08/22/2026 ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ২২ বছর: বিচারহীনতার দীর্ঘপথ ও আইনি মোড় পরিবর্তনের চিত্র
Special Correspondent
২১ August ২০২৬ ২১:০০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে চালানো হয় একের পর এক গ্রেনেড হামলা। এতে আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং আহত হন শতাধিক নেতা-কর্মী। আজ সেই মর্মান্তিক ঘটনার ২২ বছর পূর্ণ হলো।
দেড় মিনিটে বিস্ফোরিত ১১ গ্রেনেড
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। বিকেল ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছে একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। প্রায় ২০ মিনিটের বক্তব্য শেষে তিনি বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন। এরপর মঞ্চ থেকে নিচে নামার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা।
প্রায় দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়। হামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্তত ৩০০ মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী আইভি রহমান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ছিলেন।
মামলা ও তদন্তে আসে নানা মোড়
হামলার পর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। শুরু থেকেই মামলার তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দেয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলাগুলোর তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। পরের বছর সিআইডি হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলায় ২২ জনকে আসামি করে পৃথক অভিযোগপত্র দেয়।
এরপর ২০০৯ সালে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্রে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। পরে বিভিন্ন কারণে মামলার মোট আসামির সংখ্যা ৪৯ জনে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালের রায়ে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ দুই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারেক রহমানসহ আরও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের আবেদন ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
২০২৪ সালে হাইকোর্টে সব আসামি খালাস
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মামলায় দুর্বল ও শোনা সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে বিচারিক আদালতের রায় দেওয়া হয়েছিল। হামলার সঙ্গে কে সরাসরি জড়িত বা কে গ্রেনেড ছুড়েছে—এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্দিষ্ট প্রমাণের ঘাটতির কথাও রায়ে উঠে আসে।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচার আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হামলার ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছিল।
আপিল বিভাগেও বহাল থাকে খালাস
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। তবে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের মতে, তথ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনি বিষয় পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে কোনো দুর্বলতা বা বেআইনি কিছু পাওয়া যায়নি।
হাইকোর্টের রায়ে নতুন করে স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্তের যে পর্যবেক্ষণ ছিল, আপিল বিভাগ সেটিও প্রত্যাহার করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য আদেশের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশনাও বাতিল করা হয়।
দুই দশক পরও রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। মামলায় এক সময় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হলেও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে হামলায় নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
আজ ২১ আগস্ট, সেই রক্তাক্ত হামলার ২২ বছর পূর্ণ হলো। দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি ভয়াবহ সহিংসতার স্মৃতি বহন করে, তেমনি দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনি বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র