10/12/2026 আমরা কী সত্যিই ভালো আছি? নাকি চলছে ভালো থাকার জাতীয় অভিনয়?-একবার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যটা দেখে দিন: নিজের মনের খবরটা জানুন, ভালো থাকার কৌশল শিখুন
Dr Mahbub
১২ October ২০২৬ ২০:৫০
“কেমন আছেন?”—উত্তর আসে, “ভালো আছি।” কিন্তু এই অভ্যস্ত উত্তরের আড়ালে কি চাপা পড়ে থাকে ক্লান্তি, উদ্বেগ, ঘুমহীনতা কিংবা কাউকে বলতে না পারা কষ্ট? ফেসবুকের সাজানো সুখ, জনপরিসরের উত্তেজনা, অর্থের পেছনে অন্তহীন ছুটে চলা এবং নিজের মনের খবর নিতে ভুলে যাওয়ার বাস্তবতা নিয়ে এই গবেষণাধর্মী বাংলা ফিচার। রম্য ও সামাজিক ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে লেখাটি পাঠককে ফিরিয়ে আনে জরুরি প্রশ্নে: আমরা কি আসলেই ভালো আছি, আর নিজের অবস্থা কতটা বুঝতে পারছি? WHO-5, PHQ-9 ও GAD-7 অনুসরণে সহজ বাংলায় উপস্থাপিত স্ব-মূল্যায়নের প্রশ্ন, স্কোর বোঝার প্রাথমিক নির্দেশনা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সতর্কসংকেত পাঠককে নিজের অনুভূতি ও দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তন লক্ষ করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি রয়েছে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের ভূমিকা, সহানুভূতির প্রয়োজন এবং পেশাগত সহায়তা নেওয়ার আলোচনা। স্ব-মূল্যায়ন রোগনির্ণয় নয়; নিজের কষ্ট চিনতে ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দিকে এগোতে এটি একটি সূচনা। ভালো থাকার ঘোষণা থেকে নিজের যত্ন নেওয়ার পথে যাত্রাই এই লেখার মূল আহ্বান।
মানসিক স্বাস্থ্য কেবল পাগলামি বা ডিপ্রেশন নয় — এটি দৈনন্দিন জীবনের কাজ করার ক্ষমতা, সম্পর্ক ধরে রাখার সামর্থ্য, শোক সামলানোর শক্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বে প্রতি আটজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা নিয়ে বাঁচছেন। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার প্রায় ১৭ শতাংশ বলে উঠে এসেছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে। অথচ চিকিৎসা পায় খুব কম মানুষ। এই ফিচারে আলোচনা করা হয়েছে কেন আমরা নিজের মন নিয়ে ভাবি না, কীভাবে নিজের অবস্থা বুঝব, কী কী সরঞ্জাম হাতে আছে, কোন পথে সভ্যতা সত্যিকারভাবে সমৃদ্ধ হয়, আর কোথায় আমাদের নীতি ব্যর্থ হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্যবহারযোগ্য সুপারিশ আর একটি নীরব প্রশ্ন।
তাই আমরা প্রতিদিন জিজ্ঞেস করি "কেমন আছেন?" — উত্তর আসে যন্ত্রের মতো: "ভালো আছি।" অথচ এই দুটি শব্দের আড়ালে কতটা ভাঙা মানুষ লুকিয়ে থাকে, কেউ গুনতে বসি না। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভুল ধারণা, লজ্জা আর নীরবতা কতটা ক্ষতি করছে — সেটাই এই লেখার বিষয়।
বাংলাদেশে এখন “কেমন আছেন?” প্রশ্নটি বেশ নিরীহ, কিন্তু উত্তরটি বিস্ময়কর। বাজারে গিয়ে যার হিসাব মেলে না, তিনি ভালো আছেন। রাতভর দুশ্চিন্তায় যাঁর ঘুম হয় না, তিনিও ভালো আছেন। যিনি অন্যের প্রাপ্য আটকে নিজের আলমারি ভরছেন, তিনি আরও ভালো আছেন। সবাই বলেন, “আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।” আল্লাহর রহমতে বিশ্বাস আমাদের আশ্রয়; কিন্তু সেই উত্তর দেওয়ার পর নিজের মনের খবরটুকু নেওয়ার অবসর কি আমাদের হয়?
সকালে ফেসবুক খুললেই মনে হয়, দেশটি অত্যন্ত সুখী, অত্যন্ত ক্রুদ্ধ এবং অত্যন্ত জ্ঞানী—তিনটিই একসঙ্গে। একজনের ছবিতে সুখ উপচে পড়ছে, আরেকজনের মন্তব্যে রাগ টগবগ করছে, তৃতীয়জন পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান দিয়ে রেখেছেন। শুধু নিজের ঘরে তিন দিন ধরে কথা বন্ধ কেন, তার সমাধানটি এখনো পাওয়া যায়নি।
ফেসবুকের বাংলাদেশ আর রাস্তার বাংলাদেশ যেন একই বাড়ির দুই ভাড়াটে; কেউ কারও সঙ্গে দেখা করেন না। সেখানে ন্যায়বিচারের ঘোষণা, এখানে পরিচিত লোক খুঁজে নিয়ম এড়ানোর চেষ্টা। সেখানে মানবতার দীর্ঘ পোস্ট, এখানে বিপন্ন মানুষটির ফোন ধরার সময় নেই। পর্দায় আমরা যতটা উদার, দরজায় কেউ সাহায্য চাইতে এলে ততটা উদার থাকা বেশ খরচের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়!
আমাদের জনপরিসরও এখন এক বিরাট মাইক। যার যা মনে হচ্ছে, তা-ই বলছেন; মনে হওয়ার সঙ্গে জানার ব্যবধানটুকু রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। কারও ছবিতে কালি লাগিয়ে কেউ ভাবছেন ইতিহাস সংশোধন হয়ে গেল। কে ভাত খেলেন, কে খেলেন না—সেটি নিয়ে এমন তর্ক চলছে, যেন জাতির ভবিষ্যৎ একটি থালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ পাশের ঘরের মানুষটি কেন খেতে পারছেন না, তাঁর খোঁজ নেওয়ার জন্য মাইকের কোনো বরাদ্দ নেই।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়ার ব্যাপারেও আমাদের উৎসাহ অসামান্য। লন্ডন বা আমেরিকায় বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে কেউ কেউ ছাতা মেলে বসেন। দূরের ঘটনাটি নিয়ে উত্তেজনা, পক্ষবিভাগ, সম্পর্কচ্ছেদ—সবই চলে। কিন্তু নিজের মাথায় বৃষ্টি নামলে দেখা যায়, ছাতাটি কোথায় রেখেছেন মনে নেই। নিজের সন্তানের নীরবতা, নিজের ঘুমের ভাঙন, নিজের অসহিষ্ণুতা—এসব খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ হয়ে আসে না বলে বোধ হয় চোখেও পড়ে না।
আর টাকা? টাকা প্রয়োজন—খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু প্রয়োজনের হিসাব পেরিয়ে কখন যে সংগ্রহের হিসাব শুরু হয়, তা বোঝা কঠিন। হাজারে হয় না, লাখে হয় না, কোটিতেও নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। কারও কাছে প্রতিটি দায়িত্বের পাশে একটি অদৃশ্য মূল্যতালিকা ঝোলে। কাজ করবেন? আগে টাকা। অধিকার পাবেন? আগে টাকা। যেন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্যও একটি টোলঘর বসানো হয়েছে।
তাঁকে জিজ্ঞেস করুন, “কেমন আছেন?” তিনি বলবেন, “খুব ভালো।” তাঁর সম্পদের হিসাব বড় হচ্ছে; কিন্তু ভালো থাকার হিসাবও কি বড় হচ্ছে? কত টাকা হলে মানুষ নিশ্চিন্ত হবেন? আর অন্যের বঞ্চনার ওপর দাঁড়িয়ে পাওয়া নিশ্চিন্ততাকে আমরা কী নামে ডাকব?
এখানে একটু থামা প্রয়োজন। লোভ, দুর্নীতি, নিষ্ঠুরতা কিংবা মতভিন্নতাকে দেখেই কাউকে মানসিক রোগী বলা যায় না। অন্যায়ের নৈতিক ও সামাজিক দায় আছে; মানসিক রোগের তকমা দিয়ে সেই দায় ব্যাখ্যা করলে অন্যায়টিও আড়াল হয়, মানসিক অসুস্থতায় ভোগা মানুষও অপমানিত হন। তবে চারপাশের ক্রোধ, অবিশ্বাস, অপমানের অভ্যাস ও লাগামহীন প্রতিযোগিতা আমাদের একটি জরুরি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: এই পরিবেশে আমাদের মন কেমন আছে? আমরা কতটা শান্ত, কতটা নিরাপদ, কতটা সম্পর্ক ধরে রাখতে সক্ষম?
ডেলফির মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত সেই প্রাচীন আহ্বান—“নিজেকে জানো”—আজও তাই অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা কে কী বললেন জানি, কার কী ভুল জানি, কে কেমন মানুষ তার রায়ও প্রস্তুত রাখি। শুধু নিজের রাগের উৎস, নিজের ভয়, নিজের ক্লান্তি আর নিজের সীমাবদ্ধতার সামনে বসতে গেলে সময় পাওয়া যায় না। অন্যকে চেনার কাজে আমরা বিশেষজ্ঞ; নিজের সঙ্গে পরিচয়টি এখনো অসম্পূর্ণ।
এই নিবন্ধের বড় উদ্দেশ্য সেই পরিচয়ের সুযোগ তৈরি করা। নিজের মানসিক সুস্থতা—mental wellbeing—ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটু সচেতন হওয়া; নিজের অনুভূতি, ঘুম, আগ্রহ, উদ্বেগ এবং দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা; প্রয়োজন হলে সহায়তা নেওয়া। নিজেকে বিচার করার আগে নিজেকে শোনা। তাই আজ প্রশ্নটি ফেসবুকের জন্য নয়। কাউকে খোঁচা দেওয়ার জন্যও নয়। ফোনটি একটু নামিয়ে নিজের কাছে জিজ্ঞেস করি—আমি কি আসলেই ভালো আছি, নাকি “ভালো আছি” উত্তরটি দিতে দিতে প্রশ্নটির অর্থই ভুলে গেছি?
উপভোগ করুন বিশেষ গান- ভালো আছি ডটকম!—হাস্যরসাত্মক বাংলা সামাজিক ব্যঙ্গগান| Satirical Folk-Pop
শহরের ব্যস্ত রাস্তা। অফিস থেকে বেরোনো মানুষ, হাতে মোবাইল, কানে হেডফোন। এক তরুণী বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে হাসি নেই, চোখে জলও নেই। শুধু এক ধরনের ফাঁকা ভাব। কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন, "ভালো আছি।" সত্যি বললে হয়তো বলতেন, "গত তিন মাস ধরে সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। রাতে ঘুম আসে না। খাবার স্বাদহীন। যা ভালোবাসতাম, তার প্রতি কোনো টান নেই। আর কাউকে বলার মতো কেউ নেই।"
এই তরুণীকে আমরা চিনি। তিনি আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের সহকর্মী, আমাদের বোন, আমাদের নিজের ছায়া। তিনি সুস্থ মানুষের মতো হাঁটেন, কথা বলেন, কাগজে সই করেন, বাচ্চাকে স্কুলে দেন। কেউ ধরতেই পারে না তাঁর ভেতরে কী চলছে। আর তাই আমরা ধরতেই পারি না, আমাদের আশেপাশে কতজন এমন ফাঁকা হাসি নিয়ে বেঁচে আছেন।
প্রশ্নটা তাই সরাসরি নয়। প্রশ্নটা হলো — আমরা কী সত্যিই ভালো আছি? আর যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে আমরা কি সেই "না"-টা চিনতে পারি? না কি আমরা সেই বিপদে আছি, যেখানে রোগ এতটাই নিঃশব্দ যে রোগী নিজেও জানেন না তিনি অসুস্থ?
বাংলাদেশে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে, "কেমন আছেন?" উত্তর আসে, "ভালো আছি, আপনি?" এই বাক্যের আসল কাজ তথ্য দেওয়া নয় — আসল কাজ কথোপকথন শুরু করা। কেউ সত্যি জানতে চায় না। কেউ সত্যি বলতেও চায় না। কারণ সত্যি বললে কী হবে, সেটা আমরা জানি না।
ভাবুন তো, কেউ যদি সত্যি বলত — "আসলে ভালো নেই। দুই মাস ধরে ঘুম হচ্ছে না, মাথার ভেতরে সব সময় একটা চাপা কান্না।" কতজন সেই কথাটা শুনে চা খেতে বসবেন? বরং সম্ভবত তিনটি প্রতিক্রিয়া আসবে। এক, কেউ বলবে, "তোমার তো কিছু হয়নি, আমাদের কী অবস্থা দেখো।" দুই, কেউ বলবে, "এসব পশ্চিমা ভাব। ঘুরে বেড়াও, ভালো হয়ে যাবে।" তিন, কেউ চুপ করে ফিরে যাবে — আর পরের দিন থেকে সেই মানুষটিকে এড়িয়ে চলবে।
এই তিনটি প্রতিক্রিয়াই আমাদের সমাজে সাধারণ। আর এই তিনটি প্রতিক্রিয়াই মিলে তৈরি হয় সেই ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। এই লুকিয়ে রাখার নামই স্টিগমা।
বাঙালির কাছে “কেমন আছেন?” প্রশ্নটির উত্তর অনেক সময় প্রশ্ন করার আগেই প্রস্তুত থাকে—“এই তো, ভালো!” ঘুম হয়নি, কাজের চাপ মাথায় চেপে বসেছে, সংসারের হিসাব মিলছে না, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ—তবু ভালো। মনে হয়, আমাদের ভালো থাকার এমন এক অদৃশ্য চুক্তি আছে, যেখানে কষ্টের কথা বললেই শর্তভঙ্গ হবে!
ভাবুন, এক ভদ্রলোক সকালে বাজারে গেলেন। মাছের দাম শুনে তাঁর আত্মা সামান্য কেঁপে উঠল, সবজির দাম শুনে সেটি আরও কিছুটা স্থানচ্যুত হলো। বাড়ি ফিরে বিদ্যুৎ বিল দেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঠিক তখনই ফোন—“ভাই, কেমন আছেন?” উত্তর এল, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।” কৃতজ্ঞতা সত্যি হতে পারে; কিন্তু তার পাশে ক্লান্তিটাও সত্যি। আমরা অনেক সময় প্রথম সত্যটি বলি, দ্বিতীয়টিকে বসিয়ে রাখি দরজার বাইরে।
আমাদের মোবাইলের ব্যাটারি কমলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে চার্জার খুঁজি। নিজের শক্তি কমতে থাকলে বলি, “আরেকটু চালিয়ে নিই।” ফোন গরম হলে বিশ্রাম পায়; মানুষ গরম হলে শোনে, “এত মেজাজ কেন?” যন্ত্রের জন্য আমাদের যত্নের ব্যবস্থা আছে, নিজের জন্য আছে সহ্য করার উপদেশ।
মনের কথা বলতে গেলেও বিপদ। আপনি বললেন, “কয়েক দিন ধরে মন ভালো নেই।” শ্রোতা সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক দুঃখের প্রতিযোগিতা শুরু করলেন—“তোমার আবার দুঃখ কী? আমার অবস্থা শুনলে বুঝতে!” আপনার কষ্টের কথোপকথন শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের আত্মজীবনী হয়ে গেল। আপনি শ্রোতা হলেন, আপনার মন আবার অপেক্ষমাণ তালিকায়। আর আছে উপদেশের খোলা বাজার। “বিয়ে করো”, “ঘুরে এসো”, “ব্যস্ত থাকো”, “এত চিন্তা কোরো না”—সব সমস্যার সমাধান যেন হাতের কাছেই। বিশেষ করে “চিন্তা কোরো না” কথাটি আশ্চর্য। যেন উদ্বেগের একটি সুইচ আছে; মানুষটি এত দিন ভুল করে সেটি চালু রেখেছিলেন!
রম্যের আড়ালে প্রশ্নটি অবশ্য গুরুতর। আমরা কি ভালো আছি, নাকি ভালো থাকার ঘোষণা দিতে দিতে নিজের খবর নেওয়া ভুলে গেছি? হাসতে পারছি বলেই কি শান্তিতে আছি? কাজে যাচ্ছি বলেই কি কাজের চাপ সামলাতে পারছি? সামাজিক মাধ্যমে ছবি দিচ্ছি বলেই কি কারও সঙ্গে মনের কথা বলতে পারছি?
“ভালো নেই” বললেই মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে যায় না। বিশ্বাস, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানসিক কষ্ট একই মানুষের জীবনে একসঙ্গে থাকতে পারে। নিজের কষ্ট স্বীকার করা সেই মানুষটির সততার অংশ। তাই পরের বার কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর একটু বদলানো যেতে পারে—“চলছে, তবে ঘুমটা ভালো হচ্ছে না।” কিংবা, “কিছুটা চাপে আছি, সময় হলে কথা বলব।” আর নিজের কাছে প্রশ্ন করলে সৌজন্যের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের মন তো অতিথি নয় যে তাকে শুধু চা দিয়ে বিদায় করতে হবে। তাকে বসতে দিন। তার কথাটিও শুনুন।
প্রথম ভুলটা এখানেই। আমরা "মানসিক স্বাস্থ্য" শব্দটা শুনলেই যাকে মনে করি — মাথার চুল ছিঁড়ে রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষ। বাস্তবে, মানসিক স্বাস্থ্য (Mental Health) মানে কিছু সম্পূর্ণ দৈনন্দিন। এর মানে হলো — আপনি সকালে উঠতে পারছেন কি না, কাজে মন বসছে কি না, বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারছেন কি না, কারো মৃত্যু বা ক্ষতির পর আবার দাঁড়াতে পারছেন কি না, ছোট ব্যর্থতায় ধসে যাচ্ছেন কি না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, মানসিক স্বাস্থ্য কেবল মানসিক রোগের অনুপস্থিতি নয় — এটি একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন, জীবনের স্বাভাবিক চাপ সামলাতে পারে, ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে পারে এবং সমাজে অবদান রাখতে পারে। শুনতে ভালো লাগল, তাই না? কিন্তু শুধু সংজ্ঞা পড়ে কাজ হয় না। কেননা সংজ্ঞায় নিখুঁতভাবে যা লেখা আছে, জীবনযাত্রায় তার ঠিক উল্টোটা চলছে।
একটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করুন। কেউ জ্বর এলেই কাজ থেকে ছুটি নেয়। বুক ব্যথা হলে দৌড়ে হাসপাতালে যায়। কিন্তু কেউ দুই মাস ধরে অকারণ দুঃখে ভুগলে বলে, "কিছু না, মনের ব্যাপার।" এই বিভাজনটা কোথা থেকে এল?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই বিভাজনটা মানে না। ১৯৭৭ সালে জর্জ এঙ্গেল নামে এক চিকিৎসক "বায়োপসাইকোসোশ্যাল মডেল" (Biopsychosocial Model) নামে একটা ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর মূল কথা ছিল — কোনো অসুস্থতা কেবল জীবাণু বা কোষের সমস্যা নয়। এর পেছনে জৈবিক কারণ (জিন, হরমোন, নিউরোট্রান্সমিটার), মনস্তাত্ত্বিক কারণ (চিন্তার ধরন, শৈশবের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব) এবং সামাজিক কারণ (দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, বৈষম্য) — তিনটাই কাজ করে। অর্থাৎ, আমাদের মাথার রসায়ন আর আমাদের ঘরের অবস্থা আলাদা কিছু নয়। তেলের দাম বাড়লে যে চাপ পড়ে, সেটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই — সেটা মস্তিষ্কে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বদলে দেয়। আর কর্টিসলের মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে ঘুম নষ্ট হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পড়ে যায়, স্মৃতি দুর্বল হয়। আর এটাই সেই তত্ত্ব, যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে — মানসিক কষ্ট ব্যক্তির দুর্বলতা নয়, এটি ব্যক্তি আর পরিবেশের টানাপোড়েনের ফসল।
আমরা সংখ্যা নিয়ে বেশি কথা বলি না, কারণ সংখ্যা অস্বস্তি বাড়ায়। তবু বলা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি আটজনের মধ্যে একজন কোনো না কোনো সময়ে মানসিক সমস্যা নিয়ে বাঁচছেন। বিষণ্নতা (Depression) একা প্রায় ২৮ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করে। আর প্রতি বছর বিশ্বে সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান — যার বড় অংশের পেছনে চিকিৎসাহীন মানসিক সমস্যা থাকে।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই অবস্থা আরও নিষ্ঠুর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, নিম্ন আয়ের দেশে মানসিক সমস্যায় ভোগা ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো চিকিৎসাই পান না। বাংলাদেশের চিত্রটা জানতে আমাদের হাতে একটি জরিপ আছে — জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮–২০১৯)। সেই জরিপে উঠে এসেছিল, প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন — হার প্রায় ১৭ শতাংশের কাছাকাছি। এর সঙ্গে এটাও জানা দরকার, বাংলাদেশে প্রতি লক্ষ মানুষে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা হাতে গোনা — অনেক উন্নত দেশের তুলনায় এটি বহুগুণ কম।
এই সংখ্যাগুলো কেবল কষ্টের হিসাব নয়। এটি দায়বদ্ধতার হিসাব। কারণ যেখানে চিকিৎসা নেই, সেখানে কষ্টটা কেবল ব্যক্তির নয় — সেটা গোটা পরিবারের, গোটা প্রজন্মের।
অনেকে ভাবেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানে আবেগের ব্যাপার — অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা সরাসরি। কল্পনা করুন, একজন দক্ষ কারিগর, যিনি দিনে আট ঘণ্টা কাজ করতেন। তাঁর ঘুম নষ্ট, মনোযোগ কমে গেছে, কাজে ভুল বাড়ছে। তিনি ডাক্তার দেখান না, কারণ "মানসিক সমস্যা" বলাটা তাঁর কাছে দুর্বলতার স্বীকারোক্তি। ছয় মাস পরে তিনি কাজ হারান। পরিবারের আয় বন্ধ হয়। সন্তানের স্কুল ছাড়ার সময় আসে।
এটাই সেই চেইন, যা অর্থনীতির ভাষায় "loss of productivity" (উৎপাদনশীলতার ক্ষতি) বলা হয়। আর ছোট পরিসরে এই হিসাবটা কোটি কোটি মানুষে যোগ করলে যে সংখ্যা দাঁড়ায়, তা কোনো দেশের জিডিপির বড় একটা অংশ খেয়ে ফেলে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল কল্যাণমূলক ব্যয় নয় — এটি বিনিয়োগ। কিন্তু আমাদের নীতি ও বাজেটে এই বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
আমাদের সভ্যতা এখন বেশ আলো ঝলমলে। রাস্তায় আলো, বিপণিবিতানে আলো, উদ্বোধনের মঞ্চে আলো, উন্নয়নের বিজ্ঞাপনেও আলো। শুধু রাত তিনটায় যে মানুষটি বিছানায় শুয়ে নিজের জীবনের হিসাব মেলাতে পারছেন না, তাঁর পাশে বাতি জ্বালানোর লোক নেই। বাইরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়েছে; ভেতরে কথা বলার ব্যবস্থা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে।
শহরের দালান উঁচু হচ্ছে। মানুষের সহ্যক্ষমতাও উঁচু হবে—এমন একটি অলিখিত প্রত্যাশা আছে। অফিসে অপমান সহ্য করুন, পথে দুর্ভোগ সহ্য করুন, ঘরে চাপ সহ্য করুন। শেষে হাসিমুখে ছবি তুলুন। ছবিতে ক্লান্তি দেখা গেলে উন্নয়নের সঙ্গে ঠিক মানায় না। আমাদের অগ্রগতির দলিলপত্রে মানুষের মুখ আছে, কিন্তু সেই মুখের পেছনের মানুষটির জন্য আলাদা ঘর রাখা হয়নি।
ভাবুন, একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন অপূর্ব। প্রবেশপথে মার্বেল, দেয়ালে মূল্যবোধের বাণী, সভাকক্ষে দামি চেয়ার। সেখানে প্রতিদিন একজন কর্মীকে ছোট করা হয়। তাঁর কথা শোনার কেউ নেই, অভিযোগ করলে চাকরি নিয়ে ভয়। অথচ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ঘোষণা করেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ।” করতালি পড়ে। সম্পদটি পরদিন যথারীতি অপমানিত হতে কাজে আসে।
স্কুলেও কখনো একই দৃশ্য। দেয়ালে লেখা—“শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ।” নিচে দাঁড়িয়ে একটি শিশু ভয়ে কাঁপছে। পরীক্ষার নম্বর কমেছে বলে তাকে সবার সামনে হেয় করা হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য এত বড় ঘোষণা, বর্তমানের জন্য এতটুকু নিরাপদ জায়গা নেই! আমরা শিশুর ফলাফল জানতে চাই; শিশুটি কেমন আছে, সে প্রশ্নটি অভিভাবক সভার আলোচ্যসূচিতে ঢুকতে ঢুকতে সভা শেষ হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার মহিমা নিয়ে সেমিনার হয়। কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ হয়। পরিবারে সম্মান রক্ষার সভা হয়। কিন্তু কোথাও কেউ যদি বলেন, “আমি আর পারছি না”, কথাটি বড় অসুবিধা সৃষ্টি করে। তাঁকে দ্রুত বোঝানো হয় যে তাঁর ধৈর্য কম, মনোবল কম, ব্যস্ততা কম। যে ব্যবস্থাটি তাঁকে ক্লান্ত করেছে, তার কোনো ঘাটতি নেই; ঘাটতির পুরো চালানটি তাঁর নামেই পাঠানো হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এলে অবশ্য আমাদের প্রস্তুতি চমৎকার। ব্যানার তৈরি হয়, বক্তৃতা লেখা হয়, ছবি ওঠে। “মনের কথা বলুন”—এই আহ্বান দিতে গিয়ে মঞ্চের সময় শেষ হয়ে যায়। অনুষ্ঠান শেষে কেউ সত্যিই মনের কথা বলতে এগিয়ে এলে আয়োজক বলেন, “আজ একটু ব্যস্ত আছি, পরে যোগাযোগ করবেন।” সচেতনতা সফলভাবে সম্পন্ন হয়; মানুষটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় বাড়ি ফেরেন।
এই তো আলোকিত কঙ্কালের বিপদ। কাঠামো আছে, সাজসজ্জা আছে, সাফল্যের বিবরণ আছে; প্রাণের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসটি দুর্বল। একটি সমাজ মানুষকে কতটা কাজ করাতে পারে, সেই হিসাব রাখে। মানুষটি কাজের শেষে শান্তিতে বসতে পারেন কি না, তার হিসাব রাখে না। কত টাকা আয় হলো জানা যায়; সেই আয় করতে গিয়ে ঘুম, সম্পর্ক ও আত্মসম্মানের কতটা ক্ষয় হলো, তার কোনো রসিদ পাওয়া যায় না।
অবশ্য সুস্থ মন মানে সারাক্ষণ হাসিমুখও নয়। শোক থাকবে, দুশ্চিন্তা থাকবে, মতভেদ থাকবে। প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক সুখী দেখানোর চেষ্টাটিও আরেক ধরনের চাপ। মানুষের প্রয়োজন এমন পরিবেশ, যেখানে কষ্টের কথা বললে তাঁকে তুচ্ছ করা হবে না; সাহায্য চাইলে মর্যাদা হারাতে হবে না; বিশ্রাম নিলে অলস বলা হবে না। যেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদকে ব্যক্তিগত অস্থিরতা বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে না, আর মানসিক অসুস্থতাকে অপমানের শব্দ বানানো হবে না।
সভ্যতার সমৃদ্ধি তাই সেতু, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও মানুষের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে ধরে এগোয়। হাসপাতালের ভবন দরকার, সেখানে সহানুভূতিশীল সেবাও দরকার। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ দরকার, সেখানে ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করার সুযোগও দরকার। কর্মসংস্থান দরকার, কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন নিজের মর্যাদা বিসর্জন না দেওয়ার নিশ্চয়তাও দরকার।
আমরা যদি একটি উজ্জ্বল শহর বানাই, অথচ সেখানে মানুষ নিজের কষ্ট লুকিয়ে বাঁচতে বাধ্য হন, তবে সেই উজ্জ্বলতার দিকে একটু ভালো করে তাকানো প্রয়োজন। আলোয় সবকিছু সুন্দর দেখাচ্ছে বলে সবকিছু ভালো আছে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কঙ্কালের গায়েও বাতি লাগানো যায়; তাতে তার বুকে হৃদস্পন্দন ফিরে আসে না।
সমৃদ্ধ সভ্যতার পরীক্ষা তখনই, যখন তার সবচেয়ে ক্লান্ত মানুষটিও বলতে পারেন, “আমি ভালো নেই”—আর সেই কথা শুনে কেউ চেয়ার টেনে বলেন, “বসুন, আপনার কথা শুনি।”
এখন আসি সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য অংশে। ধরা যাক, আপনি সত্যিই জানতে চান — আমি কী অবস্থায় আছি?
প্রথম কথা পরিষ্কার করা দরকার। নিজেকে যাচাই করার সরঞ্জাম আছে, কিন্তু সেগুলো রোগনির্ণয় নয় — এগুলো "স্ক্রিনিং" (Screening), অর্থাৎ ঝুঁকি বোঝার প্রাথমিক ইশারা। রোগনির্ণয় করতে পারেন প্রশিক্ষিত পেশাদার।
যে সরঞ্জামগুলো বিশ্বজুড়ে প্রচলিত:
এই প্রশ্নগুলো আমাদের অনেকের কাছেই নতুন লাগে, কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে এই প্রশ্ন করার রীতি নেই। আমরা জিজ্ঞেস করি "খেয়েছ?" জিজ্ঞেস করি না "ঘুম হয়েছে?"
তবে নিজের সঙ্গে কথা বলার একটা সহজ উপায় আছে — কোনো স্কোর ছাড়াই। সেটা হলো চারটি সাধারণ প্রশ্ন, যা আপনার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে করা যায়:
এই চারটি প্রশ্নের উত্তর যদি সবই খারাপ দিকে যায়, তাহলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। সেই মুহূর্তটাই সাহায্য নেওয়ার সময়। আর একটা কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার: নিজের ক্ষতি করার চিন্তা যদি কখনো মাথায় আসে, তবে সেটা সইবার বিষয় নয়। সেটা জরুরি অবস্থা। সেখানে ঘুমিয়ে পড়া, ভাবতে থাকা, কাউকে না বলা — এগুলো সমাধান নয়।
শরীর অসুস্থ হলে আমাদের সমাজে তার কিছু গ্রহণযোগ্য ভাষা আছে। জ্বর হলে থার্মোমিটার সাক্ষী দেয়, পা ভাঙলে প্লাস্টার প্রমাণ হাজির করে। মনের কষ্টের বেলায় আমরা যেন একটু বাড়তি কাগজপত্র চাই। “কী হয়েছে?”—“ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছি না।” ব্যস, আবেদন বাতিল। যে কষ্ট নিজের বিবরণ সুন্দর করে লিখতে পারে না, আমাদের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কম।
অথচ মন সব সময় নিজের অবস্থার নাম বলতে পারে না। মানুষটি হয়তো শুধু বলেন, “কিছু ভালো লাগে না।” আমরা জিজ্ঞেস করি, “কীসের অভাব তোমার?” যেন ভালো লাগার হিসাবটি বাজারের তালিকা: চাল আছে, ডাল আছে, চাকরি আছে—তাহলে আনন্দ থাকবে না কেন? ঘরের সব আসবাব গুনে আমরা নিশ্চিত হই যে ঘরের মানুষটির কষ্ট পাওয়ার কোনো অধিকার নেই।
কখনো কষ্টটি কথাতেই আসে না। আসে দিনের কাজে পরিবর্তন হয়ে। যিনি আড্ডায় সবার আগে পৌঁছাতেন, তিনি আর আসেন না। যিনি মন দিয়ে কাজ করতেন, তাঁর ভুল বাড়ছে। কারও ঘুমের সময় বদলে গেছে, কেউ পরিচিত কাজেও আগ্রহ হারাচ্ছেন। এসব পরিবর্তনের নানা কারণ থাকতে পারে; শুধু দেখে রোগনির্ণয় করা যায় না। কিন্তু আমরা কারণ জানতে বসার আগেই চরিত্রের সনদ লিখে ফেলি—“অলস হয়েছে”, “ভাব বেড়েছে”, “দায়িত্বজ্ঞান নেই”। মানুষটির খবর নেওয়ার চেয়ে তাঁর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ।
আমাদের শ্রবণব্যবস্থার আরেক সমস্যা: আমরা অনেক সময় উত্তর দেওয়ার জন্য শুনি। কেউ প্রথম বাক্যটি শেষ করার আগেই আমাদের উপদেশ প্রস্তুত। “মন খারাপ”—“বেড়াতে যাও।” “ঘুম হচ্ছে না”—“মোবাইল কমাও।” “ভীষণ একা লাগছে”—“বিয়ে করো।” যেন মানুষের জীবনের জট খুলতে তিনটি চাবিই যথেষ্ট। চাবি না মিললে তালাটির দোষ। আর কেউ নিজের কষ্ট একটু গুছিয়ে বলতে পারলে তাঁরও রক্ষা নেই। তিনি হাসছেন? তাহলে এত কষ্ট কোথায়! কাজে যাচ্ছেন? তাহলে অসুবিধা গুরুতর নয়! আমরা যেন মনে মনে স্থির করে রেখেছি, বিপন্ন মানুষকে বিপন্ন দেখাতেই হবে। তিনি ভদ্রভাবে কথা বললে, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরলে কিংবা অন্যের খোঁজ নিলে তাঁর নিজের কষ্টটি সন্দেহের মুখে পড়ে।
ফলে “ভালো আছি” উত্তরটি কখনো সৌজন্য, কখনো আত্মরক্ষা। মানুষটি হয়তো জানেন, সত্যি বললে তাঁর কথা পাড়ার আলোচনায় পৌঁছে যাবে। অফিসে তাঁকে দুর্বল ভাবা হবে। পরিবারে বলা হবে, “আমাদের সম্মানটা অন্তত দেখো।” তখন তিনি নিজের কষ্টের চেয়ে অন্যের প্রতিক্রিয়া সামলাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমরা তাঁর নীরবতাকে সুস্থতার প্রমাণ ধরে নিশ্চিন্ত হই।
এখানে শিরোনামের কথাটির অর্থ পরিষ্কার রাখা দরকার। মনের অসুখ কখনো চেনা কঠিন হতে পারে; আবার অনেক মানুষ নিজের কষ্ট বুঝতে পারেন এবং স্পষ্ট করেও বলেন। সমস্যা শুধু কষ্টের ভাষা খুঁজে না পাওয়া নয়—সেই ভাষা শোনার নিরাপদ পরিবেশ না থাকাও। কেউ বুঝিয়ে বলতে পারছেন না, আর কেউ বলেও গুরুত্ব পাচ্ছেন না। দুই অবস্থাতেই কথোপকথনের দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়।
আমরা যদি সেই দরজা খুলতে চাই, প্রশ্নটিও একটু বদলাতে হবে। “তোমার আবার কী হয়েছে?” বললে মানুষকে নিজের কষ্টের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়। “কিছুদিন ধরে তোমাকে ক্লান্ত লাগছে, কথা বলতে চাইলে আমি শুনব”—এই বাক্যে অন্তত বসার জায়গা পাওয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে কারণ বের করা, রোগের নাম দেওয়া কিংবা সমাধান ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা পেতে পাশে থাকা—এই কাজটুকুও কম নয়।
সভ্যতার বড় ব্যর্থতা কখনো শব্দের অভাব নয়; মনোযোগের অভাব। আমাদের চারপাশে ঘোষণা আছে, বক্তৃতা আছে, মন্তব্য আছে। একটি মানুষের অসম্পূর্ণ বাক্যের জন্য ধৈর্য কম। তাই পরের বার কেউ বললে, “ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছি না”, তাঁকে কথার পরীক্ষায় ফেলবেন না। বলুন, “গুছিয়ে বলতে হবে না। যেভাবে পারো বলো, আমি শুনছি।” যে কষ্ট এত দিন ভাষা পায়নি, হয়তো সেই অনুমতিটুকু পেয়ে কথা বলা শুরু করবে।
আমাদের ঘরে “খেয়েছ?” প্রশ্নের যত জায়গা আছে, “মন কেমন?” প্রশ্নের জায়গা ততটা নেই। অথচ নিজের অবস্থা বোঝার শুরু হতে পারে কয়েক মিনিটের নিরিবিলি সময় থেকে। গত দুই সপ্তাহের কথা ভাবুন—আজকের একটি ভালো বা খারাপ মুহূর্তের কথা নয়।
নিচের প্রশ্নগুলো WHO-5, PHQ-9 ও GAD-7-এর বিষয়বস্তু অনুসরণ করে সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ বাংলায় উপস্থাপিত।এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাইকৃত বাংলা প্রশ্নমালার বিকল্প নয়; এখানে পাওয়া স্কোর শিক্ষামূলক প্রাথমিক নির্দেশনা। গবেষণা বা চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপযোগী যাচাইকৃত সংস্করণ ব্যবহার করতে হবে। WHO-এর ওয়েবসাইটে WHO-5-এর বাংলা সংস্করণও রয়েছে।
এটি নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার অনুশীলন। ভালো নম্বর পাওয়ার পরীক্ষা নয়। উত্তর লিখুন ব্যক্তিগতভাবে; অন্যের কাছে নিজেকে শক্ত বা সুখী প্রমাণ করার জন্য উত্তর বদলাবেন না।
|
ক্রম
|
নিজের কাছে প্রশ্ন
|
স্কোর
|
|
১
|
আমি কতটা সময় আনন্দ ও ভালো মেজাজ অনুভব করেছি?
|
___
|
|
২
|
কতটা সময় শান্ত ও স্বস্তিতে থেকেছি?
|
___
|
|
৩
|
কতটা সময় কর্মশক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্য অনুভব করেছি?
|
___
|
|
৪
|
ঘুম থেকে উঠে কতটা সময় সতেজ ও বিশ্রামপ্রাপ্ত মনে হয়েছে?
|
___
|
|
৫
|
দৈনন্দিন জীবনে কতটা সময় আগ্রহ জাগায় এমন বিষয় পেয়েছি?
|
___
|
পাঁচটি স্কোর যোগ করুন। মোট হবে ০–২৫। মোটকে ৪ দিয়ে গুণ করলে ০–১০০ স্কোর পাবেন। যেমন, ১২ × ৪ = ৪৮। বেশি স্কোর তুলনামূলক ভালো মানসিক সুস্থতার ইঙ্গিত দেয়। ৫০-এর নিচে স্কোর হলে আরও মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে; এটি বিষণ্নতার নিশ্চিত diagnosis নয়।
|
ক্রম
|
লক্ষণ বা অভিজ্ঞতা
|
স্কোর
|
|
১
|
কাজে আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া।
|
___
|
|
২
|
মন খারাপ, বিষণ্নতা বা আশাহীনতা।
|
___
|
|
৩
|
ঘুম আসতে বা ধরে রাখতে অসুবিধা, অথবা অতিরিক্ত ঘুম।
|
___
|
|
৪
|
ক্লান্তি বা শক্তির অভাব।
|
___
|
|
৫
|
ক্ষুধা কমে যাওয়া অথবা বেশি খাওয়া।
|
___
|
|
৬
|
নিজেকে ব্যর্থ মনে হওয়া, নিজের বা পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কষ্ট।
|
___
|
|
৭
|
পড়া বা অন্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা।
|
___
|
|
৮
|
অন্যের চোখে পড়ার মতো ধীর চলাফেরা বা কথা; অথবা অস্বাভাবিক অস্থিরতা।
|
___
|
|
৯
|
মরে গেলে ভালো হতো—এমন ভাবনা, অথবা নিজেকে আঘাত করার চিন্তা।
|
___
|
উত্তরের মান: একেবারেই হয়নি = ০; কয়েক দিন = ১; অর্ধেকের বেশি দিন = ২; প্রায় প্রতিদিন = ৩। মোট স্কোর ০–২৭।
|
মোট স্কোর
|
লক্ষণের মাত্রার প্রাথমিক ইঙ্গিত
|
|
০–৪
|
ন্যূনতম
|
|
৫–৯
|
মৃদু
|
|
১০–১৪
|
মাঝারি
|
|
১৫–১৯
|
মাঝারি থেকে তীব্র
|
|
২০–২৭
|
তীব্র
|
এগুলো লক্ষণের মাত্রা বোঝার প্রচলিত সীমা; শুধু স্কোর দিয়ে রোগ নির্ধারণ করা যায় না। ১০ বা তার বেশি হলে পেশাগত মূল্যায়ন নেওয়া উচিত। নবম প্রশ্নে শূন্যের বেশি হলে মোট স্কোর কম হলেও দ্রুত স্বাস্থ্যপেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। এই উত্তরের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাৎক্ষণিক বিপদ নয়; বর্তমান নিরাপত্তা, ইচ্ছা ও পরিকল্পনা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়।
|
ক্রম
|
লক্ষণ বা অভিজ্ঞতা
|
স্কোর
|
|
১
|
উদ্বিগ্ন, স্নায়ুচাপে বা অস্থির লাগা।
|
___
|
|
২
|
দুশ্চিন্তা থামাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।
|
___
|
|
৩
|
নানা বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা।
|
___
|
|
৪
|
স্বস্তি পেতে বা শিথিল হতে অসুবিধা।
|
___
|
|
৫
|
এত অস্থির লাগা যে স্থির বসে থাকা কঠিন।
|
___
|
|
৬
|
সহজে বিরক্ত বা খিটখিটে হয়ে পড়া।
|
___
|
|
৭
|
ভয়ানক কিছু ঘটবে—এমন আশঙ্কা।
|
___
|
PHQ-9-এর মতোই প্রতিটি উত্তর ০–৩ দিন। মোট স্কোর ০–২১। প্রচলিত ব্যাখ্যা: ০–৪ ন্যূনতম, ৫–৯ মৃদু, ১০–১৪ মাঝারি এবং ১৫–২১ তীব্র উদ্বেগের লক্ষণ। ১০ বা তার বেশি হলে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
PHQ-9 ও GAD-7 পূরণের পর আরও একটি প্রশ্ন করুন: এই সমস্যাগুলো কাজ, পড়াশোনা, ঘরের দায়িত্ব বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা কঠিন করেছে? উত্তর হতে পারে—একেবারেই নয়, কিছুটা, খুব অথবা অত্যন্ত কঠিন। এই উত্তর মোট স্কোরে যোগ হবে না, কিন্তু সহায়তা প্রয়োজন কি না বোঝার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তিনটি স্কোর যোগ করে একটি “মোট মানসিক স্বাস্থ্য নম্বর” বানাবেন না। WHO-5-এ বেশি স্কোর ভালো থাকার ইঙ্গিত; PHQ-9 ও GAD-7-এ বেশি স্কোর বেশি লক্ষণের ইঙ্গিত। স্কোর কম হলেও কষ্ট বা দৈনন্দিন অসুবিধা বেশি হলে সহায়তা নিন।
নিজের নোটে তিনটি বাক্য লিখতে পারেন: “আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে…”, “আমার দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব…”, “আমি সাহায্যের জন্য কথা বলব…”। সংখ্যার কাজ সংকেত দেওয়া; পরের কাজটি মানুষকে করতে হয়।
সব মন খারাপ জরুরি অবস্থা নয়। তবে কিছু পরিবর্তনকে “কেটে যাবে” বলে এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এখানে দেখতে হবে—লক্ষণটি কতটা তীব্র, নতুন কি না, বাড়ছে কি না এবং নিজের নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবন কতটা ব্যাহত হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে মন খারাপ, আগ্রহ হারানো, ঘুম বা খাওয়ার পরিবর্তন এবং উদ্বেগ চলতে থাকলে—বিশেষ করে কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে—চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের মূল্যায়ন নিন। লক্ষণ তীব্র হলে দুই সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা করবেন না।
নিজেকে বারবার বোঝা মনে হওয়া, গভীর আশাহীনতা, পরিচিত মানুষ থেকে সরে যাওয়া, আচরণের বড় পরিবর্তন বা মদ-মাদকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াও গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। বিশেষত পরিবর্তনগুলো নতুন বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।
আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতির বর্তমান ইচ্ছা, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রস্তুতি কিংবা নিজেকে নিরাপদ রাখতে না পারার অনুভূতি হলে এটি জরুরি অবস্থা। বিদায়সূচক আচরণ, মূল্যবান জিনিস বিলিয়ে দেওয়া বা মৃত্যুর প্রস্তুতির মতো পরিবর্তনও সতর্কসংকেত হতে পারে।
এ অবস্থায় স্কোর গণনা শেষ করার অপেক্ষা করবেন না। একা থাকবেন না। বিশ্বস্ত কাউকে সরাসরি বলুন—“আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় হচ্ছে। আমার সঙ্গে থাকুন এবং চিকিৎসা পেতে সাহায্য করুন।” নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। নিরাপদে সম্ভব হলে আত্মক্ষতির উপযোগী জিনিস থেকে দূরে থাকুন এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে সেগুলো নিরাপদ করতে বলুন। ইতিমধ্যে আত্মক্ষতি বা অতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণ হয়ে থাকলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
মন কখনো সতর্কবার্তা পাঠায় ঘুমের মাধ্যমে, কখনো ক্লান্তির মাধ্যমে, কখনো আগ্রহ হারিয়ে। সেই বার্তাকে লজ্জা দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলে নিজের খবরই অজানা থাকে। “আমি ভালো নেই”—এই স্বীকারোক্তি সাহায্যের দরজা খুলতে পারে। দরজাটি খোলার জন্য সবকিছু ভেঙে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না।
আমাদের প্রজন্মের সামনে একটা নতুন সমস্যা দাঁড়িয়েছে, যেটা আগের প্রজন্মের ছিল না। সেটা হলো — অন্য মানুষের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই শতাংশ আমরা প্রতিদিন দেখি। কেউ ভালো রেস্টুরেন্টে, কেউ সমুদ্রে, কেউ নতুন বাড়ির ছবি। কেউ নিজের সাফল্যের গল্প লিখছে। আমরা দেখছি না কারো পাশে জমানো ঋণ, তোলা খুনসুটি, নিঃশব্দ ফাঁকা দুপুর। ফলে ভেতরে একটা হিসাব চলে: "সবাই তো ভালো আছে, শুধু আমি আছি না।"
এই তুলনাটা নিজের ভাবমূর্তির সঙ্গে নয় — এটি অন্য মানুষের বাছাই করা সেরা মুহূর্তের সঙ্গে। এটা টকটকে মোড়ক আর সাদামাটা বাস্তবের লড়াই, যেখানে সাদামাটা কখনোই জিতে না। এখানে একটু হাসির কথা বলা যায়। আমরা যেমন ফটো তুলে তারপর ফিল্টার লাগাই, তেমনি মনের ক্ষেত্রে উল্টোটা করি — যত ফিল্টার সত্যি, তত ফিল্টার লাগাই। নিজের দুঃখটা আমরা কেটে ফেলি, অন্যের সুখটা আমরা বাড়িয়ে দেখি। এই ভুল হিসাবে প্রমাণ নেই, কারণ হিসাবটা দ্বিমুখী।
একটা কথা আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক সমস্যা যদি দশ বছরে তৈরি হয়, তাহলে তার ভিত অনেক সময় পাঁচ বছর বয়সে পড়ে যায়। শিশুরা বলে না, "আমি উদ্বেগে ভুগছি।" তারা বলে, "আমার পেট ব্যথা।" ক্লাসে বসে থাকতে পারে না। রাতে বাবা-মায়ের পাশে না গেলে ঘুমাতে পারে না। প্রায়ই মাথা ব্যথার কথা বলে। স্কুলে যেতে অনীহা। কখনো বেয়াদবি, কখনো নীরবতা।
বড়রা এসব পড়েন "লক্ষ্মণহীনতা" বা "অতিরিক্ত জেদ" হিসেবে। আর শাস্তির ঘণ্টা বাজে। অথচ সেই শিশুটি যা জানাতে চাইছে তা হলো — কিছু একটা ঠিক নেই, আমি কী করে বলব জানি না।
স্কুল এখানে সবচেয়ে বড় মঞ্চ। প্রতিদিন শিশুটি সেখানে ছয় ঘণ্টা কাটায়। শিক্ষক যদি চিনতে পারেন, তবে ধরা পড়ে যায় অনেক আগেই। কিন্তু শিক্ষকদের সেই প্রশিক্ষণ কী তারা পান? সেই সুযোগ কী তাদের দেওয়া হয়? প্রশ্নটা খোলা রেখে যাচ্ছি — এবং উত্তরটা আমরা কমবেশি জানি।
মানসিক কষ্টের একটা খাঁটি সত্য হলো — মানসিক চাপ আসে বেশিরভাগ সময় মানুষের সম্পর্ক থেকে। বাড়িতে যদি কেউ কেউ নিয়মিত ছোট করে কথা বলেন, অপমান করেন, সব সিদ্ধান্ত নিজে নেন — সেখানে কেউ "ভালো" থাকতে পারেন না। যেটাকে আমরা বলি পারিবারিক কলহ, মাঝেমধ্যে সেটাই একটানা মানসিক নির্যাতন। আর পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে উচ্চারণটা আমাদের কulture এতই নিষিদ্ধ যে, কেউ বললে সেটাই হয় হাসির খোরাক, নয় কৌতূহলের বিষয়।
কর্মক্ষেত্রে অন্য ছবি। অনেকে ভাবেন চাপ শুধু ওপরের চাপ, ভুল হলে বকা — সেটাই সমস্যা। আসলে বড় চাপ আসে অন্য দুই দিক থেকে — একটি, কাজটি না থাকার ভয়। দ্বিতীয়, কাজটি অর্থহীন মনে হওয়া। যে কাজের কোনও মানে খুঁজে পান না, তাঁর দিনটি শেষ হলেও শান্তি আসে না। —এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার: কর্মক্ষেত্রের "বাউন্ডারি" (Boundary) মানে দুর্বলতা নয়। অফিস শেষে ফোন বন্ধ করা, ছুটির দিনে মিটিং না রাখা — এগুলো সুস্থ থাকার শর্ত। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারি না, কারণ সেটা করতে গেলে কেউ একজন আঙুল তুলে বলবেন, "তুমি তো এত কর্মঠ না।"
আমরা বলি — "মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলুন।" কথাটা তো ঠিক। কিন্তু কে করবে সেই কথা? কথা বললে যেখানে যাওয়ার কথা, সেখানে কি আছে?
সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার চারটি স্তর থাকে। প্রথম, সচেতনতা ও স্ক্রিনিং। দ্বিতীয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি — অর্থাৎ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেই সুবিধা শুরু। তৃতীয়, প্রশিক্ষিত পেশাদার — মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট। চতুর্থ, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা, যেখানে অল্প বা কোনো খরচে কাউন্সেলিং আর চিকিৎসা পাওয়া যায়।
আমাদের দেশে প্রথম স্তরের কথা অনেক শোনা যায়। চতুর্থ স্তরের কথা প্রায় শোনা যায় না। পেশাদারের সংখ্যা কম, মধ্যম গোছের প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যাও কম, বেসরকারি সেবার মূল্য অনেকের নাগালের বাইরে। কেউ যদি সাহায্য চান, প্রথম প্রশ্ন আসে — "কোথায় যাব?" উত্তরটা সোজা নয়। এই সোজা উত্তর না থাকাটাই নীতির ফাঁক। একবার একটা প্রশ্ন ভাবুন: একটা জ্বরের জন্য আমরা সকালেই ডাক্তারের চেম্বার খুঁজে বের করি। মন খারাপের জন্য কোথায় যাব, জানি না — এটা কি স্বাভাবিক?
বিপরীত যুক্তিটা অসম্মান করে উড়িয়ে দেওয়া নয়। শুনে দেখা দরকার। কেউ বলছেন — "এসব বিদেশি ভাব। আমাদের আগে থেকেই তো সব ঠিক ছিল। মানুষের সঙ্গে মানুষ মিশত, গল্প করত, সেই ভালো ছিল।"
এখানে সত্যের একটা অংশ আছে, এবং সেটা ছোট নয়। আমাদের সমাজে আগে যৌথ বোঝাপড়া, পারস্পরিক খোঁজখবর, দাদি-নানির গল্প — এগুলো ছিল। আজ একই বাড়িতে বাবা, মা আর সন্তান তিনজন তিন রকম পর্দা নিয়ে বসে থাকেন। একান্নবর্তী পরিবারের খসে পড়া কাঠামোর জায়গাটা কেউ পূরণ করেনি। কিন্তু "এসব বিদেশি ভাব" বলার একটা অংশ সত্য, আর একটা অংশ বিপজ্জনক আত্মপ্রসাদ।
তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হলো — পুরনো সমাজের যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা, আর আধুনিক বিজ্ঞানের সেবা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা। দুটোকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় না করানো।
এখানে একটি কথা মনে রাখা ভালো। বাংলা ভাষায় আমরা বলি "মাথা ঠান্ডা রাখো"। কথাটা আজকে আমরা হালকাভাবে নিই, কিন্তু আসলে এটা খুব সঠিক পরামর্শ — কারণ চাপে মস্তিষ্কের যে অবস্থা হয়, তা বিচারশক্তি কমিয়ে দেয়। মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের অংশটি তখন বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর সামনের দিকের বিবেকবান অংশটি (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) পিছিয়ে পড়ে। ফলে বুদ্ধিমান মানুষ ছোট সিদ্ধান্তে বড় ভুল করেন।
সেই কারণেই বলা হয়, বড় সিদ্ধান্ত (চাকরি ছাড়া, সম্পর্ক ভাঙা, বড় খরচ) নিতে হয় ঠান্ডা মাথায়। এখানে চিকিৎসার একটা শব্দ আছে — "ভালো থাকা মানে কখনোই দুঃখ না থাকা নয়, ভালো থাকা মানে দুঃখ এলে সেই দুঃখ কীভাবে ধরে রাখা যায়, সেই ক্ষমতা বাড়ানো।"
বড় সংস্কার দরকার, সেটা সত্য। কিন্তু বড় সংস্কারের জন্য বসে থাকলে আজকের দুপুরের মানুষটি একা থেকে যাবেন। তাই তিনটি ধাপে ভাবি।
এই লেখা পড়ার পর হয়তো একটা প্রশ্ন আপনার ভেতরে থেকে যাবে — "আমি ভালো আছি?"
উত্তরটা সোজা হোক। যদি সত্যি "হ্যাঁ" হয়, তবে সেটা অর্জন — সেটার জন্য কৃতজ্ঞ হোন, আর পাশের মানুষটাকে একবার জিজ্ঞেস করুন। যদি সত্যি "না" হয়, তবে সেটাকে লজ্জা মনে করবেন না। সেটা জ্বরের মতোই, শুধু জ্বরের থার্মোমিটারটা আমরা হাতে নেই। আর যদি সত্যিটা জানার সাহস না থাকে, সেটাও ঠিক আছে। কারণ এত বছর ধরে আমরা যন্ত্রের মতো "ভালো আছি" বলে এসেছি — সেই অভ্যাসটা একদিনে ভাঙে না।
“চারদিকে চলছে সার্কাস: জীবনের হিসাব নিকেশ করবে কে? যে যা খুশি করছে —বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনকে তাঁবুহীন সার্কাসে অস্থির সামাজিক জীবন” —চারদিকে চলছে সার্কাস—কিন্তু মানুষের জীবনের হিসাব রাখছে কে? বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনকে তাঁবুহীন সার্কাসের রূপকে দেখানো এই সাহিত্যিক সামাজিক ফিচারে উঠে এসেছে সড়কের বিশৃঙ্খলা, বাজারের কারসাজি ও ভেজাল, নম্বরনির্ভর শিক্ষা, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা, দপ্তরের দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক মাধ্যমে গুজবের বিপজ্জনক বিস্তার। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, পরিচিত দৃশ্য ও মানবিক অনুভবের মধ্য দিয়ে লেখাটি প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতার জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং অন্যায়কে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার অভ্যাস নিয়ে।
#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #মানসিকস্বাস্থ্য #MentalHealth #সুস্থমন #Wellbeing #সুস্থমনসমৃদ্ধসভ্যতা #নীরবতা #BreakTheStigma #বিষণ্নতা #Depression #উদ্বেগ #Anxiety #আত্মহত্যাপ্রতিরোধ #SuicidePrevention #WHO5 #PHQ9 #কাউন্সেলিং #Counselling #তরুণপ্রজন্ম #YouthMentalHealth #শিক্ষকদেরদায়িত্ব #সুস্থসভ্যতা #MindMatters #MentalHealthAwareness #RightToHealth