08/12/2026 দশ বছরের পাঠশেষে ৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যর্থতার সনদ: এসএসসি ফল কার সাফল্য, কার দায়? │অধিকারপত্র এসএসসি ফলাফল প্রতিক্রিয়া-০৬
Dr Mahbub
১২ August ২০২৬ ০২:৩০
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জাতীয় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ; অনুত্তীর্ণতার হার ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সঙ্গে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৯৮৪টি থেকে কমে ৬৬৯টিতে এবং শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান ১৩৪টি থেকে বেড়ে ৩১২টিতে দাঁড়িয়েছে। একই রাষ্ট্র, একই জাতীয় শিক্ষাক্রম, একই পাঠ্যপুস্তক ও একই পরীক্ষার আড়ালে সাফল্য–ব্যর্থতার এমন বিপরীত মানচিত্র তৈরি হলো কেন? ‘অধিকারপত্র এসএসসি ফলাফল প্রতিক্রিয়া–০৬’-এর এই অনুসন্ধানী ফিচারে এসএসসি ফলকে শুধু শিক্ষার্থীর মেধা ও পরিশ্রমের বিচার হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের দশ বছরের শিক্ষা-সরবরাহ, শিক্ষকপ্রাপ্যতা, অর্থায়ন, অবকাঠামো, মাননিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত ফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনায় এসেছে Cohort Expenditure and Learning Return Audit, শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত ও অসম বিনিয়োগ, শহর–গ্রাম ব্যবধান, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার সংকট, ছেলেদের পিছিয়ে পড়া, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং শিক্ষার সাংবিধানিক ও মানবাধিকারভিত্তিক দায়। নিবন্ধটি SSC Equity and Accountability Report 2026, প্রয়োজনভিত্তিক বিদ্যালয় অর্থায়ন, অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যের শেখার পুনরুদ্ধার, শিক্ষকশূন্য পদ পূরণ, উন্মুক্ত ব্যয় ড্যাশবোর্ড এবং স্বাধীন শিক্ষা ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার রূপরেখা দিয়েছে। মূল প্রশ্ন—শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশিত হলে তাকে দশ বছর শেখানোর দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রের ফলপত্র প্রকাশিত হবে না
রাজধানীর একটি নামী বিদ্যালয়ের ফটকে রঙিন বেলুন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মুখে হাসি; কেউ ফুল হাতে, কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছে। বিদ্যালয়ের ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা—“শতভাগ সাফল্য”। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে করতালির ঢেউ উঠছে। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাও সেখানেই বেশি ব্যস্ত।
ঠিক একই সময়ে দূরের কোনো চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড় কিংবা সীমান্তবর্তী গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে নেমেছে শোকের নীরবতা। জরাজীর্ণ দালানের বারান্দায় কয়েকজন শিক্ষার্থী মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো সাংবাদিক সেখানে পৌঁছাননি। বিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ফলাফলপত্রের ঘরে গোল শূন্য—শূন্য শতাংশ পাস।
একই জাতীয় শিক্ষাক্রম, একই পাঠ্যপুস্তক, একই রাষ্ট্র, একই নাগরিকত্ব এবং একই পরীক্ষার নামে এই দুই বিপরীত ফলাফল কীভাবে সম্ভব?
এটি কি কেবল শিক্ষার্থীর মেধা ও পরিশ্রমের পার্থক্য? নাকি একদিকে দশ বছর ধরে সুযোগ, শিক্ষক, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও পারিবারিক সহায়তার সুশীতল ছায়া; অন্যদিকে শিক্ষকসংকট, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অনুপস্থিতি, ডিজিটাল বঞ্চনা এবং অবহেলার দীর্ঘ খরা?
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল তাই শুধু আনন্দের সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে রাখা একটি বিশাল আয়না। সেই আয়নায় কিছু বিদ্যালয়ের ঝলমলে মুখ যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অসমতা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং কয়েক লাখ কিশোর-কিশোরীর ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। জাতীয় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ অনুত্তীর্ণের হার ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ—প্রায় প্রতি পাঁচ পরীক্ষার্থীর মধ্যে দুজন।
গত বছরের পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এক বছরে তা কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন; আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারীর সংখ্যাও কমেছে।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে। পরীক্ষার্থী পাঠানো ৩০ হাজার ৪০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে:একই সকালে বাংলাদেশের দুই প্রান্তে দুটি বিপরীত দৃশ্য।
রাজধানীর একটি নামী বিদ্যালয়ের ফটকে রঙিন বেলুন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মুখে হাসি; কেউ ফুল হাতে, কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছে। বিদ্যালয়ের ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা—“শতভাগ সাফল্য”। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে করতালির ঢেউ উঠছে। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাও সেখানেই বেশি ব্যস্ত।
ঠিক একই সময়ে দূরের কোনো চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড় কিংবা সীমান্তবর্তী গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে নেমেছে শোকের নীরবতা। জরাজীর্ণ দালানের বারান্দায় কয়েকজন শিক্ষার্থী মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো সাংবাদিক সেখানে পৌঁছাননি। বিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ফলাফলপত্রের ঘরে গোল শূন্য—শূন্য শতাংশ পাস।
একই জাতীয় শিক্ষাক্রম, একই পাঠ্যপুস্তক, একই রাষ্ট্র, একই নাগরিকত্ব এবং একই পরীক্ষার নামে এই দুই বিপরীত ফলাফল কীভাবে সম্ভব?
এটি কি কেবল শিক্ষার্থীর মেধা ও পরিশ্রমের পার্থক্য? নাকি একদিকে দশ বছর ধরে সুযোগ, শিক্ষক, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও পারিবারিক সহায়তার সুশীতল ছায়া; অন্যদিকে শিক্ষকসংকট, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অনুপস্থিতি, ডিজিটাল বঞ্চনা এবং অবহেলার দীর্ঘ খরা?
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল তাই শুধু আনন্দের সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে রাখা একটি বিশাল আয়না। সেই আয়নায় কিছু বিদ্যালয়ের ঝলমলে মুখ যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অসমতা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং কয়েক লাখ কিশোর-কিশোরীর ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। জাতীয় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ অনুত্তীর্ণের হার ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ—প্রায় প্রতি পাঁচ পরীক্ষার্থীর মধ্যে দুজন। গত বছরের পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এক বছরে তা কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন; আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারীর সংখ্যাও কমেছে। আরও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে। পরীক্ষার্থী পাঠানো ৩০ হাজার ৪০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে:
|
সূচক |
২০২৬ |
২০২৫ |
পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
|
শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান |
৬৬৯ |
৯৮৪ |
কমেছে ৩১৫টি |
|
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান |
৩১২ |
১৩৪ |
বেড়েছে ১৭৮টি |
|
জিপিএ–৫ |
১,১৬,৬৭৬ |
১,৩৯,০৩২ |
কমেছে ২২,৩৫৬ |
|
সামগ্রিক পাসের হার |
৬২.২৫% |
৬৮.৪৫% |
কমেছে ৬.২০ শতাংশীয় পয়েন্ট |
শূন্য পাস করা ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান। এক বছরে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৩৩ শতাংশ বেড়েছে।
এগুলো নিছক সংখ্যা নয়। ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮টি আলাদা জীবন, পরিবার ও স্বপ্নের হিসাব। কারও বই কেনা হয়েছে মায়ের হাঁস বিক্রি করে; কারও পরীক্ষার ফি এসেছে বাবার দিনমজুরির টাকা থেকে; কেউ রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ ছাড়াই পড়েছে; কেউ সংসারের কাজ, কৃষিশ্রম বা ছোট ভাইবোন দেখাশোনার পর বিদ্যালয়ে গেছে। ফলাফল প্রকাশের পর আমরা তাদের প্রত্যেকের কপালে একই শব্দ লিখে দিই—“ফেল”। কিন্তু যে ব্যবস্থাটি তাদের দশ বছর ধরে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে ছিল, তার ফলাফলপত্র কোথায়?
একটি শিশুকে যদি দশ বছর ধরে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং দশ বছর শেষে দেখা যায়, প্রতি পাঁচজনের প্রায় দুজন প্রয়োজনীয় সুস্থতা অর্জন করেনি, তাহলে শুধু রোগীকে দোষ দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন উঠবে চিকিৎসা, চিকিৎসক, ওষুধ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে।
এসএসসিও অনেকটা শিক্ষাব্যবস্থার এমন একটি স্বাস্থ্যপরীক্ষা। শিক্ষার্থী এখানে শুধু পরীক্ষার্থী নয়; সে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা-পরিকল্পনা, শিক্ষকব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত ফল।
তবে একটি সতর্কতা জরুরি: এসএসসিতে অনুত্তীর্ণ হওয়া মানেই কোনো শিক্ষার্থী দশ বছরে কিছুই শেখেনি—এ কথা সত্য নয়। একইভাবে তার পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা “অপচয়” বলে ঘোষণা করাও অর্থনৈতিকভাবে যথার্থ হবে না। সে সাক্ষরতা, গণিত, সামাজিকতা, জীবনদক্ষতা কিংবা নাগরিক জ্ঞান অর্জন করে থাকতে পারে। কিন্তু ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরীক্ষার্থীর মাধ্যমিক সনদ অর্জন করতে না পারা স্পষ্টতই একটি বিশাল ব্যবস্থাগত অদক্ষতা ও অসম্পূর্ণ রিটার্ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুনরায় পরীক্ষা, কোচিং, পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়, উচ্চমাধ্যমিকে প্রবেশের বিলম্ব, ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষতি। অতএব এটি শুধু পরীক্ষার ব্যর্থতা নয়; একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সূচনা।
এই প্রশ্নের সৎ উত্তর হচ্ছে: বর্তমানে প্রকাশিত এসএসসি ফলের সামগ্রিক উপাত্ত দিয়ে নির্ভুল অঙ্ক নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ এর জন্য অন্তত জানতে হবে:
এই হিসাব ছাড়া “৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ × একটি অনুমাননির্ভর ব্যয়” করে কোনো বিশাল অঙ্ক ঘোষণা করা সাংবাদিকতাসুলভ চমক হতে পারে, কিন্তু তা নির্ভরযোগ্য শিক্ষা-অর্থনীতি হবে না। তাই প্রয়োজন একটি Cohort Expenditure and Learning Return Audit—এই পরীক্ষার্থীদের প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত অনুসরণ করে সরকারি ও পারিবারিক ব্যয়, শেখার অর্জন, পুনরাবৃত্তি, ঝরে পড়া এবং ফলাফলের সম্পর্ক নির্ণয়।
তবে বড় বাস্তবতাটি ইতিমধ্যেই পরিষ্কার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে সমস্যা শুধু বরাদ্দের ব্যবহারে নয়; মোট বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় কম। আবার সেই সীমিত বরাদ্দের বণ্টন যদি দরিদ্র, প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী না হয়, তাহলে বৈষম্য দ্বিগুণ হয়—প্রথমে সম্পদের ঘাটতি, পরে বণ্টনের অন্যায়।
শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সেচব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। রাষ্ট্রের বাজেট হলো মূল নদী, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো প্রধান খাল, আর বিদ্যালয়গুলো ছোট ছোট শাখা খাল। শহরের প্রভাবশালী বিদ্যালয়ের দিকে খালটি প্রশস্ত। সেখানে ভালো ভবন, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ডিজিটাল উপকরণ, কোচিং, শিক্ষিত অভিভাবক এবং সামাজিক যোগাযোগের পানি নিয়মিত পৌঁছে যায়। আর প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়ের দিকে যেতে যেতে খাল সরু হয়ে যায়। কোনো বিষয়ে শিক্ষক নেই; গণিত পড়ান অন্য বিষয়ের শিক্ষক; বিজ্ঞানাগার তালাবদ্ধ বা অস্তিত্বহীন; গ্রন্থাগার মানে কয়েকটি পুরোনো বইয়ের আলমারি; ইন্টারনেট দুর্বল; শিক্ষার্থীর বাড়িতে পড়ার আলাদা জায়গা নেই। তারপর ফসল কাটার দিনে দুই জমির ধান একই দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে বলা হয়—একটি জমি মেধাবী, অন্যটি ব্যর্থ। বীজকে দোষ দেওয়ার আগে কি আমরা জমিতে সমান পানি পৌঁছেছিল কি না, তা পরীক্ষা করেছি?
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এটি কেবল বিষয়ভিত্তিক মেধার পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করলে বড় ভুল হবে। বাংলাদেশের অনেক বিদ্যালয়ে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগে পাঠানো হয়। শিক্ষক, ল্যাব, কোচিং ও পারিবারিক বিনিয়োগও তাদের দিকে তুলনামূলক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়। বিপরীতে অনেক দুর্বল, দরিদ্র বা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীকে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তাহলে বিভাগভিত্তিক ফলাফলও আসলে পূর্ববর্তী সুযোগ-বণ্টনের প্রতিচ্ছবি। আমরা আগে শিক্ষার্থীদের অসমভাবে বাছাই করি, পরে সেই বাছাইয়ের ফলকে “যোগ্যতার স্বাভাবিক পার্থক্য” হিসেবে উপস্থাপন করি।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও বড় ব্যবধান রয়েছে। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ; ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ এবং চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। শুধু সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বোর্ডের মধ্যেই ব্যবধান ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এই ব্যবধান আমাদের কিছু জরুরি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়:
এই তথ্যগুলো ফলাফলের পাশে প্রকাশ না করে শুধু পাসের হার প্রকাশ করলে রোগীর জ্বরের মাত্রা জানা যায়, কিন্তু রোগের কারণ জানা যায় না।
২০২৬ সালে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন—পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ ছাত্রীর মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন পাস করেছে—হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। জিপিএ–৫ পেয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৬ ছাত্রী ও ৫২ হাজার ৭৮০ ছাত্র।
এটি মেয়েদের অগ্রগতির ইতিবাচক প্রমাণ। একই সঙ্গে ছেলেদের ক্রমবর্ধমান শিক্ষাবিচ্ছিন্নতার সতর্কবার্তা। দারিদ্র্যের কারণে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, ডিজিটাল আসক্তি, বিদ্যালয়ের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কিংবা শিক্ষাদানের ধরন—কোন কারণগুলো ছেলেদের পিছিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে আলাদা জাতীয় গবেষণা দরকার। তবে মেয়েদের ফল ভালো হওয়াকে তাদের সব সমস্যা সমাধানের প্রমাণ মনে করা যাবে না। ফলের পরই অনেক মেয়ের সামনে বাল্যবিবাহ, যাতায়াতের নিরাপত্তা এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ব্যয় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যে বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি, সেখানে প্রথমেই শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া বা শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত করাই সমাধান নয়। কারণ একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী মাত্র দুজন বা তিনজনও হতে পারে। কোথাও শিক্ষকসংকট, চরাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা, দুর্যোগ কিংবা দীর্ঘ অনুপস্থিতির মতো বাস্তবতা থাকতে পারে। তবু শূন্য পাস কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ৩০ দিনের মধ্যে স্বাধীন একাডেমিক নিরীক্ষা হওয়া দরকার। দেখতে হবে:
একই সঙ্গে শতভাগ পাস করা ৬৬৯ প্রতিষ্ঠানের ফলও বিশ্লেষণ করা দরকার। তাদের সাফল্য কি সত্যিকারের মানসম্পন্ন শিক্ষা, নাকি বাছাই করে শিক্ষার্থী ভর্তি, দুর্বল পরীক্ষার্থীকে ফরম পূরণে নিরুৎসাহিত করা এবং ব্যাপক কোচিংনির্ভরতার ফল—সেটিও যাচাই প্রয়োজন।
শিক্ষা নিছক সরকারি অনুগ্রহ নয়; এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৩ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক মানুষের শিক্ষার অধিকার স্বীকার করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাকে সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে আইনগত একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৭ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত; এটি সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকার নয়। ফলে কোনো শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণ হওয়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদালতে প্রমাণযোগ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় না।
কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো অঞ্চল, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, দারিদ্র্য বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছে; অনুমোদিত অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে; শিক্ষক নিয়োগ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে; অথবা কর্তৃপক্ষ জেনেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি—তাহলে প্রশাসনিক, আর্থিক, সাংবিধানিক ও মানবাধিকারভিত্তিক দায় অবশ্যই উঠতে পারে।
অতএব আবেগের ভাষায় “ট্রাইব্যুনাল” বলার আগে একটি কার্যকর কাঠামো নির্মাণ করা জরুরি। দেশে এখন কোনো স্বতন্ত্র শিক্ষা-অধিকার ট্রাইব্যুনাল নেই। তবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে:
শাস্তিই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হবে সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতি পুনরুদ্ধার, পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ এবং প্রতিটি শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। দোষী কে—শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাকি রাষ্ট্র?: —এই ব্যর্থতার দায় এক ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানো যাবে না; দায়ের স্তর আলাদা করতে হবে।
কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়ের মাত্রাও বাড়ে। যে শিক্ষার্থীর হাতে বাজেট, শিক্ষক নিয়োগ বা পাঠ্যক্রম নির্ধারণের ক্ষমতা নেই, তাকে সবচেয়ে বড় আসামি বানানো ন্যায়সংগত নয়।
ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানপর্ব—এই ভূখণ্ডের মানুষ শিক্ষা, ভাষা, প্রতিনিধিত্ব ও সম্পদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অধিকার; মুক্তিযুদ্ধের পেছনে ছিল বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। পরবর্তী বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনেও শিক্ষার শ্রেণিগত ও বৈষম্যমূলক চরিত্রের প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থা ও ন্যায়সঙ্গত সুযোগের প্রশ্নে; তাকে কেবল শিক্ষা অর্থায়নের আন্দোলন বলা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। তবে এসব আন্দোলনের ভেতরের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ছিল—বৈষম্যহীন মর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত সুযোগ।
তাই স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি একটি শিশুর শিক্ষার গুণমান তার জন্মস্থান, পিতার আয় অথবা কোন বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে তার ওপর নির্ভর করে, তবে স্বাধীনতার সাম্যের প্রতিশ্রুতি এখনো অসম্পূর্ণ।
সন্ধ্যা হলে রাজধানীর বিদ্যালয়ের রঙিন বেলুনগুলো একসময় চুপসে যাবে। সংবাদপত্রে নতুন খবর আসবে। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু দূরের সেই শূন্য পাস বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে থাকা কিশোরটি হয়তো আর কোনো দিন শ্রেণিকক্ষে ফিরবে না। কেউ শ্রমবাজারে হারিয়ে যাবে, কেউ বাল্যবিবাহের শিকার হবে, কেউ আজীবন নিজের নামের পাশে “ফেল” শব্দটি বহন করবে। অথচ সেই শব্দটি একা তার নয়। তার ফলাফলপত্রের অদৃশ্য অংশে আরও কয়েকটি নাম লেখা থাকা উচিত—বিদ্যালয়, শিক্ষা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়, বাজেটব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র।
এসএসসি যদি একজন শিক্ষার্থীর দশ বছরের পড়াশোনার ফল হয়, তবে তা রাষ্ট্রের দশ বছরের শিক্ষা প্রদানের ফলও। শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়ার আগে তাই রাষ্ট্রকেও নিজের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। প্রশ্নটি আর শুধু—“কতজন পাস করল?”—নয়। প্রশ্ন হলো: একই দেশের কিছু শিশুকে শতভাগ আলো এবং অন্যদের শূন্যের অন্ধকার দেওয়ার দায় কে নেবে? আর কত প্রজন্মকে ব্যর্থতার সনদ দেওয়ার পর শিক্ষাব্যবস্থা নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করবে?
ফল প্রকাশের দিন আমরা সাধারণত তিনটি সংখ্যা খুঁজি—পাসের হার, জিপিএ–৫ এবং কোন শিক্ষা বোর্ড এগিয়ে। তারপর সফল শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানাই, পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিই এবং অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর নামের পাশে একটি কঠোর শব্দ বসিয়ে দিই—“ফেল”। কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদচক্র বদলে যায়। কিন্তু যে শিশুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তার জীবনে সেই শব্দটি বহুদিন থেকে যায়—কখনো আত্মবিশ্বাসের ক্ষত হয়ে, কখনো শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতার দরজা হয়ে, কখনো পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা হয়ে।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আমাদের এই পরিচিত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার দাবি জানায়। প্রায় প্রতি পাঁচ পরীক্ষার্থীর দুজন নির্ধারিত উত্তীর্ণতার মান অর্জন করতে না পারলে ঘটনাটিকে শুধু ব্যক্তিগত অমনোযোগ বা কম পরিশ্রমের সমষ্টি হিসেবে দেখা যায় না। এত বড় একটি অনুপাত ব্যবস্থাগত অনুসন্ধানের দাবি তোলে। কোথায় ইনপুট অপর্যাপ্ত ছিল, কোথায় পাঠদান দুর্বল হয়েছে, কোন বিষয়ে শিক্ষক ছিল না, কখন শেখার ঘাটতি শনাক্ত হয়েছিল এবং শনাক্ত হওয়ার পর কী প্রতিকার দেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ফলাফলের বিচার অসম্পূর্ণ।
এসএসসি কোনো মানুষের সামগ্রিক মেধা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার চূড়ান্ত পরিমাপ নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন কাঠামোর অধীনে অর্জিত ফল। তাই অনুত্তীর্ণ হওয়া মানে একজন শিক্ষার্থী দশ বছরে কিছুই শেখেনি—এমন নয়; একইভাবে পাস করলেই সে প্রত্যাশিত সব দক্ষতা অর্জন করেছে, সেটিও নিশ্চিত নয়। এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার না করলে আমরা নম্বরকে শিক্ষা এবং সনদকে সক্ষমতার সমার্থক বানিয়ে ফেলব।
তবে পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রের দায় কমায় না। বরং রাষ্ট্র যখন একই পরীক্ষা দিয়ে সবার অর্জন পরিমাপ করে, তখন তাকে প্রমাণ করতে হবে—সফল হওয়ার জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুযোগ পেয়েছিল। একই বই বিতরণ এবং একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়াই সমতা নয়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, কার্যকর শিক্ষাঘণ্টা, নিরাপদ বিদ্যালয়, প্রযুক্তি, বিজ্ঞানাগার, প্রতিকারমূলক শিক্ষা এবং মানসিক সহায়তা যদি সমভাবে না পৌঁছায়, তবে একই পরীক্ষা অসম পথ পাড়ি দেওয়া শিশুদের কেবল একই সমাপ্তিরেখায় দাঁড় করায়; ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে না।
৬৬৯টি শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান এবং ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান তাই দুটি বিচ্ছিন্ন প্রান্ত নয়; তারা একই শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে সুযোগ বণ্টনের দুটি সম্ভাব্য প্রতিচ্ছবি। তবে এই সম্পর্ক অনুমানের ভিত্তিতে স্থির করা যাবে না। সফল প্রতিষ্ঠানগুলো কোন অঞ্চলে, তাদের ভর্তি কতটা নির্বাচনী, পরিবারগুলোর ব্যয় কত এবং দুর্বল পরীক্ষার্থীরা ফরম পূরণের সুযোগ পেয়েছে কি না—তা যেমন পরীক্ষা করতে হবে, তেমনি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষকশূন্য পদ, দারিদ্র্য, দুর্গমতা, উপস্থিতি ও পরিদর্শনের ইতিহাসও বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্য ছাড়া প্রশংসা যেমন অন্ধ হতে পারে, তেমনি শাস্তিও অন্যায্য হতে পারে।
এই ফলাফল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নিয়েও কঠিন প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষায় ব্যয় করা অর্থের পুরোটাই পাসের হারের ভিত্তিতে লাভ বা লোকসান হিসেবে গণনা করা যায় না। শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হলেও সে বিভিন্ন মাত্রার সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, জীবনদক্ষতা ও সামাজিক সক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারে। কিন্তু মাধ্যমিক সনদ অর্জনের প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো, পুনঃপরীক্ষা, শ্রেণি পুনরাবৃত্তি, ঝরে পড়া এবং ভবিষ্যৎ আয়হানির ঝুঁকি অবশ্যই অসম্পূর্ণ রিটার্নের নির্দেশক। কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং তার বিপরীতে কতটা শেখা অর্জিত হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর অনুমান নয়, কোহর্টভিত্তিক স্বাধীন নিরীক্ষা থেকে আসতে হবে।
মানবাধিকারের প্রশ্নটিও একইভাবে সংযত কিন্তু দৃঢ়ভাবে দেখতে হবে। কোনো পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়া নিজে থেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ নয়। কিন্তু কোনো শিশু যদি জন্মস্থান, দারিদ্র্য, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা বা শিক্ষাধারার কারণে নিয়মিতভাবে নিম্নমানের শিক্ষক, কম অর্থায়ন এবং দুর্বল অবকাঠামোর মধ্যে আটকে থাকে; কর্তৃপক্ষ যদি ঘাটতি জেনেও প্রতিকার না দেয়; কিংবা অনুমোদিত সম্পদ অপব্যবহারের কারণে তার শেখার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়—তখন প্রশাসনিক, আর্থিক, সাংবিধানিক ও মানবাধিকারভিত্তিক দায়ের প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দায় নির্ধারণের সময় ক্ষমতার ক্রমও মনে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষা বাজেট, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম, বিদ্যালয় পরিদর্শন কিংবা পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। তাই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিটিকেই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় আসামি বানানো ন্যায়সংগত নয়। বিদ্যালয় ও শিক্ষককে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে; কিন্তু তাদের কর্মপরিবেশ, শিক্ষকসংখ্যা, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহায়তাও একই সঙ্গে বিচার করতে হবে। ক্ষমতার সঙ্গে দায়ের মাত্রাও বাড়ে।
বর্তমান সরকার এই পরীক্ষার্থী-কোহর্টের দশ বছরের সব নীতি নির্ধারণ করেনি—এটি সত্য। তারা একাধিক সরকার, প্রশাসন, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন এবং কোভিডকালীন শিক্ষাবিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রয়েছে। ঐতিহাসিক ব্যর্থতা বর্তমান বাস্তবতার ব্যাখ্যা হতে পারে; বর্তমান নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। এখনকার নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ঘাটতি শনাক্ত করে দৃশ্যমান ও সময়সীমাবদ্ধ প্রতিকার দেওয়া।
এই ফিচারের উদ্দেশ্য সফল শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠানকে ছোট করা নয়। তাদের অর্জন উদ্যাপনের যোগ্য। উদ্দেশ্য হলো উদ্যাপনের আলোয় যেন অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর জীবন, পরিবারের ত্যাগ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অপূর্ণতা অদৃশ্য না হয়ে যায়। একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মান শুধু শীর্ষে ওঠা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে নয়; সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা শিশুকে সে কতটা সহায়তা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারে, তা দিয়েও নির্ধারিত হয়।
সুতরাং ২০২৬ সালের ফলাফলকে সমাপ্তি নয়, রাষ্ট্রীয় আত্মপর্যালোচনার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে ব্যর্থতার স্থায়ী পরিচয় না দিয়ে জানতে হবে—তার শেখার ঘাটতি কোথায়, কী সহায়তা প্রয়োজন এবং কীভাবে তাকে আবার শিক্ষা বা দক্ষতা অর্জনের পথে ফেরানো যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাসের হারের পাশে শিক্ষক, ব্যয়, অবকাঠামো, উপস্থিতি ও সহায়তার তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
সন্ধ্যায় শতভাগ পাস বিদ্যালয়ের রঙিন বেলুন চুপসে যেতে পারে; কিন্তু শূন্য পাস বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে থাকা শিশুটির ভবিষ্যৎ যেন চুপসে না যায়। তাকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য। কারণ এসএসসি যদি শিক্ষার্থীর দশ বছরের পড়াশোনার ফল হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের দশ বছরের শিক্ষা প্রদানের ফলও।
শিক্ষার্থীর ফলপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এখন একই আয়নায় রাষ্ট্রও নিজের নম্বর দেখুক—কতটা শেখাতে পেরেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং পিছিয়ে পড়া প্রতিটি শিশুকে ফিরিয়ে আনতে ঠিক কী করবে।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে যে গভীর সংকটের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় কেবল একটি তদন্ত কমিটি গঠন, কয়েকটি শোকবার্তা প্রকাশ, উদ্বেগ জানানো কিংবা ভবিষ্যতে সংস্কারের সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া যথেষ্ট নয়। কারণ প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণতা কোনো বিচ্ছিন্ন পরীক্ষাগত দুর্ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দশ বছরের শিক্ষাযাত্রা, রাষ্ট্র ও পরিবারের বিপুল বিনিয়োগ, শিক্ষকপ্রাপ্যতার বৈষম্য, শ্রেণিকক্ষের কার্যকারিতা, শেখার ঘাটতি, ঝরে পড়ার আশঙ্কা এবং অসংখ্য কিশোর-কিশোরীর ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ। এত বড় একটি জাতীয় সংকটকে তাই আবেগের তাৎক্ষণিক উত্তাপে নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, প্রয়োজনীয় বাজেট, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং প্রকাশ্য জবাবদিহিসহ একটি সমন্বিত জাতীয় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন: ফল প্রকাশের পর অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে পরিসংখ্যানের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে একটি জীবন, একটি পরিবার, একটি অসম্পূর্ণ শিক্ষাযাত্রা এবং পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে—রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনায় সেই মানবিক সত্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অর্থাৎ কাজটি শুধু ব্যর্থতার হিসাব তৈরির নয়; বরং দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত করা, শেখার ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা সংশোধন করা এবং ভবিষ্যৎ ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
ফল প্রকাশের পর প্রথম ৩০ দিন হবে সংকটের মানচিত্র তৈরির সময়। এই সময়ের মধ্যেই শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠান এবং ৩০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে—এমন সব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তবে কেবল বিদ্যালয়ের নাম ও পাসের হার প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীসংখ্যা, নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর অনুপাত, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষকশূন্য পদ, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, গত পাঁচ বছরের ফলাফলের প্রবণতা এবং সর্বশেষ বিদ্যালয় পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য একত্রে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে, কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ফল হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, প্রশাসনিক অবহেলা ও শেখার ঘাটতির ধারাবাহিক পরিণতি।
একই বিদ্যালয়ে যদি বছরের পর বছর গণিত বা ইংরেজির শিক্ষক না থাকেন, বিজ্ঞানাগার কাগজে থাকলেও বাস্তবে অকার্যকর থাকে, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যায় এবং পরিদর্শনের পরও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পৌঁছায়, তবে চূড়ান্ত ফলাফলের দায় শুধু পরীক্ষার্থীর ওপর চাপানো অন্যায়। প্রকাশিত তথ্যের উদ্দেশ্য তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে অপমান করা বা জনসমক্ষে ব্যর্থতার দেয়ালে তার নাম লিখে দেওয়া নয়; বরং সমস্যার শিকড় শনাক্ত করে প্রয়োজনের ভিত্তিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিটি অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতিও বিষয়ভিত্তিকভাবে নির্ণয় করতে হবে। কে শুধু একটি বিষয়ে সামান্য ব্যবধানে উত্তীর্ণ হতে পারেনি, কার মৌলিক পাঠদক্ষতা বা সংখ্যাজ্ঞানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে, কার পুনঃপরীক্ষার প্রস্তুতি প্রয়োজন, কে গভীর হতাশা বা মানসিক চাপে আছে এবং কার পরিবার পরীক্ষার ফি, যাতায়াত কিংবা শিক্ষাসামগ্রীর ব্যয় বহন করতে পারছে না—এসব তথ্য বিদ্যালয় পর্যায়ে সংবেদনশীলতার সঙ্গে সংগ্রহ করতে হবে। এর ভিত্তিতে একটি গোপনীয় শিক্ষার্থী-সহায়তা তালিকা তৈরি করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ্য র্যাঙ্কিং, সামাজিক অপমান কিংবা বৈষম্যের উপকরণে পরিণত করা যাবে না। শিশুকে চিহ্নিত করতে হবে সহায়তা দেওয়ার জন্য, দাগিয়ে দেওয়ার জন্য নয়।
প্রথম তিন মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন ও বহুবিষয়ক গবেষকদলের মাধ্যমে SSC Equity and Accountability Report 2026 প্রকাশ করা প্রয়োজন। এই প্রতিবেদনের কাজ শুধু কোন বোর্ডে কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, তার পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং জেলা, উপজেলা, অঞ্চল, শিক্ষাধারা, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, দারিদ্র্য, শিক্ষকপ্রাপ্যতা, শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় এবং বিষয়ভিত্তিক ফলাফলের মধ্যকার সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে হবে। কোথায় সুযোগ কম ছিল, কোথায় সম্পদের বণ্টন বৈষম্যমূলক ছিল, কোন অঞ্চলে শিক্ষকসংকট ফলাফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে এবং কোন সামাজিক গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা ব্যবস্থাগতভাবে পিছিয়ে পড়েছে—প্রতিবেদনটিকে এসব প্রশ্নের প্রমাণভিত্তিক উত্তর দিতে হবে।
গবেষণায় শুধু শূন্য বা স্বল্প পাস করা প্রতিষ্ঠান রাখলে ব্যর্থতার ছবি পাওয়া যাবে, কিন্তু সফলতার কার্যকর কারণগুলো বোঝা যাবে না। তাই শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই বিশ্লেষণের আওতায় আনতে হবে। তাদের সাফল্য কি যোগ্য শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান, কার্যকর প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শক্তিশালী বিদ্যালয়–পরিবার যোগাযোগ ও সময়মতো শেখার সহায়তার ফল, নাকি শিক্ষার্থী বাছাই, কোচিংনির্ভরতা অথবা পরীক্ষার্থী বাদ দেওয়ার মতো কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত—সেটিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। সফলতা ও ব্যর্থতা পাশাপাশি রেখে বিচার করলেই বোঝা যাবে, কোন অনুশীলন অনুসরণযোগ্য এবং কোন কাঠামোগত বৈষম্য সংস্কারের দাবি রাখে।
এই জাতীয় প্রতিবেদনের সঙ্গে একটি উন্মুক্ত SSC Equity Map বা এসএসসি শিক্ষা-সাম্য মানচিত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। একটি ডিজিটাল মানচিত্রে নাগরিকেরা দেখতে পারবেন—কোন উপজেলা বা অঞ্চলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট সবচেয়ে তীব্র, কোথায় শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম, কোথায় অনুত্তীর্ণতা ধারাবাহিক এবং কোথায় ঝরে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এমন মানচিত্র কেবল তথ্য প্রদর্শনের প্রযুক্তিগত আয়োজন হবে না; এটি হবে বরাদ্দ, শিক্ষক পদায়ন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে প্রয়োজনের দিকে পরিচালিত করার নীতিগত কম্পাস।
২০২৬ সালের পরীক্ষার্থী-কোহর্টের পেছনে রাষ্ট্র ও পরিবার কত অর্থ ব্যয় করেছে এবং সেই বিনিয়োগ কী ধরনের শিক্ষাগত ফল দিয়েছে—তার নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে ছয় মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন Cohort Expenditure and Learning Return Audit শুরু করা প্রয়োজন। এই নিরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের প্রথম শ্রেণিতে প্রবেশ থেকে এসএসসি পর্যন্ত দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রাকে একটি ধারাবাহিক কোহর্ট হিসেবে অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ব্যয়, পারিবারিক ব্যয়, বিদ্যালয়ের ধরন, উপস্থিতি, শ্রেণি পুনরাবৃত্তি, শেখার অর্জন, পুনঃপরীক্ষা, পরবর্তী শিক্ষায় প্রবেশ এবং ঝরে পড়ার মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ না করলে শিক্ষাবিনিয়োগের প্রকৃত কার্যকারিতা জানা সম্ভব নয়।
এখানে সতর্কতা জরুরি। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যয় করা অর্থের পুরোটিকে ‘লোকসান’ বলে ঘোষণা করা যেমন শিক্ষাবৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, তেমনি প্রত্যাশিত রিটার্ন অর্জিত না হওয়ার প্রশ্নটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও দায়িত্বহীনতা। একজন শিক্ষার্থী সনদ অর্জন করতে না পারলেও সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, সামাজিকতা ও জীবনদক্ষতার বিভিন্ন স্তর অর্জন করে থাকতে পারে। আবার একই শিক্ষার্থী শেখার পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে, পুনঃপরীক্ষায় ফিরতে না পারলে কিংবা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়লে বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। অতএব প্রাক্কলনকে রাজনৈতিক স্লোগান বা চূড়ান্ত লোকসানের অঙ্কে পরিণত না করে নিরীক্ষিত তথ্যের মাধ্যমে অর্জিত ও অনর্জিত শিক্ষাগত রিটার্ন আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
অডিটের ফল উপজেলা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক একটি উন্মুক্ত ব্যয় ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা উচিত। সেখানে নাগরিকেরা জানতে পারবেন, কোথায় কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, শিক্ষক ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের কতটা শ্রেণিকক্ষের শেখায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং কোন অঞ্চলে অধিক ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। তবে এই স্বচ্ছতার মধ্যেও শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়, স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধিতা, পারিবারিক অবস্থা ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য কঠোরভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। জবাবদিহির নামে কোনো শিশুর মর্যাদা বা গোপনীয়তা বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
অডিটের ফল আসা পর্যন্ত ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে অপেক্ষার ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। তাদের শেখার পুনরুদ্ধার অবিলম্বে শুরু করতে হবে। পরবর্তী পরীক্ষার আগপর্যন্ত বিদ্যালয়, উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডকে এই শিক্ষার্থীদের সক্রিয় সহায়তার আওতায় রাখতে হবে। ইংরেজি, গণিত, বাংলা ও বিজ্ঞানের মতো অধিক ব্যর্থতার বিষয়গুলোতে প্রয়োজনভিত্তিক পুনরুদ্ধারমূলক ক্লাস, সহজবোধ্য শিক্ষাসামগ্রী, অনুশীলন, মডেল টেস্ট, ব্যক্তিগত পরামর্শ, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং পুনঃপরীক্ষার প্রশাসনিক সহায়তা বিনা মূল্যে দিতে হবে।
একটি শিশুকে শুধু পুনঃপরীক্ষার তারিখ জানিয়ে দেওয়া মানে তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া নয়। দ্বিতীয় সুযোগ তখনই বাস্তব হয়, যখন প্রথমবার যে শেখার ঘাটতি, শিক্ষকসংকট, অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য বা মানসিক চাপ তাকে পিছিয়ে দিয়েছিল, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হয়। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার ফি, যাতায়াত, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল কনটেন্টের ব্যয় বহনে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। অন্যথায় পুনঃপরীক্ষার সুযোগ কাগজে সবার জন্য সমান থাকলেও বাস্তবে তা কেবল সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানদের নাগালে থাকবে।
পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ভাষাও হতে হবে মানবিক। শিক্ষার্থীকে ‘ফেল করা ব্যাচ’ হিসেবে চিহ্নিত না করে তাকে শেখার পথে সাময়িকভাবে পিছিয়ে পড়া একজন অধিকারধারী হিসেবে দেখতে হবে। তার আত্মমর্যাদা রক্ষা, পরিবারের ইতিবাচক অংশগ্রহণ এবং বিদ্যালয়ে অপমানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পুনঃশিক্ষণ কর্মসূচিও নতুন করে বর্জন ও হতাশা তৈরি করতে পারে।
শিক্ষার মান নিয়ে যত আলোচনা হোক, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকলে তার অধিকাংশই নীতিপত্রের অলংকার হয়ে থাকবে। তাই এক বছরের মধ্যে প্রতিটি মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাশাখার ন্যূনতম বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন শূন্য থাকা পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে এবং শিক্ষক পদায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, শিক্ষার্থীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশেষত চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল, দ্বীপ ও সীমান্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের ধরে রাখার জন্য পৃথক প্রণোদনা প্রয়োজন। নিরাপদ আবাসন, দুর্গমতা ভাতা, দ্রুততর পদোন্নতি, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ এবং নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন না থাকলে এসব অঞ্চলে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা দীর্ঘদিন থাকতে চাইবেন না। ফলে কাগজে পদ পূরণ হলেও শ্রেণিকক্ষ আবার শূন্য হয়ে পড়বে।
শিক্ষক নিয়োগকে সমাধানের শেষ ধাপ হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। নতুন ও কর্মরত শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক মেন্টরিং, সহকর্মী-শেখার নেটওয়ার্ক এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যাভিত্তিক একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। প্রশিক্ষণ যদি কয়েক দিনের বক্তৃতা ও সনদ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শিক্ষার্থীর শেখায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে না। শিক্ষককে শুধু জবাবদিহির লক্ষ্য নয়, পেশাগতভাবে সক্ষম করে তোলার মতো রাষ্ট্রীয় সহায়তাও দিতে হবে।
বর্তমান শিক্ষা অর্থায়নের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো—প্রায়ই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রয়োজনের পার্থক্য যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে আগে থেকেই পিছিয়ে থাকা একটি দুর্গম বিদ্যালয় এবং বহু সুযোগে সমৃদ্ধ একটি শহুরে বিদ্যালয় মাথাপিছু প্রায় সমান বরাদ্দ পেলেও তাদের শিক্ষার্থীরা সমান শিক্ষা-সুযোগ পায় না। সমতা মানে সবাইকে একই অঙ্ক দেওয়া নয়; ন্যায়সংগত অর্থায়ন মানে যার ঘাটতি ও প্রয়োজন বেশি, তাকে তুলনামূলকভাবে বেশি সহায়তা দেওয়া।
অতএব নতুন অর্থায়ন-সূত্রে দারিদ্র্য, দুর্গমতা, প্রতিবন্ধিতা, দুর্যোগঝুঁকি, শিক্ষকসংকট, ভাষাগত বা সামাজিক প্রান্তিকতা এবং বিদ্যমান শেখার ঘাটতির জন্য অতিরিক্ত ওজন যুক্ত করতে হবে। কোনো অঞ্চলে বন্যায় নিয়মিত বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক প্রযুক্তি প্রয়োজন হলে অথবা দীর্ঘদিন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকলে সেই বিদ্যালয়কে সাধারণ বরাদ্দের বাইরে পুনরুদ্ধার তহবিল দিতে হবে।
শিক্ষা খাতে সামগ্রিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি মধ্যমেয়াদি আইনগত ও আর্থিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। বাজেট কত শতাংশ বাড়ল—এই ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; অর্থ কোথায় গেল, কাদের কাছে পৌঁছাল, কোন কাজে ব্যবহৃত হলো এবং তার ফলে শেখার কী পরিবর্তন ঘটল—সেই তথ্যও নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। অর্থ বরাদ্দকে ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা মানে শুধু দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং যেখানে ঘাটতি বেশি, সেখানে দ্রুততর ও অধিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ আজও প্রায়ই বিদ্যালয়, শিক্ষা অফিস ও প্রশাসনিক দপ্তরের জটিল করিডরে ঘুরতে থাকে। কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বছরের পর বছর নেই, কোথাও অবৈধ ফি আদায় করা হয়, কোথাও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি বা পরীক্ষার যৌক্তিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, কোথাও অর্থ আত্মসাৎ অথবা দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অবহেলার অভিযোগ ওঠে—কিন্তু সহজ, স্বাধীন ও সময়সীমাবদ্ধ প্রতিকারব্যবস্থা পাওয়া যায় না। এই শূন্যতা পূরণে একটি স্বাধীন শিক্ষা ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
এই প্রতিষ্ঠানের কাছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও নাগরিকেরা বৈষম্য, ভর্তি-বঞ্চনা, শিক্ষকসংকট, অবৈধ অর্থ আদায়, প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক বৈষম্য, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং শিক্ষা-অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সহজে জানাতে পারবেন। শিক্ষা ন্যায়পালের অনুসন্ধান পরিচালনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার নথি তলব, প্রশাসনিক প্রতিকার নির্দেশ, মধ্যস্থতা এবং ব্যবস্থাগত সমস্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে। তবে এটি ফৌজদারি আদালত বা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প হবে না; বরং শিক্ষা-অধিকারসম্পর্কিত প্রশাসনিক অভিযোগের দ্রুত, স্বাধীন ও নাগরিকবান্ধব প্রতিকারমঞ্চ হিসেবে কাজ করবে।
ন্যায়পালের বার্ষিক প্রতিবেদনে শুধু অভিযোগের সংখ্যা নয়, কোন ধরনের সমস্যা সবচেয়ে বেশি ঘটছে, কোন সংস্থা প্রতিকারে বিলম্ব করছে এবং কোন নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন—তাও তুলে ধরতে হবে। এতে বিচ্ছিন্ন অভিযোগগুলো একত্র হয়ে ব্যবস্থাগত সংস্কারের প্রমাণভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করবে।
প্রতি বছর এসএসসি ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীর নম্বর, পাসের হার, জিপিএ–৫ এবং বোর্ডভিত্তিক অবস্থান প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রের নিজস্ব ফলপত্র প্রকাশিত হয় না। এই একমুখী মূল্যায়ন সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। এসএসসি ফলাফলের পাশাপাশি সরকারকে প্রতিবছর একটি National Education Delivery Report Card বা জাতীয় শিক্ষা-সরবরাহ ফলপত্র প্রকাশ করতে হবে।
এই রাষ্ট্রীয় ফলপত্রে শিক্ষকশূন্য পদের হার, শিক্ষার্থীপ্রতি প্রকৃত ব্যয়, কার্যকর শিক্ষাঘণ্টা, বিষয়ভিত্তিক শেখার অর্জন, উপস্থিতি, ঝরে পড়া, পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, পুনঃপরীক্ষায় প্রত্যাবর্তন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যের তথ্য থাকতে হবে। শুধু কতটি বই বিতরণ বা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তা নয়; এসব ইনপুট শিক্ষার্থীর শেখায় কতটা পরিবর্তন আনল, সেটিই হবে মূল্যায়নের কেন্দ্র।
একজন শিক্ষার্থীর অর্জন যদি তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় কঠোরভাবে মাপা হয়, তবে রাষ্ট্রের অর্জনও বছরব্যাপী পরিমাপযোগ্য সূচকে বিচার করতে হবে। কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে, কোন লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং ব্যর্থতার দায় কোন সংস্থার—তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে। রাষ্ট্রের ফলপত্র প্রকাশিত হলে ফলাফল নিয়ে আলোচনা শিক্ষার্থীকে দোষারোপের সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে শিক্ষা-সরবরাহব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যকারিতার দিকে অগ্রসর হবে।
সমগ্র কর্মপরিকল্পনার ওপর নিয়মিত সংসদীয় ও নাগরিক তদারকি না থাকলে সময়সীমা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক বিস্মৃতিতে হারিয়ে যেতে পারে। জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে প্রতিবছর এসএসসি ফলাফলের বৈষম্য, শিক্ষাবিনিয়োগের রিটার্ন, শিক্ষকপ্রাপ্যতা এবং পুনরুদ্ধার কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশ্য শুনানি হওয়া উচিত। সেখানে শুধু মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারাই বক্তব্য দেবেন না; গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
প্রতি তিন মাসে কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি প্রকাশ করা প্রয়োজন। নাগরিকেরা জানতে পারবেন—কতটি শিক্ষকপদ পূরণ হয়েছে, কতজন অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থী পুনঃশিক্ষণে যুক্ত হয়েছে, কতজন পুনঃপরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, কতটি প্রতিষ্ঠানের ফল উন্নত হয়েছে এবং কোন অঞ্চল এখনো পিছিয়ে রয়েছে। শুধু কার্যক্রমের সংখ্যা নয়, তার গুণগত ফলও জানাতে হবে। দশটি প্রশিক্ষণ আয়োজনের চেয়ে প্রশিক্ষণের ফলে শ্রেণিকক্ষে কী পরিবর্তন এসেছে—এই প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
এই উন্মুক্ত তদারকি সরকারকে বিব্রত করার আয়োজন নয়; বরং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার গণতান্ত্রিক সুরক্ষা। তথ্য গোপন থাকলে ব্যর্থতা সহজেই অজুহাতের আড়ালে চলে যায়; তথ্য প্রকাশিত হলে নাগরিকেরা সমস্যা বুঝতে, অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি তুলতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত উত্তরণের পথের মূল কথা একটিই: পরিসংখ্যানকে শুধু শোক, বিস্ময় বা রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না। ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান এবং ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংখ্যা হিসেবে গণনা করাই রাষ্ট্রের কাজ নয়; তাদের প্রত্যেকের পেছনে থাকা শিক্ষাগত বাস্তবতা শনাক্ত করে শেখার পথে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রথম ৩০ দিনে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, ৯০ দিনের মধ্যে সাম্য ও জবাবদিহি প্রতিবেদন, ছয় মাসের মধ্যে ব্যয়–শিক্ষণ রিটার্ন অডিট, অবিলম্বে বিনা মূল্যের পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা এবং এক বছরের মধ্যে ন্যূনতম শিক্ষকপ্রাপ্যতা—এই ধারাবাহিক পদক্ষেপই উদ্বেগকে কর্মে এবং প্রাক্কলনকে প্রমাণভিত্তিক নীতিতে রূপ দিতে পারে।
শিক্ষার্থীর ফল ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এখন রাষ্ট্রকে নিজের ফল প্রকাশ করতে হবে—সে কোথায় বিনিয়োগ করেছে, কাকে কতটা সুযোগ দিয়েছে, কতটা শেখাতে পেরেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই ব্যর্থতা সংশোধনে কোন সংস্থা, কত দিনের মধ্যে, কত টাকা ব্যয়ে কী করবে। কারণ জবাবদিহি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে দায়িত্ব, সম্পদ, সময়সীমা এবং দৃশ্যমান প্রতিকার যুক্ত থাকে। আর শিক্ষা সংস্কার তখনই মানবিক হয়, যখন একটি অনুত্তীর্ণ শিশুকে ব্যর্থতার স্মারক হিসেবে নয়, পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়।
দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে শুধু বন্ধ করা বা শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা সহজ প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া; কিন্তু এতে এলাকার শিশুর শিক্ষাসুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে। প্রথমে ঘাটতি নির্ণয়, প্রয়োজনীয় শিক্ষক–অর্থ–প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উন্নয়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। সহায়তার পরও অবহেলা, অনিয়ম বা অর্থের অপব্যবহার চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই কর্মপরিকল্পনার সাফল্য পাসের হার সাময়িকভাবে বাড়ানো দিয়ে মাপা যাবে না। দেখতে হবে প্রকৃত শেখা বেড়েছে কি না, অঞ্চলভিত্তিক ব্যবধান কমেছে কি না, অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা ফিরে এসেছে কি না এবং পরিবারনির্ভর অতিরিক্ত শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কমেছে কি না।
চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু আরও বেশি সনদ বিতরণ নয়; জন্মস্থান, পারিবারিক আয়, শিক্ষাধারা কিংবা প্রতিবন্ধিতা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুকে শেখার, বিকশিত হওয়ার এবং মর্যাদার সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণের বাস্তব সুযোগ দেওয়া।
#অধিকারপত্র #অধিকারপত্রএসএসসিফলাফলপ্রতিক্রিয়া #এসএসসিফলাফল২০২৬ #SSCResult2026 #শিক্ষাসংস্কারধারাবাহিক #দেশচিন্তা #ছয়লাখনব্বইহাজারঅনুত্তীর্ণ #৩৭দশমিক৭৫শতাংশ #শিক্ষার্থীব্যর্থনয় #রাষ্ট্রেরফলপত্রকোথায় #শিক্ষারঅধিকার #মানসম্মতশিক্ষা #সবারজন্যশিক্ষা #সমতাভিত্তিকশিক্ষা #একীভূতশিক্ষা #শিক্ষাবৈষম্য #শিক্ষাগতন্যায়বিচার #শহরগ্রামবৈষম্য #শূন্যপাসপ্রতিষ্ঠান #শতভাগপাস #৬৬৯বনাম৩১২ #শিক্ষকসংকট #বিষয়ভিত্তিকশিক্ষক #শেখারঘাটতি #শেখারপুনরুদ্ধার #পুনরুদ্ধারমূলকশিক্ষা #শিক্ষাবিনিয়োগ #শিক্ষার্থীপ্রতিব্যয় #শিক্ষাঅর্থায়ন #প্রয়োজনভিত্তিকঅর্থায়ন #কোহর্টঅডিট #LearningReturnAudit #SSCEquityReport #SSCEquityMap #শিক্ষাজবাবদিহি #রাষ্ট্রীয়জবাবদিহি #শিক্ষান্যায়পাল #EducationOmbudsman #NationalEducationReportCard #EducationEquity #EducationJustice #EducationAccountability #EvidenceBasedEducation #LearningRecovery #QualityEducation #InclusiveEducation #HumanRightsEducation #PublicEducation #SDG4 #BangladeshEducation