—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
২০২৪ সালের অস্থিরতার পর বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অভূতপূর্ব সংকটে। বিদ্যালয় পোড়ানো, শিক্ষক-পলায়ন, অটোপাসের প্রতারণা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ‘হারানো প্রজন্ম’। এই বিশ্লেষণধর্মী রচনায় তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে কয়েক মাসের ধ্বংস একটি জাতির ভবিষ্যৎকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দেয়, এবং কেন শিক্ষা শুধু অবকাঠামো নয়—এটি বিশ্বাস, সম্পর্ক ও স্মৃতির জটিল নির্মাণ।
মহারণের পর: যখন শিক্ষার বাগান পোড়ে
২০২৪ সালের আগস্টের তীব্র দাবদাহ শেষে যে বিষণ্ন রাত নেমে এসেছিল, তার ভোরবেলা যেন পুরো বাংলার পাঠশালাগুলো নিঃস্ব হয়ে জেগেছিল। আগুনের লেলিহান শিখা যেমন সুদীর্ঘ শুষ্ক বনের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি লতা-পাতা গ্রাস করে নিয়ে যায়, তেমনি মানুষের হাতে গড়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তম্ভ—গুরু-শিষ্য, পাঠ্যবই, পরীক্ষা, ডিগ্রি—সব যেন এক অমানিশায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেউ আগুন দিয়েছিল ইতিহাসের ধুলোয়; কেউ দিয়েছিল ক্ষোভের শিখায়; কেউ শুধু উদাসীনতায়।
এই মহারণে একটি কথা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর ধরে রাখতে পারছি না। একটি গভীর বাণী মনে পড়ে—
“যদি কোনো জাতিসত্ত্বাকে তিলে তিলে ধ্বংস করতে চাও, তবে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি ভেঙো না; বরং ধীরে ধীরে স্লো পয়জনিং দাও—এমনভাবে, যাতে তারা বুঝতেই না পারে কখন জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে গেল।”
এবার ভাবুন, হে সাধারণ মানুষ এবং তথাকথিত বিপ্লবী আবালবৃদ্ধা বণিতা—ঠিক এমনটাই কি ঘটছে না? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নীরবে এক ধরনের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে—বিশ্বাসের বিষ—যা দিন দিন পুরো কাঠামোকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। আমরা কি সত্যিই তা বুঝতে পারছি?
যদি বুঝতেই পারতাম, তবে বলতাম — কাঁদো বাঙালি, কাঁদো! শিক্ষার বারোটা বাজিয়ে এখন জেগে জেগে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখো! আসলে চেষ্টা ও পরিশ্রম সব সময় সব ক্ষতের প্রলেপ হতে পারে না। আমাদের কাছেও কোনো আলাউদ্দিনের সেই আশ্চর্য প্রদীপ নেই—যেটা ঘষলেই দৈত্য বেরিয়ে এসে বলবে, “হুকুম করুন,” আর আমরা বলব, “শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করে দাও,”—আর সব ঠিক হয়ে যাবে। শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতি ঘটতে পারে খুব দ্রুত, কিন্তু সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে বহুগুণ বেশি।
ক্ষতের প্রথম বীজ
একটি কল্পিত গ্রামের কথা বলি, যার নাম রাখা যাক মায়ানগরী। এখানকার স্কুলটির দেয়ালে একসময় রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ আর নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ আঁকা থাকত। আগস্টের পর সেই দেয়াল ভাঙা, জানালার গ্রিল খোলা, আর পাঠকক্ষের ভেতর জমানো ধুলো যেন এক একটি স্তূপাকার প্রশ্ন। শহীদ মিনারের বেদিতে কেউ ফেলে গিয়েছিল ফুল না আগুনের কয়লা, তা বলা দুষ্কর। শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেকে পথে নেমেছেন, কেউ লুকিয়েছেন নিজেদের পরিচয়—যেন পুড়ে যাওয়া বনের পাখিরা এখন অন্য বনে আশ্রয় খুঁজছে, কিন্তু সেখানেও আগুনের গন্ধ।
প্রথম ক্ষতি: সম্পর্কের পুড়ে যাওয়া। শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে ছিল নদী-পারের সেতু; সেই সেতু এখন অদৃশ্য। একদল তরুণ বিশ্বাস করে—পড়ালেখা শুধু শৃঙ্খল, ডিগ্রি শুধু প্রতারণা। আরেক দল বলে—পুরোনো ব্যবস্থা পুড়ে যাক, তবে নতুন কিছু তো জাগেনি। তাই ক্লাসরুমের বদলে মাঠ, মসজিদ, মন্দির, কিংবা মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় তারা ‘নিজের মতো’ শিক্ষা গড়ছে। কিন্তু সেই শিক্ষা কি কোনো গাছের মতো শিকড় ছড়ায়? না, বরং আগাছার মতো ছড়ায়—যেখানে ইচ্ছে সেখানে অঙ্কুরিত, কিন্তু কখনো ফল ধরে না।
জনতার রোষানল: যখন বিদ্যালয় হয়ে ওঠে শত্রুশিবির
আগস্টের সেই অন্ধকার সপ্তাহগুলোর কথা বললে একটি দৃশ্য বারবার চোখে ভাসে—ভিড়। কেবল মিছিলের ভিড় নয়, ধ্বংসের ভিড়। উত্তাল জনতা যখন বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যায়, তাদের চোখে ছিল না কোনো প্রশ্ন, ছিল শুধু প্রতিশোধের আগুন। একটি কল্পিত শহরের নাম দেওয়া যাক বিদ্যারনগর। সেখানে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হলো। তাদের কণ্ঠে একটাই স্লোগান—“এই দেয়ালের আড়ালে জন্ম নেয় বিভেদ, এখানে শেখানো হয় না স্বাধীনতা, শেখানো হয় বাধ্যতা।” প্রথমে তারা ভাঙে প্রধান ফটক। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পরীক্ষার হলগুলোতে। উত্তরপত্রের স্তূপ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো—যেন সেই উত্তরপত্রগুলোর প্রতিটি পাতায় লেখা ছিল পুরোনো ব্যবস্থার পাপের হিসাব। শিক্ষক কক্ষে ঢুকে তারা ভাঙে কম্পিউটার, ছিঁড়ে ফেলে রেজিস্টার। একজন প্রবীণ শিক্ষক হাঁটুজানু হয়ে বলেন, “আমি তো শুধু পড়িয়েছি।” উত্তরে তরুণ এক মুষ্টিযোদ্ধা চিৎকার করে ওঠে, “তুমি পড়িয়েছ বলেই আমরা শৃঙ্খলিত।”
এই জনতার রোষানল থামে না সহজে। পরের দিন তারা পুড়িয়ে দেয় গ্রন্থাগার। সেখানকার শত শত বই—কবিতা, বিজ্ঞান, ইতিহাস—সব একই চিতায়। মব ভায়োলেন্সের এই দৃশ্য যেন কোনো রূপকথার দানব নয়; বাস্তবের দানব, যে শিক্ষার গায়ে হাত তুলেছে। জনতা যখন ক্ষিপ্ত হয়, তখন তারা বিচার করে না, তারা ধ্বংস করে। আর ধ্বংসের প্রথম শিকার হয় সেই প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে জ্ঞানের চর্চা হতো। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সব হয়ে ওঠে ‘শত্রুশিবির’। পরিণাম: নির্মমতা জ্ঞানের জায়গা দখল করে নেয়, আর যুক্তি পথঘাটে লুটিয়ে পড়ে।
স্বয়ংক্রিয় পাস: প্রতারণার শেষ অধ্যায়
জনতার রোষানলের পর যখন ধুলো স্থির হলো, তখন শিক্ষাব্যবস্থা এতটাই ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছিল যে ক্লাস চলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিদ্যালয় খোলা থাকলেও নেই শিক্ষক, নেই ছাত্র, নেই কোনো নিরাপত্তা। এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ এক সিদ্ধান্ত নিল—সবাই পাস। ‘অটোপাস’ নামের এই প্রক্রিয়ায় কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো মূল্যায়ন নেই, উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। যে কোনো ছাত্র, সে ক্লাস করুক বা না করুক, পরীক্ষা দিক বা না দিক—সে এগিয়ে যাবে পরবর্তী শ্রেণিতে। একটি কল্পিত উচ্চবিদ্যালয়ের কথা ধরা যাক, নিরুদ্দেশ উচ্চবিদ্যালয়। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুমনা আগস্টের পর আর বিদ্যালয়ে আসেনি। সে এখন বাড়ির কাছে একটি গার্মেন্টসে কাজ করে। কিন্তু জানুয়ারিতে যখন ফল প্রকাশ হলো, সুমনাও পেয়ে গেল অষ্টম থেকে নবমে পাসের সনদ। তার মা খুশি। কিন্তু সুমনা কি সত্যিই অষ্টম শ্রেণির পাঠ জানে? সে জানে না দ্বিঘাত সমীকরণ, জানে না কোষ বিভাজন, জানে না বাংলা ব্যাকরণ। তবু সে নবম শ্রেণির ছাত্রী। এর নাম কী? নাম প্রতারণা। অটোপাস যেন এক মায়াবী জাল—যার ফাঁদে পা দিয়ে ছাত্ররা মনে করে তারা শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তারা জ্ঞানের মরুভূমিতে হাঁটছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া বনের মাটি যেমন উর্বরতা হারায়, তেমনি অটোপাস শিক্ষার উর্বরতা ধ্বংস করে। কেননা শিক্ষা মানে তো শুধু ক্লাস উত্তীর্ণ হওয়া নয়; শিক্ষা মানে জানা, বোঝা, বিশ্লেষণ করা, ভুল থেকে শেখা। অটোপাসের যুগে ভুলের কোনো দাম নেই, অধ্যবসায়ের কোনো পুরস্কার নেই। তাহলে কে পড়বে? কে শিখবে? সবাই ‘পাস’—কিন্তু কেউই জানে না কিছু। এটি ক্ষতির সেই গতি যা চোখে দেখা যায় না—মস্তিষ্কের মৃত্যু, জ্ঞানের অপমৃত্যু। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সব স্বাভাবিক, ছাত্ররা এগোচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে জ্ঞানের গহন অজ্ঞতায়।
শিক্ষার প্রকৃত ক্ষতি: মূল্যহীন ডিগ্রি ও মূল্যহীন মন
অটোপাসের এই প্রক্রিয়া আর মব ভায়োলেন্সের ধ্বংসলীলা মিলে শিক্ষার গায়ে যে ক্ষত বসিয়েছে, তার নাম ‘মূল্যহীনতা’। একটি কল্পিত স্নাতক ছাত্রের কথা বলা যাক—রনিত। সে আগস্টের আগে পর্যন্ত ইতিহাসের অনার্স ছাত্র ছিল। বিদ্রোহের সময় তার কলেজের আর্কাইভ পুড়ে যায়, বিভাগের তিন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দেশ ছাড়েন। বাকি শিক্ষকরাও ক্লাস নিতে ভয় পান। কয়েক মাস পর ঘোষণা আসে—সবাই পাস, সবাই স্নাতক। রনিত পেয়ে গেল সনদ। সে খুশি। কিন্তু সে যখন চাকরির বাজারে নামে, তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি ইতিহাসে স্নাতক? সোনালি যুগের অর্থনীতি সম্পর্কে কী জানেন?” রনিত জবাব দিতে পারে না। সে তো বই-ই পড়েনি, পরীক্ষাই দেয়নি। তার স্মৃতিতে কেবল আগুনের লেলিহান শিখা আর পোড়া কাগজের গন্ধ। নিয়োগকর্তা তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। রনিত এখন ফেরি করে চায়ের দোকানে। রনিত একা নয়। লাখ লাখ রনিত এই দেশে ঘুরছে, হাতে সনদ, মাথায় শূন্যতা। শিক্ষার ক্ষতি শুধু এই নয় যে ছাত্ররা কিছু জানে না। তার চেয়েও বড় ক্ষতি—তারা জানে না যে তারা জানে না। তারা ভাবে ডিগ্রি মানেই শিক্ষা। কিন্তু ডিগ্রি তো শুধু একটি কাগজ। শিক্ষা হলো সেই ক্ষমতা, যার আলোয় মানুষ অন্ধকার চিনতে পারে। এখন সেই আলো নিভে গেছে। একটি উপমা দিই: পোড়া বনের পর যদি তুমি পোড়া কয়লার টুকরো জড়ো করে তাকে ‘গাছ’ বলে ডাকো, তবু সেটা গাছ হবে না। তেমনি পোড়া সিলেবাস আর অটোপাসের সনদ জড়ো করে তাকে ‘শিক্ষিত জাতি’ বললেও সেটা মিথ্যা। শিক্ষিত জাতি তৈরি হয় কষ্টে, পরীক্ষায়, ব্যর্থতায়, পুনরায় চেষ্টায়। আর এখানে তো ব্যর্থ হওয়ার সুযোগটাই নেই—সবাই সফল, সবাই পাস। তখন সফলতা তার অর্থ হারায়। এটি ক্ষতির গতি প্রকৃতির সেই দিক, যা বহু বছর পর ধরা দেয়—যখন সেই প্রজন্ম দেশ চালাবে, তখন দেখা যাবে তারা পড়তে পারে না, লিখতে পারে না, যুক্তি দিতে পারে না। তখন ফিরে তাকিয়ে কাঁদবে কেউ? তখন হয়তো অটোপাসের নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই সেই শিক্ষার শিকার হয়ে বসে থাকবেন।
প্রকৃতির রূপক: ক্ষতির গতি
চীনের এক পুরোনো কাহিনি মনে পড়ে। এক কৃষক তার ধানের ক্ষেতে আগুন দিয়েছিল পুরোনো ফসল পোড়াতে, কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামের জঙ্গলে। সেখানকার বন্যপ্রাণীরা পলায়ন করেছিল দূরের বনে। কিন্তু সেই দূরের বনেও ছিল অন্য প্রাণী—যাদের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল না তারা। সংঘাত লেগেই থাকে। তেমনি ২০২৪-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতির গতি গভীর ও ধীর—অনেকটা বটবৃক্ষের শিকড়ের মতো যা মাটির নিচে চুপে চুপে দেয়াল ফাটায়, বা নদীর ভাঙনের মতো যা তীরকে ক্রমশ খেয়ে ফেলে। ক্ষতির প্রকৃতি অবশ্য তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান নয়। বরং সূক্ষ্ম, ধীর, নীরব।
- প্রথম মাসে: বই পুড়েছে, সিলেবাস ভেসে গেছে।
- দ্বিতীয় মাসে: শিক্ষকেরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউ রিকশাচালক, কেউ দোকানি, কেউ বিদেশ পাড়ি।
- তৃতীয় মাসে: পরীক্ষার নাম উঠে গেছে। ফলে মূল্যায়নের কোনো মাপকাঠি নেই। এখন যে যার মতো ‘পণ্ডিত’।
- চতুর্থ মাসে: মব ভায়োলেন্সের ফলে বিদ্যালয়গুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। অভিভাবকেরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পান।
- পঞ্চম মাসে: অটোপাস চালু হয়। ছাত্রেরা বিদ্যালয়মুখী হয় না কারণ পাস তো আছেই।
- ষষ্ঠ মাসে: নতুন প্রজন্ম ‘স্কুল’ শব্দটি শুধু ইতিহাসের বইয়ে দেখবে। কিন্তু সে ইতিহাসের বই তো পোড়ানোই হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতি হয়েছে স্মৃতির ক্ষয়, যা হয়তো আমরা বুঝতেই পারছি না। মানুষ ভুলতে বসে কেন তারা আগে পাঠশালায় যেত। জ্ঞানের চর্চা যে শুধু চাকরি বা ডিগ্রির জন্য নয়, বরং মানুষকে মানুষ রাখার জন্য—এই বোধটি লোপ পায়। শিক্ষা ছাড়া সমাজ যেমন অন্ধ, তেমনি ইতিহাস ছাড়া শিক্ষা পঙ্গু। আর এখানে ইতিহাসও নেই, শিক্ষাও ভগ্ন।
দহনের পর: পোড়া বীজের সম্ভাবনা
কিন্তু বন পুড়ে গেলে প্রকৃতি কি চিরকাল মরু থাকে? না। পুড়ে যাওয়া বনে কিছু গাছ আছে যাদের বীজ আগুনে ফোটে—যেমন ইউক্যালিপটাস বা কিছু পাইন। আগুনের তাপেই তাদের বীজের আবরণ ফাটে, নতুন অঙ্কুর বেরোয়। তেমনি ২০২৪-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার ভস্মরাশির নিচে কি কোনও বীজ লুকিয়ে আছে? হয়তো আছে। হয়তো সেই বীজ হলো স্থানীয় শিক্ষা—প্রতিটি পাড়া, গ্রাম, মহল্লার মানুষ নিজেরাই গড়ে তুলছে ছোট ছোট পাঠচক্র। হয়তো সেই বীজ হলো ডিজিটাল পথচলা—যেখানে কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস নেই, বরং জানার ইচ্ছে আছে। হয়তো সেই বীজ হলো শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা—যেখানে প্রবীণ একজন গায়েন, একজন কুমোর, একজন জেলে নিজেদের জীবনের পাঠ দিচ্ছে। হয়তো সেই বীজ অটোপাসের প্রতিরোধ—কিছু ছাত্র, কিছু শিক্ষক নিজেরাই গড়ে তুলছে সমান্তরাল পরীক্ষা পদ্ধতি, যেখানে প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। কিন্তু এগুলো কি যথেষ্ট? একটা পোড়া বনের পুনর্জন্মের জন্য প্রয়োজন বৃষ্টি, প্রয়োজন সময়, প্রয়োজন কৃষকের ধৈর্য। এখানে সে ধৈর্য কার? আগস্টের ক্ষোভ আজও জ্বলছে। মানুষ এখনো বিশ্বাস করে না কোনো প্রতিষ্ঠানে। আর যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে শিক্ষা টিকে না। শিক্ষা তো বিশ্বাসেরই অন্য নাম—শিক্ষকের কথায়, বইয়ের পাতায়, পরীক্ষার ফলাফলে, ডিগ্রির মূল্যে।
এর জন্য দায়ী কে? অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতা নাকি নোংরা রাজনীতির বলি
ক্ষত এত গভীর, অগ্নিকাণ্ড এত ব্যাপক—অথচ এখনো কেউ দাঁড়িয়ে বলে না, “আমি দায়ী।” বরং সবাই আঙুল তোলে অন্য দিকে। মায়ানগরীর পোড়া বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে একটি শিশু জিজ্ঞেস করেছিল, “কে পোড়ালো আমাদের স্কুল?” কেউ উত্তর দেয়নি। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কেননা দায়ী কে, তা না জানলে আগামী বর্ষায় সেই আগুন আবার জ্বলবে। আসলে দায়ীদের তালিকা লম্বা। তার মাঝে দুটি নাম সবার ওপরে—অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতা আর নোংরা রাজনীতির বলি।
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতা। ২০২৪-এর আগস্টের পর যে সরকার দায়িত্ব নেয়, তারা যেন এক পথচারী, যে পাশের বাড়িতে আগুন দেখেও হাঁটতে থাকে—ভাবতে থাকে, “এটা আমার বাড়ি না।” শিক্ষাব্যবস্থা পোড়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে কোনো জরুরি বৈঠক হয়নি। শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য কোনো নির্দেশনা জারি হয়নি। বিদ্যালয়ে সেনা মোতায়েনের পরিবর্তে তারা অপেক্ষা করেছে ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক’ হওয়ার জন্য। কিন্তু কখনো কি স্বাভাবিক হয়েছিল? বিদ্যালয় পোড়ার পর যখন অভিভাবকেরা ফিরিয়ে আনতে চাইলেন সন্তানদের, তখন সরকার বলল, “ক্লাস হবে অনলাইনে।” কিন্তু যেসব গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট নেই, সেখানে অনলাইন শিক্ষা এক বিদ্রূপ ছাড়া কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতার একটি কল্পিত দৃষ্টান্ত দিই: এক মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “শিক্ষার উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।” সেই সময় এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেন, “পুড়ে যাওয়া বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণের তহবিল কোথায়?” মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “তা প্রশাসন দেখবে।” এই ‘তা প্রশাসন দেখবে’—এই বাক্যটাই উদাসীনতার চূড়ান্ত নমুনা। প্রশাসন তো দেখার নাম করল না। কারণ প্রশাসনও ভয়ে পাথর। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা হলো তারা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়নি। তাদের চোখে প্রধান সমস্যা ছিল আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, খাদ্য—শিক্ষা হয়ে গেল ‘গৌণ’ বিষয়। কিন্তু একটি জাতির জন্য শিক্ষার চেয়ে গৌণ কী আছে? অন্তর্বর্তী সরকার যেন এক ডাক্তার, যে রোগীর হাত ভাঙা দেখেও বলে, “আগে নখ কাটি, তারপর হাত ধরব।” ততক্ষণে রোগী অচল।
দ্বিতীয়ত, নোংরা রাজনীতির বলি। শিক্ষা কখনোই রাজনীতির ঊর্ধ্বে ছিল না, কিন্তু ২০২৪ সালে তা সরাসরি রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বহু বছর ধরে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। একটি সরকার এসে পাঠ্যবইয়ে নিজের ইতিহাস লেখে, আরেকটি এসে তা বদলে দেয়। একটি দল শিক্ষক নিয়োগে নিজেদের লোক বসায়, অপরটি ক্ষমতায় এলে তাদের বদলি করে। এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষা পায় ক্ষত। এক পর্যায়ে ছাত্ররা বুঝতে পারে—তারা আর শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে না, বরং তারা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর পুতুল। এই বোধ থেকেই আগুনের সূচনা। কল্পিত একটি ঘটনা: ২০২৪-এর জুলাইয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আবিষ্কার করে তার পড়ার টেবিলে রাখা ‘অর্থনীতি’ বইয়ের অর্ধেক অধ্যায় লিখেছেন একজন সাবেক মন্ত্রীর অনুচর। তিনি ক্ষোভে বই ছিঁড়ে ফেলেন। সেই ক্ষোভই আগস্টে আগুন হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যারা বহু বছর ধরে শিক্ষাকে বিষিয়ে তুলেছে, ইচ্ছে করে পাঠ্যক্রমকে বিভাজনের হাতিয়ার বানিয়েছে, পরীক্ষাকে অর্থনীতির বাজারে পরিণত করেছে—তারাই কি দায়ী নয়? নোংরা রাজনীতির এই বলির প্রথম শিকার শিক্ষা। রাজনীতিবিদেরা যেমন একে অপরের বিরুদ্ধে মিছিল করেন, তেমনি বিদ্যালয়ের মাঠ হয়ে ওঠে সেই মিছিলের স্থান। যখন একজন মন্ত্রী বলেন, “আমাদের পাঠ্যবই সেরা,” আর বিরোধী নেতা বলেন, “এটি মস্তিষ্ক ধোলাই,” তখন ছাত্র বুঝতে পারে—সে আর শিখছে না, সে যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক। এই বোধ থেকেই আগস্টের ধ্বংস। দায়ী কেবল আগুন যারা দিয়েছে, তা নয়; দায়ী তারাও যারা বহু বছর ধরে ঘরের কোণে বারুদ জমিয়েছিল।
সবশেষে, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকার বলে, “আমরা তো এসেছি বাঁচাতে, আমরা আগে কী করেছি?” নোংরা রাজনীতির দলগুলো বলে, “আমরা না, উল্টো তারাই দায়ী।” সাধারণ মানুষ বলে, “আমরা কী করব, আমরা তো ছোট।” এই ‘আমি না’—এই বাক্যটি যেন এক অভিশাপ। একটি কল্পিত দৃশ্য: পোড়া বিদ্যালয়ের সামনে পাঁচজন দাঁড়িয়ে। একজন অন্তর্বর্তী মন্ত্রী, দুইজন রাজনৈতিক দলের নেতা, একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক। মন্ত্রী বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ।” নেতারা বলেন, “এরা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে।” শিক্ষক বলেন, “আমি তো বেতন পাইনি।” অভিভাবক বলেন, “আমার সন্তান কোথায় পড়বে?” কেউ বলেন না, “আমি ভুল করেছি।” কেউ বলেন না, “আমি আগুন নেভাবো।” কেউ বলেন না, “আজ থেকে শিক্ষার জন্য আমি লড়ব।” এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতির ফলেই ক্ষতির গতি থামে না। বরং ক্ষত আরও গভীর হয়, কারণ দায়ী কাউকে না পেলে প্রতিশোধের আগুন অন্য দিকে ধেয়ে আসে।
তবে কি সব শেষ? না। উপন্যাসের চরিত্রেরা যেমন শেষ অঙ্কে এসে চিৎকার করে ওঠে, “আমি দায়ী,” তেমনি আমাদের সমাজের কেউ না কেউ যদি একদিন দাঁড়িয়ে বলে—আমি দায়ী, আমি মন্ত্রী হয়ে উদাসীন ছিলাম, আমি নেতা হয়ে শিক্ষাকে বলি দিয়েছি, আমি শিক্ষক হয়ে সত্য লুকিয়েছি, আমি অভিভাবক হয়ে চুপ থেকেছি—তবেই ক্ষত নিরাময়ের পথ খুলবে। যতদিন দায় এড়ানোর রাজনীতি চলবে, ততদিন শিক্ষা পোড়বে, আর আমরা দাঁড়িয়ে দেখব। অন্তর্বর্তী সরকার হোক আর স্থায়ী সরকারই হোক, নোংরা রাজনীতি হোক আর সৎ রাজনীতি—শিক্ষার আগুন নেভানোর দায়িত্ব সবার। কারণ পোড়া বিদ্যালয়ের ধোঁয়া তো সবার নাকে যায়। সেই ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে এখনই। কে সেই মুখোশ খুলে বলবে, “আমি নেব আগুন”? নাকি আরও অপেক্ষা—যতক্ষণ না শেষ বিদ্যালয়টিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়?
নিভে যাওয়া প্রদীপের ফিরে আসা
বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে”। কিন্তু সেই ফিরে আসার জন্য প্রয়োজন আগের চিহ্ন। এখন তো চিহ্নগুলো পুড়ে গেছে। মব ভায়োলেন্স সেসব চিহ্ন মুছে দিয়েছে, অটোপাস সেসব চিহ্নের ওপর কলমা এঁকেছে। তবু আশা: প্রতিটি পোড়া বিদ্যালয়ের চত্বরে একটি শালিক বসে। প্রতিটি ঝলসানো বইয়ের পাতায় একটি শব্দ অক্ষত থাকে। ‘মা’, ‘বাংলা’, ‘মানুষ’—এরকম কিছু শব্দ। সেই শব্দ দিয়েই আবার গড়তে হবে নতুন বর্ণমালা, নতুন পাঠক্রম, নতুন সম্পর্ক। কিন্তু শুধু শব্দ দিয়ে হবে না। দরকার ক্ষমা, দরকার পুনর্গঠন, দরকার সেই শিক্ষকদের ফিরিয়ে আনা যারা পথে নেমেছিলেন, দরকার সেই ছাত্রদের ফিরিয়ে আনা যারা অটোপাসের মায়াজালে বিশ্বাস হারিয়েছে।
ক্ষতির গতি প্রকৃতি এখনো পূর্ণ নয়। তবে সে গতি থামাতে হলে মানুষকে আগুন নিভতে দিতে হবে—অর্থাৎ, যারা আগুন দিয়েছে তাদের কথা শুনতে হবে; যারা পুড়েছে তাদের যন্ত্রণা বুঝতে হবে; আর যারা নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে তাদের মুখ ফিরিয়ে আনতে হবে। মব ভায়োলেন্সের জায়গায় বসাতে হবে সংলাপ। অটোপাসের জায়গায় বসাতে হবে কঠিন পরীক্ষা, ব্যর্থতা ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ। নইলে আগামী বছর এই সময় আমরা লিখব না ‘ক্ষতির গতি প্রকৃতি’, বরং ‘মৃত্যুর গতি প্রকৃতি’।
শিক্ষা মরে না। মানুষ মরে। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষের হাতে তৈরি, তবে মানুষের অন্ধত্বই শিক্ষাকে হত্যা করে। ২০২৪-পরবর্তী সময় সেটাই শিখিয়ে দিচ্ছে—যে কোনও ব্যবস্থাই দুর্বল যদি তার মূল উপাদান ‘মানুষ’ নিজেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এখন শুধু অপেক্ষা, সেই বিশ্বাসের ফিরে আসার। পোড়া বনে কি আবার কোকিল ডাকে? উত্তর আছে বাতাসে। আমরা কি তা শুনতে পাচ্ছি?
তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: ক্ষতির মুহূর্ত বনাম পুনর্গঠনের যুগ
কেটে যাওয়া ১৮ মাস আমাদেরকে একটি নির্মম কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: ধ্বংস ও পুনর্গঠন কখনোই সমান গতিতে ঘটে না। এখানে আমরা কেবল ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত গাণিতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তিগুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করি—যেখানে একটি ক্ষণিক আঘাত কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ে রূপ নেয়, এবং কেন সেই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে লাগে বহু গুণ বেশি সময়, শ্রম ও সামাজিক পুঁজি। এই বিশ্লেষণ আমাদের শেখায়, শিক্ষা শুধু অবকাঠামো বা পাঠ্যসূচির সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা, যার প্রতিটি ভাঙন বহুগুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাই এই অধ্যায়ে আমরা ‘ক্ষতির ত্বরণ’ ও ‘পুনর্গঠনের মন্দা’—এই দুই বিপরীত গতির সূত্র ধরে অনুসন্ধান করব, কীভাবে ১৮ মাসের ধ্বংস একটি জাতির শিক্ষাগত ভবিষ্যৎকে সাড়ে সাত বছরের দীর্ঘ পুনর্গঠনের যাত্রায় ঠেলে দেয়।
১. ক্ষতির ত্বরণ সূত্র: ধ্বংসের নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র
পদার্থবিজ্ঞানে একটি সূত্র আছে—বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তন প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক, এবং তা বলের দিকেই ঘটে। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই সূত্রের এক ভিন্ন রূপ দাঁড়ায়: ক্ষতির গতিবেগ পুনর্গঠনের গতিবেগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। কেন? কারণ ধ্বংসের জন্য প্রয়োজন কেবল একটি মুহূর্তের আবেগ, আর নির্মাণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য, পরিকল্পনা, সম্পদ ও সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি।
২০২৪-এর আগস্ট থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৮ মাস—এই সময়কালকে আমরা ‘ক্ষতির ত্বরিত পর্ব’ বলতে পারি। এই পর্বের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
প্রথম বৈশিষ্ট্য: বহুমুখী আক্রমণ। একই সময়ে পুড়েছে বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো, ধ্বংস হয়েছে গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরি, লোপ পেয়েছে পরীক্ষা পদ্ধতি, পালিয়ে গেছেন শিক্ষক, ভেঙে গেছে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক, অটোপাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মূল্যায়ন, মব ভায়োলেন্সে নষ্ট হয়েছে নিরাপত্তাবোধ। অর্থাৎ, শিক্ষাব্যবস্থার সবগুলো ‘অর্গান’ একসঙ্গে আঘাত পেয়েছে। একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করলে—একই বজ্রপাতে পুড়েছে শিকড়, কাণ্ড, ডালপালা ও পাতা। তখন সেই বৃক্ষের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: স্নোবল ইফেক্ট (তুষারগোলক প্রভাব)। একটি ক্ষতি আরেকটি ক্ষতিকে টেনে আনে। যেমন: বিদ্যালয় পোড়ার ফলে শিক্ষকরা চলে যান। শিক্ষক না থাকায় ছাত্ররা বিদ্যালয়মুখী হয় না। ছাত্র না আসায় সরকার অটোপাস চালু করে। অটোপাসে শিক্ষার মান এতটাই কমে যায় যে অভিভাবকেরা বিদ্যালয়কে ‘সময়ের অপচয়’ ভাবতে শুরু করেন। এই স্নোবল ইফেক্ট ক্ষতির গতিকে কেবল বাড়িয়ে তোলে—একটি পাথর পড়ে, তার গতিতে আরও পাথর কুড়িয়ে নিয়ে ভূমিধসে পরিণত হয়।
২. পুনর্গঠনের মন্দা সূত্র: সময়ের সাপেক্ষে পাঁচগুণ ব্যয়
এখন প্রশ্ন—ক্ষতি হয়েছে ১৮ মাসে, কেন পুনর্গঠনে লাগবে পাঁচগুণ অর্থাৎ ৯০ মাস বা সাড়ে সাত বছর? এর পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে, যাকে আমরা ‘পুনর্গঠনের মন্দা সূত্র’ বলতে পারি।
২.১ প্রতিষ্ঠানিক স্মৃতির ক্ষয় : একটি শিক্ষাব্যবস্থা শুধু দালানকোঠা আর বই নয়; এটি এক ধরনের ‘স্মৃতি’—যা বহু বছর ধরে সঞ্চিত হয়। কোনো বিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষক কে, কীভাবে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়, কীভাবে দুর্বল ছাত্রকে বিশেষ ক্লাস দিতে হয়, অভিভাবক সভা কীভাবে আয়োজন করতে হয়—এই সব জ্ঞান কোনো রেজিস্টারে লেখা থাকে না; এটি মানুষের স্মৃতি ও অভ্যাসের ভেতর বাস করে। যখন মব ভায়োলেন্সের ফলে সেই মানুষগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, বা অটোপাসের ফলে ‘শিক্ষাদানের অভ্যাস’ ভেঙে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানিক স্মৃতি হারিয়ে যায়। নতুন করে সেটি গড়তে গেলে সময় লাগে, কারণ স্মৃতি প্রতিস্থাপনের কোনো যন্ত্র নেই। একটি পোড়া বাড়ি ৬ মাসে তৈরি করা যায়, কিন্তু পোড়া সম্পর্ক ও অভ্যাস গড়তে লাগে প্রজন্ম।
২.২ বিশ্বাসের ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের সময় : শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে সূক্ষ্ম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিশ্বাস। ছাত্রের বিশ্বাস যে শিক্ষক তাকে সত্যি কিছু শেখাবেন; অভিভাবকের বিশ্বাস যে বিদ্যালয় তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করবে; সমাজের বিশ্বাস যে ডিগ্রির মূল্য আছে। ২০২৪-পরবর্তী ঘটনাবলি—মব ভায়োলেন্স, অটোপাস, শিক্ষক পলায়ন—এই সব মিলে বিশ্বাসের ভিত সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের একটি তত্ত্ব আছে: বিশ্বাস হারাতে লাগে এক মুহূর্ত, ফিরে পেতে লাগে দশগুণ সময়। যেমন একটি কাঁচের গ্লাস ভাঙতে লাগে এক সেকেন্ড, কিন্তু সেই কাঁচ গলিয়ে আবার গ্লাস বানাতে লাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাই। যেসব ছাত্র অটোপাসে ‘পাস’ হয়েছে, তারা আজীবন মনে করবে—শিক্ষা একটা ফাজলামো। তাদের বোঝাতে যে শিক্ষার আসল মূল্য আছে, সে জন্য প্রয়োজন নতুন প্রজন্ম, নতুন দৃষ্টান্ত। যা বের করতে সময় লাগে ন্যূনতম ৫ থেকে ৭ বছর—অর্থাৎ প্রায় পাঁচগুণ।
২.৩ শিক্ষক তৈরির চক্র ও হারানো প্রজন্ম : একটি শিক্ষক তৈরি হতে কত সময় লাগে? ন্যূনতম চার বছর স্নাতক, এক বছর প্রশিক্ষণ, আরও তিন বছর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়—মোট আট বছর। ২০২৪-এর ধ্বংসের ফলে বহু অভিজ্ঞ শিক্ষক পেশা ছেড়েছেন। তাদের জায়গায় নতুন শিক্ষক তৈরি করতে গেলে সেই আট বছরের চক্রটি শুরু থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আট বছরের মধ্যে যারা ছাত্র ছিল (যারা অটোপাস পেয়েছে) তারা তো পড়েনি—তারা কীভাবে শিক্ষক হবে? অর্থাৎ, একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে গেছে। এই ‘হারানো প্রজন্ম’ ফিরিয়ে আনার কোনো শর্টকাট নেই। সেজন্য সময় লাগবে কমপক্ষে ১০ বছর—যা ১৮ মাসের প্রায় সাড়ে ছয় গুণ। আমরা যদি রক্ষণশীল হিসাব করি, পাঁচগুণ সময় ন্যূনতম অনুমান।
৩. সিস্টেম থিওরি: জটিল ব্যবস্থায় ক্ষতি ও পুনর্গঠনের অসমতা
জটিল ব্যবস্থা তত্ত্ব (Complex Systems Theory) অনুযায়ী, একটি ব্যবস্থা যত জটিল, তার ধ্বংস তত দ্রুত ঘটে, কিন্তু পুনর্গঠন তত ধীর। একটি ক্লকের কথা ভাবুন: এটি ভাঙতে এক সেকেন্ড, কিন্তু ঘড়ির কারিগরকে এটি মেরামত করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে। কারণ ভাঙার সময় শুধু একটি বল প্রয়োগ করলেই হয়, কিন্তু মেরামতের সময় প্রতিটি খুঁটিনাটি অংশ সঠিক জায়গায় বসাতে হয়। শিক্ষাব্যবস্থা একটি অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা—এর উপাদানগুলো পরস্পর নির্ভরশীল। পাঠ্যবই ছাড়া শিক্ষক অচল, শিক্ষক ছাড়া ছাত্র অচল, মূল্যায়ন ছাড়া ডিগ্রি অর্থহীন, ডিগ্রি অর্থহীন হলে চাকরিবাজার অচল, চাকরিবাজার অচল হলে সমাজ অস্থির। এই পরস্পর নির্ভরশীলতার জাল ছিঁড়ে গেলে পুনরায় গাঁথতে গেলে প্রতিটি গিঁট আলাদাভাবে বাঁধতে হয়।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থার পূনর্গঠনের সময় ও মূল্য
২০২৪-পরবর্তী ১৮ মাসে এই জালটি ছিঁড়েছে বহু জায়গায়। পুনর্গঠনের সময় হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে:
- ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ: ২ বছর (যা ক্ষতির সময়ের তুলনায় ১.৩ গুণ)
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ: ৫ বছর (৩.৩ গুণ)
- পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়ন কাঠামো পুনঃস্থাপন: ৩ বছর (২ গুণ)
- ছাত্র-শিক্ষকের বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ: ৭ বছর (৪.৬ গুণ)
- হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের জন্য বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা: ১০ বছর (৬.৬ গুণ)
- সমাজে ডিগ্রির মূল্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ৮ বছর (৫.৩ গুণ)
এই ছয়টি উপাদানের গড় নিলে দাঁড়ায় প্রায় ৫.৮ গুণ। তাই পাঁচগুণ সময় একটি ন্যূনতম ও বাস্তবসম্মত অনুমান।
৫. মনস্তাত্ত্বিক দিক: ট্রমা ও পুনরুদ্ধারের গাণিতিক মডেল
মনোবিজ্ঞানে একটি সুপরিচিত মডেল আছে—ট্রমার পরে পুনরুদ্ধারের সময় ক্ষতির সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি। একটি ট্রমাটিক ঘটনা (যেমন বিদ্যালয়ে মব ভায়োলেন্স) মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, কিন্তু তার PTSD (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) থেকে বেরোতে বছর লাগে। একইভাবে, শিক্ষাব্যবস্থার ‘কালেকটিভ ট্রমা’—অর্থাৎ সমষ্টিগত মানসিক আঘাত—থেকে সমাজকে বেরোতে গেলে সময় লাগে, কারণ ট্রমা শুধু স্মৃতিতে থাকে না, এটি আচরণে, সিদ্ধান্তে, বিশ্বাসে লেগে থাকে।
উদাহরণ: একজন ছাত্র যে অটোপাসের কারণে ‘পাস’ হয়েছিল, সে কখনো পরীক্ষার চাপ নেয়নি, ব্যর্থতার স্বাদ পায়নি। ফলে তার মধ্যে সহনশীলতা, অধ্যবসায়, ব্যর্থতা মোকাবিলার ক্ষমতা—এই গুণগুলো তৈরি হয়নি। তাকে পুনরায় শিক্ষার জগতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথাগত ক্লাস যথেষ্ট নয়; দরকার থেরাপিউটিক এডুকেশন। যা সময়সাপেক্ষ। এই ‘চরিত্র গঠনের সময়’ হিসাব করলে দেখা যায়, ১৮ মাসের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে কমপক্ষে ৯০ মাস—অর্থাৎ ঠিক পাঁচগুণ—প্রয়োজন।
৬. গাণিতিক অনুমানে একটি সতর্কবাণী।: ধ্বংসের ত্বরণ বনাম নির্মাণের জড়তা
পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে—ধ্বংসের ত্বরণ অনেক বেশি, কারণ ধ্বংসের বল অভিকর্ষের মতো সর্বত্র ক্রিয়াশীল। আর নির্মাণের বল ঘর্ষণের মতো, যা ক্রিয়াশীল হলেও গতি কম। ১৮ মাসে শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামতে পাঁচগুণ সময় লাগবে—এই তত্ত্বের পক্ষে যুক্তিগুলো হলো:
শেষ পর্যন্ত, এই বিশ্লেষণ শুধু একটি গাণিতিক অনুমান নয়, এটি একটি সতর্কবাণী। যারা মনে করছেন, “কয়েকটা বিদ্যালয় পুড়েছে, আবার বানিয়ে ফেলব,” তারা ভুল করছেন। কারণ শিক্ষা কেবল ইট-সুরকির তৈরি নয়; এটি মানুষের মন, সম্পর্ক, বিশ্বাস, অভ্যাস, স্মৃতি—এসবের জটিল বুনন। এই বুনন ছিঁড়ে গেলে তা সেলাই করতে সময় লাগে, আর সেই সময়ের হিসাব পাঁচগুণ। তাই দ্রুত পুনর্গঠনের নামে যদি তাড়াহুড়া করে ভাঙা জিনিস জোড়া দেওয়া হয়, তবে তা হবে একটি ‘প্যাচওয়ার্ক’—যা দেখতে সুন্দর, কিন্তু প্রথম বর্ষাতেই ভেঙে পড়বে। প্রকৃত পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, পরিকল্পনা, আর সবচেয়ে বড় কথা—সেই পাঁচগুণ সময়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা। নইলে ক্ষতির ১৮ মাস পরে আরও ১৮ মাস যোগ হবে, আর তখন আমরা পাঁচগুণের পরিবর্তে দশগুণের সূত্র লিখতে বসব।
শেষ উপাখ্যান: নপুংসকের স্বাদ আর বাঘের লোভ
একটি পুরোনো কাহিনি দিয়ে শুরু করি। কোনো এক বনের গহীনে এক বৃদ্ধ বাঘছানাকে শিকার শেখাচ্ছিল। প্রথম দিন বাঘছানা একটি পঙ্গু হরিণ ধরল। বৃদ্ধ বললেন, “এটা সহজ শিকার, এর স্বাদ নপুংসকের মতো। তুই যদি এই স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে যাস, তবে তোর আর কখনো পূর্ণশক্তির হরিণ ধরার ইচ্ছে থাকবে না। কারণ নপুংসকের স্বাদ একবার পেলে বাঘ বার বার তা চায়—সহজ শিকার, নিশ্চিত ভোজ।” বাঘছানা সেই কথায় কর্ণপাত করল না। সে দিনের পর দিন পঙ্গু হরিণ শিকার করল, অসুস্থ মৃগ শিকার করল। একসময় তার শরীরের শক্তি কমে গেল, তার শিকারের কৌশল মরিচা ধরল। বনের অন্যান্য বাঘ তাকে উপহাস করল। সে যখন বুঝল, তখন অনেক দেরি। কারণ নপুংসকের স্বাদ আসক্তির মতো—একবার পেলে ছাড়ে না।
এই উপাখ্যানটি ২০২৪-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার দর্পণ। এখন প্রশ্ন—যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের ‘প্রতিপক্ষ’ বানিয়ে নৈতিকতার ইচ্ছাকৃত চরম অবনমন করা হয়েছে, তা কি কখনো পূরণ হবে? অর্থাৎ, সেই অবনমনের ফল কি কখনো ভালো হবে? উত্তর হলো—না, কখনো না। বরং তা একটি অপূরণীয় দুর্যোগের দরজা খুলে দেবে। কেননা নপুংসকের স্বাদ যে বাঘ একবার পায়, সে বার বার তা পেতে চায়।
প্রথম প্রমাণ — শত্রু চিহ্নিত করার অভ্যাস : শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হলো নদী আর তীরের মতো—একটি অপরটির অস্তিত্ব নির্ধারণ করে। কিন্তু ২০২৪-পরবর্তী সময়ে যখন শিক্ষার্থীদের বলা হলো, “শিক্ষক তোমার শত্রু, সে তোমাকে বোকা বানায়, সে ব্যবস্থার দালাল,” তখন সেই সম্পর্কের মেরুদণ্ড ভেঙে গেল। এখন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে না “আমি কী শিখলাম?” বরং প্রশ্ন করবে “সে কী লুকাচ্ছে?” এই ‘শত্রু চিহ্নিত করার অভ্যাস’ একবার মগজে ঢুকে গেলে তা আর বেরোয় না। যেমন বাঘ একবার পঙ্গু হরিণের স্বাদ পেলে আর পূর্ণশক্তির হরিণের পেছনে দৌড়ায় না—অতিরিক্ত পরিশ্রম তাকে বিরক্ত করে। তেমনি শিক্ষার্থী যদি একবার জেনে যায় যে ‘শিক্ষকের সমালোচনা করা’ ও ‘শিক্ষককে অসম্মান করা’ সহজ পথ, তাহলে সে আর কখনো জ্ঞানের কঠিন পথে হাঁটবে না। কারণ জ্ঞানার্জনের কঠিন পথে প্রয়োজন নম্রতা, ধৈর্য, শ্রদ্ধা। আর এই গুণগুলো তো নৈতিকতার চরম অবনমনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রমাণ — আসক্তি সৃষ্টির মনস্তত্ত্ব: মনোবিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত সূত্র আছে—যে আচরণ বারবার পুরস্কৃত হয়, তা আসক্তিতে পরিণত হয়। এখানে ‘পুরস্কার’ বলতে বোঝাচ্ছে ‘সহজ সাফল্য’, ‘কঠোর পরিশ্রম ছাড়া পাস’, ‘শিক্ষককে অপদস্থ করার আনন্দ’, ‘গ্রুপের তালি’। যখন শিক্ষার্থীরা দেখল, শিক্ষককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তারা সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, সহজেই সমাজে ‘সাহসী’ হিসেবে খ্যাতি পেতে পারে, সহজেই পরীক্ষা ছাড়াই পাস করতে পারে—তখন তাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেম রিওয়্যার্ড হয়ে গেল। অর্থাৎ, তারা আসক্ত হয়ে গেল সেই ‘নপুংসকের স্বাদে’। বাঘ যেমন বারবার পঙ্গু হরিণ খোঁজে, তেমনি এই শিক্ষার্থীরা বারবার খুঁজবে কোনো দুর্বল প্রতিপক্ষ, যাকে দোষারোপ করে নিজেদের অলসতা, অজ্ঞতা, নৈতিক পতন ঢাকা যাবে।
একটি কল্পিত দৃশ্য: বিদ্যারনগরের তরুণ রবিন। সে অটোপাসে পাস করেছে, সে কখনো পরীক্ষার চাপ নেয়নি, শিক্ষককে কখনো ভয় পায়নি বরং প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। সেখানে প্রকৃত শিক্ষক, যিনি কঠিন প্রশ্ন করেন। রবিনের প্রথম প্রবৃত্তি কী হয়? সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে যায়। স্লোগান দেয়, “শিক্ষক অত্যাচারী।” সে জমায়েত করে, ক্লাস বর্জন করে। কেন? কারণ নপুংসকের স্বাদে অভ্যস্ত বাঘ আর পূর্ণশক্তির হরিণের মুখোমুখি হতে পারে না। সে জানে—সহজ পথ হলো অভিযোগ করা, শিক্ষককে ‘প্রতিপক্ষ’ সাজানো, আর নিজেকে ‘নিপীড়িত’ হিসেবে উপস্থাপন করা। এই চক্র একবার শুরু হলে তা আর থামে না। প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি কঠিন প্রশ্ন, প্রতিটি মূল্যায়ন—সবকিছুই হয়ে ওঠে ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’। ফলে জ্ঞানচর্চা মরে যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে ক্ষমতার রণক্ষেত্র।
তৃতীয় প্রমাণ —প্রজন্মের নৈতিক সংক্রমণ : একটি সমাজের নৈতিকতা কীভাবে সংক্রমিত হয়? একটি শিশু যদি দেখে তার বড় ভাই শিক্ষককে গাল দিয়ে ‘সফল’ হচ্ছে, সে-ও শিখে যায়। যদি দেখে ক্লাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্র শিক্ষকের ক্লাস বয়কট করে, সে-ও তাই করে। এই ‘নৈতিক সংক্রমণ’ খুব দ্রুত ঘটে। ২০২৪-পরবর্তী মাত্র কয়েক মাসে আমরা দেখেছি, শিক্ষক প্রতিপক্ষ বানানোর বিষটি কেমন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। একবার ছড়িয়ে পড়লে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না, কারণ এই বিষের প্রতিষেধক—শ্রদ্ধা, বিনয়, জ্ঞানের তৃষ্ণা—সেগুলো তো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। প্রশ্ন হলো—কে এই ধ্বংস করল? নোংরা রাজনীতি, দায়বিহীন সরকার, আর কিছু ‘বুদ্ধিজীবী’ যারা বলেছিলেন, “শিক্ষক ব্যবস্থার অংশ, তাই শিক্ষক শত্রু।” তারা ভুলে গিয়েছিলেন, শিক্ষক না থাকলে শিক্ষা থাকে না, শিক্ষা না থাকলে সভ্যতা থাকে না।
উপাখ্যানের বাঘছানার কথা মনে পড়ে? সে পঙ্গু হরিণের স্বাদে এতটাই আসক্ত হয়ে গিয়েছিল যে একদিন যখন বনের সব পঙ্গু হরিণ শেষ হয়ে গেল, তখন সে আর কিছু খেতে পারল না। ক্ষুধায় তার মৃত্যু হলো। তেমনি এই প্রজন্ম, যাদের নপুংসকের স্বাদে অভ্যস্ত করা হয়েছে, তারা একদিন দেখবে—সমাজে আর ‘প্রতিপক্ষ শিক্ষক’ নেই (কারণ শিক্ষকরা সবাই পেশা ছেড়ে পালিয়েছেন), আর কোনো ‘সহজ পাস’ নেই (কারণ অটোপাস বন্ধ হয়ে গেছে), আর কোনো ‘অভিযোগের বস্তু’ নেই। তখন তারা একা পড়ে থাকবে—অশিক্ষিত, অযোগ্য, অসহায়। সেই মৃত্যু হবে নীরব, দীর্ঘ, নির্মম। তখন কেউ এসে বলবে না, “আমরা ভুল করেছিলাম।” কারণ ‘আমরা ভুল করেছিলাম’ বলার মতো নৈতিকতা তো আগেই ধ্বংস করা হয়েছে।
শেষ কথা: বাঘের স্বাদ পরিবর্তনের উপায় নেই
বিজ্ঞান বলে, বাঘের স্বাদের রিসেপ্টর একবার নির্দিষ্ট স্বাদে অভ্যস্ত হলে তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। একইভাবে, যে শিক্ষার্থী একবার শিক্ষককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নৈতিকতার চরম পতন ঘটাতে শিখেছে, তার জন্য আবার শিক্ষকের সামনে মাথা নত করে শেখা—অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন। প্রয়োজন গভীর মানসিক চিকিৎসা, প্রয়োজন সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন, প্রয়োজন দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই উপাখ্যানের শিক্ষা হলো—যে আগুন জ্বালিয়েছে, সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে যদি আমরা শুধু পোড়া ছাই দেখি, তবে নতুন করে আগুন জ্বলবেই। বাঘ নপুংসকের স্বাদ বার বার চাইবেই।
এখন প্রশ্ন—তবে কি কোনো আশা নেই? আছে। সেই বাঘছানার মৃত্যুর আগে একটি শেষ শিক্ষা ছিল—সে বুঝতে পেরেছিল তার ভুল। কিন্তু বুঝতে পেরেছিল অনেক দেরিতে। আমাদের সমাজের জন্য এখনও দেরি হয়নি। যদি আমরা আজই স্বীকার করি, “শিক্ষক প্রতিপক্ষ নন, শিক্ষক আমাদের পথপ্রদর্শক,” যদি আজই অটোপাস বাতিল করি, যদি আজই মব ভায়োলেন্সের জন্য দোষীদের শাস্তি দিই, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম সেই নপুংসকের স্বাদ পাবে না। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম? তারা যারা ইতোমধ্যে আসক্ত, তাদের ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই শেষ উপাখ্যানের করুণ সত্য হলো—এখন যা করা দরকার, তা হলো আগামী প্রজন্মকে বাঁচানো। এই প্রজন্ম হয়তো হারিয়ে গেছে—শিক্ষকবিরোধী আসক্তিতে, অটোপাসের মায়াজালে, নৈতিকতার পঙ্ক্তিতে। কিন্তু আগামী প্রজন্মকে দেওয়া যেতে পারে একটি ভিন্ন স্বাদের শিক্ষা—কঠিন, চ্যালেঞ্জিং, শ্রদ্ধাশীল। সেই স্বাদ যদি একবার পায়, তবে বাঘও বনে ফিরে যাবে প্রকৃত শিকারে। নইলে এই উপাখ্যান শুধু রূপকথা নয়, বাস্তবের করুণ কাহিনি হয়ে থাকবে।
আসল কথা: পোড়া বনের ডায়েরি
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী আঠারো মাস বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক অভিশপ্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। সেই অধ্যায়ের পাতায় লেখা আছে—বিদ্যালয় পুড়েছে, গ্রন্থাগার ভস্মীভূত হয়েছে, শিক্ষকরা পথে নেমেছেন, ছাত্ররা অটোপাসের মাদকে বিভোর, মব ভায়োলেন্সের জ্বালায় পুড়েছে সম্পর্কের বাঁধন, আর নৈতিকতার যে চরম অবনমন ঘটানো হয়েছে, তা যেন এক বিষবৃক্ষ—যার ফল খেয়ে বাঘও নপুংসকের স্বাদে আসক্ত।
এই বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি, ক্ষতির গতি প্রকৃতি কেবল ভৌত নয়, তা মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব মাত্রায় বিস্তৃত। ক্ষতি হয়েছে ১৮ মাসে, কিন্তু পুনর্গঠনে লাগবে পাঁচগুণ সময়। কেন? কারণ শিক্ষা শুধু ইট-সুরকি নয়, এটি বিশ্বাসের স্থাপত্য, সম্পর্কের জাল, স্মৃতির ভাণ্ডার। আর এসব ধ্বংস করতে লাগে একটি মুহূর্ত, গড়তে লাগে প্রজন্ম।
দায়ীদের তালিকা দীর্ঘ—অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতা থেকে শুরু করে নোংরা রাজনীতির বলি, সর্বোপরি সেই ‘আমি না’ মানসিকতা। কিন্তু দায় খুঁজে লাভ নেই যদি না আমরা স্বীকার করি, এই দুর্যোগের প্রতিটি পর্যায়ে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অংশীদার। চুপ থেকেও আমরা দায়ী।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো—শিক্ষককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নৈতিকতার যে ইচ্ছাকৃত চরম অবনমন ঘটানো হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। বরং এটি একটি আসক্তি সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করবে। বাঘ যেমন একবার নপুংসকের স্বাদ পেলে বার বার তা চায়, তেমনি এই প্রজন্ম বার বার খুঁজবে সহজ পথ, প্রতিপক্ষের অজুহাত, আর নিজের অপারগতা ঢাকার ছল।
আগামীর পথপরিক্রমা: সাত দফা প্রস্তাব
কিন্তু যদি এখনও সময় থাকে—যদি আমরা চাই এই পোড়া বনে আবার কোকিল ডাকুক, যদি চাই আগামী প্রজন্ম জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক—তবে নিচের পথপরিক্রমা অনুসরণ করতে হবে। এটি কোনো দ্রুত সমাধান নয়; এটি একটি কঠিন, দীর্ঘ, কিন্তু একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
প্রথম দফা— ক্ষমা ও দায় স্বীকার: শুরু করতে হবে একটি জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে। যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল, শিক্ষক সংগঠন, ছাত্র প্রতিনিধি, অভিভাবক ও সুশীল সমাজ বসবে। সেই সংলাপের প্রথম শর্ত হবে—দায় স্বীকার। সরকার বলবে, “আমরা উদাসীন ছিলাম।” রাজনৈতিক দল বলবে, “আমরা শিক্ষাকে বলি দিয়েছি।” শিক্ষক সংগঠন বলবে, “আমরা সময়মতো প্রতিরোধ করিনি।” ছাত্ররা বলবে, “আমরা ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছিলাম।” এই দায় স্বীকার ছাড়া বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ অসম্ভব। এরপর আসবে ক্ষমা। যারা ভুল করেছে—উভয় পক্ষই—তারা যেন ক্ষমা চাওয়ার সাহস রাখে। কারণ ক্ষমা না হলে আগুন নেভে না, আগুন নেভে না।
দ্বিতীয় দফা— অটোপাস বাতিল ও পুনর্মূল্যায়ন: অটোপাস শিক্ষার ক্যানসার। এটি немедленно বাতিল করতে হবে। কিন্তু বাতিল করলেই হবে না? যারা অটোপাসে ‘পাস’ হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ পুনর্মূল্যায়ন পরীক্ষা নিতে হবে—যা হবে স্বেচ্ছামূলক, কিন্তু ডিগ্রির বৈধতার জন্য বাধ্যতামূলক। যারা পুনর্মূল্যায়নে ফেল করবে, তাদের জন্য থাকবে সংক্ষিপ্ত কোর্স ও বিশেষ ক্লাস। এতে সময় লাগবে, খরচ হবে, কিন্তু নৈতিক সততা ফিরিয়ে আনতে এ ছাড়া গতি নেই।
তৃতীয় দফা—শিক্ষক প্রতিপত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা : শিক্ষকদের ‘প্রতিপক্ষ’ থেকে ‘অভিভাবকে’ রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন—শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (ক্লাসরুমে সিসিটিভি, শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের আইনি শাস্তি), শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা, এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে ‘শ্রদ্ধা ও নেতৃত্ব’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা। একইসঙ্গে, যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষককে অপদস্থ করেছে, তাদের জন্য শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখতে হবে—কারণ তাদের অনেকেই নপুংসকের স্বাদে আসক্ত, তাদের মুক্তি দরকার, কেবল শাস্তি নয়।
চতুর্থ দফা— মব ভায়োলেন্সের প্রতিরোধ ও আইনি কাঠামো : বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সুরক্ষিত অঞ্চল’ ঘোষণা করতে হবে। ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সহিংসতায় অংশ নিলে তা হবে অপরাধ—যার জন্য কারাদণ্ডের বিধান থাকবে। একইসঙ্গে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা উসকানি দেওয়ার জন্য আলাদা আইন করতে হবে, যাতে ভিড়ের উত্তেজনায় বিদ্যালয় পোড়ানো কেউ যেন ‘আমি তো ভিড়ের অংশ ছিলাম’ বলে রেহাই না পায়।
পঞ্চম দফা— নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক: পাঠ্যক্রমে ‘নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব’ একটি পৃথক ও বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে চালু করতে হবে। এটি হবে ব্যবহারিক—যেখানে ছাত্ররা শিখবে কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে দ্বন্দ্ব সমাধান করতে হয়, কীভাবে কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করতে হয় কিন্তু ধ্বংস করতে নয়। নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সেই ‘নপুংসকের স্বাদ’ থেকে বেরিয়ে আসার রসদ দেওয়া।
ষষ্ঠ দফা—পাঁচগুণ সময়ের জন্য পরিকল্পনা: যেহেতু আমরা জানি পুনর্গঠনে পাঁচগুণ সময় লাগবে (প্রায় সাড়ে সাত বছর), তাই সেই সময়ের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। প্রথম দুই বছর হবে জরুরি পুনর্বাসন—ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, শিক্ষক ফিরিয়ে আনা, অটোপাসের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া। পরবর্তী তিন বছর হবে কাঠামোগত সংস্কার—পাঠ্যক্রম সংস্কার, পরীক্ষা পদ্ধতি আধুনিকায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ। শেষ আড়াই বছর হবে গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও টেকসইতা। এই পুরো সময়জুড়ে থাকবে স্বচ্ছ তদারকি ও বার্ষিক প্রতিবেদন।
সপ্তম দফা— ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি: শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দফা হলো—ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করা। যেসব বিদ্যালয় অটোপাস প্রত্যাখ্যান করেছে, যেসব শিক্ষক ঝুঁকি নিয়ে পড়িয়েছেন, যেসব ছাত্র ধ্বংসের বিরুদ্ধে গিয়ে জ্ঞানচর্চা চালিয়ে গেছেন—তাদের গল্প জাতীয় পর্যায়ে প্রচার করতে হবে। একটি প্রজন্মের দরকার ‘রোল মডেল’, যারা দেখাবে নৈতিকতা ও শিক্ষা একসঙ্গে চলতে পারে, প্রতিপক্ষ তৈরি না করেও কেউ সফল হতে পারে। এই দৃষ্টান্তই একদিন সেই বাঘছানাকে দেখাবে, পূর্ণশক্তির হরিণ শিকার করার আনন্দ কত গভীর।
চূড়ান্ত প্রত্যাশা: বীজ পোড়ে না, ধৈর্য পোড়ে
একটি শেষ উপমা দিয়ে শেষ করি। জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা পড়ার পর সবাই ভেবেছিল, সেখানে শত বছর কোনো গাছ জন্মাবে না। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর পর সেখানকার পোড়া মাটি থেকে একটি গিংকো গাছের চারা বেরিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, সেই গাছের বীজ এত শক্ত ছিল যে পারমাণবিক আগুনও তাকে পোড়াতে পারেনি। শিক্ষার বীজও তেমনি—তা পোড়ে না, পোড়ে ধৈর্য। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে আমাদের ধৈর্য পুড়ে গেছে, ক্ষোভ পুড়ে গেছে, বিশ্বাস পুড়ে গেছে। কিন্তু শিক্ষার বীজ এখনো কোথাও লুকিয়ে আছে—হয়তো কোনো পোড়া বিদ্যালয়ের চত্বরে, কোনো ঝলসানো বইয়ের পাতায়, কোনো নির্বাক শিক্ষকের চোখে। সেই বীজকে আবার মাটিতে ফেলতে হবে, জল দিতে হবে, রোদ দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—যারা সেই বীজে আগুন দিতে চায়, তাদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
সেটা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। কিন্তু শুধু উপাখ্যান বা বিশ্লেষণ লিখলে হবে না। দরকার প্রতিটি বিদ্যালয়ের দরজায় একজন প্রহরী, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্রের হাতে একটি সার্থক বই, আর প্রতিটি অভিভাবকের বুকে একটি প্রশ্ন—“আমার সন্তান কি সত্যি শিক্ষিত?” এই প্রশ্ন যদি আমরা নিজেদের না করি, তবে সব বিশ্লেষণ বৃথা। পোড়া বনে আবার বনফুল ফোটাতে চাই—সেই ফুলের গন্ধ পেতে চাই। আর সেই ফুল ফোটানোর দায়িত্ব কার? আমাদের সবার। কোনো একক সরকারের না, কোনো একক দলের না, আমাদের সবার। কারণ পোড়া বিদ্যালয়ের চিহ্ন সবার চোখে, আর পোড়া ভবিষ্যৎ সবার মুখে। আজ যদি না জাগি, তবে কবে জাগব?
শিক্ষা পোড়ে না—পোড়ে উদাসীনতা। আগামীর পথে তাই প্রথম পদক্ষেপ: উদাসীনতা পোড়ানো।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংকট #AutoPass #MobViolence #হারানো_প্রজন্ম #EducationCollapse #বাংলাদেশ #StudentCrisis #TeacherCrisis #EducationReform #FutureAtRisk #SystemFailure #EducationMatters


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: