odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 12th February 2026, ১২th February ২০২৬
ভোটের ফলাফল কি হইবে, এখন হিসাবের পালা—মসনদ বদলালে কি বদলাবে মানুষের ভাগ্য, শুরু সাধারণের কঠিন বাস্তবতা। আসলে রণভেরীর শব্দ থেমেছে, এখন কি শোনা যাবে বাজারের কান্না?

বেলাশেষে: দীর্ঘ নির্ঘুম রজনীর পর সাধারণের কপাললিখন (নির্বাচন শেষে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী পরিবর্তন আসবে? দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এক বিশ্লেষণধর্মী সম্পাদকীয়।)

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১১ February ২০২৬ ১৭:৫৬

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১১ February ২০২৬ ১৭:৫৬

বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম, ঢাকা —

দীর্ঘ নির্বাচনী উত্তাপের পর সাধারণ মানুষের কপাললিখন কী বদলাবে? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মধ্যবিত্তের হাহাকার, শ্রমজীবীর বঞ্চনা ও দুর্নীতির ছায়ায় দাঁড়িয়ে এই সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ করেছে ভোট-পরবর্তী বাস্তবতা। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি আবারও আশাভঙ্গের ইতিহাস রচিত হবে—জানতে পড়ুন ‘বেলাশেষে: দীর্ঘ নির্ঘুম রজনীর পর সাধারণের কপাললিখন’।

রণভেরী যখন শান্ত

অদ্য রজনীর তিমির বিদায় হইবার পূর্বেই সংবাদ আসিতেছে যে, নির্বাচন নামক মহাযুদ্ধের অবসান ঘটিতে আর মাত্র ২৪ ঘন্টার মতো সন্ত অবশিষ্ট রহিয়াছে। অনেকের মতে নির্বাচনের প্রচারে অনেক চমক ঘটিয়াছে। আশার ফুলঝুরিতে সবুজের গালিচা লাল থেকে নীলাভ হইয়াছে। আসলে যে যুদ্ধের ডঙ্কা বিগত কয়েক মাস যাবত আপামর জনমানসে এক নিদারুণ কম্পন সৃষ্টি করিয়াছিল, সেই নির্বাচনী রণভেরী এখন ক্লান্ত। রাজপথে আছাড় খাইয়া পড়া রঙিন পোস্টারসমূহ এখন নর্দমার জলস্রোতে মিশিয়া একাকার হইবার প্রস্তুতি লইতোছে। অথচ, এই দৃশ্যপটের অন্তরালে যে প্রশ্নটি কোটি কোটি মানুষের হূদয়কন্দরে হাতুড়ির ন্যায় আঘাত করিতেছে, তাহা হইল— "বেলাশেষে সাধারণের ভাগ্যাকাশে কি নবোদিত সূর্যের আভাস মিলিবে, নাকি কালবৈশাখীর কৃষ্ণ মেঘ পুঞ্জীভূত হইবে?"

রাজনীতির এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে যবনিকা উত্তোলিত হইবার পর অভিনেতাগণ এখন নিজ নিজ কুঠুরিতে বিশ্রামের আয়োজন করিতেছেন। কিন্তু মঞ্চের সম্মুখে উপবিষ্ট যে অগণিত জনতা—যাঁহারা রোদে পুড়িয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া স্বীয় ভোটাধিকার প্রয়োগ করিবার মনস্থির করিয়াছেন —তাঁহাদের পাতে কি ১২ ফেব্রুয়ারির রজনী পরে একমুষ্টি অন্ন অধিক জুটিবে? সাধু ভাষায় বলিতে গেলে, এই মহাযজ্ঞের পূর্ণাহুতিতে কি গণমানুষের কষ্ট লাঘব হইবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে?

দ্রব্যমূল্যের দহন প্রজার দীর্ঘশ্বাস

যাঁহারা মসনদে আরোহণ করিবেন, তাঁহাদের কর্ণে কি আমজনতার কথা পৌঁছাইবে? বাজারের থলি হাতে লইয়া সাধারণ গৃহস্থের সেই করুণ আর্তি? আলু, পটল আর ভোজ্য তৈলের অগ্নিমূল্যে যখন রসুইঘর শ্মশানের ন্যায় খাঁ খাঁ করিতেছে, যখন বায়বীয় সিলিন্ডারের ভেলকিবাজি রন্ধনশালায় অস্বস্তির মহাকম্পণ তৈরি করিয়াছে, তখন রাজনৈতিক ভাষণের মিষ্টতা কি সেই জ্বালা প্রশমন করিতে সক্ষম হইবে? অনাগত ভবিষ্যৎ কী সোনার বাংলার হদিস করিতে সক্ষম হইবে, নাকি সেই “যাহা লাউ তাহাই কদু” হইয়াই রুদ্রমূর্তি ধারণ করিয়া আশার স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হইয়া উঠিবে?

কেন এই আশংকার উদ্ভব হইতেছে?

হাঁটি হাঁটি পা পা করিয়া নবীন লাল সবুজের দেশটির বয়সতো আর কম রইলো না! আমজনতা এর আগে আরো বারোবার ্‌রিূপ নির্বাচন প্রত্যক্ষণ করিয়াছে। অপরদিকে আরো অর্ধহালি হ্যাঁ/না-এর সম্মুখীন হইয়াছে, কিন্তু ভাগ্যে যাহা ছিল তাহাই রহিয়া গিয়াছে। তথাপি উৎসাহের কমতি হয় নাই। কিন্তু এইবার মনে হয় প্রথমবারের মতো উৎসাহের কমতি লক্ষ্য করা গিয়াছে। এর পিছনে রহিয়াছে গভীর দীর্ঘশ্বাস। কেননা: দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন জনমনে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি করিয়াছে। বাজারের ফর্দ এখন যেন এক বিভীষিকা। ১০ টাকার সামগ্রী আজ ৩০ টাকায় বিকাইতেছে।এর পিছনে কাহারা রহিয়াছে, তাহাও জনমনে স্পষ্ট হইলেও কিন্তু কবি এখানে নিরব হইয়া গিয়াছেন। সেই এক মহাকাব্য। বাঙালি প্রতিবারই দেখিয়াছে, “যে যায় লংকায়, সেই হয় রাবন”। কিন্ত তাই বলিয়া রাম-লক্ষণ কী আসিতে পারিবে না? কথা যাহাই হোক না কেন, মধ্যবিত্তের হাহাকার কি চির বৃত্তের মধ্যে পড়িয়া চক্রাকারে ঘুরিতে থাকিবে, নাকি তাহারা কোনো আশার আলোতে জ্বলিয়া উঠিবার সুযোগ পাইবে? কেননা এই হইতেছে সেই মধ্যম সমাজ, যাহাদের সঞ্চয় হইতেছে যৎসামান্য, তাহারা কিন্তু আজ ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্টে বদ্ধ। কি করিবে এই ইলেকশনে? তাহাদের কি আনিয়া দিবে? তাহােআজ তাহাদের নিকটেই স্পষ্ট হয় নাই। তাইতো রাত তাহাদের পোহাইবে কীনা, তাহারা আজ সন্ধিহান। আগরে মতো সেই উঃসাহের ভাটার এটাই যে প্রধানতম কারণ তাহা কি বুঝিতে পারা যায় নাই?

অপর একটি শ্রেণি রহিয়াছে, যাহাদের এই নির্বাচনী সমাবেশের মাঠে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে পরিগণিত হইয়াছে, তাহাদের সর্বত্র দেখা যাইতেছে, কিন্তু তাহারাও কিন্তু অনেকটা সন্দেহের মধ্যে রজণীপাত করিতেছে, সন্দেহের মধ্যে রহিয়াছে নিজেদের ভাগ্য নিয়া। হ্যাঁ- তাহারা হইতেছে খেটে খাওয়া শ্রেণি। শ্রমিক-মজুর-কৃষক শ্রেণি। এই শ্রেণির ঘামে ইশ্বর থাকিলেও নেতাদের চোখে কেবলই মিছিল বা সমাবেশ লোকারণ্য করিবার একটি পন্য মাত্র। কিন্তু তাহাদের ঘামেই গড়িতেছে দেশ, হইতেছে খাদ্যের যোগান, নিজেরা থাকিতেছে উপোষ। আসলে দেখা যাইতেছে, যে রাজমিস্ত্রি অট্টালিকা গড়িল, তাহার স্বীয় চালার খড়টুকুও আজ ঝরঝরে।

নির্বাচনের ইশতেহারে যে দুগ্ধ ও মধুর নদী বহাইবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে, তাহার কতটুকু বাস্তবায়িত হইবে আর কতটুকু ফাইলবন্দি হইয়া মহাফেজখানায় ধূলি ধূসরিত হইবে, তাহা মহাকালই জানে। সাধু ভাষায় বলিতে গেলে, "প্রতিশ্রুতি যখন আকাশচুম্বী হয়, প্রাপ্তির ঝুলি তখন প্রায়শই শূন্যতায় পর্যবসিত হইতে দেখা যায়।"

শাসনতন্ত্রের নব কলেবর আশার আলো

তবে কি সমস্তই আঁধার? নৈরাশ্যবাদী হইয়া কি কেবল হাহাকারই আমাদের নিয়তি? না, মুদ্রার অপর পিঠও বর্তমান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন নতুন শাসনভার ন্যস্ত হয়, তখন জনমানসে এক নবীন আশার সঞ্চার হওয়া অস্বাভাবিক নহে। যদিও পাঞ্জেরির নিকট এখন বেশ কয়েকটি সুযোগের হাতছানি রহিয়াছে, পূরণ হইবে নাকি আবারো প্রতারিত হউবে কে জানে? এখানে আসিয়াছে এক মুক্তির বারতা, স্থিতিশীলতার হাতছানি। অনিশ্চয়তার কুয়াশা কাটিয়া গেলে ব্যবসায়-বাণিজ্যে গতির সঞ্চার হইতে পারে বলিয়া তাহারা মনে করিতেছে, কিন্তু ঘর৫েপাড়া গরু যে সিধূরেও ভয় পায়, সেই ভয় কিভাবে কাটাইবে, তাহাই এখন দেখিবার সময়।

নির্বাচনের মাঠে ময়দানে ভাষণে কথায় দেওয়া হউয়াছে অনেক অনেক আশা, যাহা তৈরি করিয়াছে দেশে বণ্যায় ভাসিয়া যাইডবার সম্ভাবনা। তবে এই বন্যা পানিবাহিত হইবে না, তাহা হইবে উন্নয়নের জোয়ারে। কিন্তু এই চেজায়ার আবারো আমাবশ্যার কবলে পরিবে কিনা কে জানে? এই উন্নয়নের জোয়ার যদি আসলিই নতুন পরিকল্পনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ ঘটাইতে পারে, নির্বাচিতদের স্বীয় স্বাপর্থ সিদ্ধি অপক্ষেঅ জন মানুষের কথা প্রতিপলিত করিতে পারে, তাহা হইলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হইবে আর যুবসমাজের হতাশা কিঞ্চিৎ হউলেও দূর হইতে পারে। কিন্তু পাঞ্জেরি মনে করিয়ে দিয়াছে বিপরীত চিত্র। তাহা এখনে নাই বলিলাম।

আজ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়াছে সেই ইবলিশের ছায়া, যাহা নতুন নাম ধারণ করিয়ারেছ। আর এই নাম হইতেছে, “দূর্নীতি”। তাই আজিকার এই দুর্নীতির দমন হইবে, নাকি আরো বাড়িবে, তাহাই দেখিবার বিষয়। যদি নবনিযুক্ত কর্ণধারগণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, তবে সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটিয়া সাধারণের কষ্ট লাঘব হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু এই বঙ্গমূলকে যে ইবলিশ ঘুরিতেছে প্রতিটি পাড়া মহল্লায়, কিভাবে এই রাহু হইতে মুক্তি আসিবে, সেই চিন্তায় হাজার মন নৈস্যি শেষ হেইবার উপক্রম হইতেছে। আসলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়—এই প্রবাদ যেন এবারে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, সেই প্রার্থনায় মত্ত হাজারো বঙ্গ সৈনিক । উলুখাগড়া যেন এবার সবল বৃক্ষে পরিণত হইবার সুযোগ পায়, সেই আশায় বাধিয়া রাখিয়াছে মন।

শেষ হিসাব: কর্মফল আগামীর পথ

বেলাশেষে সূর্যের রক্তিম আভা যখন দিগন্তে বিলীন হইবে, তখন গ্রামের সেই বৃদ্ধ কৃষক বা শহরের সেই ক্ষুদ্র কেরানি যেন অন্ধকারে হারাইয়া না যান। গণমানুষের কষ্ট কেবল তখনই লাঘব হইবে, যখন রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ক্ষমতার গণ্ডি ছাড়াইয়া সেবার আঙিনায় প্রবেশ করিবে।

রাজনীতিবিদগণ মনে রাখিবেন, জনতা জনার্দন। তাঁহাদের ধৈর্য যখন বাঁধ ভাঙে, তখন কোনো মসনদই চিরস্থায়ী হয় না। অতএব, বেলাশেষের এই ক্ষণে আমাদের একটাই প্রার্থনা—আগামী দিনগুলিতে যেন ক্ষুধার জ্বালায় কাহাকেও অঝোরে অশ্রুপাত করিতে না হয়। দেশের প্রতিটি পর্ণকুটিরে যেন এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দেয়।

✍️ অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বেলাশেষে #নির্বাচন২০২৬ #জনগণেরকপাললিখন #দ্রব্যমূল্যসংকট #মধ্যবিত্তেরহাহাকার #শ্রমজীবীরঅধিকার #দুর্নীতিমুক্তবাংলাদেশ #ElectionAftermath #BangladeshPolitics #VoteAndReality #EconomicCrisisBD #জনগণেরইশতেহার #রাজনীতি_ও_বাস্তবতা #ঢাকা_সম্পাদকীয়



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: