07/03/2026 পতাকা আছে, পা নেই! উল্টে যাওয়া বাঙালি ফুটবল ভুলে গেছে, কিন্তু উন্মাদনায় আজও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
Dr Mahbub
৩ July ২০২৬ ০৮:১৫
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় ঢেকে গেছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ফুটবল-সভ্যতা। যে ভূখণ্ড একদিন ইংরেজদের হারিয়ে ইতিহাস লিখেছিল, আজ সেই জাতি নিজের ফুটবল ভুলে অন্যের জয়ে উল্লাস করে। ইতিহাস, হাস্যরস, আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যতের পুনর্জাগরণের এক ব্যতিক্রমী অনুসন্ধান করে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। আসলে, বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ রঙিন পতাকার দেশে পরিণত হয়। কিন্তু যে বাঙালি আজ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সকে নিয়ে আবেগে ভাসে, সেই বাঙালিই কি জানে—একসময় এই বাংলাই উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল কেন্দ্র ছিল? ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী সফরকারী দলকে হারানো, ওয়ারী ক্লাবের ঐতিহাসিক সাফল্য, ফুটবল জাদুকর সৈয়দ আব্দুস সামাদ, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মুক্তিযুদ্ধে অবদান, আবাহনী–মোহামেডানের সোনালি যুগ—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি খেলার ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। কেন আজ বাংলাদেশের ফুটবল মাঠ ফাঁকা, অথচ বিদেশি দলের পতাকায় ছেয়ে যায় শহর? কেন আমরা বিশ্বমানের সমর্থক, কিন্তু বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে পারিনি? গবেষণা, ইতিহাস, সমাজবিশ্লেষণ, রম্যরস এবং তীক্ষ্ণ আত্মসমালোচনার মিশেলে রচিত এই দীর্ঘ ফিচার নিবন্ধটি আমাদের ফুটবল-স্মৃতিকে নতুন করে আবিষ্কারের আহ্বান জানায় এবং প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আবারও বাংলার ফুটবলকে তার হারানো গৌরবে ফিরিয়ে আনতে পারব?
একটা জাতিকে চেনার অনেক উপায় আছে। কেউ তার বিজ্ঞান দেখে, কেউ অর্থনীতি দেখে, কেউ শিল্প-সাহিত্য দেখে। আর বাঙালিকে চিনতে চাইলে বিশ্বকাপের মৌসুমে তার ছাদে উঠে তাকান। দেখবেন—বাংলাদেশের আকাশে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল, ফ্রান্স, জার্মানির পতাকা এমনভাবে উড়ছে, যেন জাতিসংঘের সদর দপ্তর ভুল করে ঢাকার উত্তরায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
পৃথিবীর অন্য দেশগুলো ফুটবল খেলতে শেখে; আমরা শিখেছি পতাকা বাঁধতে। তারা স্টেডিয়াম বানায়; আমরা বাঁশের মাচা বানাই। তারা খেলোয়াড় তৈরি করে; আমরা ফেসবুক কমেন্ট যোদ্ধা তৈরি করি। তারা বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখে; আমরা বিশ্বকাপের পরাজয়ে তিন দিন ভাত না খাওয়ার শপথ করি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—যে জাতি আজ অন্য দেশের ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি করে, সেই জাতির নিজের ফুটবলের ইতিহাস একদিন এমন ছিল, যা শুনলে ইউরোপের অনেক দেশও মাথা নত করত।
অতীতে এদেশের ফুটবল রূপকথার যাদুর মতো চমক দেখাতো। তাইতো ইতিহাস লিখেছে। কিন্তু আজকের ভাষায় বললে, তখনকার ঢাকা ছিল “জায়ান্ট কিলার”। অথচ আজ?
—আজ আমাদের ফুটবল মাঠে যত দর্শক নেই, তার চেয়ে বেশি দর্শক বসে থাকে ইউটিউব লাইভে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্ক করতে। অতীতের গৌরব আজও আমরা ধরে রেখেছি। তবে খেলায় নয়, অন্য দেশের সাপোর্টার হিসেবে ।
অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস শুরু হয়েছে সালাহউদ্দিন বা আবাহনী-মোহামেডান দিয়ে। আসলে তারও বহু আগে। ওয়ারী ক্লাব, ভিক্টোরিয়া, রংপুরের তাজহাট, ময়মনসিংহের লীলা দেবী ট্রফি—পূর্ব বাংলা একসময় নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এমনকি ওয়ারী ক্লাব মোহনবাগানকেও হারিয়েছে, ইংল্যান্ডের সফরকারী দলের বিপক্ষেও ইতিহাস গড়েছে। অর্থাৎ ফুটবল আমাদের কাছে আমদানি করা উন্মাদনা ছিল না। এটি ছিল আত্মমর্যাদার ভাষা।
আজকের প্রজন্ম যদি বিশ্বাস করতে না চায়, তাদের দোষ দেওয়া কঠিন। কারণ তারা যে বাংলাদেশকে দেখেছে, সেখানে ফুটবল মানেই চার বছর পরপর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা, ফেসবুকের কীবোর্ড যুদ্ধ আর রাত জেগে ইউরোপ-লাতিন আমেরিকার ম্যাচ দেখা। কিন্তু এই বাংলার মাটিই একদিন ছিল উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল ভূখণ্ড। এমন এক সময় ছিল, যখন কলকাতার ময়দান আর ঢাকার মাঠ—এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরেই বাংলার ফুটবলের প্রাণস্পন্দন চলত। পূর্ববঙ্গের ওয়ারী, ভিক্টোরিয়া, রংপুরের তাজহাট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ক্লাব, নিজস্ব টুর্নামেন্ট, নিজস্ব নায়ক ছিল। ফুটবল তখন কেবল একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নীরব আত্মমর্যাদার ভাষা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি লেখা হয় ১৯৩৭ সালের ২১ নভেম্বর। ইংল্যান্ডের দুর্ধর্ষ সফরকারী ইসলিংটন করিন্থিয়ানস—যারা ভারত সফরে প্রায় সবাইকে হারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল—ঢাকার মাঠে এসে থেমে যায়। ওয়ারী ক্লাবের খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত ঢাকা একাদশের হয়ে ভূপেন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, যিনি “পাখি সেন” নামে কিংবদন্তি হয়ে আছেন, একটি মাত্র গোল করেছিলেন। সেই এক গোলই ইংরেজদের হারিয়ে দিয়েছিল। পুরো ভারত সফরে সেটিই ছিল করিন্থিয়ানসের একমাত্র পরাজয়। ঔপনিবেশিক শাসকদের চোখে যে বাঙালি ছিল “দুর্বল”, সেই বাঙালিই তাদের সবচেয়ে গর্বিত ফুটবল দলকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিল।
কিন্তু পাখি সেন একা ছিলেন না। বাংলার ফুটবল আকাশে আরও উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ফুটবল জাদুকর সৈয়দ আব্দুস সামাদ। বল যেন তাঁর পায়ে আঠার মতো লেগে থাকত। ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন, তাঁর ড্রিবলিং ও কৌশল নিয়ে কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। অথচ দেশভাগের পর জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটিয়েছেন প্রায় বিস্মৃত অবস্থায়। যে মানুষকে একসময় দর্শক “ফুটবলের জাদুকর” বলত, ইতিহাস তাকে ধীরে ধীরে পাঠ্যবইয়ের প্রান্তিক ফুটনোটে পরিণত করেছে।
দলগত সাফল্যের তালিকাটিও কম গৌরবময় নয়। ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ারী ক্লাব শুধু পূর্ব বাংলার নয়, সমগ্র ভারতীয় ফুটবলের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। তারা ১৯১৯ সালে মোহনবাগানকে আইএফএ শিল্ড থেকে বিদায় করেছিল। ১৯২৫ সালে ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টার্স সফরকারী দলের বিপক্ষে গোল করা একমাত্র ভারতীয় দল ছিল ওয়ারী ক্লাব। ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং, তাজহাট এফসি, ময়মনসিংহের লীলা দেবী ট্রফি—সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলা একসময় এমন একটি ফুটবল-সংস্কৃতি নির্মাণ করেছিল, যার গভীরতা আজকের অনেক ফুটবলপ্রেমীও কল্পনা করতে পারবেন না।
দেশভাগের পরও সেই ঐতিহ্য নিঃশেষ হয়ে যায়নি। পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন লীগ দীর্ঘদিন পশ্চিম পাকিস্তানের যেকোনো লিগের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক বলে বিবেচিত হতো। ১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া আগা খান গোল্ড কাপ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোকে ঢাকায় নিয়ে আসত। অনেক গবেষক এই প্রতিযোগিতাকেই আজকের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ঐতিহাসিক পূর্বসূরি বলে মনে করেন। অথচ এমন শক্তিশালী ফুটবল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বৈষম্যের কারণে সমগ্র পাকিস্তান দলে মাত্র তেইশজন বাঙালি ফুটবলারের সুযোগ হয়েছিল।
১৯৭১ সালে ফুটবল আবারও ইতিহাস রচনা করে। বন্দুকের পাশাপাশি বলও মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র হয়ে ওঠে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন শহরে ষোলোটি ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলে এবং বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে তুলে ধরে। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, তরুণ কাজী সালাহউদ্দিনসহ অনেকেই তখন কেবল ফুটবলার ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একটি জন্ম নিতে থাকা রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত। ইতিহাসে খুব কম দেশই বলতে পারবে—তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে ফুটবলও যুদ্ধ করেছে।
স্বাধীনতার পর আশির দশকে আবাহনী–মোহামেডান দ্বৈরথ ঢাকাকে এক বিশাল ফুটবল নগরীতে পরিণত করেছিল। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শক, টিকিটের জন্য রাতভর লাইন, শহরজুড়ে নীল-সাদা আর কালো-সাদার বিভাজন—ফুটবল তখন ছিল বাঙালির সামাজিক উৎসব। কাজী সালাহউদ্দিন, চুন্নু, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, কায়সার হামিদ, ওয়াসিম ইকবাল, মামুন জোয়ার্দার নিশু—এঁদের নৈপুণ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুটবলপ্রেমে বড় হয়েছে। স্টেডিয়ামে একটি গোল হলে যে গর্জন উঠত, তা ছিল যেন সমুদ্রের জোয়ারের শব্দ।
এই প্রশ্নের উত্তর শুনলে মনে হবে, এটি কোনো রম্যরচনা নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবই। স্বাধীনতার পর কিছুদিন ফুটবল ছিল জাতির প্রাণ। আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ মানেই ঈদের চেয়েও বড় উৎসব। স্টেডিয়ামে ঢোকার টিকিট পাওয়া মানে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেয়েও কঠিন কাজ।
তারপর একদিন ক্রিকেট এল। টেলিভিশন এল। স্পনসর এল। রাজনীতি এল। অব্যবস্থাপনা এল। ফুটবল প্রশাসন এমনভাবে ফুটবলকে পরিচালনা করল, যেন গরুর গাড়ি দিয়ে রকেট উৎক্ষেপণ করা যায়। ধীরে ধীরে মাঠ খালি হলো। খেলোয়াড় কমল। একাডেমি শুকিয়ে গেল। আর দর্শকের ভালোবাসা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে।
আজ সেই গর্জনের জায়গায় নীরবতা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস সম্ভবত এটাই—যে বাংলা একদিন ইংরেজদের হারিয়ে দিয়েছিল, যে বাংলা এশিয়াকে ফুটবল শিখিয়েছিল, যে বাংলা মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটবলকে স্বাধীনতার দূত বানিয়েছিল, সেই বাংলাই আজ অন্য দেশের পতাকা বয়ে বেড়ায়। আমাদের ফুটবল-উন্মাদনা আজও বিশ্বসেরা হতে পারে, কিন্তু আমাদের ফুটবল-স্মৃতি যেন ক্রমেই বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হার হয়তো মাঠে নয়; স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনাই আজকের সবচেয়ে বড় জয়।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ এলেই সংসারে গণতন্ত্র স্থগিত হয়। কেননা স্বামী ব্রাজিল। স্ত্রী আর্জেন্টিনা। ছেলে পর্তুগাল। মেয়ে ফ্রান্স। দাদু এখনও মনে করেন পেলের পর আর কেউ ফুটবল খেলেনি। আর পাশের বাড়ির কাকা বিশ্বাস করেন—মেসি যদি বাজারে আলু কিনতেও যান, সেটাও ফুটবল ইতিহাসের অংশ।
বিশ্বকাপের রাতে মনে হয়, দেশে নির্বাচন নয়, মহাপ্রলয় হচ্ছে। মাঠে খেলছে মেক্সিকো আর পোল্যান্ড। কিন্তু মারামারি হচ্ছে মিরপুর আর মাদারীপুরে।
জাপান বিশ্বকাপে হারিয়ে দিল জার্মানিকে। তারপর দেশে ফিরে আরও একশোটা একাডেমি বানাল। মরক্কো সেমিফাইনালে উঠল। পরদিনই তারা যুব উন্নয়নের নতুন পরিকল্পনা নিল। আইসল্যান্ডের জনসংখ্যা একটি বাংলাদেশের উপজেলার সমান। তবু তারা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আর আমরা?
আমরা প্রতিবার বিশ্বকাপ শেষে নতুন পতাকা ভাঁজ করে রেখে দিই। পরবর্তী চার বছর পর্যন্ত। তারপর আবার বের করি। জাতীয় সম্পদের মতো।
বাংলাদেশে একজন শিশু প্রথমে শেখে না অফসাইড কী। সে শেখে— “তুই ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?” —এই প্রশ্নের উত্তর ভুল হলে বন্ধুত্ব শেষ। বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। ফেসবুক আনফ্রেন্ড হওয়া তো নিত্যদিনের ঘটনা। মজার বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার একজন সমর্থককে যদি জিজ্ঞেস করেন—বাংলাদেশের লিগ চ্যাম্পিয়ন কে? তিনি হয়তো বলবেন—“বাংলাদেশে লিগও হয় নাকি?”
এ যেন এমন এক প্রেমিক, যে প্রতিদিন পাশের গ্রামের মেয়েকে প্রেমপত্র লিখছে; অথচ নিজের ঘরের মানুষটির সঙ্গে বহু বছর কথা বলেনি।
বিদেশি দলকে সমর্থন করতেই পারেন। সেটি খেলাধুলার আনন্দ। কিন্তু যদি সেই আনন্দ নিজের ফুটবলের অস্তিত্বকে গ্রাস করে, তখন সেটি আর খেলাধুলা থাকে না; সেটি হয়ে যায় সাংস্কৃতিক ভাড়াটিয়াত্ব।
যে জাতি ১৯৩৭ সালে ইংরেজদের হারিয়েছিল, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ে আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করেছিল, যে জাতির ফুটবল একসময় উপমহাদেশকে মুগ্ধ করেছিল—সেই জাতি আজ নিজের ইতিহাস ভুলে অন্যের গোলে নাচছে।
ভাবুন তো, বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতেছে। ঢাকার রাস্তায় আনন্দ মিছিল। ব্রাজিল জিতেছে। চট্টগ্রামে আতশবাজি। পর্তুগাল জিতেছে। রাজশাহীতে মিষ্টি বিতরণ। আর যদি কোনোদিন বাংলাদেশ এশিয়ান কাপের সেমিফাইনালে ওঠে?
তখন হয়তো আমরা অবাক হয়ে একে অপরকে জিজ্ঞেস করব— “আচ্ছা, আমাদেরও নাকি একটা জাতীয় ফুটবল দল আছে?” সেদিন উত্তরটা যেন লজ্জায় মাথা নিচু করে না বলতে হয়। কারণ ইতিহাস বলে—আমরা একদিন ফুটবল খেলতাম। বর্তমান বলে—আমরা এখন ফুটবল দেখি। আর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে—আমরা আবার কবে ফুটবল খেলব।
তবু আমরা স্বপ্ন দেখি। এখনো দেখি। কারণ যে জাতি একদিন ফুটবলকে কেবল একটি খেলা হিসেবে নয়, আবেগ, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে ধারণ করেছিল, সেই জাতির স্বপ্ন কখনো সম্পূর্ণ নিভে যেতে পারে না। আমি হতাশার দলে নই। আমি বিশ্বাস করি, একদিন আবার এই বাংলার মাটিতে ফুটবলের সেই হারানো জোয়ার ফিরে আসবে। আমাদের মানুষের অভাব নেই, প্রতিভারও অভাব নেই; অভাব কেবল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার, অবিচল একাগ্রতার, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের, শৃঙ্খলার এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগের। যদি দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, চর-হাওর-পাহাড় থেকে হাজারো প্রতিভাবান শিশু-কিশোরকে খুঁজে এনে আন্তর্জাতিক মানের পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া যায়, তবে একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে দিয়েই কোনো বাঙালি ফুটবলার বিশ্বকাপের মহামঞ্চে তারকার মতো জ্বলে উঠবে—এ বিশ্বাস আমার অটুট। হয়তো সেই দিনটি নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য আমার হবে না। কিন্তু তাতে কী? স্বপ্ন তো কেবল নিজের জন্য দেখা হয় না; স্বপ্ন দেখা হয় আগামী প্রজন্মের জন্য। আমি বিশ্বাস করি, আজ যে স্বপ্ন আমরা বুকের ভেতর লালন করছি, আগামী দিনের কোনো এক প্রজন্ম সেটিকে বাস্তবে রূপ দেবে। আর সেদিন, কোটি বাঙালির চোখের আনন্দাশ্রু সাক্ষ্য দেবে—স্বপ্ন কখনো মরে না; সত্যিকারের স্বপ্ন কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.
#বাংলার_ফুটবল #বাংলাদেশ_ফুটবল #ফুটবলের_ইতিহাস #হারানো_গৌরব #বিশ্বকাপ #বাঙালির_ফুটবল #আবাহনী #মোহামেডান #ওয়ারী_ক্লাব #স্বাধীন_বাংলা_ফুটবল_দল #কাজী_সালাহউদ্দিন #বাংলার_ঐতিহ্য #ক্রীড়া_ইতিহাস #SportsHistory #BangladeshFootball #FootballCulture #WorldCup #FootballHeritage #ReviveBangladeshFootball #Odhikarpatra