odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 20th October 2026, ২০th October ২০২৬
ভয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের মৃত্যু: শ্রেণিকক্ষে ভয়, মুক্তচিন্তায় শেকল ও রুদ্ধ একাডেমিক স্বাধীনতা—যেখানে শিক্ষক নিপীড়িত, সেখানে জ্ঞানেই ধস; চূড়ান্ত ক্ষতি কি কেবল শিক্ষার, নাকি পুরো জাতির

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকই যখন অনিরাপদ, তখন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? | ভয়ের সংস্কৃতিতে বন্দী বিশ্ববিদ্যালয়, পিছু হটছে জ্ঞান চর্চা: এক অদৃশ্য সংকটের করুণ মাশুল গুনছে বাংলাদেশ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ০৭:২৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ০৭:২৫

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক ফিচার | দেশচিন্তা | শিক্ষা, মানবাধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক যদি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, সত্য বলতে কিংবা নিরাপদে গবেষণা করতে না পারেন, তবে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত হবে কীভাবে? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক-নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংকট নিয়ে একটি অনুসন্ধানধর্মী বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুণগত, মানবিক ও গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা এবং পেশাগত মর্যাদা কেন অপরিহার্য? ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের সুপারিশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণা, বাংলাদেশের সংবিধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ এবং ২০২৬ সালে প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়, মতাদর্শিক বিভাজন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, শিক্ষকের অধিকার ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনায় রয়েছে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, ভিন্নমতের অধিকার, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায় এবং একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রস্তাব।

একটি ফাঁকা চেয়ার, একটি নীরব শ্রেণিকক্ষ: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট শুরু হয় যেভাবে

সকাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন। তাঁদের নির্ধারিত শিক্ষক আজ ক্লাসে আসবেন কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। শিক্ষক অসুস্থ নন। বিদেশেও যাননি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলছে কিংবা তাঁকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে। অভিযোগের নিষ্পত্তি কবে হবে, সেটিও অনিশ্চিত।

এটি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের যাচাইকৃত ঘটনার বর্ণনা নয়; বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক-নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার পরিণতি বোঝাতে একটি প্রতীকী দৃশ্য।—আসলে দৃশ্যটি সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে বড় একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখলে ক্ষতিগ্রস্ত হন কে? শুধু ওই শিক্ষক? নাকি তাঁর শিক্ষার্থী, গবেষণার সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রও?

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজ কেবল নির্ধারিত পাঠ্যসূচি শেষ করা নয়। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখান, প্রতিষ্ঠিত ধারণা যাচাই করতে উৎসাহ দেন, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন এবং প্রয়োজনে প্রচলিত নীতি ও ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। এই কাজের জন্য শুধু মেধা ও দক্ষতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তার সুযোগ, পেশাগত নিরাপত্তা এবং এমন পরিবেশ, যেখানে যুক্তিসংগত ভিন্নমত প্রকাশ করলেও অযৌক্তিক প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকবে না।

একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন ভাবেন, আজ কোন কথা বললে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, কোন গবেষণার ফল প্রকাশ করলে প্রশাসন অসন্তুষ্ট হবে কিংবা কোন মন্তব্যের কারণে অনলাইনে আক্রমণের শিকার হতে পারেন, তাহলে তাঁর মনোযোগের একটি অংশ শিক্ষা ও গবেষণা থেকে সরে গিয়ে আত্মরক্ষায় ব্যয় হবে।—এটি শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তি নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার ভবন, আসবাব, প্রযুক্তি কিংবা জমি নয়। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মানুষ—শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং তাঁদের সম্মিলিতভাবে জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষমতা। যে প্রতিষ্ঠানে এই মানুষগুলো নিরাপদ নন, সেখানে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হলেও একটি প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা কঠিন। প্রশ্নটি তাই সরাসরি করা প্রয়োজন—যে শিক্ষক নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীকে মুক্তচিন্তা, মানবিক মর্যাদা ও সাহসী নাগরিকত্বের শিক্ষা দেবেন?

বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশ্বজনীন জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান: বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক পার্থক্য কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এটি কি বিদ্যালয় কিংবা কলেজের মতোই আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে শুধু উচ্চতর শ্রেণির পাঠদান ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও গভীর কোনো দর্শন, বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব এবং বিশ্বজনীন জ্ঞানচর্চার অঙ্গীকার? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হলেও তাদের শিক্ষাগত উদ্দেশ্য, জ্ঞানচর্চার পরিধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়। সেখানে ভাষা, গণিত, সামাজিক আচরণ এবং মৌলিক জীবনদক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি গড়ে ওঠে শেখার আগ্রহ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই ভিত্তির ওপর বিস্তৃত হয় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ। কলেজে শিক্ষার্থী ক্রমশ উচ্চতর ও বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে যান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন, সৃজনশীলতা ও অনুসন্ধানের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বিদ্যমান জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রচলিত তত্ত্বের পুনর্মূল্যায়ন এবং স্বাধীন গবেষণা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করে।

একটি সহজ উপমায় বিষয়টি বোঝা যায়। বিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের বর্ণমালা চিনতে শেখায়, কলেজ সেই জ্ঞানের বিস্তৃত জগতে প্রবেশের প্রস্তুতি দেয়, আর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শুধু বই পড়তেই শেখায় না; প্রয়োজন হলে নতুন বই লেখার, পুরোনো ব্যাখ্যা সংশোধনের এবং অজানা প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের সক্ষমতাও তৈরি করে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানের ভোক্তা তৈরি করে না; জ্ঞানের স্রষ্টাও গড়ে তোলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজনীন চরিত্রের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও রয়েছে। ইংরেজি University শব্দটির উৎস লাতিন Universitas, যা মূলত একটি সংগঠিত সমষ্টি বা সম্প্রদায়কে নির্দেশ করত। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্ঞানের সর্বজনীনতা (Universality of Knowledge), একাডেমিক স্বাধীনতা (Academic Freedom) এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানবিনিময় (Internationalisation of Higher Education)। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভৌগোলিকভাবে একটি দেশে অবস্থিত হলেও তার জ্ঞানচর্চা কেবল সেই দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা মতাদর্শিক সীমানায় আবদ্ধ থাকার কথা নয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা যেমন বিশ্বের গবেষকদের আলোচনার বিষয় হতে পারে, তেমনি বিদেশের কোনো গবেষণা বাংলাদেশের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। এই পারস্পরিক বিনিময়ই বিশ্ববিদ্যালয়কে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জ্ঞানসমাজের অংশ করে তোলে।

এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পরিচয় নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের সম্প্রসারণ নয়; এটি বিশ্বজনীন জ্ঞান, স্বাধীন চিন্তা ও মানবিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠান। তার প্রশাসন স্থানীয় আইনের অধীন হলেও জ্ঞানচর্চার আদর্শ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাডেমিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মতাদর্শিক আনুগত্য নয়, যুক্তি, প্রমাণ, স্বাধীন অনুসন্ধান এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মানই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু সনদ তৈরির প্রতিষ্ঠান, নাকি উন্নত ও নিরাপদ পৃথিবী গড়তে স্বাধীন মানুষের পাঠশালা?

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় যদি কেবল উচ্চতর শিক্ষাদান ও সনদ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে পৃথিবীর জ্ঞানবিকাশ, মানবসভ্যতার অগ্রগতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসে তার ভূমিকা এত গভীর হতো না। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী কিংবা প্রশাসক তৈরি করার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, যেখানে মানুষ পৃথিবীকে বোঝার পাশাপাশি পৃথিবীকে আরও মানবিক, ন্যায়সংগত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তোলার চিন্তা করতে শেখেন। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক পার্থক্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যমান সমাজের প্রয়োজন মেটানো নয়; প্রয়োজনে সেই সমাজের প্রচলিত ধারণা, বৈষম্য ও অন্যায়কে প্রশ্ন করে উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ অনুসন্ধান করা।

শিক্ষাদর্শনের ইতিহাসে জার্মান দার্শনিক উইলহেল্ম ফন হামবোল্টের (Wilhelm von Humboldt) বিশ্ববিদ্যালয়-ভাবনায় শিক্ষা ও গবেষণার ঐক্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে জন ডিউই (John Dewey) শিক্ষাকে গণতান্ত্রিক সমাজ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক মানবিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জন কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে প্রয়োগ করার সক্ষমতা অর্জনও উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় মানুষের জীবনসংকট অনুসন্ধান করছেন। আরেকজন জনস্বাস্থ্য গবেষক দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় বৈষম্য চিহ্নিত করছেন। তৃতীয়জন শিক্ষা গবেষণায় দেখাচ্ছেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার কোনো নীতি প্রান্তিক শিশুদের জন্য প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি। এসব গবেষণা কেবল একাডেমিক প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নয়; বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং ন্যায়সংগত নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গবেষক যদি অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশের কারণে শাস্তির আশঙ্কা করেন, তাহলে সমাজ সেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

এখানেই একাডেমিক স্বাধীনতা (Academic Freedom), মানবিক মর্যাদা (Human Dignity) এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার (Social Responsibility) মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় নিজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে বৃহত্তর সমাজকে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শেখানোর নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ যে প্রতিষ্ঠান নিজের প্রাঙ্গণে ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখেনি, সে কীভাবে সমাজে সহনশীলতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করবে?

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন স্নাতক কর্মসংস্থান পেলেন কিংবা কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠানটি কতজন স্বাধীনচিন্তার, নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত মানুষ গড়ে তুলতে পারছে।

বিশ্ববিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, যখন তার শিক্ষা মানুষকে শুধু জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে না, বরং অন্য মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও শেখায়। একটি উন্নত পৃথিবী নির্মাণের সূচনা তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই—যেখানে ভয় নয়, বিবেক; আনুগত্য নয়, যুক্তি; এবং ক্ষমতা নয়, মানবকল্যাণ হয়ে ওঠে জ্ঞানচর্চার প্রধান প্রেরণা।

বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল মানদণ্ড: নিরাপদ মানুষ, স্বাধীন জ্ঞান ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কি তার সুউচ্চ ভবন, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং কিংবা প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বিচার করা সম্ভব? একটি বিশাল গ্রন্থাগারে লাখো বই থাকতে পারে, কিন্তু পাঠকের যদি স্বাধীনভাবে বই বেছে নেওয়া ও তার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই গ্রন্থাগারের জ্ঞানসম্পদ পূর্ণ সম্ভাবনায় কাজে আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমন। উন্নত অবকাঠামো জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু স্বাধীন চিন্তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং ন্যায়সংগত প্রশাসন সেই সুযোগকে অর্থবহ করে তোলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত উৎকর্ষ তাই শুধু পরিমাণগত অর্জনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে একাডেমিক স্বাধীনতা (Academic Freedom), প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি (Institutional Accountability) এবং মানবিক মর্যাদা। ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক-গবেষকদের পেশাগত অধিকার, স্বাধীনতা ও দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের মতো নতুন বাস্তবতা এই নীতিগুলোর প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়িয়েছে।

বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকার্থিবাদী পরিবেশের কথা বিবেচনা করা যায়। সে সময় রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহের কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক তদন্ত, চাপ ও চাকরিগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক আনুগত্য যখন পেশাগত নিরাপত্তার নির্ধারক হয়ে ওঠে, তখন স্বাধীন গবেষণা ও মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই আলোচনায় মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা (Psychological Safety) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ধরা যাক, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নবীন শিক্ষক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের গবেষণায় পদ্ধতিগত ত্রুটি শনাক্ত করেছেন। কিন্তু পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি বিষয়টি প্রকাশ করছেন না। একইভাবে একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভুল বুঝতে পারলেও পরীক্ষার ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়ার ভয়ে প্রশ্ন করছেন না। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে সেখানে জ্ঞানের আদান-প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার অর্থ অবশ্য সমালোচনাহীন পরিবেশ নয়। একটি গবেষণাগারে যেমন পরীক্ষার মাধ্যমে অনুমানের যথার্থতা যাচাই করা হয়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তিকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু পরীক্ষাগারে যন্ত্রের ত্রুটি শনাক্ত করার জন্য যেমন গবেষককে শাস্তি দেওয়া যুক্তিসংগত নয়, তেমনি যথাযথভাবে যুক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করার জন্য শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে অপমান কিংবা প্রতিশোধের শিকার করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এখানেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে গবেষণাগারের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরপেক্ষ অভিযোগ নিষ্পত্তি, ন্যায়সংগত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সুরক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তার ভবনের উচ্চতার সঙ্গে চিন্তার পরিসরও বিস্তৃত হয়; যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, যুক্তি দুর্বল হলে তা সংশোধনযোগ্য এবং ক্ষমতা সর্বদা ন্যায়বিচারের কাছে জবাবদিহিমূলক।

বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল মানদণ্ড: নিরাপদ মানুষ, স্বাধীন জ্ঞান ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং নিয়ে বাংলাদেশে আগ্রহের কমতি নেই। কোন প্রতিষ্ঠান কত ধাপ এগিয়েছে, কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে কিংবা কতজন আন্তর্জাতিক শিক্ষক-গবেষক যুক্ত হয়েছেন—এসব অর্জন উচ্চশিক্ষার আলোচনায় গুরুত্ব পায়। নিঃসন্দেহে এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয় সূচক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উৎকর্ষ কি কেবল সংখ্যাগত অর্জনেই নির্ধারিত হয়? যে প্রতিষ্ঠানে আধুনিক গবেষণাগার রয়েছে, অথচ গবেষক স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলতে ভয় পান, সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন একাই জ্ঞানচর্চার মান নিশ্চিত করতে পারে না।

উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত রয়েছে একাডেমিক স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা, প্রশাসনিক সততা, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ। ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel এসব বিষয়কে আন্তর্জাতিক নীতিগত কাঠামোয় গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবর্তিত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালে ইউনেসকো সুপারিশটি সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, বৈষম্য, কর্মপরিবেশ এবং একাডেমিক স্বাধীনতার উদীয়মান চ্যালেঞ্জ বিবেচিত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা (Psychological Safety) বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক, গবেষক কিংবা শিক্ষার্থী যুক্তিসংগত প্রশ্ন, সংশয় বা ভিন্নমত প্রকাশের কারণে অপমান, বিচ্ছিন্নতা কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কা অনুভব করেন না। একজন নবীন শিক্ষক যদি জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করেন, কিংবা শিক্ষার্থী যদি শিক্ষকের ভুল সংশোধনের সাহস না পান, তাহলে সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক উন্মুক্ততার ঘাটতি রয়েছে।

তবে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার অর্থ সমালোচনামুক্ত পরিবেশ নয়। জ্ঞানচর্চায় কঠিন প্রশ্ন, তীব্র বিতর্ক এবং প্রতিষ্ঠিত ধারণার পুনর্মূল্যায়ন অপরিহার্য। পার্থক্য হলো, বিতর্কে যুক্তি কঠোরভাবে পরীক্ষিত হবে, কিন্তু যুক্তি উপস্থাপনকারী ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হবে না। বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারে; ব্যক্তিগত ভয় সেই বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এখানেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অর্থ শুধু নতুন ভবন, প্রযুক্তি কিংবা গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি নয়; প্রয়োজন ন্যায়সংগত প্রশাসন, কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চার নিশ্চয়তা।

বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পূর্বশর্ত বিশ্বমানের প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ—যেখানে মানুষ নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন এবং ক্ষমতা জবাবদিহির অধীন।

একাডেমিক স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, জ্ঞানচর্চার মৌলিক শর্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক এবং নির্ভয়ে সত্য অনুসন্ধানের পরিবেশে। এই পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি একাডেমিক স্বাধীনতা (Academic Freedom)। অথচ ধারণাটি নিয়ে সমাজে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ মনে করেন, এটি শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ সুযোগ-সুবিধা; আবার কারও ধারণা, একাডেমিক স্বাধীনতার অর্থ শিক্ষক যা ইচ্ছা বলতে বা করতে পারবেন। বাস্তবে কোনোটিই সম্পূর্ণ সঠিক নয়। একাডেমিক স্বাধীনতা মূলত এমন একটি পেশাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার, যা শিক্ষক ও গবেষকদের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ, ভয়ভীতি কিংবা মতাদর্শিক চাপ ছাড়াই জ্ঞান সৃষ্টি, পাঠদান, গবেষণা ও সমালোচনামূলক আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করে।

১৯৯৭ সালে ইউনেসকো গৃহীত Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষক ও গবেষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত নিরাপত্তা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। এই সুপারিশ অনুযায়ী একাডেমিক স্বাধীনতা শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গবেষণা পরিচালনা, ফলাফল প্রকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক নীতি সম্পর্কে মতপ্রকাশ, পেশাগত সংগঠনে অংশগ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপ থেকে সুরক্ষার বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

এর বাস্তব তাৎপর্য গভীর। একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, গবেষণা বরাদ্দের স্বচ্ছতা দাবি করতে পারেন কিংবা শিক্ষাক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিক সমালোচনা করতে পারেন। একইভাবে বৃহত্তর সমাজে শিক্ষা, অর্থনীতি বা জননীতির বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক মতামত প্রকাশও তাঁর পেশাগত ভূমিকার অংশ হতে পারে। তবে এই স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতার অনুমতি নয়। গবেষণায় তথ্য জালিয়াতি, শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য, যৌন হয়রানি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার একাডেমিক স্বাধীনতার সুরক্ষা পেতে পারে না। অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, প্রযোজ্য বিধি এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার (Due Process) ভিত্তিতে; ব্যক্তিগত বিরাগ বা মতাদর্শিক বিরোধের কারণে নয়।

একাডেমিক স্বাধীনতার চারটি পরস্পরসম্পর্কিত ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—পাঠদান, গবেষণা, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে মতপ্রকাশ এবং বৃহত্তর সমাজে জ্ঞানভিত্তিক বক্তব্য প্রদানের অধিকার। একটি ক্ষেত্র সংকুচিত হলে অন্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে। যেমন, গবেষণা প্রকাশের সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনায় ভয় থাকলে শিক্ষকের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবার শ্রেণিকক্ষে যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক বাধাগ্রস্ত হলে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন বিচারক্ষমতার বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখানে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন (Institutional Autonomy) এবং ব্যক্তিগত একাডেমিক স্বাধীনতার পার্থক্য বোঝা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকলেও তার প্রশাসন যদি শিক্ষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রকৃত একাডেমিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই স্বায়ত্তশাসন প্রশাসনের সীমাহীন কর্তৃত্বের অনুমোদন নয়; বরং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

উপরের আলোচনা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে,

একাডেমিক স্বাধীনতা শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিশেষাধিকার নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানসৃষ্টির সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তা এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ মানে শুধু তালাবদ্ধ ফটক নয়: শিক্ষক-নিরাপত্তার চার স্তর

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা বলতে অনেক সময় প্রবেশপথে প্রহরী, পরিচয়পত্র যাচাই, সিসিটিভি কিংবা প্রশাসনিক ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বোঝানো হয়।—এসব প্রয়োজনীয় হলেও একজন শিক্ষকের সার্বিক নিরাপত্তার ধারণা আরও বিস্তৃত।

  • প্রথমত, শারীরিক নিরাপত্তা। শিক্ষক যেন হামলা, ভয়ভীতি, অনুসরণ, হুমকি কিংবা অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার না হন। তাঁর শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, কার্যালয় ও যাতায়াতের পরিবেশ নিরাপদ থাকতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, মানসিক নিরাপত্তা। শিক্ষক যেন অপমান, নিয়মিত হয়রানি, ভয় দেখানো কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য না হন। মানসিক নিরাপত্তা মানে সমালোচনামুক্ত পরিবেশ নয়; বরং সমালোচনা ও মতভেদকে মর্যাদাপূর্ণভাবে মোকাবিলা করার পরিবেশ।
  • তৃতীয়ত, পেশাগত নিরাপত্তা। নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন, গবেষণার সুযোগ কিংবা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা যেন স্বচ্ছ ও যুক্তিসংগত মানদণ্ড অনুসরণ করে। একই ধরনের অভিযোগে ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ হলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।
  • চতুর্থত, ডিজিটাল নিরাপত্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, ভুয়া প্রচারণা কিংবা অনলাইন হুমকি থেকে শিক্ষককে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের অংশ।

এই চারটি স্তর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কেননা একজন শিক্ষক শারীরিকভাবে নিরাপদ থাকতে পারেন, কিন্তু প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে অপমান করা হলে তাঁর মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার তিনি অনলাইনে হয়রানির শিকার না হলেও চাকরি বা পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় থাকলে নিরাপত্তাবোধ কমে যেতে পারে। আসলে প্রকৃত নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই কেবল দেয়াল ও নিরাপত্তাকর্মী থাকে না। সেখানে ন্যায়সংগত অভিযোগ নিষ্পত্তি, বৈষম্য প্রতিরোধ, কর্মস্থলের মর্যাদা রক্ষা এবং সংকটে সহায়তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য হলো, আমরা শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার শেখাই; অথচ অনেক সময় নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশে সেই অধিকারগুলো কতটা কার্যকর, তা যাচাই করি না। নিরাপত্তার প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী একজন শিক্ষকও নিশ্চিন্তে বলতে পারেন—আমি প্রশ্ন তুলতে পারি, কিন্তু সে কারণে আমাকে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না।

গানে গানে শিক্ষকের নিরাপত্তা ও স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্তা: ‘শিক্ষক নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন’

শিক্ষকের নিরাপত্তা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, গবেষণা কিংবা নীতিগত বিশ্লেষণ করা সম্ভব। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কখনো কখনো প্রয়োজন হয় ভিন্ন এক ভাষার—যে ভাষা যুক্তির পাশাপাশি মানুষের অনুভূতিকেও স্পর্শ করে। সংগীত তেমনই একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এই উপলব্ধি থেকেই অধিকারপত্রের Songs of Education & Rights উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে বাংলা–ইংরেজি দ্বিভাষিক সংগীত ‘শিক্ষক নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন—When Teachers Are Free, Knowledge Shines’। গানটির মূল উদ্দেশ্য একাডেমিক স্বাধীনতার জটিল ধারণাকে সহজ, আবেগঘন ও সুরেলা উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

গানটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য অত্যন্ত সরল, অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। একজন শিক্ষক যখন নিরাপদে পাঠদান করতে পারেন, স্বাধীনভাবে গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তুলতে পারেন, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারই সুরক্ষিত হয় না; শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশও সমৃদ্ধ হয়। অন্যদিকে শিক্ষক যদি অপমান, ভয়ভীতি কিংবা পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তাহলে সেই পরিস্থিতির প্রভাব শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর জ্ঞানচর্চার ওপর পড়তে পারে। এই কার্যকারণ সম্পর্ককে গানটি সংক্ষেপে প্রকাশ করেছে একটি স্মরণযোগ্য ইংরেজি উচ্চারণে—Safe to Teach, Free to Learn। অর্থাৎ শিক্ষক নিরাপদে শেখাতে পারলে শিক্ষার্থীও স্বাধীনভাবে শিখতে পারেন।

সংগীতটির নির্মাণশৈলীতেও এই চিন্তার প্রতিফলন রয়েছে। শুরুতে অপেক্ষাকৃত শান্ত, বিষণ্ন ও সংযত সুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব সংকট, শিক্ষকের অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাঙ্গনে ভয় ও অস্বস্তির অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে সুরের বিস্তার ঘটে; যুক্ত হয় শক্তিশালী কণ্ঠ, অর্কেস্ট্রার আবহ এবং সম্মিলিত সংগীতায়োজন। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গানটি ব্যক্তিগত বেদনা থেকে সমষ্টিগত প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যায়। মাঝের অংশে গুরুত্ব পায় একাডেমিক স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা। শেষ পর্যায়ে বাংলা ও ইংরেজি কণ্ঠ মিলিত হয়ে উচ্চারণ করে—Let Knowledge Be Free! অর্থাৎ জ্ঞানচর্চা হোক স্বাধীন।

গানটির বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে না। বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাকে পরস্পরবিরোধী দাবি হিসেবে না দেখে একই মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে শিক্ষকের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার অধিকার, অভিযোগের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে গানটি মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার অর্থ দায়মুক্তি নয় এবং শৃঙ্খলার অর্থও ভিন্নমত দমন নয়।

সংগীতটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি হয় শেষাংশে। সম্মিলিত কণ্ঠ ও অর্কেস্ট্রার বিস্তার থেমে যাওয়ার পর শুধু একটি একক কণ্ঠে শোনা যায়—‘জ্ঞান স্বাধীন... মানুষ স্বাধীন...’। শুরুতে যে নীরবতা ভয়, অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তার প্রতীক ছিল, শেষের সেই নীরবতা হয়ে ওঠে বিবেক, মর্যাদা এবং আশার প্রকাশ। এই সংগীতায়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; বরং স্বাধীন চিন্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিরাপদ জ্ঞানচর্চার পরিবেশে।

অধিকারপত্রের এই সংগীত উদ্যোগ তাই কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন নয়; একে শিক্ষা ও মানবাধিকারের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়। দীর্ঘ প্রবন্ধের তাত্ত্বিক আলোচনা যাঁদের কাছে জটিল মনে হতে পারে, তাঁরাও গানের কথা, সুর ও আবেগের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবেন কেন শিক্ষকের নিরাপত্তা একটি মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিহার্য শর্ত।

‘শিক্ষক নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন’ গানটির মধ্য দিয়ে অধিকারপত্র একটি মৌলিক বার্তা পৌঁছে দিতে চায়—যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নির্ভয়ে শেখাতে পারেন, শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেন এবং প্রত্যেকে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা পান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত অর্থে মুক্ত জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান। কারণ শিক্ষককে নিরাপদ রাখা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সুরক্ষা দেওয়া নয়; এর অর্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, স্বাধীন গবেষণা এবং একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত রাখা।

গানটির মাধ্যমে অধিকারপত্রের এই মানবিক আহ্বান আরও বিস্তৃত শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা ও মানবাধিকার নিয়ে চিন্তাশীল প্রত্যেক মানুষকে গানটি শোনার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। কারণ এটি কেবল শিক্ষকের নিরাপত্তা নিয়ে একটি সংগীত নয়; বরং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার সম্মিলিত প্রত্যাশার সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

পুরো গানটি শুনুন অধিকারপত্রের ইউটিউব চ্যানেলে:শিক্ষক নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন | Let Knowledge Be Free | Academic Freedom Anthem | Odhikarpatra Songs of Education & Rights | Bengali–English Cinematic Anthem

গানটি শুনে পাঠক ও শ্রোতারা নিজেদেরও প্রশ্ন করতে পারেন—আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারছি, যেখানে শিক্ষক নির্ভয়ে সত্য বলতে পারেন, শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেন এবং ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকে সমান মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পান?

শিক্ষক নিরাপদ, জ্ঞান স্বাধীন—এই অঙ্গীকার শুধু গানের কথায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের আচরণেও প্রতিষ্ঠিত হোক।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়: স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার অস্বস্তিকর দূরত্ব

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসে একাডেমিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাসংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিবাদ, মতপ্রকাশ ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক কোনো নতুন ধারণা নয়। কিন্তু ইতিহাসের এই গৌরব বর্তমানের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত করে তোলে না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। আইন দ্বারা আরোপিত নির্দিষ্ট যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার অধীনে বাক্‌স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারও স্বীকৃত। এই সাংবিধানিক কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩। এর ৫৬(২) ধারায় শিক্ষকদের চাকরির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক মত পোষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আইনসংগত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার স্বাধীনতার প্রতি বিরূপ আচরণ না করার বিধান রয়েছে। একই আদেশের ৫৬(৩) ধারায় শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে অপসারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ ও অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে তদন্তের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।  অর্থাৎ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ শুধু আন্তর্জাতিক নীতির বিষয় নয়; অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ বিধিবদ্ধ ভিত্তিও রয়েছে। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও চাকরিবিধি এক নয়। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, সংবিধি এবং প্রযোজ্য বিধান আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম সংকট হচ্ছে আইন ও নীতির ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে দূরত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গর্ব করা হয়। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর।

সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি কিংবা শিক্ষক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো যথাযথভাবে কার্যকর না হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অল্প কয়েকজনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আইনের নির্ধারিত ক্ষমতার মধ্যে নেওয়া হলেও তা ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।

এখানে তিনটি প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথমত, সিদ্ধান্তটি নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের বৈধ ক্ষমতা ছিল কি না।
  • দ্বিতীয়ত, অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠায় নিরপেক্ষ ও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়েছে কি না।
  • তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের বক্তব্য উপস্থাপন এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার বাস্তব সুযোগ পেয়েছেন কি না।

—এই শর্তগুলো পূরণ না হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে

২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল প্রকাশিত এবং পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ করা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৬৮ জন শিক্ষক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পর দীর্ঘ সময় ধরে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পক্ষ তদন্তের মান ও আইনি গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার অর্থ তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়। আবার অভিযোগ ওঠার অর্থও তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হুমকি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু সেই তদন্ত অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা হলে দুটি পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অভিযোগকারী ন্যায়বিচার পান না, অভিযুক্ত ব্যক্তিও অভিযোগের নিষ্পত্তি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। আর মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ৩১ আগস্টের সিন্ডিকেট সভায় তিনজন অধ্যাপককে সাময়িক বরখাস্ত ও তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। শিক্ষক সমিতির অভিযোগ ছিল, সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। —এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ববিদ্যালয় কি অভিযোগের বিচার করবে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে যাবে?

একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর গ্রহণযোগ্য উত্তর হওয়া উচিত, অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, প্রক্রিয়া হবে একই; বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। তবে নির্দিষ্ট আইন-কানুন প্রক্রিয়া অফনুসরণ করে।

ভয়ের সংস্কৃতি: যে নীরবতা শ্রেণিকক্ষের দরজা পেরিয়ে গবেষণাগারে পৌঁছে যায়

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকট সব সময় প্রকাশ্য সংঘাত দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় শুরু হয় নীরবতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষক দেখলেন, কোনো সহকর্মী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। আরেকজন দেখলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো মন্তব্যের কারণে একজন সহকর্মী ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তৃতীয়জন লক্ষ্য করলেন, ভিন্নমত প্রকাশের পর কারও পেশাগত সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। —এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রত্যেকে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বার্তা গ্রহণ করতে পারেন—নিরাপদ থাকতে চাইলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলাই ভালো। এটি আত্মরক্ষার একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি উদ্বেগজনক।

ধীরে ধীরে শিক্ষকরা সংবেদনশীল গবেষণার বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন। প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন কম তুলতে পারেন। শ্রেণিকক্ষে বিতর্কিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে শেষ করতে পারেন।—এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Chilling Effect—অর্থাৎ সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই সম্ভাব্য শাস্তি বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মানুষ নিজের বক্তব্য ও কার্যক্রম সীমিত করে ফেলে। চিন্তার স্বাধীনতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ক্ষতি এখানে ঘটে। কর্তৃপক্ষ হয়তো কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করেনি, কিন্তু মানুষ নিজেরাই বলতে ভয় পাচ্ছেন।

ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পরিবেশদূষণ নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেল, যা কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্বস্তিকর। গবেষক যদি আশঙ্কা করেন, ফল প্রকাশ করলে পেশাগত ক্ষতি হতে পারে, তাহলে তিনি গবেষণার বিষয় পরিবর্তন করতে পারেন কিংবা ফল প্রকাশে দ্বিধা করতে পারেন।

একই বিষয় শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্নীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস বা মানবাধিকার গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদনে একটি অদৃশ্য বাছাই প্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যেসব বিষয় নিরাপদ, সেগুলো নিয়ে গবেষণা বাড়ে; যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অস্বস্তিকর, সেগুলো পিছিয়ে যায়। ফলে সমাজ এমন জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এখানে একটি তাত্ত্বিক ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—Organisational Silence বা প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যখন মনে করেন, সমস্যা জানিয়ে লাভ নেই বা জানালে ক্ষতি হতে পারে, তখন তাঁরা প্রয়োজনীয় তথ্যও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছান না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই নীরবতা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা কমায় না, জ্ঞানচর্চার নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। একটি প্রতিষ্ঠানে সবাই একমত—এটি সব সময় সুস্থ পরিবেশের প্রমাণ নয়। কখনো কখনো এর অর্থ হতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশের মানুষগুলো নীরব হয়ে গেছেন।

শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য: অদৃশ্য ক্ষতও শিক্ষার মানকে আঘাত করে

শিক্ষককে সমাজ সাধারণত জ্ঞানী, স্থির, আত্মবিশ্বাসী এবং সমস্যা সমাধানে সক্ষম মানুষ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। ফলে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন—এমন বিষয় অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। কিন্তু শিক্ষকও মানুষ। তাঁর পরিবার আছে, সামাজিক সম্পর্ক আছে, পেশাগত স্বপ্ন আছে এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধ আছে।

দীর্ঘদিন অপমান, পেশাগত অনিশ্চয়তা কিংবা হুমকির মুখে থাকতে হলে তাঁর ঘুম, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং সামাজিক সম্পর্ক প্রভাবিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের আনুমানিক ১৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। বিশ্বজুড়ে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কারণে প্রতিবছর আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়, যার উৎপাদনশীলতাজনিত অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। —এই পরিসংখ্যান সারা বিশ্বের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য; বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মানসিক অসুস্থতার হার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তবে তথ্যটি স্পষ্ট করে, মানসিক স্বাস্থ্য কর্মক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা উভয়েই বৈষম্য, অনিরাপদ চাকরি, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্মপরিবেশে নিয়ন্ত্রণের অভাব, হয়রানি এবং প্রতিকূল সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। —বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঝুঁকিগুলোর কিছু বিশেষ রূপ রয়েছে। একজন শিক্ষক হয়তো বছরের পর বছর একটি গবেষণা প্রকল্প তৈরি করেছেন। হঠাৎ তাঁর দায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে গবেষণার অগ্রগতি থেমে যেতে পারে। পদোন্নতি বা পেশাগত মূল্যায়ন নিয়ে অস্বচ্ছতা থাকলে তিনি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে পড়তে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ হলে পরিবারের সদস্যরাও উদ্বেগ ও সামাজিক অস্বস্তির সম্মুখীন হতে পারেন।

এটি মনে রাখা প্রয়োজন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার প্রত্যেক ব্যক্তি মানসিক রোগে আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। আবার কারও মানসিক অসুস্থতার কারণও একটিমাত্র ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী চাপ যে সুস্থতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।—এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব চিকিৎসক হয়ে ওঠা নয়; বরং ক্ষতিকর কর্মপরিবেশ প্রতিরোধ করা এবং প্রয়োজনে গোপনীয় ও সহজলভ্য পেশাগত সহায়তার ব্যবস্থা করা।

পরিবারও এই সংকটের বাইরে থাকে না: শিক্ষকের অনিশ্চয়তার অদৃশ্য ভার

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক যখন পেশাগত অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক চাপ, সামাজিক অপমান কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন, তখন সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ বা কার্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দিনের শেষে শিক্ষক যখন বাড়ি ফেরেন, তাঁর সঙ্গে ফিরে আসে কর্মস্থলের উদ্বেগ, অপূর্ণ প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বাইরে থেকে একটি পরিবারকে স্বাভাবিক মনে হলেও তার ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে অদৃশ্য মানসিক চাপ। শান্ত পুকুরে একটি পাথর নিক্ষেপ করলে যেমন ঢেউ ক্রমশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি একজন মানুষের পেশাগত সংকটও কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের অনুভূতি, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

ধরা যাক, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। রাতে তাঁর ঘুম হচ্ছে না, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে অস্বস্তি বোধ করছেন। সন্তান জানতে চাইছে, ‘বাবা, তুমি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছ না কেন?’ কিংবা ‘মা, তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?’ এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কখনো কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ শিক্ষক হয়তো নিজের অভিজ্ঞতার জটিলতা সন্তানকে বোঝাতে চান না, আবার পরিবারের কাছেও অনিশ্চয়তার বাস্তবতা সম্পূর্ণ আড়াল করতে পারেন না। এটি একটি উদাহরণমূলক পরিস্থিতি হলেও কর্মক্ষেত্রের চাপ পারিবারিক জীবনে কীভাবে প্রবেশ করতে পারে, তা বুঝতে সহায়তা করে।

মনোবিজ্ঞানে কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার প্রভাব ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ছড়িয়ে পড়াকে স্পিলওভার প্রভাব (Spillover Effect) বলা হয়। আবার একজনের মানসিক চাপ পরিবারের অন্য সদস্যদের আবেগ ও আচরণে প্রভাব ফেললে তাকে ক্রসওভার প্রভাব (Crossover Effect) হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, অভিভাবকের দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ সন্তানের নিরাপত্তাবোধকে প্রভাবিত করতে পারে; দাম্পত্য সম্পর্কে যোগাযোগের জটিলতা তৈরি হতে পারে কিংবা আয় ও চাকরির অনিশ্চয়তা পারিবারিক পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন এবং কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষকের চিকিৎসাগত অবস্থা সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক বিধি প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি, ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংকটাপন্ন শিক্ষক-কর্মীদের জন্য উপযুক্ত সহায়তার ব্যবস্থা। কারণ যে প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দেয়, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজের আচরণেও এসব মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষককে সম্মান জানানো মানে কেবল শিক্ষক দিবসে ফুল দেওয়া, অনুষ্ঠানে প্রশংসা করা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তাঁর অবদান স্বীকার করা নয়। প্রকৃত সম্মান প্রকাশ পায় তখন, যখন সংকটে তাঁর কথা শোনা হয়, নিরাপত্তার উদ্বেগ গুরুত্ব পায় এবং ন্যায়সংগত প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তার অভিঘাত শুধু একজন ব্যক্তির কর্মজীবনে নয়, তাঁর পরিবারের জীবনেও পৌঁছাতে পারে। তাই শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক সমাজ গঠনেরও অপরিহার্য অঙ্গ।

স্বাধীনতার নামে দায়মুক্তি নয়, শৃঙ্খলার নামে প্রতিশোধও নয়

শিক্ষক-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা যুক্তি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি একাডেমিক স্বাধীনতার কথা বলে সব ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন, তাহলে তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?

প্রশ্নটি যথার্থ। কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন করেন, যৌন হয়রানিতে জড়িত থাকেন, গবেষণায় জালিয়াতি করেন, সহিংসতায় উসকানি দেন কিংবা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

একাডেমিক স্বাধীনতা অপরাধ বা অসদাচরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ নয়। তবে এখানে বিপরীত প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ যাচাই না করে কিংবা যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই যদি কোনো শিক্ষককে দীর্ঘ সময় শাস্তিমূলক অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হয়, সেটি কি ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এই দুই প্রশ্নের উত্তর একই নীতির মধ্যে পাওয়া যায়—Due Process of Law, অর্থাৎ আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া। এর মূল কথা হলো, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হতে হবে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ সম্পর্কে জানাতে হবে, প্রাসঙ্গিক প্রমাণ পর্যালোচনা করতে হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের বাস্তব সুযোগ দিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে।

অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও সাক্ষীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর ঝুঁকি থাকলে তদন্ত চলাকালে সাময়িক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার কারণ, সময়সীমা ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনাযোগ্য হওয়া উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগকে নিছক রাজনৈতিক মতভেদের বিরোধ হিসেবে খাটো করা যাবে না। আবার একজন শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের বৈধ সংগঠনগত সংশ্লিষ্টতা কিংবা অজনপ্রিয় মতকে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের একমাত্র প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে না।

এখানে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো অভিযোগের প্রকৃতি আলাদা করে দেখা। রাজনৈতিক মত পোষণ এক ধরনের বিষয়। পেশাগত অসদাচরণ আরেক ধরনের বিষয়। আর ফৌজদারি অপরাধ সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি প্রশ্ন।—এসবের মধ্যে পার্থক্য না করলে বিচারব্যবস্থা অবিশ্বাসের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আনুগত্য ও প্রভাবের ভারসাম্য বদলেছে। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন নিয়ম তৈরি করতে হবে, যা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য নয়; সব সময়, সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু শৃঙ্খলা মানে নীরবতা নয়। একইভাবে স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়।— একটি ন্যায়সংগত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষককে প্রশ্ন করা যাবে, অভিযোগের তদন্ত করা যাবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিও দেওয়া যাবে। কিন্তু কাউকে ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন: স্বায়ত্তশাসনের রক্ষক, নাকি ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন (University Autonomy) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন। এর মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে অযৌক্তিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দিয়ে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন কখনোই জবাবদিহিহীন ক্ষমতার সমার্থক নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ন্যায়সংগত প্রশাসন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বশীলতার অপরিহার্য শর্ত। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়েও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অস্বচ্ছতা কিংবা মতপ্রকাশের সংকোচনের মুখোমুখি হয়, তাহলে স্বায়ত্তশাসনের মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন (University Governance) নির্ভর করে তার বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার ওপর। সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত সভা, যথাযথ প্রতিনিধিত্ব, সিদ্ধান্তের কার্যবিবরণী সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অবশ্য স্বচ্ছতার অর্থ সব আলোচনা বা নথি নির্বিচারে প্রকাশ করা নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং আইনগত সুরক্ষা বজায় রেখেও সিদ্ধান্তের কারণ, প্রক্রিয়া ও যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য রাখা সম্ভব।

এই কাঠামোয় নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযোজ্য আইন ও বিধিতে নির্ধারিত নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা কার্যকর না থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারত্ব দুর্বল হতে পারে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা তাই কেবল ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব ও নৈতিক দায়িত্ব পালনেরও ক্ষেত্র।

একজন উপাচার্যের সাফল্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক সভা কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ, ভিন্নমত কতটা সম্মানিত, অভিযোগের নিষ্পত্তি কতটা নিরপেক্ষ এবং শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল—এসবও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

প্রশাসনিক ন্যায়পরায়ণতার প্রকৃত পরীক্ষা ঘটে তখন, যখন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও একই নিয়ম প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ন্যায়বিচারের নীতি অপরিবর্তিত থাকে, সেখানেই স্বায়ত্তশাসন প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার পরিচয় পায়। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্জিত স্বাধীনতা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।

অনলাইনে অপপ্রচার, ক্যাম্পাসে মব, আর প্রশাসনের শাস্তি: আক্রান্ত শিক্ষকের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় কোথায়?

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিংবা তাঁকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—অভিযোগের প্রকৃতি কী, প্রমাণ কতটা গ্রহণযোগ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না? কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চশিক্ষার প্রেক্ষাপটে এর পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেসব শিক্ষক রাজনৈতিক বিশ্বাস, মতাদর্শিক অবস্থান কিংবা ভিন্নমতের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, সম্মানহানিকর প্রচারণা অথবা ক্যাম্পাসে দলবদ্ধ হুমকি ও জনতার চাপের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন, তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ভূমিকা পালন করেছে?

ধরা যাক, একজন শিক্ষককে কেন্দ্র করে ফেসবুকে তাঁর ছবি ব্যবহার করে অবমাননাকর বক্তব্য, যাচাইবিহীন অভিযোগ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, হুমকি কিংবা দলবদ্ধ চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অভিযোগকারী শিক্ষার্থী এবং অন্য সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কিংবা শারীরিক নিরাপত্তার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

এখানেই প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্বের (Institutional Duty of Care) প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন শিক্ষক অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেমন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তেমনি তিনি অন্যায় আচরণ, হুমকি বা সংঘবদ্ধ হয়রানির শিকার হলে তাঁকে সুরক্ষা দেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ। একটি হাসপাতাল যেমন রোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তাঁর চিকিৎসার অধিকার অস্বীকার করতে পারে না, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ও কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলার কারণে তাঁর মৌলিক নিরাপত্তার প্রয়োজন উপেক্ষা করতে পারে না।

কিন্তু পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যদি দেখা যায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অনলাইনে অপপ্রচার ও ক্যাম্পাসে হুমকির অভিযোগ জানালেও প্রশাসন কার্যকর প্রতিকার দেয়নি, অথচ পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দুটি পৃথক বিষয় অনুসন্ধান করা অপরিহার্য—প্রথমত, শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত মূল অভিযোগের যথার্থতা; দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিজে যে হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করেছেন, তার প্রতিকারে প্রশাসনের ভূমিকা। একটি অভিযোগের তদন্ত অন্য অভিযোগের নিষ্পত্তির বিকল্প হতে পারে না।

বিশেষত রাজনৈতিক পরিবর্তন বা মতাদর্শিক মেরুকরণের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিশ্বাসযোগ্য অসদাচরণের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। একইভাবে সেই পরিচয় তাঁকে অপমান, ভয়ভীতি কিংবা বিচারবহির্ভূত শাস্তির বৈধ লক্ষ্যেও পরিণত করতে পারে না। মতাদর্শিক বিরোধকে যদি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শাসনের পরিবর্তে জনতার চাপকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ডে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আক্রান্ত শিক্ষকরা নিরাপত্তা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছিলেন কি না, অনলাইন অপপ্রচার ও ক্যাম্পাসের হুমকির অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছিল কি না, হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং শিক্ষকদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীন তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়কে মনে রাখতে হবে, প্রশাসনের নৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা কেবল জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নয়; বরং বিতর্কিত, অজনপ্রিয় কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষককেও ন্যায়সংগত সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি হতে পারে, কিন্তু অভিযোগ তদন্তের আগেই সামাজিক অপমান কিংবা মবের চাপকে শাস্তির বিকল্প হতে দেওয়া যায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় কতজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে; বরং এই যে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আগে বা চলাকালে তাঁরা যখন নিরাপত্তাহীনতা, অপপ্রচার কিংবা সংঘবদ্ধ হুমকির অভিযোগ করেছেন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন কী করেছে?

কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে পারে, কিন্তু সেই শিক্ষকের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে সমান আন্তরিকতা দেখায় না, তার প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নৈতিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয় তখনই প্রকৃত ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে, যখন শাস্তি ও সুরক্ষা—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণ, আইন, মানবিক মর্যাদা এবং অভিন্ন ন্যায়নীতিই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে।

ভিন্নমতের কারণে শিক্ষককে শাস্তি: একাডেমিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক সংকট

বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জ্ঞানতীর্থ, যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা, মতের বৈচিত্র্য এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্কের মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞানের জন্ম হয়। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই যদি কোনো শিক্ষক ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাস, দার্শনিক অবস্থান কিংবা মতাদর্শের কারণে নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অপমান, অনলাইন অপপ্রচার অথবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনাগুলো তাই শুধু ব্যক্তিগত অধিকার কিংবা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির গভীর সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (Michel Foucault) শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা (Disciplinary Power) ধারণা এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ফুকোর মতে, ক্ষমতা কেবল প্রত্যক্ষ শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে না; শাস্তির সম্ভাবনা মানুষের আচরণেও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে। ধরা যাক, একজন শিক্ষক রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পর প্রশাসনিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেন। তাঁর সহকর্মীরা তখন ভাবতে পারেন, অনুরূপ মত প্রকাশ করলে তাঁদেরও একই পরিণতি হতে পারে। ফলে প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতা (Self-Censorship) এবং ভীতিনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এই উদ্বেগ কেবল তাত্ত্বিক নয়। আন্তর্জাতিক সংগঠন Scholars at Risk-এর Free to Think 2025 প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বের ৪৯টি দেশ ও অঞ্চলে উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট ৩৯৫টি আক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষক-গবেষকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গবেষণার স্বাধীনতা, শিক্ষার গুণগত মান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

এখানে আন্তর্জাতিক নীতিগত অবস্থানও সুস্পষ্ট। ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel শিক্ষক ও গবেষকদের পাঠদান, গবেষণা, মতপ্রকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা এবং পেশাগত সংগঠনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ৫৬(২) ধারাতেও শিক্ষকদের রাজনৈতিক মত পোষণ ও আইনসংগত সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতার স্বাধীনতা সুরক্ষার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতভিন্নতা নিজেই পেশাগত অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।

তবে স্বাধীনতা কখনো অসদাচরণের দায়মুক্তি নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তদন্ত করতে এবং প্রমাণিত অপরাধে বিধিসম্মত ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সে প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া (Due Process) এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

যে বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্নমতের শিক্ষককে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়কে শাস্তির ভিত্তি করে, সে প্রতিষ্ঠান শুধু একজন শিক্ষকের অধিকারই সংকুচিত করে না; শিক্ষার্থীদের কাছেও স্বাধীন চিন্তার পরিবর্তে নীরব আনুগত্যের বিপজ্জনক শিক্ষা পৌঁছে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা তাই ক্ষমতা প্রয়োগে নয়, বরং মতের ভিন্নতার মধ্যেও ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার সক্ষমতায় নিহিত।

ভিন্নমতের কারণে শিক্ষককে শাস্তি: একাডেমিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট

বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষক ও গবেষকরা রাজনৈতিক বিশ্বাস, মতাদর্শ কিংবা দার্শনিক অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করবেন—এটিই উচ্চশিক্ষার মৌলিক আদর্শ। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক যদি ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণের কারণে নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অপমান, অনলাইন হয়রানি কিংবা একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার মতো ব্যবস্থার শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নাকি একাডেমিক স্বাধীনতার সংকোচন?

এই সংকট ব্যাখ্যায় মিশেল ফুকোর (Michel Foucault) শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা (Disciplinary Power) ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। ফুকোর বিশ্লেষণ অনুসারে, ক্ষমতা শুধু প্রত্যক্ষ শাস্তির মাধ্যমে কাজ করে না; সম্ভাব্য শাস্তির আশঙ্কাও ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক মতপ্রকাশের কারণে প্রতিকূল ব্যবস্থার মুখোমুখি হলে অন্য শিক্ষকরাও আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতা (Self-Censorship) অবলম্বন করতে পারেন। ফলে স্বাধীন গবেষণা, সমালোচনামূলক পাঠদান এবং প্রতিষ্ঠানের নীতিগত জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই আশঙ্কার আন্তর্জাতিক প্রমাণও রয়েছে। Scholars at Risk-এর Free to Think 2025 প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৪৯টি দেশ ও অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ৩৯৫টি আক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশও প্রতিবেদনের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত। গবেষক-শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ শিক্ষার গুণমান, গবেষণার স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, প্রতিবেদনটি তা বিশ্লেষণ করেছে।

আন্তর্জাতিক নীতিগত ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট। ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel শিক্ষক ও গবেষকদের পাঠদান, গবেষণা, মতপ্রকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা এবং পেশাগত সংগঠনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা স্বীকার করে। এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, তবে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ৫৬(২) ধারা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শিক্ষকের রাজনৈতিক মত পোষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আইনসংগত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার স্বাধীনতার প্রতি চাকরির শর্ত নির্ধারণে বিরূপ আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আদেশের ৫৬(৩) ধারায় শিক্ষককে অপসারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কারণ ও তদন্তের বিধান রয়েছে।

অবশ্য একাডেমিক স্বাধীনতা সহিংসতা, হয়রানি কিংবা প্রমাণিত পেশাগত অসদাচরণ থেকে দায়মুক্তি দেয় না। বিশ্ববিদ্যালয় আইনানুগ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে; কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শিক বিরোধকে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত দায়িত্ব শুধু অভিযোগের বিচার নয়; অভিযুক্ত শিক্ষকের নিরাপত্তা, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা। কারণ ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে সাময়িক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, কিন্তু স্বাধীন জ্ঞানচর্চার ভিত্তিতে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে না।

শিক্ষক অনিরাপদ হলে প্রথম মূল্য দেয় শিক্ষার্থী: ক্ষতির শুরুটা নীরবে

একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের অধিকার এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অধিকার অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

ধরা যাক, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থী একটি গবেষণাপত্র লিখছেন। তাঁর তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। হঠাৎ সেই শিক্ষক দীর্ঘ সময়ের জন্য একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকলে শিক্ষার্থীকে নতুন তত্ত্বাবধায়ক খুঁজতে হতে পারে। gfhfv নতুন শিক্ষক দক্ষ হলেও গবেষণার পদ্ধতি, তাত্ত্বিক অবস্থান কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। এতে শিক্ষার্থীর গবেষণা শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

আরেকটি ক্ষেত্রে কোনো বিভাগের অভিজ্ঞ শিক্ষক পাঠদান থেকে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর কোর্স অন্য শিক্ষককে নিতে হয়। এতে কর্মভার বাড়তে পারে, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত পাঠদানের সুযোগ কমে যেতে পারে।—এসব পরিস্থিতির সব কটিই ঘটবে, এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা নিলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘ অনিশ্চয়তা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

শিক্ষার্থীদের ওপর আরও সূক্ষ্ম একটি প্রভাব পড়ে—তাঁদের শেখার পরিবেশ বদলে যায়। যখন শিক্ষার্থীরা দেখেন, কোনো শিক্ষক ভিন্নমত প্রকাশের কারণে সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন তাঁরাও নিজের মতপ্রকাশ সম্পর্কে সতর্ক হতে পারেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ গুরুত্ব না পেলে তাঁদের মধ্যেও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। সুতরাং শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং শিক্ষকের নিরাপত্তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ হিসেবে দেখানো ভুল।

শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষার নামে শিক্ষকের ন্যায়বিচার অস্বীকার করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি শিক্ষকের একাডেমিক স্বাধীনতার নামে শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।—দুটি অধিকারের ভিত্তি একই—মর্যাদা, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহি।

একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে শেখায় কীভাবে যুক্তি দিয়ে দ্বিমত করতে হয়। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যদি পরস্পরকে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে শিক্ষাগত সম্পর্কটি ক্রমে ক্ষমতার সংঘাতে পরিণত হতে পারে। gfhfv শিক্ষক তখন হয়তো শিক্ষার্থীদের প্রশ্নকে ভয় পাবেন। শিক্ষার্থী শিক্ষকের মূল্যায়নকে সন্দেহ করবেন। উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের জায়গা সংকুচিত হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃত শিক্ষা। কারণ ভালো শিক্ষা শুধু পাঠদান ও পরীক্ষা দিয়ে তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন এমন সম্পর্ক, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই ভুল স্বীকার, সংশোধন এবং নতুন ধারণা গ্রহণ করার সুযোগ পান।

স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়: রাষ্ট্র আসলে কী হারাচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-নিরাপত্তাহীনতার প্রভাবকে সময়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করলে দুটি স্তর দেখা যায়। প্রথমটি তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি। দ্বিতীয়টি দীর্ঘমেয়াদি এবং তুলনামূলকভাবে গভীর।  স্বল্পমেয়াদে ক্ষতির মধ্যে থাকতে পারে ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন, গবেষণা তত্ত্বাবধানে বিলম্ব, বিভাগীয় কার্যক্রমে বিঘ্ন, কর্মপরিবেশে উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক ও আইনি ব্যয় বৃদ্ধি।

অভিযোগ তদন্ত, আপিল, মামলা কিংবা শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় ও সম্পদ ব্যয় হয়। এসব ব্যয় অবশ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় খরচও হতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অস্বচ্ছতা, অদক্ষতা বা অকারণ বিলম্ব সেই ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।যদি শিক্ষক একাডেমিক দায়িত্ব পালন করতে না পারেন কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী বেতন পেতে থাকেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠান অর্থ ব্যয় করছে, অথচ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পূর্ণ পেশাগত সেবা ব্যবহার করতে পারছে না।—এটিকে কেবল বেতনের অর্থের ক্ষতি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সময়, গবেষণার অগ্রগতি এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার বিষয়ও জড়িত।

দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি আরও উদ্বেগজনক।

  • প্রথমত, মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ কমতে পারে। তাঁরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপরিবেশকে অনিরাপদ বা রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত মনে করেন, তাহলে অন্য পেশা কিংবা বিদেশে গবেষণার সুযোগকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
  • দ্বিতীয়ত, গবেষণার ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চললে জাতীয় সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় প্রমাণ তৈরি কমে যেতে পারে।
  • তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা দায়িত্ব বণ্টনে যদি মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি প্রভাব ফেলে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
  • চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণা সহযোগিতা গড়ে ওঠে দক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং নৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে। অস্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা সহযোগিতার সুযোগকে দুর্বল করতে পারে।
  • পঞ্চমত, সমাজের জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি রাষ্ট্র যখন শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতি তৈরি করে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি গবেষকরা ভয় বা চাপের কারণে স্বাধীনভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে না পারেন, তাহলে নীতিনির্ধারকেরা প্রয়োজনীয় সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি জাতীয় উন্নয়ন ও সুশাসনের সমস্যায় পরিণত হয়।—এই প্রক্রিয়াকে বোঝাতে মানবপুঁজি তত্ত্বের (Human Capital Theory) একটি ধারণা ব্যবহার করা যায়। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা এবং উৎপাদনশীল সক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু দক্ষ শিক্ষক ও গবেষক তৈরি করতে যে দীর্ঘ সময় এবং সামাজিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্র একজন শিক্ষককে গড়ে তুলতে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করে। তারপর সেই শিক্ষককে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ না দিলে বিনিয়োগের সামাজিক প্রতিদান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।—একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ক্ষতি তাই শুধু একটি চাকরির ক্ষতি নয়; অনেক সময় তা ভবিষ্যতের অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্য জ্ঞানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার সূচনা।

তাহলে পথ কোথায়? নিরাপদ ও স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে সংস্কার জরুরি

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এই সংকট সমাধানে কেবল বিবৃতি, মানববন্ধন কিংবা সাময়িক প্রশাসনিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন স্থায়ী ব্যবস্থা, যা ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অধিকার সমানভাবে রক্ষা করবে।

  • প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সুস্পষ্ট Academic Freedom and Institutional Safety Policy বা একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন।—এই নীতিমালায় পাঠদান, গবেষণা, প্রকাশনা, মতপ্রকাশ, পেশাগত সংগঠনে অংশগ্রহণ এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশের অধিকার নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা-নৈতিকতা, শিক্ষক-আচরণ, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার সীমাও পরিষ্কার করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্ত কমিটিতে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না, সদস্যদের যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা কীভাবে যাচাই হবে এবং অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর অধিকার কীভাবে রক্ষিত হবে, তা লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
  • তৃতীয়ত, অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য যুক্তিসংগত সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। জটিল তদন্তে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে, কিন্তু বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা ও পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা থাকা উচিত। কোনো শিক্ষককে অনির্দিষ্ট সময় দায়িত্বহীন অবস্থায় রাখা যেমন সমস্যা, তেমনি যথাযথ তদন্ত ছাড়াই গুরুতর অভিযোগ নিষ্পত্তি করাও অন্যায়।
  • চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক একটি স্বাধীন অভিযোগ ও প্রতিকারব্যবস্থা প্রয়োজন। এটি হতে পারে ন্যায়পাল বা University Ombudsperson ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মীরা নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারবেন। তবে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া, ক্ষমতা, প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হবে।
  • পঞ্চমত, মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ সুরক্ষার জন্য পেশাগত সহায়তা চালু করতে হবে। গোপনীয় কাউন্সেলিং, সংকটকালীন সহায়তা, হয়রানি প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ এর অংশ হতে পারে। চিকিৎসা গ্রহণের তথ্য যেন পদোন্নতি বা পেশাগত মূল্যায়নে বৈষম্যের কারণ না হয়, সেই নিশ্চয়তাও জরুরি।
  • ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন হয়রানি মোকাবিলার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি এলে নিরাপত্তামূলক সহায়তা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে আইনগত সহযোগিতার প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
  • সপ্তমত, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ এবং বিষয়ভিত্তিক মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে পাঠদানের দক্ষতা, গবেষণার মান, পেশাগত সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • অষ্টমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবদ্ধ প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর করতে হবে। প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচন, সভা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
  • নবমত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষার কর্মপরিবেশ নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। এই মূল্যায়নে শিক্ষকের নিরাপত্তাবোধ, অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়, বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ, গবেষণার স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
  • দশমত, একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সূচক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে সূচকটি যেন শুধু আনুষ্ঠানিক নম্বর দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিণত না হয়। এর জন্য স্বতন্ত্র গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, অংশগ্রহণকারীর গোপনীয়তা এবং ফলাফল প্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োজন।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হবে সাংস্কৃতিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় সব পক্ষকে মেনে নিতে হবে—বিরোধী মতের অধিকার রক্ষা করা নিজের মতের অধিকার রক্ষারই অংশ। cjbbf, আজ যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পাচ্ছেন, কাল তিনি সংখ্যালঘু অবস্থানে যেতে পারেন। তাই ব্যক্তির পরিচয় নয়, নীতির স্থায়িত্বই হতে হবে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি।—সুশাসন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য তৈরি করা যায় না। সেটি সবার জন্য কার্যকর হতে হয়।

গানে গানে ভাঙবে ভয়ের শিকল, জাগবে স্বাধীন জ্ঞান: শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষায় নতুন সংগীতের আহ্বান

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার কিংবা সনদ প্রদানের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের মুক্তচিন্তা, সত্য অনুসন্ধান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের জাগরণেরও ইতিহাস। কিন্তু যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিজের মতপ্রকাশ নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন না কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, সেখানে স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই বাস্তবতার মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তাৎপর্যকে সংগীতের ভাষায় তুলে ধরতেই অধিকারপত্রের Songs of Education & Rights উদ্যোগে পরিকল্পিত হয়েছে নতুন বাংলা–ইংরেজি সিনেম্যাটিক সংগীত ‘কারার ঐ লৌহকপাট: ভাঙবে শিকল, জাগবে জ্ঞান | Break the Chains, Let Knowledge Rise’।

Attention একবার গানটি শুনেই দেখুন!🎧 **Listen to the full song on Odhikarpatra’s YouTube Channel: ভাঙবে শিকল, জাগবে জ্ঞান | Break The Chains! 🇧🇩 Epic Bilingual Song for Academic Freedom

গানটির মূল অনুপ্রেরণা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিবাদী চেতনা এবং লৌহকপাট ও শিকল ভাঙার প্রতীকী ভাষা। তবে এটি নজরুলের মূল গানের পুনর্নির্মাণ নয়; বরং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, শিক্ষক-নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার নিয়ে রচিত একটি স্বতন্ত্র দ্বিভাষিক সংগীত। এখানে লৌহকপাট কোনো বাস্তব কারাগারের দরজা নয়; এটি ভয়, অপপ্রচার, অন্যায় ও মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। আর শিকল ভাঙার আহ্বান সহিংসতার নয়, বরং যুক্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মাধ্যমে সেই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার প্রত্যয়।

গানের শুরুতে একটি নীরব শ্রেণিকক্ষের চিত্র ফুটে ওঠে। শিক্ষকের অনুপস্থিতি, অব্যক্ত উদ্বেগ এবং শিক্ষাঙ্গনের অনিশ্চয়তা শ্রোতাকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিক্ষক যদি স্বাধীনভাবে শেখাতে না পারেন, তাহলে শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে শিখবেন কীভাবে? শান্ত পিয়ানো, বিষণ্ন চেলো এবং একক কণ্ঠের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংগীতটি ধীরে ধীরে প্রতিবাদী অর্কেস্ট্রা, বাংলার ঢোল, গিটার এবং সম্মিলিত কণ্ঠের বিস্তারে রূপ নেয়। ব্যক্তিগত বেদনা তখন পরিণত হয় সমষ্টিগত দায়িত্ববোধে।

গানটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শিক্ষকের অধিকার এবং শিক্ষার্থীর অধিকারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং উভয়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে একই বিশ্ববিদ্যালয়-দর্শনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গানের ইংরেজি উচ্চারণ—Safe to Teach, Free to Learn—এই সম্পর্ককে সহজভাবে প্রকাশ করে। শিক্ষক নিরাপদে পাঠদান করবেন, শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করবেন এবং অভিযোগ উঠলে প্রত্যেকেই ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার সুযোগ পাবেন—এটিই একটি মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশিত পরিবেশ।

সংগীতটিতে অনলাইন অপপ্রচার, ব্যক্তিগত অপমান, ভয়ভীতি এবং মতাদর্শিক বিভাজনের মতো বিষয়ও স্থান পেয়েছে। তবে গানটি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে রচিত নয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ অপরাধের সমার্থক নয়; আবার একাডেমিক স্বাধীনতাও প্রমাণিত অসদাচরণের দায়মুক্তি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

গানের মধ্যভাগে একজন শিক্ষকের মানবিক পরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন; তাঁর পরিবার, স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধ রয়েছে। পেশাগত অনিশ্চয়তা তাই শুধু তাঁর কর্মজীবনের সংকট নয়, পরিবারের জীবনেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর কণ্ঠে উঠে আসে স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার এবং ভয়মুক্ত পরিবেশে শেখার আকাঙ্ক্ষা। এই দুই কণ্ঠের মিলনই গানটির মানবিক আবেদনকে গভীর করে তোলে।

সংগীতের চূড়ান্ত পর্যায়ে একক কণ্ঠ পরিণত হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উচ্চারণে—‘ভাঙবে শিকল, জাগবে জ্ঞান, মুক্ত হোক বিশ্ববিদ্যালয়!’

এর ইংরেজি প্রতিধ্বনি—Break the Chains, Let Knowledge Rise—গানটিকে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক একাডেমিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ভৌগোলিকভাবে কোনো একটি দেশে অবস্থিত হলেও স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, গবেষণার নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদার আদর্শ বিশ্বজনীন।

গানটির শেষাংশে অর্কেস্ট্রা থেমে যাওয়ার পর একক কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘জ্ঞান স্বাধীন... মানুষ স্বাধীন...’। শুরুতে যে নীরবতা ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক, শেষের সেই নীরবতা হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদা, বিবেক এবং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।

অধিকারপত্রের এই সংগীত উদ্যোগের উদ্দেশ্য তাই কেবল শ্রোতাদের বিনোদন দেওয়া নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নকে সাংস্কৃতিক আলোচনায় নিয়ে আসা। আমরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই—যেখানে মানুষ ভয়ে নীরব থাকবেন, নাকি যেখানে যুক্তিসংগত প্রশ্ন, গবেষণা ও মতভিন্নতার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞানের জন্ম হবে?

‘ভাঙবে শিকল, জাগবে জ্ঞান’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মুক্তি কেবল প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনে নয়; শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, স্বাধীন চিন্তা এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত। কারণ একটি নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দক্ষ স্নাতক তৈরি করে না; এটি এমন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তুলতে পারে, যাঁরা আগামী পৃথিবীকে আরও ন্যায়সংগত, মানবিক এবং বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

শেষ কথা: একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে তার আচরণ দেখে

বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রায়ই জাতির বিবেক বলি। কথাটি সুন্দর। কিন্তু এর সঙ্গে একটি কঠিন দায়িত্বও যুক্ত আছে। বিবেকের কাজ শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নয়। নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অন্যায় হলে সেটিও স্বীকার করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর অধিকার লঙ্ঘন করলে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আবার কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক মত, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক বিরোধের কারণে অন্যায় আচরণের শিকার হলে তাঁর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

এই দুটি দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একই ন্যায়বোধের দুটি প্রকাশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেমন, তা কেবল তার সবচেয়ে জনপ্রিয় অধ্যাপক কিংবা সবচেয়ে সফল শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায় সেই শিক্ষকটির অভিজ্ঞতা দিয়েও, যিনি প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। বোঝা যায় সেই শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা দিয়ে, যিনি প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন। cljck ich, তাঁরা কি নিরাপদে কথা বলতে পারেন? তাঁদের অভিযোগ কি গুরুত্ব পায়? তাঁরা কি ন্যায়বিচারের বাস্তব সুযোগ পান? — এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক চরিত্র প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সংকট নিয়ে আলোচনা করার সময় তাই শিক্ষক-নিরাপত্তাকে আলাদা কোনো পেশাগত দাবি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি শিক্ষার মান, গবেষণার স্বাধীনতা, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।—যে রাষ্ট্র মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়, তাকে মেধাবী মানুষের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।—যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়, তাকে নিজের প্রতিষ্ঠানেও সত্য অনুসন্ধানের পথ খোলা রাখতে হবে। আর যে প্রশাসন ন্যায়বিচারের কথা বলে, তাকে সেই ন্যায়বিচার প্রয়োগ করতে হবে পছন্দের ও অপছন্দের সবার ক্ষেত্রে।—একজন শিক্ষকের নিরাপত্তা তাই কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। এটি একটি ন্যায়সংগত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত।

শেষ প্রতিফলন: যে চেয়ারটি খালি রইল

ফিরে যাওয়া যাক সেই শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষার্থীরা বসে আছেন। সামনে শিক্ষকের চেয়ারটি খালি। হয়তো শিক্ষকটি তদন্তের মুখোমুখি। হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। হয়তো তিনি নিজেই অন্যায় আচরণের শিকার বলে দাবি করছেন। আমরা এখনো সব সত্য জানি না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়—সত্য জানার জন্য একটি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন। আর সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলে শুধু একজন মানুষ নন, একটি শিক্ষাগত সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিক্ষার্থীরা হয়তো অন্য শিক্ষকের কাছে পড়বেন। পরীক্ষা হবে। ফল প্রকাশিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্নাতকের সংখ্যা যোগ হবে।কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা তাঁদের কী শেখাবে? তাঁরা কি শিখবেন, অভিযোগের বিচার প্রমাণ দিয়ে হয়? নাকি শিখবেন, শক্তিশালী পক্ষের অবস্থান বুঝে কথা বলতে হয়? তাঁরা কি শিখবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিক দায়িত্ব? নাকি শিখবেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে নীরব থাকাই ভালো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু বই থেকে আসে না। প্রতিষ্ঠান তার আচরণের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়।—সেই শিক্ষা কখনো সাহসের, কখনো ন্যায়বিচারের, কখনো সহমর্মিতার। আবার ভুল ব্যবস্থাপনায় সেটি ভয়, অবিশ্বাস ও আনুগত্যের শিক্ষায় পরিণত হতে পারে।

তাই একটি প্রশ্ন রেখে শেষ করা প্রয়োজন—যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিজেই ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চিত, সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কীভাবে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং স্বাধীনতার পাঠ শেখাবে? কারণ একটি শ্রেণিকক্ষের খালি চেয়ার শুধু একজন শিক্ষকের অনুপস্থিতি বোঝায় না।—কখনো কখনো সেটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কথাও মনে করিয়ে দেয়। আর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দায়িত্ব শুধু শিক্ষকের নয়, শুধু প্রশাসনেরও নয়—সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের।

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com

#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #উচ্চশিক্ষা #বিশ্ববিদ্যালয় #একাডেমিকস্বাধীনতা #শিক্ষকনিরাপত্তা #মানবাধিকার #শিক্ষারমান #শিক্ষাসংস্কার #শিক্ষকঅধিকার #মানসিকস্বাস্থ্য #বিশ্ববিদ্যালয়স্বায়ত্তশাসন #ন্যায়বিচার #AcademicFreedom #HigherEducation #FacultyRights #TeacherSafety #HumanRights #UniversityGovernance #MentalHealth #QualityEducation #InstitutionalAccountability