odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 15th June 2026, ১৫th June ২০২৬
সরকার বদলেই বদলে যায় সিলেবাস, শিক্ষায় স্থিতিশীলতার অভাবে গভীরে গেঁথে যাচ্ছি ‘জেনারেশন গ্যাপ’-এর বিষবৃক্ষ, প্রয়োজন তাত্ত্বিক স্পষ্টতা ও শিক্ষাবিদের মন্থর পথচলা।

ঘূর্ণাবর্তে পাঠ্যপুস্তক: যে অদৃশ্য অস্থিরতা প্রজন্মকে করে দিচ্ছে দ্বিধাবিভক্ত

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৫:১৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৫:১৪

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের ঘনঘন পরিবর্তন কীভাবে একটি প্রজন্মকে অন্য প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে? কেন বারবার সিলেবাস বদল শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ সংকট, অভিভাবকদের বিভ্রান্তি এবং জাতীয় পর্যায়ে এক গভীর ‘জেনারেশন গ্যাপ’-এর জন্ম দিচ্ছে? এই অনুসন্ধানী ফিচারে তথ্য, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মানবিক গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, কারিকুলাম সংস্কারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য, এবং কেন একটি শিক্ষাক্রমকে অন্তত ১২ বছর সময় দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ফিনল্যান্ড, জাপান, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে তুলে ধরা হয়েছে—শিক্ষা কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার, নাকি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি? প্রবন্ধটি প্রশ্ন তোলে: আমরা কি পাঠ্যপুস্তক বদলাচ্ছি, নাকি অজান্তেই প্রজন্মের স্মৃতি, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিচ্ছি? শিক্ষা-দর্শন, নীতিনির্ধারণ, সামাজিক সংহতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আত্মসমালোচনার দলিল। বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম সংস্কার, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন, জেনারেশন গ্যাপ, শিক্ষা-দর্শন, শিক্ষানীতি, শিক্ষার স্থিতিশীলতা, কারিকুলাম সংস্কারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিখন ঘাটতি, শিক্ষাগত ধারাবাহিকতা, শিক্ষা গবেষণা, শিক্ষা প্রশাসন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং জাতীয় জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচারটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে।

প্রথম আঁচল: স্মৃতির বনাম পাঠ্যপুস্তকের খেয়া

একুশের প্রথম প্রহরে যখন বাতাসে বইছে নতুন সম্ভাবনার গন্ধ, তখন হেমন্ত কলেজের ছাদে বসে পুরনো খাতার স্তূপ উল্টোচ্ছিল। হঠাৎ হাত পড়ল এক টুকরো হলদেটে কাগজে—১৯৯৫ সালের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের ‘সুখ’ কবিতার ছাপা লাইন। স্মিত হাসল হেমন্ত। আজ তার নিজের ছেলে অর্ক, নবম শ্রেণিতে পড়ে; অর্কের বইতে ‘সুখ’ নেই, আছে ‘কৃতজ্ঞতা’ কবিতা। “বাবা, তোমাদের যুগ ছিল ফুরফুরে, আমরা টেকনোলজির ক্লান্তি নিয়ে বেড়ে উঠি,” বলে অর্ক যখন হাসে, হেমন্তের বুকের ভেতর গেঁথে যায় এক অদ্ভুত শিরশিরানি। এ যেন সেই বাড়ি, যেখানে প্রতি তিন বছরে বদলে যায় দেওয়ালের রং, কিন্তু ভাঙা জানালার কাঠ কেউ মেরামত করে না।

গভীরে যাওয়া: যখন শাসন বদলায়, বদলায় জ্ঞানের বুনন

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ প্রায় সাতবার বড় ধরনের জাতীয় শিক্ষাক্রম সংস্কার দেখেছে। ১৯৭২ সালের কমিটির শুরু থেকে ২০১২-র জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা, তারপর ২০২১-এর ‘শিক্ষাক্রম ২০২১’—প্রতি সরকার আসে, নতুন আশা জাগায়, আর জাগায় নতুন পাঠ্যপুস্তক। অথচ ইউনেস্কোর তথ্য বলে, উন্নত দেশে একটি পাঠ্যসূচি গড়ে ওঠে গড়ে ১০-১২ বছরে। সুইডেন দেখুন, ১৯৬২ সালের পর মাত্র তিনটি বড় সংস্কার। আর আমরা? ২০০১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক বদলেছে অন্তত পাঁচবার। এ যেন নদীর গতিপথ, যেখানে প্রতি বর্ষায় খনন করে নতুন খাল, ফলে পুরনো চরের চাষিরা হারিয়ে ফেলে তাদের মানসিক জমি।

তথ্যের কাঠগড়ায়: ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৯টি বিষয়ের ৬০টির বেশি পাঠ্যপুস্তকের রূপ ও রচনাশৈলী হঠাৎ বদলে যাওয়ায় পরীক্ষার ফল ৭.২ শতাংশ কমে গেছে (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন, ২০২৪)। অথচ এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শিক্ষকদের ৬৮ শতাংশই ‘নতুন কারিকুলাম যথাযথ বোঝার আগেই হাত ঘোরানোর’ চাপ অনুভব করেন। এ এক চক্রাকার ভুল—ভাইরাসের মতো ছড়ায়, বাসা বাঁধে অজান্তেই।

প্রজন্ম বিভেদের বিষাক্ত ফুল

চিত্রা (ছদ্মনাম), বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাঝরাতে ফোন পান প্রতিবেশী রত্নার। রত্নার মেয়ে পিয়াল, অষ্টম শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’-এর পরিবর্তে ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কারণ মা-বাবার দেওয়া পুরনো গাইডেবই কাজে লাগছে না, কোচিং সেন্টারও হিমশিম খাচ্ছে। এ গল্প শুধু পিয়ালের নয়, এ গল্প হাজারো পরিবারের, যেখানে ডাইনিং টেবিলে এখন আর গল্প হয় না, হয় সিলেবাসের যুদ্ধ।

কারিকুলাম পরিবর্তনের এ দ্রুততা এক অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে তোলে। বাবা-মা যখন দেখেন—‘তাদের আমলের বৃত্ত স্থির, সন্তানের বৃত্ত অস্থির’—যোগাযোগে ফাটল ধরে। জাতীয় মানসিকতায় গেঁথে যায় ‘পুরনো প্রজন্ম বনাম নতুন প্রজন্ম’ নির্মাণ। নেদারল্যান্ডসের এক গবেষক দেখিয়েছেন, শিক্ষায় অতি দ্রুত সংস্কার দেশের যুবসমাজকে ‘ইতিহাসহীন’ করে তোলে, যা পরে রাজনৈতিক অস্থিরতারও খোরাক জোগায়। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের দেশে তরুণ প্রজন্মের ৫৪ শতাংশ মনে করেন, ‘আমাদের শেখা বিষয়গুলো অভিভাবকের বোঝার বাইরে’—এ আত্মবিচ্ছিন্নতা কোনো ঘণ্টার আওয়াজ নয়, বরং এক নীরব ভূমিকম্প।

বিপর্যয়ের হিসাব নিকাশ—ঘনঘন কারিকুলাম বদলের ঝুঁকি ও অপচয়

পাঠ্যপুস্তকের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে যেন হারিয়ে যায় এক জাতির সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার। কিন্তু এই ‘হারানো’ কোনো রূপক নয়, বরং বাস্তব—যার হিসাব দিতে বসলে শিউরে ওঠে শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে শিক্ষার বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ২.১ শতাংশ (বাজেট প্রতিবেদন ২০২৪-২৫), সেখানে প্রতি পাঁচ-সাত বছর অন্তর পুরো সিলেবাস বদলে ফেলার অর্থ—কোটি কোটি টাকার ছাপানো বই, প্রশিক্ষণের অর্থ, আর স্কুল-কলেজের অস্থির সময়ের অঙ্ক।নিচে তথ্য-উপাত্ত, উপমা ও সাহিত্যিক বর্ণনার মাধ্যমে বারবার কারিকুলাম পরিবর্তনের ঝুঁকি ও ক্ষতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • প্রথম বিপর্যয়অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ: শুধু ২০২১ সালের ‘শিক্ষাক্রম ২০২১’ বাস্তবায়নের জন্য ছাপানো হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি নতুন পাঠ্যপুস্তক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের আগেই ২০২৪ সালের নির্বাচন পরবর্তী সরকার নতুন কমিটি গঠন করেছে, পুরনো সংস্করণ বাতিলের ঘোষণা দিয়ে। ফলে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের অধীনে তৈরি প্রায় ২০ কোটি পুরনো বই মজুদ থেকেই ধ্বংস বা বর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি অপ্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সাতবার বড় ধরনের কারিকুলাম পরিবর্তনের ফলে পাঠ্যপুস্তকের অপচয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এ যেন প্রতি বর্ষায় পাকা বাড়ি ভেঙে নতুন করে কাঁচা বাড়ি তোলার চক্র—শ্রম যায়, বাজেট যায়, অথচ স্থায়িত্ব কিছুরই হয় না।
  • দ্বিতীয় বিপর্যমানসিক ধাক্কা ও শিখন ঘাটতি: বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া এডুকেশন রিপোর্ট ২০২৩’ বলে, ঘনঘন সিলেবাস পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘কগনিটিভ ডিসঅর্ডার’-এর মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে—বিষয়গুলো গভীরে না বুঝেই মুখস্থ বিদায় নেয়, আবার নতুন এসে যায়। আমাদের সমীক্ষা বলছে, ২০২৩ সালে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ‘সৃজনশীল গণিত’ নামে নতুন পাঠ্যবই পড়ে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই ২০২৪ সালে সেটি বদলে গিয়ে ‘বাস্তবভিত্তিক গণিত’ হয়েছে। ফলে ওই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শূন্যস্থান পরিমাপ করতে গিয়ে দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘সেটতত্ত্ব ও ফাংশন’ বুঝতে ব্যর্থ, যা আগের দুই বছরে বোঝার কথা ছিল। অপরদিকে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঘন ঘন সিলেবাস বদলে যাওয়ার কারণে গ্রামীণ এলাকায় ঝরে পড়ার হার ২০২৩-২৪ সালে বেড়েছে ১১.৪ শতাংশ, যেখানে গত দশকে গড় ছিল ৫.২ শতাংশ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মা-বাবা যেখানে ইংরেজি ও গণিতের পুরনো গাইড কিনে দিতে পারেন, সেখানে নতুন বইয়ের যুক্তি বুঝতে না পেরে অভিভাবকরাই পড়া ছেড়ে দিতে বলেন—এ এক নীরব আত্মহত্যার দৃশ্য।
  • তৃতীয় বিপর্যয়:শিক্ষক প্রশিক্ষণের কালো গহ্বর: বারবার কারিকুলাম পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক চরিত্র। জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২০২৪ সালের মধ্যে সরকারি নির্দেশনায় শুধু মাধ্যমিক স্তরের ৪ লাখ ২৫ হাজার শিক্ষককে নতুন কারিকুলামের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার। বাকিরা ক্লাসে গিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে নতুন বই বুঝানোর চেষ্টা করেন, যা কার্যত একটি ‘চলমান কালি দাগ’ মাত্র। অথচ একজন প্রখ্যাত পাশ্চাত্য শিক্ষাবিদ বলেছিলেন, “যেকোনো শিক্ষাক্রম সংস্কার কেবল তখনই সফল হয়, যখন শিক্ষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেটির মালিক হন।” আমাদের দেশে সরকার বদলালেই শিক্ষকেরা বোর্ডের নির্দেশনা ছাড়াই নিজের ঝুঁকিতে পুরনো সিলেবাসে পড়ান, কারণ নতুন বই ধরা আছে অফিসের কাগজের পাহাড়ে। ২০২৪ সালের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ শিক্ষক চান ‘অন্তত ছয় বছরের জন্য একটি কারিকুলাম স্থির থাকুক’।
  • চতুর্থ বিপর্যয়জেনারেশন বিভেদের কালো অধ্যায়: বারবার বদলানো কারিকুলাম কেবল অর্থনীতি ও শিখন প্রক্রিয়াকেই নষ্ট করে না, এটি এক বিশাল সামাজিক দেওয়াল গড়ে তোলে—যেখানে বাবা-মা সন্তানকে সাহায্য করতে পারেন না, দাদা-দাদি নাতি-নাতনির বই পড়ে বিস্মিত হন। সাইকোলজি অ্যান্ড সোসাইটি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষাক্রমের লাগামহীন পরিবর্তন ‘পরিবর্তনের সঙ্কট’-এ পরিণত হয়, যা পরবর্তী প্রজন্মকে ‘ইতিহাসহীন যাযাবর’ বানায়। তারা জানে না আগের প্রজন্ম কী শিখেছে, ফলে জাতীয় মূল্যবোধের ধারক-বাহক তৈরি হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালের কারিকুলামে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’ শিরোনামে সম্পূর্ণ অধ্যায় ছিল; ২০২১ সেটাকে সংকুচিত করে ‘নৈতিক শিক্ষা’র অংশ করে ফেলে; ২০২৪-এ আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে আলাদা বই হিসেবে। এই দোলাচলে এক প্রজন্ম পুরো অধ্যায় না পড়েই মাধ্যমিক শেষ করেছে। কী হবে তাদের কাছে ‘চেতনা’র সংজ্ঞা? এটি দ্রুত পরিবর্তনের কুফল—যার চিহ্ন হবে একটি বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম, যারা একই দেশে বেড়েও বিভিন্ন ইতিহাসের মানুষ।
  • পঞ্চম বিপর্যয়কাঠামোগত দুর্বলতা ও তত্ত্বহীন নকশা: বিদেশি ও দেশি গবেষণায় সুস্পষ্ট—ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘তাত্ত্বিক ও দার্শনিক শূন্যতা’। কানাডার এডুকেশনাল চেঞ্জ থিওরিস্ট মাইকেল ফুলান সতর্ক করে বলেছেন, “শিক্ষাব্যবস্থায় দ্রুত ও অগভীর সংস্কার শুধু ক্ষতি ডেকে আনে, এটি উন্নয়ন নয়, বরং একধরনের ‘সংস্কারের নেশা’।” আমাদের দেশে প্রতি দুই বছরে একবার করে ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়ন হয়, অথচ এর অধীনে ‘শিখনফল’ নির্ণয়ে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১০-২০২৪ সালের মধ্যে গৃহীত শিক্ষাক্রম সংক্রান্ত আটটি প্রকল্পের ছয়টির মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়নি। একটিও প্রকল্প শেষ করার আগেই নতুন সংস্করণ শুরু হয়েছে। ফলে কোনো সংস্কারের স্থায়ী ফল মূল্যায়নের সুযোগই আসেনি। আমরা ঘুরছি এক অলীক চক্রে—পাতা লেখা, ছাপানো, বিতরণ, আবার বাতিল। অথচ ফিনল্যান্ড একবার শিক্ষাক্রম সংস্কারে ১২ বছর সময় নেয়, আমাদের নেই সেই ধৈর্য।

বারো বছরের অপেক্ষা—ফল পেতে কেন দরকার ধৈর্যের গভীর বুনন?

‘দ্রুত সংস্কার’ যেন আজ আমাদের জাতীয় অভিমান—সরকার বদলাই, আর দৌড় লাগে নতুন কারিকুলাম বানানোর প্রতিযোগিতা। অথচ পৃথিবীর যেসব দেশ শিক্ষায় শীর্ষে, তারা জানে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রমের বীজ বপন থেকে ফল ঘরে তোলার যাত্রাপথ অন্তত এক দশকের। ফিনল্যান্ড যেমন ১২ বছর অপেক্ষা করে একটি সংস্কারের গভীরতা যাচাই করে, জাপান তেমনি ধৈর্যের বাঁধন বুনে ধারাবাহিকতার চাদর। আমাদের এখানে সেটা নেই—আমরা বীজ পোঁতার মাস চারেকের মাথায় কাস্তে চালাই, ফলে শিকড়ের বদলে উঠে ধুলো। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাতাত্ত্বিকেরা বারবার সতর্ক উচ্চারণ করেন: ‘কমপক্ষে ১২ বছর সময় নেয়া দরকার একটি কারিকুলামকে পরিপক্ব হতে’—কারণ তবেই মিলবে শিক্ষার আসল ফসল, মিলবে উপযুক্ত মূল্যায়ন ও প্রজন্মের মাঝে সেতু। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমাদের রাজনীতি, আমলা-তন্ত্র ও সমাজমননে কি সেই বিরল ধৈর্য আদৌ বিদ্যমান? না থাকলে আমরা কেবলই ক্ষতির পাহাড় চড়াব, কিন্তু শিক্ষার মাটির গভীরতা কখনো ছুঁতে পারব না। নিচের অংশে সেই ধৈর্যের যুক্তি, তথ্য ও উপমায় ধরা হলো বিস্তারিত নিম্নে তুলে ধরা হলো:

এক: ফসল কাটতে সময় লাগে, শিক্ষাও ফসলের মতো

গ্রামবাংলার প্রান্তিক কৃষক জানে—আউশ ধান রোপণের পর সেটি কাটতে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। তিনি জানেন, পোকা ধরলে, খরা লাগলে, বা সময়ের আগে কাস্তে চালালে ফল মিলবে না, বরং জমি অনুর্বর হয়ে যাবে। শিক্ষাক্রমও ঠিক তেমনই। এটি একটি জৈব প্রক্রিয়া—যেখানে বীজ হয় তাত্ত্বিক অবস্থান, চারা হয় পাঠ্যপুস্তক, আর ফসল হয় শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও মূল্যবোধ।

শিক্ষাবিদ জন ডিউই একশ বছর আগে সতর্ক করে গেছেন, “যেকোনো শিক্ষাক্রম সংস্কারকে একটি ‘গবেষণাগার’ হিসেবে গণ্য করতে হবে, যেখানে অন্তত একটি পূর্ণ প্রজন্মের শিখন-ফল পরীক্ষা করে দেখা জরুরি।” বিশ্বের স্থিতিশীল শিক্ষাব্যবস্থাগুলো এই ডিউইয়ের সতর্কবার্তাকে পাথেয় করেছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল কারিকুলাম ১৯৮৮ সালে চালুর পর প্রথম বড় সংশোধন আসে ২০০০ সালে—অর্থাৎ ১২ বছর পর। ফিনল্যান্ড ২০০৪ সালে শিক্ষাক্রম সংস্কার করে, তার পূর্ণ মূল্যায়ন শেষ করে ২০১৬ সালে—আবারও ১২ বছর। জাপান ২০০৮ সালে ‘যোগাযোগভিত্তিক শিক্ষা’ চালু করে, সেটির সফলতা নিরূপণ করতে ২০২০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে।

Read More: শিক্ষার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: পাঠ্যবই, পাঠক্রম নাকি রাজনীতি—কার হাতে গড়ছে আগামী প্রজন্ম? │“শিক্ষার সন্ধিক্ষণ—পাঠ্যবই থেকে জাতি গঠন” ধারাবাহিকের ভূমিকা পর্ব

দুই: কেন ১২ বছর? শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অমোঘ হিসাব

এই ১২ বছরের সংখ্যাটি আকস্মিক নয়; এটি জ্ঞানের গভীরতার জৈবিক ও সামাজিক সময়সীমার ওপর দাঁড়িয়ে। শিশুমনোবিদ জঁ পিয়াজে বলেছেন, একটি শিশু কংক্রিট অপারেশনাল স্টেজ (৭-১১ বছর) থেকে ফরমাল অপারেশনাল স্টেজে (১১-১৫ বছর) যেতে সময় নেয় প্রায় ৫-৭ বছর। অর্থাৎ একটি কারিকুলাম সম্পূর্ণ প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের পরিণত স্তর পেরোতে অন্তত ৭-১০ বছর প্রয়োজন। তার ওপর যুক্ত হয় শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরিপক্বতা, বইয়ের বাজার স্থিতিশীলতা, অভিভাবকের মানিয়ে নেওয়া ও সমাজের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে ১২ বছর আদর্শ সময়সীমা। অস্ট্রেলিয়ার ‘কারিকুলাম অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ২০১৯’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, “একটি কারিকুলাম বাস্তবায়নের পর প্রথম তিন বছর থাকে ‘বিশৃঙ্খলা’, পরের চার বছর ‘সামঞ্জস্যের’ এবং শেষ পাঁচ বছর ‘উৎকর্ষের’। মোট ১২ বছর না দিলে কখনোই প্রকৃত শিখনফল মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।”

আমাদের দেশের উদাহরণ দেখুন: ২০১২ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা বাস্তবায়িত হওয়ার মাত্র চার বছর পর ২০১৬ সালেই সংশোধনের আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে ২০২১ সালে এসে পুরো ফ্রেমওয়ার্ক পাল্টে যায়। ফলে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের কখনো ‘উৎকর্ষের’ ধাপে পৌঁছানোর সুযোগই হয়নি। অর্থাৎ আমরা ফসল কাটার আগেই জমি চষে ফেলি—এবার বীজহারা চাষি শুধু শূন্য হাতে ফিরে।

তিন: ধৈর্যের অভাব—আমাদের কালব্যাধি

বাংলাদেশের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও সমাজমননে ধৈর্য একটি দুর্লভ পণ্য। নির্বাচনী চক্র চার বছর বা পাঁচ বছর; যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সে চায় নিজের নামে একটি ‘নতুন শিক্ষাক্রম’ উপহার দিতে। এ একধরনের ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার চাদর’ মুড়িয়ে দেওয়া শিক্ষা, যেখানে জ্ঞানের স্থিতিশীলতা বলি যায় ক্ষমতার প্রতীকায়নের বেদিতে।

অথচ শিক্ষা কোনো দ্রুত ভোগ্যপণ্য নয়, এটি মদের মতো—যত পুরনো হয়, তত গভীর হয়।শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাঁর ‘শিক্ষার স্থাপত্য’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “যে জাতি ধৈর্য হারায়, তার শিক্ষা হয় ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ী শিক্ষা তৈরি করে অগভীর মানুষ, আর অগভীর মানুষের দেশ হয় অস্থির।”

তথ্য বলছে, ফিনল্যান্ড একটি শিক্ষাক্রম সংস্কারে ১২ বছর সময় নিলেও শিক্ষায় বিশ্বনেতা হতে পেরেছে। সিঙ্গাপুর ২০০০-২০১২ সালের মধ্যে মাত্র দুটি বড় সংস্কার করেছে, ফলে তাদের শিক্ষার্থীরা টাইমস বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে। আর আমরা প্রতিবার সংস্কার করেই ‘প্রথমবারের মতো আধুনিক শিক্ষাক্রম’ বানানোর ঘোষণা দিই—এ যেন সেই গল্প, যে পাত্র বারবার জল ভরলেও ফাটল বন্ধ হয় না।

চার: জাতীয় শিক্ষাক্রমে একটি ‘স্থবিরতা আইন’ চাই

আমাদের প্রয়োজন একটি আইন বা জাতীয় কম্প্যাক্ট—যাতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে, ‘কোনো শিক্ষাক্রম সংস্কার কার্যকরের পর অন্তত ১২ বছরের জন্য তা অপরিবর্তিত রাখা বাধ্যতামূলক।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগী কর্মকর্তারা বলবেন, “আমরা তো সময়মতো সংস্কার করতে চাই, জ্ঞান দ্রুত বদলায়।” কিন্তু পরস্পরবিরোধী সত্য হলো—বিশ্বের জ্ঞান দ্রুত বদলালেও মৌলিক চিন্তার কাঠামো, গণিতের যুক্তি, ভাষার ব্যাকরণ, ইতিহাসের মেরুদণ্ড অপরিবর্তিত। এই মেরুদণ্ডের ওপর ভর করেই নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করতে হয়, পুরো শরীর উল্টে দিতে হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘কমন কোর স্টেট স্ট্যান্ডার্ডস’ চালু হয় ২০১০ সালে; তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ২০২৫ সালেও তা কার্যকর—অর্থাৎ ১৫ বছর। তাহলে আমরা কেন পারব না?এ প্রসঙ্গে আইইআরের একজন শিক্ষাবিদ এক সাক্ষাৎকারে উপমা দিয়ে বলেছেন, “একটি গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শিকড় যেমন মাটির গভীরে যায়, তেমনি একটি স্থিতিশীল শিক্ষাক্রম সমাজের শিকড়কে গভীর করে। আমরা চাইলে প্রতিবছর চারা রোপণ করতে পারি, কিন্তু তাতে ফল মিলবে না, মিলবে শুধু বেড়ার খামখেয়ালি সবুজ।”

পাঁচ: ধৈর্য রাখলে কী পাই, না রাখলে কী হারাই

যদি আমরা একবার ১২ বছর অপেক্ষা করি—তাহলে আমরা পাব:

  • স্থিতিশীল পরীক্ষা পদ্ধতি, যাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ে স্বচ্ছন্দ।
  • শিক্ষকদের পেশাগত পরিপক্বতা, নতুন বই বুঝতে আর কেঁদে না পড়ে।
  • মূল্যায়নের বাস্তব তথ্য, কোন অধ্যায় কাজ করছে, কোনটি ব্যর্থ—তার ভিত্তিতে যুক্তিসংগত সংশোধন।
  • প্রজন্ম বিভেদ হ্রাস, ভাই-বোনরা একই ধারার শিক্ষায় বেড়ে উঠলে পরিবারিক দ্বন্দ্ব কমে।
  • অর্থনৈতিক সাশ্রয়, কোটি কোটি টাকার বই ছাপাই কমে যায়, প্রশিক্ষণ ব্যয় কমে।

আর যদি না রাখি—তাহলে আমরা প্রতিনিয়ত একই ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটি। ঘন ঘন অসুস্থ রোগী যে ডাক্তার বদলায়, তার অসুখ সারেনা; ঘন ঘন গৃহস্থ যে দালান ভাঙে, তার স্থায়ী ঘর হয় না। আমরাও স্বীকার করি বা না করি—বর্তমান প্রজন্মের অর্ধেক সময় কেটে যায় কারিকুলামের টানাপড়েনে, আর অর্ধেক কেটে যায় নতুনের ভয়ে।

আসল কথা: ধৈর্য, এই বীজতলা যেন শূন্য না হয়

জাপানের একটি প্রবাদ আছে—“ধৈর্য হলো বাঁশের মতো, যার প্রথম বছর কিছু দেখা যায় না, কিন্তু পঞ্চম বছরে এক রাতেই আকাশ ছোঁয়।” আমাদের শিক্ষাক্রম সেই বাঁশের চারা। বারবার খুঁড়ে বের করলে কখনোই মাটির নিচের শক্ত কাণ্ড বেরোয় না। আমাদের দরকার একবার চারা রোপণ করে অন্তত ১২ বছর জল দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, মাটি আলগা রাখা—তবেই ফসলের সম্ভাবনা।

প্রশ্ন হলো, আমাদের রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষাবিদ, এমনকি সাধারণ অভিভাবক—সবার ভেতর কি সেই বিরল ধৈর্য আছে? নাকি আমরা আবারও তাড়াহুড়ো করে ‘নতুন বই’ উপহার দিয়ে ফিরে যাব রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের আতশবাজিতে?

উত্তর যদি ‘ধৈর্য নেই’ হয়, তাহলে সান্ত্বনা দেবে সেই প্রবাদ—“যে তাড়াতাড়ি ফল চায়, সে গাছটাই জানে না।” আমরা যদি গাছটাই না জানি, তাহলে শিক্ষার ফল কী করে পাব? অপেক্ষা করুক এই প্রতিবেদন—আগামী ১২ বছর পরে ফিরে এসে দেখুক, কোন সরকার কতবার কারিকুলাম বদলেছে। ততদিনে এ প্রজন্মের একটি সন্তান হয়তো নিজেই শিক্ষামন্ত্রী হবে; সেইদিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেব—তোমার শৈশব কেটেছে ল্যাটিন স্কোয়ারের দোলাচলে। তুমি কি সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করবে? তাই, এখন না থামলে, কখন থামবে?

শেষ সতর্কবার্তাযেখানে ক্ষতি রাজনীতির সীমানা ছাড়ায়

অতএব এত ক্ষয়ক্ষতি, এত ঝুঁকি—শুধু কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্যে পাওয়া যায়? এই অদৃশ্য অপব্যবস্থার শিকড় এখন সমাজের নালা-নর্দমা ছাড়িয়ে মগজে গেঁথে গেছে। যখন শিক্ষার্থী বলবে, “আমার বাবার আমলের বই আলাদা, আমার আমলের বই আলাদা, আমার ছোট ভাইয়ের আমলের আরেক রকম”—তখন সেই শিক্ষার্থী কোনো স্থায়ী শিক্ষার গভীরে পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু অস্থিরতার উৎপাতে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেমন বলা হয়, বারবার একই জায়গায় অপারেশন করলে সেখানে কলাই দাগ পড়ে, সেভাবে শিক্ষাক্রমের বারবার ‘অপারেশন’ আমাদের জাতীয় মস্তিষ্কে ফেলে যাচ্ছে গভীর দাগ। এখন প্রয়োজন, সংবিধানের মতো একটি ‘স্থায়ী পাঠ্যসূচি কম্প্যাক্ট’—যা কোনো সরকারের রং ধারণ করবে না, শুধু ধারণ করবে শিশুর শিখনের স্বার্থ। তা না হলে আগামী প্রজন্ম ঘৃণা করবে ইতিহাসকে, সন্দেহ করবে প্রতিটি পাঠ্যপুস্তককে, এবং শেষ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলবে ‘জ্ঞান’ বলতে আমরা কী বুঝি—সেই প্রাথমিক বিশ্বাসটুকুও।

দরকার স্পষ্ট তাত্ত্বিক অবস্থান: ‘শিক্ষা’ কি ‘চলতি খবর’ নাকি ‘বটবৃক্ষ’?

এমনিতেই শিক্ষার মূল দর্শন হওয়া চায় স্থির, কাঠামো হওয়া চায় গতিশীল। কিন্তু স্থির কোথায়? ইউনেস্কোর ‘শিক্ষা ২০৫০’ রিপোর্ট বলে—একটি জাতির মৌলিক শিক্ষাক্রম দরকার ‘আলাইনমেন্ট’ (alignment) অর্থাৎ দর্শন, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন। আমরা তাহলে কি শুধু ‘বিষয় বিন্যাস’ বদলাই, নাকি প্রকৃত ‘অধিগম্যতা’ তৈরি করি?

এক স্বনামধন্য শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, “পাঠ্যপুস্তক বদলানো মানে জোড়া লাগানো ঘড়ির কাটা বদলানো নয়, বরং ঘড়ির কলকবি বোঝা।” আজ সেই বোঝার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ‘যন্ত্রমানবের যুগ’ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অধ্যায় থাকলেও অধিকাংশ গ্রামীণ স্কুলে ইন্টারনেটের অভাবে তা অচল। ২০২১-এর শিক্ষাক্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘মূল্যবোধ শিক্ষা’—কিন্তু মূল্যবোধের সংজ্ঞাটাই বদলে যায়, যদি শিক্ষকরাই না জানেন কোন ‘আলাইনমেন্টে’ দাঁড়িয়ে পাঠ দেবেন।

শিক্ষাবিদদের সতর্ক যাত্রা: শামনা রেখে নিরাময়

চিকিৎসক যেমন রোগ বোঝার পর অপারেশনের ছুরি চালান, শিক্ষাবিদকেও তেমন ‘থিওরি অব এডুকেশনাল চেঞ্জ’ মাথায় রেখে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে হার্ভার্ডের শিক্ষাবিদ রিচার্ড এলমোরের ‘জোন অব প্রিজারভেশন অ্যান্ড ইনোভেশন’ মডেল কাজে দিতে পারে। অর্থাৎ এক হাতে আগের কারিকুলামের ভালো দিক সংরক্ষণ, অন্য হাতে ধীরে ধীরে নতুন প্রবর্তন।

আমাদের শিক্ষা কমিশন যদি সত্যিই ‘জেনারেশন গ্যাপ’ কমাতে চায়, তাহলে সমাজের মধ্যমণিতে বসিয়ে দিতে হবে তিন স্তম্ভের মঞ্চ:

  • ১) স্পষ্ট তাত্ত্বিক অবস্থান (উদার, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক);
  • ২) শিক্ষাগত আলাইনমেন্ট (শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরিকাঠামো একসূত্রে বাঁধা);
  • ৩) শিক্ষাবিদদের সতর্ক যাত্রা (রাজনৈতিক চাপমুক্ত, দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে বিশ্বাসী)।

শেষকথা: ওই অদ্ভুত অপব্যবস্থার শিকড় ছেঁড়ার ডাক

অর্ক এখন জানতে চায়, তার বাবার ‘সুখ’ কবিতাটা কেমন ছিল। হেমন্ত গুগল করে বের করে। দুই পুরুষের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একই লাইন—‘সুখ এতো বড়ো নয়, বিরাট নয়’—অর্ক হেসে বলে, “আমাদের বইয়ে ‘কৃতজ্ঞতা’ মানেই সুখ, বাবা।” বাপ-ছেলে দুজনেই থমকে যায়। তারপর হেসে ওঠে।

এই হাসি টিকিয়ে রাখতে চাই এক জাতীয় জ্ঞানতৃতীয়া, যেখানে পাঠ্যপুস্তক হবে দাঁড়—স্রোত বদলালেও ভাসবে না, বরং শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখাবে। যেখানে সরকার বদল এলেও পাঠ্যপুস্তকের মূল দর্শন বদলাবে না—তাতে থাকবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও বিজ্ঞানের প্রগতি। দরকার শুধু এ উপলব্ধি—শিক্ষা কোনো নির্বাচনী ইস্তেহারের অস্ত্র নয়; এটি জাতির আয়না। আয়নায় যদি প্রতিবার নতুন ছবি আঁকি, তবে প্রতিবিম্ব কখনো চেনা যায় না। তাই আর নয় শুধু বই বদল; এবার চলুন, শিকড়ের রক্তনালি বোঝার পালা। শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষক—সবাই মিলে গড়ি এক ‘পাঠ্যসূচি চুক্তি’, যাতে এ অদ্ভুত অপব্যবস্থা ফিরে না পায় আর কখনো অজান্তে আমাদের সমাজের গভীরে।

–অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#ঘূর্ণাবর্তে_পাঠ্যপুস্তক #শিক্ষাক্রম_সংস্কার #কারিকুলাম_সংকট #বাংলাদেশের_শিক্ষা #জেনারেশন_গ্যাপ #পাঠ্যপুস্তক_পরিবর্তন #শিক্ষানীতি #শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষা_ও_সমাজ #পাঠ্যসূচি_চুক্তি #শিক্ষার_স্থিতিশীলতা #শিক্ষা_দর্শন #EducationPolicy #CurriculumReform #GenerationGap #EducationalStability #LearningCrisis #TextbookPolitics #EducationResearch #PolicyAnalysis #BangladeshEducation #EducationalChange #KnowledgeSociety #FutureGeneration #Odhikarpatra #দেশচিন্তা #শিক্ষা_বিশ্লেষণ #জাতীয়_শিক্ষাক্রম #CurriculumDebate

Keywords:
শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, জাতীয় শিক্ষাক্রম, বাংলাদেশ শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠ্যপুস্তক সংস্কার, শিক্ষা নীতি, কারিকুলাম পরিবর্তনের প্রভাব, জেনারেশন গ্যাপ, শিক্ষা গবেষণা, শিক্ষার স্থিতিশীলতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি, শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষাদর্শন, Education Reform Bangladesh, Curriculum Change Bangladesh, Textbook Policy, Educational Development, Learning Outcomes, Education Governance, Knowledge Economy.



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: