odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 25th January 2026, ২৫th January ২০২৬
অধিকারপত্রের নতুন সম্পাদকীয় ধারাবাহিক হিসেবে শুরু হচ্ছে “জনগণের ইশতেহার”।

জনগণের ইশতেহার | পর্ব–১: আমরা আসলে কী চাই—ভোটারের নীরবতার ভাষ্য

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৫ January ২০২৬ ১৬:৩৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৫ January ২০২৬ ১৬:৩৯

আমরা আসলে কী চাই

অধিকারপত্রের নতুন সম্পাদকীয় ধারাবাহিক হিসেবে শুরু হচ্ছে “জনগণের ইশতেহার”। আজ প্রকাশিত হলো এর প্রথম পর্ব। ইশতেহার নয়, ভোটারের বাস্তব জীবন। চাকরি, বাজার, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও আইনের প্রশ্নে গণমানুষ আসলে কী চায়—এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব। ভোটের পর যাদের কথা কেউ শোনে না—এই লেখা তাদের। জনগণের ইশতেহার বলছে ভোটার আসলে কী চায়, আর কী চায় না। বাংলাদেশের নির্বাচন, ইশতেহার ও ভোটার আস্থা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক সম্পাদকীয় সিরিজ—জনগণের ইশতেহার, পর্ব–১।

এই লেখা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নয়। কোনো প্রতিশ্রুতির বিজ্ঞাপনও নয়। এটা কোনো নেতার ভাষণ না, কোনো বিশ্লেষকের থিসিসও না। এই লেখা সেই মানুষের কথা, যে লাইনে দাঁড়ায়। যে বাজারে দরদাম করে। যে চাকরির ফর্ম পূরণ করে বারবার ব্যর্থ হয়। যে ভোট দেয়, তারপর চুপ করে থাকে। এই সিরিজের নাম তাই—জনগণের ইশতেহার”। কারণ অনেক দিন ধরে দেশে ইশতেহার লেখা হচ্ছে ওপর থেকে। এবার কথা বলবে নিচের মানুষ।

বাংলাদেশের মানুষ এখন আর ইশতেহার হাতে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে বসে না। তারা বাস্তব দেখে অভ্যস্ত। প্রতিটি নির্বাচনেই তাদের সামনে একটি ঝকঝকে ভবিষ্যৎ তুলে ধরা হয়েছে—দুর্নীতিমুক্ত দেশ, বেকারত্বহীন সমাজ, স্বস্তির জীবন। কিন্তু ভোট শেষ হলে মানুষ আবার ফিরে গেছে তার পুরোনো জীবনে, যেখানে প্রতিদিন হিসাব কষে চলতে হয়। তাই আজ গণমানুষ এমন ইশতেহার খোঁজে, যেটা পড়লে মনে হবে—এটা আমাদের কথা বলছে, আমাদের মতো করেই বলছে।

ভোটার এখন আর বড় শব্দে মুগ্ধ হয় না। “উন্নয়নের মহাসড়ক”, “স্মার্ট রাষ্ট্র”, “বিশ্বমানের বাংলাদেশ”—এই শব্দগুলো সে বহুবার শুনেছে। শব্দের জোরে যে জীবন বদলায় না, সেটা সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই শিখেছে। গণমানুষ এখন এমন ভাষা চায়, যেখানে সে নিজের সকালটা চিনতে পারে। যেখানে বাজারের ব্যাগের ওজন আছে, বাসের ভিড় আছে, চাকরির অপেক্ষা আছে।

চাকরির কথা উঠলেই ভোটারের মুখে এক ধরনের নিরব হাসি আসে। সে অনেক বছর ধরে শুনছে লাখ লাখ, কোটি কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে সে দেখছে, পড়াশোনা শেষ করা তরুণ ঘুরে বেড়াচ্ছে, দরজা খুলছে না কোথাও। জনগণ এখন আর সংখ্যার খেলায় বিশ্বাস করে না। তারা জানতে চায়—কাজের সুযোগ কোথায়, কীভাবে তৈরি হবে, আর কেন এত মানুষ কাজের বাইরে পড়ে আছে। তারা চায় এমন ইশতেহার, যেখানে চাকরির সংখ্যা নয়, কর্মসংস্থানের বাস্তব গল্প থাকবে।

বাজারের প্রসঙ্গ এলে ভোটার সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত হয়। কারণ বাজার তার প্রতিদিনের লড়াইয়ের জায়গা। চাল, ডাল, তেল, ডিম—এই শব্দগুলো তার কাছে অর্থনীতির পরিভাষা নয়, বেঁচে থাকার হিসাব। সে আর শুনতে চায় না কেন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। সে জানতে চায়, দেশে কে দাম বাড়ায়, কে সুযোগ নেয়, আর তার বিরুদ্ধে কী করা হয়। জনগণের ইশতেহার মানে এমন দলিল, যেখানে বাজারের দায় কেউ এড়িয়ে যাবে না।

দুর্নীতি নিয়ে ভোটারের মনোভাব আজ খুব স্পষ্ট—সে আর বক্তৃতা চায় না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যত কথা বলা হয়েছে, তার চেয়ে কম কাজ হয়েছে। গণমানুষ চায় এমন ইশতেহার, যেখানে দুর্নীতি কোনো বিমূর্ত শত্রু না হয়ে নির্দিষ্ট সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। কোথায় দুর্নীতি, কেন হচ্ছে, আর কে দায় নেবে—এই স্পষ্টতা ছাড়া দুর্নীতির কথা এখন ফাঁকা শোনায়।

স্বাস্থ্য আর শিক্ষা ভোটারের কাছে উন্নয়নের পোস্টার নয়, জীবন-মরণের প্রশ্ন। সে চায় হাসপাতালে গেলে ডাক্তার থাকবে। সে চায় স্কুলে গেলে শিক্ষক ক্লাস নেবে। ভবন থাকলেই সেবা হয় না—এই সত্যটা সে অনেক আগেই বুঝে গেছে। জনগণের ইশতেহার তাই এমন হতে হবে, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে বড় স্লোগান নয়, ছোট কিন্তু কার্যকর প্রতিশ্রুতি থাকবে।

আইনের শাসন নিয়ে ভোটারের চাওয়াটা খুব সাধারণ। সে কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না। সে শুধু চায়, আইন যেন সবার জন্য এক হয়। ক্ষমতাবান আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য যেন আইনের দরজায় এসে শেষ হয়। গণমানুষ এমন ইশতেহার খোঁজে, যেখানে এই কথাটা সাহস করে বলা থাকবে, আর সেই সাহস বাস্তবেও দেখানো হবে।

এই দেশের বড় অংশের মানুষ রাজধানীর বাইরে থাকে। কিন্তু ইশতেহারে রাজধানীই থাকে বেশি। গ্রামের রাস্তা, শহরতলির জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগ সমস্যা—এই সব বিষয় ভোটারের কাছে খুব বাস্তব, কিন্তু রাজনীতিতে খুব ছোট করে দেখা হয়। জনগণের ইশতেহার মানে এমন দলিল, যেখানে মানুষের পাড়ার সমস্যাও রাষ্ট্রের সমস্যার তালিকায় ঢুকবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সততা। ভোটার এখন এমন ইশতেহার চায়, যেখানে বলা থাকবে—সব কিছু করা সম্ভব নয়। সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস মানুষকে আপন করে নেয়। অসম্ভব প্রতিশ্রুতির চেয়ে সৎ স্বীকারোক্তি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

গণমানুষ নিখুঁত দেশ চায় না। তারা সহনীয় জীবন চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই যুদ্ধ না হয়। তারা এমন ইশতেহার চায়, যেটা কাগজে সুন্দর না হলেও জীবনে কাজে লাগে।

এই সিরিজ সেই জায়গা থেকেই শুরু। এই লেখাগুলো কোনো দলকে নির্দেশ দেবে না। বরং ভোটারের চোখ দিয়ে দেখাবে— মানুষ কী চায়, আর কী আর চায় না। পরের পর্বগুলোতে আমরা কথা বলব— চাকরি, বাজার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন, স্থানীয় সমস্যা—সবকিছু নিয়ে, ভোটারের ভাষায়। কারণ এই দেশে ইশতেহার অনেক লেখা হয়েছে। এবার সময় এসেছে—মানুষেরটা শোনার।

🔹 সিরিজ নোট: “জনগণের ইশতেহার” ভোটার–ভিত্তিক ধারাবাহিক কলাম

কেনজনগণের ইশতেহার

নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে ইশতেহারের অভাব হয় না। অভাব হয় বিশ্বাসের। প্রতিবারই আমরা নতুন নতুন ঘোষণাপত্র দেখি—রঙিন, পরিপাটি, উচ্চাশায় ভরা। কিন্তু ভোট শেষ হলে নাগরিকের জীবনে খুব কমই তার প্রতিফলন দেখা যায়। এই ফাঁকটাই ক্রমে বড় হয়েছে। আর সেই ফাঁক থেকেই জন্ম নিয়েছে এক ধরনের নীরবতা—ভোটারের নীরবতা।—আর “জনগণের ইশতেহার” সেই নীরবতার ভাষ্য।

এই সিরিজ কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা হয়নি। এটি কোনো বিকল্প ক্ষমতার রূপরেখাও নয়। এটি লেখা হয়েছে নিচ থেকে—ভোটারের দিক থেকে। যিনি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েও সবচেয়ে কম শোনা হন।

এই ধারাবাহিকে আমরা চেষ্টা করেছি বড় তত্ত্ব নয়, ছোট বাস্তবতা তুলে ধরতে। চাকরি, বাজার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন, স্থানীয় সরকার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে ভোটারের অভিজ্ঞতা থেকে, নীতিপত্রের ভাষায় নয়। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে প্রথমে ধরা দেয় দৈনন্দিন জীবনে, নীতিগত ঘোষণায় নয়।

এই লেখাগুলোর উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়। উদ্দেশ্য প্রশ্ন তোলা। কারণ গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলাই নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার।

“জনগণের ইশতেহার” বলতে আমরা কোনো বিকল্প ঘোষণাপত্র দাঁড় করাতে চাইনি। বরং আমরা চাই, যারা ইশতেহার লিখবেন—তারা যেন এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হন। তারা যেন জানেন, ভোটার এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে সিদ্ধান্ত নেন না; তিনি হিসাব করেন।

এই সিরিজে বারবার একটি কথাই ফিরে এসেছে—ভোটার নিখুঁত দেশ চায় না, সে সহনীয় জীবন চায়। ভোটার নতুন গল্প চায় না, সে পুরোনো গল্পের জবাব চায়। এটাই এই লেখাগুলোর মূল সুর।

আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র কেবল ভোটের প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি চলমান সংলাপ। “জনগণের ইশতেহার” সেই সংলাপে একটি নাগরিক কণ্ঠ যোগ করার প্রয়াস মাত্র। এই কণ্ঠ যদি নীতিনির্ধারকদের ভাবায়, রাজনৈতিক দলগুলোকে আত্মসমালোচনায় বাধ্য করে, কিংবা ভোটারকে নিজের প্রশ্নগুলো স্পষ্ট করতে সাহায্য করে—তাহলেই এই প্রয়াস সার্থক।

এই লেখা কোনো সমাধান দিচ্ছে না। এটি দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কারও একার নয়। এটি সেই মানুষের, যিনি ভোট দেন— আর তারপর অপেক্ষা করেন।

পরবর্তী পর্ব: চাকরি নয়, কাজ—ভোটারের প্রথম দাবি

- অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#জনগণেরইশতেহার #আমরাআসলেকীচাই #ভোটারেরকথা #বাংলাদেশরাজনীতি #জাতীয়নির্বাচন #ইশতেহার #ভোটারআস্থা #গণতন্ত্র #রাজনৈতিকসম্পাদকীয় #BangladeshPolitics #VotersVoice #ElectionManifesto #DemocracyInBangladesh



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: