—অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয়
বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের করুণ অবস্থা: আরএসএফ সূচকে ১৬২তম, অন্তর্বর্তী সরকারের কারাবরণ, প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে মৌলবাদী হামলা ও সরকারপ্রধানের ‘নিরবতার বাশি’—এই প্রতিবেদনটি ইতিহাসের নৃশংস সত্য উন্মোচন করে।
বিশ্ব দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। প্রতিবছর মে মাসে জাতিসংঘ ও ইউনেস্কোর আহ্বানে এই দিবসটি পালিত হয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার হিসাবে। কিন্তু এই দিবসের প্রাক্কালে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট যেন এক বিষাদময় চিত্রকল্প। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেখানে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে আলোচনার প্রধান সুর, সেখানে আমাদের দেশে সাংবাদিকদের কারাবরণ, হুমকি, ও প্রশাসনিক দমনপীড়ন এক অভিশপ্ত নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে সাংবাদিকদের কারাবরণ, হুমকি, প্রশাসনিক দমনপীড়ন, রাজনৈতিক মৌলবাদীদের সংবাদপত্র কক্ষে হামলা, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নিজেই যখন নিরবতার শৃঙ্খল বেয়ে বাশির বাঁশি বাজান, তখন সেই চিত্র যেন এক গভীর বৈরাগ্যের মৃত্যু-মিছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের সংখ্যা ও সংবাদিক প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার নিদারুণ কাহিনি যে কোনো গণতান্ত্রিক চেতনার মানুষকে স্তম্ভিত করে তোলে।
বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য—“শান্তিময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা জোরদার করা।” UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, এ প্রতিপাদ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং ভুয়া তথ্য (disinformation) প্রতিরোধে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ বছর বৈশ্বিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে Lusaka, Zambia-এ, যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
রিপোর্টার্স উইদাউট বোর্ডার্স (আরএসএফ)-এর ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদ স্বাধীনতা সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২০ সালে যেখানে দেশটির অবস্থান ছিল ১৫৫তম, সেখানে ক্রমাবনতি এক গভীর উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেশী ভারত ১৫০তম, নেপাল ৭৬তম, এমনকি পাকিস্তান ১৫৭তম অবস্থানেও বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত। শুধু মিয়ানমার ও চীন-সহ আরও কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের নিচে রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—সংবাদকর্মীদের ওপর শারীরিক হামলা, মামলার হুমকি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার, ও টেলিযোগাযোগ সম্প্রচার আইনের অপপ্রয়োগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের মালিকানা অতি সংকীর্ণ কয়েকটি শক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত, যা বহুত্ববাদী সংবাদ পরিবেশের পক্ষে অন্তরায়।
‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ওপর মৌলবাদী হামলা — গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খুনের প্রত্যক্ষ কাহিনি
স্বাধীন সংবাদপত্রের প্রতি মৌলবাদী সন্ত্রাসের যে ইতিহাস এ দেশে নব্বইয়ের দশক থেকে লিখিত হয়ে আসছে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেশের দুই সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ওপর সাম্প্রতিক হামলাকাণ্ড। গত বছরের ৫ অক্টোবর, ২০২৪, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলোর কার্যালয় লক্ষ্য করে একদল মুখোশধারী মৌলবাদী হামলা চালায়। ভাঙচুর করা হয় কক্ষপথ, অগ্নিসংযোগ করা হয় সংবাদ বিভাগের একাংশে। আহত হন অন্তত ছয়জন নিরাপত্তাকর্মী ও দুইজন সাংবাদিক। এই ঘটনার মাত্র সপ্তাহখানেক পর ১৩ অক্টোবর, ২০২৪, একই ধরোনায় হামলা হয় ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর মতিঝিল অফিসে। ভাঙচুর করা হয় মালপত্র, সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয় তাদের অনলাইন সংবাদ পরিষেবা।
উদ্বেগজনক বিষয়—এই হামলার পেছনে থাকা সংগঠনগুলির নাম নিঃসংকোচে ঘোষণা করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ‘আনঅথরাইজড ধর্মীয় উগ্রবাদী গ্রুপ’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও কোনো গ্রেপ্তার হয়নি মোটে দুই-তিনজন ছোট নেতা-কর্মী ছাড়া। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই হামলার প্রতিবাদে সংবাদপত্রের মালিক ও সম্পাদকদের প্রতিবাদ সমাবেশ উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্র বলেছিলেন, ‘এ ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়, কিন্তু গণমাধ্যমের দমন-পীড়নের প্রমাণ নয়। এটি আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার অংশমাত্র।’
এ ভাষ্য যেন প্রকাশ্যেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে। যখন সংবাদপত্রের কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা হয়, সাংবাদিকরা রক্তাক্ত হন, তখন সেই ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থতা’ আখ্যা দেওয়া মানে এই সংকেত দেওয়া—আপনার সংবাদপত্র নিজেই মুখ বন্ধ রাখুন, নইলে পরের হামলা আরও ভয়াবহ হবে। এই দুই ঘটনার পর দেশের আরও অন্তত চারটি জেলায় সংবাদপত্র অফিসে হুমকিমূলক পোস্টার ও ইমেইল পাওয়া গিয়েছিল, যার তদন্ত আজও অর্ধ-সমাপ্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের কালপর্ব ও সরকারপ্রধানের ঐ ‘নিরবতার বাশি’
২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলটি গণমাধ্যম স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত হবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই সময়কালে অন্তত ৬৭ জন সাংবাদিককে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিখিল বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি (প্রেসক্লাব) ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের পৃথক প্রতিবেদনে অবশ্য সেই সংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গেছে।
তবে গ্রেপ্তারের চেয়েও প্রতীকী ও শঙ্কাজনক এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান তথাকথিত ‘নিরবতার বাশি বাজানো’ কর্মসূচি। গত ১৫ এপ্রিল, ২০২৫, জাতীয় কার্যক্রমে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিষয়ে এক সেমিনারে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের দেশে গণমাধ্যম অতিরিক্ত উচ্চৈঃস্বরে সত্য বলতে চায়, কিন্তু সেই সত্য প্রায়শই শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্ম দেয়। এখন সময় এসেছে ‘নিরবতার অনুশীলন’—কখন বোলো আর কখন থামো, সেই শিক্ষা সাংবাদিকদের আয়ত্ত করতে হবে।” এই বক্তব্য উপস্থিত সাংবাদিক মহলে শিহরণ সৃষ্টি করে। অনেকেই একে ‘গণমাধ্যমের চুপ করানোর ডিক্টেট’ আখ্যা দেন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর’ এই উক্তির অনুবাদ করে হেডলাইন দেয়—“গণমাধ্যমকে শেখানো হবে কখন ‘নিরব বাঁশি’ বাজাতে হয়।” পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ছয়জন সংবাদকর্মীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় ‘সরকারের সমালোচনায় অতিরিক্ত উগ্রতা’ দেখানোর অভিযোগে নোটিশ দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার ও গণমাধ্যম ওয়াচ’ তাদের প্রতিবেদনে ‘অভূতপূর্ব গণমাধ্যম দমন’ বলে বর্ণনা করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক ‘আমার দেশ’, ‘সমকাল’, ‘যুগান্তর’ ও অনলাইন পোর্টাল ‘বিডিনিউস২৪’, ‘একাত্তর টিভি’, ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’-এর কর্মী-সংবাদদাতা। অভিযোগ—সরকারবিরোধী সংবাদ পরিবেশন, ‘মিথ্যা ও উস্কানিমূলক রিপোর্ট’, ও ‘রাষ্ট্রীয় গুপ্তচরবৃত্তির তথ্য ফাঁস’। কিন্তু আদালতে অধিকাংশ মামলার সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে আসামিরা জামিন পেলেও বের হতে সময় লেগেছে গড়ে ৯০ থেকে ১৪০ দিন।
বিশেষত খোলা মামলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মার্চ ২০২৫-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহকারী ফটোসাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা; অক্টোবর ২০২৪-এ রাজশাহীতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় কমিশনারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সংবাদদাতাকে রাতভর থানায় আটকে রাখা। প্রতিটি ঘটনাই যেন মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতি রাষ্ট্রীয় কুণ্ঠিত আচরণের দলিল।
ব্যক্তিকথা—কারারুদ্ধ সাংবাদিকদের আর্তচিৎকার
শুধু সংখ্যা নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে ব্যক্তিগত মানবিক মর্যাদাও। কুষ্টিয়ার স্থানীয় সংবাদকর্মী মির্জা গোলাম রহমান (নাম পরিবর্তিত) অভিযোগ এনে বলেছেন, “আমি শুধু উপজেলা চেয়ারম্যানের দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করছিলাম। রাতে গাজীপুরের একটি কারাগারে আমাকে স্থানান্তর করা হয়। আমার সাত বছরের ছেলে ফোনে কাঁদছিল—বাবা তুমি ফিরবে না?” এই ঘটনা যেন স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৭০-এর দশকের লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসনের কালো দিনগুলি।
প্রথম আলোর হামলায় আহত এক নিরাপত্তাকর্মী হাসপাতালের শয্যায় বলেন, “হামলাকারীরা এ দেশীয় ভাষায় চিৎকার করে বলছিল—‘আল্লাহর নামে অপবাদ ছড়ানো বন্ধ কর’। তারপর তারা আমার মাথায় রাইফেলের কুণ্ডুল দিয়ে আঘাত করে। আমি ভেবেছিলাম, আজ শেষ রাত।” এই আতঙ্কের বর্ণনা যেন সরাসরি দেখিয়ে দেয় কীভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদ সশস্ত্র হয়ে স্বাধীন সংবাদপত্রের গলাটিপে ধরে।
আন্তর্জাতিক অ্যামনেস্টি তাদের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ: দমন-পীড়নের অগ্নিপরীক্ষা ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘প্রায় ৩০% গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় মামলা করা হয়, যার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই আইন গণমাধ্যমকাজকে সন্ত্রাসবিরোধী অপরাধের মর্যাদা দিয়ে ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার।’
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আদর্শ বনাম বাস্তবতা
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদ এই দিবস চালু করে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ও ডিজিটাল মাধ্যমের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসটি কেবল বক্তৃতার আসর, নয় বরং এক দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
যখন বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে সংবাদকর্মীরা সরকারি নীতি সমালোচনায় স্বচ্ছন্দ, সেখানে আমাদের দেশের সাংবাদিকরা ভাবেন—‘এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে রাতে পুলিশ কি নাড়াবে? অথবা কোনো মৌলবাদী দল কি অফিসে আগুন দেবে?’ স্বাধীন গণমাধ্যমের ধারাটি অস্তিত্বের সংকটে। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে বৈষম্য, সংবাদপত্র অধিগ্রহণে ব্যারনদের দৌরাত্ম্য, উগ্রপন্থি হামলার শঙ্কা, এবং আইনি হয়রানি এসব যেন বিষম জালের মতো জড়িয়ে ফেলেছে পুরো সেক্টরকে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও স্থানীয় প্রতিরোধ
গত বছরের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এক বিবৃতিতে ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার উদ্বেগ প্রকাশ করে’ এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘সাংবাদিক সুরক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান জানায়। অনুরূপভাবে কমনওয়েলথ প্রেস ফ্রিডম টাস্কফোর্স অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণমাধ্যমের শ্বাসরোধ নীতি’ ও ‘প্রধান উপদেষ্টার নিরবতার দর্শনের’ সমালোচনা করে নিষেধাজ্ঞা আহ্বান করে। কিন্তু বিদেশি সমালোচনা কি যথেষ্ট? তৃতীয় বিশ্বের অসংখ্য দেশে আন্তর্জাতিক চাপে গণমাধ্যমের পরিবেশ পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এখানে সরকারি পক্ষ বরং বিদেশি ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের’ অভিযোগে পাল্টা সুর তোলে।
তবে ভয়ঙ্কর হলেও সত্য—বাংলাদেশের গণমাধ্যম চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে এখনও মৃতপ্রায় নয়। ব্যতিক্রমী কিছু সংবাদমাধ্যম নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে ফ্যাক্ট-চেকিং, লং-ফরমেট গল্প, ও নাগরিক ইস্যুতে সোচ্চার থেকে। অনলাইন অ্যাক্টিভিজম, বিকল্প পডকাস্ট, স্বল্প-ব্যাপী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয় যতদিন না পর্যন্ত সরকারি কাঠামোতেই স্বাধীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাধানের পথ—কোথায় যেতে পারে বাংলাদেশ?
প্রথমত, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও টেলিযোগাযোগ সম্প্রচার আইনের ‘সেন্সরশিপ’ সংক্রান্ত ধারাগুলি সংশোধন করে ‘গণমাধ্যম সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা আবশ্যক। সেই আইনে সংবাদপত্র কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের বিধান রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী কালে গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিকদের সব মামলা খারিজ করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রেস কাউন্সিল গঠন করে সাংবাদিক নৈতিকতা রক্ষার পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘গণমাধ্যম সাক্ষরতা’ ও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পঞ্চমত, সরকারপ্রধান ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ‘নিরবতা’ সংক্রান্ত বক্তৃতার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী প্রভাব বন্ধে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে জরুরি বৈঠক ডাকা উচিত, যেখানে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সরাসরি যোগ দেবেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে তার দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে—সনদ সই করেছে, মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ১৯-এর অনুচ্ছেদ ১৯-এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। এটা কাগজের কল্পকাহিনি নয়, এটা জীবন্ত অধিকার।
শেষ কথা: ইতিহাস যেমন বিচার করবে
আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি এক কঠিন প্রতিজ্ঞা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান। যেসব সাহসী সাংবাদিক আজ কারাগারে বন্দি, যারা নিত্যদিন হুমকি উপেক্ষা করে লিখে চলেছেন, কিংবা যাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে ধরপাকড়ের মাধ্যমে—ইতিহাস তাদের ‘অপরাধী’ হিসেবে নয়, বরং অন্যায় ও নীরবতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো লড়াকু হিসেবে স্মরণ করবে। আর যারা এই নিপীড়নের মুখে ‘নীরবতার বাঁশি’ বাজান কিংবা মৌলবাদী হামলার নিন্দা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেন, ইতিহাস তাদের চিহ্নিত করবে ‘কণ্ঠরোধের সহযোগী’ হিসেবে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হঠাৎ পাওয়া কোনো উপহার নয়। এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অমর একুশের চেতনার সূতিকাগার থেকে উৎসারিত এক মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানের এই নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম এক দমনমূলক জনপদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকার ছিল ‘সংস্কার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা’—সেই প্রতিশ্রুতি যদি ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।
এখনই প্রয়োজন অদম্য সাহস এবং সাংবাদিকদের আপসহীন কলম। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি—যাতে কোনো স্বেচ্ছাচারী শক্তি গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরতে না পারে, যাতে কোনো উগ্রবাদী শক্তি সংবাদকক্ষে অগ্নিসংযোগের দুঃসাহস না দেখায়। প্রতিটি সাংবাদিক যেন নিঃশঙ্কে লিখতে পারেন স্বাধীনতার পক্ষে, সত্যের পক্ষে।
জয় হোক গণমাধ্যমের স্বাধীনতার। জয় হোক সত্যের।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#WorldPressFreedomDay2026 #PressFreedomCrisis #JournalismInDanger #RSFIndexBangladesh#BangladeshMediaCrisis #InterimGovernmentArrests #ProthomAloAttack #DailyStarAttack #JournalismUnderSiege #PressFreedomIndexBangladesh
WorldPressFreedomDay2026 PressFreedomCrisis RSFIndexBangladesh ProthomAloAttack BangladeshMediaCrisis

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: