10/10/2026 পদ্মার ভাঙনে বিলীনের শঙ্কায় জাজিরার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি
odhikarpatra
৯ October ২০২৬ ১৫:৪৯
নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম
পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খাঁনকান্দি গ্রামের ১২২ নম্বর আলতাফ হোসেন খাঁন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় পদ্মা নদী ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। কয়েক বছরের ভাঙনে নদী এগিয়ে এসে এখন বিদ্যালয়ের মাঠের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভবনের টিন ও বেড়া খুলে রাখা হয়েছে। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কিছু আসবাব ও প্রয়োজনীয় মালামাল। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই চলছে শিশুদের পাঠদান। নদীভাঙনের আতঙ্কে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে।
দুই কিলোমিটার দূরের নদী এখন বিদ্যালয়ের কাছে
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আলম খাঁনকান্দি গ্রামটি পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। চারপাশে নদীবেষ্টিত এই এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌপথ। স্থানীয়ভাবে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় ২০১৭ সালে এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খাঁন বিদ্যালয়ের জন্য ৩৩ শতাংশ জমি দান করেন। তাঁর নামেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠার সময় বিদ্যালয় থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার। কিন্তু গত দুই বছরে এলাকায় নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। চলতি বছরেই নদী প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর দিকে এগিয়ে এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে বিদ্যালয়টি এখন সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
ভবনের টিন-বেড়া খুলে চলছে ক্লাস
বিদ্যালয়ের পাকা মেঝের টিনশেড ভবনে পাঁচটি কক্ষে পাঠদান চলে। নদীভাঙনের আশঙ্কায় ভবনটির টিন ও বেড়া খুলে রাখা হয়েছে। কিছু প্রয়োজনীয় মালামালও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করে খোলা ঘরেই শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামীম খান বলেন, এ বছর এলাকায় ভাঙন সবচেয়ে বেশি হয়েছে। গত দুই মাসে নদী বিদ্যালয়ের মাঠের কাছে চলে এসেছে। প্রতিদিনই বিদ্যালয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাঁকে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে চিন্তা হয়, পরদিন এসে স্কুলটি দেখতে পাব কি না। ভাঙনের আশঙ্কায় কিছু মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে।’
২১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত আসে মাত্র ৫০-৬০ জন
চলতি শিক্ষাবর্ষে বিদ্যালয়টিতে ২১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। কিন্তু নদীভাঙনের আতঙ্ক ও বসতবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১১০ জন শিক্ষার্থী ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে। ফলে অনেক শিশুর জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বেড়া খুলে রাখা হয়েছে। সরিয়ে নেওয়া বিভিন্ন মালামাল এক জায়গায় রাখা। খোলা ঘরের দুটি কক্ষে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পড়াচ্ছেন দুজন শিক্ষক। পাশের আরেকটি কক্ষে কয়েকজন শিশুকে পাঠদান করছেন একজন শিক্ষক।
সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে ৬৫ জন শিক্ষার্থীকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘স্কুল ভেঙে গেলে কোথায় পড়ব?’
নদীভাঙনের আশঙ্কা শুধু শিক্ষক ও অভিভাবকদের নয়, আতঙ্কিত করে তুলেছে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদেরও।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনিকা ও জোনায়েদ জানায়, এখন স্কুলে আসতে তাদের ভয় লাগে। যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। বিদ্যালয়টি ভেঙে গেলে কোথায় গিয়ে পড়াশোনা করবে, তা নিয়েও তারা চিন্তিত।
শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে হারিয়ে গেলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চালু রাখা হবে এবং দূরে চলে যাওয়া শিশুদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
৩৫০ পরিবার নদীভাঙনের শিকার
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খাঁন জানান, বিদ্যালয়ের আশপাশে ভাঙন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, এলাকাটি রক্ষায় এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, চলতি বছর আলম খাঁনকান্দি এলাকায় অন্তত ৩৫০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছে। এবার বিদ্যালয়টিও ভাঙনের মুখে পড়েছে।
বসতভিটা হারিয়ে পরিবারগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ায় শিশুদের শিক্ষাজীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানান্তরিত পরিবারগুলোর অনেক শিশুর জন্য পুরোনো বিদ্যালয়ে যাতায়াত এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
বিকল্প জমি না পাওয়ায় অনিশ্চয়তা
জাজিরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন, পদ্মা নদীর তীরবর্তী গ্রামের বিদ্যালয়টি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
তবে এখনো বিকল্প জমি পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের শিকার হলেও যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
আলতাফ হোসেন খাঁন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নদীভাঙনের কারণে শিক্ষা অবকাঠামো ও শিশুদের শিক্ষাজীবন কতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।
বিদ্যালয়টি রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন বিকল্প জমি নির্ধারণ, নিরাপদ স্থানে ভবন স্থানান্তরের পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার কার্যকর উদ্যোগ। কারণ একটি বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবন হারানো নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত শত শিশুর শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
পদ্মার ভাঙন থামানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা সম্ভব। এখন এলাকাবাসী ও বিদ্যালয়সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।