05/14/2026 সনদে সোনার হরিণ, কর্মক্ষেত্রে ফাঁকা হাত: শিক্ষার আয়নায় দক্ষতার সংকট
odhikarpatra
১৪ May ২০২৬ ১০:৫৯
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সনদ প্রদানে সিদ্ধহস্ত হলেও কর্মমুখী দক্ষতা তৈরিতে ব্যর্থ। বিবিএস, আইএলও ও ইউজিসির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শিক্ষিত বেকারের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশে। জার্মানি থেকে ভিয়েতনাম—বিশ্বের সফল মডেল আর আমাদের আমলাতান্ত্রিক পান্তা-ইলিশ সিন্ড্রোমের মধ্যে সংঘর্ষ কীভাবে গড়ে তুলেছে দক্ষতার বিষাদময় প্রহসন? এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মুখস্থ বিদ্যার বৃত্ত, কারিগরি শিক্ষার দুরবস্থা, নারী শিক্ষার বৈষম্য এবং ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা’ বাঁধতে না পারার করুণ কাহিনি। পড়ুন, কেন আমাদের শিক্ষার আয়না এখন কেবল ফাঁকা হাতের প্রতিফলন দেখায়।
প্রথম স্তবক: স্বপ্নের সনদ, শূন্য হাতের করতালি
শ্রাবণের সকালবেলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শেষ পরীক্ষার ফল প্রকাশের তিন মাস পরও রনি আহমেদের (ছদ্ম নাম) হাতে এখনও কোনো চাকরির অফার জমা পড়েনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণির সনদটি ফ্রেম করিয়ে তিনি রেখেছেন দেওয়ালে, যেন কোনো পুরনো বিয়ে পড়ার শুকনো তোরণ। বাবার কণ্ঠে এখন বিষণ্নতার সুর, মায়ের চোখে অশ্রু। রনি প্রতিদিন ব্রাউজ করেন বিডি জবস, লিংকডইন, ই-মেইল পাঠান শতশত সিভি। কিন্তু ইন্টারভিউতে গেলেই একই প্রশ্ন শোনেন—‘আপনার কী কী প্র্যাকটিক্যাল স্কিল আছে? কোনও ইন্টার্নশিপ করেছেন? ডেটা অ্যানালাইসিস সফটওয়্যার জানেন?’ রনি হকচকিয়ে যান। পাঠ্যবইয়ের মুক্তিযুদ্ধের তত্ত্ব তিনি আয়ত্ত করেছেন, কিন্তু একটি এক্সেল শিট বা পিভট টেবিল তৈরি করা যেন অজানা মহাদেশের পথ।
রনির গল্প শুধু রনির নয়। এটি বাংলাদেশের প্রায় চল্লিশ লাখ তরুণের বার্ষিক উপাখ্যান, যারা শ্রমবাজারে নামেন সনদের জাহাজ নিয়ে, কিন্তু দক্ষতার ঢেউয়ে ভেসে যেতে পারেন না। পরিসংখ্যান কাঁদিয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে শিক্ষিত বেকারের হার দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন শিক্ষিত যুবকের মধ্যে একজন বেকার। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে মাত্র ১২-১৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগযোগ্য। বাকিরা পড়ে থাকেন এক বিষাদময় মাঝের জায়গায়—যেখানে সনদ সোনার হরিণের মতো ঝলমল করলেও কর্মক্ষেত্র ফাঁকা হাতের করতালির মতো শূন্য।
প্রশ্নটি সোজা, উত্তর জটিল: শিক্ষা যদি আলো হয়, তবে কেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে?
দ্বিতীয় স্তবক: মুখস্থের মশালে আলো নয়, ধোঁয়া
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া তানিয়াকে দেখুন। সে কান্দিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সে কণ্ঠস্থ করে ‘ছড়ায় ছড়ায় দেশ গড়া’, কিন্তু যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘এক কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলে আড়াই কেজির দাম কত?’—তানিয়া চোখ ছোট করে আকাশের দিকে তাকায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৩ সালের যে জরিপ প্রকাশ করেছে, তাতে আঁতকিয়ে ওঠার মতো তথ্য আছে—অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ৪৫ শতাংশ নিজের নাম সঠিকভাবে লিখতে পারে না। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পরও ৬০ শতাংশের দক্ষতা অঙ্ক ও বাংলা ভাষায় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। অর্থাৎ আমরা শিশুদের ক্লাসে ক্লাসে উত্তীর্ণ করছি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করে তুলছি না—এ যেন এক বৃত্তান্তের নাম ‘পদোন্নতি পাবি, কিন্তু বড় হবি না’।
ব্লুমের ট্যাক্সোনমির দিকে তাকালে সংকট আরও পরিষ্কার হয়। শিক্ষার ছয়টি স্তরের মধ্যে আমাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি আটকে আছে প্রথম স্তর ‘স্মরণ’–এ। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ৬০-৭০ শতাংশ সংজ্ঞা, তারিখ, সূত্র আর মুখস্থ ব্যাখ্যা নির্ভর। ‘প্রয়োগ’, ‘বিশ্লেষণ’ বা ‘সৃষ্টি’ স্তরে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। ২০২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট এক তথ্য দিয়েছে—উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ১২ শতাংশ ব্লুমের ট্যাক্সোনমির প্রয়োগ ও বিশ্লেষণ স্তরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে। বাকি ৮৮ শতাংশ কেবল পুঁথি মনে রেখেছে, বাস্তবের সূত্র ধরতে পারেনি।
একজন শিক্ষক যেমন বললেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখাই না, আমরা শেখাই কীভাবে পরীক্ষায় পাস করতে হয়। এই দুইয়ের ফারাক আকাশ-পাতাল।”
তৃতীয় স্তবক: বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের দোকান, খোলা ফাঁকা আঙিনা
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা (ছদ্মনাম)। সিজিপিএ ৩.৮০। সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোর্সে ‘এ’ পেয়েছে। কিন্তু একটি রিয়েল-টাইম প্রজেক্টে লিখতে গিয়ে থমকে যায়—এপিআই ইন্টিগ্রেশন মানে কী, গিটহাবের ব্রাঞ্চ কিভাবে ম্যানেজ করতে হয়, ডিবাগিং কীভাবে শুরু করতে হয়, সেসব তার অজানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে শুধু পিডিএফের কোড মুখস্থ করানো হয়েছে, হাতে-কলমে শেখানোর ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ বলছে, দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৪৫ লাখ, বাৎসরিক পাস করে সাত লাখের বেশি। কিন্তু মাত্র ২৫ শতাংশ স্নাতকের মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতা আছে। আর ইংরেজিতে একটি সাধারণ ই-মেইল লিখতে পারে মাত্র ৩৫ শতাংশ। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, ৬০ শতাংশ তরুণের শিক্ষাগত যোগ্যতা চাকরির বাজারে প্রত্যাশিত দক্ষতার চেয়ে ভিন্ন। অর্থাৎ, যা তারা পড়েছেন, বাজারে তার চাহিদা নেই; আর বাজারে যা চাই, তা পড়ান হয় না। এই ‘মিসম্যাচ’-এর নামান্তর দক্ষতার ফাঁকা বাজার।
বহুজাতিক কোম্পানির এক এইচআর ম্যানেজার অভিযোগ করেন, “ইন্টারভিউতে দেখি প্রার্থীর হাতে অনার্সের চমৎকার সনদ, কিন্তু তাকে ইংরেজিতে ‘টেল মি অ্যাবাউট ইওরসেলফ’ বললেই আটকে যায়। আইটি শিল্পে তো অবস্থা সাংঘাতিক। ভারত, ভিয়েতনামের ইঞ্জিনিয়াররা এখানে উচ্চ বেতনে কাজ করছেন, কারণ আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক ধারণাও দুর্বল।”
চতুর্থ স্তবক: প্রযুক্তিগত শিক্ষার সৎকার, লাশের মিছিল
জার্মানির যুব বেকারত্বের হার মাত্র ৬ শতাংশ। সেখানে ‘ডুয়েল এডুকেশন সিস্টেম’ নামে শিক্ষার্থী সপ্তাহে তিন দিন কারখানায় হাতে-কলমে কাজ করে, দুই দিন স্কুলে তত্ত্ব শেখে। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার মাত্র ১ শতাংশ, অথচ দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ডে এই হার ৪০ শতাংশের বেশি। ডিসিসিআইয়ের জরিপ বলছে, আইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা ৬৫ শতাংশ ও পলিটেকনিকের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিল্পের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ। অর্থাৎ একদিকে দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট, অন্যদিকে প্রশিক্ষণের বিনিময়ে সনদ বিতরণের প্রহসন।
ফিনল্যান্ডের ‘ফেনোমেনন-বেসড লার্নিং’ পদ্ধতি তো পুরো পৃথিবীকে অবাক করেছে। সেখানে শিক্ষার্থী মুখস্থ করে না; জলবায়ু পরিবর্তন, রোবটিকস, সুপারমার্কেট ম্যানেজমেন্টের মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে শেখে। পরীক্ষা নেই, আছে প্রজেক্ট ও পোর্টফোলিও। সেখানকার ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুল থেকেই হাতে-কলমে দক্ষ হয়ে বের হয়। আমাদের ছবি উল্টো—স্কুল থেকে বেরিয়ে কোচিং সেন্টারে আবারও মুখস্থবিদ্যার ড্রিল। ‘পান্তা-ইলিশ’ জাতীয় এই তাত্ক্ষণিক দৃশ্যমান সাফল্যের নেশায় আমরা দীর্ঘমেয়াদি ‘ভাতের ঝোল’ রান্না ভুলে যাই। যেমন একজন আমলা বললেন, “আমি তো তিন বছর পর অবসরে যাব, তাহলে দশ বছরের শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করে কী লাভ? বরং একটা ডিজিটাল ল্যাব উদ্বোধন করে শিরোনাম হওয়া সহজ।” এটাই ‘আমলার পান্তা-ইলিশ সিন্ড্রোম’—দৃশ্যমান কাজের পেছনে দৌড়, আর টেকসই ভিত গড়ায় উদাসীনতা।
পঞ্চম স্তবক: নারী শিক্ষার বাড়তি বেদনা
ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক জিনিয়া (ছদ্মনাম) জিনিয়া। জিপিএ ৩.৯৫। গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরির বাজারে নামেন। ইন্টারভিউয়ে প্রথম প্রশ্ন—‘বিবাহিত? বাবা-মা কি রাজি?’ দ্বিতীয় প্রশ্ন—‘আমাদের অফিসে রাত পর্যন্ত থাকতে হবে, পারবেন?’ তৃতীয় প্রশ্ন—‘আইটি দক্ষতা কেমন?’ জিনিয়া উত্তর দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি প্রশিক্ষণ বলে কিছু ছিল না। তাকে বলা হয়, ‘আমরা পরে জানাব।’ সেই ‘পরে’ আর আসে না। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৫৫ শতাংশ নারী, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ২৯ শতাংশ। স্নাতক পর্যায়ে নারী বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে পুরুষে ২০ শতাংশ। দ্বিগুণ বৈষম্য। একদিকে সমাজের সংস্কার, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার গৃহস্থালি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। মেয়েদের আইটি, নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা দক্ষতা কে শেখায়? ফলে লাখ লাখ শিক্ষিতা জিনিয়া রয়ে যান ‘সনদধারী গৃহবধূ’ হওয়ার অপেক্ষায়—যার জ্ঞান ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, শুধু বিয়ের দাওয়াতেই কাজে আসে।
ষষ্ঠ স্তবক: তত্ত্বের জটিল জাল আর বাস্তবের ফাঁক
ম্যাকডোনাফের ‘স্কিল ইনডেক্স’ বলে, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে মাপা হয় না, বরং মাপা হয় শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মাঝের সেতুর শক্তি দিয়ে। স্পেন্সের ‘সিগনালিং মডেল’ অনুযায়ী, ডিগ্রি নিয়োগকর্তার কাছে একটি সংকেত। বাংলাদেশে সেই সংকেত প্রায়শই মিথ্যা প্রমাণিত হয়—সনদ বলছে ‘আমি জ্ঞানী’, দক্ষতা বলছে ‘আমি শিখিনি’। পিসারিডেসের জব-ম্যাচিং তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, আমাদের বেভারিজ কার্ভ একদিকে খালি পদ, অন্যদিকে বেকার তরুণ—এই দুইয়ের মাঝে ফাঁক দিয়েই বয়ে যায় দক্ষতাহীনতার কালো নদী।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে গঠনবাদী শিক্ষার বিপরীতে আচরণবাদের চরম রূপ বলেন। শিক্ষার্থী একটি ‘পাত্র’ যাতে তথ্য ঢেলে দেওয়া হয়, নিজের জ্ঞান নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। পিয়েরে বোর্দিও বলতেন, শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য পুনরুৎপাদন করে। বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম আর বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণক্ষমতার যে ফারাক, তা কোন কাকতালীয় নয়। বিত্তবানের সন্তান ল্যাবে রোবট বানায়, আর রিকশাচালকের সন্তান মুখস্থ করে ‘রোবটের সংজ্ঞা’।
সপ্তম স্তবক: ভিয়েতনামের চোখে আমাদের আয়না
একসময় আমাদের সমপর্যায়ে থাকা ভিয়েতনাম আজ পিসা পরীক্ষায় প্রথম সারির দেশগুলোর কাছাকাছি। তাদের জাতীয় পাঠ্যক্রমে ফিজিক্স ল্যাব, কেমিস্ট্রি প্রজেক্ট, কম্পিউটার সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল বাধ্যতামূলক। ভিয়েতনামি আইটি ইঞ্জিনিয়াররা জাপান-কোরিয়ায় উচ্চ বেতনে কাজ করছেন, কারণ তারা হাতে-কলমে শিখে বের হন। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘মেইস্টার স্কুল’ থেকে স্নাতক শেষে ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিশ্চিত চাকরি পায়—কেন? কারণ স্যামসাং, হুন্দাই সরাসরি স্কুল চালায়। সিঙ্গাপুরের ‘স্কিলসফিউচার এসজি’ কৌশলে ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পেশাদার প্রশিক্ষণ পায়। আর আমরা? সেমিনারে ‘ভিশন ২০৪১’ বুলি আওড়াই, কিন্তু মাঠে শিক্ষকের অনুপস্থিতি, ল্যাবে ভাঙা যন্ত্রপাতি, আর পরীক্ষায় একই পুরোনো প্রশ্নব্যাংক।
অষ্টম স্তবক: বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?
সাম্প্রতিক সময়ে এ কথা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবাদবাক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “আমাদের দেশে নীতি নির্ধারণের লাফ ধাপই সার, কাজের কাজ রসগোল্লা।” ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২১ সালের কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক, ২০২৩ সালে এনএসডএ পুনর্গঠন—কাগজে দেদার পরিকল্পনা। কিন্তু এটিবি বাংলাদেশের প্রতিবেদন বলছে, গত পাঁচ বছরে ২৩টি প্রকল্পের ৩৮ শতাংশ সময়মতো শেষ হয়নি, ৪৫ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ। কে জবাবদিহি করে? কে জানে কোন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী চাকরি পেল?
আমরা প্রতিবারই ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা’ বাঁধার গল্প করি, কিন্তু সেই ঘন্টা বাঁধবে কে? শিক্ষক সংগঠন কি মাল্টিপল চয়েস বাতিল করতে রাজি? অভিভাবক কি রাজি সপ্তাহে দুই দিন সন্তান কারখানায় কাজ করবে? কোচিং সেন্টারের মালিকরা কি তাদের পুরোনো প্রশ্নব্যাংকের ব্যবসা হারাতে চায়? আর সেই আমলারা, যাদের ক্যারিয়ার গড়া মুখস্থ বিদ্যার সুবাদে—তারা কি নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিতে দেবে? “টাকার কলমি নাচ” আর “উল্টা সাপের হাঁচি” যেন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। দেখতে জমকালো, কিন্তু পেট ভরায় না। সাপের মুখ দিয়ে বের হয় বিকট শব্দ, কিন্তু সেটা বিষধর নয়, কেবল আওয়াজ।
নবম স্তবক: শেষ সত্য—সাক্ষর জাতি না দক্ষ জাতি?
আমরা যে ফাঁদে আটকে আছি, তার নাম ‘সনদসর্বস্বতা’। যেখানে জ্ঞান নয়, পরীক্ষার নম্বর মুখ্য; দক্ষতা নয়, ডিগ্রির ফ্রেম মুখ্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে বাংলাদেশ প্রতি বছর তার জিডিপির ৫ শতাংশ হারায়। আইটি খাতের ২০ হাজার পদ শূন্য পড়ে আছে শুধু দক্ষ প্রার্থীর অভাবে। অথচ সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট। তাতে টিকে থাকতে হলে কেবল জানা যথেষ্ট নয়, জানাকে কাজে লাগাতে হবে।
সমাধান অবশ্য অগত্যা অসম্ভব নয়। ব্র্যাকের ‘ডিফাইড ট্র্যাজেক্টরি’ প্রকল্পে আইটি ও অটোমোবাইলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে। ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ প্রকল্পের তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা মাসে গড়ে ৪০০ ডলার আয় করছে। সরকারের ‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’ ২০২৩ সালে ৮০ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের হার ৪৫ শতাংশে নিয়ে এসেছে। এই সাফল্যগুলো ছোট, কিন্তু সম্ভাবনার আলো দেখায়। এগুলোকে জাতীয় স্কেলে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন তিনটি কাজ: (১) ব্লুমের ট্যাক্সোনমির প্রয়োগ ও বিশ্লেষণ স্তরে পরীক্ষার কাঠামো বদলানো, (২) জার্মানির ‘ডুয়েল সিস্টেম’ অনুসরণ করে প্রতিটি স্কুলকে শিল্পকারখানার সঙ্গে বাধ্যতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ করা, (৩) ‘বাংলাদেশ স্কিলস পাসপোর্ট’ চালু করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রকল্প ও ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা ডিজিটালি সংরক্ষণ করা।
তবে সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ‘আমলার পান্তা-ইলিশ’ সিন্ড্রোম ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাহস দরকার। প্রয়োজন সেই নির্ভীক হাত, যে ভিড়ের চাপ উপেক্ষা করে বলতে পারে—“আজ থেকে মুখস্থ পরীক্ষা বাতিল।” যদি না পারি, তাহলে এই প্রতিবেদনের মতো আরও হাজার প্রতিবেদন লেখা হবে, আর রনি-তানিয়া-জিনিয়ারা দিনের পর দিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখবে—সনদে সোনার হরিণ, কর্মক্ষেত্রে ফাঁকা হাত।
তবু আশা ছাড়ার পাত্র নয় বাংলাদেশ। তরুণ প্রজন্ম সম্ভাবনাময়। প্রয়োজন দিকনির্দেশনা, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রয়োজন একটি অকপট স্বীকারোক্তি: শিক্ষা মানে সাক্ষরতা নয়, দক্ষতা। আর সেই দক্ষতার আয়নায় যদি নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে চাই, তবে আজই বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে হবে।
আমরা কি সেই পথে হাঁটব? নাকি আগামী প্রজন্মকেও একই বিষাদময় বিদ্রূপের পাত্র হতে দেব? প্রশ্ন সবার, উত্তর দিতে হবে সবাইকে।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#দক্ষতার_সংকট #শিক্ষিত_বেকারত্ব #বাংলাদেশ_শিক্ষা #সনদসর্বস্ব #কর্মমুখী_শিক্ষা #আমলার_পান্তা_ইলিশ #টিভেট #স্কিলস_মিসম্যাচ #ব্লুমস_ট্যাক্সোনমি #ম্যাকডোনাফ_ইনডেক্স