নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মরক্কোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরগান বনভূমির গভীরে ইদানীং এক বিশেষ ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এখানে গবাদিপশু চারণ এবং আরগানের ফল (স্থানীয় ভাষায় তাফিউশ) সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আধুনিক কোনো আইন নয় বরং কয়েক শতাব্দী প্রাচীন আমাজিঘ পদ্ধতি 'আঘদাল'-এর আওতায় এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
আঘদাল কী?
আমাজিঘ ভাষায় আঘদাল শব্দের অর্থ হলো বন্ধ করা বা বেড়া দেওয়া। এটি মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি প্রাচীন সামাজিক ও আইনি কাঠামো। এই ব্যবস্থায় সম্প্রদায়ের মুরুব্বিরা বা স্থানীয় পরিষদ (jmaâ) সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে বনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কখন ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে আর কখন তা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধারের সময় দেওয়া।
কেন এই পুনরুজ্জীবিতকরণ?
মরক্কোর প্রায় ৪০ লক্ষ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আরগান বন আজ অস্তিত্ব সংকটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ভয়াবহ খরা এবং যাযাবর রাখালদের বিশাল পালের চাপে বনের প্রায় ৪০ শতাংশ ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
মরুভূমি রোধ: আরগান গাছ সাহারা মরুভূমির বিস্তার রোধে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে।
তরল সোনা: এই গাছের ফল থেকে তৈরি আরগান তেল বা 'লিকুইড গোল্ড' মরক্কোর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ
টিজনিট (Tiznit), সিদি ইফনি (Sidi Ifni) এবং চতোউকা আইত বাহা (Chtouka Ait Baha) অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এখন সরাসরি এই প্রাচীন প্রথাকে আইনি রূপ দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক সরকারি ডিক্রিতে ১৯২৫ সালের একটি ঐতিহাসিক আইনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, যা স্থানীয় আদিবাসীদের বনের ওপর অধিকার নিশ্চিত করে এবং বাইরের চারণকারীদের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করে।
চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান পরিস্থিতি
আঘদাল পদ্ধতিটি মূলত সামাজিকভাবে কার্যকর ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক সময় থেকে বন ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে চলে যাওয়ায় এই ঐতিহ্যবাহী কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যাযাবর চারণকারীদের চাপ: বর্তমানে উট ও ছাগলের বিশাল পাল নিয়ে আসা যাযাবররা প্রায়ই এই স্থানীয় নিয়ম মানতে চান না যা মাঝে মাঝে সংঘাতের সৃষ্টি করছে।
নতুন রোগের ঝুঁকি: ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আরগান বনে এক রহস্যময় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় আঘদাল-এর মতো 'বিশ্রাম' পদ্ধতি বনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আঘদাল পদ্ধতি কঠোরভাবে পালন করা হয়, সেখানকার গাছগুলোর স্বাস্থ্য সরকারি সংরক্ষিত বনের চেয়েও অনেক ভালো। ভূমি অধিকার কর্মী আহমেদ ইয়াহইয়া মনে করেন, শুধুমাত্র কাগজ-কলমে ডিক্রি জারি করলেই হবে না, বরং স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে আগের মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলেই কেবল আরগান বনকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: