নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
বিশ্ব রাজনীতি এখন প্রবেশ করেছে ধ্বংসাত্মক বা রেকিং-বল পলিটিক্স যুগে। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থা এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে মিউনিখ সিকিউরিটি রিপোর্ট ২০২৬। মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সের আগে প্রকাশিত বার্ষিক এই প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে সরাসরি ডেমোলিশন ম্যান বা বিশ্বব্যবস্থা ভাঙার প্রধান কারিগর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের নীতি ও পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের জোট নিয়ম-কানুন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে তুলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সাল থেকে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, ৮০ বছরের বেশি সময় পর এখন তা ধ্বংসের মুখে।
ট্রাম্পের নীতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নয়, লেনদেনের রাজনীতি
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী ট্রাম্পের কার্যক্রম বিশ্বকে এমন একটি পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে নীতিনির্ভর সহযোগিতার বদলে প্রধান হয়ে উঠবে লেনদেনভিত্তিক চুক্তি ও স্বার্থপর কূটনীতি। বিশ্লেষকদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে এবং বিশ্বব্যবস্থা এমন এক কাঠামোতে চলে যেতে পারে যেখানে ধনী ও শক্তিশালীরা সুবিধা পাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন থেকে বঞ্চিত হবে।
ইউরোপকে নাড়া দিয়েছিল ভ্যান্সের বক্তব্য
প্রতিবেদনে আরও বলা হয় গত বছর মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি ইউরোপের সেন্সরশিপ ও অভিবাসন নীতিকে আক্রমণ করে বলেন, ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি আসছে ভেতর থেকেই। তার ওই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
ইউরোপের মিত্রদের ওপর শুল্ক, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তা
মিউনিখ সিকিউরিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে ট্রাম্পের মেয়াদজুড়ে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ, ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে উল্লেখ করা হয় বিদ্যমান নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কুঠারাঘাতকারী শক্তিধরদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা
প্রতিবেদনের জন্য পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা গেছে বিশ্বের বহু মানুষ মনে করছেন সরকারগুলো দ্রব্যমূল্য সংকট, আয়বৈষম্য, নিম্নমুখী জীবনমান এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে “ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অসহায়ত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়। জরিপ অনুযায়ী ফ্রান্সে ৬০%, যুক্তরাজ্যে ৫৩%, জার্মানিতে ৫১%, যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫% এর মানুষ মনে করেন, বর্তমান সরকারি নীতির ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও খারাপ অবস্থায় পড়বে।
ট্রাম্পের নীতিই বিশ্ব হতাশার বড় কারণ?
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ ট্রাম্পের নীতিকে বিশ্ব পরিস্থিতি অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রশ্ন ছিল-ট্রাম্পের নীতি কি বিশ্ব কল্যাণে সহায়ক? যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্ধেক বা তার বেশি মানুষ বলেছেন, তারা ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে একমত নন।
মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স শুরু হচ্ছে শুক্রবার এবং চলবে রবিবার পর্যন্ত। সম্মেলনে ৫০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নেবেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প নিজে এতে অংশ নিচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং কংগ্রেসের ৫০ জনের বেশি সদস্য।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: