10/12/2026 জাতীয় সংগীতে রবীন্দ্রনাথ, দেয়ালে কালির দাগ: বাংলাদেশে কবির মানবিকত্বের পরীক্ষা শেষ হবে কবে? রবীন্দ্রনাথকে মুছতে গিয়ে আমরা কাকে মুছছি?
Dr Mahbub
১২ October ২০২৬ ০৬:৪৩
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক কেন বারবার ফিরে আসে? বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্কের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অনুসন্ধান: পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের সম্প্রচার বন্ধ, ১৯৬১ সালের জন্মশতবর্ষ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, ১৯৬৭ সালের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, ছায়ানটের ওপর হামলা এবং ১০–১১ অক্টোবর ২০২৬-এর গ্রাফিতি-বিতর্ক নিয়ে অধিকারপত্রের অনুসন্ধানধর্মী রম্য-ব্যঙ্গাত্মক ফিচার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও জমিদারি-সংক্রান্ত দাবি, ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক পুঁজি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নীতির বাস্তবায়ন বিশ্লেষণ করে লেখাটি জানতে চায়—কবিকে ঘিরে আমাদের বিরোধ আসলে সাহিত্য নিয়ে, নাকি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী আত্মপরিচয় ও নাগরিক অধিকারের সীমা নিয়ে? প্রামাণ্য ইতিহাস, সাংস্কৃতিক অধিকার, শ্রেণিবৈষম্য ও পরিচয়ের রাজনীতির আলোকে প্রশ্ন—আমরা কবির সমালোচনা করছি, নাকি মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা সংকুচিত করছি?
দৃশ্যটি কল্পিত; পরিচিত মনে হলে দায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের। ঢাকার একটি স্কুলে সকাল। মাঠে শিশুরা সারি বেঁধেছে। কারও জুতোর ফিতা খোলা, কারও টিফিনের চিন্তা, কারও মাথায় গত রাতের অসমাপ্ত অঙ্ক। মাইক্রোফোন একটু কাশল। তারপর জাতীয় সংগীত। শিশুরা গাইল। একজন শিক্ষক খেয়াল করলেন, পেছনের সারিতে দাঁড়ানো ছেলেটি উচ্চারণে হোঁচট খেলেও দেশের নামটি বেশ জোরে বলছে।
ছুটির পরে সেই ছেলেটির বাবা ফোনে একটি ভিডিও দেখলেন। সেখানে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ এ দেশের শত্রু। বাবা থমকে গেলেন। সকালে যে কবির গান গেয়ে ছেলেটি দেশকে ভালোবাসল, দুপুরে সেই কবিকে ভালোবাসা কি দেশবিরোধিতা হয়ে গেল? টিফিনের বাক্স বন্ধ করা সহজ; এই প্রশ্নের ঢাকনা বন্ধ করা একটু কঠিন।
পারিবারিক আলোচনায় একজন বললেন, কবি ছিলেন জমিদার। আরেকজন বললেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি। তৃতীয়জন ঘোষণা করলেন, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ই যথেষ্ট প্রমাণ। চতুর্থজন কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর হাতে বই। ফলে ভিডিওর সামনে তিনি প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়লেন। আমাদের অনেক বিতর্কে তথ্যের ওজন মাপা হয় না; বক্তার গলার আওয়াজ আর পোস্টের শেয়ারসংখ্যা মাপা হয়।
অথচ প্রশ্নটি শুধু একজন কবিকে পছন্দ করার নয়। রাষ্ট্র কি নাগরিকের সাংস্কৃতিক স্মৃতি নির্ধারণ করবে? একটি গান কি লেখকের ধর্মীয় পরিচয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই মানুষের হবে? একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলে তাঁর সাহিত্য বাতিল হয়, নাকি তাঁকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়?
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ঝগড়া তাই অদ্ভুত এক আয়না। সামনে কবির মুখ; পেছনে আমাদের নিজেদের অনিরাপত্তা, বঞ্চনার ইতিহাস, রাজনৈতিক হিসাব এবং অন্যের পরিচয় মেনে নেওয়ার সক্ষমতা। দেয়ালে কালি পড়ে। কিন্তু দাগটি অনেক সময় দেখা যায় সমাজের চিন্তার অভ্যাসে।
“রবীন্দ্রনাথ প্রথম নিষিদ্ধ হয়েছিলেন কবে?” প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত উত্তর জনপ্রিয়; নির্ভুল উত্তর একটু দীর্ঘ। কবির সমস্ত বই, গান, আলোচনা ও ব্যক্তিগত পাঠ একসঙ্গে আইন করে নিষিদ্ধ হয়েছিল—এমন একটি সর্বব্যাপী ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বেতার-টেলিভিশনে গান প্রচার বন্ধ করাকে মেলানো ঠিক নয়। আবার প্রকাশ্য নিষেধের আগের প্রশাসনিক বাধা ও সাংস্কৃতিক চাপও ইতিহাসের বাইরে রাখা যায় না।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পূর্ববঙ্গের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তার কেন্দ্রে চলে আসেন। পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রকল্পে বাঙালি মুসলমানকে এমনভাবে ভাবা হচ্ছিল, যেন তাঁর ধর্মীয় পরিচয় এবং বাংলা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পাশাপাশি থাকতে পারে না। সমস্যাটি কবির গানের স্বরলিপিতে ছিল না; রাষ্ট্রের পরিচয়-নির্ধারণের ছকে ছিল।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপন বাধার মুখে পড়েছিল। এরপর ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রসংগীতসহ ‘ভারতীয়’ বলে বিবেচিত সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুর সম্প্রচার বন্ধ করা হয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই যুদ্ধকালীন সম্প্রচার-দমনের উল্লেখ আছে। ফলে ১৯৬৭-কে কোনো পূর্বপট ছাড়াই ‘প্রথম’ বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে।
সবচেয়ে আলোচিত পর্ব আসে ১৯৬৭ সালের জুনে। তথ্য ও বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে জানান, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বিবেচিত রবীন্দ্রসংগীত প্রচার করা হবে না; অন্যগুলোর প্রচারও কমানো হবে। গবেষণা ও ঐতিহাসিক আলোচনায় সংসদীয় বক্তব্যের তারিখ ২২ জুন; বহু বিবরণে ২৩ জুন নিষেধের তারিখ হিসেবে এসেছে। বক্তব্য, সংবাদ প্রকাশ ও প্রয়োগের দিনকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
অতএব নির্ভুল ভাষা হবে: ১৯৬৫ সালে যুদ্ধকালীন সম্প্রচার বন্ধের নজির রয়েছে; ১৯৬৭ সালের জুনে রবীন্দ্রসংগীত বর্জন ও প্রচার হ্রাসের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বড় সাংস্কৃতিক সংঘাতের জন্ম দেয়। এটি মূলত সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস; কবির সমগ্র রচনা সর্বত্র নিষিদ্ধ হওয়ার একক ঘোষণা নয়।
এখানে রাষ্ট্রের যুক্তিটি লক্ষণীয়। একটি গান বাংলায় লেখা, বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত; তবু তাকে বিদেশি বলা হচ্ছে। যেন পদ্মার বাতাস শুনতে গেলে আগে ভিসা অফিসে যেতে হবে। ব্যঙ্গটি হাসায়, কিন্তু এর নিচে কঠিন সত্য: শাসক যখন সংস্কৃতির পরিচয় নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার নেয়, মানুষের নিজের জীবনও সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় বাধার বিপরীতে প্রতিরোধও একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৬১ সালের জন্মশতবর্ষ আয়োজনের পর প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ইতিহাসে দেখা যায়, সংস্কৃতিচর্চাকে আত্মপরিচয় ও মানবিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এটি শুধু একজন বিখ্যাত কবির জন্মদিন পালনের ফল ছিল না; সাংস্কৃতিক পরিসর নিজের হাতে রাখার একটি উদ্যোগ ছিল।
১৯৬৭ সালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষক, লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিবৃতি দেন। সংরক্ষিত ঐতিহাসিক বিবরণে ১৮ জনের বিবৃতির উল্লেখ আছে; অন্য আলোচনায় ১৯ জন বলা হয়েছে। সংখ্যার এই পার্থক্য জানানোই গবেষণার সততা। মূল বক্তব্য ছিল স্পষ্ট: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাংলাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক সত্তার অংশ; সরকারি নীতিতে সেই বাস্তবতাকে মর্যাদা দিতে হবে।
প্রতিবাদ কাগজে আটকে থাকেনি। সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও ছাত্রসমাজের কর্মসূচি গড়ে ওঠে। সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে প্রতিবাদসভা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগের বিবরণ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের হাতে সম্প্রচারযন্ত্র ছিল; নাগরিকের হাতে ছিল কণ্ঠ, মঞ্চ এবং একসঙ্গে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।
ছায়ানট ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে নববর্ষের আয়োজন শুরু করে। গুরুত্বপূর্ণ কালানুক্রমটি মনে রাখা দরকার: বছরের এপ্রিলের আয়োজনকে জুনের সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বলা যাবে না। তবে উভয় ঘটনাই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার ধারায় যুক্ত।
এই আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় অবদান রেখেছিল। কিন্তু “রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিবাদ থেকেই মুক্তিযুদ্ধ”—এমন একরেখা ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ। ভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংগ্রাম পাশাপাশি কাজ করেছে। সংস্কৃতি ছিল সেই প্রবাহের শক্তিশালী স্রোত; পুরো নদী নয়।
স্বাধীনতার পরে পরিস্থিতি মৌলিকভাবে বদলায়। যে রাষ্ট্রীয় পরিসরে রবীন্দ্রসংগীত সন্দেহের বিষয় ছিল, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে সেই কবির রচনা জায়গা পায়। সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদে ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণ জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারিত। ইতিহাসের ব্যঙ্গ এখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে: যে গানকে একসময় আদর্শবিরোধী বলা হয়েছিল, সেটিই নতুন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের অংশ।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মানেই সামাজিক বিরোধের অবসান নয়। জাতীয় সংগীত থাকা, পাঠ্যবইয়ে কবিতা থাকা এবং মানুষ নিশ্চিন্তে গান গাইতে পারা—তিনটি আলাদা বিষয়। প্রথমটি সাংবিধানিক অবস্থান; দ্বিতীয়টি শিক্ষাগত উপস্থিতি; তৃতীয়টি দৈনন্দিন স্বাধীনতা। শুধু প্রথম দুটি দেখিয়ে তৃতীয়টির নিরাপত্তা প্রমাণ করা যায় না।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনায় ছায়ানটের নববর্ষ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় প্রতিষ্ঠানটির বিবরণ অনুযায়ী ১০ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হন। এটি কেবল রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে হামলা ছিল না; জনপরিসরে বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের ওপর আঘাত ছিল। সেই পার্থক্য মনে রেখেই ঘটনাটি এই ইতিহাসে আসে।
এখানে দশ একটি সংখ্যা, আবার দশটি অসমাপ্ত জীবন। আহতের সংখ্যা চিকিৎসার হিসাব দেয়; কত মানুষ পরের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ভয় পেয়েছিলেন, কত অভিভাবক সন্তানকে আটকে রেখেছিলেন, সেই হিসাব দেয় না। নিহত-আহতের তালিকা জরুরি; কিন্তু সংস্কৃতির ওপর হামলার দীর্ঘ ছায়া তালিকার চেয়ে বড়।
আরেকটি গুরুতর ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বরের ভোরে। ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সংবাদ প্রকাশিত হয়; বাদ্যযন্ত্র ও আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। হামলার অভিযোগকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন। তবে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটি সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে আনে।
সর্বশেষ বিতর্কের দৃশ্যটি আর কল্পিত নয়। ১০ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লাগানো ও মুছে দেওয়ার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে একজন অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য উঠে আসে: তাঁর বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিলেন; তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ করছেন। এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, প্রমাণিত ইতিহাস নয়।
১১ অক্টোবর বাসস জানায়, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলার নাম, পুলিশের অভিযোগ এবং রিমান্ডের আদেশ বিচারিক প্রক্রিয়ার তথ্য; এগুলো অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত রায় নয়। এই সীমারেখা সংবাদ লেখার সময় অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি।
ঘটনাটি দ্বিমুখী দায়িত্ব তৈরি করে। জনপরিসরের শিল্পকর্ম অনধিকারভাবে নষ্ট করার অভিযোগ আইন অনুযায়ী তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে ব্যবহৃত আইনি পদক্ষেপের সামঞ্জস্য, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে। সংস্কৃতির স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা সংকুচিত করা যায় না।
তবে এই ঘটনা থেকে “বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ”—এমন সিদ্ধান্ত টানা ভুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংবাদ অনুযায়ী, ৮ মে ২০২৬ তাঁর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা চলছে, আবার অন্য পরিসরে বিরোধ ও আক্রমণের অভিযোগ উঠছে।
একটি দেশের বাস্তবতা তাই একটি ভিডিওতে ধরে না। দেয়ালের একটি কালির দাগ সমগ্র জনগোষ্ঠীর মনোভাবের জরিপ নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানও সর্বত্র নিরাপত্তার সনদ নয়। আমরা যখন বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো দেশের চরিত্র বানাই, তখন অনুসন্ধান শেষ হয়, প্রচার শুরু হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এই দাবি বারবার ফিরে আসে। ২০১৮ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান একটি আলোচনায় প্রচলিত অভিযোগটির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; যে সভার তারিখ উল্লেখ করা হয়, সেদিন কবি কলকাতায় ছিলেন না বলে জানান। অভিযোগকারীকে নির্দিষ্ট বক্তব্য, চিঠি বা সমসাময়িক দলিল দেখাতে হবে। পরিচিত কারও অবস্থান থেকে কবির অবস্থান অনুমান করা যথেষ্ট নয়।
এই বিতর্কে রবীন্দ্রসমর্থকদেরও দায়িত্ব আছে। সংযুক্ত লেখায় ১৯২৬ সালের ঢাকা সফর এবং ডি.লিট প্রদানের ঘটনা একসঙ্গে এসেছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক তালিকায় তাঁর সম্মানসূচক Doctor of Literature-এর বছর ১৯৩৬। ১৯২৬ সালে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন; দুটি ঘটনা আলাদা। কবিকে রক্ষা করতে গিয়ে তারিখ ভুল করলে ইতিহাস রক্ষা হয় না।
আরও সতর্কতা প্রয়োজন: পরবর্তী সংবর্ধনা বা সম্মানসূচক ডিগ্রি আগের প্রতিটি সম্ভাব্য মতামতের স্বয়ংক্রিয় খণ্ডন নয়। যেমন অভিযোগের পক্ষে দলিল লাগে, খণ্ডনের যুক্তিও যথাযথ হতে হয়। নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়া বিরোধিতার অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাবে না—এই অবস্থানই সবচেয়ে শক্ত।
জমিদারির প্রশ্নটিও উড়িয়ে দেওয়ার নয়। রবীন্দ্রনাথ জমিদার পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং পূর্ববঙ্গের জমিদারি পরিচালনা করেছেন। তাঁর সাহিত্যিক মহত্ত্ব জমিদারি ব্যবস্থার শ্রেণিগত অসমতা বাতিল করে না। আবার তাঁর গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষকের ঋণসংকট লাঘবের উদ্যোগের বিবরণও আছে।
তাই গবেষণার প্রশ্ন হবে: কোন অঞ্চলে, কোন সময়ে, কী আচরণ, কী নথি? খাজনার দলিল, প্রজার আবেদন, স্থানীয় ইতিহাস এবং জমিদারি ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। “কবি মহান, অভিযোগ অসম্ভব” এবং “জমিদার, অতএব সব লেখা বাতিল”—দুটিই অনুসন্ধানের দরজা বন্ধ করে।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও একই সমস্যা। তাঁর ব্রাহ্ম পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু “তিনি হিন্দু নন, তাই গ্রহণযোগ্য”—এই আত্মপক্ষসমর্থনও বিপজ্জনক। এতে সাহিত্য গ্রহণের জন্য ধর্মীয় ছাড়পত্রের নিয়মটি অক্ষত থাকে। একজন হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম বা অন্য পরিচয়ের লেখকের কাজ বিচার করতে হবে তাঁর কাজ দিয়ে; ধর্মীয় অনুমোদনপত্র দিয়ে নয়।
কারণ বুঝতে ব্যক্তির মন থেকে রাষ্ট্রের কাঠামো পর্যন্ত তাকাতে হয়। ব্যক্তিগত স্তরে আগে থেকেই বিশ্বাস করা কথার সঙ্গে মিলে যায় এমন খবর গ্রহণ সহজ। পরিবারে একটি অভিযোগ বহুবার শোনা হলে তা স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। তখন সূত্র চাইলে মনে হয় বিশ্বাসের অবমাননা করা হচ্ছে। অথচ সূত্র চাওয়া কারও আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়।
প্রতিষ্ঠানের স্তরে সমস্যা আরও সূক্ষ্ম। বিদ্যালয় যদি শুধু কবির জন্ম-মৃত্যুর সাল মুখস্থ করায়, কিন্তু ঐতিহাসিক দাবি যাচাই শেখায় না, শিক্ষার্থী পরীক্ষায় সফল হয়েও গুজবের সামনে অসহায় থাকবে। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে রচনা লিখতে পারে; রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি ভুয়া পোস্ট পরীক্ষা করতে পারে না। শিক্ষার এই বৈপরীত্যেই প্রচারের ব্যবসা জমে।
কাঠামোগত স্তরে সাংস্কৃতিক সুযোগের বৈষম্য কাজ করে। শহরের সচ্ছল পরিবারের শিশু সংগীতশিক্ষা, বই ও অনুষ্ঠানে প্রবেশ পায়; দরিদ্র পরিবারের শিশু সেই সুযোগ নাও পেতে পারে। পরে দ্বিতীয় শিশুটিকে ‘সংস্কৃতিহীন’ বলা হলে বঞ্চনার ওপর অপমান যোগ হয়। সংস্কৃতির দরজা বন্ধ রেখে বাইরে দাঁড়ানো মানুষকে দরজা না চেনার জন্য দোষ দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
এই দূরত্ব রাজনৈতিক উদ্যোক্তারা কাজে লাগাতে পারেন। সংস্কৃতির একটি ধারাকে ‘তাদের’ বলে চিহ্নিত করলে নিজের অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ করা সহজ হয়। বিপরীত দিকেও কবিকে দলীয় আনুগত্যের প্রতীক বানানো সম্ভব। দুই ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ মানুষ ও সাহিত্যিক থেকে পতাকা হয়ে যান; পতাকার সঙ্গে কথা বলা যায় না, শুধু মিছিল করা যায়।
লাভ পেতে পারেন মনোযোগ-নির্ভর প্রচারক, পরিচয় নিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী গোষ্ঠী কিংবা একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষকতার সুবিধাভোগী। ক্ষতি হয় পাঠক, শিল্পী, শিক্ষক ও নতুন প্রজন্মের। তবে প্রত্যেক সমালোচকের পেছনে একই উদ্দেশ্য আছে বলা যাবে না। অসন্তোষের মধ্যে প্রকৃত শ্রেণিগত প্রশ্নও থাকতে পারে; সেটিকে শুনতে হবে, বিদ্বেষকে অনুমোদন না দিয়েই।
সামাজিক পরিচয় তত্ত্বের আলোকে মানুষ শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়, গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও নিজেকে বোঝে। ‘আমরা’ ও ‘তারা’র সীমারেখা মর্যাদা ও নিরাপত্তার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। হেনরি তাজফেল ও জন টার্নারের কাজ আন্তগোষ্ঠী সম্পর্ক বুঝতে এই দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। রবীন্দ্রনাথকে ‘তাদের কবি’ বলার রাজনীতি বিশ্লেষণে এটি সহায়ক।
এটি বর্তমান ঘটনার একটি ব্যাখ্যামূলক প্রয়োগ; প্রত্যেক বিরোধীর মনের নিশ্চিত রোগনির্ণয় নয়। কেউ সাহিত্যরুচির কারণে অপছন্দ করতে পারেন, কেউ ঐতিহাসিক প্রশ্ন তুলতে পারেন। তত্ত্বটি বুঝতে সাহায্য করে, কখন একটি রচনার আলোচনা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের পরীক্ষায় বদলে যায়।
পিয়ের বুর্দিয়ুর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ ধারণা বলে, ভাষা, রুচি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা সামাজিক সুবিধার সম্পদ হতে পারে। এগুলো অর্জনে সময়, পারিবারিক পরিবেশ ও সুযোগ লাগে। বাংলাদেশে এই দৃষ্টিতে প্রশ্ন করা যায়: রবীন্দ্রচর্চা কি নতুন মানুষকে আমন্ত্রণ জানায়, নাকি পূর্বপরিচিত রুচির পরীক্ষায় ফেল করে? প্রশ্নটি কবির বিরুদ্ধে নয়; চর্চার সামাজিক ব্যবস্থার দিকে।
তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি অধিকারভিত্তিক। এর কেন্দ্রে কবির মর্যাদার পাশাপাশি নাগরিকের স্বাধীনতা থাকে: পড়া, প্রশ্ন করা, গান গাওয়া এবং নিরাপদে অংশ নেওয়া। কোনো তত্ত্ব একা পুরো বিতর্ক বোঝায় না। পরিচয় তত্ত্ব দলগত আবেগ দেখায়, সাংস্কৃতিক পুঁজি সুযোগের ব্যবধান দেখায়, অধিকারভিত্তিক বিচার ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে। তিনটি আয়না পাশাপাশি রাখলে ছবিটি কম বিকৃত হয়।
সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং জাতীয় সংস্কৃতিতে সব শ্রেণির মানুষের অবদান ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির নির্দেশ দেয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ; এর বিচারিক প্রয়োগের অবস্থান মৌলিক অধিকারের বিধানের সঙ্গে অভিন্ন নয়। সাংস্কৃতিক দায়িত্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব অবশ্য তাতে কমে না।
এখানে মূল শব্দ অংশগ্রহণ। অনুষ্ঠান আয়োজন হয়েছে, ব্যানার হয়েছে, অতিথি এসেছেন—এসব কার্যক্রমের হিসাব। কিন্তু গ্রামের শিক্ষার্থী, স্বল্প আয়ের শিল্পী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে অংশ নিতে পেরেছেন কি না, সেটি ফলাফলের প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি কেবল মঞ্চের সামনে বসা আমন্ত্রিতদের সম্পত্তি হতে পারে না।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে; বাক্প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত যুক্তিসংগত সীমার বিধানও আছে। তাই রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে—এমন সামাজিক বাধ্যবাধকতা স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে যায় না। একইভাবে অপছন্দের অজুহাতে অন্যের অনুষ্ঠান বন্ধ বা শিল্পকর্ম নষ্ট করার অধিকার জন্মায় না।
আমাদের মজার বিপত্তি হলো, অনেক সময় কবিকে এমন উঁচু আসনে বসানো হয় যে তাঁর বই আর নাগালে থাকে না। শ্রদ্ধার মই খুব লম্বা; পাঠের চেয়ার খালি। আবার বিরোধীর রাগ এত দ্রুত ছুটে যায় যে বই খুলে দেখার সময় পায় না। দুই পক্ষেরই দরকার একটু বসা, একটু পড়া, একটু শোনা।
ধরা যাক, একটি শিশু দেখে তার প্রিয় সংগীতশিক্ষক অনুষ্ঠান করার আগে ভয় পাচ্ছেন। একটি মেয়ে শুনছে, গান শেখা তার পরিবারের পরিচয়ের সঙ্গে মানায় না। একটি সংখ্যালঘু পরিবার ভাবছে, সন্তানের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হবে কি না। এগুলো সম্ভাব্য অভিজ্ঞতার উদাহরণ; সাক্ষাৎকারভিত্তিক ঘটনা নয়। কিন্তু নীতির ফল বিচার করতে এমন প্রশ্নই করতে হবে।
আরেক শিশুর সমস্যা ভিন্ন। সে রবীন্দ্রনাথ পড়তে চায়, কিন্তু সহজ ব্যাখ্যা নেই; শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সাংকেতিক ভাষায় উপস্থাপন নেই; দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পাঠকের জন্য ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পাঠ নেই। আমরা কবিকে সর্বজনীন বলছি, কিন্তু প্রবেশের ব্যবস্থা সর্বজনীন করছি না। উদারতার ঘোষণা আর উদার ব্যবস্থার এই ব্যবধানও সংস্কৃতির সংকট।
দেশজুড়ে কত মানুষ রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ বা অপছন্দ করেন, এখানে তার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ পাওয়া যায়নি। কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে শতাংশ বানানো যাবে না। দৃশ্যমান বিরোধ গুরুতর হতে পারে; সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত হিসেবে তাকে ঘোষণা করতে আলাদা প্রমাণ লাগে।
একটি বাতিল অনুষ্ঠান পরিসংখ্যানে একটি। কিন্তু তার মধ্যে শিল্পীর আয়, শিক্ষার্থীর অনুশীলন, দর্শকের পরিকল্পনা এবং পরিবারের নিরাপত্তাবোধ জড়িয়ে থাকে। সব ভয় সংবাদ হয় না। তাই সংস্কৃতির স্বাস্থ্য মাপতে অনুষ্ঠানসংখ্যার পাশাপাশি নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের অভিজ্ঞতাও জানতে হবে।
ভারতের শান্তিনিকেতন ২০২৩ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউনেসকোর বিবরণে শিক্ষা, প্রকৃতি, শিল্প এবং ধর্ম-সংস্কৃতির সীমা অতিক্রমকারী মানবিকতার ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি শুধু স্মারক সাজানো নয়; ঐতিহ্যের সঙ্গে জীবন্ত শিক্ষা ও অংশগ্রহণের সম্পর্ক তৈরি করা। একটি সম্মাননা অবশ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সমস্ত বাস্তব সমস্যার সমাধানের সনদ নয়।
অন্য উদাহরণ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়। ঔপনিবেশিক স্মৃতি নিয়ে আন্দোলনের পরে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল সেসিল রোডসের মূর্তি সরানো হয়; তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখানে রবীন্দ্রনাথ ও রোডসকে সমতুল্য করা হচ্ছে না। তুলনাটি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়ে: বিতর্কিত স্মারক বিষয়ে আন্দোলন, আলোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পথ রয়েছে।
বাংলাদেশ সেই প্রক্রিয়াগত শিক্ষা নিতে পারে। কার ছবি জনপরিসরে থাকবে, কী ব্যাখ্যা থাকবে, কার অবদান অনুপস্থিত—এসব নিয়ে নাগরিক আলোচনা হোক। কিন্তু অনুমতি ছাড়া কালি ঢালাকে গবেষণার বিকল্প বানানো যাবে না। দেয়াল মুছলে দলিল বদলায় না; শুধু আলোচনার জায়গা ছোট হয়।
রবীন্দ্রনাথ কোনো ত্রুটিহীন ঐতিহাসিক সত্তা নন। তাঁর শ্রেণি, সময়, রাজনৈতিক অবস্থান ও রচনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। সেই প্রশ্নকে বিদ্বেষ বলে থামানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রশ্নের নাম করে দলিলহীন অভিযোগ ও সাংস্কৃতিক দমন চালানোও অন্যায়।
বাংলাদেশের সামনে নির্বাচনটি কবিকে দেবতা অথবা শত্রু বানানোর নয়। নির্বাচনটি হলো—ইতিহাসকে পড়ব, নাকি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করব; মতভেদকে আলোচনা করব, নাকি ভয় দেখিয়ে নিষ্পত্তি করব।
একটি আত্মবিশ্বাসী সমাজ তার বড় লেখকদের প্রশ্ন সহ্য করে। আবার তাদের মুছে দেওয়ার হুমকিও মেনে নেয় না। আমাদের সেই সমাজ গড়তে হবে, যেখানে শ্রদ্ধা মানে চিন্তা বন্ধ করা নয়, আর স্বাধীনতা মানে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়।
সেই কল্পিত স্কুলের ছেলেটি বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, “আমরা যে গান গাই, তার কবিকে নিয়ে এত রাগ কেন?” বাবা চাইলে তাকে একটি ভিডিও দেখাতে পারেন। চাইলে বলতে পারেন, “এসো, দাবিটির সূত্র খুঁজি।” দ্বিতীয় উত্তরটি একটু সময় নেয়। কিন্তু সন্তানকে উত্তরাধিকার হিসেবে শুধু মতামত নয়, বিচার করার অভ্যাসও দেয়।
রবীন্দ্রনাথের মুখের কালি পরিষ্কার করা সম্ভব। কঠিন হলো এমন সমাজ তৈরি করা, যেখানে কালির পাত্র হাতে নেওয়ার আগে মানুষ বই খুলতে শেখে; যেখানে কবিকে রক্ষা করার আগে তাঁর সম্পর্কে নিজের তথ্য যাচাই করে; যেখানে একটি নামকে ঘিরে বিরোধ অন্য মানুষের নিরাপত্তা কেড়ে নেয় না।
শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নয়, পরীক্ষাটি আমাদের। আমরা কি নিজের ইতিহাসের জটিলতা বহন করতে পারি? একজন কবিকে একসঙ্গে বড়, অসম্পূর্ণ, বিতর্কযোগ্য এবং পাঠযোগ্য হিসেবে দেখতে পারি?
দেয়াল থেকে কবিকে মুছে ফেলা যায়; কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার মুছলে দেয়াল হয়ে যায় পুরো দেশ।
#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #রবীন্দ্রনাথ #রবীন্দ্রসংগীত #সাংস্কৃতিকঅধিকার #জাতীয়সংগীত #ছায়ানট #ইতিহাসযাচাই #মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা #RabindranathTagore #CulturalRights #BengaliCulture