odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 12th October 2026, ১২th October ২০২৬
২০২৭–২০৩১ সালের মধ্যে ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য; এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন ডা. জুবাইদা রহমান।

নারীস্বাস্থ্যে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস, বার্লিনে জুবাইদা রহমানের আহ্বান

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১২ October ২০২৬ ১৮:৩৫

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১২ October ২০২৬ ১৮:৩৫

অধিকার পত্র ডটকম | অনলাইন  ডেস্ক :

বাংলাদেশে নারীস্বাস্থ্য ও মাতৃসেবার উন্নয়নে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব, উদ্ভাবনী অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয়।

রোববার (১১ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের (ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট) ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সমন্বয়ের মাধ্যমে নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশ কার্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

নারীস্বাস্থ্যসেবা জোরদারে আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

 খণ্ডিত প্রকল্প নয়, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাময়িক সহায়তার পরিবর্তে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে হবে।

তিনি বলেন, নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হওয়ায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাতৃস্বাস্থ্য ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন পরিকল্পনা

নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, মাতৃস্বাস্থ্যের প্রচলিত সেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলায় বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি জানান, দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে এক লাখ কমিউনিটি ও ওয়েলবিইং কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রত্যেক নারীর জন্য দক্ষ ও সহানুভূতিশীল মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রান্তের নারীকে প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে না—এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর বেঁচে থাকা যেন ঢাকায় যাওয়ার সামর্থ্য কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে। এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নয়, বরং সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।

 ফ্যামিলি কার্ড ও নারীশিক্ষার উদ্যোগের প্রসঙ্গ

নারী ও মেয়েদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারের বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগগুলোর কথাও তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার মতো উদ্যোগ নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ ও পরিবার পরিকল্পনার ওপর জিয়াউর রহমানের গুরুত্বারোপ সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে, বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ বহু প্রজন্মের তরুণীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

নারীস্বাস্থ্যে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে চুক্তি ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে।

এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)।

নারীদের আক্রান্তকারী ক্যানসারে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন ডা. জুবাইদা রহমান। এ ক্ষেত্রে নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

 আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বৈঠক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওই অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান। এতে সরকার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তার বাইরে নারীস্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।

অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা, জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের বির্গিট পিকেল এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং মিডওয়াইফারি খাতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করে। এ ছাড়া নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা বাড়াতে বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে-ইউনিভার্সিটেটসমেডিজিন বার্লিনের মতো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধিদল।

 নিরাপদ মাতৃত্ব ও নারীর মর্যাদার ওপর জোর

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ শৈশবের অধিকারী। দেশের প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার অধিকার রাখেন। একইভাবে শহর ও গ্রামের প্রত্যেক নারীর দীর্ঘ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবন যাপনের সুযোগ থাকা উচিত।

নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।