিকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও উপায়ও নির্ধারণ করে ।
এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি শিশুকে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে। এখানে শিক্ষা বলতে কেবল বর্ণমালা বা সংখ্যাজ্ঞান অর্জনকে বোঝানো হয়নি; বরং শিশুর শারীরিক, মানসিক, ভাষাগত, সামাজিক এবং আবেগিক বিকাশকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি শিশু যখন খেলতে খেলতে শিখছে, গল্প শুনছে, গান গাইছে, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশছে—তখনই তার শেখা সম্পন্ন হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এক সুস্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে শেখাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল বইয়ের পাতার ভেতরে।
কিন্তু এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করা সহজ ছিল না। কারণ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে। কোথাও NGO-নির্ভর উদ্যোগ, কোথাও বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে শিক্ষা—সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় কিন্তু অসংগঠিত চিত্র। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে শিক্ষার মানে বৈচিত্র্য দেখা দেয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উপেক্ষিত থেকে যায় ।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে পরিচালনা কাঠামো একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, সম্প্রদায় এবং পরিবার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই সমন্বয় কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়, যেখানে শিশুর কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এই কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদ্যালয় প্রস্তুতি বা “school readiness” ধারণার উপর জোর দেওয়া। একটি শিশু বিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নির্ভর করে তার শেখার সক্ষমতা, সামাজিক দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং আবেগিক স্থিতির উপর। কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্যালয়ও কতটা প্রস্তুত সেই শিশুকে গ্রহণ করার জন্য—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বিমুখী প্রস্তুতির ধারণা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে বাস্তবতা এখনো চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। শহরের একটি আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্রে যেখানে শিশুরা রঙিন উপকরণ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ পায়, সেখানে গ্রামের অনেক শিশু এখনো সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রতিফলন। পরিচালনা কাঠামো এই বৈষম্য দূর করার জন্য বিশেষভাবে দরিদ্র, প্রান্তিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগে সেই লক্ষ্য পূরণ এখনো একটি চলমান চ্যালেঞ্জ ।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি শিশুর প্রথম সামাজিক পরিসরের নির্মাতা, তার আত্মবিশ্বাসের উৎস, তার কৌতূহলের দিশারি। তাই এই কাঠামোতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় সম্প্রদায় থেকে শিক্ষক নির্বাচন, তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে ।
কিন্তু শিক্ষার এই যাত্রায় পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু তার অধিকাংশ সময় কাটায় পরিবারের সঙ্গে, তাই তার শেখার প্রাথমিক পরিবেশটি গড়ে ওঠে ঘরেই। এই কারণে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং একটি শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এই কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য। কমিউনিটি অংশগ্রহণ, অভিভাবক সভা এবং স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় সুষ্ঠু স্থানান্তর নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে একটি আনন্দময়, খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর তারা হঠাৎ করে একটি কাঠামোবদ্ধ, পরীক্ষানির্ভর ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়। এই পরিবর্তন তাদের জন্য মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পরিচালনা কাঠামোতে এই দুই পর্যায়ের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।
সবশেষে, এই কাঠামো একটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এখানে বলা হয়েছে—প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মানচিত্র তৈরি করতে হবে, বিদ্যমান উপকরণসমূহ পর্যালোচনা করতে হবে, একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে এবং একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে ।
এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে আমরা আবার সেই শিশুটির কাছে ফিরে আসি, যে প্রথমবার তার নাম লিখতে শিখছে। তার ছোট্ট হাতের সেই অক্ষরগুলো হয়তো এখনো নিখুঁত নয়, কিন্তু সেই অক্ষরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি জাতির সম্ভাবনা। যদি আমরা তার শৈশবকে সঠিকভাবে লালন করতে পারি, যদি আমরা তাকে শেখার একটি আনন্দময়, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ দিতে পারি—তবে সে একদিন এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কারণ, একটি জাতির উন্নয়ন তার বড় বড় স্থাপনায় নয়, তার ছোট ছোট শিশুদের চোখের স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম ধাপই হলো—একটি শক্তিশালী, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা।
এই বৃহৎ বয়ানের ভেতরে, যেখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো একটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আরেকটি নীরব কিন্তু গভীর স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে—Early Learning and Development Standards (ELDS)-এর ধারণা। যদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনা কাঠামো হয় একটি নদীর তীর, তবে ELDS যেন সেই নদীর অভ্যন্তরীণ স্রোত—অদৃশ্য, কিন্তু দিকনির্দেশক। আর এই স্রোতকে না বুঝিলে, আমরা হয়তো বাহ্যিক কাঠামো নির্মাণ করিব, কিন্তু শৈশবের প্রকৃত বিকাশের অন্তর্গত ছন্দ ধরিতে পারিব না।
রিমার গল্পটি তাই কেবল একটি শিশুর গল্প নহে; ইহা একটি রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। ভোরের আলোয় যখন সে মাটিতে বসিয়া আঁকিবুকি কাটে, তখন সে কোনো পাঠ্যক্রম অনুসরণ করিতেছে না—কিন্তু ELDS-এর দৃষ্টিতে সে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষণ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়াই অগ্রসর হইতেছে। তার আঙুলের ছোঁয়ায় যে রেখা তৈরি হয়, তাহার মধ্যেই লুকাইয়া থাকে সৃজনশীলতার প্রথম স্ফুলিঙ্গ, তার প্রশ্নের ভেতরে জেগে ওঠে জ্ঞানীয় বিকাশের সূচনা, আর তার সহপাঠীর সঙ্গে হাসিতে গড়ে ওঠে সামাজিকতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাচিন্তাকে এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায়।
কারণ, আমরা দীর্ঘদিন ধরিয়া শিক্ষা মানেই ভেবেছি—বই, খাতা, পরীক্ষা, নম্বর। অথচ ELDS বলিতেছে—শিক্ষা একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া, যাহা শিশুর ভেতরেই ঘটিত হয়, বাহির হইতে চাপাইয়া দেওয়া হয় না। এই ধারণাটি যেমন মুক্তিকামী, তেমনই বিপ্লবাত্মক। কিন্তু এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সংকট—ইহা এখনো সর্বত্র পৌঁছায় নাই।
শহরের একটি উন্নত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ELDS-এর সূচক অনুযায়ী কার্যক্রম পরিকল্পিত হইতেছে—শিশুর ভাষা বিকাশের জন্য গল্প, আবেগিক বিকাশের জন্য ভূমিকা খেলা, জ্ঞানীয় বিকাশের জন্য সমস্যা সমাধানমূলক কার্যক্রম। কিন্তু একই সময়ে, দেশের বহু গ্রামে এখনো শিক্ষা মানেই “অ আ ক খ” মুখস্থ করা। শিক্ষক নিজেই জানেন না ELDS কী, অভিভাবক মনে করেন—“খেলা করিয়া আবার কী শেখা হয়?” ফলে ELDS-এর দর্শন, যাহা শিশুকে কেন্দ্র করিয়া নির্মিত, তাহা বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
এই সংঘর্ষটি কেবল ধারণাগত নহে—ইহা সাংস্কৃতিক। আমাদের সমাজে এখনো শিক্ষা মানেই কঠোরতা, শৃঙ্খলা, পরীক্ষার প্রস্তুতি। সেখানে ELDS বলিতেছে—শিক্ষা হইবে আনন্দময়, খেলাধুলাভিত্তিক, শিশুর গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতে অনেক সময় শিক্ষক নিজেই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন—তিনি কি খেলতে দিবেন, না পড়াতে বসাইবেন?
এই দ্বিধা দূর না করিলে ELDS কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকিবে। কারণ, একটি মানদণ্ড কেবল প্রণয়ন করিলেই তাহা বাস্তবতা হইয়া ওঠে না; তাহাকে বাঁচাইতে হয় মানুষের চর্চায়, বিশ্বাসে, দৃষ্টিভঙ্গিতে। তবে পরিবর্তনের আলামতও স্পষ্ট। নতুন প্রজন্মের শিক্ষকরা ধীরে ধীরে বুঝিতে শুরু করিয়াছেন—একটি শিশুর শেখা মানে তার কৌতূহলকে জাগ্রত রাখা। একটি শিশুর “কেন?” প্রশ্নটি বন্ধ করিয়া দেওয়া মানে তার শেখার পথ রুদ্ধ করা। ELDS এই জায়গাটিতেই একটি নতুন আলোর দিশা দেখাইতেছে—যেখানে মূল্যায়ন মানে শুধু নম্বর নহে, বরং একটি শিশুর বিকাশের পূর্ণাঙ্গ গল্প।
এই দর্শনের শিকড়ও গভীরে প্রোথিত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১৯৯০-এর দশক হইতে শিশু অধিকার, প্রারম্ভিক বিকাশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক স্থাপিত হইতে থাকে। UNICEF ও UNESCO-এর মতো সংস্থাগুলি এই ধারণাকে সামনে আনিয়া বলে—শিশুর জীবনের প্রথম বছরগুলিই তার ভবিষ্যতের ভিত্তি। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করিয়া ২০১০-এর পরবর্তী সময়ে ELDS প্রণয়ন করে—একটি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাভিত্তিক কাঠামো হিসেবে, যাহা শিশুর বিকাশকে পরিমাপ করিবার পরিবর্তে বুঝিবার চেষ্টা করে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি সূক্ষ্ম সমালোচনার জায়গা তৈরি হয়। ELDS যেহেতু একটি মানদণ্ড, তাহা অনেক সময় অজান্তেই একটি “নির্দিষ্ট শিশু” কল্পনা করে—যে শিশু একটি নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করিবে। কিন্তু বাস্তবতার শিশুরা কি এতটা একরৈখিক? একটি পাহাড়ি অঞ্চলের শিশু, একটি বস্তির শিশু, একটি শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু—তাহাদের অভিজ্ঞতা, ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করিবার চেষ্টা অনেক সময় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলিবার ঝুঁকি তৈরি করে।
অতএব, ELDS-এর প্রয়োগ হইতে হইবে নমনীয়, প্রাসঙ্গিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল। ইহা কোনো কঠোর মাপকাঠি নহে—ইহা একটি দিকনির্দেশনা, যাহা শিশুর বৈচিত্র্যকে সম্মান করিয়া তাকে বিকশিত হইবার সুযোগ দিবে। এই আলোচনার সঙ্গে ECCD-এর বৃহত্তর কাঠামোটি যুক্ত হইলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। একটি শিশুর বিকাশ কেবল শিক্ষার উপর নির্ভর করে না—ইহা নির্ভর করে তার পুষ্টি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং স্নেহের উপর। বাংলাদেশের ECCD নীতি এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে আনিয়াছে—যেখানে একাধিক মন্ত্রণালয় একত্রে কাজ করিবার চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু বাস্তবে এই সমন্বয় অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি পাড়া কেন্দ্র, কিংবা কক্সবাজারের একটি সমন্বিত সেবা কার্যক্রম—এইসব উদাহরণ আমাদের আশা জাগায়। কিন্তু একই সঙ্গে এই প্রশ্নটিও উত্থাপিত হয়—এই উদ্যোগগুলি কি সারাদেশে সমানভাবে বিস্তৃত? শহরের একটি শিশুর তুলনায় গ্রামের শিশুটি কি একই সুযোগ পাইতেছে?
সবচেয়ে বড় যে শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহা হইল জন্ম হইতে তিন বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের জন্য কার্যকর কর্মসূচির অভাব। অথচ এই সময়টিই শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুততম বিকাশের সময়। ELDS ও ECCD উভয়ই এই সময়ের গুরুত্ব স্বীকার করে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এই স্তরটি এখনো সবচেয়ে অবহেলিত। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখে—আমরা কি সত্যিই শৈশবকে গুরুত্ব দিতেছি, নাকি কেবল নীতিমালার ভাষায় তাহাকে স্বীকৃতি দিতেছি?
তবুও আশা হারাইবার কারণ নাই। “Nurturing Care” ধারণাটি এখন ধীরে ধীরে কেন্দ্রস্থলে আসিতেছে—যেখানে শিশুর বিকাশকে একটি সমন্বিত, মানবিক এবং সম্পর্কনির্ভর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হইতেছে। এই ধারণা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে না; ইহা পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়িবে।
রিমার গল্পে আবার ফিরিয়া আসি। সে যখন মাটিতে বসিয়া ছবি আঁকে, তখন হয়তো সে কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সে শিখিতেছে—নিজেকে প্রকাশ করিতে, পৃথিবীকে বুঝিতে, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়িতে। ELDS-এর চোখে এই শেখাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, বাংলাদেশের জন্য ELDS কেবল একটি নীতিমালা নহে; ইহা একটি দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর। এই রূপান্তর তখনই সফল হইবে, যখন আমরা শিশুকে ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে নয়, বরং বর্তমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে দেখিতে শিখিব। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না হঠাৎ করিয়া; ইহা ধীরে ধীরে নির্মিত হয়—একটি শিশুর হাসিতে, একটি প্রশ্নে, একটি আঁকায়। আর সেই নির্মাণের অদৃশ্য নকশাই হয়তো ELDS—নীরব, কিন্তু গভীর; অদৃশ্য, কিন্তু অনিবার্য।
এই বিস্তৃত বয়ানের গভীরে প্রবেশ করিলে আরেকটি স্তর উন্মোচিত হয়—একটি স্তর, যেখানে নীতিমালার উজ্জ্বল শব্দাবলি ও বাস্তবতার ধুলোমাখা পথ পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়। যেন একদিকে অলংকৃত প্রাসাদ, অন্যদিকে কাঁচা মাটির ঘর—উভয়ই একই ভূখণ্ডে, কিন্তু একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। Early Childhood Care and Development (ECCD) ও ELDS-কে ঘিরে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি এই দ্বৈততারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে—যেখানে নীতিতে সবুজ সংকেত, অথচ মাঠে লাল বাতির দীর্ঘ সারি।
যে রাষ্ট্র একদিকে “Holistic Development”, “Equity”, “Quality”—এই শব্দগুলির মালা গেঁথে ভবিষ্যতের কাব্য রচনা করে, সেই রাষ্ট্রেরই কোনো এক প্রান্তে একটি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে শিশুরা বসিয়া থাকে শিক্ষকবিহীন। বোর্ডে চক দিয়ে লেখা—“ECCD ক্লাস চলছে”—কিন্তু ক্লাসরুমে কেবল নীরবতা, ধুলোর স্তব্ধ নৃত্য, আর কিছু অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ছায়া। এই বৈপরীত্য কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নহে; ইহা এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই শৈশবকে গুরুত্ব দিতেছি, না কি কেবল ভাষার অলংকারে তাহাকে বন্দি করিয়া রাখিতেছি?
নীতিনির্ধারকদের দপ্তরে বসিয়া যখন Strategic Operational Plan রচিত হয়, তখন শব্দগুলি ঝলমল করে—“inter-sectoral coordination”, “integrated services”, “child-centred approach”—সবকিছু যেন এক মহাভোজের আয়োজন। কিন্তু সেই পলিসির পায়েস যখন মাঠে পৌঁছায়, তখন তাহা অনেক সময় পান্তাভাতে পরিণত হয়—স্বাদে নয়, বাস্তবতার কঠোরতায়। একটি মন্ত্রণালয় বলে—“আমরা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি”, অন্যটি বলে—“আমরা শিক্ষা দিচ্ছি”—কিন্তু শিশুটি দাঁড়াইয়া থাকে মাঝখানে, যাহার জন্য এই সমন্বয়, সে-ই যেন সবচেয়ে বেশি অসংগঠিত।
এই সমন্বয়ের সংকট নতুন নয়। বহু আগেই গবেষণাগুলি সতর্ক করিয়াছে—নীতির মধ্যে যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়, বাস্তবে তাহা প্রায়ই দুর্বল। এক মন্ত্রণালয়ের ফাইল অন্য মন্ত্রণালয়ের টেবিলে পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে সময় হারায়, আর সেই সময়ের মধ্যেই শিশুর শৈশব অতিক্রান্ত হয়। সমন্বয়ের এই ব্যর্থতা যেন একটি অসমাপ্ত সেতু—দুই প্রান্ত আছে, কিন্তু মাঝখানে শূন্যতা।
আরেকটি বড় সংকট লুকাইয়া আছে সম্পদের বণ্টনে। ECCD-এর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ প্রায়ই সীমিত, এবং যাহা আছে তাহাও সবসময় সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। বাজেটের সভায় ECCD যেন এক অবহেলিত অতিথি—যাহাকে সবাই স্বীকার করে, কিন্তু কেউ অগ্রাধিকার দেয় না। ফলত, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কেন্দ্রগুলিতে শিক্ষক সংকট, উপকরণের অভাব, এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয় বৈষম্যের নির্মম চিত্র। ঢাকার একটি শিশুর হাতে যখন ট্যাবলেট, কোডিং ক্লাস, আর সৃজনশীলতার অসীম সুযোগ, তখন দেশের অন্য প্রান্তে একটি শিশু খালি পায়ে মাঠে দৌড়াইয়া বেড়ায়—তার কাছে শিক্ষা এখনো একটি দূরবর্তী সম্ভাবনা। নীতিমালা বলে—“কেউ পিছিয়ে থাকবে না”—কিন্তু বাস্তবতা যেন নীরবে ফিসফিস করে—“অনেকেই অনেক দূরে পিছিয়ে আছে।” এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; ইহা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন, যেখানে সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবে রূপ পায় নাই।
মনিটরিং ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের এক অদ্ভুত মায়া কাজ করে। রিপোর্টে লেখা থাকে—“কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে”, “লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত”—কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অনেক সময় সেই দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। তথ্য থাকে, কিন্তু তাহার প্রামাণিকতা প্রশ্নবিদ্ধ; মিটিং হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। যেন এক কাগুজে জগৎ—যেখানে সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তাহার সংযোগ দুর্বল।
এই সমস্ত সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারাইয়া যায় শিশুর কণ্ঠস্বর। একটি শিশু যদি প্রশ্ন করে—“ECCD কী?”—তাহার উত্তর আমরা দিই—“তোমার সার্বিক বিকাশ।” কিন্তু সেই শিশুটি যখন বলে—“আমার খেলনা নাই, বই নাই, শিক্ষক নাই”—তখন আমাদের উত্তর থমকাইয়া যায়। কারণ, নীতির ভাষা এবং শিশুর বাস্তবতার মধ্যে যে ফাঁক, তাহা কেবল যুক্তি দিয়ে পূরণ করা যায় না; প্রয়োজন সৎ আত্মসমালোচনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।
তবে এই সমালোচনার ভেতরেও সম্ভাবনার বীজ লুকাইয়া আছে। কারণ, সমস্যার স্বীকৃতি নিজেই একটি অগ্রগতি। গবেষণাগুলি যাহা দেখাইতেছে—নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান, তাহা দূর করিবার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, শক্তিশালী এবং প্রাসঙ্গিক প্রয়াস। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি, পর্যাপ্ত ও স্বচ্ছ বাজেট বরাদ্দ, আন্তঃমন্ত্রণালয় কার্যকর সমন্বয়, নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক মনিটরিং—এইসব পদক্ষেপ কেবল সুপারিশ নহে; ইহাই ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।
এখানে একটি মৌলিক সত্য পুনরায় উচ্চারিত হয়—ECCD কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নহে; ইহা একটি সামগ্রিক সামাজিক চুক্তি। পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ—সবাইকে একত্রে কাজ করিতে হইবে। একটি শিশুর বিকাশ একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া; তাহাকে খণ্ডিতভাবে দেখা মানেই তাহার সম্ভাবনাকে খণ্ডিত করা।
এই সমগ্র আলোচনার শেষে আবার সেই প্রাথমিক চিত্রে ফিরে যাই—একটি শিশু, মাটিতে বসিয়া ছবি আঁকিতেছে। তার চারপাশে যদি একটি সহায়ক পরিবেশ থাকে—যেখানে সে নিরাপদ, পুষ্ট, ভালোবাসায় আবদ্ধ, এবং শেখার সুযোগে পরিপূর্ণ—তবে তার সেই আঁকিবুকি একদিন একটি সুসংগঠিত জ্ঞানের রূপ নেবে। কিন্তু যদি সেই পরিবেশ অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই আঁকিবুকি হয়তো মুছে যাবে—অদেখা, অশ্রুত, অপূর্ণ।
নীতিমালা তখন একটি প্রেমপত্রের মতো—যত্নসহকারে লেখা, কিন্তু সঠিক ঠিকানায় পৌঁছায় নাই। বাস্তবতা সেই প্রেয়সী, যে অপেক্ষা করিতেছে—কবে এই শব্দগুলি জীবন্ত হয়ে উঠিবে, কবে প্রতিশ্রুতি রূপ নেবে কর্মে।
ততদিন পর্যন্ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এই দ্বৈততা চলিতে থাকিবে—একদিকে উষ্ণ পলিসির পায়েস, অন্যদিকে শীতল বাস্তবতার পান্তাভাত। আর এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়াইয়া একটি শিশুই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করিবে—নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।
—সেই প্রশ্নের উত্তর দিবার দায় আমাদেরই।
এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমরা একটি সত্যের সামনে এসে দাঁড়াই—প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, ELDS কিংবা ECCD—এসব কেবল নীতিগত শব্দ নয়; এগুলো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ। বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে—নীতিমালা প্রণয়ন হয়েছে, কাঠামো তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ, নীতির আলো সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।
যদি আমরা সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে চাই, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শৈশবে—শিশুর প্রথম অভিজ্ঞতায়, প্রথম শেখায়, প্রথম প্রশ্নে। কারণ, একটি শিশুর শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত, এই গল্পটি নীতি বা কাঠামোর গল্প নয়—এটি একটি শিশুর গল্প। সেই শিশুটি হয়তো এখনো নিজের নাম ঠিকভাবে লিখতে পারে না, কিন্তু তার চোখে যে স্বপ্ন, তার মনে যে কৌতূহল—সেইটিই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আমরা যদি সেই কৌতূহলকে লালন করতে পারি, যদি আমরা তার জন্য একটি নিরাপদ, স্নেহময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারি—তবে ELDS বা ECCD কোনো আলাদা শব্দ থাকবে না; এগুলো হয়ে উঠবে জীবনের অংশ। কিন্তু যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে নিঃশব্দ—একটি শিশুর সম্ভাবনা হারিয়ে যাবে, কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না, কোনো প্রতিবেদনে লেখা থাকবে না। অতএব, প্রশ্নটি এখনো রয়ে যায়—আমরা কি শৈশবকে সত্যিই গুরুত্ব দিচ্ছি, নাকি এখনো তাকে নীতির ভাষায় বন্দি করে রাখছি?
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#EarlyChildhoodBangladesh #ECCD #ELDS #SchoolReadiness #EducationReform #InclusiveEducation #ChildDevelopment #PolicyVsReality #ShishurAdhikar #PrePrimaryEducation #BangladeshEducation #HumanCapital #FutureOfNation #ChildhoodMatters #NurturingCare #EducationalEquity #DevelopmentJourney #RightsBasedEducation