—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে 'প্রগতি ২১০০' মডেল। কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই এটি পড়েছে বিতর্কের মুখে। একদিকে মুখস্থবিদ্যার অবসান, অন্যদিকে পরিকাঠামো ও শিক্ষকদের প্রস্তুতির অভাব। এই সংস্কার কি আগামীর দক্ষ প্রজন্ম গড়বে, নাকি এটি কেবলই এক 'পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র'? বিস্তারিত পড়ুন আমাদের আজকের বিশেষ ফিচারে।
যেকোনো বড় সংস্কারের পথেই কাঁটা বিছানো থাকে, আর ‘প্রগতি ২১০০’ মডেলও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, অভিভাবক ও রাজনৈতিক মহলে এই মডেলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক। কোনোটি গভীর উদ্বেগের, আবার কোনোটি হয়তো সঠিক তথ্যের অভাবে তৈরি—তবে প্রতিটি মতামতই গুরুত্বের দাবি রাখে। এই বিতর্কগুলোর যৌক্তিক সমাধান না হলে মডেলটির পূর্ণ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। নিচে মোটা দাগে এই বিতর্কগুলো আলোচিত হলো:
প্রথম বিতর্ক: ফিঙ্ক কি খুব ‘পশ্চিমা’ আর ‘বিলাসী’?
রক্ষণশীল মহলের সবচেয়ে শক্তিশালী আপত্তি হলো — ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি পশ্চিমা, উদার ও অর্থহীন। তারা বলেন, “বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে এখনও অনেক বিদ্যালয়ে বসার বেঞ্চের অভাব, সেখানে ‘সচেতনতা’, ‘মানবিক দিক’ নিয়ে আলোচনা বিলাসিতা। আমাদের আগে মৌলিক শিক্ষা, তারপর এসব ফিলসফি।” এই যুক্তির বিপরীতে প্রগতি ২১০০-এর প্রবক্তারা বলেন, মৌলিক ও মানবিক শিক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। ফিনল্যান্ডও একসময় দরিদ্র ছিল, কিন্তু তারা ‘বিলাসী’ শিক্ষায় বিনিয়োগ করেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ফিঙ্কের ‘মৌলিক জ্ঞান’ ও ‘প্রয়োগ’ স্তম্ভ মৌলিক শিক্ষাকেই আরও শক্তিশালী করে — কারণ মুখস্থবিদ্যার বদলে বাস্তব প্রয়োগ শিখলে শিক্ষার্থী ভালোভাবে জ্ঞান ধরে রাখে। তবুও এই বিতর্ক থেকেই যায় — বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অভিভাবকদের মনে, যারা ভয় পান তাদের সন্তানরা ‘পড়ালেখা ছেড়ে বাড়াবাড়ি শিখবে’।
দ্বিতীয় বিতর্ক: পরীক্ষা না থাকলে শিক্ষার্থীরা ‘আলসে’ হবে না?
বাংলাদেশের অভিভাবক ও শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখনও ‘পরীক্ষা’ ছাড়া শিক্ষা কল্পনা করতে পারেন না। প্রগতি ২১০০ মডেলে প্রচলিত লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক কম — বরং মূল্যায়ন হয় পোর্টফোলিও, প্রকল্প ও প্রতিফলনের মাধ্যমে। এতে অনেকের আপত্তি: “তাহলে তো শিক্ষার্থীরা পড়বে না! লিখিত পরীক্ষার ভয় না থাকলে কে মন দিয়ে পড়বে?” এই বিতর্কের জবাবে ফিঙ্কের অনুসারীরা বলেন, ভয়ের ভিত্তিতে শিক্ষা টেকসই নয়। প্রকৃত শিক্ষা আসে কৌতূহল থেকে, ভয় থেকে নয়। সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের উদাহরণ দেখায়, যেখানে লিখিত পরীক্ষার চাপ অনেক কম, সেখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেশি শেখে। তবুও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ লিখিত পরীক্ষা বাদ দেওয়া সম্ভব নয় — তাই প্রগতি ২১০০ মডেলেও একটি ‘মিশ্র মূল্যায়ন’ পদ্ধতি রাখা হয়েছে, যেখানে ৫০ শতাংশ নম্বর পোর্টফোলিওর, ৫০ শতাংশ লিখিত পরীক্ষার। এই আপস সমাধান এখনও অনেককে সন্তুষ্ট করতে পারেনি — কেউ কেউ বলে ‘অর্ধেক সংস্কার মানে অর্ধেক ব্যর্থতা’।
তৃতীয় বিতর্ক: শিক্ষকরা কি এত বদলাতে প্রস্তুত?
প্রগতি ২১০০ মডেল শিক্ষকের ভূমিকায় আমূল পরিবর্তন আনে — ‘সবজান্তা’ থেকে ‘সহযোগী পথিকৃৎ’। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষকই প্রশিক্ষিত নন এই ভূমিকার জন্য। অনেক শিক্ষক সরাসরি বলেছেন, “আমাদের তো বর্তমান সিলেবাসই সামলাতে কষ্ট হয়, তার ওপর আবার ‘প্রজেক্ট’, ‘পোর্টফোলিও’, ‘ফিঙ্ক স্কেল’?” শিক্ষক সংঘগুলো এই মডেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, দাবি করেছে — সংস্কারের আগে শিক্ষকদের বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও প্রশিক্ষণের মান বাড়াতে হবে। সরকারি এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষক ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন, আর মাত্র ৫ শতাংশ নিজেদের ‘প্রস্তুত’ মনে করেন। এই ফাঁক পূরণ না হলে মডেল ব্যর্থ হবে — এটি এক বাস্তব সতর্কতা।
চতুর্থ বিতর্ক: অভিভাবকদের ‘গ্রেডের ক্ষুধা’ ও ‘প্রতিযোগিতার মানসিকতা’
বাংলাদেশের মধ্যম ও উচ্চবিত্ত অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এখনও ‘জিপিএ-৫’, ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ ও ‘মেরিট তালিকা’-তে বিশ্বাসী। প্রগতি ২১০০ যখন বলে ‘গ্রেড নয়, প্রতিফলন’, তখন তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন — “আমার সন্তান তাহলে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে? কীভাবে চাকরি পাবে?” এই বিতর্কের গভীরতা অনেক, কারণ এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে জড়িত। যতক্ষণ না বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ও চাকরির বাজার ফিঙ্ক স্কেল ও পোর্টফোলিওকে গুরুত্ব দেয়, ততক্ষণ অভিভাবকদের আশ্বস্ত করা কঠিন। প্রগতি ২১০০-এর পরিকল্পনাকারীরা জানিয়েছেন, সংস্কারের প্রথম পর্যায়ে তারা ‘ডুয়েল সিস্টেম’ চালু করবেন — যেখানে শিক্ষার্থীরা চাইলে প্রচলিত পরীক্ষায় বসতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে, যখন সমাজ ফিঙ্ক স্কেলের মূল্য বুঝবে, তখন পুরোপুরি পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু এই ‘ডুয়েল সিস্টেম’ নিজেই আরেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে — কেউ বলছেন, এটা আবার সংস্কারের নামে দ্বৈত মানসিকতা তৈরি করবে।
পঞ্চম বিতর্ক: ‘অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা’ বনাম ‘মূল্যবোধের সংকট’
ফিঙ্কের ‘সচেতনতা’ ও ‘মানবিক দিক’ স্তম্ভ যখন বাস্তবায়িত হয়, তখন সেটিতে স্বাভাবিকভাবেই আসে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীর ক্ষমতায়ন, সংখ্যালঘু অধিকার ও সমকক্ষ শ্রদ্ধার মতো বিষয়। বাংলাদেশের কিছু কট্টরপন্থি মহল এতে আপত্তি তুলেছে — তাদের দাবি, এটা ‘ধর্মহীন শিক্ষা’, যা তরুণ প্রজন্মকে ‘নৈতিক পতনের’ দিকে নিয়ে যাবে। তারা চায় ‘নৈতিক শিক্ষা’ বলতে বোঝানো হোক কেবল নির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষা, ফিঙ্কের ধর্মনিরপেক্ষ ‘সচেতনতা’ নয়। এই বিতর্ক সবচেয়ে জটিল, কারণ এটি রাজনীতি ও ধর্মের গভীরে যায়। প্রগতি ২১০০-এর নীতিনির্ধারকরা সাফ জানিয়েছেন, মডেলটি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি সব ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। তবুও দেশের একটি অংশের রোষানল এড়ানো যায়নি — সংবাদপত্রের পাতায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়, এমনকি সংসদেও এই মডেলকে ‘পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ বিতর্ক: ব্যয় ও বিনিয়োগের প্রশ্ন
প্রগতি ২১০০ বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন — শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল পোর্টফোলিও ব্যবস্থা, পরিকাঠামো উন্নয়ন, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু। বাংলাদেশের বাজেটে এই অতিরিক্ত ব্যয় কোথা থেকে আসবে? কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি — এসবের মধ্যে শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? বিতর্ককারীরা বলেন, বর্তমান বাজেটেই বিদ্যালয় ভবন, শিক্ষকের বেতন ও উপবৃত্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, ফিঙ্কের মতো ‘বিলাসী মডেল’ আপাতত অসম্ভব। অন্যদিকে, সংস্কারপন্থিরা বলেন, “শিক্ষায় বিনিয়োগ বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন। আজ না করলে আগামী প্রজন্মকে আরও বেশি মূল্য দিতে হবে।” ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তারা দেখান, বিনিয়োগের পর দশকের মাথায় সেই অর্থ লাভের চেয়ে বহুগুণ বেশি ফিরে আসে — কর্মক্ষম জনশক্তি, কম অপরাধ, বেশি উদ্ভাবন।
প্রগতি ২১০০-এর বার্তা: ফিঙ্কের আলোয় সমাধান, না আপস
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে যে চিত্র ফুটে ওঠে তাতে প্রমাণিত হয় যে, ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ নামক পদ্ধতিটি কখনোই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এটি একটি ভালো উদ্যোগ ছিল — ব্লুমের ট্যাক্সোনমির ওপর ভিত্তি করে তৈরি — কিন্তু তার বাস্তবায়ন ছিল নৈপুণ্যহীন, অসম্পূর্ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি কিন্তু এই পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বাতিল করতে বলে না। ফিঙ্ক বলে — ব্লুমের কাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করো, যোগ করো ‘মানবিক দিক’, ‘শিখতে শেখা’ ও ‘সচেতনতা’। অর্থাৎ, শুধু ‘জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সৃজনশীলতা’ নয় — বরং সেই সঙ্গে শিক্ষার্থী নিজেকে চিনুক, অপরকে বোঝার চেষ্টা করুক, শিখতে শিখুক আর অনুভব করুক। প্রগতি ২১০০ সেই পথ দেখায় — যেখানে ‘কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের জেলখানা’ ভেঙে তৈরি হয় ‘অর্থপূর্ণ শিখনের উদ্যান’। সেই উদ্যানে শিক্ষার্থীরা আর ‘সঠিক উত্তর’ লিখতে শেখে না — তারা ‘সঠিক প্রশ্ন’ করতে শেখে। আর সেটিই প্রকৃত সৃজনশীলতা।
ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি এসে বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বৃদ্ধিভিত্তিক অপরাধকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ফিঙ্কের দৃষ্টিতে রেদখলে শিক্ষায় ‘সৃজনশীলতা’ কোথায়? তাঁর ‘প্রয়োগ’ ও ‘সমন্বয়’ স্তম্ভ শিক্ষার্থীকে উড়তে দেয়, কাঠামোয় বন্দি করে না। ফিঙ্কের ‘সচেতনতা’ শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করে — ‘এই কাঠামোটা কেন? এর বাইরেও কি কিছু আছে?’ অথচ আমাদের ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে শেখায়নি — শিখিয়েছে উত্তর দিতে। ফিঙ্কের ‘মানবিক দিক’ শিক্ষার্থীকে অপরের চোখে দেখতে শেখায় — অথচ আমাদের পদ্ধতি শিক্ষার্থীকে শেখায় ‘পরীক্ষকের চোখে নিজের উত্তর দেখতে’। ফিঙ্কের ‘শিখতে শেখা’ স্বাধীন অনুসন্ধানের পক্ষে — আর আমাদের ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ নির্ধারিত উত্তর ফরম্যাটের পক্ষে। ফিঙ্কের আলোয় আজ স্পষ্ট হয়ে যায় — ২০১০ সালের সেই ‘সৃজনশীল’ নামকরণ ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি, একটি শিক্ষাগত প্রতারণা, যা একটি গোটা প্রজন্মের চিন্তার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।
বিতর্কের সমাধানের পথ: সংলাপ, পাইলট ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
এই সব বিতর্কের সমাধান কী? কোনো সহজ জবাব নেই। প্রগতি ২১০০-এর পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, প্রথমে ক্ষুদ্র পরিসরে পাইলট প্রকল্প (২০-৩০টি বিদ্যালয়ে) চালানো হবে, সেখান থেকে তথ্য ও প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে মডেলকে পরিমার্জন করা হবে। তারপর ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ — প্রথমে শহুরে বিদ্যালয়, পরে গ্রামীণ। একই সঙ্গে ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচি, অভিভাবক ও শিক্ষক সংলাপ, এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা। একদিনে সব বিতর্ক মিটবে না — কিন্তু আন্তরিক প্রচেষ্টা ও স্বচ্ছ যোগাযোগের মাধ্যমে সমাজের একটা বড় অংশকে বোঝানো সম্ভব। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও অনেক বিতর্কিত সংস্কার এসেছে — জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২, সৃজনশীল পদ্ধতি ২০১৮ — সবকিছুর শুরুতে বিতর্ক ছিল, পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে। প্রগতি ২১০০ হয়তো তেমনই হবে।
তথ্যের আলোকে এক সান্ত্বনা
মনে রাখতে হবে, বিতর্ক থাকা মানে মডেলটি খারাপ — তা বোঝায় না। বিতর্ক থাকা মানে মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রাসঙ্গিক, আর মানুষের জীবন স্পর্শ করছে। ফিঙ্ক নিজেও বলেছেন, “যে শিক্ষাব্যবস্থা কখনো বিতর্কিত হয়নি, সে কখনো সত্যিকার পরিবর্তন আনে না।” বাংলাদেশের প্রগতি ২১০০ বিতর্কিত — কারণ এটি সত্যিকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গেলে সাময়িক দ্বন্দ্ব, মতানৈক্য ও প্রতিরোধ পেরোতেই হবে। শিক্ষার অ্যানার্কি শেষ করতে হলে এই বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে — ভয় না পেয়ে, যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, আর সবচেয়ে বড় কথা — ভালোবাসা দিয়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত, আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাক। শুধু পথটা এখনো পরিষ্কার নয় — ফিঙ্কের আলোয় সেই পথ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব।
উপসংহার: সংকটের বাঁকে সম্ভাবনার সূর্য
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস খুব একটা মসৃণ নয়। কিন্তু ‘প্রগতি ২১০০’ কেবল আরেকটি সাধারণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের জাতীয় চিন্তাধারার খোলনলচে বদলে দেওয়ার একটি সাহসী প্রচেষ্টা। বিতর্কের যে ঝড় আমরা দেখছি, তা আসলে একটি স্থবির ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিকতার সংঘাত। যেকোনো নতুন আলো যখন পুরনো অন্ধকারকে আঘাত করে, তখন সেখানে কিছুটা বিশৃঙ্খলা হওয়া স্বাভাবিক। ফিঙ্ক ট্যাক্সোনমি বা পোর্টফোলিও মূল্যায়ন—এসবই কেবল শব্দ নয়, বরং এগুলো আমাদের সন্তানদের মুখস্থবিদ্যার যাঁতাকল থেকে মুক্তি দেওয়ার একেকটি চাবিকাঠি।
তবে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো সফল সংস্কারের মূলে থাকে ‘বিশ্বাস’। যদি শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা না যায়, তবে সবচেয়ে আধুনিক মডেলটিও কাগজের পাতায় বন্দি হয়ে পড়বে। প্রগতি ২১০০-এর সফলতা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সার্থক সমন্বয়ের ওপর।
চূড়ান্ত প্রতিফলন: আমাদের দায়বদ্ধতা ও আগামীর বাংলাদেশ
‘প্রগতি ২১০০’ নিয়ে চলমান বিতর্কগুলো থেকে কয়েকটি মৌলিক সত্য বেরিয়ে আসে, যা আমাদের ভাবনার খোরাক দেয়:
- ভয় বনাম কৌতূহল: আমরা কি আমাদের সন্তানদের আজীবন পরীক্ষার ভয়ের মধ্যে রেখে বড় করতে চাই, নাকি তাদের মধ্যে অজানাকে জানার সহজাত কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে চাই? প্রগতি ২১০০ দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে।
- শিক্ষকের মানই শিক্ষার মান: কোনো সংস্কারই সফল হবে না যদি না আমরা আমাদের শিক্ষকদের প্রকৃত সামাজিক মর্যাদা এবং বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দিতে পারি। শিক্ষক যদি মডেলটি মনে-প্রাণে বিশ্বাস না করেন, তবে শ্রেণিকক্ষে এর প্রতিফলন ঘটবে না।
- বিনিয়োগই সেরা প্রতিরক্ষা: অর্থনৈতিক সংকট থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ‘বিলাসিতা’ ভাবলে আমরা চিরকাল পরনির্ভরশীল হয়ে থাকব। দক্ষ ও মানবিক জনশক্তিই হবে ২০২৬ এবং তার পরবর্তী বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি।
শেষ কথা: শিক্ষার অ্যানার্কি বা বিশৃঙ্খলা শেষ করতে হলে আমাদের এই বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে—ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার সময় আর নেই। ‘প্রগতি ২১০০’ কোনো ম্যাজিক নয় যে রাতারাতি সব বদলে দেবে, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় হয়তো ভুল হবে, হোঁচট খেতে হবে, কিন্তু সেই ভুলগুলো থেকে শিখেই আমাদের এগোতে হবে।
দিনের শেষে আমাদের উদ্দেশ্য এক—একটি উন্নত, মানবিক এবং বুদ্ধিদীপ্ত বাংলাদেশ। ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি সেই পথের একটি মশাল মাত্র; সেই মশাল হাতে নিয়ে অন্ধকার পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস আমাদেরই দেখাতে হবে। কারণ আজ আমরা যদি সাহসের সাথে এই পরিবর্তনকে আলিঙ্গন না করি, তবে আগামীর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। পরিশেষে বলা যায়:
"পরিবর্তন কঠিন, কিন্তু পরিবর্তনহীনতা আমাদের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রগতি ২১০০-এর বিতর্কই বলে দিচ্ছে আমরা একটি বড় অর্জনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।"
️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#EducationReformBD #Progati2100 #FinkTaxonomy #BangladeshEducation #শিক্ষা_সংস্কার #প্রগতি২১০০ #ভবিষ্যৎ_বাংলাদেশ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: