09/23/2026 শ্রেণিকক্ষের দরজাই কি ন্যায়বিচারের দরজা? বাংলাদেশের শিক্ষায় সমতা, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অসম লড়াই
Dr Mahbub
২৩ September ২০২৬ ০৭:২৪
শিক্ষায় সামাজিক ন্যায়বিচার মানে শুধু সবাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ দেওয়া নয়; বরং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, পরিচয়ের মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব, নিরাপদ অংশগ্রহণ, মানসম্মত শিক্ষা এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার নিশ্চিত করা।বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে এবং নারীসহ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হয়েছে। তবু একই শ্রেণিকক্ষে বসা সব শিক্ষার্থী কি সমমানের শিক্ষক, শিক্ষাসামগ্রী, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শেখার সহায়তা পাচ্ছে? কার পরিবারের পক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষা ব্যয় বহন করা সম্ভব, কার ভাষা ও সংস্কৃতি পাঠ্যক্রমে স্বীকৃত, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিষ্ঠান কতটা প্রবেশগম্য, পরীক্ষার ব্যর্থতার দায় কার ওপর চাপানো হয় এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে শিক্ষার্থী বা শিক্ষক কোথায় প্রতিকার চাইবেন—এসব প্রশ্নই শিক্ষায় সামাজিক ন্যায়বিচারের কেন্দ্রবিন্দু।Nancy Fraser-এর পুনর্বণ্টন–স্বীকৃতি–প্রতিনিধিত্ব কাঠামো, অংশগ্রহণের সমতা (Participatory Parity), Paulo Freire-এর সমালোচনামূলক চেতনা, John Dewey-এর গণতান্ত্রিক শিক্ষা-ভাবনা এবং UNESCO IESALC-এর পাঁচটি ‘A’—প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জবাবদিহি—এই নিবন্ধের বিশ্লেষণী ভিত্তি। বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় শিক্ষানীতি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোকে নিবন্ধটি দেখিয়েছে: ভর্তি নিশ্চিত করা আর শিক্ষাগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এক নয়। শিক্ষায় সফলতা, নিরাপদ অংশগ্রহণ, পরিচয়ের মর্যাদা, সিদ্ধান্তে কণ্ঠস্বর ও কার্যকর প্রতিকার না থাকলে শিক্ষা সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ির পরিবর্তে বিদ্যমান বৈষম্য পুনরুৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে।
একই সকালে বাংলাদেশের দুই শিশু বিদ্যালয়ের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হয়। প্রথম শিশুটির হাতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি স্মার্টফোন, ব্যক্তিগত শিক্ষকের তৈরি নোট এবং পরীক্ষার আলাদা প্রস্তুতি-পরিকল্পনা। বাড়িতে তার পড়ার নিজস্ব কক্ষ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রয়োজনমতো সহায়তা করার মতো শিক্ষিত অভিভাবক রয়েছেন। দ্বিতীয় শিশুটি হয়তো সকালের খাবার না খেয়েই কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে জানতে পারে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকটি আবারও অনুপস্থিত, পাঠাগারটি বন্ধ, পরীক্ষাগারটি কার্যত অচল এবং শ্রেণিকক্ষে যে পাঠ বোঝার কথা ছিল, সেটি বুঝতে পরে টাকা দিয়ে কোচিং করতে হবে।
রাষ্ট্রের নথিতে দুজনই শিক্ষার্থী। দুজনের জন্যই বিদ্যালয়ের দরজা খোলা। দুজন একই শ্রেণির বই পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত একই ধরনের পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু তাদের শিক্ষাযাত্রা কি একই জায়গা থেকে শুরু হয়েছে? তারা কি একই সুযোগ, সহায়তা ও নিরাপত্তা পেয়েছে? তাদের অর্জিত ফলকে কি কেবল ব্যক্তিগত “মেধা” অথবা “পরিশ্রমের” নিরপেক্ষ প্রতিফলন বলা যায়?
শিক্ষায় সামাজিক ন্যায়বিচারের (Social Justice in Education) প্রশ্নটি ঠিক এই অস্বস্তিকর জায়গা থেকেই শুরু হয়। সবাইকে একই বই দেওয়া, একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করানো বা একই পরীক্ষায় বসানো আনুষ্ঠানিক সমতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বাসস্থান, অঞ্চল, ভাষা, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, পারিবারিক শিক্ষা, ডিজিটাল সুযোগ এবং প্রতিষ্ঠানের মানে বড় ব্যবধান থাকলে একই নিয়ম সবার জন্য সমান সম্ভাবনা তৈরি করে না।
শিক্ষা যদি একটি দৌড় হয়, তাহলে সমতা হলো সবাইকে একই স্টার্টিং লাইনে দাঁড় করানোর ঘোষণা। কিন্তু কারও পায়ে ভালো জুতা, কারও পায়ে শিকল; কারও সামনে সমতল পথ, কারও সামনে কাদা, দেয়াল ও অন্ধকার। এই অবস্থায় একই বাঁশি বাজিয়ে দৌড় শুরু করাকে নিরপেক্ষতা বলা গেলেও ন্যায়বিচার বলা যায় না। অবশ্য শিক্ষাকে কোনো একক বিজয়ীর প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়—এখানেই অ্যানালজিটির সীমা। তবু তুলনাটি দেখায়, অভিন্ন নিয়ম সব সময় ন্যায়সংগত ফল তৈরি করে না।
সামাজিক ন্যায়বিচারকে প্রায়ই দরিদ্র শিক্ষার্থীকে কিছু বৃত্তি দেওয়া, মেয়েদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা কিংবা কয়েকজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। এসব ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার আরও মৌলিক প্রশ্ন তোলে: শিক্ষা-সম্পদ কে পাচ্ছে? কার সংস্কৃতি ও পরিচয় স্বীকৃতি পাচ্ছে? সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে? কার কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠান শুনছে? অন্যায় হলে কে প্রতিকার পাচ্ছে?
Nancy Fraser-এর তত্ত্বে ন্যায়বিচারের তিনটি পরস্পরনির্ভর মাত্রা হলো পুনর্বণ্টন (Redistribution), স্বীকৃতি (Recognition) ও প্রতিনিধিত্ব (Representation)। পুনর্বণ্টন জানতে চায়—দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষাসামগ্রী, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বৃত্তি, অবকাঠামো ও শেখার সহায়তা ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত হয়েছে কি না। স্বীকৃতি পরীক্ষা করে—শিক্ষার্থীর ভাষা, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়কে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, নাকি প্রভাবশালী সংস্কৃতিকেই একমাত্র স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন হলো—শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের জীবন ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করা সিদ্ধান্তে কার্যকর কণ্ঠস্বর পাচ্ছে কি না।
এই তিন মাত্রার সম্মিলিত লক্ষ্য অংশগ্রহণের সমতা বা সমমর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ (Participatory Parity)। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন বা রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার কারণে কেউ যেন অন্যের তুলনায় অধস্তন অবস্থান থেকে অংশ নিতে বাধ্য না হয়।
Schiller এবং তাঁর সহলেখকদের ২০২৫ সালের দক্ষিণ আফ্রিকান উচ্চশিক্ষাভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক ন্যায়বিচারনির্ভর শিক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষকদের সচেতনতা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠিত বিধিব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তার বাস্তব প্রয়োগ সীমিত করতে পারে (Schiller et al., 2025)। গবেষণাটি পাঁচজন শিক্ষকের প্রতিফলনমূলক জার্নালের ওপর ভিত্তি করে এবং আইন, স্বাস্থ্য ও সমাজকর্ম—এই তিনটি শাখায় সীমাবদ্ধ। তাই এর ফল বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি সাধারণীকরণ করা যাবে না। তবে প্রতিষ্ঠান কীভাবে শিক্ষকের সদিচ্ছাকেও আটকে দিতে পারে—এই অন্তর্দৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
Paulo Freire-এর মতে, শিক্ষা কেবল শিক্ষার্থীর মাথায় তথ্য জমা রাখার “ব্যাংকিং ব্যবস্থা” নয়। সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে তার সামাজিক বাস্তবতা বুঝতে, ক্ষমতার সম্পর্ক শনাক্ত করতে, প্রশ্ন করতে এবং পরিবর্তনের কাজে অংশ নিতে শেখায়। অন্যদিকে John Dewey শিক্ষা ও গণতন্ত্রকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বিদ্যালয় কেবল ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির স্থান নয়; বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের জীবনেই গণতন্ত্র, সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত সম্পর্ক অনুশীলিত হওয়ার কথা।
সেই অর্থে সামাজিক ন্যায়বিচার পাঠ্যবইয়ের আলাদা অধ্যায় বা বার্ষিক দিবসের স্লোগান নয়। শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীকে সম্বোধন করেন, কার উত্তরকে মূল্য দেন, কে সামনে বসে, কে সিদ্ধান্তে অংশ নেয়, ভুল করলে কাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হয়, অভিযোগ করলে কার কথা বিশ্বাস করা হয়—এসব দৈনন্দিন ঘটনার মধ্যেই ন্যায় বা অন্যায় নির্মিত হয়।
শিক্ষা একই সঙ্গে মুক্তির পথ এবং বৈষম্য পুনরুৎপাদনের যন্ত্র—দুটিই হতে পারে। দরিদ্র পরিবারের প্রথম প্রজন্মের কোনো শিক্ষার্থী যদি মানসম্মত শিক্ষা পেয়ে সামাজিক ও পেশাগত গতিশীলতার সুযোগ পায়, শিক্ষা মুক্তির দরজা খুলে দেয়। কিন্তু সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের সাংস্কৃতিক পুঁজি, ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি, ব্যক্তিগত শিক্ষক ও যোগাযোগের সুবিধাকে যদি “ব্যক্তিগত মেধা” হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে শিক্ষা বিদ্যমান শ্রেণিবিন্যাসকে বৈধতা দেয়।
বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। নারীশিক্ষা, প্রাথমিক ভর্তি, উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু ভর্তি বা নিবন্ধনকে শিক্ষাগত ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত নির্দেশক ধরে নিলে একটি বড় সত্য আড়ালে থেকে যায়: প্রতিষ্ঠানে ঢোকা আর সেখানে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা, শেখা ও সফল হওয়া এক বিষয় নয়।
UNESCO IESALC উচ্চশিক্ষার অধিকারকে access ও success—দুইয়ের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে। প্রতিষ্ঠানকে শুধু দরজা খুললেই হবে না; শিক্ষার্থী যাতে পূর্ণভাবে অংশ নিতে, সুস্থ থাকতে, মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং তা থেকে উপকৃত হতে পারে, তার ব্যবস্থাও করতে হবে। UNESCO IESALC-এর সামাজিক ন্যায়বিচার কাঠামোতে পাঁচটি ‘A’—প্রাপ্যতা (Availability), প্রবেশগম্যতা (Accessibility), গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability), অভিযোজনক্ষমতা (Adaptability) ও জবাবদিহি (Accountability)—অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎকর্ষ (Inclusive Excellence), ন্যায্যতার দাবিদার জনগোষ্ঠী (Equity-deserving Groups) এবং আন্তঃপরিচয়গত বৈষম্য (Intersectionality)। UNESCO IESALC-এর ব্যাখ্যায় জোর দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীকে “সমস্যা” হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাকে ব্যর্থ করে দেওয়া কাঠামো পরিবর্তনের ওপর।
প্রাপ্যতা মানে পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, আসন ও শেখার উপকরণ রয়েছে কি না। প্রবেশগম্যতা শুধু বিদ্যালয়ের সামনে র্যাম্প আছে কি না—সেটি নয়; অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক, ভাষাগত, ডিজিটাল ও মনোভাবগত বাধা দূর করাও এর অংশ। গ্রহণযোগ্যতা জানতে চায় শিক্ষা নিরাপদ, মানসম্মত, বৈষম্যমুক্ত এবং শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কি না। অভিযোজনক্ষমতা পরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্যময় প্রয়োজনের সঙ্গে পাঠ্যক্রম, সময়, শিক্ষণ ও মূল্যায়নকে খাপ খাওয়াতে পারছে কি না। আর জবাবদিহি জানতে চায়—অধিকার লঙ্ঘিত হলে কার্যকর অভিযোগ, তদন্ত, আপিল ও প্রতিকার পাওয়া যায় কি না।
UNESCO-এর হিসাবে বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির হার ২০০০ সালের ১৯ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু একই সময়ে দেশ, অঞ্চল ও সামাজিক গোষ্ঠীভেদে প্রবেশ ও সফলতায় বড় বৈষম্য রয়ে গেছে। অর্থাৎ শিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণ নিজে থেকেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। UNESCO-এর উচ্চশিক্ষার অধিকারবিষয়ক পর্যালোচনা উচ্চশিক্ষাকে জনকল্যাণমূলক সম্পদ ও শিক্ষার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, আইনের নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং নিরক্ষরতা দূর করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঘোষিত হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদ সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করে। ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রেও এসব কারণে বাধা আরোপ না করার নিশ্চয়তা দেয়। একই সঙ্গে নারী, শিশু এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সাংবিধানিক সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের সরকারি পাঠ তাই অভিন্ন আচরণের পাশাপাশি বৈষম্য দূর করতে ইতিবাচক ব্যবস্থারও ভিত্তি দেয়।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু নীতি ঘোষণার পরের আসল প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন: কত সম্পদ প্রয়োজন, কে দায়িত্ব নেবে, অগ্রগতি কোন সূচকে মাপা হবে এবং ব্যর্থতার জন্য কে জবাব দেবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এখনো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি হলেও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, জলবায়ু, শ্রমবাজার, প্রতিবন্ধিতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অধিকার বিবেচনায় এর বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় হালনাগাদ নতুনভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
একটি মহানগরীর সুসজ্জিত বিদ্যালয়ের সঙ্গে চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল, পাহাড়, চা-বাগান কিংবা দরিদ্র নগরবস্তির বিদ্যালয়ের তুলনা করলে একই জাতীয় পাঠ্যক্রমের নিচে একাধিক শিক্ষা-বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়। কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার ও ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ রয়েছে; কোথাও একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, অপ্রতুল উপকরণ, যাতায়াতের অনিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করে।
পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্যও বিদ্যালয়ের বাইরের একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে। প্রাইভেট টিউশন, কোচিং, স্মার্ট ডিভাইস, ইন্টারনেট, অনলাইন কোর্স, সহায়ক বই এবং শান্ত পরিবেশে পড়াশোনার সুবিধা যাদের রয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ পায়। পরে পরীক্ষার ফলকে শুধু মেধার নিরপেক্ষ পরিমাপ বলা হলে এই অদৃশ্য বিনিয়োগগুলো আড়ালে থেকে যায়।
মেধা অবশ্যই অস্বীকার করার বিষয় নয়। কিন্তু মেধা কোন পরিবেশে বিকশিত হয়েছে, কার প্রতিভা নিয়মিত পরিচর্যা পেয়েছে এবং কে একাধিক বাধা অতিক্রম করে একই ফল অর্জন করেছে—এসব বিবেচনা ছাড়া meritocracy সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থাকে ব্যক্তিগত যোগ্যতা হিসেবে বৈধতা দিতে পারে। UNESCO IESALC এই কারণে “merit” পুনর্বিবেচনা, বিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং ন্যায্যতার দাবিদার জনগোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক ব্যবস্থার কথা বলেছে।
সমতা (Equality) হলো সবাইকে একই জিনিস দেওয়া। ন্যায্যতা (Equity) হলো প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া। সামাজিক ন্যায়বিচার (Social Justice) আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করে—কেন শুরুতেই কারও প্রয়োজন এত বেশি হলো এবং কোন কাঠামো বারবার একই জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখছে?
এটিকে তিন শিশুর দেয়ালের ওপারে খেলা দেখার প্রচলিত ছবির বাইরে একটি বিদ্যালয়-উদাহরণে বোঝা যায়। সমতার নীতি অনুযায়ী সব শিক্ষার্থীকে একই বই দেওয়া হলো। ন্যায্যতার নীতি অনুযায়ী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে ব্রেইল বা ডিজিটাল accessible version, শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে সাংকেতিক ভাষা সহায়তা এবং শেখার ভিন্নতা থাকা শিক্ষার্থীকে সহজপাঠ্য উপকরণ দেওয়া হলো। সামাজিক ন্যায়বিচার আরও জানতে চাইবে—কেন মূল বইটি প্রথম থেকেই সর্বজনীন শিখন-নকশা (Universal Design for Learning—UDL) অনুসারে তৈরি হয়নি, কেন সহায়ক উপকরণ দেরিতে আসে এবং এসব সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা কোথায় ছিলেন?
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির আইনগত ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু আইন থাকা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তব প্রবেশগম্যতা, reasonable accommodation, সহায়ক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত জনবল থাকা এক কথা নয়। আইনটির সরকারি পাঠ বাস্তবায়ন মূল্যায়নে তাই শুধু ভর্তি নয়, উপস্থিতি, অংশগ্রহণ, শেখার অগ্রগতি, নিরাপত্তা ও শিক্ষা সম্পন্ন করার তথ্যও প্রয়োজন।
একই পাঠ্যক্রম তখনই ন্যায়সংগত হতে পারে, যখন তা শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্যকে সমস্যা নয়, শিক্ষা-সম্পদ হিসেবে স্বীকার করে। যার মাতৃভাষা পাঠদানের ভাষা নয়, যে কিশোরী নিরাপদ যাতায়াত বা মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাবে অনুপস্থিত থাকে, যে শিশু পরিবারের আয়ে সহায়তা করে, যে শিক্ষার্থী নিজের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্রূপের শিকার হয়—তাদের সবার জন্য একই বই ও একই সময়সীমা সমান সুযোগ তৈরি করে না।
Vicki Hargraves সামাজিক ন্যায়বিচারকে fairness, equity, inclusion এবং ক্ষমতা, সম্পদ ও সুযোগের অসমতা মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর আলোচনায় culturally responsive pedagogy, শিক্ষার্থীর পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক বিদ্যালয়-প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। Aotearoa New Zealand-এর Te Kotahitanga উদ্যোগ Māori শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সম্পর্কভিত্তিক শিক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচক ফলের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল (Hargraves, 2021) ।
বাংলাদেশের জন্য এর শিক্ষা হলো—ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ভাষাগত সংখ্যালঘু বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির একটি ছবি বা পৃথক অধ্যায় পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করাই অন্তর্ভুক্তি নয়। তাদের ইতিহাস, ভাষা, জ্ঞান, জীবন-অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈধ জ্ঞান হিসেবে মূল পাঠ্যক্রমে স্থান দিতে হবে। স্বীকৃতি মানে কাউকে করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন নয়; সমমর্যাদার জ্ঞান-উৎপাদক ও নাগরিক হিসেবে দেখা।
সামাজিক ন্যায়বিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শ্রেণিকক্ষ, আর শিক্ষক সেখানে প্রধান মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু শিক্ষককে যদি কেবল কেন্দ্রীয় নির্দেশনা, বই ও পরীক্ষার রুটিন বাস্তবায়নকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাঁর পেশাগত বিচার, স্থানীয় জ্ঞান ও নৈতিক নেতৃত্ব সংকুচিত হয়।
বাংলাদেশকেন্দ্রিক সংযুক্ত শিক্ষকশিক্ষা-নথিটি একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব উত্থাপন করেছে: শিক্ষা কি গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব, সামাজিক সমতা ও মানবিক রূপান্তরের প্রকল্প, নাকি প্রধানত বাজারের জন্য মানবসম্পদ তৈরির ব্যবস্থা? উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বহু ক্ষেত্রে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও মূল্যায়ন সম্প্রসারণে অবদান রেখেছে। কিন্তু donor expectation এবং neoliberal priority যদি শিক্ষার উদ্দেশ্যকে কর্মদক্ষতা, পরিমাপযোগ্য ফল ও বাজারযোগ্যতার সংকীর্ণ ধারণায় সীমাবদ্ধ করে, তাহলে নাগরিকতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমালোচনামূলক চেতনা প্রান্তে চলে যেতে পারে।
কর্মসংস্থানযোগ্যতা অবশ্যই জরুরি। প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অপরিহার্য। সমস্যা তখনই, যখন শিক্ষার্থীকে পূর্ণ মানুষ ও নাগরিকের পরিবর্তে কেবল ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা হয়। দক্ষ পেশাজীবী এবং ন্যায়সচেতন নাগরিক তৈরি পরস্পরবিরোধী নয়; একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থাকে দুটো দায়িত্বই পালন করতে হবে।
শিক্ষকশিক্ষায় তাই social-justice literacy অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ শিক্ষককে পাঠপরিকল্পনার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের ক্ষমতা-সম্পর্ক, অচেতন পক্ষপাত (Implicit Bias), সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, trauma-sensitive support, disability inclusion, gender responsiveness এবং বৈষম্য শনাক্ত করার পদ্ধতি শেখাতে হবে। প্রশিক্ষণ এককালীন কর্মশালায় সীমাবদ্ধ না রেখে mentoring, classroom observation, professional learning community এবং critical reflective inquiry-এর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শিক্ষকের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারও শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নিরাপত্তাহীন, অপমানিত, অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপে থাকা এবং পেশাগত স্বাধীনতাবিহীন শিক্ষককে দিয়ে মুক্ত, নিরাপদ ও ন্যায়সংগত শ্রেণিকক্ষ গড়া কঠিন। শিক্ষককে জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে, কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা এককভাবে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর শেখা বোঝার আয়না হওয়ার কথা। কিন্তু যখন একটি পরীক্ষাই ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের সম্মানের একমাত্র বিচারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই আয়না হাতুড়িতে পরিণত হয়। উচ্চঝুঁকির পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যালয় পাঠ্যক্রমের বিস্তৃত উদ্দেশ্য সংকুচিত করে সম্ভাব্য প্রশ্ন, নম্বর ও পাসের হারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সৃজনশীলতা, সহযোগিতা, নৈতিক বিচার, নাগরিকতা, কৌতূহল ও সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
Hargraves সতর্ক করেছেন, test-driven accountability সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক শিক্ষণকে দুর্বল করতে পারে। কারণ যা সহজে সংখ্যায় ধরা যায়, ব্যবস্থা সেটিকেই সবচেয়ে মূল্যবান মনে করতে শুরু করে। অথচ মানুষের সব গুরুত্বপূর্ণ শেখা পরীক্ষার নম্বরে ধরা পড়ে না।
এর অর্থ পরীক্ষা বাতিল নয়; মূল্যায়নের বহুমুখীকরণ। গঠনমূলক মূল্যায়ন (Formative Assessment), প্রকল্প, portfolio, ব্যবহারিক কাজ, মৌখিক উপস্থাপনা, সহযোগী সমস্যা সমাধান এবং প্রয়োজনীয় accommodation যুক্ত করতে হবে। ফলাফল বিশ্লেষণেও শুধু সামগ্রিক পাসের হার নয়; অঞ্চল, লিঙ্গ, দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী opportunity gap শনাক্ত করতে হবে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্যায় হলে শিক্ষার্থী বা শিক্ষক কোথায় যাবেন—এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাকাঠি। অভিযোগের একটি ঠিকানা থাকাই যথেষ্ট নয়। সময়সীমা না থাকলে, অভিযোগকারীকে অগ্রগতি না জানালে, সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ না করলে, অভিযুক্ত কাঠামোই নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত করলে কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকলে অভিযোগব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
জবাবদিহি মানে শুধু শাস্তি নয়। এর মধ্যে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া (Due Process), উভয় পক্ষকে শোনা, নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের মানদণ্ড, কারণসংবলিত সিদ্ধান্ত, আপিল, গোপনীয়তা, সময়সীমা এবং প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত। শিশু, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য অভিযোগের পথ শারীরিক, ভাষাগত ও যোগাযোগগতভাবে প্রবেশগম্য হতে হবে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল বা অন্য কোনো কাঠামোয় একজন প্রতিনিধি রাখলেই participatory parity তৈরি হয় না। তাঁর মতামত বাস্তব সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তিনি স্বাধীনভাবে কথা বলতে নিরাপদ কি না এবং প্রতিনিধিত্বটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত কি না—এসবও দেখতে হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি দূরবর্তী শিক্ষার্থীকে শিক্ষক, পাঠ ও বৈশ্বিক জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। সহায়ক প্রযুক্তি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা বাড়াতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তা, অনুবাদ, accessible content এবং দ্রুত feedback দিতে পারে। কিন্তু ডিভাইস, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ভাষা ও digital literacy-তে বৈষম্য থাকলে প্রযুক্তি পুরোনো বিভাজনের ওপর নতুন দেয়াল নির্মাণ করে।
অ্যালগরিদমও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরপেক্ষ নয়। অসম বা পক্ষপাতপূর্ণ তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত ব্যবস্থা ভর্তি, মূল্যায়ন বা ঝুঁকি শনাক্তকরণে বৈষম্য পুনরুৎপাদন করতে পারে। তাই শিক্ষা-প্রযুক্তিতে accessibility-by-design, data protection, bias audit, মানবিক তদারকি এবং low-tech alternative রাখা জরুরি। প্রযুক্তিকে শিক্ষক বা মানবিক সম্পর্কের বিকল্প নয়, ন্যায়সংগত শিক্ষার সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
অবিলম্বে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে equity audit, অভিযোগব্যবস্থা পর্যালোচনা, প্রবেশগম্যতা যাচাই এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীর সহায়তা-মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। এক থেকে তিন বছরের মধ্যে শিক্ষকশিক্ষা, অর্থায়ন-সূত্র, মূল্যায়ন এবং data-disaggregation সংস্কার করা প্রয়োজন। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কেন্দ্র–প্রান্ত সম্পদবৈষম্য, শিক্ষা প্রশাসনের ক্ষমতা-কাঠামো এবং অধিকারভিত্তিক স্বাধীন প্রতিকারব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
প্রতিটি উদ্যোগের জন্য নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান, সহযোগী পক্ষ, বাজেট, সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ জরুরি। “সচেতনতা বাড়াতে হবে” বা “যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে”—এ ধরনের দায়িত্বহীন সুপারিশ সংস্কার আনে না। ন্যায়বিচারের নীতিকে প্রশাসনিক ক্রিয়ায় অনুবাদ করতে হবে।
শিক্ষায় সামাজিক ন্যায়বিচার কোনো সৌজন্যমূলক সহায়তা, প্রকল্পের আলাদা component বা বিশেষ দিবসের স্লোগান নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক সমাজের পূর্বশর্ত। বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু শিক্ষা থেকে মর্যাদার সঙ্গে উপকৃত হওয়া, নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়া, সিদ্ধান্তে কণ্ঠস্বর রাখা এবং অন্যায়ের কার্যকর প্রতিকার পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার তাই নতুন ভবন, সংশোধিত পাঠ্যক্রম কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষকে—বিশেষ করে সেই শিক্ষার্থীকে, যার পথ সবচেয়ে দীর্ঘ, কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা এবং অধিকার সবচেয়ে সহজে উপেক্ষিত হয়।
সবাইকে একই দরজা দিয়ে ঢোকানো সমতা হতে পারে; কিন্তু প্রত্যেকের জন্য শেখা, মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও সফলতার পথ তৈরি করাই সামাজিক ন্যায়বিচার।
একটি সমাজের শিক্ষাগত সাফল্য তার সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ নম্বরে যতটা নয়, সবচেয়ে বাধাগ্রস্ত শিক্ষার্থীর জন্য সে কতটা পথ তৈরি করতে পারে—তাতেই বেশি পরিমাপযোগ্য। চকচকে ভবন, ডিজিটাল পর্দা, শতভাগ পাস বা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং অগ্রগতির দৃশ্যমান ছবি দেখাতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রকৃত ছবি পাওয়া যায় সেই শিক্ষার্থীর চোখে, যে প্রশ্ন করতে নিরাপদ বোধ করে, ভুল করলে দ্বিতীয় সুযোগ পায় এবং নিজের পরিচয়ের কারণে ছোট হয়ে যেতে বাধ্য হয় না।
শিক্ষা যদি কেবল বিদ্যমান প্রতিযোগিতায় সুবিধাপ্রাপ্ত কয়েকজনকে আরও এগিয়ে দেয়, তবে তা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে নতুন সনদ দেয়। আর যদি শিক্ষা মানুষকে ক্ষমতার ভাষা বুঝতে, অন্যায়কে প্রশ্ন করতে এবং অপরের মর্যাদা রক্ষা করতে শেখায়, তবে সেটিই গণতন্ত্রের সবচেয়ে গভীর বিদ্যালয়।
তাই প্রশ্নটি শুধু কতজন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করল তা নয়; প্রশ্ন হলো—প্রবেশের পর কে কথা বলতে পারল, কে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেল, কার পরিচয় সম্মানিত হলো এবং কার জন্য ন্যায়বিচারের দরজাটি সত্যিই খুলল।
#শিক্ষায়সামাজিকন্যায়বিচার #শিক্ষাসংস্কার #শিক্ষারঅধিকার #শিক্ষাবৈষম্য #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #শিক্ষায়সমতা #সামাজিকন্যায়বিচার #বাংলাদেশেরশিক্ষা #শিক্ষকশিক্ষা #প্রতিবন্ধীবান্ধবশিক্ষা #EducationReform #SocialJusticeInEducation #InclusiveEducation #EducationalEquity #RightToEducation #OdhikarPatra
Keywords:
শিক্ষায় সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষাগত সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষার অধিকার, participatory parity, শিক্ষা বৈষম্য, বাংলাদেশ শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষকশিক্ষা, institutional accountability, higher education, equity in education