odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 25th February 2026, ২৫th February ২০২৬
চার বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বদলে গেছে যুদ্ধের কৌশল, কূটনীতি ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য

ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর: বদলে যাওয়া রণকৌশল আর বিপন্ন বিশ্ব নিরাপত্তা

Special Correspondent | প্রকাশিত: ২৪ February ২০২৬ ২৩:১০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ২৪ February ২০২৬ ২৩:১০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি এটি চুরমার করে দিয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের সমীকরণ। যুদ্ধের চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব দেখছে এক নতুন ভূ-রাজনীতি, যেখানে আমেরিকার একক আধিপত্যের অবসান ঘটছে এবং যুদ্ধের ময়দান দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোনের মতো বিধ্বংসী প্রযুক্তি।

যুদ্ধের ময়দানে ড্রোন বিপ্লব

এই চার বছরে যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে ড্রোন। কামিকাজে ড্রোন থেকে শুরু করে মোশন সেন্সর যুক্ত স্বয়ংক্রিয় ড্রোন প্রতি ছয় সপ্তাহ অন্তর অন্তর উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন সব মারণাস্ত্র। ইউক্রেনের ‘ব্ল্যাক উইং’ ইউনিটের মতো যোদ্ধারা এখন বাঙ্কারে বসেই লড়ছেন এই প্রযুক্তিগত লড়াই। রাশিয়ার সেনারা এখন এমন ড্রোন ব্যবহার করছে যা যুদ্ধক্ষেত্রে ওত পেতে থাকে এবং মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই বিস্ফোরিত হয়। পশ্চিমা সামরিক শক্তিগুলো এখন এই ‘অটোমেটেড কিলিং’ বা স্বয়ংক্রিয় হত্যার কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।

মার্কিন নেতৃত্বের অবসান ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনীতি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তন বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা এখন অনেকটাই ম্রিয়মাণ। আলাস্কায় পুতিনের জন্য লাল গালিচা সংবর্ধনা কিংবা ইউক্রেনকে সহায়তার বদলে সমঝোতার চাপ—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে কিয়েভ। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও খোদ মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়া আদৌ শান্তি চায় কি না তা যুক্তরাষ্ট্রের জানা নেই। আমেরিকা এখন বৈশ্বিক অভিভাবক থেকে সরে এসে নিজস্ব বলয় তৈরিতে ব্যস্ত, যা ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

অস্তিত্বের সংকটে ইউরোপ

ইউরোপ এখন এক মিথ্যা অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে। ইউক্রেনকে পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা না দিয়ে দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু সমরবিদদের শঙ্কা, ইউক্রেনের পতন হলে রুশ বাহিনী সরাসরি ন্যাটোর সীমান্তে পৌঁছে যাবে। যদিও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশগুলো ২০৩৫ সাল নাগাদ প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু বর্তমানের রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মানবিক বিপর্যয় ও ইউক্রেনীয়দের ক্লান্তি

যুদ্ধের চার বছর ইউক্রেনকে এক বিধবা ও এতিমদের জাতিতে পরিণত করার উপক্রম করেছে। ডনবাসের ক্রামাতোরস্কের মতো শহরগুলো এখন ধ্বংসস্তূপ। সাধারণ মানুষ যারা এক সময় ভাবতেন এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, তারা এখন চরম ক্লান্ত।

মানবিক চিত্র: কিয়েভের রাস্তায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে স্বজনহারা মানুষের ভিড়।

সৈন্য সংকট: সম্মুখসমরে রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনীয় সেনার অনুপাত এখন ১:২০। এই অসম লড়াইয়ে ইউক্রেন টিকে আছে কেবল তাদের উদ্ভাবনী শক্তি আর অদম্য জেদের ওপর ভর করে।

এক নজরে যুদ্ধের প্রভাব (২০২২-২০২৬)

রণকৌশল: প্রযুক্তির জয়জয়কার

প্রথাগত যুদ্ধের ধারণা বদলে দিয়ে এখন আকাশ দখল করেছে ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। যুদ্ধের ময়দানে এখন আর শুধু মানুষের লড়াই নেই; বরং সাশ্রয়ী ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে।

ভূ-রাজনীতি: বিশ্বশক্তির নতুন সমীকরণ

একক মার্কিন আধিপত্যের যুগ কার্যত হুমকির মুখে। রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা এবং কৌশলগত কারণে চীন, রাশিয়া ও ভারতের একটি অলিখিত অক্ষ বা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বনেতৃত্বের চেয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

অর্থনীতি: ইউরোপের জ্বালানি ও খাদ্য সংকট

যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে ইউরোপ। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় মহাদেশটিতে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। এই সংকট সামাল দিতে ইউরোপীয় দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

ইউক্রেন: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও জনশক্তি সংকট

গত চার বছরে ইউক্রেন তার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ হারিয়েছে। ক্রমাগত রুশ হামলার পাশাপাশি এখন কিয়েভের বড় দুশ্চিন্তা হলো সেনাসংকট। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে দক্ষ সেনার অভাব এবং নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানসিক ক্লান্তি দেশটিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইউক্রেনীয়দের জন্য এই যুদ্ধ এক অভিশাপ, যা তাদের প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এটি যেন এক দীর্ঘস্থায়ী খরচের খাতা। কিন্তু কিয়েভের যোদ্ধারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্ব সাহায্য করুক বা না করুক অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াই তারা চালিয়ে যাবেন।

---মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: