নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
শীতের কনকনে ঠান্ডা এক দিনে শিকাগোর লেকফ্রন্ট যেন ফিরে পেয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক এক বিস্ময়। বিশালাকার ম্যামথ (Mammoth) প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল শহরের স্কাইলাইনের পটভূমিতে। তবে এগুলো কোনো বাস্তব প্রাণী নয় বরং ধাতব কাঠামো, কৃত্রিম পশম ও নানা উপকরণে তৈরি শিল্পকর্ম। ম্যামথগুলোর ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মানুষের পাফার জ্যাকেট, স্কার্ফ ও শীতের পোশাক কারণ এগুলো বহন করছিল একদল পারফর্মার। এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্মগুলোর স্রষ্টা শিকাগোভিত্তিক বিখ্যাত শিল্পী নিক কেভ (Nick Cave)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে থ্রিফট শপ ও ক্রাফট স্টোর থেকে সংগ্রহ করা নানা সামগ্রী দিয়ে গড়ে তুলেছেন বিস্ময়কর ভাস্কর্য ও পরিধানযোগ্য শিল্পকর্ম, যা আধুনিক শিল্পজগতে তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
Smithsonian-এ ‘Mammoth’ প্রদর্শনী
নিক কেভের এই ম্যামথ শিল্পকর্মগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির Smithsonian American Art Museum (SAAM)-এ প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রদর্শনীর নাম Mammoth যা শুরু হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে। জানা গেছে, এটি Smithsonian American Art Museum-এর ইতিহাসে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় কমিশনকৃত প্রদর্শনী। একইসাথে এটি ওয়াশিংটন ডিসিতে নিক কেভের প্রথম একক প্রদর্শনী। নিক কেভ জানান, এই প্রদর্শনী তৈরিতে লেগেছে প্রায় ৯ বছর। শিকাগোর Irving Park এলাকায় তিনি তার পার্টনার শিল্পী ও ডিজাইনার বব ফাউস্ট (Bob Faust)-এর সঙ্গে Facility নামক একটি স্টুডিওতে কাজ করেন। সেখানেই প্রস্তুত হয়েছে প্রদর্শনীর অধিকাংশ অংশ। এই প্রদর্শনীর জন্য কেভ সংগ্রহ করেছেন হাজার হাজার বস্তু পুরনো ফোন, খেলনা, কুইল্টিং ব্লক, টিংকার টয়, থিম্বল, পাই প্লেটসহ বহু পারিবারিক স্মৃতি ও পুরনো জিনিসপত্র। এগুলো সাজানো হয়েছে একটি বিশাল আলোকিত টেবিলের ওপর, যা প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় আকর্ষণ।
ম্যামথ: ইতিহাসের প্রতীক
নিক কেভের মতে, ম্যামথ শুধু একটি প্রাণীর নাম নয় এটি ইতিহাস ও স্মৃতির প্রতীক। তিনি বলেন, একসময় ম্যামথ পৃথিবীতে ছিল, পরে বিলুপ্ত হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, এরপর আবার আবিষ্কৃত হয়। এটি দেখায় কীভাবে ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা হয়, আবার কখনো নতুনভাবে প্রকাশ পায়। এই ভাবনাই প্রদর্শনীর মূল থিমকে শক্তিশালী করেছে। প্রদর্শনীতে শুধু ভাস্কর্য নয়, রয়েছে ম্যামথগুলোর শিকাগোর লেকফ্রন্টে হাঁটার ভিডিও। এছাড়া চলতি বছর Smithsonian মিউজিয়ামের ভেতরে ১২টি ম্যামথ নিয়ে একটি লাইভ প্রসেশন (procession) আয়োজন করা হবে, যেখানে শিল্পকর্মগুলো পরিচালনা করবেন পারফর্মাররা। নিক কেভ বলেন, তিনি ম্যামথগুলোকে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখেননি কারণ তিনি চেয়েছেন দর্শকরা দেখতে পাক এই প্রাণীদের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। এতে মানবতার প্রকাশ স্পষ্ট হয়।
রাজনীতি, ইতিহাস ও পুনর্জন্মের বার্তা
নিক কেভ তার কাজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বর্ণবাদ, সামাজিক বৈষম্য ও ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন। প্রদর্শনীতে থাকা একটি নতুন ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য Amalgam (Plot) এ দেখা যায় দুই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শরীর থেকে ফুল ফুটে উঠছে যা দুঃখ ও নিপীড়নের মধ্যেও “পুনর্জন্ম”-এর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেভের বিখ্যাত Soundsuits সিরিজের জন্ম হয়েছিল ১৯৯১ সালে রডনি কিংয়ের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে। তিনি তখন উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজে বর্ণ ও পরিচয় কতটা বড় একটি বিষয়। Soundsuits-এর মাধ্যমে তিনি এমন এক “দ্বিতীয় চামড়া” তৈরি করেন যা লিঙ্গ, বর্ণ ও শ্রেণিকে আড়াল করে দেয়। Smithsonian-এর কিউরেটর সারাহ নিউম্যান জানান, প্রদর্শনীর ওয়াল টেক্সটগুলো খুব বেশি নির্দেশনামূলক নয়। দর্শকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে শিল্পকর্ম ব্যাখ্যা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নিক কেভ আশা করেন, দর্শকরা প্রদর্শনীতে থাকা প্রতিটি বস্তুর সাথে নিজেদের স্মৃতি ও অতীতের কোনো না কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাবেন।
বর্তমানকে ছুঁয়ে অতীতের দিকে যাত্রা নিক কেভ বলেন, এই প্রদর্শনী মানুষকে অতীতে নিয়ে যাবে, আবার একই সাথে বর্তমানের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এটি কেবল শিল্প প্রদর্শনী নয় এটি ইতিহাস, পরিচয়, মানবতা ও স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল।
-মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: