odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 8th September 2026, ৮th September ২০২৬
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এ ফিরে দেখা—সাক্ষরতার নামে ৩৫ বছর ধরে প্রকল্প: কোটি মানুষ ‘লক্ষ্যমাত্রা’, হাজার কোটি টাকা ব্যয়—ফল কোথায়?

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এ ফিরে দেখা—স্বাধীনতার পরে ৫৫ বছরেও শতভাগ সাক্ষরতা অর্জিত না হওয়ার ব্যবচ্ছেদ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৮ September ২০২৬ ১৮:৩১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৮ September ২০২৬ ১৮:৩১

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার | দেশ চিন্তা

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও শতভাগ সাক্ষরতা নয়: প্রকল্পের পর প্রকল্প, হাজার কোটি টাকা—তবু নিরক্ষরতার দায় কার?
আজকের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ এ  দেশের মতভাগ সাক্ষরতা নিয়ে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে মনে দোল খায়: কাগজে অগ্রগতি, মাঠে অপূর্ণতা—বাংলাদেশ কেন এখনো শতভাগ সাক্ষর নয়? —স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সাক্ষরতায় বড় অগ্রগতি করেছে—এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও দেশের প্রতিটি নাগরিক পড়তে, লিখতে ও দৈনন্দিন জীবনে সংখ্যা ব্যবহার করতে সক্ষম নন। ১৯৯০-এর দশক থেকে একের পর এক বিশাল প্রকল্প, পুনরাবৃত্ত কর্মসূচি, প্রশাসনিক কাঠামো বদল এবং বিপুল সরকারি ও উন্নয়ন-সহযোগীর অর্থ ব্যয়ের পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে—আমরা কি মানুষকে টেকসইভাবে সাক্ষর করেছি, নাকি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষরতাও ফাইলবন্দী হয়ে গেছে?

একটি নাম লিখতে পারাই কি সাক্ষরতা?

ধরা যাক, বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের ষাটোর্ধ্ব একজন নারী। স্থানীয় একটি সাক্ষরতা কেন্দ্রে কয়েক মাস পড়েছিলেন। নিজের নাম লিখতে পারেন। কয়েকটি শব্দ চিনতে পারেন। কিন্তু ওষুধের গায়ে লেখা নির্দেশনা বুঝতে পারেন না। ব্যাংকের ফরম পূরণ করতে পারেন না। মোবাইলে আসা প্রতারণামূলক বার্তা আর সরকারি সেবার এসএমএসের পার্থক্য ধরতে পারেন না।

রাষ্ট্রের কোনো পুরোনো প্রকল্পের খাতায় হয়তো তিনি একসময় ছিলেন—সাক্ষর করা হয়েছে এমন একজন সুবিধাভোগী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কি সত্যিই সাক্ষর?

আরেকটি দৃশ্য কল্পনা করা যাক। কোনো উপজেলার পুরোনো একটি প্রকল্প ফাইলে লেখা আছে—কেন্দ্র খোলা হয়েছে, প্রশিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, বই বিতরণ হয়েছে, লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রকল্প শেষ। সমাপনী প্রতিবেদন হয়েছে। কিন্তু পাঁচ বছর পর সেই শিক্ষার্থীদের কতজন নিয়মিত পড়েন? কতজন হিসাব করতে পারেন? কতজন সরকারি ফরম বুঝতে পারেন? কতজন ডিজিটাল তথ্য যাচাই করতে পারেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বাংলাদেশের সাক্ষরতা-নীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গা।

আজ ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। UNESCO এ বছর দিবসটির ৬০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করছে “Literacy for people, the planet and prosperity” প্রতিপাদ্যে। ১৯৬৬ সালে দিবসটির সূচনা হয়েছিল; ২০২৬ সালের বৈশ্বিক আয়োজন ৮–৯ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য দিনটি তাই শুধু শুভেচ্ছা, র‍্যালি বা আলোচনা সভার উপলক্ষ নয়। এটি হওয়া উচিত ৫৫ বছরের রাষ্ট্রীয় হিসাব মেলানোর দিন।

প্রেক্ষাপট: অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু গন্তব্য এখনো দূরে

বাংলাদেশের সাক্ষরতার ইতিহাস নিঃসন্দেহে অগ্রগতির ইতিহাসও। ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় আজ অনেক বেশি মানুষ পড়তে ও লিখতে পারেন। বিদ্যালয়ের বিস্তার, নারীশিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ, উপবৃত্তি, সামাজিক সচেতনতা এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার নানা উদ্যোগ এই অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু “অগ্রগতি হয়েছে” আর “লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে”—দুটি এক কথা নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারিতে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ছিল ৭৪.৬৬ শতাংশ; পুরুষের হার ৭৬.৫৬ এবং নারীর ৭২.৮২ শতাংশ। পরে BBS-এর Sample Vital Statistics-এর তথ্য অনুযায়ী ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ, আর ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৫.৬ শতাংশ বলা হয়েছে। অন্যদিকে UNESCO Institute for Statistics-ভিত্তিক World Bank ডেটায় বাংলাদেশের ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ২০২২ সালে প্রায় ৭৯ শতাংশ।

সংখ্যাগুলো এক নয়—কারণ বয়সসীমা, জরিপপদ্ধতি এবং সাক্ষরতার সংজ্ঞাও এক নয়। কিন্তু সব উৎসের একটি যৌথ বার্তা স্পষ্ট:বাংলাদেশ এখনো শতভাগ সাক্ষরতার দেশ নয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।

প্রকল্পের ইতিহাস: নাম পাল্টেছে, কাঠামো পাল্টেছেসমস্যা কি পাল্টেছে?

বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ও উপানুষ্ঠানিক সাক্ষরতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নতুন নয়। বরং কয়েক দশক ধরে একটির পর একটি বড় প্রকল্প হয়েছে।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর নিজস্ব হালনাগাদ তালিকায় দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পর সমন্বিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম (INFEP), উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প-১, ২, ৩ ও ৪, Total Literacy Movement বা TLM, সাক্ষরতা-উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষা, মৌলিক সাক্ষরতা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রকল্পসহ বহু কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলোর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বিশাল। উদাহরণ হিসেবে, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প-২-এ লক্ষ্য ছিল ৮১.৭৯ লাখ মানুষ; সরকারি নথিতে অর্জন দেখানো হয়েছে ৩৬.১৮ লাখ। আর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প-৪ বা TLM-এর লক্ষ্য ছিল ২২৮.৮৯ লাখ মানুষ, অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়েছে ৯২.২৫ লাখ। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে বহু ক্ষেত্রে বড় ফারাক ছিল। এখানেই প্রথম বড় প্রশ্ন: আমরা কি প্রকল্পের ব্যয়, কেন্দ্রের সংখ্যা ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মেপেছি বেশি—আর শেখার স্থায়িত্ব মেপেছি কম?

সর্বাত্মক সাক্ষরতা আন্দোলন’: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল বিশাল

১৯৯০-এর দশকে Total Literacy Movement বা TLM একসময় বাংলাদেশের সাক্ষরতা অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হয়ে ওঠে। সরকারের Education for All পরিকল্পনা-সংক্রান্ত দলিলে TLM-এর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৬,৮২৯.৯৬ মিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৬৮৩ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল ২ কোটি ২৮ লাখের বেশি মানুষকে আওতায় আনা। কিন্তু ২০০১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩৮.৩ শতাংশের মতো মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল বলে ওই নথিতে উল্লেখ আছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর বর্তমান প্রকল্পতালিকায়ও TLM-এর লক্ষ্যমাত্রা ২২৮.৮৯ লাখ এবং অর্জন ৯২.২৫ লাখ দেখানো হয়েছে। কাজেই প্রকল্পটির গল্প শুধু অর্থ ব্যয়ের নয়। এটি রাষ্ট্রীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তব সক্ষমতার গল্প।

৩৫ বছরের সাক্ষরতা প্রকল্প: টাকা, লক্ষ্য বাস্তবতা: একটি ইনফোগ্রাফিক বিশ্লেষণ

নিচে দেশে গৃহীত ও ব্যয়িত অর্থের একটি vertical timeline তুলে ধরা হলো:

চিত্রের ক্যাপশন: প্রকল্প হয়েছে বহু, টাকা ব্যয় হয়েছে বিপুল, কিন্তু শতভাগ সাক্ষরতা এখনো হয়নি। ১৯৯১ থেকে ২০২৬—বাংলাদেশের সাক্ষরতা প্রকল্পের ৩৫ বছরের হিসাব এক ছবিতে। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি মানুষকে সাক্ষর করেছি, নাকি শুধু প্রকল্প সম্পন্ন করেছি?

উপরের ইনফোগ্রাফিকটি বাংলাদেশের সাক্ষরতা অর্জনের দীর্ঘ ইতিহাসকে একটি সরল কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্নে নামিয়ে এনেছে—৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্প, বাজেট, লক্ষ্যমাত্রা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ চলার পরও শতভাগ সাক্ষরতা কেন অর্জিত হলো না?

চিত্রের প্রথম শক্তিশালী দিক হলো অগ্রগতি বনাম অপূর্ণতার বৈপরীত্য। সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%, ৭৭.৯% কিংবা ৭৫.৬%—যে সূচকই ধরা হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার: বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু এখনো এমন একটি অবস্থায় পৌঁছায়নি যেখানে প্রত্যেক নাগরিক কার্যকরভাবে পড়তে, লিখতে, হিসাব করতে এবং দৈনন্দিন জীবনে সেই দক্ষতা ব্যবহার করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, সময়রেখাটি দেখায় যে সাক্ষরতা নিয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিক। INFEP থেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প, TLM, Basic Literacy Project এবং সর্বশেষ Adult Literacy & Functional Skill Up Program—নাম ও কাঠামো বদলেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সমস্যা রয়ে গেছে। বিশেষ করে কয়েকটি প্রকল্পে লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব অর্জনের বড় ফারাক প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, উপকারভোগী ধরে রাখা এবং পরবর্তী মূল্যায়নের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

তৃতীয়ত, ইনফোগ্রাফিকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা দেয়: সাক্ষরতা শুধু প্রকল্পভিত্তিক “কোর্স সম্পন্ন” করার বিষয় নয়। প্রকল্প শেষে অর্জিত দক্ষতা টেকসই না হলে এবং মানুষ যদি বাস্তব জীবনে পড়া, লেখা, গণনা, ডিজিটাল সেবা ও নাগরিক তথ্য ব্যবহারে সক্ষম না হন, তাহলে পরিসংখ্যানের সাক্ষরতা বাস্তব সক্ষমতায় রূপ নেয় না।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্নটি হলো—আমরা কি প্রকল্পের আউটপুট বেশি মেপেছি, কিন্তু শেখার স্থায়িত্ব কম মেপেছি? কতটি কেন্দ্র খোলা হলো, কতজন অংশ নিলেন, কত টাকা ব্যয় হলো—এসব তথ্য তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু পাঁচ বছর পরও কতজন বাস্তবে পড়তে পারেন, লিখতে পারেন, নিজের অধিকার বুঝতে পারেন বা ডিজিটাল প্রতারণা শনাক্ত করতে পারেন—এই প্রশ্নের উত্তরই প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড হওয়া উচিত।

ইনফোগ্রাফিকের শেষ সারির চারটি বার্তা তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ: প্রকল্প হয়েছে বহু, শতভাগ সাক্ষরতা এখনো অধরা; লক্ষ্য ও অর্জনে ফারাক আছে; পোস্ট-লিটারেসি ও জীবনদক্ষতা জরুরি; এবং প্রকল্পের বদলে একটি স্থায়ী lifelong learning system প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, এই ভিজ্যুয়ালটি শুধু অতীতের হিসাব নয়; এটি ২০২৬ সালের জন্য একটি নীতিগত সতর্কবার্তা। নতুন প্রকল্প শুরু করার আগে পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর value-for-money, learning retention, কার্যকর সাক্ষরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন জরুরি।

আসলে ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে একের পর এক সাক্ষরতা প্রকল্প, শত কোটি টাকার বরাদ্দ এবং কোটি মানুষের লক্ষ্যমাত্রা—তবু বাংলাদেশে শতভাগ সাক্ষরতা এখনো অধরা। ইনফোগ্রাফিকটি দেখাচ্ছে ১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রধান সাক্ষরতা প্রকল্পের সময়রেখা, লক্ষ্য, অর্জন ও ব্যয়ের চিত্র। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এ বড় প্রশ্ন—প্রকল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু টেকসই সাক্ষরতা কতটা তৈরি হয়েছে?

যখন প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতি সাইনবোর্ড এনজিও অভিযোগ উঠেছিল

বাংলাদেশের সাক্ষরতা প্রকল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি TLM ঘিরে। ২০০৩–০৪ সালের সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, মানহীন বাস্তবায়ন এবং তথাকথিত “সাইনবোর্ড” বা কার্যত অকার্যকর এনজিওর মাধ্যমে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত Directorate of Non-Formal Education বিলুপ্ত করেছিল। অবশ্য অভিযোগ আর বিচারিকভাবে প্রমাণিত অপরাধ এক জিনিস নয়। তাই ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে দায়িত্বশীল ভাষা জরুরি। কিন্তু একটি নীতিগত প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই: একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে কি সুশাসনের সংকট শেষ হয়, নাকি একই দুর্বলতা নতুন প্রতিষ্ঠান ও নতুন প্রকল্পে ফিরে আসতে পারে?

কয়েক দশকে প্রায় হাজার কোটি টাকা: এই সংখ্যার অর্থ কী?

২০২৫ সালে The Daily Star-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নের তথ্য সমন্বয় করে বলা হয়, ১৯৯১ সালের পর সাক্ষরতা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুধু কয়েকটি পুরোনো প্রকল্পেই BNFE-সংশ্লিষ্ট ব্যয় প্রায় ২,৯১২ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে। এই সংখ্যাটিকে sensational headline বানানো সহজ। কিন্তু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায় আরেকটি কথা বলতে হবে—এই পুরো অর্থ “অপচয়” হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যাবে না। 

এই প্রকল্পগুলো লাখ লাখ মানুষকে কোনো না কোনো ধরনের শিক্ষা, সাক্ষরতা, দক্ষতা বা দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। অনেক উদ্যোগ ফলও দিয়েছে। প্রকৃত অনুসন্ধানের প্রশ্ন অন্য জায়গায়: প্রতি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কতজন মানুষ টেকসইভাবে কার্যকর সাক্ষরতা অর্জন করেছেন? —সেই হিসাব কোথায়?

একটি বড় পার্থক্য: ‘প্রকল্পে অংশ নেওয়াআরসাক্ষর হওয়াএক নয়

বাংলাদেশে অনেক প্রকল্পে “অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা” বলতে কোর্সে অন্তর্ভুক্ত হওয়া, কোর্স শেষ করা কিংবা নির্দিষ্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সাক্ষরতার ধারণা আরও বিস্তৃত। কেউ যদি ছয় বা নয় মাসের কোর্স শেষে নিজের নাম লিখতে পারেন, কিন্তু দুই বছর পর পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেন—তাহলে তাঁকে দীর্ঘমেয়াদে সাক্ষর বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

কেউ যদি বাংলা বাক্য পড়তে পারেন, কিন্তু জমির দলিল, ব্যাংক নোটিশ, হাসপাতালের নির্দেশনা বা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিধি বুঝতে না পারেন, তবে তাঁর সাক্ষরতা কতটা কার্যকর?

আর ডিজিটাল যুগে প্রশ্ন আরও কঠিন। মানুষকে এখন শুধু লেখা পড়লেই হয় না; তাকে তথ্য খুঁজতে হয়, যাচাই করতে হয়, ডিজিটাল ফরম পূরণ করতে হয়, মোবাইল ব্যাংকিং বুঝতে হয়, প্রতারণা শনাক্ত করতে হয়। সাক্ষরতার ধারণা তাই বদলে গেছে। —আমাদের প্রকল্প কি বদলেছে সেই গতিতে?

৪৫ লাখ মানুষকে সাক্ষর করার প্রকল্প

২০১৪ সালে সরকার Basic Literacy Project (64 Districts) অনুমোদন করে। লক্ষ্য ছিল ১৫–৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতা ও জীবনদক্ষতা দেওয়া। অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৪৫৩ কোটি টাকা। শুনতে বিশাল, কিন্তু তখনই একটি বড় বৈপরীত্য ছিল। ওই সময় ১৫–৪৫ বছর বয়সী নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি বলে সরকারি প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ প্রকল্প সফল হলেও পুরো সমস্যার একটি অংশকেই ধরতে পারত। এই পদ্ধতিই বাংলাদেশের সাক্ষরতা নীতির দীর্ঘদিনের এক রোগকে সামনে আনে—সমস্যা জাতীয়; সমাধান প্রকল্পভিত্তিক।

প্রকল্প শেষ, তারপর কী?

সাক্ষরতা এমন একটি দক্ষতা যা ব্যবহার না করলে ক্ষয় হয়। একজন সদ্য সাক্ষর মানুষকে যদি বই না দেওয়া হয়, সংবাদপত্র না পড়ে, স্থানীয় পাঠাগার না থাকে, কর্মক্ষেত্রে লেখাপড়ার প্রয়োজন না হয়, সরকারি সেবায় লিখিত তথ্য ব্যবহার না করেন—তাহলে তাঁর অর্জিত দক্ষতা দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। —এই কারণেই “post-literacy” ও continuing education অপরিহার্য।

বাংলাদেশ এ প্রয়োজন উপলব্ধিও করেছিল। সাক্ষরতা-উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প চালু হয়েছিল। সরকারি প্রকল্পতথ্যে একটি কর্মসূচিতে ১৩.৬০ লাখের লক্ষ্য থাকলেও অর্জন ছিল ৯.৭০ লাখ। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—learning ecosystem গড়ে ওঠেনি। আসলে, আমরা কেন্দ্র খুলেছি। কোর্স চালিয়েছি। প্রকল্প শেষ করেছি। কিন্তু গ্রামের একজন নবসাক্ষর মানুষকে সারাজীবন পড়া, লেখা, হিসাব ও ডিজিটাল দক্ষতা ব্যবহারের পরিবেশ কতটা তৈরি করেছি?

মানবিক গল্প: কাগজেসাক্ষর, জীবনে নির্ভরশীল

একজন দিনমজুর ভাবুন, যিনি বাজার থেকে সার কেনেন। প্যাকেটের মাত্রা বুঝতে অন্যের সাহায্য চান। একজন নারী ভাবুন, যিনি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করেন কিন্তু স্ক্রিনে আসা নির্দেশনা পুরোপুরি পড়তে পারেন না। একজন শ্রমিক ভাবুন, যিনি নিয়োগপত্রে কী লেখা আছে বুঝতে পারেন না। একজন অভিভাবক ভাবুন, যিনি সন্তানের স্কুল থেকে দেওয়া লিখিত নোটিশ পড়তে পারেন না। নিরক্ষরতার অর্থ শুধু বই পড়তে না পারা নয়। এর অর্থ হচ্ছে অন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়া। কখনো অর্থনৈতিক লেনদেনে। কখনো স্বাস্থ্যসেবায়। কখনো আইনি অধিকারে। কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তায়। এই কারণেই সাক্ষরতা কোনো “শিক্ষা প্রকল্পের বিষয়” নয়। এটি নাগরিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি।

ভালো উদাহরণও আছে: সাক্ষরতা যখন জীবনের সঙ্গে যুক্ত

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিকও আছে। UNESCO Institute for Lifelong Learning-এর নথিভুক্ত Friendship Adult Literacy Programme-এ চরাঞ্চলের ১৬–৪৫ বছর বয়সী মানুষদের প্রায় আট মাসে ৩৮৪ ঘণ্টার শিক্ষা দেওয়া হয়। পড়া-লেখা ও গণিতের সঙ্গে জীবনদক্ষতা এবং আয়মুখী কার্যক্রমের যোগসূত্র রাখা হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ নারী। Friendship-এর শিক্ষা কর্মসূচি ২০২৩ সালে UNESCO Confucius Prize for Literacy-ও পেয়েছিল। এর শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ: সাক্ষরতা টেকে তখনই, যখন তা জীবনের কাজে লাগে।

তথ্যকে সহজ করে দেখলে কী দাঁড়ায়?

সাক্ষরতার শতকরা হার নিয়ে অনেক সময় আমরা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ি। ধরুন, ৭৭.৯ শতাংশ মানুষ সাক্ষর। প্রথম শুনলে এটি বড় অর্জন। কিন্তু উল্টো করে পড়লে অর্থ দাঁড়ায়—প্রতি ১০০ জনে প্রায় ২২ জন এখনো ওই সংজ্ঞায় সাক্ষর নন। —১৫ বছর ও তদূর্ধ্বদের ক্ষেত্রে BBS-এর ৭৫.৬ শতাংশ হার ধরলে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন সাক্ষরতার বাইরে বা সীমার নিচে রয়ে যাচ্ছেন।  একটি ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য এই অনুপাত সংখ্যায় পরিণত হলে তা ছোট সমস্যা থাকে না। সাক্ষরতার শেষ ২০–২৫ শতাংশ অর্জনই সাধারণত সবচেয়ে কঠিন। কারণ এখানেই বেশি থাকে—দারিদ্র্য, দুর্গমতা, প্রতিবন্ধিতা, বিদ্যালয়ত্যাগ, শ্রমে যুক্ত শিশু-কিশোর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী, ভাষাগত সংখ্যালঘুতা এবং সামাজিক বঞ্চনার জটিল সমীকরণ।

তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: ব্যর্থতা কোথায়?

বাংলাদেশের সাক্ষরতা-অভিযানের ইতিহাসে প্রকল্পের অভাব ছিল না। বরং গত কয়েক দশকে একের পর এক প্রকল্প এসেছে, বাজেট এসেছে, কেন্দ্র খোলা হয়েছে, প্রশিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, বই ছাপা হয়েছে, এনজিও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এত আয়োজনের পরও শতভাগ সাক্ষরতা অর্জিত হয়নি। তাই এখন প্রশ্নটি শুধু “কত প্রকল্প হয়েছে?” নয়; বরং “কেন কাঙ্ক্ষিত ফল স্থায়ী হয়নি?”

. প্রকল্প আছে, কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা দুর্বল

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন সাক্ষরতাকে একটি development project বা উন্নয়ন প্রকল্পের দৃষ্টিতে দেখেছে। একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ পান, অস্থায়ী জনবল আসে, বাস্তবায়নকারী সংস্থা বা এনজিও যুক্ত হয়, শিক্ষাকেন্দ্র খোলে, বই ও উপকরণ বিতরণ হয়। কয়েক বছর পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়—সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যক্রমের গতি থেমে যায়।

এই মডেল অবকাঠামো নির্মাণে কার্যকর হতে পারে। একটি রাস্তা বা ভবন প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও থেকে যায়। কিন্তু মানুষের শেখার সক্ষমতা এমন নয়। সাক্ষরতা অর্জনের পর নিয়মিত চর্চা, পাঠের সুযোগ, জীবনদক্ষতা, কর্মসংস্থান ও continuing education না থাকলে অর্জিত দক্ষতা ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো—সাক্ষরতা কর্মসূচি হয়েছে, কিন্তু সাক্ষরতা ধরে রাখার স্থায়ী ecosystem তৈরি হয়নি।

. ইনপুটের হিসাব আছে, শেখার স্থায়িত্বের হিসাব কম

প্রকল্প মূল্যায়নে সাধারণত খুব সহজে পাওয়া যায়—কতটি কেন্দ্র খোলা হয়েছে, কতটি বই ছাপা হয়েছে, কতজন প্রশিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন, কতজন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন, কত টাকা ব্যয় হয়েছে।—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো output, চূড়ান্ত outcome নয়। আসলে প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত:

  • তিন বছর পরও কতজন সাবলীলভাবে পড়তে পারেন?
  • পাঁচ বছর পরও কতজন লিখতে হিসাব করতে পারেন?
  • কতজন ব্যাংক ফরম, ওষুধের নির্দেশনা, সরকারি নোটিশ বা ডিজিটাল তথ্য বুঝতে পারেন?
  • কতজন কর্মসংস্থান, আয় বা সামাজিক সেবায় সাক্ষরতার ব্যবহার করতে পারছেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে প্রয়োজন longitudinal tracking—অর্থাৎ একই শিক্ষার্থীকে কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করে দেখা। এই ব্যবস্থা দুর্বল হলে প্রকল্প শেষে “কতজনকে সাক্ষর করা হয়েছে” বলা যায়, কিন্তু কতজন সাক্ষর রয়ে গেছেনতা বলা যায় না।

. সাক্ষরতার সংখ্যাই এক নয়সংজ্ঞাতেও অসঙ্গতি

বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংখ্যা সামনে আসে। এর একটি কারণ হলো—সব প্রতিষ্ঠান একই বয়সসীমা বা একই পদ্ধতি ব্যবহার করে না। কোথাও ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠী বিবেচিত হয়। কোথাও ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব। কোথাও ব্যক্তি নিজেই জানান তিনি পড়তে-লিখতে পারেন কি না—অর্থাৎ self-reported literacy আবার কোথাও বাস্তব পড়া, লেখা ও গণিতের সক্ষমতা যাচাই করা হয়—অর্থাৎ competency-based assessment—এই পার্থক্যের কারণে একই দেশের সাক্ষরতার হার বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন হতে পারে। আর রাজনৈতিক বক্তব্যে সুবিধাজনক সংখ্যা বেছে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বাংলাদেশের তাই প্রয়োজন একটি National Literacy Measurement Framework—যেখানে বয়স, সাক্ষরতার সংজ্ঞা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং functional literacy-এর মানদণ্ড অভিন্ন হবে।

. পুরোনো নিরক্ষরতা কমানো হচ্ছে, কিন্তু নতুন নিরক্ষরতার উৎস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি

এটি বাংলাদেশের সাক্ষরতা-নীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। কেননা একদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাক্ষরতা প্রকল্প চলছে। আর অন্যদিকে প্রতি বছর কিছু শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, কেউ কখনো বিদ্যালয়েই প্রবেশ করছে না, আবার কেউ কয়েক বছর বিদ্যালয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় reading ও numeracy competency অর্জন করতে পারছে না।—এ যেন নৌকার একদিকে পানি সেচে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে ছিদ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।

শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করতে হলে দুটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে—বর্তমান নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর করা এবং নতুন করে নিরক্ষর জনগোষ্ঠী তৈরি হওয়া বন্ধ করা। তাই, প্রাথমিক শিক্ষা, বিদ্যালয়ত্যাগ রোধ, Second Chance Education এবং adult literacy-কে therefore একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

. সাক্ষরতার সঙ্গে জীবিকা বাস্তব জীবনের যোগ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়

একজন দরিদ্র প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দিনের শেষে দুই ঘণ্টা সাক্ষরতা কেন্দ্রে কেন যাবেন? —এই প্রশ্নটি খুবই বাস্তব।

তিনি যদি কয়েক মাস পড়ার পর দেখেন, সেই শিক্ষার সঙ্গে আয়, কাজ, কৃষি, স্বাস্থ্য, সরকারি সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, কর্মদক্ষতা বা চাকরির কোনো দৃশ্যমান যোগ নেই, তাহলে নিয়মিত শেখার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

সাক্ষরতা তখন টেকসই হয়, যখন মানুষ অনুভব করেনআমি যা শিখছি, তা আমার জীবন বদলাচ্ছে।আর এই কারণে literacy programme-কে আলাদা করে না দেখে livelihood, technical skills, digital literacy, financial literacy এবং health literacy-এর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক SKILFO pilot এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। প্রকল্পে ৬,৮২৫ বিদ্যালয়বহির্ভূত কিশোর-কিশোরীকে কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে সাক্ষরতা যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল এবং BNFE-এর তথ্যে ৬,৮০৫ জনকে কার্যক্রমের আওতায় আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আসলে এ ধরনের মডেলের শক্তি হলোসাক্ষরতা এখানে শুধু পড়ার দক্ষতা নয়; জীবনের কাজে লাগানোর দক্ষতা।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা: প্রকল্প থেকে নীতি-শিক্ষা নেওয়া হয়নি যথেষ্ট

একটি প্রকল্প শেষ হলে তার ফলাফল থেকে তিনটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া উচিত—) কী কাজ করেছে?; ) কী কাজ করেনি?; এবং ) পরবর্তী প্রকল্পে কী পরিবর্তন আনা হবে?

কিন্তু বাংলাদেশের সাক্ষরতা কর্মসূচির ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, নতুন নামে নতুন প্রকল্প এসেছে; অথচ পূর্ববর্তী প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল, cost-effectiveness এবং learner retention নিয়ে জনসমক্ষে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। ফলে প্রকল্প বদলেছে, কিন্তু সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে একই থেকেছে।

মূল অনুসন্ধানী সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের সাক্ষরতা অর্জনের ব্যর্থতাকে শুধু অর্থের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রকৃত সমস্যা আরও গভীরে। এটি মূলত— project dependency, দুর্বল institutional continuity, অসম্পূর্ণ learner tracking, fragmented data, dropout-এর ধারাবাহিকতা এবং literacy-এর সঙ্গে জীবন ও জীবিকার দুর্বল সংযোগের সম্মিলিত ফল। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু “কত টাকা ব্যয় হয়েছে” নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রতি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কতজন মানুষ সত্যিকার অর্থে টেকসই, কার্যকর ও জীবনোপযোগী সাক্ষরতা অর্জন করেছেন? —শতভাগ সাক্ষরতার ভবিষ্যৎ নীতি এই একটি প্রশ্নের উত্তর থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

আবার নতুন প্রকল্প: আমরা কি পুরোনো শিক্ষা নিয়েছি?

২০২৬ সালেও নতুন উদ্যোগ আসছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পতালিকায় Adult Literacy and Functional Skill Up Program—Pilot Phase নামে ২০২৬–২৭ মেয়াদের প্রায় ৪৯.২৫ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবিত প্রকল্প দেখা যাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ৪০ জেলার ৪০ উপজেলায় ২৫–৪৫ বছর বয়সী ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী; ভবিষ্যতে দেশব্যাপী ৪৫ লাখ মানুষকে লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নও প্রয়োজনীয়: ১৯৯০-এর দশক থেকে যে ভুলগুলো হয়েছে, সেগুলোর institutional learning কোথায়?

নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে কি প্রকাশ করা হবে (জানতে মন চায়):

  • আগের প্রকল্পে ব্যক্তি-পিছু প্রকৃত ব্যয় কত?
  • প্রশিক্ষণ শেষে competency কত ছিল?
  • দুই বছর পর retention কত?
  • কোন মডেল সবচেয়ে কার্যকর ছিল?
  • কোন মডেল ব্যর্থ হয়েছে এবং কেন?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়াই শুধু আরেকটি প্রকল্প শুরু হয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়’—দায় কার?

এখানে দায়ের প্রশ্নটি ব্যক্তি খোঁজার চেয়ে বড়। কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া দুর্নীতির দায় চাপানো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ নয়। বরং দায়ের কাঠামো দেখতে হবে। তাই দায় রয়েছে যদি দেখা যায়:

  • প্রকল্প ডিজাইন বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে;
  • লক্ষ্যমাত্রা রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত হয়;
  • তথ্য যাচাইযোগ্য না হয়;
  • স্বাধীন মূল্যায়ন না থাকে;
  • অকার্যকর প্রকল্পের শিক্ষা পরবর্তী প্রকল্পে ব্যবহার না হয়;
  • প্রকল্প শেষে শেখা ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকে; এবং
  • একই ধরনের ব্যর্থতা নতুন নামে পুনরাবৃত্ত হয়।

তখন দায় শুধু একজন প্রকল্প পরিচালকের নয়। এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক তদারকি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার সম্মিলিত দায়।

শতভাগ সাক্ষরতা বলতে কী বুঝব?

বাংলাদেশ যদি ২০৩০-এর দশকে সত্যিকার অর্থে শতভাগ সাক্ষরতার দিকে যেতে চায়, তাহলে “নাম লিখতে পারে কি না” দিয়ে আর সাক্ষরতা মাপা যথেষ্ট নয়। জাতীয় মানদণ্ডে অন্তত পাঁচটি সক্ষমতা থাকা দরকার:

  • পড়া — দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় লেখা বুঝে পড়তে পারা।
  • লেখা — নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থপূর্ণ বাক্য লিখতে পারা।
  • গণনা — দৈনন্দিন হিসাব করতে পারা।
  • কার্যকর সাক্ষরতা — স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সরকারি সেবা ও নাগরিক জীবনে দক্ষতা ব্যবহার করা।
  • ডিজিটাল সাক্ষরতা — ডিজিটাল তথ্য পড়া, যাচাই করা এবং নিরাপদে ব্যবহার করা।

কারণ ২০২৬ সালে একজন মানুষ কাগজের অক্ষর চিনলেও ডিজিটাল দুনিয়ায় সম্পূর্ণ অসহায় হতে পারেন।

নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা

বাংলাদেশের সাক্ষরতা-নীতি এখন আর “আরেকটি বড় প্রকল্প” দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। শুরু করতে হবে একটি জাতীয় শেখার নিশ্চয়তা ব্যবস্থা দিয়ে।

অবিলম্বে যা করা দরকার

  • প্রথমত, ১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বড় সাক্ষরতা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্পগুলোর স্বাধীন performance and value-for-money audit করতে হবে। কত টাকা ব্যয়, কতজন অংশগ্রহণকারী, কতজন প্রকৃত competency অর্জন করেছেন এবং দুই থেকে পাঁচ বছর পর কতজন তা ধরে রেখেছেন—এসব প্রকাশ করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, BBS, BNFE, DPE, BANBEIS এবং UNESCO/UIS-এর সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি অভিন্ন জাতীয় সাক্ষরতা পরিমাপ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
  • তৃতীয়ত, প্রত্যেক নতুন প্রকল্পের আগে পূর্ববর্তী প্রকল্পের lessons learned প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

মধ্যমেয়াদি কৌশল

  • প্রতি ইউনিয়ন বা স্থানীয় সরকারের অধীনে community learning centre বা lifelong learning hub গড়ে তোলা যেতে পারে। এগুলো শুধু তিন বা ছয় মাসের প্রকল্পকেন্দ্র হবে না; বছরজুড়ে পড়া, ডিজিটাল সেবা, কর্মদক্ষতা, নারীশিক্ষা এবং নাগরিক সহায়তার কেন্দ্র হবে।
  • প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতাকে TVET, কৃষি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
  • বিদ্যালয়ত্যাগ রোধকে adult literacy policy-এরই অংশ হিসেবে ধরতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার

  • সাক্ষরতা কার্যক্রমকে প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বের করে স্থায়ী lifelong learning system-এ রূপান্তর করতে হবে।
  • দুর্গম এলাকা, চর, হাওর, চা-বাগান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শহুরে বস্তির জনগোষ্ঠীর জন্য একই মডেল চাপিয়ে না দিয়ে targeted strategy নিতে হবে।
  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—“কতজনকে সাক্ষর করা হয়েছে” নয়, রাষ্ট্রীয় সাফল্যের সূচক হতে হবে কতজন টেকসইভাবে কার্যকর সাক্ষর রয়েছেন”।
  • এই গবেষণা ও প্রাপ্ত প্রমাণ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশের মূল সংকট শুধু সাক্ষরতা কর্মসূচির ঘাটতি নয়; বরং ধারাবাহিকতা, ফলাফল যাচাই, জবাবদিহিতা এবং অর্জিত সাক্ষরতা ধরে রাখার একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভাব।

শেষ কথা: আর কত প্রকল্পের পর সাক্ষর হবে বাংলাদেশ?

সাক্ষরতা কোনো পরিসংখ্যানের সারি নয়, কোনো প্রকল্পের সমাপনী প্রতিবেদনও নয়। সাক্ষরতা মানে একজন মানুষের নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। নিজের নাম লিখতে পারা তার শুরু; কিন্তু নিজের অধিকার পড়তে পারা, ওষুধের নির্দেশনা বুঝতে পারা, ব্যাংকের হিসাব মিলাতে পারা, সন্তানের স্কুলের নোটিশ বুঝতে পারা, ডিজিটাল প্রতারণা শনাক্ত করতে পারা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সচেতন নাগরিক হিসেবে যোগাযোগ করতে পারা—সাক্ষরতার প্রকৃত অর্থ সেখানে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু এই নয় যে, সাক্ষরতার হার কত শতাংশ। বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যে অসংখ্য প্রকল্প নিয়েছে, যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে “সাক্ষর” হিসেবে দেখিয়েছে, সেই অর্জন কতটা টেকসই হয়েছে? প্রকল্প শেষ হওয়ার পাঁচ বছর পর সেই মানুষগুলো কোথায়? তারা কি এখনো পড়তে পারে, লিখতে পারে, হিসাব করতে পারে, নাকি রাষ্ট্রের কাগজে তারা সাক্ষর—কিন্তু জীবনে আবারও নির্ভরশীল?

এখানেই জবাবদিহিতার প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ একটি প্রকল্প ব্যর্থ হলে শুধু টাকা নষ্ট হয় না; নষ্ট হয় সময়, আস্থা, সুযোগ এবং একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের হিসাব টাকায় করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শেখার সুযোগের মূল্য কোনো বাজেটের পাতায় ধরা যায় না।

বাংলাদেশের এখন আর নতুন স্লোগান দরকার নেই। দরকার নতুন রাষ্ট্রীয় মনোভাব। সাক্ষরতাকে প্রকল্প নয়, স্থায়ী জনঅধিকার হিসেবে দেখতে হবে। “কতজনকে কোর্সে আনা হলো” থেকে নজর সরিয়ে “কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল, ব্যবহার করল এবং ধরে রাখল”—এই প্রশ্নকে জাতীয় মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে। প্রতিটি বড় সাক্ষরতা প্রকল্পের স্বাধীন মূল্যায়ন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, শেখার ফল যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণ বাধ্যতামূলক না করলে একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি নতুন নামে চলতেই থাকবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—শতভাগ সাক্ষরতা কোনো অসম্ভব স্বপ্ন নয়। কিন্তু তা অর্জন হবে না শুধু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প, ব্যানার, প্রশিক্ষণ, বই বিতরণ আর সেমিনারের মাধ্যমে। এটি সম্ভব হবে তখনই, যখন বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বন্ধ হবে; প্রাপ্তবয়স্কদের শেখা জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে; ইউনিয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ে শেখার স্থায়ী ব্যবস্থা থাকবে; নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দুর্গম অঞ্চলের মানুষ ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আলাদা প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে; এবং রাষ্ট্র নিজের সাফল্যের দাবি নিজেই নয়, স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করবে।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ তাই আমাদের জন্য উৎসবের চেয়ে বড় একটি আয়না। এই আয়নায় আমাদের অর্জনও দেখা যায়, ব্যর্থতাও দেখা যায়। দেখা যায় অগ্রগতির গল্প, আবার দেখা যায় অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ ছায়া।

আজ প্রশ্নটি আর শুধু শিক্ষা প্রশাসনের নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের নৈতিকতার। কটি স্বাধীন দেশের একজন নাগরিকও যদি অক্ষরজ্ঞান, তথ্যজ্ঞান বা কার্যকর সাক্ষরতার অভাবে নিজের অধিকার থেকে পিছিয়ে থাকেন, তবে সেই স্বাধীনতার সুফল কি সত্যিই সবার কাছে পৌঁছেছে?

তাই এখন সময় এসেছে আরেকটি প্রকল্পের নয়—একটি জাতীয় অঙ্গীকারের।প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে পারে, কিন্তু মানুষের শেখা যেন শেষ না হয়। বাজেটের বরাদ্দ শেষ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায় যেন শেষ না হয়। আর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস যেন শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে—হোক এমন এক দিনের শপথ, যেদিন বাংলাদেশ বলবে: কাগজে নয়, জীবনে সাক্ষরতা; সংখ্যায় নয়, সক্ষমতায় অগ্রগতি; প্রকল্পে নয়, অধিকারে শিক্ষা। —তখনই হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থে বলা যাবে—স্বাধীনতার স্বপ্ন শুধু পতাকায় নয়, প্রতিটি মানুষের হাতে ধরা বইয়ের পাতায়ও পূর্ণ হয়েছে।

সাক্ষরতা নয়, এখন প্রয়োজনশেখার রাষ্ট্র

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু ৫৫ বছর পর সাক্ষরতার প্রশ্নটি তাই কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি স্বাধীনতার অর্থের সঙ্গেও যুক্ত।—একজন মানুষ যদি নিজের অধিকার পড়তে না পারেন, স্বাস্থ্যবিধি বুঝতে না পারেন, ডিজিটাল তথ্য যাচাই করতে না পারেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে না পারেন—তাঁর নাগরিক স্বাধীনতা কতটা পূর্ণ?

বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এই অর্জনকে অস্বীকার করা অন্যায়। কিন্তু অগ্রগতিকে আত্মতুষ্টির অজুহাত বানানো আরও বড় ভুল। এবার প্রকল্পের নাম নয়—ফলাফল চাই। বরাদ্দ নয়—জবাবদিহিতা চাই। “কতজনকে শেখানো হয়েছে” নয়—কতজন সত্যিই শিখেছেন এবং সেই শেখা জীবনে ব্যবহার করছেন, তার উত্তর চাই।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এ বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি খুব সরল:

আর কত প্রকল্পের পর আমরা এমন একটি বাংলাদেশ পাব, যেখানে একজন মানুষও অক্ষর, তথ্য জ্ঞানের অভাবে নিজের অধিকার থেকে পিছিয়ে থাকবে না?

 লেখক: অধ্যাপক . মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#আন্তর্জাতিকসাক্ষরতাদিবস #LiteracyDay2026 #সাক্ষরতা #শিক্ষাঅধিকার #উপানুষ্ঠানিকশিক্ষা #শিক্ষানীতি #রাষ্ট্রীয়জবাবদিহিতা #অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: