odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 8th October 2026, ৮th October ২০২৬
অধিকার কি শুধু কাগজে? বাস্তব জীবনে মানুষের প্রাপ্য কতটা নিশ্চিত

অধিকার কি শুধু কাগজে? বাস্তব জীবনে মানুষের প্রাপ্য কতটা নিশ্চিত

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৮ October ২০২৬ ০৬:১১

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৮ October ২০২৬ ০৬:১১

অধিকারপত্র ডটকমে 

অধিকার—শব্দটি ছোট, কিন্তু একজন মানুষের পুরো জীবনকে ঘিরে এর বিস্তৃতি। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয়, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানেই স্বীকৃত। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, কাগজে লেখা অধিকার আর মানুষের বাস্তব জীবনের অধিকারের মধ্যে দূরত্ব কতটা?

একজন মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হন জীবিকার সন্ধানে। কেউ যান অফিসে, কেউ কারখানায়, কেউ দোকানে, কেউ বিদ্যালয়ে। কেউ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছুটছেন, কেউ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, কেউ আবার নিজের কথা বলার সুযোগ খুঁজছেন।

জীবন আলাদা, প্রয়োজন আলাদা। কিন্তু সবার একটি জায়গায় মিল—মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে।

৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় পাওয়াকে নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ছাড়া জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা রয়েছে।

অর্থাৎ অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনের একটি মৌলিক ভিত্তি।

কিন্তু বাস্তবতা কী বলে?

অধিকার কাগজে স্বীকৃত হওয়া এবং বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করতে পারা—দুটি বিষয় এক নয়।

একজন শ্রমজীবী মানুষ তার ন্যায্য পাওনা সম্পর্কে জানলেও হয়তো প্রতিকার চাইতে সংকোচ বোধ করেন। একজন দরিদ্র মানুষ আইনি সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করলেও প্রক্রিয়াটি তার কাছে কঠিন মনে হতে পারে। একজন নারী আইনে সমান অধিকার পেলেও সামাজিক বাস্তবতায় বৈষম্যের মুখোমুখি হতে পারেন।

এখানেই প্রশ্ন আসে—আইন কি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে?

কারণ অধিকার তখনই অর্থবহ, যখন একজন সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই অধিকার ব্যবহার করতে পারেন।

কথা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার সাহস

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষের কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং নির্দিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতার অধীনে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

এই অধিকার শুধু সাংবাদিক বা রাজনীতিবিদদের জন্য নয়। সাধারণ নাগরিকেরও প্রশ্ন করার, নিজের মত প্রকাশের এবং অন্যায়ের বিষয়ে কথা বলার অধিকার রয়েছে।

তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। মতপ্রকাশ যেন মিথ্যা তথ্য, ঘৃণা, সহিংসতা বা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের হাতিয়ার না হয়—সেটিও একটি দায়িত্বশীল সমাজের অংশ।

সবচেয়ে দুর্বল মানুষের অধিকারই আসল পরীক্ষা

একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝার জন্য শুধু উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়।

দেখতে হবে—সেখানে একজন দরিদ্র মানুষ ন্যায়বিচারের সুযোগ কতটা পান।

একজন শিশু কতটা নিরাপদ।

একজন নারী কতটা মর্যাদা নিয়ে চলতে পারেন।

একজন শ্রমিক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান কি না।

একজন সাধারণ নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে কতটা নিরাপদ বোধ করেন।

কারণ শক্তিশালী মানুষ অনেক সময় নিজের অধিকার আদায়ের পথ খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষটির জন্য সেই পথ সহজ নয়।

তাই সবচেয়ে দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই একটি রাষ্ট্র ও সমাজের মানবিকতার বড় পরীক্ষা।

অধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা

মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যম শুধু ঘটনা জানাবে না; ঘটনার পেছনের কারণ, মানুষের ওপর তার প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট অধিকার সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলবে।

কোনো শ্রমিক বঞ্চিত হলে তার কথা সামনে আসবে। কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠবে। কোনো নাগরিক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলে বিষয়টি আলোচনায় আসবে।

কারণ একটি সমাজে অনেক অন্যায় ঘটে নীরবে। সংবাদ সেই নীরবতাকে ভাঙার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

অধিকার জানাও, অন্যের অধিকারও মানো

নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া যেমন জরুরি, অন্যের অধিকারকে সম্মান করাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।

আমার কথা বলার অধিকার আছে—অন্যের কথাও শোনার দায়িত্ব আছে।

আমার স্বাধীনতা আছে—কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন অন্যের নিরাপত্তা ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

আমার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে—অন্যের ন্যায়বিচারের অধিকারও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অধিকার তাই শুধু দাবি করার বিষয় নয়; এটি দায়িত্ববোধেরও বিষয়।

শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য

একটি রাষ্ট্রের সংবিধানে অধিকার লেখা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই অধিকার মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব।

যেদিন একজন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাবেন না, যেদিন দরিদ্র ও অসহায় মানুষও ন্যায়বিচারের দরজায় পৌঁছাতে পারবেন, যেদিন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ সমান মর্যাদা পাবেন, যেদিন শিশুর নিরাপত্তা শুধু কাগজের প্রতিশ্রুতি থাকবে না—সেদিন অধিকার সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে।

অধিকার কোনো দয়া নয়। অধিকার মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি।

আর সেই মর্যাদা রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।

প্রশ্ন তাই একটাই—অধিকার কি শুধু কাগজে থাকবে, নাকি মানুষের জীবনেও তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে?