odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 5th November 2026, ৫th November ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নতুন প্রতিবেদন: ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকার, একাডেমিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সংকট

বিশ্ববিদ্যালয় যখন রাজনৈতিক প্রতিশোধের ক্ষেত্র: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষকের মর্যাদা ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ November ২০২৬ ১০:৩৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ November ২০২৬ ১০:৩৯

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম- দেশচিন্তা

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বরখাস্ত, সাময়িক বহিষ্কার, পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা এবং পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ৩ নভেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে এই বিশেষ বিশ্লেষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত অধিকার, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সংকট পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাই এই ফিচারের মূল প্রতিপাদ্য।

পূর্ব ঘোষণা - Disclaimer

এই প্রতিবেদনটি Human Rights Watch (HRW)-এর ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে অধিকারপত্রের নিজস্ব ভাষা, বিশ্লেষণ ও সম্পাদকীয় কাঠামোয় প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি মূল প্রতিবেদনের সরাসরি অনুবাদ নয়। এখানে উল্লিখিত তথ্য ও অভিযোগের দায় সংশ্লিষ্ট মূল সূত্রের। প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। 

মূল প্রতিবেদন—Human Rights Watch⁠ দেখতে ক্লিক করুন: Human Rights Watch (3 November 2026). Bangladesh: Academics Allegedly Targeted for Supporting Hasina: Political Revenge Would Violate Rights.

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক, মুক্তচিন্তার আশ্রয় এবং ভিন্নমতের সহাবস্থানের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো যখন পরিবর্তিত হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাজনৈতিক পালাবদলের উত্তাপের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি পরিসর রক্ষা করতে হয়, যেখানে শিক্ষক তাঁর বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারেন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং প্রশাসন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে তাঁর কাজ, আচরণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গৃহীত বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ ও মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই কি আবার রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই ও মতাদর্শিক আনুগত্য নির্ধারণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে?

৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (Human Rights Watch—HRW) প্রতিবেদন “Bangladesh: Academics Allegedly Targeted for Supporting Hasina: Political Revenge Would Violate Rights” এই প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত, পাঠদান থেকে বিরত রাখা, পদোন্নতি আটকে দেওয়া, বহিষ্কার এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনটি নিছক কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয় নয়। এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কি নাগরিকের রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিচারক হবে, নাকি আইন, প্রমাণ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চরিত্রকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক চর্চা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য চাপিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়; একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়া এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করাও এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ন্যায়বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে। আগের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারও বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে সহযোগিতার অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, আবার কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগও থাকতে পারে। অতএব, কোনো অভিযোগকে তদন্তের বাইরে রাখার প্রশ্ন নেই। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো শিক্ষক যদি সহিংসতা, নির্যাতন, বেআইনি আটক, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা শিক্ষার্থীদের অধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন, কোনো রাজনৈতিক প্যানেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ কিংবা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অপরাধের দায় ব্যক্তির নিজের কাজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে; রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

এই জায়গাতেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে গৃহীত ব্যবস্থাগুলো কি প্রকৃত অপরাধের অনুসন্ধান ও জবাবদিহির ফল, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে শাস্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

বিশটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়: অভিযোগ, তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিস্তার

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাকরি থেকে অব্যাহতি, সাময়িক বরখাস্ত, পাঠদান থেকে বিরত রাখা, প্রশাসনিক দায়িত্ব সীমিত করা, পদোন্নতি আটকে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার এবং পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা।

প্রতিবেদনটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনগুলোর বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ-সমর্থক শিক্ষকদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এই তথ্যের তাৎপর্য শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, একটি অনলাইন গ্রুপের সদস্যপদ বা রাজনৈতিক যোগাযোগ কি নিজেই কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রমাণ? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, উদ্দেশ্য এবং আইনভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যাচাই না করে এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় কি না, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৪৪ জন শিক্ষককে তাঁদের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আরও ২৫ জন শিক্ষকের পাঠদান কার্যক্রম সীমিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয়জন শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং আরও ১৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশাসনিক পার্থক্য স্মরণ করা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষককে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং তদন্ত শেষে স্থায়ী শাস্তি দেওয়া—তিনটি পৃথক প্রশাসনিক বিষয়। প্রতিটির আইনগত ভিত্তি, যুক্তি ও প্রক্রিয়াগত শর্ত আলাদা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, বিভাগীয় কার্যক্রম কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হলে, আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিচ্যুত না করেও তাঁর পেশাগত জীবন গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পরিচয় শুধু তাঁর পদবি বা বেতনকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক, একাডেমিক প্রকাশনা, পেশাগত মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন—সবকিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো তদন্তের অজুহাতে দীর্ঘদিন একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হলে সেটির প্রভাব ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে জ্ঞান উৎপাদন ও শিক্ষার পরিবেশেও পড়ে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের ঘটনাও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর দাবি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে ১২ জন শিক্ষককে বরখাস্ত, অপসারণ কিংবা তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় এবং আরও ৩৪ জনের কার্যক্রম সীমিত করে বা তাঁদের পদাবনতি ঘটায়। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ হলো, এ ক্ষেত্রে অনুসৃত তদন্তপ্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইননির্ধারিত শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রতিবেদনে ১২ জন শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্ত, আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি না পাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, তদন্তপ্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এই সংখ্যাগুলোকে কেবল প্রশাসনিক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন শিক্ষক, তাঁর পরিবার, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, গবেষণার অসমাপ্ত কাজ এবং বহু বছরের পেশাগত অর্জন। একই সঙ্গে অভিযোগের শিকার শিক্ষার্থী বা শিক্ষক যদি সত্যিই কোনো অপরাধে যুক্ত থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যায়বিচার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার নয়।

অভিযোগের বিচার, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার?

প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমানের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি ২০১৭ সাল থেকে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি ছাত্র আন্দোলনকে অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, তারা আলোচনাটির ভিডিও পর্যালোচনা করে সেখানে এমন মন্তব্যের প্রমাণ পায়নি। আরেকটি অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তিনি গণহত্যায় উসকানি দিয়েছিলেন। অধ্যাপক মশিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আয়োজিত বৈঠক ছিল, যেখানে উপাচার্যদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্থায়ীভাবে সাময়িক বরখাস্ত করার সুপারিশ করে এবং তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এইচআরডব্লিউর পর্যালোচনা কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। অধ্যাপক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার। তবে কোনো অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত বক্তব্য ও প্রমাণের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে টেলিভিশনের মতো প্রকাশ্য মাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে মূল ভিডিও, পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও প্রাসঙ্গিক অংশ যাচাই না করে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

একটি অভিযোগ গুরুতর হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হলেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা হয়ে যায় না। উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ঘটনা: দৃশ্যমান প্রমাণের গুরুত্ব

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পূর্বা ইসলাম ও অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারের ঘটনা এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিশন মিছিলটিকে ‘সন্ত্রাসী’ মিছিল হিসেবে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুকে প্রকাশিত মিছিলটির একটি ভিডিও পর্যালোচনা করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, সেখানে একদল মানুষকে স্লোগান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়; সরাসরি সংঘর্ষ বা সহিংসতার দৃশ্য দেখা যায়নি।

ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকারের কথিত নিপীড়ন ও গণহত্যার সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এইচআরডব্লিউর পর্যালোচিত ভিডিওতে তাঁকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণহত্যাকে সমর্থন করেছিলেন। অধ্যাপক খন্দকার এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, আন্দোলনের পুরো সময় তিনি ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করছে।

এই ঘটনাগুলো একটি মৌলিক গবেষণাগত প্রশ্ন সামনে আনে: অভিযোগের ভাষা এবং দৃশ্যমান প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে? তদন্তে ব্যবহৃত ভিডিও, ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের সত্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে? অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য কি নথিভুক্ত হয়েছে? তদন্ত কমিটি কি ভিন্নমত বা বিপরীত প্রমাণ বিবেচনা করেছে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো তদন্ত কমিটি যদি একটি ভিডিওকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সেই ভিডিওর পূর্ণাঙ্গতা, উৎস, সময়, স্থান এবং প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা অপরিহার্য। আংশিক দৃশ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির সম্পূর্ণ ভূমিকা নির্ধারণ করা গবেষণাগতভাবেও দুর্বল, প্রশাসনিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দৃশ্যমান প্রমাণের ব্যাখ্যা এবং প্রমাণের প্রকৃত অর্থ এক জিনিস নয়।

শিক্ষার্থীদের অধিকার: অপরাধের দায় ব্যক্তিগত, শিক্ষার অধিকার সর্বজনীন

শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়টি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং তাঁদের পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা হয়। একটি তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি জানিয়েছিল, এসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় সম্পৃক্ততার ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, আরও ২৭৭ জন আওয়ামী লীগ-সমর্থক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে দায়ের করা মামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা না নিলেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তাঁদের অনেকে ক্যাম্পাসে আসছেন না। অভিযুক্তদের অনেকে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, কোনো শিক্ষার্থী যদি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, নির্যাতন, ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো অপরাধে অংশ নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো শিক্ষার্থী যদি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক হন, রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন কিংবা পূর্ববর্তী সরকারের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে শুধু সেই পরিচয়ের কারণে তাঁর শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।

একজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা, পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা কিংবা ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা তাঁর শিক্ষাজীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। সনদ আটকে থাকলে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, বৃত্তি কিংবা গবেষণার সুযোগ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলেও শিক্ষার্থী সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষার নামে শিক্ষার অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। বরং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো, প্রমাণ দেখানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ যেন অযৌক্তিকভাবে বিপন্ন না হয়, সে ব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে শুধু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, একজন অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও জ্ঞানার্জনে আগ্রহী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কী বলে?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কয়েকটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা—এসব কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের জন্য সংরক্ষিত অধিকার নয়। এগুলো রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।

সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ২০ অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি বা International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২২ অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়েছে। ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায়সংগত বিচার ও আইনের সামনে সমতার গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে।

অবশ্য এসব অধিকার সীমাহীন নয়। অন্যের অধিকার রক্ষা, জননিরাপত্তা এবং আইনসম্মত বৈধ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোয় রয়েছে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং বৈষম্যহীন হতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্বাসকে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শাস্তি দেওয়া এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অপরাধমূলক আচরণ এক নয়। একজন শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচক হতে পারেন, এমনকি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু তাঁর কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড যদি আইন ভঙ্গ করে, তাহলে সেই কর্মকাণ্ডের বিচার হবে আইন অনুযায়ী। একইভাবে কোনো শিক্ষক আন্দোলনের বিরোধিতা করলেই তাঁকে অপরাধী বলা যায় না; আবার আন্দোলনের সমর্থক হলেই তাঁর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় না।

মানবাধিকারের এই নীতির প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষমতাসীনদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। যে অধিকার কেবল নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের জন্য চাওয়া হয়, সেটি সর্বজনীন মানবাধিকারের ধারণা নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো রোগ: দলীয়করণ, ক্ষমতার পালাবদল ও প্রতিশোধের আশঙ্কা

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদানের প্রবণতা ছিল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

এই প্রবণতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। বিশ্ববিদ্যালয় যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক আনুগত্যের কেন্দ্র পরিবর্তন করে, তাহলে তার একাডেমিক স্বাধীনতা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ে। এক সরকারের সময়ে যে শিক্ষক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুবিধা পান, অন্য সরকারের সময়ে সেই পরিচয়ের কারণেই তিনি বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ জ্ঞানচর্চার স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে দলীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

এই সমস্যাকে শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখলে এর কাঠামোগত চরিত্র আড়ালে থেকে যাবে। কারণ দলীয়করণের সংস্কৃতি কোনো একটি দলের আবির্ভাবের সঙ্গে শুরু হয়নি এবং কোনো একটি দলের বিদায়ের মধ্য দিয়ে এর অবসানও ঘটবে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকলে প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলে একই ধরনের সংকট পুনরুৎপাদিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, প্রভোস্ট কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা, একাডেমিক অবদান ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচিত হয়? শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ? তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ? কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় কি তদন্তের গতিপথকে প্রভাবিত করে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্যক্তিগত, অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগের মধ্যে খুঁজলে চলবে না। প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, নিয়োগনীতি, শৃঙ্খলামূলক বিধান, তদন্তপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের চেতনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন দায়িত্ব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এই আন্দোলনের পটভূমিতে ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি, বৈষম্য, অধিকার, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

কিন্তু একটি আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং তার পরবর্তী সময়ে গৃহীত প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নৈতিক বা আইনগত বৈধতা এক বিষয় নয়। কোনো আন্দোলন যদি অধিকার, গণতন্ত্র ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়, তাহলে সেই আন্দোলনের পর প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাছেও একই মানদণ্ড প্রত্যাশিত হবে।

বিশেষ করে যে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আরও বেশি সংবেদনশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়ার কথা। কিন্তু যদি নতুন প্রশাসনিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা আন্দোলনের ঘোষিত অধিকারভিত্তিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এখানে কোনো ঐতিহাসিক দায় অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনের সময় বহু মানুষের প্রাণহানি, নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। যারা প্রকৃত অর্থে অপরাধে জড়িত, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সেই বিচার যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত না হয়। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধের প্রমাণ প্রয়োজন; রাজনৈতিক পরিচয়ের তালিকা নয়।

যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার জায়গা ছিল, সেটি যেন নতুন ক্ষমতাকাঠামোর কাছে আনুগত্য প্রকাশের প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়—এই সতর্কতাই এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

অপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: দুটি বিষয়কে আলাদা রাখতেই হবে

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা তুলে ধরতে গিয়ে প্রকৃত অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করা যাবে না। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় কিংবা তার আগে-পরে যদি কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনজন শিক্ষাবিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন; তাঁদের মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং অন্য একজনের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই বিচারিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে শাস্তির অভিযোগ থেকে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ থাকলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তাঁকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। আবার কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা অজনপ্রিয় হলেই তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যায় না।

এখানেই ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ নিহিত। ন্যায়বিচার মানে অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অন্যায় শাস্তি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই দুটি নীতি পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তার প্রভাব কেবল কর্মস্থলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাঁর ব্যক্তিগত আয়, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্পর্ক, পেশাগত পরিচয়, মানসিক সুস্থতা, গবেষণার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন।

দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে না পারা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার সুযোগ হারানো কিংবা পদোন্নতি আটকে যাওয়া একজন শিক্ষকের পেশাগত জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। সামাজিক পরিসরেও তৈরি হতে পারে অনিশ্চয়তা ও দূরত্ব। বিশেষ করে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলে একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে পারেন।

অন্যদিকে, কোনো শিক্ষক যদি সত্যিই শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বা সহিংসতায় সহযোগিতা করে থাকেন, তাহলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অভিযুক্তের পেশাগত ক্ষতি নয়, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিচারপ্রাপ্তির অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সুতরাং, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণায় শুধু বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা পদোন্নতি আটকে দেওয়ার পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ব্যক্তিগত, পেশাগত ও সামাজিক জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও নথিভুক্ত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল প্রশাসনিক আদেশের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, অধিকার, মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ইতিহাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: একটি বৃহত্তর গবেষণার আয়না

এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান অনন্য। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

কিন্তু একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা শুধু অতীতের অর্জনের ওপর নির্ভর করে না। বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বাধীন, কতটা ন্যায়সংগত এবং কতটা জবাবদিহিমূলক, তার ওপরও নির্ভর করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে যে গবেষণা প্রয়োজন, তা নিছক কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগ সংগ্রহের কাজ হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, একাডেমিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সমন্বিত অনুসন্ধান।

এ গবেষণায় অন্তত কয়েকটি মাত্রা বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

  • প্রথমত, ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং সেই পরিবর্তনে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত ও তথ্য-অনুসন্ধান কমিটিগুলোর গঠন, কার্যপরিধি, তদন্তপদ্ধতি এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও বিধিসম্মত ছিল?
  • তৃতীয়ত, অভিযুক্ত শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, অভিযোগের কপি ও প্রমাণ পাওয়ার অধিকার, নিরপেক্ষ শুনানি এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?
  • চতুর্থত, এই পরিবর্তন শিক্ষকদের ব্যক্তিগত, পেশাগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে? তাঁদের গবেষণা, প্রকাশনা, পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা প্রভাবিত হয়েছে?
  • পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ কতটা তথ্য ও প্রমাণসমর্থিত?
  • ষষ্ঠত, শিক্ষক রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দলীয়করণের দীর্ঘ ইতিহাস কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করতে হলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথি নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, তদন্ত কমিটির সদস্য, আইনজ্ঞ এবং মানবাধিকার গবেষকদের সাক্ষাৎকারও প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, নথি যাচাই, বিপরীত প্রমাণ বিবেচনা এবং গবেষণাগত নৈতিকতা অনুসরণ করতে হবে।

এ ধরনের গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হবে—কাউকে আগাম অপরাধী কিংবা নির্দোষ ঘোষণা না করে প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ও দাবিকে প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা। কারণ গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়কে যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্যভাবে নথিভুক্ত করা, যার প্রভাব বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘদিন থাকতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় কার? ক্ষমতাসীনদের, নাকি সমাজের?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কি সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সম্প্রসারিত প্রতিষ্ঠান, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য স্বাধীন জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র?

সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থায়ন করতে পারে, আইন প্রণয়ন করতে পারে, প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষককে সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে একমত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। একইভাবে শিক্ষার্থীরও রাজনৈতিক বিশ্বাস, সংগঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, যা আইনসম্মত সীমার মধ্যে সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের অর্থ কোনো শিক্ষক বা প্রশাসকের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং এর অর্থ হলো, একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক নির্দেশ, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আইন, প্রাতিষ্ঠানিক বিধি, যোগ্যতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে গৃহীত হয়।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট, সিনেট, ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং শৃঙ্খলামূলক কমিটির সদস্যদের মনে রাখতে হবে, তাঁদের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা নয়। তাঁদের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, শিক্ষার পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং প্রত্যেক সদস্যের ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষা করা।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক তাঁর মত প্রকাশ করতে ভয় পান, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত আপিল করার নিশ্চয়তা থাকে না, সেখানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

ক্ষমতার পালাবদল নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই হোক ভবিষ্যতের পথ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ৩ নভেম্বরের প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। অতীতের দলীয়করণ, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে, তার পুনরাবৃত্তি কোনো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ অভিযুক্তকে জানাতে হবে, প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দেখাতে হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাচনেও নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তির বিরুদ্ধে স্বাধীন ও কার্যকর আপিলের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন এবং একাডেমিক মূল্যায়নে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব কমিয়ে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলামূলক বিধি যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত না হয়, বরং সবার জন্য সমভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুটি দায়িত্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং একটি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে অন্যটিও সমান গুরুত্বে পালন করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার নৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে শিক্ষক গতকাল ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছিলেন, আজ তিনি বিরোধী অবস্থানে থাকতে পারেন। যে শিক্ষার্থী আজ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থক, ভবিষ্যতে তিনি তার সমালোচকও হতে পারেন। কিন্তু তাঁদের অধিকার কোনো সরকারের মেয়াদের সঙ্গে শুরু বা শেষ হতে পারে না।

শেষ কথা: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা মানে ভিন্নমতের নিরাপত্তা

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য এখানেই—বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে; ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনে বাধ্য হওয়ার স্থান এটি নয়।

এই বক্তব্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্ন রেখে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, দলীয় আনুগত্য এবং মতপ্রকাশের সংকোচনের অভিযোগ ছিল, ৫ আগস্টের পর তার বিপরীত কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করাই কি আমাদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন? নাকি প্রত্যাশিত পরিবর্তন ছিল এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ, যেখানে কোনো শিক্ষক তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে চাকরি হারানোর ভয় পাবেন না, কোনো শিক্ষার্থী তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং কোনো অপরাধী তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিচার থেকে রেহাই পাবেন না?

প্রকৃত পরিবর্তন নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টিই।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই একটি কঠিন আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অতীতের অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে নতুন অন্যায়ের ভিত্তি তৈরি করা যাবে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতাকে কেবল নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের নিরাপত্তা হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন সেখানে নিজের মতের পাশাপাশি ভিন্নমতেরও নিরাপত্তা থাকে। নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সমান মর্যাদা দেওয়া হয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মহত্ত্ব কতজন শিক্ষক কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে কতজন শিক্ষক স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন, কতজন শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন এবং কতটা নিরপেক্ষভাবে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকারের নয়, কোনো রাজনৈতিক দলেরও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান, যুক্তি, সত্য, মানবিক মর্যাদা ও মুক্তচিন্তার। ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার মানদণ্ড যেন কখনো পাল্টে না যায়।

–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বিশ্ববিদ্যালয়েরস্বাধীনতা #একাডেমিকস্বাধীনতা #মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা #রাজনৈতিকপ্রতিহিংসা #শিক্ষকঅধিকার #শিক্ষার্থীদেরঅধিকার #মানবাধিকার #ন্যায়বিচার #উচ্চশিক্ষাসংস্কার #বিশ্ববিদ্যালয়প্রশাসন #রাজনীতিরদলীয়করণ #গণতন্ত্রওশিক্ষা #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #HumanRights #AcademicFreedom #FreedomOfExpression #PoliticalRevenge #UniversityAutonomy #JusticeForAll #StudentsRights #AcademicRights #HumanRightsWatch #HigherEducation #Bangladesh