নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংঘাতের বিস্তৃতি এবং হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন আদর্শিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ: সতর্ক অবস্থানে আসিয়ান
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মূলত সতর্কতা ও সংযম প্রদর্শনের নীতি গ্রহণ করেছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ৪ মার্চ এক যৌথ বিবৃতিতে এই উত্তেজনাকে দুর্ভাগ্যজনক এবং বিশ্ব শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মালয়েশিয়া: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পাশাপাশি ইরানের পাল্টা হামলারও নিন্দা জানিয়েছে দেশটি।
থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম: দেশগুলো পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম পালনের আহ্বান জানিয়েছে।
সিঙ্গাপুর: ওমান-নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছে দেশটি।
এই সতর্ক বার্তার নেপথ্যে রয়েছে দেশগুলোর নাগরিকদের নিরাপত্তা। বিশেষ করে ফিলিপাইনের জন্য এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ ইরানে তাদের প্রায় ১,৬০০ এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ২২ লাখের বেশি প্রবাসী কর্মী কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
লি কুয়ান ইউ স্কুল অফ পাবলিক পলিসির ডিন জোসেফ লিউ এবং বিশ্লেষক হান্টার মারস্টনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। এই বিষয়টি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের, কারণ দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে তারা নিজেরাও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকদের মনে করছেন এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বেপরোয়া ও অস্থির সুপারপাওয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দেশগুলোকে বিকল্প বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজতে বাধ্য করতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার ভারসাম্য রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ চাপ
আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ব্যক্তিগতভাবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে গাজায় শান্তি রক্ষার জন্য ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অফ পিস’ স্কিমে ৮,০০০ সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নিজ দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য সুবিধা অন্যদিকে মুসলিম প্রধান দেশের সংহতি এই দুইয়ের মাঝে প্রাবোও এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন।
অর্থনীতির ওপর কালো মেঘ
ভূ-রাজনৈতিক ইমেজের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর: থাইল্যান্ডে শেয়ার বাজারে ধস নামায় বুধবার লেনদেন আগেভাগেই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। মিয়ানমার এর সামরিক জান্তা ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য জ্বালানি রেশনিং ঘোষণা করেছে এবং সিঙ্গাপুর তার জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশটি তাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের তাপ সরাসরি অনুভব করছে। মার্কিন একক আধিপত্যের প্রতি অনাস্থা এবং তেলের দামের উর্ধ্বগতি দেশগুলোকে এখন প্র্যাগমেটিজম বা বাস্তববাদী হতে বাধ্য করছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: