10/15/2026 চারদিকে চলছে সার্কাস: জীবনের হিসাব নিকেশ করবে কে? যে যা খুশি করছে —বাংলাদেশে তাঁবুহীন সার্কাসে অস্থির দৈনন্দিন জীবন
Dr Mahbub
১৪ October ২০২৬ ১৯:২৭
চারদিকে চলছে সার্কাস—কিন্তু মানুষের জীবনের হিসাব রাখছে কে? বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনকে তাঁবুহীন সার্কাসের রূপকে দেখানো এই সাহিত্যিক সামাজিক ফিচারে উঠে এসেছে সড়কের বিশৃঙ্খলা, বাজারের কারসাজি ও ভেজাল, নম্বরনির্ভর শিক্ষা, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা, দপ্তরের দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক মাধ্যমে গুজবের বিপজ্জনক বিস্তার। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, পরিচিত দৃশ্য ও মানবিক অনুভবের মধ্য দিয়ে লেখাটি প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতার জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং অন্যায়কে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার অভ্যাস নিয়ে। সরকারের দৃশ্যমান উপস্থিতি আর বিপদের সময় কার্যকর সুরক্ষার ব্যবধান যেমন এখানে আলোচিত, তেমনি রয়েছে নাগরিকের সুবিধাবাদ ও নীরব সম্মতির আত্মসমালোচনা। তবে ক্ষোভেই থেমে যায় না এই লেখা; সৎ শিক্ষক, সেবায় নিবেদিত চিকিৎসাকর্মী, দায়িত্বশীল কর্মচারী ও সচেতন নাগরিকের নীরব অবদানে খুঁজে পায় পরিবর্তনের আশা। দেশকে ভালোবাসার অর্থ কী—শুধু আবেগ, নাকি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য প্রতিদিন দায় নেওয়া? সেই প্রশ্নেই পাঠককে নিজের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে আহ্বান জানায় ‘চারদিকে চলছে সার্কাস’।
রাস্তার মৃত্যুকূপ থেকে বাজারের ভেলকি, নম্বরের দোলনা থেকে হাসপাতালের অনিশ্চিত অপেক্ষা—চারদিকে যেন এক তাঁবুহীন সার্কাস, যেখানে খেলা চলে মানুষের জীবন নিয়ে। আলো জ্বলে, ঘোষণা বাজে, প্রতিশ্রুতির রঙিন ফিতা ওড়ে; অথচ বিপদের নিচে নিরাপত্তার জাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফাইলের ভাঁজে আটকে থাকে অধিকার, পর্দার হট্টগোলে হারিয়ে যায় সত্য, আর গুজবের আগুনে পুড়ে যায় মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। এই ব্যঙ্গের আয়নায় শুধু ক্ষমতাবানদের মুখ দেখা যায় না; ধরা পড়ে আমাদের সুবিধাবাদ, নীরবতা এবং অনিয়মের সঙ্গে প্রতিদিনের আপসও। আমরা অন্যের অন্যায়ে ক্ষুব্ধ হই, নিজের ব্যতিক্রমের জন্য দরজা খুঁজি; দেশকে ভালোবাসি, অথচ তার নিয়ম মানতে গিয়ে ভালোবাসার পরীক্ষা এড়িয়ে যাই। তবু সব আলো নিভে যায়নি। আছেন সেই শিক্ষক, যিনি কৌতূহল বাঁচান; সেই চিকিৎসাকর্মী, যিনি ক্লান্তির মধ্যেও হাত বাড়ান; সেই নাগরিক, যিনি সুবিধার চেয়ে বিবেককে বড় করেন। তাঁদের নীরব শ্রমেই টিকে থাকে আমাদের একমাত্র বাড়ি। এই সামাজিক ফিচার তাই হাসির ফাঁকে অস্বস্তি জাগায়, ক্ষোভের ভেতর মমতা খোঁজে এবং জানতে চায়: জীবনের হিসাব নেবে কে? সরকার ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিকের ছোট সৎ অভ্যাস কি ফিরিয়ে আনতে পারে নিরাপদ আগামী? সার্কাসের দর্শক হয়ে হাততালি দেব, নাকি দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার আগে খুঁটি শক্ত করব—সেই সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায় এই লেখা। কারণ দেশ কোনো দূরের মঞ্চ নয়; এখানেই আমাদের সন্তান ঘুমায়, স্বপ্ন বড় হয়, প্রিয়জন বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকে। তাদের জন্য নিশ্চিন্ত সকাল চাইলে আজই নিজেদের ভূমিকাটুকু বদলাতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, দায় নিতে হবে।
সার্কাসের তাঁবু আমরা আগে দেখেছি। বাঁশের খুঁটি, রঙিন কাপড়, ভেতরে গুঁড়ো করা কাঠের গন্ধ, আর মাঝখানে গোল রিং। সেখানে একজন রিংমাস্টার থাকতেন, হাতে চাবুক, মুখে গম্ভীর হাসি। বাঘ লাফাত তাঁর ইশারায়, হাতি নাচত তাঁর সুরে, আর ট্রাপিজের খেলোয়াড় দুলত জালের ভরসায়। সার্কাসের একটা নিয়ম ছিল: যত বিপজ্জনক খেলাই হোক, নিচে জাল থাকত, আর মাথার ওপর একজন হিসাব রাখত।
আজকের বাংলাদেশে তাঁবুটা নেই, কিন্তু সার্কাসটা আছে। আছে আরও বড় আকারে, আরও জমজমাট। তফাত শুধু একটাই: রিংমাস্টার নেই, জালও নেই। বাঘ নিজের ইচ্ছেমতো লাফাচ্ছে, হাতি নাচছে নিজের তালে, ভাঁড় ঢুকে পড়েছে বাঘের খাঁচায়, আর দর্শক টিকিট না কেটেই খেলার ভেতরে ঢুকে গিয়ে নিজেই খেলোয়াড় হয়ে গেছে। যে যা খুশি করছে। জীবনের হিসাব নিচ্ছে না কেউ।
এই লেখা কোনো একজন মানুষের বিরুদ্ধে নয়, কোনো একটি দলের বিরুদ্ধেও নয়। এই লেখা আয়নার মতো। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মুখ বিকৃত দেখালে দোষ আয়নার নয়। আসুন, তাঁবুহীন এই সার্কাসের একেকটা রিংয়ে একটু উঁকি দিই।
মোটরসাইকেলের মৃত্যুকূপ দেখেছেন কখনো? একটা গোল দেয়ালের ভেতর বাইকওয়ালা দেয়াল বেয়ে ঘোরে, নিচের দর্শক দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। ঢাকার রাস্তা সেই মৃত্যুকূপের বিনা-টিকিটের সংস্করণ, যেখানে দর্শক আর খেলোয়াড়ের তফাত নেই।
এখানে লাল বাতি একটা পরামর্শ মাত্র, আইন নয়। জেব্রা ক্রসিং সাদা-কালো ডোরাকাটা সাজসজ্জা, পথচারীর অধিকার নয়। বাস চলে প্রতিযোগিতার রেসে, যেন যাত্রীর চেয়ে আগের বাসটাকে হারানোই জীবনের উদ্দেশ্য। রিকশাওয়ালা উল্টো পথে আসেন, কারণ সোজা পথটা তাঁর কাছে অনেক দূর। ফুটপাথ হকারের দোকান, মোটরবাইকের শর্টকাট, আর মাঝে মাঝে ক্ষমতাবানের গাড়ি রাখার জায়গা। যে বেচারা সত্যিই হাঁটতে চায়, সে নামে রাস্তায়, কারণ তার জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, প্রত্যেক চালক মনে করেন তিনিই একমাত্র ভদ্রলোক, বাকিরা সব জানোয়ার। ঘণ্টাখানেক জ্যামে আটকে থাকা মানুষটি যখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন, তখন তিনি ভাবেন না যে ওই জ্যামের একটা ইটের নাম তিনি নিজেই। প্রতিদিন সকালে কত মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়, জানে না সন্ধ্যায় ফিরতে পারবে কি না। তবু রোজ রাতে সমাজ ঘুমিয়ে পড়ে, যেন কিছুই হয়নি। এই অদ্ভুত স্বাভাবিকতাই সার্কাসের সবচেয়ে বড় ভেলকি।
জাদুকর আমরা ভালোবাসি। টুপি থেকে খরগোশ বেরোয়, রুমাল থেকে ফুল। বাংলাদেশের বাজারে জাদুকররা আরও দক্ষ। তাঁরা ট্রাক ঘুরিয়ে দেন, আর বাজারে আলু উধাও হয়ে যায়। তাঁরা একবার ফিসফিস করেন, আর পেঁয়াজের দাম এক রাতে আকাশে উঠে যায়। সরকার জিজ্ঞেস করে, 'কেন বাড়ল?' ব্যবসায়ী উত্তর দেন, 'আন্তর্জাতিক বাজার।' আন্তর্জাতিক বাজার জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবে, 'আমরা তো কিছুই করিনি।'
আমাদের সিন্ডিকেট-সংস্কৃতিতে একটা কাব্যিক সৌন্দর্য আছে। দাম বাড়ে ঘোষণা দিয়ে নয়, নিঃশব্দে, ঠিক যেমন প্রেম আসে। দাম কমে না, কারণ কমার কোনো কারণ কেউ খুঁজে পায় না। মাঝে মাঝে অভিযান হয়। ম্যাজিস্ট্রেট আসেন, জরিমানা হয়, ছবি ওঠে, পরদিন পত্রিকায় খবর ছাপা হয়। তারপর সবকিছু আগের মতো, যেন জরিমানাটাই ব্যবসার একটা ট্যাক্স।
আর খাবার? মরিচের গুঁড়োয় কাঠের গুঁড়ো মেশে, দুধে মেশে এমন জিনিস যার নাম বললে রসায়নের শিক্ষক ভয় পাবেন, ফল পাকে এমন রাসায়নিকে যা ভেতরের পাকা আর বাইরের পাকাকে আলাদা করে দেয়। ক্রেতা জানেন, বিক্রেতা জানেন, নিয়ন্ত্রকও জানেন। শুধু জানেন না যে তিনজনেই একই থালায় খাচ্ছেন। যে বিক্রেতা ভেজাল বেচেন, তিনিও ভেজাল ওষুধ কিনে বাড়ি ফেরেন। এ এক অদ্ভুত বৃত্ত, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেককে ঠকাচ্ছে আর ভাবছে সে-ই সবচেয়ে চালাক।
ট্রাপিজের খেলোয়াড়ের জীবন নির্ভর করে সঠিক সময়ে সঠিক দোলনা ধরার ওপর। আমাদের ছাত্রছাত্রীরাও দোলনায় দুলছে, তবে তাদের দোলনা কে ঝুলিয়েছে, কেউ জানে না।
শিক্ষা এখানে একটা ধরাবাঁধা যাত্রা। স্কুলে পড়ে, কিন্তু আসল পড়াটা হয় কোচিংয়ে। কোচিংয়ে পড়ে, কিন্তু আসল পড়াটা হয় গাইড বইয়ে। গাইড বই পড়ে, কিন্তু আসল পড়াটা হয় পরীক্ষার আগের রাতে, ফেসবুকের প্রশ্ন-ফাঁসের গুজবে। শিক্ষা মানে আর জ্ঞান নয়, শিক্ষা মানে জিপিএ। জিপিএ মানে আর যোগ্যতা নয়, জিপিএ মানে একটা সংখ্যা। অভিভাবকের মুখে সেই সংখ্যার মূল্য ঠিক শেয়ারবাজারের মতো, ওঠে-নামে আর বুক কাঁপায়।
একটি শিশু যখন প্রথম স্কুলে যায়, সে জিজ্ঞেস করে, 'আকাশ নীল কেন?' এক যুগ পরে সে জিজ্ঞেস করে, 'স্যার, এটা কি পরীক্ষায় আসবে?' এই দুই প্রশ্নের মাঝের ব্যবধানই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি। আমরা কৌতূহল দিয়ে শুরু করে নম্বর দিয়ে শেষ করি, আর তারপর বিস্মিত হই যে দেশে গবেষক এত কম কেন।
এর ওপর আছে সার্টিফিকেটের বাজার। কাগজ আছে, যোগ্যতা নেই। ডিগ্রি আছে, দক্ষতা নেই। চাকরির বাজারে এসে এক তরুণ বুঝতে পারে, কাগজের টুকরো দিয়ে ভাত রাঁধা যায় না। তখন সে খোঁজে মামা, চাচা, কিংবা 'ভাই'। যোগ্যতার সার্কাসে সবচেয়ে বড় খেলাটা আসলে পরিচিতির খেলা।
তারের ওপর হাঁটার খেলাটা সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ ভুল হলে নামার জায়গা নেই। আমাদের রোগীরা সেই তারের ওপর হাঁটে প্রতিদিন।
সরকারি হাসপাতালে ঢুকলে মনে হয় একটা মেলায় এসেছি। বারান্দায় শুয়ে আছে রোগী, তার পাশে বসে আছে স্বজন, তাদের মাঝখান দিয়ে ছুটছে ট্রলি, আর কোথাও একটা ঘোষণা হচ্ছে যা কেউ শুনছে না। ডাক্তার সময় দিতে পারেন না, কারণ রোগী অনেক। রোগী অপেক্ষা করতে পারে না, কারণ রোগ অপেক্ষা করে না। আর মাঝখানে দালাল দাঁড়িয়ে আছে সুবিধাজনক সমাধান নিয়ে: 'ভাই, একটা ভালো ক্লিনিক চেনা আছে।'
বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা আরও রঙিন। সেখানে রিসেপশনে ফুল আছে, ওয়েটিং রুমে এসি আছে, আর বিলের কাগজে এমন সংখ্যা আছে যা দেখে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে। টেস্টের পর টেস্ট, ওষুধের পর ওষুধ। রোগী ভাবে সে চিকিৎসা নিচ্ছে, অথচ সে আসলে একটা ব্যবসায়িক হিসাবের অংশ। যে স্বজনরা সর্বস্ব বিক্রি করে রোগী বাঁচাতে চায়, তারা জানেও না বাঁচানোর দাম কে ঠিক করে।
অথচ এই ব্যবস্থার ভেতরেই আছেন এমন অনেক ডাক্তার ও নার্স, যাঁরা নিঃস্বার্থে খেটে যান। সার্কাসের একটা নিয়ম আছে: ভাঁড়ের হইচইয়ে সবসময় চাপা পড়ে যান নীরব কর্মীরা। ভালো মানুষ আছেন বলেই ব্যবস্থাটা এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কিন্তু একটা দেশ কত দিন ব্যক্তিগত সততার ওপর ভর দিয়ে চলবে? ব্যবস্থার কাজ হলো সাধারণ মানুষকে অসাধারণ হতে বাধ্য না করা।
হাতি বিশাল প্রাণী, ধীর, গম্ভীর। সরকারি দপ্তরও তাই। ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যেতে যে সময় নেয়, তাতে একটা ছোট নদী পাড়ি দেওয়া যায়। প্রতিটি টেবিলে একজন, প্রতিজনের একটা নিজস্ব 'সিস্টেম', আর সিস্টেমের নিয়মটা কাগজে লেখা নেই। কাগজে লেখা নিয়ম বলে, 'সাত দিনে কাজ হবে।' আসল নিয়ম বলে, 'কাকে চেনেন?'
এখানে সেবা পাওয়া মানে অধিকার পাওয়া নয়, অনুগ্রহ পাওয়া। নাগরিক এখানে আবেদনকারী, প্রার্থী, কখনো কখনো ভিক্ষুক। তাকে বলা হয়, 'আজ নয়, কাল আসুন।' সেই 'কাল' কখনো আসে না, যদিও আসার একটা গোপন উপায় আছে, যার নাম সবাই জানে অথচ কেউ বলে না।
উন্নয়ন প্রকল্পের কথা ভাবুন। রাস্তা তৈরি হয়, কয়েক মাসে ভেঙে যায়। আবার তৈরি হয়, আবার ভাঙে। এই চক্রটা যেন একটা স্থায়ী কর্মসংস্থান প্রকল্প। ব্রিজ উদ্বোধন হয়, ফিতা কাটা হয়, ছবি ওঠে। রক্ষণাবেক্ষণের কথা কেউ ভাবে না, কারণ ফিতা কাটার ছবি আছে, মেরামতের ছবি নেই। আমরা উদ্বোধনপ্রিয় জাতি, রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের অনীহা।
সার্কাসে ভাঁড়ের কাজ হাসানো। তবে আমাদের এই সার্কাসে ভাঁড়ের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে হাসির জায়গায় কান্না পায়।
টক শো দেখুন। পাঁচজন বসেন, পাঁচজনই একসঙ্গে কথা বলেন, কেউ কারও কথা শোনেন না, আর শেষে দর্শক বোঝে না কে কী বলল। আমরা এখন মত দিই আগে, জানি পরে। কেউ যখন বলে 'আমি বিশ্লেষণ করছি', তার অর্থ প্রায়ই দাঁড়ায়, 'আমি আগে থেকেই ঠিক করে এসেছি।'
আর সামাজিক মাধ্যম হলো সার্কাসের সবচেয়ে বড় তাঁবু, যেখানে সবাই একসঙ্গে মঞ্চে। একজন একটা ছবি দেখে ঘটনা বানিয়ে ফেলেন, দশজন তা শেয়ার করেন, একশজন ক্ষিপ্ত হন, আর এক হাজার জন সিদ্ধান্ত নেন কে দোষী। যাচাই-বাছাইয়ের সময় কারও নেই, কারণ গুজব সত্যের চেয়ে দ্রুত দৌড়ায়। তারপর সত্য যখন জুতার ফিতা বাঁধে, ততক্ষণে বিচারের রায় হয়ে গেছে, আর কখনো কখনো ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। এই ভাঁড়ামিতে হাসির কিছু নেই, শুধু একটা ভয়ংকর তামাশা।
প্রত্যেকে এখানে বিশেষজ্ঞ। মহামারির সময় সবাই ভাইরোলজিস্ট ছিল, ক্রিকেটের সময় সবাই কোচ, নির্বাচনের সময় সবাই সংবিধান-বিশারদ। জানার বিনয় হারিয়ে যাওয়ার এই যুগে 'জানি না' বলাই সবচেয়ে সাহসী কাজ।
সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকে প্রথমে চোখ যায় ঝলমলে আলোয়, তারপর মনে হয়, এত আলো জ্বালাল কে? চারদিকে তাকালে বারবার একটা নামই চোখে পড়ে: সরকার।
রাস্তার মোড়ে সরকার, ফাইলের ভাঁজে সরকার, হাসপাতালের করিডরে সরকার, স্কুলের দেয়ালে সরকার। পোস্টারে সরকার, ফিতা কাটার ছবিতে সরকার, বাজেট বক্তৃতার প্রতিশ্রুতিতে সরকার। অথচ বিপদের মুহূর্তে, যখন সত্যিই একজন রিংমাস্টারকে দরকার, তখন চারদিকে তাকিয়ে সরকারকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার আছে সবখানে, আবার কোথাও নেই। এই উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির লুকোচুরিই আমাদের সার্কাসের সবচেয়ে পুরোনো খেলা।
আমাদের সরকার বিশাল। সে নিয়োগ দেয়, নিয়ম মানায় না। আইন বানায়, আইনের পাহারাদারকে পাহারা দেয় না। প্রতিশ্রুতি দেয় ঝুড়ি ভরে, বাস্তবায়নের হিসাব রাখে চামচে মেপে। প্রতি কয়েক বছরে রিংমাস্টার বদলায়, বদলায় পোশাক, বদলায় স্লোগান। চাবুকটা থেকে যায় একই, আর বাঘ-ভাঁড় তা ভালোই চেনে। তারা জানে, আইন শুধু তাদের জন্য, যাদের পেছনে কেউ নেই।
নাগরিক এখানে কখনো ভোটার, কখনো সমর্থক, কখনো 'জনগণ': মঞ্চে বহুল উচ্চারিত, প্রয়োজনের সময় নিখোঁজ একটা বিমূর্ত শব্দ। 'জনগণের সরকার' শুনতে মধুর, কিন্তু সার্কাসের দর্শক জানে, সামনের সারি ক্ষমতার কাছের মানুষদের জন্য বরাদ্দ। পেছনে বসে বাকিরা, আর তাঁবুর ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় তারা, যারা টিকিট কেনারই সুযোগ পায়নি।
এই সার্কাসের সবচেয়ে ধূর্ত খেলোয়াড়ের নাম গুজব। সে টিকিট কাটে না, অনুমতি নেয় না, তবু সবচেয়ে সামনের সারিতে বসে। যেখানে সরকার জবাব দেয় না, সেখানেই গুজব জবাব বানিয়ে ফেলে। যেখানে তথ্য আটকে থাকে ফাইলের ভিড়ে, সেখানে গুজব ছুটে যায় মোবাইলের স্ক্রিনে। তথ্যের শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না, কেউ না কেউ তা ভরাট করে, আর সেই কেউ প্রায়ই সত্যবাদী হয় না।
রাত ন'টায় একটা ছবি ছড়ায়, ক্যাপশনে লেখা 'শেয়ার করুন, সবাই জানুক।' ছবিটা আসলে তিন বছর আগের, অন্য দেশের, অন্য ঘটনার। কিন্তু রাত দশটায় তার সঙ্গে জুড়ে যায় একটা গল্প, এগারোটায় একটা দোষী, আর মধ্যরাতে একটা দাবি: 'এখনই ব্যবস্থা নিন।' সকালে সরকারি বিবৃতি আসে, 'ঘটনা তদন্তাধীন।' ততক্ষণে সত্য জুতার ফিতা বাঁধছে, আর গুজব ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে বিজয়ীর মঞ্চে। বিবৃতি কেউ পড়ে না, কারণ ক্ষোভ ততক্ষণে অভ্যাস হয়ে গেছে।
ট্র্যাজেডি হলো, গুজবের সবচেয়ে বড় রসদ জোগায় সরকারের নীরবতা, আবার সরকারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র গুজবের ভয়। যেকোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন এলেই ঘোষণা আসে, 'এটি গুজব, অপপ্রচার।' ফলে যে সত্য খবর, তারও গায়ে সরকারি ছাপ পড়ে 'গুজব' বলে। আর যা সত্যিই গুজব, তা সরকারি অস্বীকারের কারণে হয়ে ওঠে 'গোপন সত্য'। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের জালে আটকে নাগরিক শেষ পর্যন্ত কিছুই বিশ্বাস করে না, কিংবা সবকিছু বিশ্বাস করে। দুটোই সমান বিপজ্জনক।
গুজব কখনো নিরীহ নয়। রামুর আগুন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক গণপিটুনি, ভুয়া 'ছেলেধরা' রটনায় পিটিয়ে মারা নিরপরাধ মানুষ: এগুলো ফেসবুকের পোস্ট হিসেবে শুরু হয়ে মানুষের রক্তে শেষ হয়েছে। প্রতিবার তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবার প্রতিশ্রুতি আসে, আর প্রতিবার পরের গুজব তৈরি হতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। ডিজিটাল বাংলাদেশের সবচেয়ে অ-ডিজিটাল চেহারাটা দেখা যায় এখানে: স্মার্টফোন হাতে, কিন্তু যাচাইয়ের বুদ্ধি বন্ধক।
আর সরকারের তরফেও গুজব কম নেই। সংখ্যার গুজব: 'এত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, এত কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত।' সাফল্যের গুজব: 'সব ঠিক আছে, উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ।' বাজারে আগুন জ্বললে বলা হয় 'নিয়ন্ত্রণে', হাসপাতালে শয্যা ফুরোলে বলা হয় 'পর্যাপ্ত প্রস্তুতি'। যে সরকার নিজের পরিসংখ্যানে নাগরিকের বিশ্বাস হারায়, সে অন্যের গুজবকে দোষ দেওয়ার নৈতিক জোর হারায়।
তবে ন্যায্য বিচার করতে হলে বলতে হয়, সরকার মানে শুধু মন্ত্রী-আমলা নন। সরকার মানে সেই অসংখ্য কর্মচারী, যাঁদের অনেকে বন্যায় নৌকা নিয়ে ছোটেন, টিকা দিতে দুর্গম গ্রামে হাঁটেন, ঝড়ের রাতে ঘুম ভুলে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ব্যক্তির সততা দিয়ে ব্যবস্থার ব্যর্থতা ঢাকা যায় না। নিয়ম যদি সবার জন্য সমান হতো, সৎ হতে বীরত্ব লাগত না।
আসল সংকট জবাবদিহির অভাব: যেখানে ক্ষমতা আছে অথচ প্রশ্নের পথ বন্ধ। সাংবাদিক প্রশ্ন করলে বলা হয় 'অপপ্রচার', নাগরিক প্রশ্ন করলে 'উসকানি', ফেসবুকে লিখলে 'শৃঙ্খলাভঙ্গ'। যে সরকার প্রশ্নকে ভয় পায়, সে আসলে নিজের ভিতকেই ভয় পায়। সত্যিকারের শক্তিশালী সরকার প্রশ্নকে স্বাগত জানায়, কারণ প্রশ্ন ছাড়া সংশোধন হয় না, আর সংশোধন ছাড়া কোনো তাঁবু বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকে না।
তাই চারদিকে যখন সরকার দেখি, জানতে চাই, এই দেখা কি ভরসার, নাকি শুধু উপস্থিতির? সরকার যদি জালের মতো নিচে থেকে ধরে, সে আমাদের রক্ষক। আর যদি চাবুকের মতো ওপর থেকে নামে, সে আরেকজন খেলোয়াড় মাত্র, যার খেলা চলে আমাদের জীবন নিয়ে। আর গুজব? সে তখনই থামবে, যখন সত্য হবে দ্রুততম, সহজলভ্য আর বিশ্বাসযোগ্য। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন তাঁবুতে আগুন লাগাতে একটা শেয়ার বাটনই যথেষ্ট।
এতক্ষণ আমরা আঙুল তুলেছি রাস্তার চালক, বাজারের ব্যবসায়ী, দপ্তরের কর্মকর্তা আর পর্দার ভাঁড়ের দিকে। এবার একটু আঙুলটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে ধরা যাক। সার্কাসের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, এত বিশৃঙ্খলা চলে কীভাবে? উত্তরটা অস্বস্তিকর: কারণ আমরা চলতে দিই। জ্যামে বসে আমরা হর্ন বাজাই, কিন্তু আইন ভেঙে ডানদিক দিয়ে ঢুকে পড়তে দ্বিধা করি না। ভেজাল নিয়ে ক্ষোভ করি, কিন্তু সস্তা পেলে কিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিই, কিন্তু নিজের কাজটা আটকে গেলে 'একটু ব্যবস্থা' খুঁজি। আমরা সবাই একটা অলিখিত চুক্তিতে সই করেছি: 'তুমি আমার অনিয়ম সহ্য করো, আমি তোমারটা।'
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম এমন অবস্থাকে বলেছিলেন 'অ্যানোমি', অর্থাৎ নিয়মহীনতা, যখন সমাজে পুরোনো নিয়ম দুর্বল হয়ে যায় অথচ নতুন নিয়ম শক্ত হয়ে ওঠে না। তখন মানুষ দিশাহারা হয়, লোভ বাড়ে, আর নৈতিকতার মাপকাঠি এক-একজনের কাছে এক-এক রকম হয়ে যায়। দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে এই সংকট প্রায় অনিবার্য। কিন্তু অনিবার্য মানে অপরিহার্য নয়। সমস্যা শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, দরকার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।
আরেকজন চিন্তাবিদ হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন 'অসততার সাধারণীকরণ' নিয়ে, মন্দ যখন এত নিয়মিত হয়ে যায় যে তাকে আর মন্দ মনে হয় না। আমাদের সার্কাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এটাই। ঘুষ আর ঘুষ থাকে না, 'চা-পানি' হয়ে যায়। ভেজাল আর অপরাধ থাকে না, 'ব্যবসার কৌশল' হয়ে যায়। মিথ্যা আর মিথ্যা থাকে না, 'পরিস্থিতির দাবি' হয়ে যায়। শব্দ বদলালে মনের অস্বস্তিও বদলে যায়, আর অস্বস্তিহীন অন্যায়ই সবচেয়ে টেকসই।
তবু নিরাশা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। সার্কাসের এক কোণে সবসময় একজন নীরব কর্মী থাকেন, যিনি প্রতিদিন খুঁটি ঠিক করেন, দড়ি টানটান করেন, আলো জ্বালান। এ দেশেও তেমন মানুষ আছেন।
আছেন সেই শিক্ষক, যিনি কোচিংয়ে না গিয়ে ক্লাসে মন দেন। সেই ট্রাফিক সার্জেন্ট, যিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে নিয়ম মানান। সেই ছোট ব্যবসায়ী, যিনি দাম বেশি পেলেও ওজনে ঠকান না। সেই তরুণ, যে সার্টিফিকেটের বদলে দক্ষতা অর্জনে মন দেয়। সেই সাংবাদিক, যিনি গুজবের স্রোতে ভেসে না গিয়ে তথ্য যাচাই করেন। এই মানুষেরা চিৎকার করেন না, তাই সার্কাসের গোলমালে তাঁদের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। কিন্তু তাঁরাই আসলে তাঁবুর খুঁটি।
আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই সার্কাসের সবচেয়ে বড় দর্শক এবং সবচেয়ে বড় আশা। তারা প্রশ্ন করছে, তারা সংগঠিত হচ্ছে, আর পুরোনো 'এভাবেই চলে' যুক্তিকে তারা আর মেনে নিতে চায় না। প্রশ্ন করার সাহসই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
এবার আসল প্রশ্নে ফিরি: রিংমাস্টার কোথায়?
সবাই তাকাচ্ছে ওপরের দিকে। সরকার, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান। অবশ্যই এদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। যে ক্ষমতা পায়, তাকে জবাবদিহিও করতে হয়। কিন্তু নিয়মের কাঠামো শক্ত না হলে ব্যক্তিগত সততা পথ হারায়, আর নাগরিক সচেতনতা না থাকলে কাঠামো শূন্যে ঝুলে থাকে। তাই কাজটা দুই দিক থেকেই করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে দরকার আইনের সমান প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, আর এমন ব্যবস্থা যেখানে নিয়ম মানা সহজ আর ভাঙা কঠিন। এখন আমাদের এখানে উল্টোটা: নিয়ম মানা কঠিন আর ভাঙা সহজ, তাই নিয়ম ভাঙাই যৌক্তিক আচরণ হয়ে ওঠে। মানুষ যে পথে সুবিধা পায়, সেই পথেই হাঁটে। পথটা ঠিক করে দেওয়া ব্যবস্থার কাজ।
নাগরিকের দিক থেকে দরকার ছোট ছোট অভ্যাসের বদল। লাল বাতিতে থামা, রসিদ চেয়ে নেওয়া, শেয়ার করার আগে একবার ভাবা, সন্তানকে নম্বরের আগে বোঝার কথা শেখানো। এগুলো বিপ্লব নয়, কিন্তু সব বড় বদল ছোট অভ্যাসের যোগফল।
সার্কাস শেষে আলো নেভে, তাঁবু গোটানো হয়, দর্শক বাড়ি ফেরে। কিন্তু আমাদের এই সার্কাস শেষ হয় না, কারণ আমরা বাড়ি ফিরে যাওয়ার জায়গা নেই। এটাই আমাদের একমাত্র বাড়ি, এটাই আমাদের একমাত্র মঞ্চ।
তাই প্রশ্ন এটা নয় যে সার্কাস চলবে কি না। প্রশ্ন হলো, কেমন সার্কাস চলবে। যেখানে বাঘ ও ভাঁড় নিজের ইচ্ছেমতো চলে আর দর্শক ভয়ে কাঁপে, নাকি যেখানে নিয়ম আছে, জাল আছে, আর প্রত্যেক খেলোয়াড় জানে যে তার ওপর একজোড়া চোখ আছে? সেই চোখ কোনো একজন রিংমাস্টারের নয়। সেই চোখ আমাদের সবার সম্মিলিত বিবেকের।
জীবনের হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কোনো একজন কর্তার নয়। সেটা আমাদের সবার। যেদিন আমরা নিজেদের জবাবদিহির আওতায় আনব, সেদিন সার্কাস হয়তো থামবে না, কিন্তু সেটা আর মৃত্যুকূপ থাকবে না। সেটা হবে আনন্দের খেলা, যেখানে ট্রাপিজের নিচে জাল আছে, আর দর্শক নিশ্চিন্তে হাততালি দিতে পারে।
তাঁবুর বাইরে অন্ধকার নামছে। ভেতরে এখনো বাজছে ব্যান্ড, এখনো নাচছে ভাঁড়, এখনো দুলছে ট্রাপিজ। আসুন, একটু থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করি: আমি আজ এই সার্কাসে কোন ভূমিকায়? দর্শক, ভাঁড়, নাকি খুঁটি ঠিক রাখা সেই নীরব কর্মী?
উত্তরটা যদি তৃতীয়টা হয়, তাহলে আশা আছে।
রাত বাড়লে শহরের শব্দ কিছুটা কমে আসে। কিন্তু কোনো কোনো ঘরে অপেক্ষা তখনো জেগে থাকে। মা দরজার দিকে তাকান, সন্তান ফোনের পর্দায় বাবার নাম খোঁজে, হাসপাতালের বেঞ্চে বসে একজন মানুষ প্রিয়জনের খবর পাওয়ার আশায় প্রতিটি পায়ের শব্দ শোনেন। তাঁদের কাছে সড়ক, চিকিৎসা কিংবা প্রশাসন কোনো বিমূর্ত ব্যবস্থা নয়। এগুলোই ঠিক করে দেয় মানুষটি ফিরবে কি না, চিকিৎসা পাবে কি না, আগামীকাল আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবে কি না।
দেশের প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর ঠিকানা সম্ভবত এই অপেক্ষাগুলো। যে দেশে প্রিয়জন থাকে, সে দেশের অনিয়ম আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও ক্ষত তৈরি করে। তাই দেশকে ভালোবাসলে তার অসংগতি দেখে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক; প্রশ্ন করাও সেই মমতার অংশ। প্রিয় একটি ঘরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়লে আমরা যেমন মেরামতের কথা বলি, তেমনি মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন হলে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের কাছে হিসাব চাইতে হয়।
সেই হিসাব দেওয়ার প্রধান দায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারীদের। একজন নাগরিকের সততা দিয়ে হাসপাতালের ঘাটতি পূরণ করা যায় না, ব্যক্তিগত সৌজন্য দিয়ে আইনের অসম প্রয়োগও বদলানো যায় না। দরকার কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং ভুল সংশোধনের উন্মুক্ত পথ। পাশাপাশি আমাদেরও নিজের দৈনন্দিন আচরণের দিকে তাকাতে হয়: যে খবরটি ছড়াচ্ছি, সেটি যাচাই করেছি কি? যে সুবিধাটি নিচ্ছি, তার জন্য অন্য কারও অধিকার সরিয়ে দিচ্ছি কি?
এই সার্কাসের ভেতরে এখনো অনেক মানুষ নীরবে দড়ি শক্ত করে ধরে আছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া বন্ধ করা, প্রশ্নের উত্তর চাওয়া এবং নিজের কাজটুকু সৎভাবে করা। পরিবর্তনের শুরু কখনো কখনো এতটাই ছোট—একটি যাচাই করা খবর, একটি ন্যায্য সিদ্ধান্ত, একটি অনৈতিক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান।
আগামীকাল সকালে যে শিশুটি স্কুলে যাবে, সন্ধ্যায় তার নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার কথা। এই সাধারণ প্রত্যাশাটুকু পূরণ করাই একটি দেশের বড় পরীক্ষা। সার্কাসের আলো যত উজ্জ্বল হোক, দরজায় অপেক্ষা করা মানুষটির স্বস্তির চেয়ে তার মূল্য বেশি হতে পারে না।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#চারদিকে_চলছে_সার্কাস #জীবনের_হিসাব_নেবে_কে #তাঁবুহীন_সার্কাস #সামাজিক_ব্যঙ্গ #বাংলা_সাহিত্যিক_ফিচার #জবাবদিহি #নাগরিক_অধিকার #সুশাসন #সড়ক_নিরাপত্তা #শিক্ষা_ও_মানবিকতা #গুজব_নয়_সত্য #সম্মিলিত_বিবেক #দেশচিন্তা #অধিকারপত্র