10/19/2026 ইনানীর রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল ফায়ার সার্ভিস
odhikarpatra
১৭ October ২০২৬ ২৩:৪১
কক্সবাজার প্রতিনিধি | অধিকারপত্র ডটকম
কক্সবাজার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে ছয়জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাতে পাওয়া সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আগুনের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, অগ্নিকাণ্ডের প্রায় চার মাস আগে গত ১১ জুন রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থাপনাটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না। পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি, সতর্কতামূলক নোটিশের পর গৃহীত ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সকাল সাড়ে সাতটায় আগুন, উদ্ধার ১০ জনের মরদেহ
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের কর্মকর্তা তালহা বিন জাশিমের বরাতে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) জানায়, সকাল ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। পরে রিসোর্ট থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকাজে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও যুক্ত হন।
কাঠের তৈরি স্থাপনাটি আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন
১৭ অক্টোবর রাতে প্রকাশিত ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে নিহত ১০ জনের মধ্যে নয়জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের নাম:
১. ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ঢাকার বনশ্রী
২. মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), ঢাকার বনশ্রী
৩. লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), ঢাকার খিলগাঁও
৪. নাফিসতা মীম (২৭), ঢাকার খিলগাঁও
৫. ফারিহা কবির (৩৩), চুয়াডাঙ্গা
৬. ফায়িজান আহম্মেদ (৫), চুয়াডাঙ্গা
৭. নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), আশুলিয়ার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক
৮. জিহাদ হাওলাদার
৯. তারিকুল ইসলাম।
নিহতদের মধ্যে ফারিহা কবির, তাঁর পাঁচ বছর বয়সী সন্তান এবং তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্য রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের সংখ্যা ও নামের বানানে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই প্রকাশের আগে হাসপাতাল, পুলিশ ও স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া চূড়ান্ত তালিকার সঙ্গে নামগুলো মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দশম নিহত ব্যক্তির পরিচয় রাত ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত পর্যালোচিত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি।
আহত ছয়জনের পরিচয়
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯) রয়েছেন। অন্য আহতরা হলেন মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
ইউএনবির প্রতিবেদনে তাঁদের নাম ও বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে রাত ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত পর্যালোচিত সূত্রগুলোতে বিস্তারিত হালনাগাদ পাওয়া যায়নি।
জুনেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা, তবু চালু ছিল রিসোর্ট
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরিন জুনাইদ শনিবার ঢাকায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, গত জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ জুন রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু সতর্ক করার পরও সেটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল না। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেনের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছে, স্থাপনাটিতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল।
এমনকি রিসোর্টটির পরিবেশগত ছাড়পত্রও ছিল না বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশার বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছে।
এই তথ্যগুলো রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তবে নোটিশের পর কোন কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং আইনগতভাবে কার্যক্রম বন্ধ করার সুযোগ ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ম্যানেজার গ্রেপ্তার, মামলা দায়ের
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে শনিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের বরাতে ইত্তেফাক ও ইউএনবি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইত্তেফাকের রাত ৯টা ৪৮ মিনিটে হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে এ ঘটনায় মামলা দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনবির রাত ১০টা ১৫ মিনিটের হালনাগাদে বলা হয়, মামলার প্রক্রিয়া চলছিল।
রাতের পর্যালোচিত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে ইত্তেফাক জানিয়েছে।
তবে ম্যানেজার গ্রেপ্তার হওয়া মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অগ্নিকাণ্ডে দায়দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে হবে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি, তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নানের বরাতে ইত্তেফাক জানিয়েছে, কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, সতর্কতামূলক নোটিশের পর গৃহীত পদক্ষেপ এবং প্রাণহানির কারণ খতিয়ে দেখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন পর্যন্ত আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কাঠের স্থাপনায় অগ্নিঝুঁকি, পর্যটন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
রিসোর্টটি ছিল কাঠের তৈরি তিনতলা স্থাপনা। নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও খাবার তৈরির ব্যবস্থা ছিল; ওপরের তলাগুলোতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি ভবনে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে পর্যটকদের আবাসন, রান্নার স্থান এবং জরুরি বহির্গমনপথের মধ্যে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না থাকলে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনেক ইকো রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট পরিচালকদের সতর্ক করার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে শুধু সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করাই যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণও জরুরি।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানি শুধু একটি রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়, পর্যটনকেন্দ্রের সামগ্রিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। জনস্বার্থে তদন্তে অন্তত কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন:
- ১১ জুনের সতর্কতামূলক নোটিশে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল?
- নোটিশের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না?
- প্রয়োজনীয় ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া স্থাপনাটি কীভাবে চালু ছিল?
- আগুন লাগার সময় পর্যটকদের নিরাপদে বের হওয়ার জন্য কার্যকর জরুরি বহির্গমনপথ ছিল কি না?
- আগুনের সূত্রপাত কোথায় এবং কী কারণে হয়েছিল?
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথির মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন হবে না।
সর্বশেষ অবস্থা: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ রাত ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত পর্যালোচিত সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০, আহত ছয়জন, রিসোর্টের ম্যানেজার গ্রেপ্তার, মামলা দায়ের এবং পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেছে। আগুনের চূড়ান্ত কারণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণের প্রতিবেদন তখনও পাওয়া যায়নি।
:
জুনেই সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস, তবু বন্ধ হয়নি রিসোর্ট—ইনানীতে আগুনে প্রাণ গেল ১০ জনের!
#কক্সবাজার #ইনানী #টুপটুপরিসোর্ট #অগ্নিকাণ্ড #ফায়ারসার্ভিস #পর্যটননিরাপত্তা #অধিকারপত্রডটকম