অধিকার পত্র ডটকম
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল। সামনে দেশটির সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে নিরাপত্তা ইস্যুই আবারও জনআলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে সামরিক সক্ষমতার বিভিন্ন পরিবর্তনের পরও ইসরায়েলি জনগণের একটি অংশ নিজেদের আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করছেন কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আলজাজিরার ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। যুদ্ধের পাশাপাশি সামরিক ব্যয়, অর্থনীতি, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং ৭ অক্টোবরের হামলার দায়-দায়িত্ব নিয়েও দেশটিতে বিতর্ক রয়েছে।
লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জেস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আয়ালা পানিয়েভস্কির মতে, ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে জাতীয় নিরাপত্তা ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে নির্বাচনে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে তিনি আলজাজিরাকে জানান।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের অনুভূতি এবং দেশের সামরিক সক্ষমতা—দুটিকে আলাদা করে দেখার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, সামগ্রিক সামরিক মূল্যায়নে প্রায় তিন বছরের যুদ্ধের পর ইসরায়েল আগের তুলনায় নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামাস ও হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু এলাকায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছে। ফলে সামরিক সক্ষমতা বাড়লেও জনগণের নিরাপত্তাবোধ একইভাবে বাড়েনি—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।
বিশেষ করে অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্রেগম্যানের মতে, সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। তিনি ভবিষ্যতে নতুন করে বড় ধরনের ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছেন।
এদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতেও নিরাপত্তা ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একদিকে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরছেন, অন্যদিকে দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি এখনো রয়েছে বলে বক্তব্য দিচ্ছেন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী শিবিরের কিছু রাজনীতিকও হামাসের পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলের ওপর সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কার কথা বলছেন। একই সঙ্গে ইরান ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নীতিও নির্বাচনী আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক লেভ গ্রিনবার্গের মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বা অনিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সমাজ বর্তমান সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী—এমন দুই বড় রাজনৈতিক অবস্থানে বিভক্ত।
৭ অক্টোবরের হামলার আগে সরকারের ভূমিকা ও সম্ভাব্য ব্যর্থতা নিয়েও দেশটিতে বিতর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের দাবি এবং হামলার আগে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনও রাজনৈতিক বিতর্ককে প্রভাবিত করছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হামলার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার অভিযোগ নেতানিয়াহু ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো অস্বীকার করেছে।
ফলে আসন্ন নির্বাচনে ইসরায়েলিদের কাছে নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু সীমান্ত বা সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুদ্ধের ফলাফল, ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কা, সরকারের জবাবদিহি, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—সবকিছু মিলিয়েই দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে জনমত গড়ে উঠছে।
