08/24/2026 স্বীকৃতির কাগজ আছে, বিশ্বাসের সেতু কোথায়? বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার, অবিশ্বাস ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেও প্রশ্ন একটাই: অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে কীভাবে তৈরি হবে পারস্পরিক বিশ্বাস?
Dr Mahbub
২৩ August ২০২৬ ১০:১০
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন যেন একটি মুদ্রার দুই পিঠ কিংবা চাঁদের আলো–অন্ধকারের গল্প। আমরা রাস্তায় অর্থ চাওয়া, গণপরিবহনে জবরদস্তির অভিযোগ কিংবা দৃশ্যমান আচরণ দেখি; কিন্তু অনেক সময় দেখি না পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যান, বিদ্যালয়ে বুলিং ও অপমান, ভেঙে যাওয়া শিক্ষাজীবন, কর্মক্ষেত্রে পরিচয় গোপনের চাপ, চাকরিতে বৈষম্য, নিরাপদ আবাসনের সংকট এবং হাসপাতালে মর্যাদাহানির মতো অদৃশ্য বাস্তবতা।এই অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে মুদ্রার দুই পিঠ, চাঁদের অদৃশ্য অংশ, ঝরে পড়া ফুল, বৈঠাহীন নৌকা, শিকড়হীন গাছ, অদৃশ্য দড়িতে বাঁধা দৌড়বিদ এবং হিমশৈলের পানির নিচের অংশের মতো analogy দিয়ে দেখানো হয়েছে—একজন হিজড়া মানুষের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য শুধু তাঁর দৃশ্যমান আচরণ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে তাঁর জীবনের পথে পরিবার, বিদ্যালয়, শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সমাজের কোন কোন দরজা বন্ধ হয়েছিল। কারণ প্রান্তিকতা প্রায়ই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষের সম্ভাবনা সংকুচিত হওয়ার দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া।একই সঙ্গে ফিচারটি স্পষ্ট করে—সামাজিক বঞ্চনা কোনো জবরদস্তি, ভয় দেখানো বা বেআইনি আচরণের বৈধতা দেয় না। অধিকার যেমন পরিচয় দেখে বদলাবে না, জবাবদিহিও পরিচয় দেখে বদলানো উচিত নয়। তাই হিজড়া জনগোষ্ঠীকে বুঝতে হলে মুদ্রার দুই পিঠই দেখতে হবে: একদিকে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ণ নাগরিক অধিকার, অন্যদিকে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান আইনি ও সামাজিক জবাবদিহি।
ঢাকার একটি ব্যস্ত সড়ক। যানজটে বাস থেমে আছে। কয়েকজন হিজড়া ব্যক্তি বাসে উঠতেই কোনো যাত্রী মানিব্যাগ বের করেন, কেউ চোখ নামিয়ে রাখেন, কেউ বিরক্ত হন। কারও মনে ভয়—টাকা না দিলে অপমানজনক কথা শুনতে হবে কি না। আবার সেই বাসে ওঠা মানুষটির জীবনের অন্য একটি ছবি আমরা সাধারণত দেখি না—তিনি হয়তো কৈশোরেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, বিদ্যালয়ে অপমানিত হয়েছেন, চাকরির দরজায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, হাসপাতালে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পেয়েছেন।
এই দুই ছবিই বাংলাদেশের বাস্তবতার অংশ। —যেখানে একটি ছবি দেখিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করলে সমস্যাটিকে বোঝা যাবে না। হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য বাস্তব। একইভাবে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জোরপূর্বক টাকা আদায়, হুমকি কিংবা হয়রানির অভিযোগও বাস্তব সামাজিক উদ্বেগ। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বেআইনি আচরণকে পুরো জনগোষ্ঠীর পরিচয় বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি সামাজিক বঞ্চনার ইতিহাস দেখিয়ে জবরদস্তি বা হয়রানিকে বৈধতা দেওয়ারও সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে তাই আলোচনাটি কেবল ‘সহানুভূতি’ বনাম ‘বিরক্তি’র নয়। এটি একই সঙ্গে অধিকার ও দায়িত্ব, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, আইন ও সামাজিক বিশ্বাস এবং সর্বোপরি পূর্ণ নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এ হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন হিসেবে উঠে এসেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যেও এই সংখ্যা ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সংখ্যাটিকে সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে। বিভিন্ন বেসরকারি উৎস ও প্রতিবেদনে এর চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যার প্রাক্কলন পাওয়া যায়—কোথাও ৫০ হাজার, কোথাও এক লাখেরও বেশি মানুষের কথা বলা হয়েছে। এসব প্রাক্কলনের পদ্ধতি ও সংজ্ঞা এক নয়। ফলে ১২,৬২৯-কে বাংলাদেশের সব gender-diverse মানুষের মোট সংখ্যা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি উচ্চতর বেসরকারি প্রাক্কলনকেও যাচাই ছাড়া জাতীয় জনসংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
এর একটি মৌলিক কারণ হলো—‘হিজড়া’, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এবং ‘ইন্টারসেক্স’ সমার্থক পরিচয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক বাস্তবতায় হিজড়া একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়গত পরিচয়ও বহন করে। হিজড়া পরিচয়কে কেবল একটি শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য, যৌন অভিমুখিতা কিংবা একটি একমাত্রিক লিঙ্গপরিচয়ের মধ্যে আটকে দিলে বাস্তবতার জটিলতা হারিয়ে যায়।
এখানেই জননীতির প্রথম চ্যালেঞ্জ। সেবা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য তথ্য দরকার; কিন্তু শ্রেণিবিন্যাস করতে গিয়ে ব্যক্তির আত্মপরিচয়, মর্যাদা, গোপনীয়তা ও বৈচিত্র্য মুছে ফেলা যাবে না।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। স্বীকৃতির পর পরিচয়, ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব দুস্থ ও অসচ্ছল হিজড়া ব্যক্তিদের জন্য মাসিক ৬০০ টাকা বিশেষ ভাতা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্তরে মাসিক ৭০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৮০০ টাকা, উচ্চমাধ্যমিকে ১,০০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১,২০০ টাকা শিক্ষা উপবৃত্তির বিধান রয়েছে। কর্মক্ষম ব্যক্তিদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে এককালীন ১০ হাজার টাকা সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৪০০ জন শিক্ষা উপবৃত্তি, ১২ হাজার ২২৯ জন বিশেষ ভাতা এবং ১,৫০০ জন প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন। এসব উদ্যোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তবে সরকারি কর্মসূচির বিভিন্ন শ্রেণির উপকারভোগী সংখ্যা সরাসরি যোগ করে ‘মোট স্বতন্ত্র উপকারভোগী’ নির্ধারণ করাও সতর্কতার দাবি রাখে, কারণ একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির আওতায় থাকতে পারেন।
আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে—আইনি বা প্রশাসনিক স্বীকৃতি এবং দৈনন্দিন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এক জিনিস নয়। কাগজে পরিচয়ের ঘর তৈরি করা তুলনামূলক সহজ; সহপাঠীর বেঞ্চে জায়গা তৈরি করা কঠিন। ভাতা দেওয়া যায়; কিন্তু চাকরিদাতার পূর্বধারণা বদলানো কঠিন। পরিচয়পত্র দেওয়া যায়; কিন্তু পরিবারের ‘লোকলজ্জা’ একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে দূর করা যায় না।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে আমরা প্রায়ই দেখি রাস্তায়, ট্রাফিক সিগন্যালে, বাজারে কিংবা গণপরিবহনে। কিন্তু খুব কম মানুষই দেখেন সেই পথটি, যেটি একজন মানুষকে ঘর থেকে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে আসে। আমরা অনেক সময় তার হাত বাড়িয়ে টাকা চাওয়ার দৃশ্যটি দেখি; কিন্তু তার বহু বছর আগের কান্না, প্রত্যাখ্যান, অপমান কিংবা ভেঙে যাওয়া শিক্ষাজীবন দেখি না। এই অদৃশ্য ঘটনাগুলোই হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতার সবচেয়ে করুণ ইতিহাস।
মুন্নীর (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা এই নীরব সহিংসতার এক নির্মম উদাহরণ। বিদ্যালয়ে তাঁর হাঁটা ও আচরণ অন্য শিশুদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে না মেলায় সহপাঠীরা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত। ‘মেয়েদের মতো হাঁটে’ বলে টিটকারি দেওয়া হতো, ‘হিজড়া’ বলে ডাকা হতো। নির্যাতন শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সহপাঠীরা মারধর করত, এমনকি তাঁর প্যান্ট খুলে দেওয়ার মতো চরম অপমানও করেছিল।
একটি শিশুর জন্য বিদ্যালয় হওয়ার কথা নিরাপদ শেখার জায়গা। কিন্তু যে জায়গায় বই হাতে যাওয়ার কথা, সেখানে যদি তাকে নিজের শরীর ও পরিচয় বাঁচাতে হয়, তাহলে শিক্ষা আর শেখার অভিজ্ঞতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে প্রতিদিনের আতঙ্ক।
এই ধরনের ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক হলো, অনেক শিশুই শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। তখন সমাজ পরে প্রশ্ন করে—“তারা শিক্ষিত নয় কেন?” কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে—বিদ্যালয় কি তাদের থাকতে দিয়েছিল?
হিজড়া বা gender-diverse শিশুর জীবনে সবচেয়ে গভীর আঘাত অনেক সময় অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না; আসে নিজের পরিবার থেকেই। পত্রিকায় প৫্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোনো কোনো শিশুর পড়াশোনা পরিবারের সিদ্ধান্তেই বন্ধ হয়ে গেছে। লিঙ্গপ্রকাশ প্রচলিত প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলায় পরিবার তাকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। কোথাও লজ্জা, কোথাও সামাজিক চাপ, কোথাও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়—সব মিলিয়ে একজন সন্তান ধীরে ধীরে নিজের ঘরেই অপর হয়ে যায়।
এরপর কোনো একদিন তাকে বাড়ি ছাড়তে হয় বা সে নিজেই চলে যায়। বাইরের মানুষ তখন শুধু একজন হিজড়া ব্যক্তিকে দেখে; কিন্তু দেখে না সেই মানুষটি হয়তো বহু বছর নিজের মায়ের রান্নাঘর, বাবার ডাক, ভাইবোনের সঙ্গে ঘুমানো, ঈদের দিন কিংবা পরিবারের জন্মদিন—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন।
এই বিচ্ছিন্নতা শুধু আবাসন হারানো নয়। এটি নিজের প্রথম সামাজিক পরিচয় হারানো। আর পরিবার হারানোর পর অনেকেই আশ্রয়ের জন্য গুরু-মা বা হিজড়া সম্প্রদায়ের সামাজিক পরিবারের দিকে যান। সেই নতুন পরিবার তাদের বাঁচায়, কিন্তু একই সঙ্গে মূলধারার সমাজ থেকে দূরত্বও স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা নিবন্ধে পরিবার থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত ধারাবাহিক বঞ্চনার এই চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
জয়ার (ছদ্মনাম) গল্প আরেক ধরনের করুণ বাস্তবতা দেখায়। তিনি ভালো ফল নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছিলেন। অর্থাৎ শিক্ষা ও সক্ষমতার দিক থেকে সামনে এগোনোর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় তাঁর পথ সহজ হয়নি। পরে তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন।
সেখানেও নিরাপদ থাকার উপায় হয়ে দাঁড়ায়—নিজের পরিচয় গোপন করা। একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব আর কী হতে পারে—প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে হবে, সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে হবে, অথচ নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রকাশ পেলেই চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা সম্মান হারানোর ভয়।
অনুসন্ধানমূলক তথ্য উদঘাটনে জানা যায় , সহকর্মীরা পরিচয় জানতে পারার পর জয়া যৌন হয়রানির শিকার হন। এখানে চাকরি পাওয়া সাফল্য নয়; বরং প্রশ্ন হলো—কোন মূল্য দিয়ে সেই চাকরি ধরে রাখতে হয়েছে? কর্মক্ষেত্রে যদি একজন মানুষকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে কর্মসংস্থান থাকলেও নাগরিক মর্যাদা সম্পূর্ণ হয় না।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ইতিহাসে সবচেয়ে অপমানজনক নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল সরকারি চাকরির নিয়োগকে কেন্দ্র করে। কয়েকজন হিজড়া আবেদনকারী চাকরির জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁদের তথাকথিত ‘প্রকৃত হিজড়া’ কি না তা নির্ধারণের নামে শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ঘটনাটি নথিভুক্ত হয়েছে।
ভাবা যায়—একজন মানুষ চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মক্ষমতা কিংবা পেশাগত সক্ষমতা মূল্যায়নের কথা। অথচ এক পর্যায়ে তাঁর শরীরই যেন রাষ্ট্রীয় সন্দেহের বস্তু হয়ে গেল। অধিকার পাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রমাণ করতে হলো—তিনি আসলে কে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অপমান ছিল না; রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং বাস্তব প্রশাসনিক আচরণের মধ্যকার ভয়াবহ ব্যবধানের উদাহরণও ছিল।
যে রাষ্ট্র পরিচয়কে স্বীকৃতি দেয়, সেই রাষ্ট্রের কোনো প্রক্রিয়ায় যদি সেই পরিচয় যাচাই করতে গিয়ে ব্যক্তির শরীর, গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে স্বীকৃতিই উল্টো বঞ্চনার যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
অসুস্থ হলে একজন নাগরিকের পরিচয় হওয়ার কথা—তিনি একজন রোগী। কিন্তু বাংলাদেশের হিজড়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হাসপাতালেও এই সাধারণ অবস্থান সবসময় নিশ্চিত হয় না।
২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের ১৬ জেলার ৫৪৪ জন হিজড়া ব্যক্তিকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, হয়রানি, আর্থিক সমস্যা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক অসুস্থতায় হিজড়া পরিচয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একাধিক ধরনের বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।
এই বাস্তবতার করুণ দিকটি সংখ্যায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ভাবুন, একজন মানুষ জ্বর, ব্যথা বা গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে গেছেন। চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগে যদি তাঁর শরীর, কণ্ঠস্বর বা পরিচয় নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়; অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয়; কেউ হাসাহাসি করে; কিংবা তাঁকে কোন ওয়ার্ডে রাখা হবে তা নিয়েই দ্বিধা তৈরি হয়—তাহলে হাসপাতাল নিজেই আর নিরাপদ জায়গা থাকে না।
পরবর্তীবার তিনি অসুস্থ হলেও হয়তো হাসপাতালে যেতে দেরি করবেন। বৈষম্যের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ কখনো কখনো এটাই—মানুষকে সরাসরি সেবা থেকে তাড়িয়ে দিতে হয় না; এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয় যে সে নিজেই আর ফিরে যেতে চায় না।
প্রান্তিকতার আরেকটি কম আলোচিত দিক হলো আবাসন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর একজন হিজড়া ব্যক্তি যদি সাধারণ বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিতে না পারেন, তাহলে তাঁর সামনে বিকল্প খুব সীমিত হয়ে যায়। শিক্ষা বা চাকরি থাকলেও নিরাপদ আবাসন না থাকলে স্বাধীন জীবন গড়ে তোলা কঠিন।
এটি একটি chain reaction তৈরি করে। যেমন:
পরিবার নেই → নিরাপদ বাসস্থান নেই → নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই → স্থায়ী চাকরি কঠিন → ব্যাংক, পরিচয় ও সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা → আবার সম্প্রদায়নির্ভর জীবন।
এখানেই বোঝা যায়, প্রান্তিকতা শুধু একটি চাকরি না পাওয়ার নাম নয়। একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরপর দরজা বন্ধ করলে শেষ পর্যন্ত তার সামনে যে কয়েকটি পথ খোলা থাকে, সমাজ আবার সেই পথগুলোকেই তার ‘স্বভাব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
গণপরিবহন কিংবা দোকানে জোর করে টাকা আদায়ের অভিযোগ বাস্তব এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই দৃশ্যটিই যদি হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমাদের একমাত্র পরিচয় হয়, তাহলে সামাজিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
আমরা হয়তো একজন হিজড়া ব্যক্তিকে বাসে টাকা চাইতে দেখি। কিন্তু দেখি না—
এগুলো কোনো জবরদস্তিমূলক আচরণের নৈতিক বৈধতা দেয় না। বরং দেখায়—আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কেন বিকল্প জীবিকার বাস্তব পথ তৈরি করাও জরুরি। কারণ শুধু রাস্তা থেকে কাউকে সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থান বদলায়; কারণ বদলায় না।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাটি সবসময় শারীরিক নির্যাতন, চাকরি হারানো কিংবা হাসপাতালের অপমান নয়। সবচেয়ে করুণ ঘটনাটি হতে পারে খুব সাধারণ একটি দৃশ্য— একজন বৃদ্ধ হিজড়া মানুষ বহু বছর পর নিজের পরিবারের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, কিন্তু ভেতরে ঢোকার সামাজিক অধিকার অনুভব করলেন না।
একজন শিক্ষিত হিজড়া মানুষ চাকরির আবেদনপত্র পূরণ করতে গিয়ে থমকে গেলেন—gender-এর ঘরে কী লিখবেন তা নিয়ে নয়, লিখলে সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাবেন কি না তা নিয়ে। একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার আগে ভাবলেন—ব্যথা সহ্য করবেন, নাকি আবার অপমান সহ্য করবেন। একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার আগে আয়নায় নিজের হাঁটা, কথা বলা বা হাত নাড়ার ভঙ্গি বদলানোর অনুশীলন করল—যাতে সহপাঠীরা তাকে নিয়ে হাসে না।
এই দৃশ্যগুলোর সবকটির হয়তো সংবাদ প্রতিবেদন নেই। কিন্তু নথিভুক্ত বৈষম্য, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, কর্মক্ষেত্রের প্রত্যাখ্যান এবং স্বাস্থ্যসেবায় বাধার ধারাবাহিকতার আলোকে এগুলো আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—প্রান্তিকতা অনেক সময় বড় কোনো ঘটনার নাম নয়; এটি প্রতিদিন একটু একটু করে একজন মানুষের সম্ভাবনা সংকুচিত হওয়ার প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনপরিসরে আমরা প্রায়ই তাদের জীবনের শেষ দৃশ্যটি দেখি—রাস্তার জীবন, অর্থ চাওয়া, দলবদ্ধ বসবাস, সামাজিক দূরত্ব। কিন্তু তার আগের দৃশ্যগুলো খুব কমই দেখি।
এই অদৃশ্য ঘটনাগুলো সামনে না আনলে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমাদের বিচার অসম্পূর্ণ থাকবে। কারণ একজন মানুষ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছেন তা দেখার পাশাপাশি, কোন কোন দরজা তাঁর সামনে বন্ধ হয়েছিল—সেটিও দেখতে হবে। আর সম্ভবত সেখানেই বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে না-দেখা করুণ ইতিহাসটি লুকিয়ে আছে।
একটি শিশুর জীবনের প্রথম প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র নয়—পরিবার। সেখানেই যদি সে প্রথম শেখে, ‘তুমি আমাদের মতো নও’, তাহলে পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্রের একটি পরিচয়পত্র সেই ক্ষত পুরোপুরি সারাতে পারে না।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রজন্মের হিজড়া মানুষের শিক্ষাজীবনের বিবরণে বিদ্যালয়ের অসহযোগিতা, সহপাঠীদের উপহাস, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। মুন্নী, সাবিরুন্নেসা এবং ‘ন’ নামে উপস্থাপিত তিন ব্যক্তির জীবনের অভিজ্ঞতাও দেখায়—কেউ পরিবারের সিদ্ধান্তে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ সহপাঠীদের টিটকারি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কেউ প্রতিকূল পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
একটি বর্ণনায় মুন্নী জানিয়েছেন, সহপাঠীরা তাঁর হাঁটা নিয়ে টিটকারি দিত, ‘হিজড়া’ বলে ডাকত, মারধর করত—এমনকি পোশাক খুলে দেওয়ার মতো অপমানজনক নির্যাতনও ঘটেছে।
এসব অভিজ্ঞতা কেবল কয়েকটি ব্যক্তিগত গল্প নয়। বাংলাদেশের পাঁচটি শহরে ৩৪৬ জন হিজড়া ব্যক্তিকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে ৭৩.৩ শতাংশ, শিক্ষাসংক্রান্ত ৫৯.৩ শতাংশ, রাজনৈতিক ৫৮.৫ শতাংশ, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত ৪৬.৪ শতাংশ, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ৪২.৭ শতাংশ এবং সামাজিক ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত লঙ্ঘন ৩৪.৪ শতাংশ।
এটি বাংলাদেশের সব হিজড়া মানুষের ওপর করা জাতীয় জরিপ নয়। তাই এসব শতাংশকে পুরো জনগোষ্ঠীর হার বলা যাবে না। কিন্তু গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়—বঞ্চনা একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়; একই মানুষের জীবনের একাধিক দরজায় বাধা তৈরি হতে পারে।
হিজড়া শিশু-কিশোরদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিণতি শুধু একটি সার্টিফিকেট না পাওয়া নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, আয়, সামাজিক যোগাযোগ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন জীবনযাপনের সম্ভাবনাও জড়িয়ে থাকে।
অতীতের বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষানীতিতে হিজড়া শিশুদের প্রয়োজন পৃথকভাবে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে—সে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক শিক্ষাক্রমে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের বিষয় আলোচনায় এলেও শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তবায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
এখানে মূল প্রশ্নটি আলাদা হিজড়া বিদ্যালয় তৈরি করা নয়; বরং মূলধারার বিদ্যালয় কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যাচ্ছে। যারা ইতিমধ্যে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছেন, তাদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগের শিক্ষা, উন্মুক্ত শিক্ষা কিংবা বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আলাদা প্রতিষ্ঠানই যদি প্রধান সমাধান হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ীও করতে পারে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা মানে একই ভবনে উপস্থিতি নয়। ভর্তি, ইউনিফর্ম, টয়লেট, বুলিং, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তা, নাম ও পরিচয়ের ব্যবহার এবং শিক্ষক-সহপাঠীর আচরণ—সব ক্ষেত্রেই মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
কলঙ্ক যখন মানুষের পরিচয়ের আগে হাঁটে
সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যানের stigma বা সামাজিক কলঙ্কের ধারণা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সমাজ কখনো কোনো একটি বৈশিষ্ট্যকে এমন নেতিবাচক অর্থ দেয় যে মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় সেই একটি বৈশিষ্ট্যের আড়ালে চলে যায়।
একজন হিজড়া ব্যক্তি হয়তো শিক্ষার্থী, দক্ষ রাঁধুনি, উদ্যোক্তা, শিল্পী, কম্পিউটার অপারেটর, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, শিক্ষক, সমাজকর্মী বা সংগঠক। কিন্তু তাঁকে দেখেই যদি প্রথম এবং একমাত্র পরিচয় হয় ‘হিজড়া’, আর সেই শব্দের সঙ্গে যদি আগে থেকেই ‘ভয়’, ‘চাঁদাবাজি’, ‘অশ্লীলতা’ বা ‘অস্বাভাবিকতা’র ধারণা জুড়ে থাকে, তাহলে তাঁর অন্য সব পরিচয় অদৃশ্য হয়ে যায়।
‘হিজড়া’ শব্দটিকেও অনেক সময় একটি সম্প্রদায়ের পরিচয়ের বদলে অপমানসূচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ভাষা নিছক শব্দ নয়—ভাষা আচরণ তৈরি করে। শিশুকে যদি ‘হিজড়া’ শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহার করতে শেখানো হয়, সে বড় হয়ে একজন হিজড়া সহকর্মীকে সমমর্যাদার পেশাজীবী হিসেবে গ্রহণ করতে অসুবিধা বোধ করতে পারে।
অন্যদিকে হিজড়া মানুষও যদি অ-হিজড়া সমাজের সঙ্গে বারবার প্রত্যাখ্যান, উপহাস, সহিংসতা, পুলিশি হয়রানি কিংবা চাকরিতে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাহলে বৃহত্তর সমাজের প্রতি তাঁর আস্থাও ক্ষয়ে যেতে পারে। এভাবেই কলঙ্ক থেকে সামাজিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব থেকে অবিশ্বাস এবং অবিশ্বাস থেকে আরও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের contact hypothesis বা আন্তঃগোষ্ঠী সংযোগের ধারণা আমাদের এই জায়গাটি বুঝতে সাহায্য করে। একজন দোকানদারের সঙ্গে হিজড়া মানুষের একমাত্র যোগাযোগ যদি হয় মাসে একদিন টাকা চাওয়ার সময়, তাহলে তাঁর কাছে ‘হিজড়া’ পরিচয়ের অর্থ সেই অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু একই ব্যক্তি যদি তাঁর সন্তানের স্কুলে একজন হিজড়া শিক্ষক, ব্যাংকে কর্মকর্তা, হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমে সংবাদকর্মী, ব্যবসায় উদ্যোক্তা কিংবা অফিসে সহকর্মী হিসেবে হিজড়া মানুষকে নিয়মিত দেখেন, তাহলে পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক অর্থ বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়।
একইভাবে একজন হিজড়া মানুষের অ-হিজড়া সমাজের সঙ্গে প্রধান অভিজ্ঞতা যদি হয় প্রত্যাখ্যান, অপমান ও বৈষম্য, তাহলে তিনিও সমাজকে বিশ্বাস করতে শিখবেন কীভাবে? বিশ্বাস বক্তৃতা থেকে আসে না; বিশ্বাস তৈরি হয় পুনরাবৃত্ত নিরাপদ, সমমর্যাদাপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে।
Social construction of gender বা লিঙ্গের সামাজিক নির্মাণের ধারণাও বিষয়টি বোঝার আরেকটি পথ। একটি সমাজ নারী ও পুরুষের আচরণ, পোশাক, চলন, পেশা ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে নির্দিষ্ট প্রত্যাশা তৈরি করে। যারা সেই প্রত্যাশার বাইরে অবস্থান করেন, তাদের সহজেই ‘অন্য’ হিসেবে দেখা হয়।
এখানেই ‘অপরকরণ’ বা othering-এর প্রক্রিয়া শুরু হয়। একজন শিশুর লিঙ্গপ্রকাশ প্রচলিত প্রত্যাশার সঙ্গে না মিললেই যদি তাকে উপহাস করা হয়, পরিবার তাকে লুকিয়ে রাখতে চায় কিংবা বিদ্যালয় তাকে সমস্যার উৎস হিসেবে দেখে, তাহলে সেই শিশুটি খুব অল্প বয়সেই শিখে যায়—মূলধারার সমাজে তার জায়গাটি অনিশ্চিত। তাই অন্তর্ভুক্তির কাজ শিশুকে ‘স্বাভাবিক’ বানানো নয়; প্রতিষ্ঠানকে এমন করা, যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও প্রত্যেকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে অংশ নিতে পারে।
আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা অনেক হিজড়া ব্যক্তিকে অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ আয়ের পথে ঠেলে দেয়। বাস্তব জীবনের চিত্র আমাদের দেখায় কিভাবে তারা ভিক্ষাবৃত্তি, যৌনকর্ম এবং স্থানীয়ভাবে ‘ছল্লা’ নামে পরিচিত অর্থ সংগ্রহের সাথে জড়িয়ে যায়।
রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, বাজার, দোকান কিংবা বাসাবাড়িতে গিয়ে টাকা চাওয়া এবং নবজাতককে আশীর্বাদ করার বিনিময়ে উপহার নেওয়ার ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রথাও রয়েছে। কিন্তু স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার বা অনুদান এবং ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এক বিষয় নয়।
হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে তীব্র অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে জোরপূর্বক টাকা আদায়। গণপরিবহন, দোকান, বাজার, বিয়ে কিংবা নবজাতকের বাড়িতে অর্থ দাবি এবং টাকা না দিলে অপমান, হুমকি বা হয়রানির অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে নবজাতকের পরিবার থেকে ১১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের উদাহরণও রয়েছে।
কেউ যদি ভয় দেখান, পথ আটকে দেন, অশালীন আচরণ করেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে শরীর স্পর্শ করেন কিংবা জোর করে টাকা নেন—তিনি যে পরিচয়েরই মানুষ হোন, সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এখানেই বিশ্লেষণ শেষ করলে একটি বড় প্রশ্ন বাদ পড়ে যায়—কেন একটি জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমান অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনানুষ্ঠানিক আয়ের এমন ব্যবস্থায় আটকে থাকে?
উত্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, দক্ষতা অর্জনের সীমিত সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বাসা ভাড়া পাওয়ার সমস্যা, সংকীর্ণ সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা।
বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সামাজিক বর্জনের ‘extreme margin’-এ অবস্থানকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল; সেখানে শারীরিক, মৌখিক ও যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও উঠে আসে। এর কোনোটিই জবরদস্তির পক্ষে যুক্তি নয়। বরং শিক্ষা হচ্ছে—অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ এবং অপরাধ তৈরির সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তন—দুটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে।
একজন দোকানদারকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা যাবে না। একই সঙ্গে একজন যোগ্য হিজড়া নাগরিককে তাঁর পরিচয়ের কারণে চাকরি না দেওয়াকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যাবে না। আইন সবার জন্য এক; অধিকারও সবার জন্য এক।
সরকার বিভিন্ন সময়ে হেয়ারকাটিং, বিউটিফিকেশন, ড্রাইভিং, কম্পিউটার, সেলাই, ব্লক-বাটিক, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন ট্রেডে হিজড়া ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান এক জিনিস নয়।
একজন হিজড়া নারী দক্ষভাবে পোশাক তৈরি শিখলেন, কিন্তু ক্রেতা যদি তাঁর পরিচয়ের কারণে তাঁর কাছ থেকে পোশাক কিনতে না চান, তাহলে দক্ষতা আয় তৈরি করবে না। একজন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিলেন, কিন্তু সাক্ষাৎকার বোর্ড তাঁকে দেখে অস্বস্তি বোধ করলে সার্টিফিকেটের বাজারমূল্য কমে যায়।
পর্যবেক্ষণ উপকরণে জয়ার অভিজ্ঞতাও এসেছে। ভালো ফল নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরও তাঁর উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের পথ সহজ হয়নি; পোশাক কারখানায় কাজের সময় পরিচয় গোপন রাখা এবং পরবর্তী সময়ে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে শাম্মীর বিউটি পার্লারের মতো উদ্যোক্তা উদ্যোগ কিংবা চট্টগ্রামে হিজড়া ব্যক্তিদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগের উদাহরণ দেখায়—প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হলে বিকল্প জীবিকার পথও তৈরি করা সম্ভব।
UNDP-এর ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার তরুণদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি কেস স্টাডিতেও দেখা যায়, প্রশিক্ষণ থাকার পরও সামাজিক ট্যাবুর কারণে বাজারে কাজ কিংবা গ্রাহক পাওয়া কঠিন হতে পারে। সেখানে নিয়োগদাতাদের sensitization, workplace anti-harassment ব্যবস্থা এবং সরাসরি job placement-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সাফল্য শুধু ‘কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন’ দিয়ে মাপলে চলবে না। জানতে হবে—
প্রশিক্ষণের output নয়, জীবিকার outcome মাপতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন। অথচ হিজড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বাধা শুধু অর্থনৈতিক নয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের ১৬ জেলার ৫৪৪ জন হিজড়া ব্যক্তিকে নিয়ে একটি গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, হয়রানি, আর্থিক সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অসুস্থতায় হিজড়া পরিচয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া অংশগ্রহণকারীদের বিশ্লেষণে ৫৩.৫ শতাংশ চার ধরনের বাধাই কোনো না কোনোভাবে অনুভব করেছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে উঠে এসেছে। এখানে intersectionality বা আন্তঃসংযোগমূলক বৈষম্যের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন দরিদ্র, পরিবারবিচ্ছিন্ন, কম শিক্ষিত হিজড়া ব্যক্তি হাসপাতালে গেলে তাঁর দারিদ্র্য, লৈঙ্গিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে না; একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত হয়ে বাধাকে আরও তীব্র করতে পারে।
তাই শুধু একটি আলাদা টয়লেট তৈরি কিংবা একটি সচেতনতামূলক কর্মশালা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন রোগীর পছন্দের নাম ব্যবহার, গোপনীয়তা রক্ষা, informed consent নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল ও পরীক্ষা বন্ধ করা, বৈষম্যের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ। মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবাও এই ব্যবস্থার অংশ হওয়া প্রয়োজন—বিশেষত দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রত্যাখ্যান, সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা যাঁদের রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পরও আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিজড়া মানুষের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে লাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা, যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং উত্তরাধিকার অধিকারের অস্পষ্টতার প্রসঙ্গ এসেছে। বিশেষত উত্তরাধিকার প্রশ্নে প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় বিধানের বাস্তব প্রয়োগে হিজড়া ব্যক্তির অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজে বিভ্রান্তি এবং বিরোধ দেখা দিতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—লিঙ্গপরিচয়, শারীরিক যৌন বৈশিষ্ট্য এবং যৌন অভিমুখিতা এক বিষয় নয়। এগুলোকে এক করে দেখলে আইন ও নীতি উভয় ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাই আইন সংস্কারের আলোচনায় প্রয়োজন নির্ভুল সংজ্ঞা, মানবিক মর্যাদা, সমান সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ।
অধিকার দেওয়ার নামে শরীরের অপমান নয়
২০১৫ সালের সরকারি চাকরির একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হিজড়া আবেদনকারীদের তথাকথিত ‘প্রকৃত হিজড়া’ শনাক্ত করার নামে অপমানজনক শারীরিক পরীক্ষার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছিল।
ঘটনাটি একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—অধিকার দেওয়ার নামে যদি মানুষের শরীর, পরিচয় ও গোপনীয়তাকে অপমান করা হয়, তাহলে অন্তর্ভুক্তির নীতিই বঞ্চনার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ, যখন প্রশাসনের আচরণেও সেই মর্যাদা প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর ‘উৎপত্তি’ খুঁজতে গিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—হিজড়া কোনো নির্দিষ্ট সময়ে জন্ম নেওয়া একক জৈবিক জনগোষ্ঠী নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় কয়েক শতাব্দী ধরে বিবর্তিত একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, লৈঙ্গিক এবং সম্প্রদায়গত পরিচয়। ফলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে কেবল জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য, intersex অবস্থা, transgender পরিচয় কিংবা যৌন অভিমুখিতার ইতিহাস হিসেবে দেখা নৃতাত্ত্বিকভাবে যথাযথ নয়। বরং বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও gender identity-র মানুষ কীভাবে একটি স্বতন্ত্র সামাজিক সম্প্রদায়, আত্মীয়তার কাঠামো, ভাষা, আচার, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সংগঠিত হয়েছেন—সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটিই হিজড়া পরিচয়ের ইতিহাস।
বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠী এই বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় Hijra cultural tradition-এর অংশ। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন স্থানীয় পার্থক্য থাকলেও গুরু–চেলা সম্পর্ক, নির্বাচিত বা সামাজিক পরিবার, আশীর্বাদ ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশনার কিছু ঐতিহ্য এবং মূলধারার নারী–পুরুষ দ্বৈত পরিচয়ের বাইরে একটি পৃথক সামাজিক পরিচয়—এসবের মধ্যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দেখা যায়। বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ethnographic গবেষণাও হিজড়া জনগোষ্ঠীকে প্রচলিত নারী–পুরুষ দ্বৈততার বাইরে অবস্থিত একটি সামাজিক পরিচয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য, ধর্মীয় কাহিনি কিংবা পৌরাণিক চরিত্রের উল্লেখ করা হয়। এগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় gender variance সম্পর্কে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির সাক্ষ্য দিতে পারে। কিন্তু আধুনিক হিজড়া সম্প্রদায়ের সরাসরি ‘উৎপত্তি’ কোনো একটি পৌরাণিক চরিত্র বা নির্দিষ্ট প্রাচীন ঘটনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক পদ্ধতি নয়।
নৃতত্ত্ব এখানে lineage-এর চেয়ে social formation-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—‘প্রথম হিজড়া কে ছিলেন?’ বরং—কখন এবং কীভাবে লিঙ্গের প্রচলিত নারী–পুরুষ শ্রেণির বাইরে থাকা বিভিন্ন মানুষ নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক সম্প্রদায় হিসেবে সংগঠিত করতে শুরু করলেন?
এই দৃষ্টিতে হিজড়া পরিচয় কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি; এটি দীর্ঘকাল ধরে ধর্ম, রাজনীতি, পরিবার, পেশা, দেহ, যৌনতা এবং সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক পরিচয়।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যযুগীয় ইতিহাসে eunuch, khwajasara এবং gender-variant মানুষের বিভিন্ন ধরনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তাঁরা রাজদরবার, রাজপরিবার, প্রশাসন, অভিজাত পরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার—ঐতিহাসিক khwajasara, palace eunuch এবং আধুনিক Hijra একেবারে অভিন্ন সামাজিক শ্রেণি নয়। গবেষক Jessica Hinchy-র ঐতিহাসিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ঔপনিবেশিক নথিতে khwajasara এবং feminine-identifying Hijra-কে কখনো পৃথক সামাজিক শ্রেণি হিসেবে দেখা হয়েছে।
অতএব মুঘল দরবারে eunuch বা khwajasara-দের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছিল—এ তথ্য থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে বর্তমান হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রত্যেক সামাজিক কাঠামো তখন একইভাবে বিদ্যমান ছিল।
তবু এই ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়: নারী–পুরুষের দ্বৈততার বাইরে কিংবা প্রচলিত পুরুষত্বের বাইরে অবস্থানকারী মানুষের সামাজিক ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নয়। অর্থাৎ আজকের সামাজিক ধারণায় হিজড়া জনগোষ্ঠীকে যতটা ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘সমাজের বাইরের’ বলে মনে করা হয়, ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
আধুনিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একজন মানুষ হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য হলেই তিনি অবশ্যই একই ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মেছেন, এমন ধারণা ভুল।
হিজড়া পরিচয়ের মধ্যে থাকতে পারেন বিভিন্ন ধরনের gender-diverse ব্যক্তি। ঐতিহাসিকভাবে ইংরেজি সাহিত্যে ‘eunuch’, ‘hermaphrodite’ কিংবা ‘transvestite’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে হিজড়াদের বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু আধুনিক গবেষণায় এসব শব্দের অনেকগুলোই অপ্রতুল, পুরোনো কিংবা বিভ্রান্তিকর হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের গবেষণাতেও দেখা যায়, হিজড়া পরিচয়কে নারী–পুরুষের প্রচলিত দ্বৈত শ্রেণির বাইরে একটি সামাজিক পরিচয় হিসেবে দেখা অধিক কার্যকর।
এই কারণে Hijra identity simultaneously embodied and social—অর্থাৎ দেহ ও gender identity গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রদায়গত সদস্যপদ, সামাজিক স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ এবং সম্পর্কের কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হিজড়া সম্প্রদায়ের বিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো গুরু–চেলা (guru–chela) ব্যবস্থা। পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যাত বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অনেক gender-diverse ব্যক্তি অন্য হিজড়া মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। এরপর কোনো গুরু বা গুরুমার অধীনে চেলা হিসেবে একটি সামাজিক পরিবারের অংশ হতে পারেন।
বাংলাদেশে পরিচালিত ethnographic গবেষণায় দেখা গেছে, গুরু শুধু নেতা নন; তিনি নতুন সদস্যকে হিজড়া সম্প্রদায়ের সামাজিক আচরণ, সম্পর্ক, জীবিকার ধরন এবং সম্প্রদায়গত নিয়ম শেখাতে পারেন। চেলারা পরস্পরের সঙ্গে এমন একটি সামাজিক আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যা অনেক ক্ষেত্রে জন্মপরিবারের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। নৃতত্ত্বের ভাষায় এটিকে fictive kinship বা chosen kinship হিসেবে বোঝা যায়—অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক নয়, সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মীয়তা নির্মিত হয়।
এই কাঠামোর একটি মৌলিক সামাজিক প্রয়োজনও রয়েছে। যখন জন্মপরিবার কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয়, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহায়তা কিংবা সামাজিক পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিবার সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। তবে গুরু–চেলা ব্যবস্থা নিয়ে romanticize করাও ঠিক নয়। বাংলাদেশের গবেষণায় এই কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষা ও belonging-এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অসমতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোষণের অভিজ্ঞতাও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এটি একই সঙ্গে survival institution এবং power structure।
দীর্ঘ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিজড়া সম্প্রদায়ের ভেতরে স্বতন্ত্র cultural practices গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের যোগাযোগের বিশেষ শব্দভাণ্ডার ও সাংকেতিক ভাষার ব্যবহার নিয়ে গবেষণায় আলোচনা রয়েছে। গুরু–চেলা সম্পর্ক, নিজেদের মধ্যে সম্বোধন, সামাজিক অনুষ্ঠান, নির্দিষ্ট জীবিকার রীতি এবং সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ আচরণবিধি মিলিয়ে একটি distinct subculture তৈরি হয়েছে।
এর নৃতাত্ত্বিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলধারার সমাজ কোনো গোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময় বাইরে রাখলে সেই গোষ্ঠী শুধু ‘বঞ্চিত জনগোষ্ঠী’ হয়ে থাকে না; নিজেদের নিরাপত্তা, পরিচয় ও সামাজিক সংহতির জন্য তারা বিকল্প সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ—
Exclusion → Community formation → Alternative kinship → Cultural identity → Community continuity
হিজড়া সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক টিকে থাকার একটি বড় কারণ এই নিজস্ব সামাজিক সংগঠন।
দক্ষিণ এশিয়ার হিজড়া সংস্কৃতির সঙ্গে জন্ম, বিবাহ এবং অন্যান্য পারিবারিক উপলক্ষে উপস্থিত হয়ে গান, নাচ, আশীর্বাদ এবং বিনিময়ে অর্থ বা উপহার গ্রহণের ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কিত। বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের কাজকে badhai বা স্থানীয় বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যের ভেতরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক paradox রয়েছে।
একদিকে সমাজ দৈনন্দিন সামাজিক সম্পর্ক থেকে হিজড়া মানুষকে দূরে রেখেছে; অন্যদিকে সন্তানের জন্ম বা বিশেষ অনুষ্ঠানে তাদের আশীর্বাদের একটি সাংস্কৃতিক মূল্যও তৈরি করেছে।
অর্থাৎ একই জনগোষ্ঠী simultaneously—socially excluded কিন্তু ritually included।
নৃতাত্ত্বিকভাবে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখায় যে হিজড়া মানুষকে সমাজ পুরোপুরি ‘বাইরে’ রাখেনি; বরং কিছু বিশেষ symbolic ও ritual space-এ স্থান দিয়েছে, যদিও শিক্ষা, সম্পত্তি, বিবাহ, চাকরি বা ক্ষমতার মূল প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত থেকেছে।
পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক পেশা থেকে ব্যাপক বঞ্চনা এই ঐতিহ্যগত অর্থ সংগ্রহকে অনেকের জন্য জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করেছে। এখানেই বর্তমানের স্বেচ্ছা উপহার ও জবরদস্তিমূলক অর্থ আদায়ের বিতর্কের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ইতিহাস তাই বর্তমানের জবরদস্তিকে বৈধতা দেয় না; বরং দেখায় কীভাবে ritual economy দীর্ঘ সামাজিক বর্জনের মধ্যে কখনো survival economy-তে রূপান্তরিত হয়েছে।
হিজড়া ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি আসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন জনসংখ্যাকে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে চিহ্নিত, গণনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী ছিল। ইউরোপীয় Victorian gender ও sexual morality-এর সঙ্গে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক জীবন, পোশাক, প্রকাশ্য পরিবেশনা এবং পারিবারিক কাঠামোর সংঘাত তৈরি হয়।
ঐতিহাসিক Jessica Hinchy দেখিয়েছেন, ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা হিজড়াদের increasingly ‘deviant’ এবং সম্ভাব্য অপরাধী জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তবে তিনি এটিও দেখিয়েছেন যে এই অপরাধীকরণকে শুধু ‘বিদেশি ব্রিটিশ মূল্যবোধ বনাম ভারতীয় সংস্কৃতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; স্থানীয় উচ্চবর্গীয় ভারতীয় মনোভাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিও এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল।
১৮৭১ সালের Criminal Tribes Act ঔপনিবেশিক হিজড়া ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইনের Part II-এর আওতায় উত্তর ভারতের নির্দিষ্ট অঞ্চলে তথাকথিত ‘eunuchs’-দের নিবন্ধন, নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক গবেষণা দেখায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাম নিবন্ধন করা, নারীর পোশাক বা অলংকার পরে প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়া ও public performance-এর ওপর বিধিনিষেধ এবং তাদের পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কেও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা ছিল। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কিছু নথিতে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্মূল করার লক্ষ্যও প্রকাশ পেয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন: ১৮৭১ সালের আইনের ‘eunuch’ অংশটি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের সর্বত্র একই মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়নি। গবেষণা অনুযায়ী এর বিশেষ প্রয়োগ উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও সংশ্লিষ্ট কিছু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত ছিল। তবু এর বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রভাব গভীর। ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ভাষায় gender difference-এর সঙ্গে criminality, obscenity এবং deviance যুক্ত হতে থাকে। নৃতাত্ত্বিকভাবে এটি একটি বড় রূপান্তর:
Cultural difference → Administrative classification → Surveillance → Criminalisation → Stigma.
যে জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্য একসময় নির্দিষ্ট সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করতেন, ঔপনিবেশিক আধুনিকতায় তাদের পরিচয় ক্রমে ‘সমস্যাজনক’ জনগোষ্ঠীর ভাষায় পুনর্গঠিত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সঙ্গে Criminal Tribes ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু সামাজিক institution-এর ইতিহাস শুধু আইন পরিবর্তনে শেষ হয় না। দীর্ঘদিন কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘অশ্লীল’, ‘অপরাধপ্রবণ’, ‘অস্বাভাবিক’ কিংবা ‘ভয়ংকর’ হিসেবে প্রশাসনিক ও সামাজিক ভাষায় উপস্থাপন করলে সেই stereotype সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি যে ভয়, কৌতূহল, যৌনীকরণ এবং অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, তার সবটাই ঔপনিবেশিকতার ফল বলা যাবে না; কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রশাসন এসব ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি শক্তি দিয়েছিল—এটি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়, কিন্তু বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নতুন সীমান্ত অতিক্রম করেও টিকে থাকে। পূর্ববঙ্গ, পরে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশেও হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরু–চেলা নেটওয়ার্ক, সামাজিক পরিবার, বিশেষ জীবিকার ধরন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
তবে নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাদের পূর্ণ নাগরিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের ethnographic গবেষণায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, নিরাপদ আবাসনের অভাব, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চনা, শারীরিক ও যৌন সহিংসতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির সংকটকে হিজড়া জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পাওয়া গেছে। গবেষকেরা তাদের অবস্থানকে সমাজের “extreme margin of exclusion” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই পর্যায়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত social network একটি survival system হিসেবেও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কয়েক দশকেও হিজড়া জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতি ও মূলধারার নাগরিক আলোচনায় প্রায় অদৃশ্য ছিল। পরবর্তী সময়ে HIV/AIDS prevention programme, মানবাধিকার আন্দোলন, community-based organisation, NGO কার্যক্রম, গণমাধ্যম এবং হিজড়া ও transgender অধিকারকর্মীদের সক্রিয়তার মাধ্যমে তাদের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে জননীতি ও নাগরিক অধিকারের আলোচনায় প্রবেশ করে।
এই পরিবর্তনও হিজড়া পরিচয়ের evolution-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। একসময় রাষ্ট্রের চোখে তারা প্রধানত ছিল welfare কিংবা public-health intervention-এর target population; ধীরে ধীরে তারা rights-bearing citizen হিসেবে স্বীকৃতির দাবি তোলে।
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে পৃথক লিঙ্গপরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করে; পরবর্তীতে ২৬ জানুয়ারি ২০১৪-এর সরকারি গেজেটে সরকার বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘হিজড়া লিঙ্গ (hijra)’ হিসেবে চিহ্নিত করে স্বীকৃতি প্রদান করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরও এই স্বীকৃতিকে তার হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির ভিত্তিগত মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ফলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক পরিচয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর শুরু হয়। ঐতিহাসিকভাবে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে সামাজিক পরিচয় বহন করলেও আধুনিক রাষ্ট্রে ধীরে ধীরে সেই পরিচয়—
Community identity → Administrative identity → Legal recognition → Citizenship claim
এই পথে অগ্রসর হয়েছে। অর্থাৎ ‘হিজড়া’ এখন শুধু সামাজিক সম্প্রদায়ের নাম নয়; এটি সরকারি নীতি, পরিচয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অধিকার আলোচনারও একটি প্রশাসনিক category। তবে এখানেই নতুন একটি নৃতাত্ত্বিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
রাষ্ট্র যখন একটি fluid ও culturally complex identity-কে একটি নির্দিষ্ট administrative box-এ রাখে, তখন কারা ‘হিজড়া’ এবং কারা নয়—সেটি নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকে? এই প্রশ্ন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিজড়া, transgender এবং intersex পরিচয় এক নয়। রাষ্ট্রীয় শ্রেণিবিন্যাস প্রয়োজন হলেও সেটি যদি মানুষের আত্মপরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতার বৈচিত্র্যকে অতিরিক্ত সরল করে, তাহলে স্বীকৃতিই আবার নতুন exclusion তৈরি করতে পারে।
সমসাময়িক বাংলাদেশে হিজড়া পরিচয়ের evolution আরও একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আগের প্রজন্মে যাঁদের জন্য পরিবার ত্যাগ করে গুরু–চেলা সম্প্রদায়ে প্রবেশ প্রায় একমাত্র নিরাপদ পথ হয়ে উঠতে পারত, নতুন প্রজন্মের একটি অংশ শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবাধিকার আন্দোলন, NGO, entrepreneurship এবং professional employment-এর মধ্য দিয়ে ভিন্ন জীবনপথ নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
এর ফলে traditional hijra community identity এবং contemporary transgender rights discourse-এর মধ্যে কখনো সংযোগ, আবার কখনো টানাপোড়েনও তৈরি হতে পারে।
এই পরিবর্তনকে ‘পুরোনো হিজড়া সংস্কৃতি বিলুপ্ত হচ্ছে’ হিসেবে দেখার চেয়ে identity diversification হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বাংলাদেশে একজন gender-diverse ব্যক্তির জন্য সামাজিকভাবে টিকে থাকার একমাত্র পথ যেন গুরু–চেলা সম্প্রদায়ে প্রবেশ না হয়; তিনি চাইলে জন্মপরিবারে থেকে শিক্ষা গ্রহণ, পেশা নির্বাচন এবং নিজের পরিচয় বজায় রেখে সাধারণ নাগরিক জীবনও যাপন করতে পারেন—এটাই অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাসকে তাই সরল একটি ‘জন্ম–বঞ্চনা’ কাহিনি হিসেবে নয়, কয়েকটি পর্যায়ের সামাজিক বিবর্তন হিসেবে দেখা যায়—
দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন gender diversity ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি
→ মধ্যযুগীয় সমাজ ও রাজদরবারে gender-variant মানুষের বিভিন্ন ভূমিকা
→ সম্প্রদায়ভিত্তিক Hijra identity-এর বিকাশ
→ গুরু–চেলা ও নির্বাচিত আত্মীয়তার কাঠামো
→ ritual ও livelihood culture-এর বিকাশ
→ ঔপনিবেশিক শ্রেণিবিন্যাস ও criminalisation
→ সামাজিক stigma ও মূলধারা থেকে ক্রমবর্ধমান exclusion
→ দেশভাগ-পরবর্তী রাষ্ট্রে community-based survival
→ স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রশাসনিক অদৃশ্যতা
→ NGO, জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে দৃশ্যমানতা
→ ২০১৩–১৪ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
→ welfare থেকে rights ও citizenship discourse
→ বর্তমান সময়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, activism ও বহুমাত্রিক gender identity-এর নতুন পর্ব।
নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে তাই বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর কোনো একটি নির্দিষ্ট ‘origin point’ নেই। তাদের ইতিহাস biological origin-এর চেয়ে social evolution-এর ইতিহাস।
হিজড়া পরিচয়ের জন্ম হয়েছে মানুষের শরীরের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য থেকে নয়; বরং gender diversity, সামাজিক প্রত্যাখ্যান, পারস্পরিক আশ্রয়, নির্বাচিত আত্মীয়তা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও আনুষ্ঠানিক ভূমিকা, জীবিকার প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় শ্রেণিবিন্যাস এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের আন্তঃক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে।
এই ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ paradox হলো—যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিজড়া জনগোষ্ঠীকে প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, সেই বিচ্ছিন্নতাই আবার তাদের নিজস্ব সামাজিক পরিবার, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়গত সংহতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। ফলে হিজড়া সম্প্রদায়কে শুধু ‘বঞ্চিত মানুষদের সমষ্টি’ হিসেবে দেখলে তাদের ইতিহাসের অর্ধেকটাই দেখা হয়; অন্য অর্ধেক হলো প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক অভিযোজন, resistance এবং শতাব্দীব্যাপী টিকে থাকার ইতিহাস।
আজ বাংলাদেশের সামনে তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত হিজড়া সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করে মানুষকে মূলধারায় ‘স্বাভাবিক’ করা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে হিজড়া পরিচয় বহন করা এবং পূর্ণ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে অংশ নেওয়া—এই দুটির মধ্যে আর কোনো বিরোধ থাকবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে হিজড়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি নতুন নয়। মুঘল আমলসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে তাঁরা দরবার, প্রশাসন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ইউরোপীয় দ্বৈত লৈঙ্গিক ধারণা, আইন এবং নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে হিজড়া জনগোষ্ঠী ক্রমে অপরাধীকরণ ও সামাজিক কলঙ্কের শিকার হয়। এর অর্থ ঔপনিবেশিকতার আগে কোনো বৈষম্য ছিল না—এমন নয়। বরং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আইন, প্রশাসন এবং সামাজিক ভাষা বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
আজও সেই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র কাউকে স্বীকৃতি দিলেও প্রশাসনিক ফরম, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র ও বিচারব্যবস্থায় সেই স্বীকৃতির অর্থ যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে অধিকার কাগজেই আটকে থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষের আইনি পরিচয় ও অধিকার নিয়ে ভিন্ন পথে এগিয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে পরিচয়ের স্বীকৃতি, নাগরিক নথি, বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা এবং জনসেবায় প্রবেশ নিয়ে বিভিন্ন আইন ও নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থার সংজ্ঞা, আত্মপরিচয়ের অধিকার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য তাই কোনো বিদেশি আইন হুবহু অনুকরণ করাই সমাধান নয়। শিক্ষাটি বরং হলো—আইনি স্বীকৃতিকে বাস্তব প্রতিষ্ঠানে অনুবাদ করতে হয়। বিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমে পরিচয়ের ঘর থাকল, কিন্তু সহপাঠীর নির্যাতন বন্ধ হলো না—অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ। চাকরিতে সুবিধা থাকল, কিন্তু অফিসে প্রতিদিন অপমান সহ্য করতে হলো—অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ। হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থা থাকল, কিন্তু চিকিৎসক রোগীকে মানুষ হিসেবে না দেখে কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখলেন—সেটিও পূর্ণ অধিকার নয়। আবার আইনগত স্বীকৃতি আছে বলে কোনো হিজড়া ব্যক্তি জবরদস্তি বা অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না—এ ধারণাও ভুল। আসলে সমতা মানে দায়মুক্তি নয়; সমতা মানে একই অধিকার, একই মর্যাদা এবং একই আইনি জবাবদিহি।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতা বোঝার জন্য শুধু দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা সামাজিক ‘অসহিষ্ণুতা’র কথা বললে ব্যাখ্যাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রান্তিককরণ আসলে একটি বহুমাত্রিক সামাজিক প্রক্রিয়া—যেখানে পরিবার, সংস্কৃতি, লিঙ্গের সামাজিক ধারণা, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, প্রতিষ্ঠান, ভাষা, সামাজিক মর্যাদা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে সমাজের কেন্দ্র থেকে প্রান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়া বোঝার জন্য Stigma Theory, Social Construction of Gender, Social Exclusion Model, Minority Stress Model, Intersectionality, Social Identity Theory, Contact Hypothesis, Structural Violence, Ecological Systems Theory এবং Capability Approach—এসব তত্ত্ব ও মডেল বিশেষভাবে কার্যকর।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতার গোড়ায় রয়েছে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে সমাজের কঠোর দ্বৈত ধারণা। Social Construction of Gender দৃষ্টিভঙ্গি বলে, নারী বা পুরুষ হওয়া শুধু জৈবিক বৈশিষ্ট্যের বিষয় নয়; সমাজ নির্দিষ্ট আচরণ, পোশাক, কণ্ঠস্বর, পেশা, চলাফেরা, দেহভঙ্গি এবং সামাজিক ভূমিকার সঙ্গে ‘নারীত্ব’ ও ‘পুরুষত্ব’ যুক্ত করে দেয়।
বাংলাদেশের পরিবারেও একটি ছেলে কেমন করে হাঁটবে, কথা বলবে, খেলবে বা পোশাক পরবে এবং একটি মেয়ে কেমন আচরণ করবে—এ সম্পর্কে শক্তিশালী সামাজিক প্রত্যাশা রয়েছে। কোনো শিশুর gender expression এসব প্রত্যাশার বাইরে গেলেই তার জন্য ‘অস্বাভাবিক’, ‘মেয়েলি’, ‘ছেলেদের মতো’, এমনকি ‘হিজড়া’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজেকে হিজড়া হিসেবে চিহ্নিত করার বহু আগেই সমাজ তার শরীর ও আচরণকে বিচার করতে শুরু করতে পারে।
এখানেই প্রান্তিকতার প্রথম ধাপ। সমাজ প্রথমে একটি norm বা স্বাভাবিকতার মানদণ্ড তৈরি করে; এরপর যে মানুষ সেই মানদণ্ডে মেলে না, তাকে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে চিহ্নিত করে; এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যতিক্রমী পরিচয়কে সামাজিক দূরত্বের ভিত্তিতে পরিণত করে।
এরভিং গফম্যানের Stigma Theory বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গফম্যান দেখিয়েছেন, সমাজ কোনো ব্যক্তির একটি বৈশিষ্ট্যকে এমন নেতিবাচক অর্থ দিতে পারে যে তার অন্যান্য পরিচয় ও সক্ষমতা সেই বৈশিষ্ট্যের আড়ালে চলে যায়।
একজন হিজড়া ব্যক্তি একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, সন্তান, ভাইবোন, শিল্পী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, কর্মী কিংবা দক্ষ পেশাজীবী হতে পারেন। কিন্তু সমাজ যদি তাঁকে প্রধানত ‘হিজড়া’ পরিচয়ের মাধ্যমে দেখে এবং ‘হিজড়া’ শব্দটির সঙ্গে আগে থেকেই অস্বাভাবিকতা, যৌনতা, ভয়, ভিক্ষাবৃত্তি বা চাঁদাবাজির stereotype যুক্ত থাকে, তাহলে তাঁর ব্যক্তিসত্তার অন্যান্য দিক অদৃশ্য হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিকতার মধ্যে দেখা যায়—
Difference → Labeling → Stereotype → Stigma → Social Distance → Discrimination → Exclusion
অর্থাৎ পার্থক্যকে প্রথমে নাম দেওয়া হয়, নামের সঙ্গে stereotype যুক্ত হয়, stereotype থেকে stigma তৈরি হয়, stigma সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই দূরত্ব শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অংশগ্রহণ থেকে বাস্তব বঞ্চনায় রূপ নেয়।
Social Identity Theory দেখায় যে মানুষ সাধারণত নিজেকে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে দেখে। এই প্রক্রিয়ায় ‘আমরা’ বা in-group এবং ‘তারা’ বা out-group তৈরি হতে পারে। যখন নারী-পুরুষের দ্বৈত কাঠামোকেই সমাজের স্বাভাবিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তখন হিজড়া জনগোষ্ঠী সহজেই ‘তারা’তে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো পরিবার ও সম্প্রদায়নির্ভর সমাজে এই বিভাজনের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। এখানে ব্যক্তির পরিচয় কেবল ব্যক্তিগত নয়; পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক সম্মান, প্রতিবেশ, আত্মীয়তা ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে কোনো পরিবারের সন্তান প্রচলিত gender norm-এর বাইরে গেলে বিষয়টি অনেক সময় শুধু সেই সন্তানের ব্যক্তিগত পরিচয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং পরিবারের সামাজিক পরিচয় ও সম্মানের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা হতে পারে। এই জায়গাতেই ‘লোক কী বলবে?’ মানসিকতা প্রান্তিককরণের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশি বা বৃহত্তর বাঙালি সমাজকে একরৈখিকভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়; শ্রেণি, অঞ্চল, শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশীলন, নগর-গ্রাম এবং প্রজন্মভেদে সামাজিক মূল্যবোধের বড় পার্থক্য রয়েছে। তবু পরিবারকেন্দ্রিকতা, আত্মীয়তার গুরুত্ব, সামাজিক মর্যাদা, লোকসমাজের মতামত এবং পারিবারিক সম্মান—এসব উপাদান বহু সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এই কাঠামোর মধ্যে gender-diverse কোনো শিশুর আচরণকে অনেক পরিবার ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য হিসেবে না দেখে পারিবারিক ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখতে পারে। ফলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হতে পারে—
লুকানো → নিয়ন্ত্রণ → সংশোধনের চেষ্টা → শাস্তি → সামাজিক বিচ্ছিন্নতা → পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ paradox তৈরি হয়। পরিবার মূলত ব্যক্তির সবচেয়ে বড় social protection system হওয়ার কথা; কিন্তু সেই পরিবারই যদি প্রত্যাখ্যানের প্রথম প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, তাহলে পরবর্তী প্রায় সব ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
Bronfenbrenner-এর Ecological Systems Theory ব্যবহার করলে এই প্রক্রিয়াটি আরও পরিষ্কার হয়। একজন হিজড়া বা gender-diverse ব্যক্তির জীবনকে কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।
ফলে একজন ব্যক্তির প্রান্তিকতা কোনো একটি ঘটনার ফল নয়; বিভিন্ন স্তরের ব্যর্থতা পরস্পরের ওপর জমতে জমতে cumulative disadvantage তৈরি করে।
Social Exclusion Model অনুসারে সামাজিক বর্জনকে শুধু দরিদ্রতা হিসেবে দেখা যায় না। এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে ধীরে ধীরে বাদ পড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য প্রান্তিকতার পথ হতে পারে—
পরিবারে প্রত্যাখ্যান
↓
বিদ্যালয়ে বুলিং ও নিরাপত্তাহীনতা
↓
ঝরে পড়া
↓
দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা
↓
আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা
↓
অনানুষ্ঠানিক বা ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকায় নির্ভরতা
↓
সামাজিক নেতিবাচক stereotype শক্তিশালী হওয়া
↓
আরও সামাজিক দূরত্ব ও বৈষম্য।
এই ধারাবাহিকতা বুঝতে পারলে পরিষ্কার হয় কেন শুধু একটি ভাতা বা তিন মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে বহু বছরের প্রান্তিকতা ভাঙা কঠিন।
Minority Stress Model অনুসারে সংখ্যালঘু বা সামাজিকভাবে stigmatized জনগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাপের পাশাপাশি পরিচয়ভিত্তিক অতিরিক্ত মানসিক চাপের সম্মুখীন হতে পারে।
হিজড়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই চাপ কয়েকভাবে আসতে পারে—প্রকাশ্য বৈষম্য, প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা, অপমানের পূর্বানুমান, নিজের পরিচয় গোপন করার প্রয়োজন এবং সমাজের নেতিবাচক ধারণা ধীরে ধীরে নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও প্রভাবিত করা। অর্থাৎ তিনি কেবল বাস্তবে ঘটে যাওয়া অপমানের চাপ বহন করেন না; ভবিষ্যতে কোথায় অপমানিত হতে পারেন—সেই আশঙ্কাও তাঁর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
চাকরির সাক্ষাৎকারে যাওয়ার আগে, হাসপাতালে প্রবেশের আগে, বাড়ি ভাড়া চাইতে কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময়ও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—‘তারা আমার পরিচয় জানলে কী করবে?’ এই anticipatory stress সামাজিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে এবং বিচ্ছিন্নতাকে আরও গভীর করতে পারে।
Kimberlé Crenshaw-এর Intersectionality ধারণা মনে করিয়ে দেয় যে ‘হিজড়া’ পরিচয় দিয়ে সবার অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন উচ্চশিক্ষিত, শহরে বসবাসকারী এবং আর্থিকভাবে তুলনামূলক স্বচ্ছল হিজড়া ব্যক্তির অভিজ্ঞতা একজন দরিদ্র, পরিবারবিচ্ছিন্ন, গ্রামীণ এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া হিজড়া ব্যক্তির মতো হবে না। একই মানুষের ওপর একাধিক পরিচয় ও অবস্থান একসঙ্গে কাজ করতে পারে—
লৈঙ্গিক পরিচয় + দারিদ্র্য + কম শিক্ষা + পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা + আবাসন অনিশ্চয়তা + সামাজিক stigma
এই উপাদানগুলো কেবল যোগ হয় না; অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। তাই নীতিতে ‘সব হিজড়ার জন্য একটি কর্মসূচি’ ধরনের homogeneous approach কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
Johan Galtung-এর Structural Violence ধারণা দিয়ে আরও গভীর একটি বাস্তবতা বোঝা যায়। সব সহিংসতার দৃশ্যমান আক্রমণকারী থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, সামাজিক কাঠামো কিংবা সুযোগ বণ্টনের পদ্ধতি যদি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেটিও কাঠামোগত সহিংসতার রূপ নিতে পারে।
কোনো নিয়োগকর্তা প্রকাশ্যে না বললেও যদি হিজড়া পরিচয় দেখেই প্রার্থী বাদ পড়ে যান; বিদ্যালয়ের কোনো নীতিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও পরিবেশ এতটাই hostile হয় যে শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়; হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকভাবে সেবা নিষিদ্ধ না হলেও অপমানের ভয়ে রোগী সেখানে যেতে না চান—তাহলে কাগজে অধিকার থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে অধিকার প্রয়োগ সম্ভব হয় না।
এ কারণেই formal equality এবং substantive equality এক নয়। আইনে সবাই সমান লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়; বাস্তবে সমান সুযোগ ব্যবহারের সক্ষমতাও থাকতে হবে।
Amartya Sen-এর Capability Approach হিজড়া জনগোষ্ঠীর নীতি বিশ্লেষণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নয়ন মানে শুধু আয়, ভাতা বা কোনো সেবা পাওয়া নয়; বরং একজন মানুষ বাস্তবে কী হতে এবং কী করতে সক্ষম—সেটিই মূল প্রশ্ন।
তাহলে resources দেওয়া হয়েছে, কিন্তু capability তৈরি হয়নি। নীতির প্রশ্ন তাই হওয়া উচিত: একজন হিজড়া নাগরিক কি বাস্তবে শিক্ষা সম্পন্ন করতে, নিরাপদ বাসস্থান পেতে, নিজের পছন্দের পেশায় যেতে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে, পরিবার গড়তে, সামাজিক সম্পর্কে অংশ নিতে এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন?
Gordon Allport-এর Contact Hypothesis অনুসারে যথাযথ পরিবেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমমর্যাদাপূর্ণ, ইতিবাচক ও নিয়মিত যোগাযোগ পূর্বধারণা কমাতে পারে।
বাংলাদেশে এর তাৎপর্য গভীর। যদি অধিকাংশ নাগরিকের হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকে রাস্তাঘাট, বাস বা দোকানে টাকা চাওয়ার অভিজ্ঞতায়, তাহলে সেই সীমিত অভিজ্ঞতাই পুরো জনগোষ্ঠীর mental image তৈরি করতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যখন হিজড়া ব্যক্তিকে শিক্ষক, চিকিৎসাসেবাকর্মী, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা, সহকর্মী, শিল্পী বা প্রতিবেশী হিসেবে দেখবেন, তখন stereotype challenge হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর এখানেই inclusive education এবং inclusive employment শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়—এগুলো সামাজিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের নীতিও।
উপরের তত্ত্বগুলো একত্র করলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি Cycle of Hijra Marginalisation দাঁড় করানো যায়—
কঠোর নারী–পুরুষ সামাজিক মানদণ্ড
→ ভিন্ন gender expression চিহ্নিতকরণ
→ Labeling ও stigma
→ পরিবার ও বিদ্যালয়ে প্রত্যাখ্যান
→ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া
→ দক্ষতা ও social capital কমে যাওয়া
→ formal employment থেকে বঞ্চনা
→ অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকার ওপর নির্ভরতা
→ জনপরিসরে সংঘাত ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা
→ সাধারণ মানুষের stereotype আরও শক্তিশালী হওয়া
→ সামাজিক দূরত্ব ও বৈষম্য বৃদ্ধি
→ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একই প্রান্তিকতার পুনরুৎপাদন।
এটি একটি self-reinforcing cycle। সমাজ প্রথমে একটি জনগোষ্ঠীর জন্য মূলধারার দরজা সংকুচিত করে; পরে সেই সংকুচিত জীবিকার ফলাফলকেই ওই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। এই চক্র ভাঙতে হলে তাই শুধু শেষ ধাপ—যেমন জবরদস্তিমূলক টাকা আদায়—নিয়ে কাজ করলে হবে না; একই সঙ্গে পরিবার থেকে বিদ্যালয়, শিক্ষা থেকে চাকরি, চাকরি থেকে সামাজিক মর্যাদা—সম্পূর্ণ causal chain-এ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হওয়া উচিত দয়া ও কল্যাণভিত্তিক Welfare Model থেকে Rights–Capability–Inclusion Model-এ উত্তরণ।
পুরোনো মডেলের প্রশ্ন হতে পারে— “তাদের জন্য আমরা কী সুবিধা দিলাম?”
নতুন মডেলের প্রশ্ন হওয়া উচিত—“তারা অন্য নাগরিকের মতো বাস্তবে কতটা শিক্ষা, কাজ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সম্পদ, সামাজিক সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ব্যবহার করতে পারছেন?”
অর্থাৎ,
Recognition → Participation → Capability → Belonging → Citizenship
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হবে শুরু, শেষ নয়। স্বীকৃতি থেকে অংশগ্রহণ, অংশগ্রহণ থেকে সক্ষমতা, সক্ষমতা থেকে belonging বা সমাজের অংশ হওয়ার অনুভূতি এবং সেখান থেকে পূর্ণ নাগরিকত্ব—এই ধারায় নীতি পুনর্গঠন করতে হবে।
সবশেষে বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতাকে তাদের ব্যক্তিগত ‘ব্যর্থতা’ বা শুধু সমাজের ‘খারাপ মনোভাব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি ব্যক্তি, পরিবার, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আন্তঃক্রিয়ার ফল। তাই সমাধানও ব্যক্তিকে পরিবর্তনের প্রকল্প হতে পারে না; পরিবর্তন করতে হবে সেই সামাজিক পরিবেশকে, যা পার্থক্যকে stigma-তে, stigma-কে বঞ্চনায় এবং বঞ্চনাকে পুনরায় stereotype-এ রূপান্তর করে।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত এই নয় যে সে সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য কতটা স্বাচ্ছন্দ্যময়; বরং তার প্রকৃত পরীক্ষা হলো—যে মানুষটি প্রচলিত সামাজিক ছকের সঙ্গে সবচেয়ে কম মেলে, তাকেও সে কতটা মর্যাদা, সুযোগ, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে পারে।
সমাধান কোনো একক মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কিংবা ভাতার কর্মসূচির হাতে নেই। পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী—সব পক্ষকে একই সামাজিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রশ্নকে শুধু মানবিকতার আহ্বান হিসেবে দেখলে একটি মৌলিক সমস্যা থেকে যায়। মানবিকতা ব্যক্তিভেদে বদলায়; অধিকার বদলানোর কথা নয়। একজন হিজড়া ব্যক্তির স্কুলে যাওয়ার অধিকার আমি তাঁকে পছন্দ করি কি না, তার ওপর নির্ভর করতে পারে না। চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার চিকিৎসকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে পারে না। চাকরির যোগ্যতা লৈঙ্গিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। ঠিক একইভাবে একজন দোকানদারের নিরাপত্তা, একজন যাত্রীর ব্যক্তিগত পরিসর কিংবা একটি পরিবারের জোরপূর্বক অর্থ না দেওয়ার অধিকারও সুরক্ষিত থাকতে হবে।আর এই ভারসাম্যটিই নাগরিক সামাজিক চুক্তি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুযোগের দরজা খোলা এবং আইন প্রয়োগ করা। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বৈষম্য না করা। পরিবারের দায়িত্ব সন্তানকে ত্যাগ না করা। সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব পরিচয়ের কারণে কাউকে অপমান না করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব stereotype না ছড়ানো। আর হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য ও নেতৃত্বেরও দায়িত্ব আছে—সমাজে আস্থা নষ্ট করে এমন জবরদস্তিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা, দক্ষতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার পথে এগিয়ে নেওয়া। তখনই হয়তো ‘আমরা বনাম তারা’ ভাষাটি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে।
একটি মুদ্রার দুই পিঠ। আমরা একই সময়ে সাধারণত একটিই দেখতে পাই। এক পিঠ দেখে যদি পুরো মুদ্রাটির বিচার করি, তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত কখনোই সম্পূর্ণ হবে না। চাঁদের ক্ষেত্রেও তাই। রাতের আকাশে আমরা তার আলোকিত মুখ দেখে মুগ্ধ হই; অথচ একই চাঁদের যে অংশটি সেই মুহূর্তে আমাদের চোখের আড়ালে, সেটিও চাঁদেরই অংশ। চোখে না পড়ার অর্থ তার অস্তিত্ব নেই—এমন নয়।
বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনও অনেকটা সেই মুদ্রা ও চাঁদের মতো। আমরা তাদের জীবনের একটি দৃশ্যমান অংশ দেখি—রাস্তায় দেখি, বাসে দেখি, বাজারে দেখি, কখনো অর্থ চাইতে দেখি। কিন্তু যে পরিবার থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন, যে বিদ্যালয়ে তাঁর শৈশব ভেঙেছে, যে চাকরির দরজায় তাঁর যোগ্যতা পরাজিত হয়েছে, কিংবা যে হাসপাতালে অসুস্থ শরীরের চেয়ে তাঁর পরিচয় বেশি আলোচিত হয়েছে—সেই অন্ধকার পিঠটি অধিকাংশ সময় আমাদের চোখে পড়ে না।
১. স্কুল ছেড়ে দেওয়া শিশুটি: ঝরে পড়া ফুল, নাকি তাকে ঝরিয়ে দেওয়া হয়েছে?
মুন্নীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ে তাঁর হাঁটা ও আচরণ নিয়ে সহপাঠীরা টিটকারি দিত, ‘হিজড়া’ বলে ডাকত, মারধর করত, এমনকি পোশাক খুলে দেওয়ার মতো চরম অপমানের ঘটনাও ঘটেছিল।
প্রথম analogy: গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুল
সকালে বাগানে গিয়ে একটি ফুল মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলে আমরা সহজেই বলি—“ফুলটি ঝরে গেছে।” কিন্তু যদি আগের রাতে কেউ ডালটি বারবার নাড়িয়ে থাকে? তাহলে ফুলটি কি নিজে ঝরেছে, নাকি তাকে ঝরিয়ে দেওয়া হয়েছে?
হিজড়া শিশুর school dropout-কে শুধু ‘ঝরে পড়া’ বললেও একই ভুল হতে পারে। একজন শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়ে দিয়েছে—এটি দৃশ্যমান ঘটনা। কিন্তু তার পেছনে যদি প্রতিদিনের টিটকারি, বুলিং, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ও পারিবারিক চাপ থাকে, তাহলে সে শুধু dropout নয়; অনেক ক্ষেত্রে pushed out।
দ্বিতীয় analogy: নদীর মাঝখানে নৌকা থেকে বৈঠা কেড়ে নেওয়া
২. পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ: ঘর ছেড়েছে, নাকি ঘর তাকে ছেড়ে দিয়েছে?
পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যান ও বিদ্যালয়ের বঞ্চনা হিজড়া মানুষের পরবর্তী জীবনের ঝুঁকিকে আরও বাড়াতে পারে। বিভিন্ন নথিতেও পরিবারকে বৈষম্যের প্রথম ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রথম analogy: শিকড় কেটে গাছকে মরুভূমিতে দাঁড় করানো
দ্বিতীয় analogy: ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ
জয়ার ঘটনায় দেখা যায়, ভালো ফল নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরও তাঁর উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের পথ সহজ হয়নি। পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় পরিচয় গোপন রাখা এবং পরিচয় প্রকাশের পর হয়রানির অভিজ্ঞতাও নথিতে এসেছে।
প্রথম analogy: হাতে চাবি, কিন্তু তালা বদলে দেওয়া হয়েছে
দ্বিতীয় analogy: দৌড় প্রতিযোগিতায় কারও পায়ে অদৃশ্য দড়ি
৪. চাকরির জন্য গিয়ে শরীরের পরীক্ষা: দরজায় যোগ্যতার বদলে পরিচয়ের প্রমাণ
সরকারি চাকরির একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তথাকথিত ‘প্রকৃত হিজড়া’ নির্ধারণের নামে নির্বাচিত আবেদনকারীদের অপমানজনক শারীরিক পরীক্ষার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রথম analogy: পরীক্ষার খাতা না দেখে কলম পরীক্ষা
দ্বিতীয় analogy: নাগরিকত্বের দরজায় আয়নার ঘর
৫. হাসপাতালে রোগীর আগে যখন পরিচয় দেখা হয়
বাংলাদেশের ১৬ জেলার ৫৪৪ জন হিজড়া ব্যক্তিকে নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, হয়রানি, আর্থিক সংকট এবং অবকাঠামোগত বাধার সম্মিলিত প্রভাব পাওয়া গেছে।
প্রথম analogy: আগুন নেভানোর আগে বাড়ির মালিকের পরিচয় জিজ্ঞাসা
দ্বিতীয় analogy: বৃষ্টিতে ছাতা আছে, কিন্তু খুলতে ভয়
৬. বাসা নেই, নিরাপদ ঠিকানা নেই: ভিত্তি ছাড়া বাড়ি নির্মাণ
প্রথম analogy: বালুর ওপর বাড়ি
দ্বিতীয় analogy: মই দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিচের দুই ধাপ নেই
৭. রাস্তায় অর্থ চাওয়ার দৃশ্য: মুদ্রার সবচেয়ে দৃশ্যমান পিঠ
এখানেই সবচেয়ে কঠিন সামাজিক দ্বন্দ্বটি আসে।
কোনো হিজড়া ব্যক্তি বাসে উঠে যাত্রীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নিলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। ভয় দেখানো, অপমান করা, পথ আটকানো কিংবা অনিচ্ছাকৃত স্পর্শকে সামাজিক বঞ্চনার যুক্তি দিয়ে বৈধ করা যায় না। বিভিন্ন নিবন্ধেও এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথম analogy: মুদ্রার দুই পিঠ
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা → বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া → চাকরিতে প্রত্যাখ্যান → নিরাপদ বাসস্থানের অভাব → অনানুষ্ঠানিক জীবিকার ওপর নির্ভরতা।
দ্বিতীয় analogy: রোগের জ্বর আর ভেতরের সংক্রমণ
৮. সবচেয়ে না-দেখা ঘটনা: চাঁদের অন্ধকার পিঠ
প্রথম analogy: চাঁদের আলো এবং অদৃশ্য অংশ
দ্বিতীয় analogy: হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়া
হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিষয়ে বাংলাদেশের সামাজিক আলোচনার বড় দুর্বলতা হলো—আমরা প্রায়ই শেষ দৃশ্যটি দেখি, কিন্তু আগের অধ্যায়গুলো পড়ি না।
আবার এই অদৃশ্য বঞ্চনাগুলো জানার অর্থ এই নয় যে কোনো অন্যায় আচরণকে গ্রহণযোগ্য বলতে হবে। অধিকার যেমন পরিচয় দেখে বদলাবে না, জবাবদিহিও পরিচয় দেখে বদলানো উচিত নয়। তাই হিজড়া জনগোষ্ঠীকে বুঝতে হলে আমাদের একই সঙ্গে মুদ্রার দুই পিঠ, চাঁদের আলো ও অদৃশ্য অংশ, iceberg-এর চূড়া ও পানির নিচের বিশাল কাঠামো দেখতে হবে। তখন প্রশ্নটি আর শুধু থাকবে না—“তারা এমন কেন?”
প্রশ্নটি বদলে যাবে—“একজন মানুষ আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে পৌঁছানোর পথে পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্র এবং সমাজ—আমরা প্রত্যেকে কী ভূমিকা রেখেছি?” আর সম্ভবত এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে সহানুভূতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়—ন্যায়সংগত সামাজিক আত্মসমালোচনা।
আবার সেই থেমে থাকা বাসটির কথা ভাবা যাক। একজন হিজড়া মানুষ বাসে উঠলেন। যাত্রীরা আতঙ্কিত হলেন না। কারণ তিনি কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা চাইতে আসেননি। হয়তো তিনি নিজের কর্মস্থলে যাচ্ছেন—বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে, হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে, নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে।
এই দৃশ্য কোনো কল্পলোক নয়। কিন্তু এটি বাস্তব করতে হলে শুধু হিজড়া মানুষটিকে বদলাতে বললে হবে না। বদলাতে হবে সেই পরিবারকে, যে সন্তানকে বের করে দেয়; সেই বিদ্যালয়কে, যেখানে টিটকারি ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়; সেই চাকরির বাজারকে, যেখানে দক্ষতার আগে পরিচয় দেখা হয়; সেই হাসপাতালকে, যেখানে রোগীর চিকিৎসার আগে শরীর নিয়ে কৌতূহল শুরু হয়; সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে, যেখানে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়; এবং সেই আচরণকেও, যেখানে সামাজিক বঞ্চনার প্রতিক্রিয়ায় জবরদস্তিকে জীবিকার স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির একটি দরজা খুলেছে। এখন প্রয়োজন আরও কঠিন কাজ—স্বীকৃতিকে বাস্তব নাগরিকত্বে রূপান্তর করা।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি করুণা নয়, প্রয়োজন ন্যায়সংগত সুযোগ। বিশেষ সুবিধার নামে স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা নয়, প্রয়োজন মূলধারায় প্রবেশের বাস্তব পথ। অপরাধের ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক দায়মুক্তি নয়, প্রয়োজন সমান আইন। আর সাধারণ মানুষের ভয় এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—কোনোটিকেই অস্বীকার না করে প্রয়োজন নতুন সামাজিক বিশ্বাস।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ১২ হাজার ৬২৯ জন মানুষের নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের সমাজের চরিত্রের।
একটি পরিবার কি তার লৈঙ্গিকভাবে বৈচিত্র্যময় সন্তানকে ঘর থেকে বের না করে পাশে দাঁড়াতে পারে? একটি বিদ্যালয় কি তাকে নিরাপদে শিখতে দিতে পারে? একটি কর্মক্ষেত্র কি পরিচয়ের বদলে যোগ্যতা দেখতে পারে? একটি হাসপাতাল কি কৌতূহলের বস্তু নয়, রোগী হিসেবে তাকে চিকিৎসা দিতে পারে? একজন নাগরিক কি হিজড়া ব্যক্তিকে ভয় না পেয়ে সহকর্মী, প্রতিবেশী বা সহযাত্রী হিসেবে দেখতে পারেন? আবার একজন হিজড়া নাগরিকও কি সমাজের অন্য নাগরিকের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতি একই সম্মান দেখাতে পারেন?
একজন মানুষকে তার একটি পরিচয়ের বাইরে পূর্ণ মানুষ এবং পূর্ণ নাগরিক হিসেবে দেখার সক্ষমতা আমাদের কতটা আছে—বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন সেই প্রশ্নেরই একটি কঠিন পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর গল্প শুধু একটি জনগোষ্ঠীর গল্প নয়; এটি আমাদের পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্র, আইন এবং নাগরিক বিবেকেরও আয়না। আমরা তাদের রাস্তায় দেখি, গণপরিবহনে দেখি, কখনো অর্থ চাইতে দেখি; কিন্তু খুব কমই ফিরে তাকাই সেই দীর্ঘ পথটির দিকে, যে পথে একটি শিশু প্রথমে পরিবারের অস্বস্তি, তারপর বিদ্যালয়ের বিদ্রূপ, সমাজের প্রত্যাখ্যান, চাকরির বন্ধ দরজা এবং কখনো হাসপাতালের বৈষম্য পেরিয়ে একদিন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। দৃশ্যমান বর্তমানের পেছনে যে অদৃশ্য ইতিহাস থাকে, সেটি না দেখলে আমাদের বিচার কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না।
মুদ্রার এক পিঠে যদি থাকে কোনো হিজড়া ব্যক্তির জবরদস্তিমূলক অর্থ আদায়ের অভিযোগ, তবে অন্য পিঠে থাকতে পারে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন একটি শৈশব, অসমাপ্ত স্কুলজীবন, কর্মসংস্থানের প্রত্যাখ্যান কিংবা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। কিন্তু মুদ্রার দ্বিতীয় পিঠের বেদনা প্রথম পিঠের অন্যায়কে বৈধ করে না। আবার প্রথম পিঠের কোনো অন্যায় দিয়ে দ্বিতীয় পিঠের দীর্ঘ বঞ্চনাকেও অস্বীকার করা যায় না। অধিকার ও জবাবদিহি—দুটিকেই একই সঙ্গে ধারণ করাই ন্যায়বিচারের ভিত্তি।
চাঁদের আলোকিত অংশটিই পুরো চাঁদ নয়। হিমশৈলের পানির ওপরে দৃশ্যমান অংশটিও তার সম্পূর্ণ অবয়ব নয়। তেমনি হিজড়া জনগোষ্ঠীর যে জীবন আমাদের চোখে পড়ে, সেটিও তাদের সম্পূর্ণ জীবন নয়। তাদের অদৃশ্য ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে—কোন পরিবার সন্তানকে ধরে রাখতে পারেনি, কোন বিদ্যালয় নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি, কোন কর্মক্ষেত্র যোগ্যতার আগে পরিচয় দেখেছে, কোন স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীর আগে তার লিঙ্গপরিচয় নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে এবং কোথায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দৈনন্দিন মর্যাদায় রূপ নিতে পারেনি।
তাই প্রশ্নটি শুধু “হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে?”—এতটুকু নয়। আরও গভীর প্রশ্ন হলো—কোন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তাদের প্রথমে প্রান্তে ঠেলে দেয়? কারণ যে সমাজ মানুষকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অক্ষত রাখে, সে সমাজ পরে শুধু পুনর্বাসন প্রকল্প দিয়ে সেই প্রান্তিকতা দূর করতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু স্বীকৃতির কাগজ হাতে থাকা আর সমাজে নিজের জায়গা পাওয়া এক বিষয় নয়। সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তি ঘটবে সেদিন, যেদিন একজন হিজড়া শিশুকে পরিবার থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের জন্য বিকল্প পরিবার খুঁজতে হবে না; বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে নিজের হাঁটা বা কণ্ঠস্বর লুকাতে হবে না; চাকরির সাক্ষাৎকারে যোগ্যতার পাশাপাশি নিজের পরিচয় নিয়ে আতঙ্কিত হতে হবে না; হাসপাতালে গিয়ে রোগীর বদলে কৌতূহলের বস্তু হতে হবে না; এবং জীবিকা অর্জনের জন্য সমাজের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
আর একই সঙ্গে একজন সাধারণ নাগরিকও যেন হিজড়া পরিচয়ের কোনো ব্যক্তিকে দেখে ভয় না পান—তাঁর ব্যক্তিগত পরিসর, নিরাপত্তা বা অর্থ কেড়ে নেওয়া হবে কি না সেই আশঙ্কায় না থাকেন। অন্তর্ভুক্তি একমুখী দাবি নয়; এটি পারস্পরিক মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও বিশ্বাসের সামাজিক চুক্তি।
সুতরাং সামনে পথটি করুণার নয়—ন্যায়ের। বিচ্ছিন্নতার নয়—অংশগ্রহণের। পরিচয় মুছে দেওয়ার নয়—পরিচয়সহ মর্যাদাপূর্ণ নাগরিকত্বের। এবং দায়মুক্তিরও নয়—সবার জন্য সমান জবাবদিহির।
হয়তো আমাদের সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি শুরু হবে ভাষার একটি ছোট পরিবর্তন থেকে। আমরা যখন জিজ্ঞেস করা বন্ধ করব—“ওরা এমন কেন?” এবং তার পরিবর্তে প্রশ্ন করব—“আমাদের সমাজের কোন কোন দরজা বন্ধ হতে হতে একজন মানুষকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে?”—তখনই সমস্যাটিকে নতুন চোখে দেখা শুরু হবে।
কারণ সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে আছে, শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সমাজের সবচেয়ে প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির জন্যও ঘর, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র, আইন এবং মানুষের হৃদয়ের দরজা কতটা খোলা—তা দিয়ে।
বাংলাদেশ হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতির কাগজ দিয়েছে। এখন আরও বড় কাজটি বাকি—সেই কাগজের স্বীকৃতিকে জীবনের স্বীকৃতিতে রূপ দেওয়া। আর সেখানেই এই দীর্ঘ আলোচনার শেষ প্রশ্নটি ফিরে আসে— স্বীকৃতির কাগজ যখন আছে, আমরা কি এবার বিশ্বাসের সেতুটিও নির্মাণ করতে পারব?
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#হিজড়া #হিজড়াজনগোষ্ঠী #বাংলাদেশেরহিজড়া #মুদ্রারঅন্যপিঠ #যেকান্নাআমরাদেখিনা #প্রান্তিকতা #সামাজিকবঞ্চনা #বৈষম্য #মানবিকমর্যাদা #মানবাধিকার #নাগরিকঅধিকার #অন্তর্ভুক্তিমূলকসমাজ #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #শিক্ষারঅধিকার #কর্মসংস্থান #স্বাস্থ্যসেবা #সামাজিকন্যায়বিচার #GenderDiversity #HijraCommunity #TransgenderRights #SocialExclusion #HumanRights #SocialJustice #InclusiveEducation #DignityForAll #Bangladesh