08/05/2026 বাংলাদেশের নেতৃত্বে জাতিসংঘের ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাব: মব সংস্কৃতি থেকে মানবিক রাষ্ট্রের পথে—প্রশংসনীয় প্রস্তাবে দায়িত্ব বেড়েছে সরকারসহ রাষ্ট্রের সবার
Dr Mahbub
৫ August ২০২৬ ১০:৪৬
অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
বাংলাদেশের নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত “Follow-up to the Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace” প্রস্তাব কেবল একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি শান্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি। এই প্রস্তাবের তাৎপর্য, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণের লক্ষ্যে অধিকারপত্র চারটি অংশে বিভক্ত একটি বিশেষ ফিচার প্রকাশ করছে। চার অংশে বিন্যস্ত এই বিশেষ ফিচারের প্রথম অংশে জাতিসংঘের Culture of Peace ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি, বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, মব সংস্কৃতি, আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত “Follow-up to the Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace” প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ, প্রমিত, সহজবোধ্য ও পাঠকবান্ধব বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে সাধারণ পাঠক, গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা মূল দলিলের বক্তব্য যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেন। তৃতীয় অংশে আন্তর্জাতিক দলিলটির নীতিগত তাৎপর্য এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় মন্তব্য ও স্বাধীন বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অংশে শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ডিজিটাল নাগরিকত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, তরুণদের অংশগ্রহণ ও সুশাসনভিত্তিক একটি বাস্তবসম্মত নীতিগত রোডম্যাপ, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। অধিকারপত্র বিশ্বাস করে—শান্তি কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ নির্মাণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই চার পর্বের বিশেষ ফিচার সিরিজের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা, জনআলোচনা সমৃদ্ধ করা এবং নীতি ও অনুশীলনের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু দলিল আছে, যেগুলো আইন নয়, তবুও আইনের চেয়েও শক্তিশালী। কারণ সেগুলো রাষ্ট্রের আচরণ, সমাজের মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের A/79/L.111 শীর্ষক Follow-up to the Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace তেমনই একটি দলিল। ২০২৫ সালের এই প্রস্তাবের অন্যতম সহ-উদ্যোক্তা বাংলাদেশ। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকারও বটে।
এই প্রস্তাব আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনদর্শন, একটি সামাজিক চর্চা। আজকের বাংলাদেশে যখন মতভেদ অনেক সময় সংলাপের বদলে সংঘর্ষে, বিতর্ক অপমানে, সমালোচনা সাইবার হামলায়, আর প্রতিবাদ কখনও কখনও মবের চাপে পরিণত হয়, তখন এই প্রস্তাব নতুন করে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি শান্তির সংস্কৃতি গড়ছি, নাকি সহিংসতার সংস্কৃতি?
১৯৪৫ সালে ইউনেস্কোর সংবিধানে একটি ঐতিহাসিক বাক্য লেখা হয়েছিল—"Since wars begin in the minds of men, it is in the minds of men that the defences of peace must be constructed."
জাতিসংঘের এই প্রস্তাব সেই দর্শনকেই পুনরায় সামনে এনেছে। মানুষের মন যদি ঘৃণায় ভরে যায়, তাহলে আইন একা সমাজকে রক্ষা করতে পারে না। আবার মানুষের মন যদি সম্মান, সহমর্মিতা ও যুক্তিবোধে গড়ে ওঠে, তবে অস্ত্র ছাড়াই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ কারণেই এই প্রস্তাব যুদ্ধ বন্ধ করার চেয়ে অনেক বড় একটি কাজ করতে চায়—যুদ্ধের মানসিক বীজকে শুকিয়ে দিতে।
অর্থাৎ, শান্তি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আগেই একটি সামাজিক অভ্যাস।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্মই নিয়েছে শান্তি, মানবমর্যাদা ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে। তবুও আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এমন কিছু প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান—
এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো ধীরে ধীরে "মব সংস্কৃতি"কে স্বাভাবিক করে তোলে। জাতিসংঘের এই প্রস্তাব সরাসরি "মব কালচার" শব্দটি ব্যবহার না করলেও যে দর্শন উপস্থাপন করেছে, তা স্পষ্টভাবে এমন সংস্কৃতির বিপরীত। কারণ এটি অহিংসা, সংলাপ, মানবমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান এবং বৈচিত্র্যের স্বীকৃতিকে শান্তির অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হচ্ছে—সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগকে ন্যায়বিচার মনে করা। জনতা আদালত নয়। ভাইরাল পোস্ট প্রমাণ নয়। হ্যাশট্যাগ রায় নয়। কোনো ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে অপমান করা বিচার নয়। কাউকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। রাষ্ট্র যদি আইন ছেড়ে জনতার আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে একদিন সেই জনতাই রাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই শান্তির সংস্কৃতি মানে কেবল শান্ত থাকা নয়; বরং আইনের শাসনের প্রতি আস্থা গড়ে তোলা।
ডিজিটাল যুগে যুদ্ধের নতুন অস্ত্র ট্যাঙ্ক নয়। অ্যালগরিদম। ভুয়া তথ্য। ঘৃণার পোস্ট। ডিজিটাল লিঞ্চিং।
জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে ডিজিটাল পরিসর এখন শান্তির সংস্কৃতি গঠনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সঙ্গে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলা, সহনশীলতা, বহুত্ববাদ এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগের ওপর জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশে তাই ডিজিটাল নাগরিকত্ব (Digital Citizenship) আর বিলাসিতা নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষার পূর্বশর্ত। একটি "শেয়ার" কখনও কখনও একটি জীবন ধ্বংস করতে পারে। আবার একটি দায়িত্বশীল মন্তব্য একটি সংঘর্ষ থামিয়েও দিতে পারে।
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশগুলোর একটি হলো শিক্ষা। এখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে শিশুদের জন্য এমন শিক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেখানে থাকবে—পারস্পরিক শ্রদ্ধা; সহনশীলতা; মানবাধিকার; বৈশ্বিক নাগরিকত্ব; অহিংস বিরোধ নিষ্পত্তি; এবং সক্রিয় নাগরিকত্বের চর্চা।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি; কিন্তু শান্তিভিত্তিক শিক্ষা নিয়ে ততটা ভাবিনি। একজন শিক্ষার্থী গণিতে শতভাগ নম্বর পেতে পারে। কিন্তু যদি সে মতভিন্নতাকে সহ্য করতে না শেখে— তবে শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা বা অবকাঠামোতে নয়; বরং তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারে, কতটা নিশ্চিন্তে রাস্তায় চলতে পারে, কতটা নির্ভয়ে নিজের ঘরে বসবাস করতে পারে এবং ভিন্নমত পোষণ করেও আইনের সমান সুরক্ষা পায়—সেখানেই রাষ্ট্রের সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় নিহিত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আবারও বাংলাদেশের উদ্যোগে উত্থাপিত "Follow-up to the Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace" শীর্ষক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এই প্রস্তাব কেবল একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান এবং প্রশাসনের ওপর একটি নতুন নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও সৃষ্টি করেছে। প্রস্তাবটি সংলাপ, সহনশীলতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, অহিংসা, সংহতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবোধকে পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং অসহিষ্ণুতার পরিবর্তে পারস্পরিক বোঝাপড়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের খুব বেশি পেছনে যেতে হয় না। ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এমন এক নতুন পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে, যেখানে বহু ক্ষেত্রেই শান্তির সংস্কৃতির পরিবর্তে সংঘাতের সংস্কৃতি দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক মতভেদ ক্রমশ ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার ভাষা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা না করে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা, ভয় দেখানো কিংবা সংগঠিত জনতার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা চোখে পড়েছে। কোথাও কোথাও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া, বাড়িঘর বা প্রতিষ্ঠানে হামলা, সম্পত্তি নষ্ট করা কিংবা প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতাও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘে শান্তির সংস্কৃতি নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া একটি রাষ্ট্রের জন্য এই বাস্তবতা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন আত্মসমালোচনার ক্ষেত্র। কারণ "Culture of Peace" কখনোই কেবল যুদ্ধ না থাকার নাম নয়। এটি এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে ভয় ছাড়াই; সংখ্যালঘু বা বিরোধী মতের মানুষ আইনের সমান সুরক্ষা পায়; মতবিরোধের সমাধান হয় আদালত, সংলাপ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—রাস্তার শক্তি বা জনতার বিচারের মাধ্যমে নয়। এই দর্শনই ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের উদ্যোগে প্রথম জাতিসংঘে গৃহীত হয়েছিল এবং প্রায় আড়াই দশক ধরে এটি জাতিসংঘের শান্তি এজেন্ডার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
এখানেই বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার গ্রহণ করার পর সেই অঙ্গীকার কেবল কূটনৈতিক ভাষণে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিককে বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার, আইনের সমান সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের এই প্রস্তাব সেই সাংবিধানিক দায়িত্বকেই আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর অর্থ হলো, সরকারের কাছে এখন কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করাও অপরিহার্য, যেখানে—
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যখন জনতার আবেগ আইনের শাসনের জায়গা দখল করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ মব কখনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু চেনে না; আজ যে জনতার হাততালি দেয়, কাল সেই একই জনতার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। রাষ্ট্র যদি আইনের শাসনের পরিবর্তে জনতার বিচারের প্রতি নীরব থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে নাগরিকের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ক্ষয়ে যায়।
এই কারণেই জাতিসংঘের শান্তির সংস্কৃতি বিষয়ক প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক দল—সবার জন্য একটি নীতিগত নির্দেশনা।
বিশেষভাবে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির সংস্কৃতি কেবল পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এটি শুরু হয় পরিবারে, বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জনপরিসরের ভাষায়। যদি শিশু শিখে যে মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়; যদি শিক্ষার্থী শেখে যে বিতর্ক মানেই সহিংসতা নয়; যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতি শেখায় যে বিরোধী মতও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ—তাহলেই শান্তির সংস্কৃতি বাস্তব রূপ পাবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করার। সরকার চাইলে এই প্রস্তাবের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে একটি "Culture of Peace National Action Plan" প্রণয়ন করতে পারে। সেখানে মব সহিংসতা প্রতিরোধ, ঘৃণামূলক বক্তব্য মোকাবিলা, নাগরিক সংলাপ, মানবাধিকার শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি, স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি কমিটি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি সংসদ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে শান্তির সংস্কৃতিকে একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, জাতিসংঘের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য কোনো পুরস্কার নয়; বরং এটি একটি দায়িত্বের দলিল। যে রাষ্ট্র বিশ্বকে সংলাপ, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা দেয়, সেই রাষ্ট্রের নিজের ভেতরেও সেই মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কারণ শান্তির সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উচ্চারিত কোনো কূটনৈতিক শব্দ নয়; এটি প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক সহাবস্থানের জীবন্ত অনুশীলন। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই অনুশীলনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ারই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভবন নয়, তার গবেষণাগারও নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মানুষ ভয় ছাড়া প্রশ্ন করতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে, যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে পারে এবং পরস্পরের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে মতপার্থক্যকে ধারণ করতে পারে। যখন সেই পরিবেশ ভেঙে পড়ে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠান থেকে ভয়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাব তাই শুধু যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলে না; এটি এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানায়, যেখানে সংলাপ সংঘর্ষকে প্রতিস্থাপন করবে, সম্মান অপমানকে পরাজিত করবে এবং যুক্তি আবেগনির্ভর সহিংসতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আর বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা বহু বছর ধরে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছি ফলাফল, জিপিএ, চাকরি, দক্ষতা ও অর্থনীতির ভাষায়। কিন্তু খুব কমই আলোচনা করেছি—একজন শিক্ষার্থী কীভাবে একজন শান্তিপ্রিয় নাগরিক হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবটি বলছে, শিশুদের জন্য এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান, সহনশীলতা, সক্রিয় নাগরিকত্ব, মানবাধিকার এবং অহিংস আচরণ শেখানো হবে। এই একটি অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। কারণ—
বাংলাদেশে গত এক দশকে একটি উদ্বেগজনক সামাজিক প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে—বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক রায় ঘোষণা: কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে। কখনও কর্মক্ষেত্রে। কখনও রাজনৈতিক পরিসরে। কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি অভিযোগ উঠল। একটি ভিডিও ভাইরাল হলো। কয়েক হাজার মন্তব্য জমা হলো।
এরপর শুরু হলো—"পদত্যাগ করতে হবে।"; "ওকে বহিষ্কার করো।"; বা "ওকে সমাজ থেকে বের করে দাও।"—এই ধরনের আচরণ আইনি প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘের প্রস্তাবটি যদিও নির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করে না, তবে এটি ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, মানবমর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি, আইনের শাসন, সংলাপ ও অহিংসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। অতএব, নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জনমত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জনতার চাপ বিচারিক বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
শারীরিক আঘাতই শুধু সহিংসতা নয়। কাউকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া, যেখানে তিনি সম্মান রক্ষার জন্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হন—এটিও এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা হতে পারে।কর্মক্ষেত্রে দলবদ্ধ চাপ সৃষ্টি করা। শিক্ষকের কক্ষে অবরোধ। কর্মকর্তাকে অপমান করে পদত্যাগে বাধ্য করা।
সামাজিক মাধ্যমে লাগাতার চরিত্রহনন। এসব ঘটনায় বাহ্যিক রক্তপাত নাও থাকতে পারে; কিন্তু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত অনেক গভীর। শান্তির সংস্কৃতি এই কারণেই কেবল সংঘর্ষ এড়ানোর শিক্ষা দেয় না; এটি মর্যাদার সঙ্গে মতবিরোধ পরিচালনার শিক্ষা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্রশ্নের জায়গা। এখানে মতভেদ থাকবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। একাডেমিক বিতর্ক থাকবে। তত্ত্বের বিরোধ থাকবে। কিন্তু এগুলো যদি ব্যক্তিগত ঘৃণায় পরিণত হয়, তাহলে জ্ঞানচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জাতিসংঘের প্রস্তাবটি আন্তঃধর্মীয়, আন্তঃসাংস্কৃতিক এবং আন্তঃসভ্যতাগত সংলাপের ওপর জোর দিয়েছে। এই দর্শন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—`আমি আপনার সঙ্গে একমত নই; কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার রক্ষায় আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।“
আগে একজন মানুষকে অপমান করতে একটি জনসভা লাগত। এখন একটি মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। একটি ভুয়া পোস্ট। একটি বিকৃত ছবি। একটি সম্পাদিত ভিডিও। একটি মিথ্যা ক্যাপশন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষের সামনে একজন মানুষের সামাজিক পরিচয় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে ডিজিটাল পরিসর এখন শান্তির সংস্কৃতি নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার কৌশল বিকাশের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হতে পারে—ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা;সাইবার বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষাক্রম; দায়িত্বশীল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার; অনলাইন ঘৃণামূলক প্রচারণা সম্পর্কে সচেতনতা; ভুক্তভোগীদের জন্য কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা।
ঘৃণার ভাষা কখনও একদিনে জন্মায় না। প্রথমে আসে ঠাট্টা। তারপর বিদ্রূপ। তারপর অপমান। তারপর অমানবিকীকরণ। এরপর সহিংসতা। এই কারণেই জাতিসংঘ "hate speech" মোকাবিলাকে শান্তির সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছে এবং সহনশীলতা, বহুত্ববাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীল যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একটি সমাজ যখন প্রতিপক্ষকে "শত্রু" নয়, "সহনাগরিক" হিসেবে দেখতে শেখে, তখনই শান্তির প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়।
এই চারটি বিদ্যালয় যদি একই সঙ্গে সম্মান, সহমর্মিতা ও সংলাপ শেখায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মব নয়, মানবিক সমাজ গড়বে। কিন্তু যদি চারটিই ঘৃণা শেখায়—তাহলে কোনো আইনই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাবের একটি মৌলিক শক্তি হলো—এটি শান্তিকে শুধু সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখে না। বরং এটি স্পষ্টভাবে বলছে, শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই ভূমিকা রয়েছে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ সহিংসতা যেমন একদিনে জন্ম নেয় না, তেমনি শান্তিও কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। শান্তি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—পরিবারে, শ্রেণিকক্ষে, সংবাদপত্রে, আদালতে, সংসদে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং মানুষের দৈনন্দিন আচরণে।
প্রকৃত শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন—
এই কারণেই জাতিসংঘের প্রস্তাবটি মানবমর্যাদা, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং সামাজিক সংহতিকে শান্তির অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যম বহুবার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার কখনও কখনও অসত্য, অর্ধসত্য, উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা কিংবা যাচাইহীন তথ্যও সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ডিজিটাল যুগে একটি শিরোনাম হাজার মানুষের আবেগকে কয়েক মিনিটে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই জাতিসংঘ গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের কথা বিবেচনায় রেখে শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতি প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য এর অর্থ হতে পারে— সংঘর্ষকে উত্তেজনামূলকভাবে নয়, সমাধানমুখীভাবে উপস্থাপন করা। অভিযুক্তকে আদালতের আগে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন না করা। ফ্যাক্ট-চেকিংকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা। সামাজিক সম্প্রীতির ইতিবাচক উদাহরণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ সংবাদ শুধু তথ্য দেয় না; সংবাদ সমাজের ভাষাও তৈরি করে।
এই প্রস্তাব নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোর ভূমিকাকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতি গঠনে তাদের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে এর অর্থ হতে পারে—
রাষ্ট্র একা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; সমাজকে সঙ্গে নিয়েই তা সম্ভব।
জাতিসংঘ তরুণদের শান্তির অংশীদার হিসেবে দেখেছে, কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে নয়। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংলাপ, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত শক্তি হলো তরুণ সমাজ। কিন্তু যদি সেই শক্তি—
তাহলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অস্থির হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, যদি তরুণরা শান্তি, যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক নেতৃত্বের চর্চা করে, তবে তারাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক সম্পদ।
একজন শিশু প্রথম শেখে—
এসব শেখায় পরিবার। পরে বিদ্যালয় সেই শিক্ষাকে পরিশীলিত করে। তাই শান্তির সংস্কৃতি শুরু হয় ডাইনিং টেবিল থেকে।:
এই প্রস্তাব প্রারম্ভিক শৈশবের বিকাশে বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ শৈশবেই সমতা, সহনশীলতা, মানবাধিকারবোধ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি নির্মিত হয়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে তার নৈতিক নেতৃত্বকে বাস্তবে রূপ দিতে চায়, তবে "শান্তির সংস্কৃতি"কে কেবল আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি হতে হবে—
সমাজে ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে। সরকার বদলাতে পারে। প্রশাসন বদলাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব বদলাতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিবার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিশোধ, অপমান, জোরপূর্বক নতিস্বীকার এবং সামাজিক লাঞ্ছনার সংস্কৃতিও ফিরে আসে, তবে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—টেকসই শান্তি কেবল সংঘাত শেষ করে আসে না; এটি আসে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে, যেখানে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, মতভেদকে সংলাপে রূপান্তর করা হয় এবং আইনের শাসনকে জনতার আবেগের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
সীমিত প্রচার (Distr.: Limited): ১৮ জুলাই ২০২৫
মূল ভাষা: ইংরেজি
৭৯তম অধিবেশন; কার্যসূচির বিষয় ১৪: শান্তির সংস্কৃতি (Culture of Peace)
বাহরাইন, বাংলাদেশ, নেপাল, কাতার, রাশিয়ান ফেডারেশন, শ্রীলঙ্কা, তুর্কমেনিস্তান এবং ভিয়েতনাম: খসড়া প্রস্তাব (Draft Resolution): শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচির বাস্তবায়নের অগ্রগতি (Follow-up to the Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace)
সাধারণ পরিষদ,
১. জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত উদ্দেশ্য ও মূলনীতিসমূহকে স্মরণে রেখে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করার প্রতি জাতিসংঘের অঙ্গীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে;
২. জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)-এর সংবিধান স্মরণ করে, যেখানে বলা হয়েছে—
"যেহেতু যুদ্ধ মানুষের মনেই শুরু হয়, তাই শান্তির প্রতিরক্ষাও মানুষের মনেই নির্মাণ করতে হবে।"
৩. স্বীকার করে যে, ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত "শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচি" আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য, বিশেষ করে জাতিসংঘ ব্যবস্থার জন্য, একটি সার্বজনীন নীতিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য হলো এমন একটি শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যা সমগ্র মানবজাতির, বিশেষত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে অবদান রাখে।
৪. শান্তির সংস্কৃতি বিষয়ক পূর্বে গৃহীত সাধারণ পরিষদের সব প্রস্তাব স্মরণ করে, যার মধ্যে ২০২৪ সালের ২ মে গৃহীত ৭৮/২৭৭ নম্বর প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উক্ত প্রস্তাবটি শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচির গৃহীত হওয়ার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে গ্রহণ করা হয়েছিল।
৫. এছাড়াও জাতিসংঘের সহস্রাব্দ ঘোষণা (United Nations Millennium Declaration) এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা (2030 Agenda for Sustainable Development) স্মরণ করে, যেগুলো সক্রিয়ভাবে শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের আহ্বান জানায়।
৬. আরও স্মরণ করে যে, ২১ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের ৭৫/২০১ নম্বর প্রস্তাব, ২৭ এপ্রিল ২০১৬ তারিখের ৭০/২৬২ নম্বর প্রস্তাব—যা জাতিসংঘের শান্তি প্রতিষ্ঠা কাঠামোর (Peacebuilding Architecture) পর্যালোচনা সম্পর্কিত—এবং ২৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখের ৭২/২৭৬ নম্বর প্রস্তাব, যা মহাসচিবের শান্তি প্রতিষ্ঠা ও টেকসই শান্তি বিষয়ক প্রতিবেদনের অনুসরণে গৃহীত হয়েছিল, সেইসঙ্গে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখের ৭৬/৩০৫ নম্বর প্রস্তাব, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার অর্থায়ন (Financing for Peacebuilding) সম্পর্কিত—এসব প্রস্তাব পুনরায় স্মরণ করে।
৭. মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগরকে শান্তির অঞ্চল (Zones of Peace) হিসেবে ঘোষণা-সংক্রান্ত সাধারণ পরিষদের পূর্ববর্তী প্রস্তাবসমূহ স্মরণ করে এবং উক্ত অঞ্চলগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এসব শান্তি অঞ্চলের গুরুত্বের ওপর জোর প্রদান করে।
যা জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।
উন্নীত করা যায় এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের প্রচার ও বর্ণনাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
১৩. স্বীকার করে যে, শান্তি প্রতিষ্ঠা (Peacebuilding) এবং টেকসই শান্তি (Sustaining Peace) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগসমূহে শান্তির সংস্কৃতি (Culture of Peace) বিকাশের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন; একইভাবে শান্তির সংস্কৃতি বিকাশের উদ্যোগসমূহেও শান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যকে সমান গুরুত্ব প্রদান করা আবশ্যক।
১৪. মহাসচিবের "আমাদের অভিন্ন কর্মসূচি" (Our Common Agenda) শীর্ষক প্রতিবেদনের ওপর সাধারণ পরিষদের ১৫ নভেম্বর ২০২১ তারিখের ৭৬/৬ নম্বর প্রস্তাব এবং এর পরবর্তী বাস্তবায়নমূলক কার্যক্রমসমূহ স্মরণ করে।
১৫. স্বীকার করে যে, আমাদের দেশসমূহ ও জনগণের সম্মিলিত কল্যাণ, নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং সমৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই জাতিসংঘ সনদের আলোকে বৈশ্বিক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, কার্যকর সমাধান অনুসন্ধান এবং গৃহীত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—
১৬. আরও স্বীকার করে যে, স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত, গঠনমূলক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল মতবিনিময়, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, আন্তঃবিশ্বাসভিত্তিক সংলাপ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ—
গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।
১৭. আরও স্বীকার করে যে, বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও আলোচনার পথ বেছে নেওয়া এবং একে অপরের বিরুদ্ধে নয়, বরং একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
১৮. মহাসচিবের প্রতিবেদন স্মরণ করে, যেখানে সাধারণ পরিষদের ১৪ জুন ২০২৩ তারিখের ৭৭/২৯৬ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতি বিকাশে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের একটি সার্বিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
১৯. এছাড়াও ২০২২–২০৩২ সময়কালকে "আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক" (International Decade of Indigenous Languages) হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি স্মরণ করে।
২০. আরও স্মরণ করে যে, ইউনেস্কো (UNESCO) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে—
২১. ১৬ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ পর্যন্ত নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানে অনুষ্ঠিত "ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন সামিট" (Transforming Education Summit) এবং এর পূর্ব-সম্মেলন (Pre-Summit), যা ২৮ থেকে ৩০ জুন ২০২২ পর্যন্ত প্যারিসে ইউনেস্কো আয়োজন করেছিল, সে সম্পর্কে অবগত হয়েছে (Taking note)।
২২. এছাড়াও অবগত হয়েছে (Taking note) যে, সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরামর্শ প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন উপায়ে ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন সামিট-এর কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের অনুরোধের ভিত্তিতে ইউনেস্কো (UNESCO) এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের, বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য–৪ (SDG 4) – শিক্ষা ২০৩০ উচ্চপর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি (High-level Steering Committee)-কে আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে তারা ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন সামিট চলাকালে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যে জাতীয় অঙ্গীকার করেছে, তা দেশীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে।
২৩. সভ্যতাসমূহের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেগুলোকে স্বাগত জানায়।
২৪. যুবসমাজ, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বাস্তবধর্মী কর্মসূচির মাধ্যমে শান্তির সংস্কৃতি বিকাশে জাতিসংঘের "সভ্যতাসমূহের জোট" (United Nations Alliance of Civilizations) যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতি গভীর প্রশংসা প্রকাশ করে। এছাড়াও সরকারসমূহ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ফাউন্ডেশন, নাগরিক সমাজের সংগঠন, গণমাধ্যম এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে তাদের সহযোগিতামূলক কার্যক্রমেরও প্রশংসা করে।
২৫. ২০২৪ সালের ২৫ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্তুগালের কাসকাইশ (Cascais)-এ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের "সভ্যতাসমূহের জোট"-এর (United Nations Alliance of Civilizations) দশম ফোরাম সম্পর্কে অবগত হয়েছে। উক্ত ফোরামের প্রতিপাদ্য ছিল— "শান্তিতে ঐক্যবদ্ধ: আস্থা পুনর্গঠন, ভবিষ্যৎ পুনর্নির্মাণ—মানবতার জন্য দুই দশকের সংলাপের প্রতিফলন।" (United in Peace: Restoring Trust, Reshaping the Future – Reflecting on Two Decades of Dialogue for Humanity)
২৬. ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের "শান্তির সংস্কৃতি ফোরাম" (High-level Forum on the Culture of Peace) স্মরণ করে, যা শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচি গৃহীত হওয়ার বিংশতম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়াও "শান্তির সংস্কৃতি: মানবজাতিকে ক্ষমতায়ন ও রূপান্তর" (The Culture of Peace: Empowering and Transforming Humanity) শীর্ষক ওই বৈঠকের সভাপতির সারসংক্ষেপ (Chair's Summary) স্মরণ করে।
২৭. ২০২৪ সালের ২ আগস্ট অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের "শান্তির সংস্কৃতি ফোরাম"-কে স্বাগত জানায়। "বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তির সংস্কৃতি লালন ও বিকাশ" (Cultivating and Nurturing the Culture of Peace for Present and Future Generations) প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই ফোরামটি শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচির ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এই ফোরামে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, সাধারণ পরিষদের পর্যবেক্ষক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজন শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
২৮. ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর আশগাবাতে অনুষ্ঠিত "সংলাপই শান্তির নিশ্চয়তা" (Dialogue is a Guarantee of Peace) শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফলাফল দলিল (Outcome Document) এবং ২০২২ সালের ১৪–১৫ সেপ্টেম্বর আস্তানায় অনুষ্ঠিত বিশ্বের ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মসমূহের নেতৃবৃন্দের সপ্তম কংগ্রেসের ঘোষণাপত্র সম্পর্কে অবগত হয়েছে।
২৯. প্রশংসার সঙ্গে লক্ষ করে যে, "শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচি" জাতিসংঘের তিনটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও পরস্পরকে শক্তিশালীকারী মূল স্তম্ভ—
—এই তিন ক্ষেত্রেই সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৩০. ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সভাপতি কর্তৃক আহূত উচ্চপর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন, যা "নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি সম্মেলন" (Nelson Mandela Peace Summit) নামে পরিচিত, এবং সেখানে গৃহীত রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র স্মরণ করে।
৩১. স্বীকার করে যে, বহুপাক্ষিকতা (Multilateralism), আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি (Preventive Diplomacy) আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করা জরুরি; এবং এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে।
৩২. এছাড়াও স্বীকার করে যে, শান্তির সংস্কৃতি বিকাশে নারী ও যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের অবদানও সমানভাবে মূল্যবান। বিশেষভাবে নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, যাতে—
নারীদের পূর্ণ, সমান এবং অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
৩৩. লক্ষ করে যে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সন্ত্রাসবাদ-অনুকূল সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধ, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকার উন্নয়নে যুবসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। এছাড়াও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল পর্যায়ে যুবসমাজের পূর্ণ, কার্যকর, গঠনমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের গুরুত্ব স্বীকার করে এবং এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ যুব কার্যালয় (United Nations Youth Office) প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করে।
৩৪. ইউনেস্কোর (UNESCO) সাধারণ সম্মেলনের ছত্রিশতম অধিবেশনে "শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতি" বিষয়ক কর্মসূচি (Programme of Action for a Culture of Peace and Non-Violence) গৃহীত হওয়ার বিষয়টি স্মরণ করে এবং লক্ষ করে যে, উক্ত কর্মসূচির উদ্দেশ্যসমূহ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত "শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচি"-এর উদ্দেশ্য ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩৫. শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতি বিকাশে ইউনেস্কোর বিভিন্ন কার্যক্রমকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিশেষ করে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহের অনুরোধের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে শান্তির সংস্কৃতি বিকাশে তাদের প্রদত্ত সহায়তার বিষয়টি উল্লেখ করে।
৩৬. গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করে যে, করোনাভাইরাস রোগ (COVID-19) মহামারির ফলে—
উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও মহামারিটি—
আরও তীব্র করেছে; লিঙ্গ বৈষম্য গভীরতর করেছে; এবং স্বাস্থ্যসেবা ও টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
৩৭. স্বীকার করে যে, ডিজিটাল পরিসর (Digital Sphere) এবং এর চলমান রূপান্তর শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
৩৮. সরকারসমূহের সহযোগিতায় নাগরিক সমাজের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়টি লক্ষ করে, যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো—
৩৯. বিশ্বব্যাপী নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূহকে "শান্তির সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঘোষণা ও কর্মসূচি"-তে কল্পিত লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে শান্তির সংস্কৃতি বিকাশে তাদের প্রচেষ্টা ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং আরও সম্প্রসারণের জন্য উৎসাহিত করে।
সিদ্ধান্তমূলক অংশ (Operative Part) [মূল ঘোষণা]
জাতিসংঘের এই প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি শান্তিকে কেবল যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক সমঝোতা কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখেনি। বরং এটি শান্তিকে একটি সামাজিক, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক সক্ষমতা (social capability) হিসেবে বিবেচনা করেছে। শান্তি তখনই টেকসই হয়, যখন একটি সমাজে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তি, পারস্পরিক সম্মান, বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দর্শনটি ১৯৯৯ সালের "Declaration and Programme of Action on a Culture of Peace"-এর ধারাবাহিকতা বহন করে এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। এই প্রস্তাবের দর্শনকে একটি বাক্যে সংক্ষেপ করলে বলা যায়— "শান্তি সেনাবাহিনী দিয়ে রক্ষা করা যায়; কিন্তু শান্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত চর্চায়।"
বিশ্ব এখন একযোগে বহু সংকটের মুখোমুখি—
জাতিসংঘের মতে, এগুলোর কোনোটিই কেবল নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের মন, মূল্যবোধ এবং আচরণের পরিবর্তন। তাই এই প্রস্তাবে শিক্ষা, পরিবার, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যুবসমাজ এবং নাগরিক সমাজকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে শান্তি নির্মাণের অংশীদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এই প্রস্তাব কেবল একটি আন্তর্জাতিক নথি নয়; এটি একটি নীতিগত আয়না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় আলোচনা চলছে—শিক্ষা সংস্কার; অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা; ধর্মীয় সম্প্রীতি; সামাজিক মেরুকরণ; ঘৃণামূলক বক্তব্য; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজন; তরুণদের নাগরিক অংশগ্রহণ; এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা।
—এসবের প্রতিটির সঙ্গে এই প্রস্তাবের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে বলছে, বিদ্যালয়ে এমন শিক্ষা দিতে হবে যা শিশুদের কেবল পরীক্ষায় সফল নয়, বরং সহনশীল, মানবিক, বৈশ্বিক দায়িত্বশীল এবং শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এটি শিক্ষাকে নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এখানে শান্তি শিক্ষা (Peace Education), বৈশ্বিক নাগরিকত্ব শিক্ষা (Global Citizenship Education), মানবাধিকার শিক্ষা, প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষা এবং সহনশীলতা-ভিত্তিক শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হতে পারে—
এই প্রস্তাবটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনে। সহিংসতা কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে নয়; ভাষা, আচরণ, বৈষম্য, বিদ্বেষ, অপমান, সামাজিক বর্জন এবং ডিজিটাল ঘৃণার মাধ্যমেও জন্ম নিতে পারে। অন্যদিকে শান্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে—শ্রদ্ধাবোধ, ন্যায়বিচার, সমতা, অন্তর্ভুক্তি, সংলাপ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি। —এই মূল্যবোধের ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে। এটি UNESCO-এর বিখ্যাত দর্শনেরই সম্প্রসারণ—"যেহেতু যুদ্ধ মানুষের মনেই জন্ম নেয়, তাই শান্তির প্রতিরক্ষাও মানুষের মনেই নির্মাণ করতে হবে।"
এই প্রস্তাবের কোথাও "শান্তি"কে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে— পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, নারী, যুবসমাজ, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা—সকলেই শান্তির সংস্কৃতি গঠনের সহ-অংশীদার। এটি নীতিনির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—Whole-of-Society Approach।
এই প্রস্তাবের আলোকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার বিবেচনা করা যেতে পারে—
প্রস্তাবটি উচ্চাভিলাষী এবং মূল্যবোধসমৃদ্ধ হলেও এর বাস্তবায়ন সহজ নয়। কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়ে যায়—
অতএব, এই প্রস্তাবের সফলতা নির্ভর করবে নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, বাজেট, শিক্ষক উন্নয়ন এবং সামাজিক অংশীদারিত্বে রূপান্তর করার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রস্তাবের নৈতিক অঙ্গীকার: আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে প্রতিশ্রুতি, দেশের মাটিতেও কি তার প্রতিফলন ঘটবে?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই প্রস্তাবটি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি (Treaty) নয়, ফলে এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর সরাসরি আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। তবে এটিকে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এ ধরনের প্রস্তাবকে "Normative Commitment" বা নীতিগত ও নৈতিক অঙ্গীকার বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো রাষ্ট্র যখন একটি প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা হয় বা তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, তখন সে বিশ্ববাসীর সামনে একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি দেয় যে, এই মূল্যবোধগুলোকে সে নিজ দেশের নীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক চর্চায় প্রতিফলিত করার চেষ্টা করবে। এই প্রস্তাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে শান্তির সংস্কৃতি, অহিংসা, শিক্ষা, সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আরও জোরালো উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ যেহেতু এই প্রস্তাবের অন্যতম সহ-উদ্যোক্তা, তাই এটি শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়; বরং দেশের অভ্যন্তরেও একটি নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—আমরা কি সেই মূল্যবোধগুলো নিজেদের রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক জীবনে বাস্তবে চর্চা করছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, "Culture of Peace" বা শান্তির সংস্কৃতি কোনো একক কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নৈতিক দর্শন। এর অর্থ হলো, বিরোধের পরিবর্তে সংলাপ, ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা, প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, বৈষম্যের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তি এবং শক্তির পরিবর্তে মানবমর্যাদাকে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। জাতিসংঘের প্রস্তাবটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, লিঙ্গসমতা এবং মানবমর্যাদা—এসবই শান্তির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
বাংলাদেশ যদি এই নীতিগত অঙ্গীকারকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে, তবে তার প্রভাব রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চিত করতে হবে যে কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে প্রমাণ, ন্যায়বিচার ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে জনতার চাপ, সামাজিক অপমান বা ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করা হবে না। কারণ "শান্তির সংস্কৃতি"র দর্শন বিচারকে প্রতিস্থাপন করে না; বরং বিচারকে আরও ন্যায়সঙ্গত, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
একইভাবে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের অর্থ এই নয় যে সমাজে মতভেদ থাকবে না; বরং মতভেদকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ, সমালোচনা, মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন নাগরিকের বৈধ অধিকার। কিন্তু যখন মতপ্রকাশ ঘৃণার ভাষায় রূপ নেয়, প্রতিবাদ ভয়ভীতি প্রদর্শনে পরিণত হয়, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত অপমান, চরিত্রহনন ও সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে কাউকে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন তা "Culture of Peace"-এর নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রস্তাব ঘৃণামূলক বক্তব্য মোকাবিলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বহুত্ববাদ এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই প্রস্তাবের তাৎপর্য আরও গভীর। একটি বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা মতভেদকে সংঘর্ষ নয়, সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে শিখবে। জাতিসংঘ তাই শিশুদের জন্য এমন শিক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, মানবাধিকার, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং অহিংস আচরণ শেখানো হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হতে পারে—বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি শিক্ষা, ডিজিটাল নাগরিকত্ব, সংঘাত-সমাধান দক্ষতা এবং সহমর্মিতাভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় উপকারভোগী হবেন সাধারণ নাগরিক। কারণ একটি "শান্তির সংস্কৃতি"ভিত্তিক রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়; তার সম্মান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, ন্যায্য শুনানির অধিকার এবং বৈষম্যহীন আচরণের নিশ্চয়তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমন সমাজে একজন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত অপপ্রচার, চরিত্রহনন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলেও জানবেন যে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান তাঁর অধিকার রক্ষায় ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। কর্মক্ষেত্রে কেউ জনতার চাপের কারণে নয়, বরং ন্যায়সংগত তদন্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতপার্থক্যকে সহিংসতার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে। পরিবারে শিশুরা শিখবে প্রতিযোগিতার আগে সহমর্মিতা, মতবিরোধের আগে শ্রদ্ধা এবং শক্তির আগে মানবিকতা।
অবশেষে, এই প্রস্তাব বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক আয়না তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তির সংস্কৃতির পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে গৌরবের বিষয়। কিন্তু সেই নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একই দর্শন দেশের আদালতে, সংসদে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং নাগরিকের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হবে। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে উচ্চারিত মূল্যবোধ যদি জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা কূটনৈতিক ভাষণ হিসেবেই থেকে যায়; কিন্তু যদি সেই মূল্যবোধ রাষ্ট্র ও সমাজের সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, তবে সেটিই একটি জাতির নৈতিক পরিপক্বতার সর্বোচ্চ প্রকাশ।
একটি আন্তর্জাতিক প্রস্তাব তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনে। জাতিসংঘের এই প্রস্তাবও তেমনি। এটি নতুন কোনো আন্তর্জাতিক আইন নয়; এটি রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা, যা তাদের নিজ নিজ আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক নীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে। প্রস্তাবটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তির সংস্কৃতি জোরদার করতে, শিক্ষা, গণমাধ্যম, যুবসমাজ, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে এবং সহিংসতার মূল কারণগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানায়। বাংলাদেশ যেহেতু এই প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা, তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমাদের দেশে এর বাস্তব প্রতিফলন কী হতে পারে?
বাংলাদেশে শিক্ষা নীতি আছে। যুবনীতি আছে। নারী উন্নয়ন নীতি আছে। কিন্তু ‘জাতীয় শান্তির সংস্কৃতি নীতি (National Culture of Peace Policy)’ নেই। সময় এসেছে এমন একটি নীতি প্রণয়নের, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা থাকবে— রাষ্ট্র কীভাবে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করবে; ঘৃণার ভাষা প্রতিরোধ করবে; সংলাপকে উৎসাহিত করবে; মানবমর্যাদা রক্ষা করবে; এবং অহিংস সামাজিক আচরণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
এটি কোনো নতুন নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো নয়; বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নীতিগত ফ্রেমওয়ার্ক হতে পারে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে শান্তি শিক্ষা, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব শিক্ষা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবাধিকারের শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে তাই—
একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার পাশাপাশি মতভিন্নতাকে সম্মান করতে শেখে, তবেই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে সমাজকে রূপান্তরিত করবে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিটি মতবিরোধ যদি শাস্তি, অবরোধ, সামাজিক অপমান বা চরম অবস্থানে পৌঁছে যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল চরিত্র হারায়। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে—Dialogue and Mediation Centre প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। যেখানে—শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী—যেকোনো বিরোধ আদালত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ পাবেন। এটি শাস্তির বিকল্প নয়; বরং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি অতিরিক্ত পথ।
বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানেই এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়, যেখানে জনতার চাপই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের একমাত্র নির্ধারক হয়ে ওঠে। এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও কর্মক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট Anti-Mob Protocol বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মূল নীতিগুলো হতে পারে—
এ ধরনের কাঠামো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব না করে, একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে একজন মানুষকে সবচেয়ে দ্রুত একা করে দেওয়া যায় ডিজিটাল মাধ্যমে। একটি অপপ্রচার। একটি বিকৃত ভিডিও। একটি সমন্বিত ট্রোলিং। একটি মিথ্যা অভিযোগ।
জাতিসংঘ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে শান্তির সংস্কৃতি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কৌশল উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশে তাই—
—এসবকে একত্রে একটি জাতীয় উদ্যোগে রূপ দেওয়া যেতে পারে।
সাংবাদিকতার কাজ সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু সত্য প্রকাশের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম কখনও কখনও একটি সংঘর্ষকে আরও তীব্র করতে পারে। অন্যদিকে, দায়িত্বশীল ভাষা একই ঘটনার সংবাদ দিয়েও সামাজিক উত্তেজনা কমাতে পারে। জাতিসংঘ গণমাধ্যমকে শান্তির সংস্কৃতি প্রচারের অংশীদার হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশে সম্পাদকীয় পর্যায়ে Peace Journalism Guidelines প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।
জাতিসংঘ প্রারম্ভিক শৈশবের বিকাশে বিনিয়োগকে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমাদের পরিবারে শিশু যদি শেখে—ক্ষমা চাইতে, ক্ষমা করতে, অন্যের কথা শুনতে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে, তবে সেই শিশু বড় হয়ে সমাজে সহিংসতার বদলে সংলাপকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশ বহুবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি, মানবিকতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এখন "Culture of Peace" প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের সামনে আরেকটি সুযোগ এসেছে— বিশ্বকে দেখানোর যে, শান্তি শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা, বিচার, গণমাধ্যম, ডিজিটাল নাগরিকত্ব এবং সামাজিক আচরণেরও ভিত্তি।
একটি সমাজ একদিনে সহিংস হয় না। প্রথমে আমরা অপমানকে হাস্যরস ভাবি। তারপর বিদ্বেষকে মতামত বলি। তারপর মিথ্যাকে প্রচারণা বলি। তারপর জনতার চাপকে বিচার মনে করি। এরপর একদিন বুঝতে পারি—আমরা অজান্তেই শান্তির ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
বাংলাদেশের নেতৃত্বে উত্থাপিত এই জাতিসংঘ প্রস্তাব আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—শান্তি কেবল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়; শান্তি হলো একটি জাতির নৈতিক চরিত্র। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার শক্তিতে নয়, বরং সে কীভাবে মতভেদ সামাল দেয়, কীভাবে দুর্বলকে মর্যাদা দেয়, কীভাবে আইনকে জনতার আবেগের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় এবং কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা শেখায়—সেখানেই তার প্রকৃত মহত্ত্ব।
যদি বাংলাদেশ এই প্রস্তাবকে কেবল একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে না দেখে, বরং শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে একটি নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, তবে "শান্তির সংস্কৃতি" আর শুধু জাতিসংঘের ভাষা থাকবে না—এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের নতুন সামাজিক চুক্তি, যেখানে মব নয়, মানুষ জিতবে; অপমান নয়, মর্যাদা জিতবে; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার জিতবে; আর ভয় নয়, সংলাপই হবে সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
আপনার ফিচার নিবন্ধের জন্য নিচের অংশটি যুক্ত করা যেতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় পরিষ্কার রাখা হয়েছে—এই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি নিজে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক (legally binding) নয়, তবে এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, নৈতিক এবং নীতিগত (political, moral and normative) অঙ্গীকার। বাংলাদেশের মতো একটি সহ-উদ্যোক্তা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এর নৈতিক ও নীতিগত গুরুত্ব আরও বেশি। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অধিকারপত্র-এর দৃষ্টিতে, A/79/L.111 কেবল একটি জাতিসংঘের রেজোলিউশন নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর জন্য শান্তি, শিক্ষা ও মানবিক রাষ্ট্রগঠনের একটি নীতিগত রূপরেখা। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
একটি সত্যিকারের শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন পরিবারে সম্মান, বিদ্যালয়ে সহনশীলতা, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীলতা, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার এবং নাগরিক জীবনে সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ যখন শিক্ষা সংস্কার, সামাজিক সম্প্রীতি এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ অনুসন্ধান করছে, তখন এই প্রস্তাব আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়— আমরা কি শুধু সংঘাত এড়াতে চাই, নাকি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে শান্তি নিজেই একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাস, একটি শিক্ষাগত লক্ষ্য এবং একটি জাতীয় চরিত্রে পরিণত হবে?
–লেখক ও গবেষক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র, (odhikarpatranews@gmail.com
#শান্তির_সংস্কৃতি #CultureOfPeace #জাতিসংঘ #বাংলাদেশ #মব_কালচার #আইনের_শাসন #মানবাধিকার #বাকস্বাধীনতা #সংবিধান #গণতন্ত্র #সামাজিক_সম্প্রীতি #শান্তি #UNGA #Bangladesh #Odhikarpatra