প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, রাত | বিশেষ প্রতিবেদন
অধিকার পত্র ডেস্ক: দেশে ভোক্তা অধিকার ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হলেও সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাত—ঔষধ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মূল্য অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বাজারে প্রচলিত বহু ঔষধের স্ট্রিপ, পাতা কিংবা প্যাকেটে স্পষ্টভাবে খুচরা মূল্য উল্লেখ না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি বাজারগত অনিয়ম নয়; বরং জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট গুরুতর নৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই কোম্পানির একই ঔষধ ভিন্ন ভিন্ন ফার্মেসিতে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১০ টাকা, কোথাও ২০ টাকা, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি দামের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষে প্রকৃত মূল্য যাচাই করার সুযোগ থাকে না।
কারণ, অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মতো অধিকাংশ ঔষধের প্রতিটি স্ট্রিপ বা পাতায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে না। ফলে রোগী ও স্বজনরা পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বিক্রেতার কথার ওপর।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই অস্বচ্ছতার সুযোগে গড়ে উঠেছে এক ধরনের “নিয়ন্ত্রণহীন মূল্য ব্যবস্থা”, যেখানে রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা হচ্ছে।
একজন ভুক্তভোগী জানান, “রোগী নিয়ে ফার্মেসিতে গেলে তখন দরদাম করার পরিস্থিতি থাকে না। দোকানদার যে দাম বলেন, সেটাই দিতে হয়। পরে অন্য দোকানে গিয়ে দেখি একই ঔষধ অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক সংকটকেও আরও গভীর করছে। কারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় ইতোমধ্যেই বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর ঔষধের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও খুচরা পর্যায়ে মূল্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তাদের মতে, প্রতিটি ঔষধের স্ট্রিপ, পাতা ও বোতলে বড় অক্ষরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া বাজার তদারকিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহলের ভাষ্য, “যে দেশে একটি বিস্কুটের প্যাকেটেও মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক, সেখানে মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধের ক্ষেত্রে মূল্য অস্বচ্ছতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
অনেকেই মনে করছেন, রোগীর অসহায়ত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে প্রশাসনের দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ।
জাহাঙ্গীর আলম, নিজস্ব প্রতিবেদক।
বাজার তদারকি অতিরিক্ত দাম জনস্বাস্থ্য ঔষধ প্রশাসন ফার্মেসি অনিয়ম ভোক্তা অধিকার এমআরপি মূল্য অস্বচ্ছতা ঔষধ বাজার

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: