04/25/2026 সৃজনশীলতার আড়ালে বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি ও বাংলাদেশের শিক্ষার আত্মহত্যা: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির এক কালো অধ্যায়
Dr Mahbub
২৩ April ২০২৬ ২৩:৪৯
—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতির সূচনা কি আসলেই মুক্তি নাকি এক সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি? দেড় যুগের অস্থিরতা, বিদেশিদাতাদের এজেন্ডা এবং শিক্ষকদের অসহায়ত্বের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই সত্য উদঘাটন করা হলো এই বিশেষ নিবন্ধে। “সৃজনশীল” নামটি যেন এক বিষবৃক্ষের ফুল—বাইরে সুন্দর, ভেতরে নিঃশেষ। বাংলাদেশে শিক্ষার নামে যে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধ ইতিহাসে বিরল। নামের আড়ালে কাঠামোবদ্ধ যান্ত্রিকতা, কোচিং-গাইডের অর্থনীতি ও শিক্ষকের অপ্রস্তুততা—আজ এই নিবন্ধে উন্মোচিত হবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ‘সৃজনশীল’ জালিয়াতির কাহিনি। পড়ুন, জানুন ও ভাগ করুন—যেন সত্যের পথে ফিরতে পারে আগামীর বাংলাদেশ। অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের এই বিশেষ নিবন্ধে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতির প্রবর্তনকে একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি এবং প্রতারণা হিসেবে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
সত্যের আয়নার সামনে
ইতিহাস মাঝে মাঝে এমন এক আয়না ধরে দেয়—যাতে সেটিতে নিজেদের চেহারাই যেন অচেনা হয়ে ওঠে। স্বস্তি নেই, পলায়ন অসম্ভব। সেই আয়নার সামনে আজ দাঁড় করিয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে। নাম তার ‘সৃজনশীল’—এক পদে যেন স্বপ্নের বীজ। মুক্তচিন্তা, বিশ্লেষণের স্বাধীনতা, প্রাসঙ্গিক জ্ঞান—যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই মূল্যায়নপদ্ধতির আবির্ভাব হয়েছিল, কালবৈপরীতে তা আজ পরিণত হয়েছে এক প্রাতিষ্ঠানিক জালে। যেখানে নামের আড়ালে বিকৃতির জয়জয়কার, উদ্দেশ্যের পেছনে পদ্ধতির অবক্ষয়, আর সংস্কারের মুখোশে এক নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁসি।
আমরা যেন এক নৈতিক থিয়েটারের দর্শক। যারা একসময় এই পদ্ধতির স্থপতি, যারা এর প্রয়োগে উৎসাহ দিয়েছিলেন, তারাই আজ কণ্ঠে উদ্বেগ নিয়ে বলেন—“শিক্ষা ধ্বংসের পথে।” ‘চোরের মায়ের বড় গলা’—পুরোনো প্রবাদটি এই প্রসঙ্গেই যেন বারবার বাজে নতুন সুরে। ভুল নকশা, অকাল প্রয়োগ, বাস্তবতাহীন কাঠামো—তারপর তারই প্রতিক্রিয়ায় আক্ষেপ। দায় কোথায়? কেউ জানে না; দায় এড়ানোর যে কৌশলী নাচ, সেটাই আজ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত।
‘সৃজনশীল’—শব্দটি যেন মন্ত্র। বিশ্লেষণ, সমালোচনা, প্রয়োগ, নতুন করে ভাবার সক্ষমতা—এই যে আভা, এটি বহুদূরের পথ দেখায়। কিন্তু আমাদের বাস্তব ভিন্ন। একই পুরোনো পরীক্ষাপাগল সংস্কৃতির ওপরে ‘সৃজনশীল’ নামের প্রলেপ। প্রশ্নের ভাষা পাল্টেছে সত্যি, কিন্তু শিক্ষকের মনোজগৎ, শিক্ষার্থীর মেধার জগৎ, মূল্যায়নের দর্শন—সবকিছু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁচিতে কাঁপছে। নাম ‘সৃজনশীল’, কিন্তু চর্চা ‘মুখস্থনির্ভর’; উদ্দেশ্য ‘বিশ্লেষণ’, কিন্তু পরিণতি ‘পুনরুত্পাদন’। এই দ্বৈততাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা অনিচ্ছায়, সামাজিক চাপে, প্রতিযোগিতার অনিবার্যতায় কিংবা ঋণ করে কোচিং, গাইডবই ও মডেল টেস্টের অদৃশ্য জালে আবদ্ধ হয়েছেন। তারা জানেন না, তাঁরা আসলে যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছেন, তা সত্যিকারের সৃজনশীলতার বিকল্প নয়—বরং ‘রূপান্তরিত প্রতারণা’র এক পরিশীলিত রূপ। এই প্রতারণা শুধু নীতি-নৈতিকতার নয়; এটি আরও গভীর—সত্যকে আড়াল করে মিথ্যাকে নাগরিক অধিকারে পরিণত করার অভিঘাত।
মিথ্যার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: ধর্ম ও ন্যায়ের চোখে
ইসলামী শিক্ষায় সত্যের বিকৃতি ও মিথ্যার বাণিজ্যই সবচেয়ে বড় পাপ। পবিত্র কুরআন বলে—‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না’ (সূরা আল-বাকারা, ২:৪২)। হযরত মুহাম্মদ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্য (শাহাদাতুয-যূর) কে শিরকের পরেই সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছেন। শিক্ষার মতো পবিত্র ক্ষেত্রে যদি সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার জয়রথ চলে, তবে তা শুধু ব্যক্তির পাপ নয়—একটি জাতির ন্যায়বোধ ও ভবিষ্যৎ বিনাশের গোপন চুক্তি।
ইতিহাস সাক্ষী—যে সমাজে সত্যের কণ্ঠসার বন্ধ হয়, মিথ্যা যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, সেখানে ধীরে ধীরে ন্যায়ের কাঠামো ধসে পড়ে, আস্থার বন্ধন ছিন্ন হয়, আর এক সময় মানুষ নৈতিক দেউলিয়ার ঘোর অন্ধকারে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশের শিক্ষায় ‘সৃজনশীল’ নামকরণ সেদিকেই ইঙ্গিত করে। এটি কোনো পদ্ধতিগত ব্যর্থতার খাতায় লেখা অধ্যায় নয়; এটি এক জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পতনের মহাকাব্য।
নাম পরিবর্তনের ছলনা ও সত্য গোপন
আসলে ঘটনাটি কী? ১৯৯৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (SESIP)-এর পরিকল্পনা শুরু হয়। বিদেশি দাতাদের অর্থে পাবলিক পরীক্ষা সংস্কারের উদ্যোগে প্রথমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ‘কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন’ (Structured Question) পদ্ধতি নিয়ে। এটি ছিল ব্লুমের ট্যাক্সোনমির সরাসরি প্রয়োগ — যেখানে প্রশ্নগুলোর নির্ধারিত কাঠামো থাকে, উত্তরও হয় নির্ধারিত কাঠামোর ভেতরে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পদ্ধতি যখন সাধারণ মানুষের সামনে আসে, তখন এর নাম ‘কাঠামোবদ্ধ’ শুনলে অনেকেই বুঝতে পারেননি এর মর্ম। তখন ঘটে চরম কৌশলী পদক্ষেপ। বিদেশি দাতা গোষ্ঠী তাদের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থাটিকে জায়েজ করতে ব্যববহার করে কয়েকজন দালাল শিক্ষাবিদকে। একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ যিনি সাম্প্রতিক আলোচনায় এসেছেন (নৈতিক কারণে পরিচয় গোপন করা হলো) যার অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরামর্শে অভিভাবকদের কনভিন্সড করতে ব্লুম-এর কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’। কী সুন্দর নাম! ‘সৃজনশীল’ — যে শব্দটি স্বাধীনতা, উদ্ভাবন ও মুক্তচিন্তার গন্ধ বহন করে। অথচ পদ্ধতিটি ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত — একটি কাঠামোবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, নির্ধারিত উত্তর ফরম্যাটের পরীক্ষা। এই নাম পরিবর্তন ছিল ইতিহাসের এক অপমান — এক সত্যিকারের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি। একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ বলেছেন,
“বেঞ্জামিন ব্লুম সাহেব বেঁচে থাকলে এই নাম পরিবর্তনে হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতেন। কারণ তিনি জানতেন, সৃজনশীলতাকে কোনো কাঠামোতে আবদ্ধ করা যায় না।”
২০১০-এর সেই অন্ধকার বিকেল…
২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষা। ঠিক তখনই মঞ্চে আসে এক নবাগত—‘কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন’ (Structured Question)। কিন্তু দর্শকের সামনে নাম দেয়া হয় ‘সৃজনশীল’। এই নামকরণের অন্তরালে আছে এক ইতিহাস, যা বাংলাদেশ ভুলতে চাইলেও ইতিহাস ভুলবে না। ১৯৯৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর অর্থে শুরু হয় ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (SESIP)। বিদেশি দাতাদের টাকায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ব্লুমের ট্যাক্সোনমির এই ‘স্ট্রাকচার্ড অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে। প্রশ্নের নির্ধারিত কাঠামো, উত্তরের নির্ধারিত বিন্যাস—সবকিছু যেন লোহার খাঁচা। মানুষ পার পায়নি ছলনা বুঝতে। তাই সেই ফরাসি নাম ‘কাঠামোবদ্ধ’ বদলে ফেলতে হয়। আজ যিনি আলোচনায় এসেছেন (নৈতিক কারণে নাম গোপন), সেই প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদের কৌশলী পরামর্শে ব্লুমের সন্তানকে মোড়ানো হয় ‘সৃজনশীল’ নামের পাড়ে। ‘ব্লুম সাহেব বেঁচে থাকলে হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতেন,’ বলেছিলেন এক শিক্ষক—কারণ সৃজনশীলতা কোনো কাঠামো বরদাশত করে না।
বিদেশি দাতারা তখন খুশি—তাদের বিনিয়োগ ‘মাপযোগ্য, ‘প্রতিবেদনযোগ্য’ হয়। সৃজনশীলতা অমাপ্য; তাই তারা বেছে নিল ‘কাঠামোবদ্ধ সৃজনশীলতা’ নামের অক্সিমোরন—এক অভিশপ্ত মিশ্রণ। অভিভাবকদের বলা হলো, ‘এতে তোমার সন্তান ভাবতে শিখবে।’ বাস্তবে শিখল কীভাবে নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজের চিন্তা ফেলতে হয়। এক যুগেরও বেশি পরেও শিক্ষকরা আতঙ্কে ভরা—কেউ জানে না ‘প্রয়োগ’ আর ‘বিশ্লেষণ’ ধাপের ফারাক কোথায়। ‘আমি নিজে জানি না, ছাত্রদের কী শেখাব?’—এক শিক্ষকের আর্তনাদ যেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্ট্যাটাস-সিম্ফনি।
শিক্ষকের অপ্রস্তুততা: এক যুগের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান
২০১০ সালে শুরু। আজ ২০২৬। দেড় যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। মাউশির জরিপ বলে—মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬৫ শতাংশ শিক্ষক আজও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না ‘কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের ধাপগুলো’। মাত্র ২০ শতাংশের আত্মবিশ্বাস আছে এই পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যারা এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করছেন, তাদের অধিকাংশই সাঁতার না জানা সাঁতারু! অথচ ‘সৃজনশীল নামের রঙিন চাদরে ঢাকা পড়ে এই ব্যর্থতা। অভিভাবকেরা ভাবেন, ‘আমার সন্তান সৃজনশীল হচ্ছে’। আসলে শিক্ষার্থী শিখছে কীভাবে বিদেশি কাঠামোয় নিজের চিন্তা বন্দি করতে হয়।
গণিতের ওপর যখন একই পদ্ধতি চাপানো হলো, তখন শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণা চরমে ওঠে। গণিত—যার গায়ে আবেগের প্রলেপ চড়ে না, যেখানে যুক্তির বুনট। ‘রহিমের জমির ত্রিভুজাকার ফুলবাগান’-এর গল্প শোনাতে শোনাতে মূল ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল হারিয়ে যায়। ‘এটা তো গল্পের মোড়ক দেওয়া পুরনো অঙ্ক,’ বলেছিলেন এক গণিত শিক্ষক। তবুও চলছে এই নাটক।
ফিঙ্কের আলোয় উন্মোচিত কুহক
ব্লুমের ট্যাক্সোনমি পাপ করেনি। এটি এক নিরপেক্ষ কাঠামো—শিক্ষকের জন্য দিকনির্দেশনা মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশ নীতিনির্ধারক ও বিদেশি দাতা ঐ কাঠামোকে ব্যবহার করেছে বিকৃতির অস্ত্র হিসেবে। শিক্ষার্থীকে এখন জানতে হয় কোন বাক্যটি ‘বিশ্লেষণ’ ধাপে নম্বর এনে দেবে, কোন শব্দ ‘মূল্যায়ন’-এ কাজ করবে। এ যেন ‘পারফর্মেটিভ ক্রিয়েটিভিটি’—এক অভিনয়, যা ক্লান্ত করে ফেলেছে একটি প্রজন্মকে।
তখন আসে ফিলিপ ফিঙ্ক (Fink)-এর ট্যাক্সোনমি। তার ‘সচেতনতা’ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করতে শেখায়—‘এই কাঠামোটা কেন? বাইরেও কিছু আছে?’ আমাদের ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ শিক্ষার্থীকে শেখায়নি প্রশ্ন করতে, শিখিয়েছে উত্তর দিতে। ফিঙ্কের ‘মানবিক দিক’ অপরের চোখে দেখা শেখায়; আমাদের পদ্ধতি শিক্ষার্থীকে শেখায় ‘পরীক্ষকের চোখে নিজেকে দেখা’। ফিঙ্কের ‘শিখতে শেখা’ স্বাধীন অনুসন্ধান চায়; আমাদের ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ চায় নির্ধারিত ফরম্যাটের পুনরুৎপাদন। ফিঙ্কের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—২০১০ সালের সেই নামকরণ ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি, এক শিক্ষাগত মিথ্যাচার, যা একটি গোটা প্রজন্মের চিন্তার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।
এক নীরব গণহত্যার দায়মোচন
আমরা কি ভুলে বসেছি এই অপরাধ? হয়তো। দৈনন্দিন সংগ্রামের স্যাঁতসেঁতে আবহে মানুষ যে কেবল ক্ষুধা আর জ্বালায় কাতর, তাদের কাছে শিক্ষার সেই ‘সৃজনশীল’ নামের জাল ফাঁকি হয়তো ছোটখাটো ব্যাপার। কিন্তু ইতিহাসের চোখ কখনও ঘুমায় না। বিদেশি স্বার্থের খাতিরে, কয়েকজন ‘বিশেষজ্ঞের’ কূটকৌশলে আর এক অনৈতিক নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষায় যে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, তার জন্য আজও কেউ মাথা নত করেনি। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ—যিনি নামকরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন—তিনি সম্ভবত ভালো উদ্দেশ্যই পোষণ করেছিলেন। কিন্তু ফলাফলের জ্বালায় আজ পুড়ছে এক জাতি।
প্রগতি ২১০০ মডেল সেই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বলে না ‘কাঠামোবদ্ধ সৃজনশীলতা’। এটি বলে ‘অর্থপূর্ণ শিখন’—যেখানে কাঠামোখানা শুধু আবছা অলংকরণ, মূল বুননটাই বড়। ফিঙ্কের আলোয় আমরা পথ দেখছি সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু সেই পথে পা ফেলতে হলে আগে স্বীকার করতে হবে—২০১০ সালে ‘সৃজনশীল’ নামকরণ ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাসেক্টরের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ও অপরাধ। শিকার হয়েছে লক্ষ লক্ষ কচি মেধা। তাদের কাছে এখনও ঋণী আমরা। ঋণ শোধের পথ একটাই—সত্যিকারের সৃজনশীল শিক্ষা। ফিঙ্কের পথ। আর সেই পথে যাত্রার শর্ত একটাই—নিজেদের ভুল স্বীকার করার সাহস। সেই সাহস আজই দরকার।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
ইতিহাস সাক্ষী, যে সমাজে সত্যের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং মিথ্যার ভাষ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, সেখানে ন্যায়বিচারের কাঠামো ধসে পড়ে। আমাদের আজকের প্রয়োজন কেবল নাম পরিবর্তন নয়, বরং শিক্ষার মৌলিক কাঠামোকে নতুন করে পুনর্গঠন করা। আমাদের প্রয়োজন এমন এক সাহসী স্বীকারোক্তি, যা কেবল ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়াই নয়, বরং প্রগতি ২১০০-এর মতো মডেলের আলোকে ‘অর্থপূর্ণ শিখন’-এর পথে হাঁটার সাহস জোগাবে। কোনো প্রলোভন বা স্বার্থের বিনিময়ে মিথ্যার পোশাক না পরিয়ে, শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি ও জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।
সর্বশেষ বাক্য: নাম বদলালে নয়, শিক্ষার শিকড় বদলাতে হবে। তবেই ‘সৃজনশীল’ থেকে ‘সার্থক’ হবে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#সৃজনশীল_প্রতারণা #শিক্ষাসংকট #বাংলাদেশশিক্ষা #চিন্তার_স্বাধীনতা #EducationCrisis #IntellectualFraud #CreativeEducationMyth #BangladeshEducation #BloomVsFink #EducationReform #Srijonshil #IntellectualFraud #BangladeshEducation #CriticalThinking #EducationCrisis #TruthMatters