odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 26th January 2026, ২৬th January ২০২৬
ব্যালট-উৎসবের বাংলাদেশ: মাঠের গল্প, প্রান্তের রং, আর ভোটের খণ্ডচিত্রে রাজনীতির জলছবি

ভোটের হাওয়া ও কিছু খণ্ডচিত্র নিয়ে “নির্বাচন বারো রঙ্গ”: ব্যালট-উৎসবে বাংলাদেশে নির্বাচনের জলছবি ও টুকিটাকি

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৬ January ২০২৬ ০৮:৪২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৬ January ২০২৬ ০৮:৪২

—অধিকারনপত্রের বিশেষ কলাম নির্বাচনের টুকিটাকি

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে ভোটের হাওয়া, মাঠের টুকিটাকি, প্রবাসী ভোটের নতুন অধ্যায়, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নারী–সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব ও তারুণ্যের উত্থান নিয়ে অধিকারপত্রের বিশেষ কলাম “নির্বাচন বারো রঙ্গ”—যেখানে ছোট খণ্ডচিত্রের মধ্যেই ধরা পড়েছে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা।

 শীতের শেষ প্রান্তে এসে বাংলার বাতাসে এখন আর শুধু কুয়াশা নেই—আছে ভোটের গন্ধ। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইভ আড্ডা, সবখানেই ঘুরেফিরে একটাই আলোচনা—কে দাঁড়াচ্ছে, কে সরে যাচ্ছে, কার পোস্টার ছেঁড়া হলো, আর কোন প্রার্থী সকালে কোন বাজারে গেলেন। নির্বাচন মানেই কেবল ব্যালট বাক্সের হিসাব নয়; নির্বাচন মানে মানুষের কথাবার্তা, গুঞ্জন, প্রত্যাশা আর ছোট ছোট ঘটনার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বকে পড়ে নেওয়ার এক বিরল সুযোগ।

এই আবহেই আমাদের অধিকারপত্র-এর নিয়মিত আয়োজন নির্বাচন বারো রঙ্গ। এখানে থাকবে না শুধু বড় দল আর বড় নেতার গল্প; বরং থাকবে ভোটের মাঠের সেইসব টুকিটাকি—যেগুলো হয়তো খবরের শিরোনাম হয় না, কিন্তু নির্বাচনের আসল মেজাজটা ঠিকই ধরে রাখে। কোথাও এক প্রার্থী নিজের পোস্টার নিজেই ঠিক করছেন, কোথাও ভোটার তালিকা হাতে নিয়ে তরুণেরা হিসাব কষছে, আবার কোথাও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ভোটার মনে মনে ঠিক করে ফেলছেন কাকে ভোট দেবেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ যেন এক ব্যালট-উৎসবের প্রস্তুতিতে। উৎসবের মতোই এখানে আছে রং—আশার রং, সংশয়ের রং, উত্তেজনার রং। আছে আনন্দ, আছে আশঙ্কা, আছে হাস্যরসও। এই কলামে আমরা সেই রংগুলোকেই ধরার চেষ্টা করব—কখনো ব্যঙ্গের ছোঁয়ায়, কখনো মানবিক গল্পে, আবার কখনো নিখাদ পর্যবেক্ষণে।

শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে পুব আকাশে যখন নতুন সূর্য উঁকি দিচ্ছে, তখনই যেন বাংলার রাজনীতির ময়দানেও জ্বলে উঠছে উত্তাপ। দীর্ঘ নীরবতার পর গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে আবারও শোনা যাচ্ছে প্রচারণার ডামাডোল—মাইক, পোস্টার, স্লোগান আর সোশ্যাল মিডিয়ার উত্তাল ঢেউ।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন হয়ে উঠতে যাচ্ছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ক বহুল প্রত্যাশিত গণভোট। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের আঙুলের ছাপেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক অভিমুখ। আর এজন্যই বড় ছবির ফাঁকে ফাঁকে তুলে আনা হয়েছে ছোট ছোট খণ্ডচিত্র। কারণ অনেক সময় রাষ্ট্রের বড় গল্পগুলো লেখা হয় ঠিক এই ছোট ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই।

বৈচিত্র্যের ক্যানভাসে নির্বাচনী রাজনীতি

নির্বাচনের মাঠ ঠিক যেন এক বিশাল ক্যানভাস—রঙের পর রং লেগে ওঠে, ভিড়ের ভেতর থেকে খুঁজে পাওয়া যায় নতুন মুখ, নতুন গল্প। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচন সেই ক্যানভাসকে যেন আরও প্রশস্ত করেছে। প্রচারণার শব্দ, সভার উচ্ছ্বাস কিংবা ব্যানারের ভিড়ের বাইরে এবার চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য—সংখ্যালঘু, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মিলিয়ে বৈচিত্র্যের এক শক্তিশালী উপস্থিতি।

এবারের নির্বাচনে মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থীর ভিড়। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় কথা হলো—এই ভিড়ের রঙিন চরিত্র। জাতীয় রাজনীতিতে এবার যে অন্তর্ভুক্তির বাতাস বইছে, সেটি নিছক প্রতীকী নয়, বরং বাস্তবতার গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্রায় ৮০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী সরাসরি ভোটের মাঠে লড়ছেন—এ যেন বহুদিনের আড়াল ভেঙে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক নতুন দরজা খুলে যাওয়া। এর মধ্যেই ১০ জন নারী, যাদের উপস্থিতি শুধু সাহসের নয়, বরং প্রজন্মের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। তারা একাই মনোনয়ন দিয়েছে ১৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীকে। ছোট দল হলেও এই পদক্ষেপ যেন এক দৃঢ় বার্তা—রাজনীতি মানেই সংখ্যার হিসাব নয়, কখনো কখনো তা মূল্যবোধের প্রতিশ্রুতিও। বিএনপি, জামায়াতসহ ২২টি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে লড়ছেন আরও ৬৬ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী, আর স্বাধীনতার মতো সাহস নিয়ে ১২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজেদের শক্তিতে নেমেছেন নির্বাচনী যুদ্ধে।

নারীর অগ্রযাত্রার চিত্রটিও এবারে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। সব মিলিয়ে ৭৬ জন নারী প্রার্থী—রাজনীতির কঠিন পথ পাড়ি দিতে প্রস্তুত। তাদের উপস্থিতি যেন বলে, সংসদের দরজা আর আগের মতো ভারী নয়। একই সঙ্গে ভোটার তালিকায় ১,১২০ জন হিজড়া ভোটারের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে, ধীরে হলেও সমাজ বৈষম্যহীনতার পথে হাঁটছে। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘ আন্দোলনের, অবহেলিত জীবনের, স্বীকৃতির গল্প।

এই বৈচিত্র্যের ভিড়ে দলীয় পরিসংখ্যানও কম আকর্ষণীয় নয়। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা বলছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি—মোট ২৮৮ জন। তাদের পরেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও সক্রিয় উপস্থিতি দেখিয়েছে ২২৪ জন প্রার্থীর মাধ্যমে। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। নবীন পরিচয়ের দল হয়েও তারা ৩২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে—যা প্রমাণ করে, রাজনীতির পরিসর বদলে যাচ্ছে; পুরনো শক্তির মাঝে নতুন তরঙ্গ উঠছে।

নির্বাচনের এই বহুরঙা ক্যানভাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের গল্প। বঞ্চনার ইতিহাস, সংগ্রামের পথ, স্বীকৃতির তৃষ্ণা—সব মিলেই তো গণতন্ত্রের রঙ তৈরি হয়। সংখ্যালঘু প্রার্থীদের ওঠে আসা, নারী নেতৃত্বের বিস্তার, হিজড়া জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বীকৃতি—সবই বলে দেয়, বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক নতুন বাঁকে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে প্রশ্ন একটি—এই বৈচিত্র্য কি কেবল নির্বাচনমুখী প্রদর্শন, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সূচনা? উত্তরটি লুকিয়ে আছে ভোটের বাক্সে নয়, বরং নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় নীতিতে, রাজনৈতিক আচরণে এবং মানুষের জীবন পরিবর্তনের বাস্তবতায়। তবু আজ অন্তত বলা যায়—বাংলাদেশের নির্বাচনী ক্যানভাসে প্রথমবারের মতো রং লেগেছে একটু বেশি, গল্প হয়েছে একটু বড়, এবং রাজনীতি হয়েছে মানুষের আরও কাছে।

রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

এই নির্বাচনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই ছিল ‘নৌকা বনাম ধানের শীষ’। কিন্তু ২০২৬ সালের চিত্র ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনীতি ভেঙে পড়েছে তিনটি প্রধান বলয়ে।

  • প্রথম বলয়টি হলো বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য। এখানে রয়েছে বিভিন্ন বিরোধী দল, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও আন্দোলনভিত্তিক শক্তি, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিল। তাদের ভাষ্য—এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার বদল নয়, এটি একটি ‘রিসেট’।
  • দ্বিতীয় বলয়টি গড়ে উঠেছে জামায়াত–এনসিপি জোটকে ঘিরে দশ দলীয়। এটি একটি আদর্শিক ও প্রজন্মভিত্তিক ব্লক। একদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুরোনো কাঠামো, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সংগঠিত ক্ষোভ ও পরিচয়ের রাজনীতি—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ তাদের শক্তি। তারা নিজেদের তুলে ধরছে ‘বিকল্প নৈতিক রাজনীতি’র ধারক হিসেবে।
  • তৃতীয় বলয়টি হলো ইসলামী আন্দোলন ও বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলো। এই অংশটি তুলনামূলকভাবে খণ্ডিত, কিন্তু নির্দিষ্ট অঞ্চলে তাদের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ধর্মীয় আবেগ ও স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

এই নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের পেছনে কয়েকটি বড় প্রভাবক কাজ করছে। প্রথমত, জুলাই সনদ ও গণভোট। এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীর মাঠে উপস্থিতি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এটি যেমন আশ্বাস দিচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন—ভারত, চীন ও পশ্চিমা শক্তির আগ্রহ ও অবস্থান এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।

এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রবাসী ভোট। দূরের মানুষদের এই কাছাকাছি হয়ে আসা যেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। প্রশ্ন এখন একটাই—এই ভোট কি শুধু সংখ্যা হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের রাজনীতির ভাষা বদলে দেবে? উত্তর হয়তো মিলবে ফলাফলে নয়, বরং এই অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায়। কারণ ইতিহাস বলে, একবার কথা বলার সুযোগ পেলে নীরবতা আর সহজে ফিরে আসে না।

 প্রবাসী ভোট: ইতিহাসের নতুন অধ্যায়

ভোটের লাইন মানেই একসময় ছিল স্কুল মাঠ, সরকারি অফিসের উঠান কিংবা গ্রামের কাঁচা রাস্তা। কিন্তু ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে দিয়েছে। এবার ভোটের লাইন ছড়িয়ে পড়েছে লন্ডনের ঠান্ডা সকালে, দুবাইয়ের ব্যস্ত কর্মঘণ্টায়, মালয়েশিয়ার নির্মাণশ্রমিকের বিরতিতে, নিউইয়র্কের সাবওয়ের পাশে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন—দেশের বাইরে থেকেও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন তারা।

১২১টি দেশ থেকে ‘Postal Vote BD’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যালটে ভোট দিচ্ছেন প্রবাসীরা। আঙুলের ছোঁয়ায় দেওয়া এই ভোট শুধু প্রযুক্তির জয় নয়; এটি প্রবাসী জীবনের দীর্ঘ নীরবতার ভাঙন। যে মানুষগুলো বছরের পর বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, তারা এতদিন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ছিল কার্যত দর্শক। ২০২৬ সালে সেই দর্শক আসনে বসে থাকা মানুষগুলো হঠাৎই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রবাসী ভোট অনেক আসনেই হয়ে উঠতে পারে ‘কিং-মেকার’। বিশেষ করে যেসব আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কম, সেখানে প্রবাসী ভোটের ওজন নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশি আর শুধু ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ নন, তারা এখন ভোটের সমীকরণেরও শক্তিশালী অংশ।

নারী ও সংখ্যালঘু: সংখ্যা বনাম বাস্তবতা

ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের মুখে মুখে চাপা কথাবার্তা—কেউ সংসারের হিসাব কষছেন, কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে আছেন ব্যালট বাক্সের দিকে। এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়। কারণ বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে কোটি ২৮ লাখের বেশি নারী ভোটার আগামীর সংসদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। সংখ্যায় তারা শক্তিশালী, প্রভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিপুল সংখ্যার প্রতিফলন কি সত্যিই সংসদের আসনে দেখা যাচ্ছে?

পরিসংখ্যান বলছে, বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। ৩০০ আসনের সংসদে এবারে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৬ জন। অর্থাৎ ভোটার হিসেবে নারীর উপস্থিতি যতটা দৃশ্যমান, প্রার্থী হিসেবে তার ছিটেফোঁটাও ততটা নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রণীত জুলাই সনদ ২০২৫-এ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দুর্বল। ৫১টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৩০টি দলই এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।

এই বৈপরীত্য শুধু সংখ্যার নয়, এটি ক্ষমতার ভাষারও। ভোটাধিকার প্রয়োগে নারীরা যতটা দৃশ্যমান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তারা ততটাই অনুপস্থিত। ফলে ভোটকেন্দ্রের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীরা যখন ব্যালট বাক্সে রায় দিচ্ছেন, তখন সংসদের আসনে বসার প্রশ্নে তাদের কণ্ঠ যেন অনেকটাই ক্ষীণ।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এবার কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও উদ্বেগ পুরো কাটেনি। নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু ভোটের মাঠে তাদের নিরাপত্তা এখনো বড় প্রশ্ন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো নির্বাচনের সময় ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়—ভোটের উৎসব অনেক সময় সংখ্যালঘুদের জন্য উদ্বেগের কারণও হয়ে ওঠে।

তারুণ্যের উত্থান আর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ২০২৬-এর নির্বাচন

এই বাস্তবতার মাঝেই নির্বাচনের আরেকটি বড় অধ্যায় লিখছে তারুণ্য। ২০২৬ সালের ভোটার ডেমোগ্রাফিতে সবচেয়ে বড় চমক হলো তরুণ ভোটারদের বিস্ফোরণ। ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ভোটার, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথমবার ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ—যারা দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

এই প্রজন্ম কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা প্রশ্ন তোলে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব আলোচনা, ফ্যাক্টচেক আর ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের ভেতর দিয়েই তাদের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে। তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হলো সংস্কার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো। কে অতীতে কী করেছে, তার চেয়ে কে আগামী দিনে কী বদলাবে—এই প্রশ্নটাই তাদের ভোটের মানদণ্ড।

নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের শক্তি, আর তরুণদের এই বিশাল উপস্থিতি মিলিয়ে এবারের নির্বাচন যেন এক গভীর পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। সংখ্যায় যারা বেশি, তারা কি সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারবেন? নাকি ক্ষমতার কাঠামো আবারও সংখ্যার এই শক্তিকে পাশ কাটিয়ে যাবে?

২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল আসন জয়ের লড়াই নয়। এটি প্রতিনিধিত্বের ন্যায়সংগততা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ব্যালট বাক্সের ভেতরে জমা পড়া প্রতিটি ভোট শুধু একটি দল বা প্রার্থীর পক্ষে নয়—এটি একটি প্রশ্নও ছুড়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের দিকে: সংখ্যার শক্তি কি এবার বাস্তবতার শক্তিতে রূপ নেবে?

Gen-Z ভোটার: কীভাবে ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ‘গেম-চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে Gen-Z বা তারুণ্য ভোটাররা—যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ তরুণ ভোটার, যারা মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশের কাছাকাছি, তারা কোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক আনুগত্যে বাঁধা নয়। এই প্রজন্ম বড় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ আর টিকটক বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে; তাদের রাজনীতি আবেগের চেয়ে বেশি তথ্যনির্ভর, ইস্যুভিত্তিক ও ফলাফলমুখী। ‘কে ছিল ক্ষমতায়’ তার চেয়ে ‘কে কী বদলাবে’—এই প্রশ্নটাই তাদের কাছে মুখ্য। কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার, ডিজিটাল অধিকার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার—এই পাঁচটি ইস্যু Gen-Z ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণে প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে যেসব দল বা প্রার্থী কেবল পুরনো স্লোগান আর স্মৃতির রাজনীতি করছে, তাদের জন্য এই তরুণ ভোটাররা এক ধরনের নীরব প্রত্যাখ্যান হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে, যারা নতুন ভাষায়, নতুন মাধ্যমে এবং সংস্কারের স্পষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে হাজির হচ্ছে—Gen-Z তাদের হাত ধরেই ক্ষমতার সমীকরণ উল্টে দিতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এবারের নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে সবচেয়ে বড় চমক আসতে পারে এই তরুণদের ‘নীরব কিন্তু সংগঠিত’ রায় থেকেই।

শেষকথা: উৎসবনাপরীক্ষা দিন?

ফেব্রুয়ারির আকাশে হালকা বসন্তের গন্ধ। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাফেরা যেন একটু অন্য রকম। সরকারি ছুটি মিলিয়ে ১১–১২ ফেব্রুয়ারি আর শুধু ভোটের দিন নয়—এ যেন এক অঘোষিত জাতীয় উৎসবের আবহ। কোথাও শিশুরা হাতে পতাকা নিয়ে বেড়াচ্ছে, কোথাও দোকানের সামনে ঝুলছে প্রার্থীদের রঙিন পোস্টার। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের কফিশপ—সবখানেই আজ আলোচনার কেন্দ্র একটাই: ভোট।

সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে জনরায়ের প্রতিটি কাগজ যেন মানুষের আশা, ভয়, ক্ষোভ, বিশ্বাস আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। কারও কাছে এই নির্বাচন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, কারও কাছে স্থিতির আশা, আবার অনেকে দেখছেন নতুন এক বাংলাদেশের সম্ভাব্য আত্মপ্রকাশ। নির্বাচনের ফল তাই কেবল কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর বিজয় নয়; এটি হতে পারে দেশের দিকনির্দেশ বদলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

প্রতীক বরাদ্দ শেষ, প্রচারের ঢেউও এখন স্তিমিত। দেয়ালজুড়ে থাকা হাসিমুখগুলো যেন অপেক্ষা করছে বিচার দিনের। মাঠের প্রতিটি চায়ের কাপ, প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি হাঁটাপথে এখন একই প্রত্যাশা—১২ ফেব্রুয়ারি কী আসছে?”

রাজনীতির উত্তাপের ভেতরেও ভোটাররা জানেন, বিজয় মানে শুধু মালা পরা নয়; এটি দায়িত্বের ভার তুলে নেওয়া। ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে কি না, তা নিয়েই মানুষের মনে মিশে আছে আশা আর সংশয়ের দ্বন্দ্ব। তবু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের দিনটি উৎসব না পরীক্ষার দিন—তা নির্ধারণ করবে জনগণের সিদ্ধান্তই। ব্যালটের সেই নীরব কাগজগুলোই বলবে, বাংলার পথ কোন দিকে ফিরবে।বাংলার মাঠ-ঘাট, শহর-বন্দর—সবখানে আজ একটাই প্রতিধ্বনি:

১২ ফেব্রুয়ারি।

অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র, 📧 odhikarpatranews@gmail.com

#নির্বাচনবারোরঙ্গ #ত্রয়োদশনির্বাচন #জাতীয়সংসদনির্বাচন২০২৬ #ভোটেরহাওয়া #ব্যালটউৎসব #বাংলাদেশরাজনীতি #ভোটারেকথা #নির্বাচনীটুকিটাকি #মাঠেরগল্প #সংখ্যালঘুপ্রতিনিধিত্ব #নারীনেতৃত্ব #প্রবাসীভোট #তারুণ্যেরউত্থান #BangladeshElection2026 #ElectionFeatureBD #PoliticalAnalysis #VotersVoice #BallotStories #DemocracyInBangladesh #YouthVote #DiasporaVote



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: