07/23/2026 যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি ৩০ বছরের পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অনুমতির খবরে নতুন বিতর্ক
odhikarpatra
২৩ July ২০২৬ ০২:৪২
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ঢাকা
ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে প্রস্তাবিত ৩০ বছরের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে, যার আওতায় সৌদি আরব নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পেতে পারে। তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং কার্যকর হতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন শিগগিরই চুক্তিটি কংগ্রেসে উপস্থাপন করতে পারে। অনুমোদন পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অংশ নেবে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও সেটি সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। গাজা যুদ্ধের পর সেই আলোচনা স্থবির হয়ে যায়। পরে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনাটি পুনরায় শুরু করে এবং স্বাভাবিকীকরণের শর্তটি বাদ দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির মেয়াদ হবে ৩০ বছর। এর আওতায় মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউসসহ বিভিন্ন কোম্পানি সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, যৌথ যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি সমীক্ষার ভিত্তিতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বৈধ হলেও একই প্রযুক্তি উচ্চমাত্রায় ব্যবহার করলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান উৎপাদনের পথও খুলে দিতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৯ সালের তথাকথিত "গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড" ১২৩ চুক্তির মতো কঠোর নিরাপত্তা শর্ত নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত পরিদর্শন প্রটোকলও বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের পরিধি সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল হোরোভিটজের মতে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক পারমাণবিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তার ভাষ্য, প্রস্তাবিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করছে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি খাতে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
এছাড়া সৌদি আরবে দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে পারমাণবিক জ্বালানিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য জমা দিতে হয়। কংগ্রেস চাইলে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে চুক্তিটি বাতিল করতে পারে।
ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তাও আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের নন-প্রলিফারেশন কর্মসূচির উপপরিচালক আন্দ্রেয়া স্ট্রিকার কংগ্রেসকে চুক্তিটি অনুমোদন না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এটি বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি এমন সময় সামনে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার কথা বলছে। সেই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চুক্তিটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে এবং কংগ্রেসের অনুমোদনের ওপর এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তবে এটি অনুমোদিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।