06/18/2026 কলঙ্কের কালো অধ্যায়: ৫ আগস্টের পর যে আগুনে পুড়েছে বাংলার শ্রেণিকক্ষ—২০২৪ আগস্ট পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহকে উপজীব্য করে একটি বিস্তৃত বাংলা সংবাদধর্মী ফিচার
Dr Mahbub
১৭ June ২০২৬ ২৩:৪০
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে নেমে আসে অন্ধকার। তিন হাজারের বেশি শিক্ষক নিগ্রহের শিকার, জোরপূর্বক পদত্যাগ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—একটি জাতি কীভাবে হারায় তার নির্মাতাদের? পড়ুন বিস্তৃত অনুসন্ধানী ফিচার।
প্রারম্ভিক ভূমিকা
বৈশাখের প্রথম প্রভাতে যে সবুজ মাঠে শিশুরা প্রথম 'অ' লেখা শিখত, সে মাঠের মাটির নিচে আজ পোড়া স্বপ্নের ছাই। যে শিক্ষকের হাত ধরে বাঙালি শিখেছিল 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'— সেই হাতেই আজ লেগেছে অদৃশ্য কলঙ্কের কালো দাগ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অসামান্য মোড়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। রক্তাক্ত সেই বিজয়ের মিছিলে ফুলেল শান্তির বদহজমে বিষাক্ত এক অধ্যায়ের সূচনা হয়—শিক্ষক নিগ্রহের কালো অধ্যায়। যে শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর, যাঁদের শ্রদ্ধায় নত হয়েছিল মাথা, সেই শিক্ষকদেরই গণ-লাঞ্ছনার অভিযোগে কেঁপে ওঠে সমগ্র শিক্ষাঙ্গন।
একটি সরকারের পতন যখন নতুন আশার সঞ্চার করেছিল, তখনই এক স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নেমে আসে অস্থিরতার কালো মেঘ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক—কারো ওপরই রেহাই নেই। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাল বানিয়ে চলছে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, শারীরিক লাঞ্ছনা, এমনকি সশস্ত্র হামলা।
এই ফিচার প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে বের করব—কীভাবে এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প শিক্ষাঙ্গনের ভিত্তিচ্যুত করল? কেন শিক্ষকতা পেশা হলো ক্ষমতার দোলাচলের সহজ শিকার? আর কোন পথে ফিরে পাওয়া যাবে শিক্ষকের হারানো মর্যাদা?
মূল বিষয় ও সারসংক্ষেপ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয় অভূতপূর্ব এক সহিংসতার ঢেউ। 'মব জাস্টিস'-এর নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এবং প্রতিষ্ঠান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্র ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৯ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী তিন মাসে 'মব সন্ত্রাসের' শিকার হয়েছেন তিন হাজারের বেশি শিক্ষক। এদের মধ্যে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা লোক দেখানো স্টাইলে জনগণের প্রতি আবেদন ও আহ্বান জানিয়েও শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা বন্ধ করতে পারেননি বা করেননি, যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জোরপূর্বক পদত্যাগ করা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালুর নির্দেশ দেয়, কিন্তু ততদিনে ক্ষত গভীর। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি।
এই নিগ্রহের ঘটনাগুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মৌলিক অবনতি, শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণ, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
মূল ভাবনা ও তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে ব্যাখ্যা
বাংলাদেশের শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত তাত্ত্বিক কাঠামোর আশ্রয় নিতে হয়।
একাধিক লেন্সে বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের শিক্ষাবাস্তবতার আলোকে প্রয়োগ ও উদাহরণ
বরিশালের গৌরনদীর একজন প্রধান শিক্ষক: যে রাতে সপরিবারে প্রাণভিক্ষা চাইতে হয়েছিল
‘ও ভাই…আমরা শিক্ষক মানুষ, আমরা রাজনীতি করি না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ভাই, আমাদের মাইরেন না ভাই। আমাদের ওপর হামলা কইরেন না ভাই! ও ভাই…আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান…’
২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট। বরিশালের গৌরনদী। বিকেল প্রায় ৪টা। মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীর বাসভবনে হামলা চালায় শতাধিক ব্যক্তি। ধারালো অস্ত্রের কোপে ফেটে যাচ্ছে দরজার কাঠ। বদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে উঠছে প্রাণভিক্ষার আর্তনাদ। কেউ এ ঘর থেকে ও ঘরে ছোটাছুটি করছেন বাঁচার আকুতিতে, কেউ মোবাইল ফোনে কাউকে ফোন করার চেষ্টায়।
প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের মেয়ে আ—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—ফেসবুক লাইভে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখাতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে আক্রান্ত পরিবারটিকে। সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও এরপর জোর করে পদত্যাগ করানো হয় তাঁকে। শুরু হয় নির্বাসিত জীবন, বঞ্চনা আর মানবেতর জীবনযাপন। গত ১৯ এপ্রিল যোগাযোগ করা হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের বলেন, ‘আমার প্রাণের ক্যাম্পাসের ভেতরে আমাকে সপরিবারে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে, এ কথা যতবার ভাবি, আমার গা শিউরে ওঠে।” তিনি জানান, আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শুনিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে দেন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক। ‘আমি জীবনে কোনো দিন রাজনীতি করিনি। এখন মনে হয়, আমার দোষ একটাই—আমি কড়া প্রশাসক, কখনো কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দিইনি। অথচ আমাকে অপরাধী বানিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে এমন জঘন্য কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।”’
অনেক দৌড়ঝাঁপের পর গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর বেতন-ভাতা চালু হলেও, প্রাণের ভয়ে এখনো স্কুলে ফিরতে পারেননি এই শিক্ষক। যে মানুষটি সারা জীবন ছাত্রদের গড়ার কারিগর ছিলেন, সেই মানুষটি আজ নিজের স্কুলে ফিরতেও ভয় পান।
একজবন সাদাসিধে মহিলা অধ্যক্ষ: নীরব পদত্যাগের নারী কণ্ঠ
রাজধানীর একটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ একজবন সাদাসিধে মহিলা । ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের চাপে পড়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক গৌতম চন্দ্র পাল এবং শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক শাহনাজা আখতারকেও একই দিন পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
ঐ সাদাসিধে মহিলা অধ্যক্ষ-এর মতো আরও কত নারী শিক্ষক নীরবে পদত্যাগ করেছেন, কাউকে কিছু না বলে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ ছিল বিশেষভাবে নৃশংস। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্র ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে ৪৯ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের অনেককেই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছ। একটি শিক্ষক সংগঠন ক্ষোভের সাথে জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষকদের ওপর নিপীড়ন চলছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক: ‘মব জাস্টিস’-এর প্রতিবাদে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
শিক্ষক নিগ্রহের এই অধ্যায়ে একটি নাম আলাদাভাবে স্মরণীয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক। অন্যরা যখন জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন ‘মব জাস্টিস’-এর প্রতিবাদে। তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন, অভ্যুত্থানের নামে নিরপরাধ শিক্ষকদের ওপর ‘মব জাস্টিস’ চালানো হচ্ছে, তখন তিনি নীরব থাকতে পারেননি। তাঁর এই পদত্যাগ ছিল এক নীরব প্রতিবাদ—একটি বার্তা যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে আইনের শাসনকে পদদলিত করা যায় না।
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়: মানববন্ধনের মুখে একাকী প্রধান শিক্ষক
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়েরিএকজন অসহায় প্রধান শিক্ষক । এক মঙ্গলবারের দুপুরে উপজেলা চত্বরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয় কিছু লোকজন। স্কুলের কিছু শিক্ষার্থীও সেখানে ছিল। পরে এলাকার ছয়জনের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়। ভৌতিক অনিয়মের অভিযোগ—যার সত্যতা যাচাই হয়নি—তার ভিত্তিতে একটি মানববন্ধন। আর সেই মানববন্ধনের মুখে একজন প্রধান শিক্ষক হয়ে যান আতঙ্কিত। অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে তাঁকে হয়তো পদত্যাগ করতেই হবে—এটাই ছিল নীরব বার্তা।
লক্ষাধিক শিক্ষকের নীরব আর্তনাদ
এরা কেবল কয়েকটি নাম। এদের পেছনে আছে আরও হাজার হাজার অজ্ঞাত-অপরিচিত শিক্ষক—যাঁদের কথা কখনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি, যাঁদের আর্তনাদ কেউ শোনেনি। যাঁরা নীরবে পদত্যাগ করেছেন, নীরবে বাড়ি ফিরে গেছেন, নীরবে হারিয়েছেন পেশাগত পরিচয়।
একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে, টানাহ্যাঁচড়া করে, অসম্মান করে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়েছে। অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেককে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। কেউ কেউ এখনো বেতন-ভাতা পান না।
শিক্ষা উপদেষ্টা একজন শিক্ষক হয়েও কিছু করলেন না বা করতে পারলেন না। তিনি বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জোর করে পদত্যাগ করানোর সুযোগ নেই। কিন্তু উপদেষ্টার কথায় কী আর ফিরে আসে হারানো মর্যাদা? কী আর ফিরে আসে নিরাপত্তার অনুভূতি?
এই গল্পগুলো কেবল কয়েকটি জীবনের কাহিনি। কিন্তু এই কাহিনিগুলোর প্রতিটিতে লুকিয়ে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকট। যে সমাজ তার শিক্ষককে অপমান করে, সে সমাজ নিজের আয়নায় থুথু ফেলে। যেদিন শেষ শিক্ষক লাঞ্ছিত হবেন, সেদিন শেষ শিক্ষার্থীও হারাবে তার ভবিষ্যৎ।
আমরা কি পারব ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকের হারানো মর্যাদা? আমরা কি পারব আবার গড়তে সেই সম্পর্ক, যেখানে শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক, আর শিক্ষার্থী হবেন জ্ঞানের পিপাসু? নাকি এই অগ্নিপরীক্ষায় পুড়ে যাবে বাংলার শিক্ষাঙ্গনের শেষ প্রদীপটিও?
অনলাইন আখড়ায় লাঞ্ছিত এক অধ্যাপকের গল্প
ফিজিক্যাল ক্যাম্পাসের হিংসা যখন কিছুটা থামে, তখন শুরু হয় আরও সূক্ষ্ম, আরও নৃশংস এক আক্রমণ—অনলাইন মিডিয়া ট্রায়াল। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ—ডিজিটাল এই আখড়াগুলোতে বসে বিচার হয় শিক্ষকদের। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তারা হয়ে যান 'দোষী'। আর এই অনলাইন লঞ্চিত লাঞ্ছনার এক জীবন্ত উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক (নৈতিক কারণে না্ম প্রকাশ করা হলোপ না)।
সেই শিক্ষকতকে শুধুমাত্র আদর্শিক কারণে অনলাইনে বচ বাহিনীর অপপ্রচার চলে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি নাকি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন। আর এই অভিযোগের কারণে তাকে সকল প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কে, কীভাবে প্রমাণ করল এই অভিযোগ? উত্তর লুকিয়ে আছে ফেসবুকের অসংখ্য পোস্ট, শেয়ার, কমেন্টে। শিক্ষার্থীরা সামাজিক মাধ্যমে চরিত্র হরণেল সচেষ্ট হয়। বিভিন্ন আজগুবি অভিযোগ তুললেন, তিনি নাকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করতেন, মূল্যায়নে স্বেচ্ছাচারিতা করতেন, এমনকি ধর্মীয় পোশাকের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করতেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে—ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে—ফেসবুক বাংলাদেশে 'মিডিয়া ট্রায়াল' ও 'সামাজিক purge'-এর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। ডিজিটাল জায়গাটি আর 'অন্য' কোনো জায়গা ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল সেই আখড়া, যেখানে অপরাধী চিহ্নিত করা হয় এবং বিচার কার্যকর করা হয়।
সেই অধ্যাপক কী বলেছিলেন? 'অভিযোগটি আমার জন্য দুর্ভাগ্যজনক'। এই কয়েকটি শব্দে ফুটে ওঠে একজন শিক্ষকের অসহায়ত্ব, যিনি নিজের পেশাগত জীবনকে প্রশ্নের মুখে দেখছেন—অথচ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ তিনি পাননি।
অনলাইন আক্রমণের ধরণ
গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক পোস্ট, কমেন্ট এবং অডিও ক্লিপ সরাসরি সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে। হাজারি লেনের সহিংসতা (২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর) শুরু হয়েছিল একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে, যেখানে ইসকনকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' আখ্যা দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টফাজ্জল হোসেনের লিঞ্চিং (সেপ্টেম্বর ২০২৪) ছড়িয়ে পড়েছিল ফেসবুক থ্রেড ও হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডের মাধ্যমে।
অসংখ্য অধ্যাপকের ক্ষেত্রেও একই প্যাটার্ন। কেউ একজন ফেসবুকে পোস্ট দিলেন—সেটি শেয়ার হলো, ভাইরাল হলো—আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাপক হয়ে গেলেন 'বিতর্কিত'। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ হাজার হাজার মিথ্যা দাবি খণ্ডন করলেও, ফ্যাক্ট-চেক সর্বদা প্রাথমিক পোস্টের থেকে পিছিয়ে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ দাঙ্গা-হিংসার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যের সঙ্গে যুক্ত।
শুধু কী এই একজন অধ্যাপক, তিনিই একা নন, আরও কতজন?
এই অধ্যাপকের মতো আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন শিক্ষকের বিচার দাবি করে তালিকা প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীদের একটি ছাত্র সংগঠনের। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে জুলাই আন্দোলন দমনের অভিযোগে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিনকে পদ ছাড়তে হয়েছে। অনেক শিক্ষককে জেলে যেতে হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একটি গবেষণা বলছে, 'ভাইরালিটি প্রতিস্থাপন করে যাচাই-বাছাইকে, আর ক্ষোভ প্রতিস্থাপন করে বিচারকে'। অধ্যাপক লিটুর গল্প এই সত্যেরই প্রতিধ্বনি।
অন্ধকারের এপারে কী আছে?
অনলাইন বুলিং-এর শিকার এই অধ্যাপককেরা আজ কোথায়? প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত। তার বেতন-ভাতা চলছে কি না, কে জানে? তার মানসিক অবস্থা কেমন—সেটা কি কাউকে ভাবিয়েছে? অনলাইন লাঞ্ছনার শিকার এই শিক্ষকের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ডিজিটাল জগতে একটি পোস্ট, একটি শেয়ার, একটি কমেন্ট কীভাবে একজন মানুষের সারা জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। ফেসবুক যখন 'ডিজিটাল কোর্ট অফ পাবলিক ওপিনিয়ন'-এ পরিণত হয়, তখন সেখানে কোনো আসামির পক্ষে নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ থাকে না। এই অধ্যাপকের মতো মতো হাজারো শিক্ষক আজ নীরবে ভোগেন—কারও পরিচয় জানা যায় না, কারও গল্প কখনো লেখা হয় না। কিন্তু প্রতিটি গল্পেই আছে একই সত্য—অনলাইন আক্রান্ত একজন শিক্ষক আসলে আক্রান্ত সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা।
এক অধ্যাপকের গল্প কেবল একজন শিক্ষকের নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মপরীক্ষা। ডিজিটাল যুগে যখন কয়েকটি ক্লিকেই একজন মানুষ ধ্বংস হতে পারে, তখন আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সেই সভ্যতা, যেখানে কোনো শিক্ষক তার মত প্রকাশের অপরাধে লাঞ্ছিত হবেন? নাকি আমরা পারব ফিরিয়ে আনতে মানবিকতার সেই বোধ, যেখানে অভিযোগের আগে হয় যাচাই, আর শাস্তির আগে হয় ন্যায্য বিচার?
ক্যাম্পাসের কালো অধ্যায়: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবমাননা, পদত্যাগ ও চাকরিচ্যুতির হিড়িক
শুধু স্কুল-কলেজ নয়, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনেও নেমে আসে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার কালো ছায়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়ে ওঠেন ছাত্র-জনতার ক্রোধের সহজ লক্ষ্য। কারও পদত্যাগ দাবি করা হয়, কারও চাকরি বাতিলের দাবি ওঠে, কাউকে সরাসরি বহিষ্কার বা বরখাস্ত করা হয়। এটি ছিল শিক্ষকতা পেশার ইতিহাসে এক চরম অবমাননার অধ্যায়।
বাস্তবতা: রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ নাকি ন্যায়বিচার?
শিক্ষকদের এই চাকরিচ্যুতি, পদত্যাগ ও শাস্তির ঘটনাগুলো কী? রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ নাকি ন্যায়বিচার? উত্তর সহজ নয়। একদিকে অভিযোগ—আওয়ামী লীগের ১৬ বছর ক্ষমতায় শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে কলুষিত হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে মেধার চেয়ে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই পরিবর্তনের এই সময়ে ‘বিতর্কিত’ শিক্ষকদের চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেওয়া ‘প্রয়োজনীয়’ বলে মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে প্রশ্ন—শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন, ফেসবুক পোস্ট বা উত্তেজিত জনতার রোষানলের ভিত্তিতে শিক্ষকের ভাগ্য নির্ধারণ কি ন্যায়সঙ্গত? তদন্ত কমিটি গঠন করলেও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানের মতো কেউ কেউ নিজের লেখার জন্য ক্ষমা চেয়েও রেহাই পাননি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘শুধু মত প্রকাশের অপরাধে শিক্ষকের হয়রানি ও লক্ষ্যবস্তু করা’ অভিব্যক্তির স্বাধীনতার পরিপন্থি।
তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনার দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিলেও, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল না, তাঁদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।
যে সমাজ তার শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করে, যে সমাজ ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে অধ্যাপকের ভাগ্য নির্ধারণ করে, সেই সমাজ কি সত্যিই উন্নতির পথে এগোতে পারে? নাকি এই ‘শুদ্ধিকরণ’ শেষ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে দেবে? ইতিহাসই বলে দেবে উত্তর।
শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে বড় কিছু হওয়া যায় না
‘শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে বড় কিছু হওয়া যায় না’—এই কথাটি আমি কোথাও পড়িনি, শুনিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনাবলি পড়তে পড়তে, শিক্ষকদের আর্তনাদ শুনতে শুনতে, এই কথাটি আমার মনের গভীর থেকে উঠে এসেছে। হয়তো এটি কোনো প্রাচীন ঋষির উক্তি নয়, কোনো দার্শনিকের সূত্রাবলি নয়—এটি একটি নগ্ন সত্য, যা প্রতিটি সভ্য সমাজের বোধগম্য হওয়া উচিত।
কারণ, যে সমাজ তার শিক্ষককে কষ্ট দেয়, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যৎকে কষ্ট দেয়। যে জাতি তার গুরুকে অপমান করে, সে জাতি নিজের শেকড় কেটে ফেলে।
ইতিহাসের আয়না
ইতিহাস সাক্ষী—যে সভ্যতাগুলো তাদের শিক্ষকদের সম্মান করেছে, তারা স্থায়ী হয়েছে; যে সভ্যতাগুলো শিক্ষকদের অবজ্ঞা করেছে, তারা বিলীন হয়েছে। প্রাচীন ভারতের গুরু-শিষ্য পরম্পরা, গ্রিসের অ্যারিস্টটলের লাইসিয়াম, চীনের কনফুসিয়াসের শিক্ষাপদ্ধতি—এসবই শিক্ষককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যখন সেই কেন্দ্র দুর্বল হয়, তখন সভ্যতা দুর্বল হয়।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের পর আমরা দেখলাম—শিক্ষকরা যখন কষ্ট পেলেন, তখন শ্রেণিকক্ষ থমকে গেল। পঠন-পাঠন ব্যাহত হলো। শিক্ষার্থীরা উন্মুক্ত হয় গুজব ও সহিংসতার প্রতি। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ল। এর মধ্য দিয়ে আমরা শিখলাম—শিক্ষকের কষ্ট মানে সমাজের কষ্ট, জাতির কষ্ট।
উপসংহার: ফিরে দেখা, ফিরে পাওয়া
আমাদের শিক্ষকদের মনে যে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, তা কি আমরা ফিরিয়ে নিতে পারি? পারি, যদি আমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিই—শিক্ষক আর আক্রমণের শিকার নয়। শিক্ষক হবেন শ্রদ্ধার পাত্র, ভয়ের নয়। প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য—শিক্ষকতা পেশা একটি পবিত্র পেশা, এটি রাজনীতির হাতিয়ার নয়। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো, সামাজিক মাধ্যমে লাঞ্ছিত করা, শারীরিকভাবে হামলা করা—এগুলো যেন সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনায় জড়িতদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, যাতে কেউ আর এই পথে পা না বাড়ায়।
আমাদের সন্তানরা দেখুক—শিক্ষকদের সম্মান করা হয়, তাদের কথা শোনা হয়, তাদের মনে কোনো কষ্ট থাকে না। তারাই একদিন আমাদের দেশ গড়বে, ন্যায়-বিচারের ভিত্তিতে, মানবিক মূল্যবোধে, সত্য ও সুন্দরের পথে। কারণ, শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে যে জাতি বড় হতে চায়, সে কখনো বড় হয় না। বড় হয় কেবল সেই জাতি, যে তার শিক্ষককে ভালোবাসে, তাকে রক্ষা করে, তাকে দেয় তার প্রাপ্য মর্যাদা।
আমরা কি সেই জাতি হতে চাই, যে নিজের শিক্ষকের কষ্টকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যায়? নাকি আমরা সেই জাতি হতে চাই, যে শিক্ষকের চোখের জলে নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এবং সেই জল মুছে দিয়ে বলে—'আমরা তোমাদের পাশে আছি, তোমরা নিরাপদ, তোমরা
প্রতিটি জাতির ইতিহাসে কিছু অধ্যায় থাকে অন্ধকারময়। কিছু অধ্যায় থাকে কলঙ্কে লেপটানো। কিন্তু সত্যিকারের সভ্যতা চিহ্নিত হয় সেই অন্ধকার থেকে কীভাবে আলোর পথ খুঁজে বের করা হয়, সেই ক্ষমতায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে এক দীর্ঘ শাসনের। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়—এটি ছিল অত্যাশ্চর্য, ঐতিহাসিক, অভূতপূর্ব। কিন্তু সেই বিজয়ের উল্লাসে আমরা যেন ভুলে গেলাম—আমাদের শিক্ষকদের কথা, যাঁরা ছিলেন সেই সংগ্রামের সঙ্গী, অথচ সংগ্রাম-পরবর্তী অস্থিরতার প্রথম শিকার।
শুরু হলো শিক্ষক নিগ্রহের এক দুঃস্বপ্নের অধ্যায়। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতার কালো মেঘ। জোরপূর্বক পদত্যাগ, শারীরিক লাঞ্ছনা, সামাজিক মাধ্যমে অবমাননা, চাকরি বাতিল—কোনো শিক্ষকই রেহাই পেলেন না। ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক নিগ্রহের শিকার, সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক এখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। যাঁরা ফিরতে পেরেছেন, তাঁদের অনেকের মনের ক্ষত এখনো শুকায়নি।
আমরা কী হারালাম?
এই সংকটে আমরা কী হারালাম? কেবল কিছু শিক্ষক হারাইনি—আমরা হারিয়েছি শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা, হারিয়েছি গুরু-শিষ্যের পবিত্র সম্পর্ক, হারিয়েছি একটি জাতির আত্মবিশ্বাস। যে শিক্ষক একসময় 'গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু দেব মহেশ্বর'—এই বোধে সিক্ত ছিলেন, সেই শিক্ষক আজ লাঞ্ছিত, অপমানিত। যে শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞানের মন্দির, তা হয়ে উঠল সহিংসতার আখড়া। যে শিক্ষার্থীরা ছিল ফুলের মতো কোমল, তারা হয়ে উঠল অস্ত্র হাতে উত্তেজিত জনতা।
আমরা হারিয়েছি আস্থা—শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ভিত্তি যে আস্থা, তা ভেঙে গেছে চুরমার। আমরা হারিয়েছি নিরাপত্তা—একজন শিক্ষক আজ জানেন না, কাল তাঁর শিক্ষার্থীরা আবারও মানববন্ধন করবে কিনা, তাঁর মাথায় জুতো পড়বে কিনা।
আমরা হারিয়েছি ভবিষ্যতের নাগরিক নির্মাণের সেই কারিগরদের, যাঁরা জাতির আগামী দিন গড়ার মূলধন। শিক্ষক নিগ্রহের অর্থ—আমরা নিজের হাতে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদকে ধ্বংস করছি। যে সমাজের শিক্ষক ভীত, সেই সমাজের শিক্ষার্থী কখনো সাহসী হয় না। যে সমাজের শিক্ষক অপমানিত, সেই সমাজের শিক্ষার্থী কখনো সম্মানিত হয় না।
আমরা কী শিখলাম?
এই অগ্নিপরীক্ষা থেকে আমরা কী শিখলাম? শিখলাম—রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে আইনের শাসনকে দুর্বল করা যায় না। 'মব জাস্টিস' কোনো ন্যায়বিচার নয়, এটি অনাচার। ফেসবুক পোস্ট বা উত্তেজিত জনতার রোষানলের ভিত্তিতে কারও ভাগ্য নির্ধারণ করা যায় না।
শিখলাম—শিক্ষাঙ্গন রাজনীতির হাতিয়ার হতে পারে না। শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের পণ্য নন, তাঁরা জাতির সম্পদ। তাঁদের যোগ্যতা বিচার হবে তাঁর পেশাগত দক্ষতায়, শিক্ষার্থীরা তাঁকে মূল্যায়ন করবে তাঁর শিক্ষাদানের মানে—কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তাঁর আনুগত্যে নয়।
শিখলাম—শিক্ষকতা পেশাকে পুনরায় মর্যাদার আসনে বসাতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার। প্রয়োজন আইনের শাসন, প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা।
শিখলাম—সহিংসতা কখনো সমাধান নয়। শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কখনো পুরোপুরি শুকাবে না। কিন্তু সেই ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আগামী দিনের পথচলায় সচেতন হই, তবে হয়তো এই অন্ধকার অধ্যায় থেকেও আলোর সূচনা সম্ভব।
আমরা কী করতে পারি?
শেষ কথা
শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে কোনো জাতি কখনো বড় হয় না। বড় হয় কেবল সেই জাতি, যে তার শিক্ষককে ভালোবাসে, রক্ষা করে, সম্মান করে। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী অধ্যায় আমাদের জন্য ছিল এক কঠিন শিক্ষা। আমরা দেখেছি কীভাবে অস্থিরতা, আবেগ ও সহিংসতা একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার শূন্যতা অপব্যবহার করে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে শিক্ষাঙ্গনকে ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু আমরা যদি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের পথচলায় সতর্ক হই, তবে হয়তো এই অন্ধকার অধ্যায় থেকেও আমরা আলোর পথ খুঁজে পাব।
আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—শিক্ষককে সুরক্ষিত করা, শিক্ষককে সম্মান করা, শিক্ষককে দেওয়া তার প্রাপ্য মর্যাদা। কারণ, শিক্ষকই জাতির প্রকৃত কারিগর। শিক্ষকই নির্মাতা ভবিষ্যতের। শিক্ষকই প্রেরণা, শিক্ষকই পথপ্রদর্শক।
আসুন, এই প্রতিজ্ঞা করি—শিক্ষক নিগ্রহ যেন আর কখনো না ঘটে। শিক্ষাঙ্গন যেন হয় শান্তির, জ্ঞানের, মানবিকতার ঠিকানা। আমাদের সন্তানরা যেন এমন শিক্ষকের কাছে পড়ে, যিনি নিরাপদ, যিনি সম্মানিত, যিনি ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলেন আগামী প্রজন্মকে।
কারণ, যে জাতি তার শিক্ষককে বাঁচায়, সেই জাতিই বাঁচে। যে জাতি তার শিক্ষককে হারায়, সেই জাতি হারায় তার ভবিষ্যৎ।
শিক্ষক হোক আমাদের গর্ব, শিক্ষক হোক আমাদের শক্তি। শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে নয়, শিক্ষকের হাত ধরে—বাংলা হোক আলোকিত, উজ্জ্বল, সমৃদ্ধ। শিক্ষক বাঁচলে বাঁচে জাতি। শিক্ষক সম্মানিত হলে সম্মানিত হয় জাতি।
শিক্ষা সংস্কারে সম্ভাব্য প্রভাব ও সুপারিশ
গবেষণাভিত্তিক প্রভাব বিশ্লেষণ
শিক্ষক নিগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা গবেষকরা উদ্বিগ্ন। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের 'Global Report on Teachers'-এ বলা হয়েছে, শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতা ও পেশাগত অবমূল্যায়ন শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও তীব্র।
সুপারিশ
চূড়ান্ত প্রতিফলন
যে মাঠে ফসল ফলাতে হয়, সেই মাঠে যখন চাষিই লাঞ্ছিত হয়—তখন ফসলের আশা করা বৃথা। যে সমাজ তার শিক্ষককে হারায়, সে সমাজ হারায় তার ভবিষ্যৎ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তনের নামে শিক্ষাঙ্গনে যে সহিংসতার ঢেউ এলো, তা আমাদের সভ্যতার জন্য এক কালো কলঙ্ক। তিন হাজারের বেশি শিক্ষক নিগ্রহের শিকার, সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক এখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি—এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো হলো বাংলার মাটিতে পোড়া স্বপ্নের ছাই।
শিক্ষকতা পেশার ঐতিহাসিক মর্যাদা যখন ধূলিসাৎ হয়, তখন সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়। 'গুরু-শিষ্য' সম্পর্কের সেই আস্থা ও বিশ্বাস, যা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, তা পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার কোনো সংস্কার সফল হবে না।
প্রয়োজন আইন নয়—প্রয়োজন সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি—যে ইচ্ছাশক্তি শিক্ষককে দেয় তার প্রাপ্য মর্যাদা, দেয় নিরাপত্তা, দেয় সম্মান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান—শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনাগুলোর দ্রুত ও ন্যায্য বিচার করুন, এবং শিক্ষাঙ্গনে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে শিক্ষক নির্ভয়ে পাঠদান করতে পারেন, শিক্ষার্থী নির্ভয়ে শিখতে পারে। কারণ, যেদিন শেষ শিক্ষক লাঞ্ছিত হবেন, সেদিন শেষ শিক্ষার্থীও হারাবে তার ভবিষ্যৎ।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষক #শিক্ষা #শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষক_নিরাপত্তা #অধিকারপত্র #বাংলাদেশ #শিক্ষাঙ্গন #মানবাধিকার #গবেষণা #সমাজ #Teachers #Education #Bangladesh #EducationReform #TeacherProtection #AcademicFreedom #HumanRights #Policy #Research #Odhikarpatra