নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে রেকর্ড গড়লেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার রাতে ক্যাপিটল হিলে দেওয়া এই ভাষণটি স্থায়ী ছিল ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট। যা গত বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক তার ট্যারিফ (শুল্ক) নীতি বাতিল এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা হ্রাসের চ্যালেঞ্জের মুখেই এই দীর্ঘ ভাষণ দিলেন তিনি।
প্রতিবেদনটির প্রধান আকর্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অভিবাসন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি চ্যালেঞ্জ
২০২৬-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প আবারও তার পুরনো অস্ত্র 'অভিবাসন' ইস্যুকে সামনে এনেছেন। ভাষণে তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া মানে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া। এক পর্যায়ে তিনি উপস্থিত সদস্যদের দাঁড়িয়ে সমর্থন জানাতে বলেন—যদি তারা বিশ্বাস করেন যে সরকারের প্রথম কাজ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া, অবৈধ অভিবাসীদের নয়। ডেমোক্র্যাটরা বসে থাকলেও রিপাবলিকানরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে করতালি দেন। ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত।
২. ট্যারিফ ও আয়কর বিলোপের ঘোষণা
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সমালোচনা না করলেও ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তিনি কংগ্রেসের সাহায্য ছাড়াই ট্যারিফ কার্যকর করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি এক অভাবনীয় দাবি করে বলেন, বিদেশি দেশগুলোর ওপর আরোপিত ট্যারিফ দিয়ে বর্তমানের 'ইনকাম ট্যাক্স' বা আয়কর ব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব হবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা একে অবাস্তব বলে মনে করছেন।
৩. উত্তাল সংসদ: ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবাদ
ভাষণ চলাকালীন ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। টেক্সাসের প্রতিনিধি আল গ্রিনকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বর্ণবাদবিরোধী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছিলেন। এছাড়া রাশিদা তলাইব এবং ইলহান ওমর সরাসরি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করেন। বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য মাঝপথেই ভাষণ বর্জন করে কক্ষ ত্যাগ করেন।
৪. শোম্যানশিপ ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
ট্রাম্পের ভাষণে বরাবরের মতোই ছিল নাটকীয়তা। তিনি গ্যালারিতে উপস্থিত অলিম্পিক জয়ী আইস হকি দলকে অভিনন্দন জানান এবং গোলরক্ষক কনর হেলেবাইককে 'প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম' দেওয়ার ঘোষণা দেন। এছাড়া ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারকে উৎখাতে ভূমিকা রাখা কর্মকর্তাদের পদক প্রদান এবং এক রাজনৈতিক বন্দীর পারিবারিক পুনর্মিলনীর আয়োজন করে দর্শকদের আবেগ আপ্লুত করার চেষ্টা করেন।
৫. কৌশলগত নীরবতা
কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুতে ট্রাম্প ছিলেন একেবারেই নীরব। মিনিয়াপলিসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনা বা বর্তমানে চলমান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অচলাবস্থা নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। এমনকি অর্থনীতির বর্তমান নাজুক অবস্থা নিয়েও বিস্তারিত কোনো রূপরেখা দেননি।
৬. ইরানকে সামরিক হামলার হুমকি
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন। আট মাস আগে হামলার দাবি করলেও তিনি বলেন, ইরান আবারও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইরানকে বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসী মদদদাতা দেশ হিসেবে তিনি কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র গড়তে দেবেন না। প্রয়োজনে আবারও সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
৭. ২০২৬ নির্বাচন ও জালিয়াতির অভিযোগ
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির আশঙ্কার মাঝেই ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে 'ভোট চুরির' আগাম অভিযোগ তুলেছেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটরা কেবল কারচুপির মাধ্যমেই জিততে পারে। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
৮. তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের ভাষণে বেশ কিছু ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য ছিল বলে বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন।
মুদ্রাস্ফীতি: তিনি দাবি করেন রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, যা সঠিক নয়।
জ্বালানি তেল: কোনো কোনো রাজ্যে গ্যাসের দাম ২.৩০ ডলারের নিচে বলে দাবি করলেও প্রকৃত বাজারদর তার চেয়ে বেশি।
কর্মসংস্থান: জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কর্মসংস্থান বাড়লেও গত বছরে বেকারত্বের হার বেড়েছে এবং চাকরির বাজার ছিল স্থবির।
ভাষণটি ছিল মূলত নির্বাচনী বার্তা-কেন্দ্রিক। অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে রিপাবলিকান সমর্থন জোরদার করার পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের চাপে রাখাই ছিল ট্রাম্পের কৌশল। তবে ট্যারিফ নীতি ও অর্থনৈতিক দাবিগুলো নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
---মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: