08/16/2026 ক্যালেন্ডারের বাইরে আরেক আগস্ট: বাংলার অনাহার, মোগল দরবারের ভ্রাতৃঘাত এবং উদ্বাস্তু মানুষের কান্না│ শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট— চতুর্থ পর্ব
Dr Mahbub
১৬ August ২০২৬ ০৫:১৭
শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট— চতুর্থ পর্ব
পরিচিত যুদ্ধ ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বাইরেও আগস্টের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, ক্ষুধা, বন্যা, উদ্বাস্তুতা এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলায় বিপর্যস্ত অসংখ্য মানুষের কান্না। এই বিস্তৃত মানবিক ফিচারে উঠে এসেছে দারা শিকোহের ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ড ও বহুত্ববাদী ভারতের হারানো সম্ভাবনা; ১৯৪৩ সালের বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ; স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের খাদ্যসংকট; ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা; ২০০৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় সংকট; ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের গণনির্বাসন; বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণ এবং কাবুল বিমানবন্দরে দেশত্যাগে মরিয়া মানুষের মর্মন্তুদ দৃশ্য। এসব বৈশ্বিক ও জাতীয় ট্র্যাজেডির পাশাপাশি নিবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ এবং ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডকে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরতম ক্ষতের আলোকে বিশ্লেষণ করেছে। নিবন্ধের মূল প্রশ্ন—আগস্ট কি সত্যিই অপয়া, নাকি ক্ষমতার লোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিদ্বেষ, অবহেলা ও বিচারহীনতাই বারবার এই মাসকে মানুষের কান্নায় রক্তাক্ত করেছে?
আগস্টের দুঃখের ইতিহাস কেবল বহুল আলোচিত কয়েকটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ কিংবা মনীষীর প্রয়াণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিচিত তারিখগুলোর আড়ালে আরও একটি আগস্ট আছে—যেখানে রাজপ্রাসাদের ক্ষমতাসংগ্রাম মিলিত হয়েছে অনাহারে কঙ্কাল হয়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘ মিছিলে; প্রবল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের শেষ সম্বল; আর সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষাধিক রাষ্ট্রহীন মানুষ বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেয়েছে, পৃথিবীতে সত্যিই তাদের নিজের বলে কোনো দেশ আছে কি না।
ইতিহাসের এই আগস্ট অনেক সময় উচ্চ শব্দে আসে না। কখনো সে আসে শস্যহীন গোলাঘরে, কখনো ভাতের আশায় শহরে ছুটে আসা কৃষকের শীর্ণ শরীরে, কখনো নাফ নদী পেরোনো শিশুর আতঙ্কিত চোখে। যুদ্ধের গোলা ও বোমা দৃশ্যমান; কিন্তু ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলায় যে ধীর মৃত্যু ঘটে, তার শব্দ ইতিহাসের বইয়ে অনেক কম শোনা যায়। অথচ বাঙালির সামষ্টিক স্মৃতিতে আগস্টের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোর কয়েকটি তৈরি হয়েছে এই নীরব বিপর্যয় থেকেই।
ইতিহাস সাধারণত বড় ঘটনার শব্দ মনে রাখে—যুদ্ধের কামান, রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান, বোমার বিস্ফোরণ, কোনো সাম্রাজ্যের পতন কিংবা নতুন পতাকার উত্থান। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ক্ষত সব সময় উচ্চ শব্দে তৈরি হয় না। কখনো একটি শস্যহীন গোলাঘর, খালি হাঁড়ির পাশে নির্বাক বসে থাকা মা, বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া কৃষকের ঘর কিংবা সীমান্তের ওপারে ফেলে আসা জন্মভূমির দিকে উদ্বাস্তু শিশুর শেষবার তাকানো—এসব নীরব দৃশ্যও একটি জাতি ও সভ্যতার স্মৃতিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী তাড়া করে।
আগস্টের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, হিরোশিমা–নাগাসাকি, ভারতবর্ষের দেশভাগ, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কিংবা একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো বহুল আলোচিত ঘটনাগুলো সামনে আসে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পরিচিত তারিখগুলোর আড়ালে রয়েছে আরেক আগস্ট—কম উচ্চারিত, অথচ কম মর্মান্তিক নয়। সেখানে মোগল দরবারে সিংহাসনের জন্য ভাইয়ের হাতে ভাই নিহত হন; ঔপনিবেশিক বাংলায় খাদ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে; স্বাধীন দেশে বন্যা ও বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা মিলিত হয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়; আর জাতিগত নিপীড়ন থেকে বাঁচতে লাখো মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশের শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেয়।
এই আগস্টে দারা শিকোহ কেবল একজন পরাজিত যুবরাজ নন; তিনি ধর্মীয় সংলাপ, জ্ঞানচর্চা ও বহুত্ববাদী সহাবস্থানের একটি রুদ্ধ সম্ভাবনা। তেতাল্লিশ ও চুয়াত্তরের ক্ষুধার্ত মানুষ শুধু দুর্ভিক্ষের পরিসংখ্যান নন; তাঁরা এমন এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাক্ষী, যেখানে বাজারে খাদ্য থাকলেও দরিদ্রের জীবনে তার অধিকার থাকে না। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের প্লাবিত জনপদ মনে করিয়ে দেয়—প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করে বৈষম্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নির্বাসন দেখায়, রাষ্ট্র যখন কোনো জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ইতিহাস অস্বীকার করে, তখন মানুষ শুধু ঘর হারায় না—হারায় নিজের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ।
বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণ আবার প্রমাণ করে, সব গণবিপর্যয়ের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা ও বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করা সতর্কবার্তাও একদিন একটি শহরের ওপর বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে। কাবুল বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ডানা আঁকড়ে থাকা মরিয়া মানুষের দৃশ্য জানিয়ে দেয়—পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক হিসাব ব্যর্থ হলে তার সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হয় সেই সাধারণ মানুষকে, যার যুদ্ধ শুরু বা শেষ করার সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা ছিল না।
এই দীর্ঘ শোকযাত্রার ভেতরেই আগস্ট বাঙালির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে দুই মহীরুহকে। ৭ আগস্ট ১৯৪১ সালে প্রয়াত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, মানবতাবাদ ও সম্প্রীতির অন্যতম প্রধান নৈতিক কণ্ঠ। আর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে—বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রীয় নেতাকে। একজনের বিদায় ছিল জীবনের অনিবার্য নিয়মে; অন্যজনের মৃত্যু ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক বর্বরতা। এই দুই হারানো আগস্টকে বাঙালির সাংস্কৃতিক হৃদয় ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর দীর্ঘ ছায়ায় পরিণত করেছে।
তবে ভিন্ন ভিন্ন ট্র্যাজেডিকে প্রাণহানির সংখ্যা দিয়ে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। হিরোশিমার প্রতিটি মৃত্যু, দুর্ভিক্ষের প্রতিটি অনাহারী শরীর, দেশভাগে বাস্তুচ্যুত প্রতিটি পরিবার, রোহিঙ্গা শিবিরের প্রতিটি শিশু এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত প্রতিটি মানুষ সমান মানবিক মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাসে কোনো ঘটনার প্রতীকী গভীরতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতও বিবেচ্য। সেই বিচারে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙালির রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের ওপর এমন এক পরিকল্পিত আঘাত, যার ছায়া অন্য সব আগস্টের শোকের মধ্যেও পৃথকভাবে দৃশ্যমান।
আগস্ট তাই কোনো অলৌকিক অভিশাপের নাম নয়। এটি ক্ষমতার লোভ, ঔপনিবেশিক শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ, রাষ্ট্রীয় অবহেলা, পরিবেশবিরোধী উন্নয়ন এবং বিচারহীনতার বার্ষিক সাক্ষ্য। একই সঙ্গে এটি আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের আহ্বান। ইতিহাসের এই নীরব ও উচ্চারিত কান্নাগুলোকে যদি আমরা দলীয় সুবিধা, আনুষ্ঠানিক স্মরণ কিংবা আবেগের ক্ষণস্থায়ী প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না রেখে ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে পারি, তবেই আগস্টের স্মরণ অর্থবহ হবে।
এই নিবন্ধ সেই বিস্মৃত ও বহুল উচ্চারিত কান্নাগুলোকে একই মানবিক মানচিত্রে স্থাপন করার প্রয়াস—যাতে ক্ষুধার্ত কৃষক, নিহত শিশু, নির্বাসিত জনগোষ্ঠী, দমিত জ্ঞানচর্চা এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষদের ইতিহাস আলাদা আলাদা দ্বীপ হয়ে না থাকে। কারণ তাঁদের সবার কান্নার গভীরে একই দাবি উচ্চারিত হয়: মানুষের জীবন ক্ষমতার চেয়ে বড়, খাদ্য দয়া নয় অধিকার, নাগরিকত্ব কোনো শাসকের অনুগ্রহ নয় এবং রাজনৈতিক মতভেদ কখনো হত্যার বৈধতা হতে পারে না।
মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আগস্টের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় যুবরাজ দারা শিকোহকে ঘিরে। সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও মনোনীত উত্তরাধিকারী দারা শুধু সিংহাসনের দাবিদার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানসন্ধানী, সুফি ভাবাপন্ন চিন্তক এবং ভারতীয় ধর্ম–দর্শনের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার আগ্রহী সাধক।
দারা বিশ্বাস করতেন, সত্যকে শুধু একটি ধর্মীয় ভাষা বা সম্প্রদায়ের সীমানায় বন্দী করা যায় না। তিনি হিন্দু ও মুসলিম আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মধ্যে মিল খুঁজেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত রচনা মাজমা-উল-বাহরাইন—অর্থাৎ ‘দুই সমুদ্রের মিলন’—সুফিবাদ ও ভারতীয় বেদান্তদর্শনের মধ্যকার সাদৃশ্য অনুসন্ধানের এক সাহসী প্রয়াস। তাঁর উদ্যোগেই উপনিষদের ফারসি অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জ্ঞানজগতে ভারতীয় দর্শন পরিচিত হওয়ার পথও প্রশস্ত করে।
কিন্তু সাম্রাজ্যের সিংহাসন যুক্তি, দর্শন কিংবা উদারতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়নি। শাহজাহানের অসুস্থতার পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে শুরু হয় উত্তরাধিকারের যুদ্ধ। দারা পরাজিত ও বন্দী হন। তাঁকে দিল্লির রাস্তায় অপমানজনকভাবে শিকল পরিয়ে ঘোরানো হয়—যাতে জনগণের চোখে সম্ভাব্য সম্রাটের মর্যাদা ধ্বংস করা যায়। পরে ধর্মত্যাগের অভিযোগ তুলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬৫৯ সালের আগস্টের শেষভাগে ভাই আওরঙ্গজেবের নির্দেশে দারাকে হত্যা করা হয়।
দারা শিকোহের মৃত্যু একজন যুবরাজের মৃত্যু মাত্র ছিল না। তাঁর সঙ্গে মোগল ভারতের একটি সম্ভাব্য বৌদ্ধিক পথও যেন রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল—যে পথে ধর্মীয় আত্মপরিচয়কে অস্বীকার না করেও পারস্পরিক জ্ঞান, সংলাপ ও সহাবস্থান সম্ভব ছিল। ইতিহাসে ‘যদি’ শব্দটির নিশ্চিত উত্তর নেই; দারা সম্রাট হলে সাম্রাজ্য কোন পথে যেত, তা আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু বলা যায়, তাঁর হত্যাকাণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের বহুত্ববাদী চিন্তার ওপর একটি বড় আঘাত ছিল।
আগস্ট এখানে আমাদের সামনে ক্ষমতার এক পুরোনো সত্য উন্মোচন করে: স্বৈরশাসন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীর শরীর হত্যা করে না; সে বিকল্প চিন্তা, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ এবং ভিন্নভাবে সহাবস্থানের স্বপ্নকেও হত্যা করতে চায়।
বাংলার ইতিহাসে আগস্টের সবচেয়ে নীরব অথচ ভয়াবহ কান্নাগুলোর একটি ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষ। এটি নিছক প্রাকৃতিক খাদ্যাভাব ছিল না। যুদ্ধকালীন বাজারনীতি, খাদ্য পরিবহনের সংকট, চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ঔপনিবেশিক সরকারের অগ্রাধিকার এবং দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংস—সব মিলিয়ে বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদ অনাহারের মৃত্যুভূমিতে পরিণত হয়েছিল।
ধান ছিল, কিন্তু দরিদ্রের কেনার ক্ষমতা ছিল না। বাজার ছিল, কিন্তু সেই বাজারে কৃষিশ্রমিকের প্রবেশাধিকার ছিল না। সাম্রাজ্যের যুদ্ধ চালানোর জন্য জাহাজ, অর্থ ও খাদ্য বরাদ্দ ছিল; কিন্তু বাংলার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য সময়মতো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। ফলে গ্রাম থেকে মানুষ দলে দলে কলকাতার দিকে ছুটে আসে—এক মুঠো ভাত, একটু ফ্যান কিংবা বেঁচে থাকার সামান্য সুযোগের আশায়।
১৯৪৩ সালের আগস্টে কলকাতার ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাজার এবং বাড়ির দরজার পাশে ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় ক্রমে মৃত্যুর সারিতে পরিণত হয়। কোনো মা নিজের খাবার সন্তানের মুখে তুলে দিয়ে নিজে নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন; কোনো শিশু মৃত মায়ের শরীর নাড়িয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে; কেউ আবর্জনার স্তূপে খাবার খুঁজছে; কেউ রাস্তার পাশে পড়ে আছে—জীবিত না মৃত, বোঝার মতো শক্তিও পথচারীর নেই।
তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রথমদিকে দুর্ভিক্ষের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশে নানা বাধা ছিল। এমনকি ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দ ব্যবহারের ওপরও চাপ ছিল। কিন্তু আগস্টে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের মর্মন্তুদ আলোকচিত্র প্রকাশিত হলে সেই আড়াল ভেঙে যায়। ছবিগুলো বিশ্ববাসীকে দেখায়—সাম্রাজ্যের তথাকথিত সুশাসনের রাজধানীর রাস্তায় মানুষ অনাহারে মরছে। গবেষকদের হিসাবে এই দুর্ভিক্ষ ও সংশ্লিষ্ট রোগে বাংলায় মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক লাখ থেকে প্রায় ৩০ লাখ বা তারও বেশি হতে পারে; সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও বিপর্যয়ের ব্যাপকতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
এই দুর্ভিক্ষ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়: খাদ্য উৎপাদন থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের কাছে খাদ্য কেনার অর্থ, ন্যায্য বাজার, সামাজিক সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক সরকার না থাকলে ভরা গোলার পাশেও মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে।
সুতরাং ১৯৪৩ সালের আগস্ট ছিল প্রকৃতির অভিশাপের চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক অবিচারের ট্র্যাজেডি। ক্ষুধা সেখানে শুধু পেটের শূন্যতা ছিল না; ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের নৈতিক দেউলিয়াপনার প্রকাশ।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আবার ভয়াবহ খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি তখনো পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাদ্যবাজারের অস্থিরতা, মজুতদারি, কর্মসংকট এবং বৈদেশিক সহায়তার জটিলতা।
বর্ষার বন্যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। নদীভাঙন ও প্লাবনে ফসল, ঘরবাড়ি এবং মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়। কিন্তু দুর্ভিক্ষের প্রকৃত কারণ শুধু মাঠে পানি ওঠা ছিল না। বন্যার আঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিল সেই মানুষ, যার সঞ্চয় ছিল না, জমি ছিল না, বিক্রি করার সম্পদ ছিল না এবং বাজার থেকে খাবার কেনার সামর্থ্য দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিল।
একজন দিনমজুরের কাছে দুর্ভিক্ষ শুরু হয় সেদিন, যেদিন বাজারে চাল আছে অথচ তার হাতে কাজ নেই। জেলের দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যখন নদী ফুলে উঠলেও মাছ ধরার নৌকা ভেসে যায়। কৃষকের দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যখন ফসল নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের দায় বাড়ে। আর মায়ের দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যখন নিজের না খেয়ে থাকার পরও সন্তানের মুখে দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পান না।
চুয়াত্তরের আগস্টে উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার অনাহার ও অপুষ্টি তীব্র হয়ে ওঠে। মানুষের শেষ সম্বল বিক্রি হতে থাকে; অনেকে কাজ ও খাদ্যের সন্ধানে শহরের দিকে যাত্রা করে। সরকারি এবং গবেষকদের মৃত্যুর হিসাবের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। এ কারণেই সংখ্যাকে রাজনৈতিক অস্ত্র না বানিয়ে বিপর্যয়ের প্রকৃতি বোঝা জরুরি। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ঘটনাটিকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত দুর্ভিক্ষ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালের মধ্যে তিন দশকের ব্যবধান এবং দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকলেও ভুক্তভোগীর মুখ প্রায় একই—ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর, নারী, শিশু এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষ। দুই দুর্ভিক্ষই দেখিয়েছে, দুর্যোগ সবার ঘরে সমানভাবে প্রবেশ করে না। যার ঘর শক্ত, সঞ্চয় আছে এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে, সে বিপদ সামলানোর সুযোগ পায়। যার কিছুই নেই, প্রকৃতির সামান্য ধাক্কাও তার জীবনে মৃত্যুদণ্ড হয়ে আসে।
বাংলার সভ্যতা নদীর সন্তান। নদী পলি এনে মাটি উর্বর করে, মাছ দেয়, যাতায়াতের পথ তৈরি করে এবং কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু সেই নদী যখন অতিবৃষ্টি, উজানের ঢল, অপরিকল্পিত বাঁধ, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং দুর্বল অবকাঠামোর সঙ্গে মিলিত হয়, তখন আশীর্বাদ মুহূর্তে বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
১৯৮৮ সালের বন্যা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্লাবন। আগস্টের শেষভাগে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানির নিচে চলে যায়। নদীর পানি বাঁধ অতিক্রম করে গ্রাম, হাট, বিদ্যালয় ও শহরে প্রবেশ করে। বহু পরিবার ঘরের চাল, সড়কের উঁচু অংশ কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়। পানিবাহিত রোগ, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং খাদ্যসংকট মানুষের কষ্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এর এক দশক পর ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যাও জুলাই থেকে শুরু হয়ে আগস্টে ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল বিভিন্ন মাত্রায় প্লাবিত হয় এবং বহু স্থানে পানি দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে। কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। কিন্তু এই দুর্যোগে বাঙালির সামাজিক সংহতির শক্তিও প্রকাশ পায়—মানুষ নৌকায় করে খাবার পৌঁছে দিয়েছে, বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে, পরিবার অপরিচিত পরিবারকে জায়গা দিয়েছে।
বাংলাদেশের আগস্টের বন্যাগুলো তাই শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এগুলো আমাদের উন্নয়নদর্শনের পরীক্ষাও। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত করে, জলাভূমি ভরাট করে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঘটিয়ে এবং দরিদ্র মানুষের বসতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঠেলে দিয়ে আমরা নিজেরাই ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে তুলি। বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; কিন্তু বৃষ্টি যেন মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, তার জন্য বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, আগাম সতর্কতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রকৃতিবান্ধব নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব।
২০০৭ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র–সেনা সংঘাত দ্রুত দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। একটি খেলার মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ পরে ছাত্রবিক্ষোভ, পুলিশি অভিযান, কারফিউ, শিক্ষক–শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে পৌঁছায়।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান ও পরীক্ষার স্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক, প্রশ্ন করার জায়গা এবং স্বাধীন চিন্তার আশ্রয়। সেখানে যখন ভয় প্রবেশ করে, শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়, শিক্ষার্থীর কণ্ঠ দমন করা হয় কিংবা ক্যাম্পাসকে নিরাপত্তা সমস্যার ভাষায় দেখা হয়, তখন ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হয় না—পুরো সমাজের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগস্টের এই অধ্যায়টি অনেক বড় ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু এটি স্মরণ করা প্রয়োজন, কারণ জ্ঞানাঙ্গনের স্বাধীনতা রক্ষা না করলে রাষ্ট্রের কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তরই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়কে শৃঙ্খলিত নীরবতার জায়গা নয়, দায়িত্বশীল স্বাধীনতার পরিসর হতে দিতে হয়।
২০১৭ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হলে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের কেউ পাহাড়ি পথ ধরে কয়েক দিন হেঁটেছে, কেউ নাফ নদী পাড়ি দিয়েছে ছোট নৌকায়, কেউ পরিবারের সদস্যকে পথে হারিয়েছে, কেউ চোখের সামনে নিজের বাড়ি পুড়তে দেখেছে।
তারা যখন কক্সবাজারের সীমান্তে পৌঁছায়, সঙ্গে ছিল না কোনো সম্পদ, নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কিংবা স্বীকৃত নাগরিকত্ব। কারও কোলে অপুষ্ট শিশু, কারও শরীরে গুলির ক্ষত, কারও চোখে স্বজন হারানোর নির্বাক আতঙ্ক। তাদের অধিকাংশের একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়—‘শরণার্থী’।
আগস্ট ২০১৭-এর পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়; আগের আগতদের মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে মিয়ানমারের অভিযানকে জাতিগত নির্মূলের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম, বসতভিটা, মসজিদ, কবরস্থান ও কৃষিজমি ধ্বংসের প্রমাণও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ সীমিত সম্পদ নিয়েও বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শিবিরে বসবাস কোনো টেকসই সমাধান নয়। একটি শিশু খাদ্য ও তাঁবু পেয়ে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষা, পরিচয়, চলাচলের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের অধিকার ছাড়া সে পূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না।
রোহিঙ্গাদের আগস্ট শুধু ঘর হারানোর স্মৃতি নয়; নাগরিকত্ব হারানোরও ইতিহাস। নিজের জন্মভূমিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী বসবাস করার পরও যখন একটি জনগোষ্ঠীকে বলা হয়—তোমরা এ দেশের কেউ নও—তখন রাষ্ট্র কেবল তাদের অধিকার কেড়ে নেয় না, তাদের অস্তিত্বের ইতিহাসও মুছে দিতে চায়।
২০২০ সালের আগস্টে লেবাননের বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক বছর ধরে অনিরাপদভাবে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হয়ে শহরের বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়। শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন; বহু পরিবার ঘর হারায়।
ঘটনাটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেনি। আকাশ থেকে শত্রু বিমান বোমা ফেলেনি। একটি গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক এবং কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক অবহেলাই একটি শহরের ওপর বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়েছিল।
বৈরুত দেখিয়েছে, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতা এবং জবাবদিহির অভাবও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। বিপদের কথা কর্মকর্তারা জানতেন—তবু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ বিস্ফোরণটি কয়েক সেকেন্ডে ঘটলেও তার প্রস্তুতি চলছিল বছরের পর বছর ধরে, একের পর এক অগ্রাহ্য সতর্কবার্তা ও দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তের মধ্যে।
আগস্টের কান্নার ইতিহাসে এই ঘটনা তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সব ট্র্যাজেডি হঠাৎ ঘটে না; কিছু ট্র্যাজেডিকে অবহেলা ধীরে ধীরে নির্মাণ করে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান দ্রুত আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কাবুল বিমানবন্দরে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা বিশ্বমানবতার বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়ার আশায় বিমানবন্দরে ছুটে আসে। কেউ বিমানে জায়গা পাওয়ার জন্য দেয়াল টপকে প্রবেশ করে, কেউ চলন্ত সামরিক বিমানের বাইরের অংশ আঁকড়ে ধরে।
আকাশে ওঠার পর বিমান থেকে মানুষের পড়ে যাওয়ার দৃশ্য আধুনিক বিশ্বের অন্যতম মর্মান্তিক প্রতীকে পরিণত হয়। একজন মানুষ কখন নিজের জীবন বাঁচাতে উড়োজাহাজের ডানা কিংবা চাকায় ঝুলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়? যখন মাটিতে থেকে যাওয়াকে সে নিশ্চিত মৃত্যুর সমান মনে করে।
আফগানিস্তানের এই আগস্ট দীর্ঘ যুদ্ধ, বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ, ব্যর্থ রাষ্ট্রগঠন, দুর্নীতি, উগ্রবাদ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার সম্মিলিত পরিণতি। দুই দশকের যুদ্ধের শেষে বড় শক্তিগুলো তাদের কৌশলগত হিসাব নিয়ে ফিরে গেছে; কিন্তু আফগান নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সাধারণ নাগরিককে রেখে গেছে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে।
মোগল দরবারে দারা শিকোহের হত্যাকাণ্ড, তেতাল্লিশের অনাহার, চুয়াত্তরের খাদ্যসংকট, বাংলাদেশের বন্যা, রোহিঙ্গাদের নির্বাসন, বৈরুতের বিস্ফোরণ কিংবা কাবুল বিমানবন্দরের আতঙ্ক—ঘটনাগুলোর সময় ও স্থান আলাদা। তবু তাদের ভেতরে এক গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
প্রতিটি ঘটনায় সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
সম্রাটের সিংহাসন নিয়ে লড়াই করেন রাজপুত্রেরা, কিন্তু তার প্রভাব পড়ে প্রজাদের ওপর। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন শাসকেরা, অথচ সন্তান হারান মা। খাদ্যনীতি নির্ধারণ করেন আমলা ও রাজনীতিকেরা, কিন্তু না খেয়ে মারা যায় ভূমিহীন শ্রমিক। নিরাপত্তার নামে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী, অথচ দেশ হারায় নিরস্ত্র পরিবার। বিপজ্জনক রাসায়নিকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ফেলে রাখে কর্তৃপক্ষ, কিন্তু বিস্ফোরণে ঘর হারায় সাধারণ নাগরিক।
এই কারণেই আগস্টের কান্না কোনো একটি ধর্ম, জাতি বা রাষ্ট্রের কান্না নয়। ক্ষুধার্ত শিশুর কোনো রাজনৈতিক দল নেই; উদ্বাস্তু মায়ের কোনো ভূরাজনৈতিক কৌশল নেই; বোমায় আহত মানুষের শরীর শাসকের মতাদর্শ বোঝে না।
আগস্টকে অপয়া বললে ভাষাটি আবেগের দিক থেকে শক্তিশালী হয়, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ মাসের কোনো নৈতিক ইচ্ছা নেই। আগস্ট দারা শিকোহকে হত্যা করেনি, বাংলার চাল লুকিয়ে রাখেনি, নদীর চর দখল করেনি, রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ায়নি কিংবা বৈরুত বন্দরের গুদামে বিপজ্জনক রাসায়নিক ফেলে রাখেনি।
এসব করেছে মানুষ এবং মানুষের নির্মিত অন্যায় ব্যবস্থা।
কখনো ক্ষমতার লোভ, কখনো ঔপনিবেশিক শোষণ, কখনো বাজারের নিষ্ঠুরতা, কখনো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, কখনো প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং কখনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা আগস্টকে কান্নার মাসে পরিণত করেছে। তাই আগস্টের অমঙ্গল কাটাতে ক্যালেন্ডার বদলানোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র বদলানো।
দারা শিকোহের মৃত্যু আমাদের চিন্তার বহুত্ব রক্ষার শিক্ষা দিক। তেতাল্লিশ ও চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ খাদ্যকে দয়া নয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখতে শেখাক। বন্যা আমাদের নদী ও জলাভূমিবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজন বোঝাক। রোহিঙ্গাদের নির্বাসন নাগরিকত্বহীনতার নিষ্ঠুরতা সামনে আনুক। বৈরুত শেখাক, জবাবদিহিহীন অবহেলাও হত্যার সমান ভয়ংকর হতে পারে। আর কাবুলের দৃশ্য মনে করিয়ে দিক—ভূরাজনীতির প্রতিটি ব্যর্থ হিসাবের নিচে অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবন চাপা পড়ে থাকে।
আগস্ট তাই কেবল অতীতের শোক বহন করে না; ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও বহন করে। আমরা যদি এই কান্নাকে শুধু স্মরণসভা, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণে পরিণত করি, তবে পরবর্তী আগস্টে নতুন কোনো শহর, নতুন কোনো জনপদ কিংবা নতুন কোনো জনগোষ্ঠী একই ইতিহাসের শিকার হবে।
আর যদি এই শোককে ন্যায়বিচার, মানবিক রাষ্ট্রনীতি, সম্প্রীতি, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তবেই আগস্টের অশ্রু একদিন পরিবর্তনের বৃষ্টিতে পরিণত হতে পারে। কারণ আগস্ট নিজে অপয়া নয়; অপয়া হলো সেই সভ্যতা, যা বারবার মানুষের কান্না দেখে—তবু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।
আগস্টের দীর্ঘ ইতিহাস মূল্যায়ন করতে বসলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অন্তহীন শোকযাত্রা। সাম্রাজ্যের সিংহাসনের জন্য ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ড, ঔপনিবেশিক বিভাজন, দুর্ভিক্ষে কঙ্কাল হয়ে যাওয়া মানুষ, পারমাণবিক আগুনে পুড়ে যাওয়া নগর, বন্যায় ভেসে যাওয়া জনপদ, রাজনৈতিক সহিংসতা, উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল—সব মিলিয়ে আগস্ট যেন মানবসভ্যতার বিবেকের ওপর জমে থাকা এক গভীর ক্ষত। এই মাসে মানুষ যেমন প্রকৃতির কাছে অসহায় হয়েছে, তেমনি আরও বেশি অসহায় হয়েছে মানুষেরই নির্মিত ক্ষমতা, ঘৃণা, যুদ্ধ ও প্রতিহিংসার কাছে।
কিন্তু বাঙালির ইতিহাসের মানদণ্ডে আগস্টের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রেখে বিচার করলে শেষ পর্যন্ত একটি দিন অন্য সব দিনের ওপর দীর্ঘতম ছায়া ফেলে—১৫ আগস্ট ১৯৭৫।
এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তারিখ নয়; একটি স্বাধীন জাতির রাজনৈতিক স্বপ্ন, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং সদ্য অর্জিত রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ আঘাতের দিন। এদিন হত্যা করা হয়েছিল সেই মানুষটিকে, যাঁর নেতৃত্বে বাঙালি ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ সংগ্রাম অতিক্রম করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগের বিশ্বব্যাপী শ্রোতা জরিপে যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বাংলার অসংখ্য মহৎ ব্যক্তিত্বকে পেছনে রেখে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচিত হয়েছিলেন—তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিবিসি জরিপের সমকালীন প্রতিবেদন
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সংকট নিয়ে ইতিহাসে আলোচনা ও সমালোচনা থাকবে—থাকাই উচিত। কোনো নেতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক মতভেদ, ব্যর্থতা কিংবা বিরোধ সপরিবারে হত্যার নৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে না। যুক্তির জবাব যুক্তিতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জবাব রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জবাব জনগণের কাছে দেওয়ার কথা। পরিবারের নারী, নববধূ, আত্মীয়স্বজন এবং একটি শিশুকে গুলি করে হত্যা কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়—এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে বাঙালির আগস্ট-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত করার সবচেয়ে মর্মান্তিক কারণটির নাম শেখ রাসেল।
বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। রাজনীতি কী, রাষ্ট্রক্ষমতা কী, সামরিক অভ্যুত্থান কী—এসব বোঝার বয়স তার হয়নি। সে কোনো সরকার পরিচালনা করেনি, কোনো নীতিনির্ধারণ করেনি, কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেনি। তার পরিচয় ছিল একটিই—সে একটি শিশু এবং বঙ্গবন্ধুর সন্তান।
তবু ঘাতকেরা তাকে রেহাই দেয়নি।
একটি শিশু যখন প্রাণভিক্ষা চেয়েও বাঁচতে পারে না, তখন হত্যাকাণ্ডটির রাজনৈতিক মুখোশ সম্পূর্ণ খসে পড়ে। স্পষ্ট হয়ে যায়, উদ্দেশ্য শুধু রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল তাঁর রক্তের উত্তরাধিকার, পারিবারিক স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও নিশ্চিহ্ন করা। বিদেশে অবস্থান করায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান; কিন্তু দেশে থাকা তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে হত্যা করা হয়।
শেখ রাসেলের নিথর শরীর তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের প্রতীক নয়। সে মানবতার কাছে এক অনন্ত প্রশ্ন—রাজনৈতিক ঘৃণা কতটা অন্ধ হলে একজন সশস্ত্র মানুষ দশ বছরের শিশুকেও শত্রু হিসেবে দেখতে পারে?
হিরোশিমা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ কিংবা অন্যান্য বিপর্যয়ের পরিসর ও প্রাণহানির সংখ্যা অবশ্যই অনেক বড়। ইতিহাসের পৃথক ট্র্যাজেডিকে শুধু সংখ্যার দাঁড়িপাল্লায় মাপাও নৈতিকভাবে যথার্থ নয়। তবু বাঙালির জাতীয় ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডটির নির্মম উদ্দেশ্য বিবেচনায় এই নিবন্ধের মূল্যায়ন হলো—১৫ আগস্টের ঘটনা আমাদের আগস্টের সব ট্র্যাজেডির মধ্যে সবচেয়ে গভীর ও প্রতীকী ক্ষত। কারণ সেদিন একজন মানুষকে নয়, তাঁর দেশে অবস্থানরত প্রায় পুরো পরিবারকে; একটি সরকারকে নয়, স্বাধীনতার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে; একটি জীবনকে নয়, একটি আদর্শ ও জাতীয় স্বপ্নকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঘাতকেরা হয়তো ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মুছে যাবে। পরিবারের সদস্যদের নিশ্চিহ্ন করলে স্মৃতিও বিলীন হবে। রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের নতুন সূচনা লেখা যাবে।
কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, অস্ত্র মানুষের শরীর হত্যা করতে পারে—আদর্শ নয়। বই পোড়ানো যায়, কিন্তু চিন্তা নয়। কোনো নেতার বাড়ি ধ্বংস করা যায়, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তাঁর অবস্থানকে গুলি করে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
বঙ্গবন্ধু যে ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন, সেটি ছিল বাঙালির অধিকার, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির ভাষা। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অস্বীকার করে ইতিহাস লেখা যায় না। হত্যাকারীরা তাঁর জীবন শেষ করেছিল; কিন্তু তাঁর নামকে ইতিহাস থেকে সরাতে পারেনি। বরং সেই হত্যাকাণ্ড তাঁকে বাঙালির সম্মিলিত শোক, প্রতিবাদ এবং বিচারপ্রত্যাশার আরও গভীর প্রতীকে পরিণত করেছে।
এই কারণেই ১৫ আগস্ট কোনো দলীয় সীমানায় আবদ্ধ থাকার দিন নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সপরিবারে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে কোনো দলের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করা নয়; এর অর্থ মানবজীবন, আইনের শাসন, সাংবিধানিক রাজনীতি এবং সভ্যতার পক্ষে দাঁড়ানো।
পনেরোই আগস্টের রক্তাক্ত শোকের কয়েক দিন আগে, ৭ আগস্ট ১৯৪১ সালে বাঙালি হারিয়েছিল তার আরেক মহান অভিভাবক—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি শুধু কবি, ঔপন্যাসিক, সুরকার কিংবা নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্য, মানবতাবাদ এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী নৈতিক কণ্ঠ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।” গানটি আজ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। কিন্তু এটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিভাজননীতির বিপরীতে তিনি বাঙালিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মাতৃভূমির বন্ধনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাখিবন্ধনকে তিনি হিন্দু–মুসলমানের পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতীকে রূপ দিয়েছিলেন।
তাঁর কাছে বাংলা শুধু ভূখণ্ড ছিল না; ছিল নদী, মাটি, ভাষা, মানুষ ও বহুত্বের মিলিত প্রাণ। তিনি যে বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন, সেখানে ধর্ম মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার দেয়াল নয়—আত্মিক বৈচিত্র্যের একটি পথ।
রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে প্রয়াত হন; তার ছয় বছর পর ১৯৪৭ সালে বাংলা আবার বিভক্ত হয়। তিনি যদি তখন জীবিত থাকতেন, দেশভাগ ঠেকাতে পারতেন কি না—এর নিশ্চিত উত্তর ইতিহাস দিতে পারে না। একজন কবি, তিনি যত বড় নৈতিক ব্যক্তিত্বই হোন, একা ঔপনিবেশিক কৌশল, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং উপমহাদেশীয় ক্ষমতার দর-কষাকষি থামিয়ে দিতে পারতেন—এ দাবি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
তবু প্রশ্নটি অর্থহীন নয়।
তিনি জীবিত থাকলে কি বিভক্তির বিরুদ্ধে আরও একটি প্রবল নৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠত? তাঁর কণ্ঠ কি হিন্দু–মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বিবেককে নতুন করে নাড়া দিত? তাঁর সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব কি রাজনৈতিক নেতাদের অন্তত আরেকবার ভাবতে বাধ্য করত? “বাংলার মাটি, বাংলার জল” যিনি মানুষের কণ্ঠে তুলে দিয়েছিলেন, তিনি কি বাংলার শরীরে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার নীরবে মেনে নিতেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে বাংলা এমন এক নৈতিক অভিভাবককে হারিয়েছিল, যিনি বিভাজনের ভাষার বিপরীতে মিলনের ভাষা নির্মাণ করতে পারতেন। তাঁর অনুপস্থিতি দেশভাগ ঘটিয়েছে—এ কথা বলা অতিসরলীকরণ; কিন্তু তাঁর উপস্থিতি বাঙালির ঐক্যের সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে পারত—এ সম্ভাবনা ইতিহাসের সামনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিকল্পনা হিসেবে থেকে যায়।
আগস্টের বাঙালি ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু যেন একই নদীর দুই তীর। একজন বাঙালিকে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় দিয়েছেন; অন্যজন সেই আত্মপরিচয়কে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছেন। একজন লিখেছেন বাংলার প্রতি ভালোবাসার অমর সংগীত; অন্যজন সেই বাংলার মানুষকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের বাংলা ছিল মানবিকতা, সৌন্দর্য, সম্প্রীতি ও মুক্তচিন্তার বাংলা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ছিল রাজনৈতিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শোষণমুক্তি ও মর্যাদার বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও উভয়ের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং বাংলা।
অথচ আগস্টেই বাঙালি দুজনকে হারিয়েছে—একজনকে সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে, অন্যজনকে মানুষের পরিকল্পিত বর্বরতায়। এই পার্থক্যটি গভীর। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ শোকের, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু একই সঙ্গে শোক, অপরাধ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। একজনের মৃত্যু প্রকৃতির অনিবার্য নিয়ম; অন্যজনের হত্যাকাণ্ড ছিল প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয়।
এই দুই হারানোকে পাশাপাশি রাখলে আগস্টের বাঙালি চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই মাস যেন বাঙালির সাংস্কৃতিক হৃদয় ও রাজনৈতিক মেরুদণ্ড—দুটিতেই আঘাত করেছে।
কোন ট্র্যাজেডি সবচেয়ে বড়—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা গুনে পাওয়া যায় না। হিরোশিমা–নাগাসাকিতে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে; দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছে আরও বেশি; দেশভাগে কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যু সমান মূল্যবান এবং প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব ঐতিহাসিক ব্যাপ্তি রয়েছে।
তবু একটি জাতির ট্র্যাজেডি মূল্যায়নে সংখ্যার পাশাপাশি ঘটনার প্রতীকী গভীরতা, উদ্দেশ্য, নৈতিক নির্মমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অভিঘাতও বিবেচনা করতে হয়। সেই বিচারে ১৫ আগস্ট বাঙালির জন্য অনন্যভাবে ভয়াবহ।
কারণ সেদিন স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর নিজের স্বাধীন দেশে। যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, সেই রাষ্ট্রেরই অস্ত্রধারীদের একটি অংশ তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। তাঁর সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধূ, আত্মীয় এবং দশ বছরের শিশুকে। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাতির পিতার রক্তে রাষ্ট্রের মাটি ভিজে গিয়েছিল।
এটি শুধু শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নের ওপর এক পরিকল্পিত আঘাত। এই কারণেই—প্রাণহানির সংখ্যা দিয়ে নয়, জাতীয় ইতিহাসের গভীরতা এবং হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী নির্মমতার বিচারে—১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি বাঙালির আগস্টের অন্য সব শোককে ছাপিয়ে যায়।
তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে আগস্টের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে স্বীকার করার অর্থ অন্য মানুষের মৃত্যু, অন্য রাজনৈতিক পক্ষের কষ্ট কিংবা পরবর্তী সময়ের সহিংসতাকে ছোট করা নয়। সত্যিকারের শোক কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীর শোককে অস্বীকার করে না। সত্যিকারের মানবতা নিজের প্রিয় মানুষের জন্য কাঁদতে গিয়ে অন্য মায়ের কান্নাকে উপহাস করে না।
পনেরোই আগস্টের শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে আমাদের প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা, প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিটি শিশুহত্যা এবং প্রতিটি সপরিবার নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমান নৈতিক শক্তিতে দাঁড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্য শোক তখনই অর্থপূর্ণ হবে, যখন তাঁর হত্যাকাণ্ড থেকে আমরা শিখব—রাজনীতিতে অস্ত্র নয়, জনগণের রায়ই শেষ কথা; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের পথ; এবং কোনো শিশুকে তার পিতা, পরিবার বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শত্রু হিসেবে দেখা যাবে না।
শেখ রাসেলের মৃত্যু স্মরণ করে যদি আমরা আজকের প্রতিটি শিশুর জীবন, শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকার রক্ষা না করি, তবে আমাদের শোক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা বলে যদি বৈষম্য, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও অধিকারহীনতা টিকিয়ে রাখি, তবে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেও তাঁর আদর্শ থেকে দূরে সরে যাব।
আগস্ট চলছে। আকাশে বর্ষার মেঘ, বাতাসে শ্রাবণের বিষণ্নতা। এই মাসে বাঙালির শোকের তালিকা দীর্ঘ—রবীন্দ্রনাথের নিঃশ্বাস থেমে যাওয়া, দুর্ভিক্ষের পথে পড়ে থাকা নামহীন মানুষ, দেশভাগে বিচ্ছিন্ন পরিবার, বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত সিঁড়ি, শেখ রাসেলের অসমাপ্ত শৈশব, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত মানুষ এবং অধিকার চাইতে গিয়ে ঝরে পড়া তরুণ প্রাণ।
কাঁদো বাঙালি, কাঁদো—কিন্তু সেই কান্না যেন দুর্বলতার না হয়। কান্না হোক আত্মশুদ্ধির, ইতিহাসকে সত্যভাবে দেখার এবং আর কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটতে না দেওয়ার শপথের। কাঁদো তাদের জন্য, যাদের স্বপ্ন শেষ হওয়ার আগেই জীবন শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কাঁদো সেই সব মায়ের জন্য, যাঁরা আগস্টে সন্তান হারিয়েছেন। কাঁদো সেই শিশুর জন্য, যে শেষ মুহূর্তেও বুঝতে পারেনি কেন তাকে হত্যা করা হচ্ছে।
তারপর চোখের জল মুছে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো—হে পরম করুণাময়, বাঙালিকে আর কোনো পনেরোই আগস্ট দেখাবেন না। কোনো পরিবারের ওপর এমন অন্ধকার নেমে আসতে দেবেন না। রাজনৈতিক মতভেদকে হত্যায়, ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে প্রতিহিংসায় এবং ধর্মকে বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হওয়া থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের নেতাদের বিবেক, রাষ্ট্রকে ন্যায়বিচার এবং জনগণকে পরস্পরের প্রতি মমতা দান করুন। প্রতিটি শিশুকে নিরাপদ রাখুন; প্রতিটি মায়ের কোল পূর্ণ রাখুন।
আগস্ট যেন আর বাঙালির জন্য রক্ত, অভিশাপ ও বিচ্ছেদের মাস হয়ে না আসে। বরং এই মাস ফিরে আসুক আত্মসমালোচনা, সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার ও মানবিক পুনর্জাগরণের বার্তা নিয়ে। শোকের স্মৃতি মুছে না যাক, কিন্তু সেই স্মৃতি থেকে জন্ম নিক এমন এক বাংলাদেশ—যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও নিরাপদ, শিশু অমর্যাদিত নয়, ইতিহাস বিকৃত নয় এবং মানুষের জীবন ক্ষমতার চেয়ে মূল্যবান।
আগস্ট চলছে—কাঁদো বাঙালি, কাঁদো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, আর যেন কোনো ট্র্যাজেডি না ঘটে। কান্নার আগস্ট একদিন সৌভাগ্যের আগস্ট হয়ে আসুক; বাঙালির আকাশে আর রক্তের মেঘ নয়, শান্তি, ন্যায় ও মানবতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বিস্ময়করআগস্ট #ক্যালেন্ডারেরবাইরেআরেকআগস্ট #আগস্টেরইতিহাস #বাংলারকান্না #দারাশিকোহ #মাজমাউলবাহরাইন #বহুত্ববাদ #বাংলারমহাদুর্ভিক্ষ #দুর্ভিক্ষ১৯৪৩ #চুয়াত্তরেরদুর্ভিক্ষ #খাদ্যনিরাপত্তা #খাদ্যঅধিকার #বাংলাদেশেরবন্যা #বন্যা১৯৮৮ #বন্যা১৯৯৮ #জলবায়ুন্যায়বিচার #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #আগস্ট২০০৭ #বিশ্ববিদ্যালয়েরস্বাধীনতা #রোহিঙ্গাসংকট #রোহিঙ্গাশরণার্থী #রাষ্ট্রহীনমানুষ #বৈরুতবিস্ফোরণ #আফগানিস্তান #কাবুলবিমানবন্দর #রবীন্দ্রনাথঠাকুর #সাতইআগস্ট #বঙ্গবন্ধু #শেখমুজিবুররহমান #পনেরোইআগস্ট #শেখরাসেল #জাতীয়শোক #রাজনৈতিকহত্যাকাণ্ড #মানবাধিকার #ন্যায়বিচার #জবাবদিহি #মানবিকরাষ্ট্র #ইতিহাসেরশিক্ষা #অধিকারপত্র #OdhikarPatra #AmazingAugust #BengalFamine #DaraShikoh #RohingyaCrisis #BeirutExplosion #Afghanistan #Bangabandhu #SheikhRussell #HumanRights #Justice #NeverAgain