odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 5th June 2026, ৫th June ২০২৬
মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু ও ডিজিটাল সেবার যুগে এখনও যদি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী স্কুলে ঢুকতে না পারেন, একজন অন্ধ শিক্ষার্থী বই না পান, কিংবা একজন অটিস্টিক তরুণ চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন—তবে উন্নয়নের এই গল্প আসলে কার?

দয়া নয়, অধিকার চাই: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়নই টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি—জাতীয় বাজেট ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৩ June ২০২৬ ২৩:১০

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৩ June ২০২৬ ২৩:১০

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম

বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন দিগন্তে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও অমীমাংসিতএই উন্নয়ন কি সত্যিই সবার জন্য? প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, পরিবহন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। এই বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে কেন প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, SDGs অর্জন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পূর্বশর্ত।Nothing About Us Without Us” এবংLeave No One Behind”-এর আলোকে আলোচিত হয়েছে প্রতিবন্ধিতা, উন্নয়ন, মানবাধিকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গভীর সম্পর্ক। উন্নয়ন যদি সবার জন্য হয়, তবে প্রতিবন্ধী মানুষদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না।
একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিশু যদি স্কুলে ঢুকতেই না পারে, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি বই না পায়, আর একজন অটিস্টিক তরুণ যদি চাকরির সাক্ষাৎকারে বৈষম্যের শিকার হয়তবে আমরা কোন উন্নয়নের কথা বলছি?
টেকসই উন্নয়ন শুধু GDP নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্ন। প্রতিবন্ধী মানুষদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়তাঁদের সঙ্গে নিয়েই গড়তে হবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই বাংলাদেশ।

টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন কেন জরুরি?

একটি রাষ্ট্র কত বড় বড় সেতু বানালো, কত উঁচু ভবন দাঁড় করালো, কিংবা কত দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলো—শুধু তা দিয়েই প্রকৃত উন্নয়ন মাপা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটিও উন্নয়নের সুফল পায়, নিজের অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এবং রাষ্ট্রের মূলধারায় সম্মানের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে। আর সেই জায়গা থেকেই বলতে হয়—বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই।

কারণ উন্নয়ন যদি হয় “সবার জন্য”, তাহলে সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষ বাদ পড়বে কেন? একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যদি বিদ্যালয়ে ঢুকতেই না পারে, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি বই না পায়, একজন অটিস্টিক তরুণ যদি চাকরির সাক্ষাৎকারে অপমানিত হয়, কিংবা একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী নারী যদি হাসপাতালে নিজের কথা বোঝাতেই না পারেন—তবে সেই উন্নয়ন কাদের জন্য?

বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আজও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, গণপরিবহন, বিচারব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবায় নানাভাবে বঞ্চনার শিকার। অথচ তারা সমাজের বোঝা নয়; বরং সঠিক সুযোগ পেলে তারাই হতে পারেন দেশের সম্পদ, উদ্ভাবক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, শিল্পী কিংবা দক্ষ কর্মী। সমস্যা মানুষের মধ্যে নয়; সমস্যা আমাদের অপ্রস্তুত সমাজ ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মধ্যে।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে ১২ নভেম্বরের একটি প্রশাসনিক বৈঠক: অন্যায়ের অন্ধকার ভাঙার স্বপ্ন│একটি বাস্তব কাহিনি—প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েটদের ন্যায্যতার লড়াইয়ের অন্তরালে রা্ষ্ট্র

অনেক সময় আমরা প্রতিবন্ধিতাকে দয়া বা করুণার চোখে দেখি। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি নিজেই একটি বড় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি করুণা চান না—তিনি চান শিক্ষা, কাজ, নিরাপদ চলাচল, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অধিকার। “দয়া” মানুষকে নির্ভরশীল করে, কিন্তু “ক্ষমতায়ন” মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলে।

বিশ্বব্যাপী Sustainable Development Goals (SDGs)-এর মূল প্রতিশ্রুতি হলো—“Leave No One Behind” অর্থাৎ কাউকে পেছনে ফেলে নয়। এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব যদি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে থাকে। কারণ টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তি এবং অংশগ্রহণের প্রশ্ন।

একটি উদাহরণ কল্পনা করা যাক। একটি গ্রামে নতুন একটি স্কুল তৈরি হলো। ভবন সুন্দর, ডিজিটাল ক্লাসরুম আছে, কিন্তু সেখানে কোনো র‍্যাম্প নেই। তাহলে হুইলচেয়ারে থাকা শিশুটির জন্য সেই স্কুল কি সত্যিই “উন্নয়ন”? আবার একটি সরকারি ওয়েবসাইট চালু হলো, কিন্তু screen reader-friendly নয়। তাহলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ কতটা বাস্তব?

অর্থাৎ, প্রতিবন্ধীদের বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন করা হয়, তা আসলে অসম্পূর্ণ উন্নয়ন—যেখানে অবকাঠামো আছে, কিন্তু মানবিকতা নেই; প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু সমতা নেই।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ ইলন মাস্ক, বিলাল মাহমুদ ও বাংলাদেশে বিশেষ শিশুদের মায়েদের সংগ্রাম: নীরব আগামীর গল্প│আন্তর্জাতিক মা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ডিজঅ্যাবিলিটি প্রফেশনালস কর্তৃক রাজধানীতে আয়োজিত বিশেষ মায়েদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ; পাশাপাশি উন্মোচিত হয় ডিসঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নতুন দিগন্ত

বিশেষ শিশুদের পিতামাতাসহ বাংলাদেশের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক পেশাজীবীবৃন্দ (যেমন: শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, থেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনসমূহ) মনে করে,

“প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন মানে শুধু ভাতা নয়। এর অর্থ হলো—শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা,  accessible পরিবহন গড়ে তোলা, প্রযুক্তিকে সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করা, এবং নীতি নির্ধারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কারণ “Nothing About Us Without Us” — আমাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে, অথচ আমরা সেখানে থাকব না—এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শিক্ষিত হন, কর্মে যুক্ত হন, উদ্যোক্তা হন—তখন তিনি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ উৎপাদনশীলতাকে বাড়ায়, সামাজিক বৈষম্য কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে আরও স্থিতিশীল করে ।”

আজকের বাংলাদেশ “স্মার্ট বাংলাদেশ”, “উন্নত বাংলাদেশ” কিংবা “ডিজিটাল বাংলাদেশ”-এর স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন একজন প্রতিবন্ধী শিশুও বলবে—“এই দেশ আমারও”; যখন কোনো মা তাঁর প্রতিবন্ধী সন্তানকে লুকিয়ে রাখবেন না; যখন চাকরির ইন্টারভিউতে দক্ষতা দেখা হবে, প্রতিবন্ধিতা নয়; যখন রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও প্রযুক্তি হবে সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ অমৃতময়ী নীরবতার ভাষা যেনো অকূল সমুদ্রের বাতিঘর: বিশেষ শিশুদের মায়েদের জীবনসংগ্রাম, নীরব কান্না, অনন্ত লড়াই আর ভালোবাসার অদেখা মহাকাব্যে নিরব আগামীর গল্প │আন্তর্জাতিক মাতৃদিবস উপলক্ষে বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মায়েদের অদম্য ধৈর্য, অশ্রু, সামাজিক লড়াই ও নিঃশর্ত ভালোবাসার এক হৃদয়স্পর্শী দলিল।

কারণ মনে রাখতে হবে—প্রতিবন্ধীরা উন্নয়নের বাইরে নয়, তাঁরাই উন্নয়নের অংশীদার। তাঁদের বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর তাঁদের ক্ষমতায়ন ছাড়া মানবিক বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব।

টেকসই উন্নয়ন চাইলে প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন অপরিহার্য

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে—মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—এই উন্নয়ন কি সবার জন্য? নাকি এখনও এমন লাখো মানুষ আছেন, যারা উন্নয়নের গল্প শুনেন, কিন্তু তার অংশ হতে পারেন না?

প্রতিবন্ধী মানুষদের বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্র কখনোই প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। কারণ টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু GDP বৃদ্ধি নয়; টেকসই উন্নয়ন মানে এমন এক সমাজ, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না, কেউ অবহেলিত হবে না, কেউ নিজের অক্ষমতার কারণে নয়—বরং সমাজের অপ্রস্তুত ব্যবস্থার কারণে বঞ্চিত হবে না।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী দেশের একটি বিশাল মানবসম্পদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এখনও অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না, অনেক তরুণ চাকরির সুযোগ পায় না, অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েও ন্যায়বিচার পায় না। প্রশ্ন হলো, এভাবে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে আমরা কীভাবে উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখি?

একটি দেশ তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন দুর্বলতম নাগরিকটিও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যদি স্কুলের সিঁড়িতে আটকে যায়, একজন অন্ধ শিক্ষার্থী যদি পাঠ্যবই না পায়, একজন autistic তরুণ যদি শুধু “ভিন্ন” হওয়ার কারণে চাকরির সুযোগ হারায়—তাহলে সেই ব্যর্থতা ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান: বৈশ্বিক কোটা নীতি, বাস্তবায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ │Empowering Persons with Disabilities: Global Employment Quotas, Policies & Challenges in Inclusion

প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন মানে করুণা দেখানো নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কারণ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যখন শিক্ষা পায়, দক্ষতা অর্জন করে, কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়—তখন তিনি শুধু নিজের জীবনই বদলান না; তিনি পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠেন। একজন প্রতিবন্ধী তরুণের চাকরি মানে একটি পরিবারের দারিদ্র্য কমা। একজন প্রতিবন্ধী নারীর শিক্ষা মানে একটি প্রজন্মের সচেতনতা বৃদ্ধি। একজন inclusive school মানে মানবিক ভবিষ্যৎ তৈরি।

আজ বিশ্বব্যাপী Sustainable Development Goals (SDGs)-এর মূল দর্শনই হলো—“Leave No One Behind”। অর্থাৎ কাউকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন নয়। তাই প্রতিবন্ধিতা inclusion কোনো “special agenda” নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ অধিকারের আড়ালে বঞ্চনা: যখন আন্তর্জাতিক দিবস আসে, কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বঞ্চনার অবসান হয় না │ আগামীকাল আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কি আজও উপেক্ষিত? মেধাবী গ্র্যাজুয়েট প্রতিবন্ধীদের হাহাকার কি পৌঁছাবে নীতিনির্ধারকদের কানে?

বাস্তবতা হলো, প্রতিবন্ধী মানুষদের বাদ দিলে রাষ্ট্র শুধু মানবিকভাবেই ব্যর্থ হয় না, অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ লাখো মানুষ কর্মক্ষম থাকা সত্ত্বেও সুযোগের অভাবে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হতে পারে না। ফলে poverty cycle আরও গভীর হয়, dependency বাড়ে, এবং সামাজিক বৈষম্য দীর্ঘস্থায়ী হয়।

অন্যদিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ পুরো জাতিকেই উপকৃত করে। যে র‍্যাম্প একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য তৈরি হয়, সেটি বৃদ্ধ মানুষ, গর্ভবতী নারী কিংবা আহত ব্যক্তিরও কাজে লাগে। যে inclusive education ব্যবস্থা প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য তৈরি হয়, সেটি সকল শিশুর জন্য মানবিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলে। অর্থাৎ inclusion কারও জন্য আলাদা সুবিধা নয়; এটি সবার জন্য উন্নত জীবনব্যবস্থা।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিক্ষা সংস্কার, স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন, ডিজিটাল সেবা, নগর পরিকল্পনা—সব জায়গায় প্রতিবন্ধিতা inclusion বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ accessibility কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক অধিকার। Sign language কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি যোগাযোগের অধিকার। Inclusive education কোনো দয়া নয়; এটি সাংবিধানিক ন্যায়বিচার।

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত ফিচার │ লিখিত অধিকার, অলিখিত বঞ্চনা: প্রতিবন্ধী মানুষের অদৃশ্য জীবনের দৃশ্যমান লড়াই │আইন ও নীতির কাগজে অধিকার থাকলেও, বাস্তবের মাটিতে এখনো অদৃশ্য লাখো প্রতিবন্ধী মানুষ। অন্তর্ভুক্তি কেবল সহানুভূতির নয়—এটি ন্যায় ও মানবতার প্রশ্ন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে নয়, প্রতিবন্ধী মানুষদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। “Nothing About Us Without Us”—এই দর্শন বাস্তবায়ন ছাড়া প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত, স্মার্ট ও মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে প্রতিবন্ধী মানুষদের ক্ষমতায়ন আর কোনো দাতব্য কাজ নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় এজেন্ডা। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন মাপা হয় তার সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা নাগরিকের জীবনমান দিয়ে। আজ প্রশ্ন একটাই—উন্নয়ন কি সবার জন্য, নাকি শুধু কিছু মানুষের জন্য?

আজ সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। প্রতিবন্ধী মানুষদের “অসহায়” হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। কারণ প্রতিবন্ধিতা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামোই আসল প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়ন, মানবিক রাষ্ট্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চায়, তাহলে প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন আর বিকল্প নয়—এটি এখন জাতীয় প্রয়োজন, নৈতিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার।


 লেখক: অধ্যাপক . মহবুব লিটু, অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেসিডেন্ট , বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ডিজএবিলিটি প্রফেশনালস (বিএনএডিপি); এবং উপদেষ্টা সম্পাদক অধিকারপত্র ডট কম

#টেকসই_উন্নয়ন #প্রতিবন্ধী_অধিকার #প্রতিবন্ধীদের_ক্ষমতায়ন #InclusiveBangladesh #LeaveNoOneBehind #SDGsBangladesh #AccessibilityForAll #NothingAboutUsWithoutUs #InclusiveEducation #DisabilityInclusion #SmartBangladesh #HumanRights #SocialJustice #DisabilityRights #InclusiveDevelopment #BNADP #অধিকারপত্র #মানবিক_বাংলাদেশ #সবার_জন্য_উন্নয়ন #EqualityForAll

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: