odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 6th November 2026, ৬th November ২০২৬
পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নদীতে পড়ে যাওয়ার ধারণা তদন্তকারীদের; ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা

তাহসিফের শেষ রাত: বারে মদ্যপান, টঙ্গীতে হেরোইন খুঁজতে যাওয়ার দাবি দীপের

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১ November ২০২৬ ১৮:২৩

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১ November ২০২৬ ১৮:২৩

*অধিকার পত্র ডটকম | অনলাঔন প্রতিবেদন

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে তাঁর জীবনের শেষ রাতের আরও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। মামলায় গ্রেপ্তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে উত্তরার একটি বারে মদ্যপানের পর টঙ্গীর একটি মাঠে মাদক কিনতে যান তাহসিফ। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দীপ পালিয়ে যান। পরে তাহসিফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তবে তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। দীপের বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত, ভিসেরা ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

 নেস্ট বারে তিনজন, কথাকাটাকাটির দাবি

দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, জারিকা তাসনিম দিশা ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে তাঁরা মদ্যপান করেন। এ সময় দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের কথাকাটাকাটি হয় বলে দাবি করেছেন দীপ।

দীপের ভাষ্য, বারে তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে দিশাকে উদ্দেশ করে তিনি হেরোইন সেবনের কথা বলেন। তবে এ বিষয়ে দীপের বক্তব্যের স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

 রাত ১২টার পর টঙ্গীর মাঠে

দীপের দাবি, রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ দিশাকে উত্তরার বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাঁরা দুজন মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি মাঠের দিকে যান।

সেখানে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন চান এবং টাকা দিতে প্রস্তুত বলে জানান—এমন দাবি করেছেন দীপ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাহসিফ মাদক কিনে সেবন করেন। মদ্যপানের পর মাদক সেবনে তিনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেন দীপ।

 পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর দাবি

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, তখন সেখানে পুলিশের একটি টহল দল আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। দীপও নদীর পাড়ের দিকে দৌড়ে গিয়ে একটি পিলারের পেছনে লুকিয়ে থাকেন। এ সময় তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছিন্নতা ঘটে।

দীপ দাবি করেন, কয়েক মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরেন। তখন তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন। পরে পুলিশ তাঁকে চলে যেতে বললেও তিনি বস্তির ভেতরের রাস্তা দিয়ে চলে যান। নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে কয়েকবার ফোন করেও পাননি বলে জানান তিনি।

দীপের দাবি, তাহসিফ মাদক নিতে এসেছেন বলে তিনি ভেবেছিলেন, তাই মাদক না নিয়ে চলে যাবেন না। পরে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে যান। তবে তাহসিফকে নদীতে পড়তে বা পানিতে ডুবে যেতে দেখেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।

 মাঠে যাওয়ার ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে

তাহসিফ ও দীপের টঙ্গীর মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ভিডিওতে তাহসিফকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। তাঁর পেছনে হাতে হেলমেট নিয়ে হাঁটছিলেন দীপ। এ সময় তাহসিফকে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’

তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে ঘটনার রাতের গতিবিধি যাচাই করছেন। তবে ভিডিওতে কাউকে নদীতে পড়তে বা মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা দেখা যায়—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার ধারণা, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনের তথ্য, বারের ঘটনা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি পানিতে পড়ে যেতে পারেন—এমন ধারণা করা হচ্ছে।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলেননি। দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

 ময়নাতদন্তে নমুনা সংগ্রহ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

 যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে দীপের ডাকে বের হন তাহসিফ। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরেননি। রাত ১টার দিকে তাঁর ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়—‘রওনা দিসি আসতেছি’।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসার খবর আসে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয় তাহসিফের। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

 দীপ ও দিশা রিমান্ডে

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর পর ৩১ অক্টোবর তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। ১ নভেম্বর ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে নেস্ট বারে যাওয়া জারিকা তাসনিম দিশাকেও গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। ২ নভেম্বরের মানবজমিনের প্রতিবেদনে দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

তদন্তকারীরা দীপ ও দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

 মৃত্যুর রহস্য এখনো অমীমাংসিত

তাহসিফের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে দীপের বক্তব্য সামনে এলেও সেটিই চূড়ান্ত সত্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তিনি কেন নদীর কাছে গিয়েছিলেন, ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাহসিফ তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন এবং কীভাবে নদীতে পড়েন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই বোঝা যাবে এটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে দুর্ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড—কোনো একটিতে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

**তথ্যসূত্র:** দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা পোস্ট, মানবজমিন, বাসস, জাগো নিউজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

 

 

 

সম্পাদনা-নোট: দীপের বয়ানে মাদক সেবন, দিশার ব্যক্তিগত জীবন এবং পুলিশের ধাওয়ার যে বিবরণ এসেছে, সেগুলোকে তাঁর দাবি হিসেবেই রাখা হয়েছে। এগুলোকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রমাণিত কারণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।