odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 17th February 2026, ১৭th February ২০২৬
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ফাটল আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন ইউরোপীয় নেতারা

মিউনিখ সম্মেলনে ইউরোপের স্পষ্ট বার্তা: আমেরিকা আর নির্ভরযোগ্য নয়

Special Correspondent | প্রকাশিত: ১৭ February ২০২৬ ০০:২০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ১৭ February ২০২৬ ০০:২০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

সাত দশক ধরে যে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন ছিল পশ্চিমা সংহতির প্রতীক ২০২৬ সালে এসে তা যেন এক বিচ্ছেদের দলিলে পরিণত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতিগুলো আটলান্টিকের দুই তীরের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে এমন এক ফাটল ধরিয়েছে যা ইউরোপীয় নেতাদের মতে অপ্রতিরোধ্য।

১. মুক্ত বিশ্বের নেতা খেতাব কি তবে হারাল আমেরিকা?

১৯৪০-এর দশকের পর থেকে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিডার অফ দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড বা মুক্ত বিশ্বের নেতার সম্মান পেয়ে এসেছেন। কিন্তু এবারের সম্মেলনে সেই ঐতিহ্যে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ অত্যন্ত কড়া ভাষায় বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন: যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের দাবি আজ চ্যালেঞ্জের মুখে, এবং সম্ভবত তা ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে। মের্জের এই বক্তব্য কেবল কথার কথা নয় তিনি জানিয়েছেন যে ফ্রান্সের সাথে ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধের (Nuclear Deterrence) বিষয়ে ইতিমধ্যে গোপন আলোচনা শুরু করেছে জার্মানি। এটি আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার ওপর ইউরোপের আস্থাহীনতারই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

২. ডেমোক্র্যাটদের ২০২৮-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম রূঢ় বাস্তবতা

গ্যাভিন নিউজাম, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ (AOC) এবং মার্ক কেলির মতো ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা মিউনিখে এসেছিলেন বিশ্বনেতাদের আশ্বস্ত করতে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজাম মঞ্চে দাঁড়িয়ে দাবি করেন যে, ট্রাম্পের নীতিগুলো সাময়িক এবং তাঁর রাজ্য (ক্যালিফোর্নিয়া) আমেরিকার আসল চেতনার ধারক। তবে সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন ইউরোপীয় নেতারা এখন আমেরিকাকে একটি রেকিং বল (ধ্বংসাত্মক শক্তি) হিসেবে দেখছেন।

৩. ওকাসিও-কর্তেজের হোঁচট ও ভূ-রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা

প্রগ্রেসিভ তারকা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ (AOC) এই সম্মেলনে নিজের আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাইওয়ান ইস্যুতে একটি সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বেশ অস্বস্তিতে পড়েন। চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করে, তবে আমেরিকা সেনা পাঠাবে কি না এমন প্রশ্নে তাঁর অস্পষ্ট ও জড়তাহীন উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এটি প্রমাণ করেছে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতির বিকল্প বিশ্বদর্শন তৈরি করতে ডেমোক্র্যাটদের এখনো অনেক পথ বাকি।

৪. গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল

রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যখন ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পুরনো পরিকল্পনার কথা নতুন করে তোলেন, তখন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটরদের ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এদিকে, হাউজ স্পিকার মাইক জনসন কংগ্রেসনাল ডেলিগেশন বাতিল করায় অনেক ডেমোক্র্যাট সদস্য সম্মেলনে যোগ দিতেই পারেননি যা ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।

৫. মার্কো রুবিও এবং 'নতুন পৃথিবী'র বার্তা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বছরের তুলনায় কিছুটা নমনীয় সুরে কথা বললেও তাঁর মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট: পুরানো বিশ্বব্যবস্থা হারিয়ে গেছে। তিনি সম্মেলন শেষ করেই হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোর নেতাদের সাথে দেখা করতে যান, যাঁরা ট্রাম্পের নীতির ঘোর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এটি ইউরোপের মূলধারার নেতাদের মনে আরও সংশয় তৈরি করেছে।

জন ম্যাককেইনের মতো নেতারা যে 'পাশ্চাত্য মূল্যবোধের' জয়গান গাইতেন, আজ মিউনিখের অলিগলিতে সেই সুর আর শোনা যায় না। ডেমোক্র্যাটরা ২০২৮ সালে হোয়াইট হাউস ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, ততদিনে আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বের যে ক্ষতি হয়ে যাবে তা মেরামত করতে কয়েক প্রজন্ম সময় লেগে যেতে পারে।

-মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: