odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 20th October 2026, ২০th October ২০২৬
পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে রাতে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলেছিলেন ইশরাক হোসেন; পরদিন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ঘোষণার কথা জানিয়ে দুপুরে বললেন, স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন

রাতে ‘গুজব’, সকালে ‘প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত’, দুপুরে ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’: ইশরাকের বক্তব্যে প্রশ্ন

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ০০:৪৭

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ০০:৪৭

অনলাইন ডেক্স: অধিকার পত্র 

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা ঘিরে এক দিনের ব্যবধানে তাঁর বক্তব্যে একাধিক পরিবর্তন দেখা গেছে। রোববার রাতে মন্ত্রিসভা থেকে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হলে সেটিকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলে অস্বীকার করেন তিনি। এমনকি সংবাদটি প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় তাঁর দপ্তরের পক্ষ থেকে। অথচ সোমবার সকালে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিষয়ে দুপুরে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন।

১৯ অক্টোবর সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাকের বক্তব্য ও আগের রাতের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে পদত্যাগের উদ্যোগ, সিদ্ধান্ত জানার সময় এবং সংবাদ প্রকাশ নিয়ে তাঁর অবস্থানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর আগে শনিবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য। এ ঘটনার পরদিন তাঁর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। সোমবার দুপুরে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে আগের রাতের অস্বীকৃতি এবং পরদিনের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি।

পদত্যাগের নির্দেশ, নাকি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি?

সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন।

তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন এবং তাঁকে এলাকায় কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।

তবে এর আগের দিন রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক ইশরাকের কাছে জানতে চান, সকালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের কথা বলা হলেও দুপুরে তিনি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথা বলছেন কেন।

জবাবে ইশরাক বলেন, ‘আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলিও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাচ্ছি, অফিশিয়ালি কিন্তু তাঁর নির্দেশই আসবে।’

প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উনি ক্যাবিনেটের প্রধান, উনি নির্দেশই দিবেন।’

ইশরাকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে তাঁর বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—পদত্যাগের উদ্যোগ প্রথমে কার পক্ষ থেকে এসেছিল এবং রোববার রাতে পদত্যাগের নির্দেশের খবরটি কেন সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছিল?

আগের রাতের খবরকে ‘গুজব’ বলেছিলেন কেন?

রোববার রাত ১০টার দিকে প্রথম আলো অনলাইনে ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এর প্রায় ২২ মিনিট পর রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে ইশরাক লেখেন, ‘পদত্যাগের গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এর চার মিনিট পর রাত ১০টা ২৬ মিনিটে একই গ্রুপে দেওয়া অডিও বার্তায় তিনি প্রথম আলোর খবরকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ আখ্যা দেন।

অডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘দয়া করে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি, এই পুরো বিষয়টিকে গুজব হিসেবে ধরবেন। এর কোনো সত্যতা এখনো নেই।’

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা উড়োখবরের মাধ্যমে আসবে না।

রাত ১০টা ২৮ মিনিটে ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা একই গ্রুপে একটি প্রতিবাদলিপি দেন। সেখানে প্রকাশিত খবরকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলা হয়। খবর প্রত্যাহার না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। পরে প্রতিবাদলিপিটি ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর ফেসবুক পেজে দেওয়া আরেক বার্তায় বলা হয়, ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং তাঁর পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না।

এতে আরও দাবি করা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য একটি মহল কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আরেকটি অডিও বার্তায়ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান ইশরাক।

মধ্যরাতেও অস্বীকার, সকালে বক্তব্যে পরিবর্তন

রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আরেকটি পোস্ট দেন ইশরাক।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মন্ত্রিপরিষদের যেকোনো সদস্যের প্রতি পদত্যাগ অথবা অন্য যেকোনো নির্দেশ আসার সাথে সাথে সেটি কার্যকর করা প্রথাগতভাবে বাধ্যতামূলক অথবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা কার্যকর হয়ে যায়।’

ওই পোস্টে তিনি আরও জানান, তাঁর ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দ্রুত সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানাবেন।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন।

সকাল ৯টা ৮ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে দেওয়া অডিও বার্তায় ইশরাক বলেন, ‘বেলা দুইটায় প্রেসক্লাবে একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে আমার যে চূড়ান্ত ঘোষণাটি, যেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কনভে করেছেন, সেটি আমরা ঘোষণা দেব।’

এ বক্তব্যে আগের রাতের অবস্থান থেকে পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাতে পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে গুজব বললেও সকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দুপুরে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেন।

‘সিদ্ধান্ত আগেই প্রকাশ করে বিভ্রান্তি তৈরি’

সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আগের রাতের অস্বীকৃতির বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেন ইশরাক।

তিনি দাবি করেন, সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে সোমবার সকালে প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু দলের কোনো সহকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগেই তা প্রকাশ করে দেওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

ইশরাক বলেন, ‘আমাদের অফিশিয়াল প্রক্রিয়া অনুযায়ী আজকে সকালেই এটার অফিশিয়াল সিদ্ধান্তটা এসেছে। সেভাবেই আসার কথা ছিল, সেভাবেই এটাকে মিডিয়াতে নিয়ে আসার কথা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের হয়তোবা কোনো কলিগই এটিকে যে সময় প্রকাশ করার কথা, তার অতি আগে প্রকাশ করে দিয়ে একটা কনফিউশন তৈরি করেছে।’

এরপর তিনি বলেন, ‘গতকাল হইছে না আজকে হইছে, তাতে কী আসে–যায়?’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইশরাক আরও ব্যাখ্যা দেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগে সেটিকে গুজব বা অসত্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে এখানেই প্রশ্ন দেখা দেয়। কোনো সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যকে মিথ্যা বলা এক বিষয় নয়। আগের রাতে তাঁর পক্ষ থেকে শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসার কথা বলা হয়নি; পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এ তথ্যও অস্বীকার করা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা

সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন।

তিনি জানান, ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করতে চান। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার কথাও জানান তিনি।

তবে সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সরাসরি ‘আমি পদত্যাগ করলাম’ বলার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেসক্লাব চত্বরে নেতা-কর্মীদের সামনে এসে অবশ্য তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি আজকে পদত্যাগ করলাম আমার এই পদ থেকে।’

এ সময় উপস্থিত নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিয়ে তাঁর পদত্যাগের বিরোধিতা করেন।

বেলা তিনটার দিকে প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে স্লোগান দেন ইশরাক। তাঁর গাড়ির সামনে-পেছনে কয়েক শ নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় তাঁকে ‘মাদকের আস্তানা, এই বাংলায় হবে না’ এবং ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। পরে হাইকোর্ট মোড়, আবদুল গণি রোড ও গুলিস্তান হয়ে গোপীবাগের দিকে যান তিনি।

বক্তব্যের সময়ক্রমে যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেল

ইশরাক হোসেনের বক্তব্যের সময়ক্রম বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।

প্রথমত, রোববার রাতে পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে তিনি ও তাঁর দপ্তর কেন সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন, যদিও পরদিন সকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ঘোষণার কথা জানান?

দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্তটি সোমবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা থাকলে আগের রাতে প্রকাশিত খবরকে ‘মিথ্যা’, ‘কাল্পনিক’ ও ‘গুজব’ বলার ভিত্তি কী ছিল?

তৃতীয়ত, পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি ইশরাকের নিজের উদ্যোগে নেওয়া, নাকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর কার্যকর করা হয়েছে—এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে যে পার্থক্য দেখা গেছে, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা কী?

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, রোববার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের খবর প্রকাশিত হয়েছিল সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে।

ফলে পদত্যাগের ঘটনা নিশ্চিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ ও আগের রাতের অস্বীকৃতির ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইশরাকের বক্তব্যের ধারাবাহিকতা এবং তাঁর দপ্তরের প্রকাশিত প্রতিবাদলিপির সঙ্গে পরদিনের ঘোষণার পার্থক্যই এ বিতর্কের মূল বিষয়।

সংগ্রহীত