—অধিকারপত্র | শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
শিক্ষার নামে লাখো ছাত্রছাত্রীকে False Hope দেখানো হচ্ছে! কাগজে নীতি, ক্লাসে অনিয়ম—রিয়াজের মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থী আজও হারাচ্ছে নিজের স্বপ্ন। পড়ুন পুরো রিপোর্ট এবং জানুন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সত্যিকারের চেহারা।
অনিয়মের ‘বোড়াজাল’ বনাম মেধার মরণ
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার কথা উঠলেই আমাদের মনে পড়ে এক চিরন্তন আশার গল্প। সেই গল্পে একটি দরিদ্র গ্রামের শিশু বই হাতে নিয়ে স্কুলে যায়, কারণ সে বিশ্বাস করে—শিক্ষাই তার জীবনের ভাগ্য বদলে দেবে। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—এই গল্পটি কি সত্যিই বাস্তব, নাকি এটি একটি সমষ্টিগত কল্পকাহিনি, যা আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শুনে আসছি?
আজকের বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী যেন একটি অদৃশ্য প্রতারণার জালে আটকে পড়েছে। তাদের সামনে দেখানো হচ্ছে এক বিশাল স্বপ্নের দরজা, কিন্তু দরজাটি খুলতেই দেখা যায়—ওপারে কোনো আলো নেই, আছে কেবল দুর্নীতির অন্ধকার করিডোর। এই করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে হাজার হাজার রিয়াজ হারিয়ে ফেলছে নিজের ভবিষ্যৎ।
অনিয়ম শব্দটা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ওটা একটা সুসংগঠিত ‘বোড়াজাল’। এই জালে ছোট ছোট চুনোপুঁটিরা (সাধারণ শিক্ষার্থী) আটকে প্রাণ হারায়, আর রাঘববোয়ালরা জাল ছিঁড়ে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে যায়। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস থেকে শুরু করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন—সবখানেই এখন ‘ম্যাজিক’ চলছে। যে ছেলেটি রাত জেগে লণ্ঠনের আলোয় (কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে) অংক কষেছে, সে দেখছে পাশের বাড়ির ‘ফাঁকিবাজ’ মন্টু প্রশ্নফাঁসের জাদুমন্ত্রে আকাশচুম্বী নম্বর পেয়ে হাসছে। এই হাসিটা যতটা না বিজয়ের, তার চেয়ে বেশি মেধার গালে এক সজোরে চড়। রম্য সাহিত্যের ভাষায় বললে, আগে লোকে বলত— ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। এখনকার সংস্করণ হলো— ‘তদ্বির আর টাকা দেয় যে, নিয়োগপত্র পায় সে’।
বাংলাদেশে শিক্ষা একসময় ছিল সামাজিক উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী সিঁড়ি। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে শহরের মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী—সবার কাছেই শিক্ষা ছিল ভবিষ্যৎ বদলের একমাত্র ভরসা। স্কুলের ঘণ্টা বাজলেই মনে হতো, নতুন দিনের দরজা খুলে যাচ্ছে। কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসের ভিত্তি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। কাগজে নীতি, পরিকল্পনা আর উন্নয়নের ঘোষণা যতই থাকুক, বাস্তবের শ্রেণিকক্ষে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র—অনিয়ম, অযোগ্য নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির এক জটিল চক্র। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সামনে যে স্বপ্নের পথ দেখানো হয়, তা অনেক সময় ভ্রান্ত আশায় পরিণত হয়।
এই বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে ধরা যেতে পারে রিয়াজ নামের এক কিশোরকে। ছোট্ট গ্রামের ছেলে রিয়াজ প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায় নতুন স্বপ্ন নিয়ে। শিক্ষকরা তাকে বলেন—“ভালো পড়াশোনা করো, বড় মানুষ হবে।” কিন্তু বছর পার হতে না হতেই সে বুঝতে শুরু করে, সেই প্রতিশ্রুতি অনেক সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। স্কুলে শিক্ষক অনুপস্থিত, পাঠদান অসম্পূর্ণ, আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো যেন শিক্ষার্থীর জন্য নয়, বরং অন্য কারও স্বার্থে পরিচালিত।
বাংলায় একটি অতি পরিচিত প্রবাদ আছে— ‘বিদ্যারত্ন মহাধন’। কিন্তু বর্তমান সময় ও সমাজের দিকে তাকালে মনে হয়, এই প্রবাদটি এখন ব্যাকরণ বইয়ের কোনো এক ধুলোপড়া পাতায় ‘অপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ’ হিসেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বাস্তব বলছে, বিদ্যা এখন আর অমূল্য নেই; বরং তার গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট ‘এমআরপি’ (MRP)। আর সেই দাম মেটাতে গিয়ে মেধার পকেট যখন গড়ের মাঠ, তখন শুরু হয় এক বিরামহীন ‘বোবা কান্না’।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা এখন সেই বনেদি জমিদার বাড়ির মতো হয়েছে, যার বাইরের পলেস্তারা আর নীল-সাদা চুনকামে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও ভেতরের কড়িবরগাগুলো অনিয়মের উইপোকায় কঙ্কালসার। সরস্বতীর সেই ধবধবে সাদা হাঁসটি এখন আর জ্ঞানের অন্বেষণে সরোবরে চরে না; সে এখন দালালের ড্রইংরুমে ‘রোস্ট’ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
দুর্নীতির ইকোসিস্টেমে মারপ্যাচের ঘূর্ণিপাত
যে ছাত্রটি লণ্ঠনের আলোয় বসে অঙ্ক কষছে, সে একদিন দেখছে—তার পাশের বাড়ির মন্টু প্রশ্নফাঁসের জাদুমন্ত্রে আকাশচুম্বী নম্বর পেয়ে গেছে। এটি শুধু অন্যায় নয়; এটি মেধার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আঘাত। এক সময় মানুষ বলত— “লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।” আজকের বাস্তবতায় সেই প্রবাদটি যেন আপডেট হয়ে গেছে— “তদ্বির আর টাকা দেয় যে, চাকরিটা পায় সে।”
দুর্নীতির স্তরবিন্যাস (Levels of Corruption) পিরামিড
শিক্ষা প্রশাসনের দুর্নীতিকে অনেক সময় একটি পিরামিড কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা এই পিরামিডের নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বিভিন্ন স্তর রয়েছে, এবং প্রতিটি স্তর যেন এক অদৃশ্য সুতোয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো একটি স্তরে অনিয়ম শুরু হলে তা ধীরে ধীরে অন্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে দুর্নীতি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়, যেখানে প্রশাসনিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ একত্রে জড়িয়ে যায়।
এই পিরামিডের নিচে রয়েছে স্কুল বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়। এখানে নিয়োগ বাণিজ্য, সম্পদ অপব্যবহার বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ দেখা যায়। মধ্যস্তরে রয়েছে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, যাদের কাজ তদারকি করা। কিন্তু তদারকি যদি দুর্বল হয়, তবে অনিয়ম স্থায়ী রূপ নেয়। সবশেষে রয়েছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন। এখান থেকে দেওয়া অনুমোদন যদি যথাযথ যাচাই ছাড়া হয়, তবে নিচের স্তরের অনিয়ম বৈধতা পেয়ে যায়। ফলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পিরামিডের নিচতলা হলো স্কুল ম্যানেজমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়। এখানেই অনেক সময় প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া বা সম্পদ ব্যবস্থাপনা স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, কিংবা বিদ্যালয়ের জমি, পুকুর বা অন্যান্য সম্পদের লিজ দেওয়া—এসব বিষয় কখনো কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মূল লক্ষ্য—শিক্ষার মান উন্নয়ন—পিছিয়ে পড়ে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছতা হারায়।
পিরামিডের দোতলা বা মধ্যস্তর হলো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসন। এই স্তরের মূল দায়িত্ব হলো স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি করা এবং অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করা। কিন্তু অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে এই তদারকি যথেষ্ট কার্যকর হয় না। কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, কখনো দায়িত্বহীনতা বা অনানুষ্ঠানিক প্রভাব—এই সব কারণে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান বিলম্বিত হয়। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ঘটে যাওয়া অনিয়মগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায় এবং সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়।
সবশেষে রয়েছে পিরামিডের চিলেকোঠা বা শীর্ষ স্তর, যা শিক্ষা বোর্ড বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই স্তর থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন প্রদান করা হয়। যদি এই স্তরে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং প্রশাসনিক সতর্কতা বজায় না থাকে, তাহলে নিচের স্তরে ঘটে যাওয়া অনিয়মগুলো শেষ পর্যন্ত বৈধতার রূপ পেয়ে যেতে পারে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।
এই স্তরবিন্যাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে কেবল কোনো একটি স্তরে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ পিরামিডের কোনো একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো কাঠামোটিই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
দুর্নীতির বিচিত্র রকমফের (Types of Corruption)- এর মেনুকার্ড— পোলাও | খিচুড়ি | হালুয়া | চচ্চড়ি |
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের দুর্নীতিকে অনেক সময় একটি ব্যঙ্গাত্মক মেনুকার্ড দিয়ে বোঝানো যায়। মেনুতে রয়েছে—নিয়োগের পোলাও; নথি জালিয়াতির খিচুড়ি; তহবিলের হালুয়া; রাজনৈতিক চচ্চড়ি। এই সব খাবারের মূল উপাদান একই—ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাবের অপব্যবহার। এই বাস্তবতা কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি নৈতিক সংকট।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে দুর্নীতি যেন এক অদ্ভুত “মেনু কার্ডে” সাজানো নানা পদের মতো—প্রতিটি আলাদা স্বাদের, কিন্তু সবগুলোর মূল উপাদান একই: ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাবের অপব্যবহার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, প্রশাসনিক নথি, উন্নয়ন তহবিল কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কখনো প্রকাশ্য, কখনো আড়ালে নানা ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে। এই চিত্রটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং বৃহত্তর শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে গড়ে ওঠা এক ধরনের সাংগঠনিক অসুস্থতার প্রতিফলন।
এই দুর্নীতির তালিকায় প্রথমেই আসে “নিয়োগের পোলাও”—যেখানে শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া কখনো কখনো মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ এবং রাজনৈতিক সুপারিশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়, আর সঙ্গে থাকে কোনো প্রভাবশালী নেতার সুপারিশ। ফলে যে তরুণ দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা করে, প্রস্তুতি নেয় এবং স্বপ্ন দেখে শিক্ষক হওয়ার, সে অনেক সময় কেবল অর্থের অভাবে সুযোগ হারায়। এতে শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়।
এরপর রয়েছে “নথি-জালিয়াতির খিচুড়ি”, যা প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি সূক্ষ্ম কিন্তু বিপজ্জনক রূপ। সরকারি চিঠিপত্র বা তালিকায় কারসাজি করে তথ্য পরিবর্তনের ঘটনা প্রায়ই অভিযোগের আকারে সামনে আসে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দপ্তর থেকে পাঠানো দুইজন প্রার্থীর তালিকা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে রহস্যজনকভাবে তিনজন হয়ে যেতে পারে। এই ধরনের নথি ম্যানিপুলেশন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সত্যকে আঘাত করে এবং সরকারি সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো “তহবিলের হালুয়া”—যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন তহবিল বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি বা ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের নামে বরাদ্দ অর্থ যদি ভুয়া ভাউচার বা কাগুজে প্রকল্পের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়, তাহলে তার সরাসরি ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদের। যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার কথা, তারা বাস্তবে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
সবশেষে রয়েছে “রাজনৈতিক চচ্চড়ি”, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীক। বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এর ফলে শিক্ষাঙ্গনে কখনো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কখনো দখলদারিত্বের সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য—জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার পরিবেশ—পিছিয়ে পড়ে এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়।
এই রূপকধর্মী চিত্রটি আসলে একটি গভীর বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। দুর্নীতির এই বিভিন্ন রূপ শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা হয়ে থাকে না; বরং সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষা খাতকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
দুর্নীতির প্রভাব: আম গাছ বনাম বিষবৃক্ষ
বাংলা প্রবাদে বলা হয়, “আম গাছের তলে আমই পড়ে।” অর্থাৎ যে মাটিতে যে বীজ রোপণ করা হয়, সেখান থেকেই সেই ফল জন্ম নেয়। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। যদি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সততা, ন্যায় এবং মেধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক। কিন্তু যখন সেই ব্যবস্থার ভেতরে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শেকড় গেড়ে বসে, তখন পুরো কাঠামোটি ধীরে ধীরে একটি বিষবৃক্ষে পরিণত হয়। এই বিষবৃক্ষের ফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে।
প্রথমত, এই ধরনের পরিস্থিতিতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। যখন তারা দেখে যে নিয়োগ, ভর্তি বা ফলাফলের ক্ষেত্রে মেধা নয় বরং অর্থ বা প্রভাবই নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে কঠোর পরিশ্রম বা সততার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করা কঠিন। এর ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায় কিংবা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির কারণে অযোগ্য শিক্ষকরা ক্লাসরুমে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, যা শিক্ষার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, কারণ তার হাতেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান ও মূল্যবোধ। কিন্তু যদি শিক্ষক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাব প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অনুপ্রেরণা দিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান ধীরে ধীরে অবনতি ঘটে।
তৃতীয়ত, নীতি কাগজে, বাস্তব শূন্য। বাংলাদেশে শিক্ষাবিষয়ক নীতিমালা তৈরি হয় প্রায় নিয়মিত। নতুন পাঠ্যক্রম, ডিজিটাল শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম—এসব শব্দ আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু বাস্তবের শ্রেণিকক্ষে গেলে দেখা যায় এক ভিন্ন দৃশ্য। অনেক স্কুলে শিক্ষক নেই, পাঠদান অসম্পূর্ণ, প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নীতিমালার সুফল পায় না। নীতি যেন হয়ে গেছে PowerPoint-এর স্লাইড—যা সেমিনারে আলোচিত হয়, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায় না।
সবশেষে, এই দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতির সংস্কৃতি একটি আদর্শহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রজন্ম তৈরি করার ঝুঁকি তৈরি করে। যখন শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই দেখে যে অনৈতিক উপায়েই অনেক সময় সফল হওয়া সম্ভব, তখন তাদের মানসিকতায়ও সেই ধারণা প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে সততা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতার মতো মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুস্থ রাখতে হলে এই বিষবৃক্ষের শেকড়েই আঘাত করতে হবে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কারণ সুস্থ মাটিতেই কেবল সুস্থ গাছ জন্ম নিতে পারে, আর সেই গাছই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে পারে।
ব্যান্ডেজ নয়, সার্জারি প্রয়োজন
সব বাধা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা থেমে থাকে না। অনেকে অনলাইন শিক্ষা, স্বশিক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু সবাই কি সেই সুযোগ পায়? বাস্তবতা হলো—না। ফলে সমাজে বৈষম্য আরও বাড়ে। এইভাবে রিয়াজদের সংগ্রাম চলতেই থাকবে আর আমাদের বিবেক কে প্রশ্ন করবে : আর কতো?
আজকের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কেবল ছোটখাটো সমস্যা নয়। এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। যখন পচন হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন কেবল ব্যান্ডেজ দিয়ে কাজ হয় না। প্রয়োজন সার্জারি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্নীতির এই বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর সংস্কার। কারণ বিদ্যা যখন পণ্যে পরিণত হয়, তখন শিক্ষক আর মানুষ গড়ার কারিগর থাকেন না—
তারা হয়ে যান সেলসম্যান। আর ছাত্ররা হয়ে যায় কাস্টমার। এই সওদাগরি সংস্কৃতি বন্ধ না হলে মেধার বোবা কান্না একদিন প্রলয়ংকরী আর্তনাদে পরিণত হবে।
শেষ কথা
রিয়াজের মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখনও বিশ্বাস করে—শিক্ষা তাদের জীবনের পথ বদলে দেবে। এই বিশ্বাস যদি ভেঙে যায়, তবে একটি জাতির ভবিষ্যৎও ভেঙে পড়ে। তাই শিক্ষাকে কেবল কাগজে নয়, বাস্তবেও সত্য করতে হবে। যেদিন শিক্ষাব্যবস্থায় মেধা, সততা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে— সেদিনই রিয়াজদের স্বপ্ন সত্যিকারের আলো পাবে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যা যখন পণ্যে পরিণত হয়, তখন শিক্ষক আর মানুষ গড়ার কারিগর থাকেন না; তাঁরা হয়ে যান ‘সেলসম্যান’। আর ছাত্ররা পরিণত হয় কেবল ‘কাস্টমার’-এ। এই সওদাগরি সংস্কৃতি বন্ধ না হলে মেধার এই বোবা কান্না অচিরেই এক প্রলয়ংকরী আর্তনাদে রূপ নেবে।
শিক্ষা শুধুমাত্র বই বা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক সম্মিলিত যাত্রা—যেখানে শিক্ষক, প্রশাসক এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা যেন কেবল এক False Hope। রিয়াজের চোখে এখনও স্বপ্নের প্রদীপ জ্বলছে; কিন্তু আমাদের সমাজ ও প্রশাসন যদি এখনই সতর্ক না হয়, তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘন অন্ধকারে সেই আলো নিভে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
যাই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত, শিক্ষার সঠিক পথে ফেরাতে হবে। নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে হবে, অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব থেকে সরাতে হবে। আর তখনই রিয়াজ এবং তার মতো অনেকে ভ্রান্ত আশা নয়, সত্যিকারের শিক্ষা পাবে। ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষা—এই দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—এবার সত্যিই জীবন্ত হোক, কেবল কাগজে নয়, প্রতিটি ক্লাসরুমে, প্রতিটি শিশুর স্বপ্নে।
—ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র, odhikarpatranews@gmail.com
#শিক্ষা_সংকট #শিক্ষা_দুর্নীতি #EducationCrisis #FalseHope #BangladeshEducation #EducationReform #BangladeshPolicy #SaveEducation

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: