odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 17th March 2026, ১৭th March ২০২৬
হেরা গুহার ‘ইকরা’ থেকে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ—লাইলাতুল কদরের আলোয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও শিক্ষা সংস্কারের নতুন দিগন্ত

মহিমান্বিত রজনীর আলোকশিখা: পবিত্র লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৬ March ২০২৬ ১০:২৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৬ March ২০২৬ ১০:২৪

সম্পাদকীয় (অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক)

লাইলাতুল কদরের আলোয় জ্ঞান ও নৈতিকতার নতুন অঙ্গীকার—

লাইলাতুল কদরের আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে কেন্দ্র করে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব এবং নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী সম্পাদকীয়।

আজ সোমবার—হাজার রজনির শ্রেষ্ঠ রজনি, পবিত্র লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। মুসলমানদের কাছে এটি মহিমান্বিত ও অপরিসীম পুণ্যময় এক বরকতময় রাত। এ রাতকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ে জাগে গভীর ভক্তি, বিনয় ও আত্মিক আবেগ। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষায় তারা ইবাদত-বন্দেগি, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার এবং দোয়া-মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে এই পুণ্যময় রজনি অতিবাহিত করেন।

তবে আজকের এই রাতের তাৎপর্য কেবল অধিক ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষকে আল্লাহর দেখানো সৎপথে পরিচালিত করে সত্যিকার অর্থে মানবিক ও নৈতিক গুণে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক অনন্য প্রেরণার উৎস। সেই প্রেরণার আলোকে এই নিবন্ধে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে পবিত্র এই সময়ের অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও তাৎপর্য বিবেচনা করা হয়েছে।

গভীর নিশীথে যখন নিঝুম চরাচর নিস্তব্ধতায় মগ্ন, তখন আসমান থেকে নেমে আসে এক অলৌকিক প্রশান্তি। আজ সেই পবিত্র লাইলাতুল কদর। যে রজনী হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যে রাতে হেরা গুহার সেই আদি আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল মানবজাতির মুক্তির সনদ আল-কুরআন হয়ে। কদরের এই মহিমা কেবল এক রাতের ইবাদত-বন্দেগিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূলে রয়েছে ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’—জ্ঞানের সেই আদি আহ্বান। আজ যখন আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর, তখন এই রজনীর তাৎপর্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও বিনির্মাণের এক নতুন দিশা দেখায়।

লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

ইসলামি ঐতিহ্যে লাইলাতুল কদরকে মানবজাতির জন্য এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রজনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে সূরা আল-কদরে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম (সূরা আল-কদর, ৯৭:১–৩) । এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই রাত কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়; বরং এটি মানবচিন্তা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জাগরণের এক অনন্য মুহূর্ত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ও হাদিসে উল্লেখ করেছেন,যে ব্যক্তি ঈমান সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। ফলে লাইলাতুল কদর মানুষের আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ এবং জ্ঞান ও নৈতিকতার পথে নতুন করে অঙ্গীকার করার এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান বহন করে।

হেরা গুহার সেই আদি স্পন্দন: জ্ঞানের নবজাগরণ

লাইলাতুল কদরের গল্পের শুরু হয় একটি নির্জন পাহাড়ি গুহায়, যেখানে ধ্যানের মগ্নতায় মগ্ন ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সেই রাতে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আসা প্রথম নির্দেশটি কোনো নামাজ, রোজা বা হজের ছিল না; সেটি ছিল পড়ার নির্দেশ। "ইকরা বিইসমিকা রাব্বিকাল্লাজি খালাক"—পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।

এই মহিমান্বিত রজনীর প্রকৃত শিক্ষা হলো অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা। কদরের রজনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির সত্যিকারের মুক্তি আসে তার চিন্তার মুক্তি ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎকর্ষের মাধ্যমে। কয়েক শতাব্দী ধরে আমরা কদরকে কেবল তসবিহ জপা আর হালুয়া-রুটির আয়োজনে সীমাবদ্ধ করেছি, কিন্তু ভুলে গেছি যে এই রাতেই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ‘গবেষণাপত্র’ অবতীর্ণ হয়েছিল। আজ যদি আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনতে চাই, তবে আমাদের সেই ‘হেরা’র চেতনাকে ফিরে পেতে হবে, যেখানে জ্ঞানার্জন ছিল ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আধ্যাত্মিক জাগরণ ও জ্ঞানের সন্ধান

লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য কেবল একটি পবিত্র রজনীর আধ্যাত্মিক গুরুত্বেই সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিহিত আছে অন্ধকার থেকে আলোর পথে মানুষের যাত্রায়। প্রাক-ইসলামি আরবের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির যুগে কুরআনের অবতারণা মানবচিন্তার জগতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল জ্ঞান, বোধ এবং নৈতিক জাগরণ। ইসলামী ঐতিহ্যে জ্ঞানার্জনকে কখনো কেবল পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটি মানবমুক্তি ও নৈতিক উন্নতির এক পবিত্র ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেই কারণেই ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং আত্মশুদ্ধির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল।

কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে এক ধরনের ধোঁয়াশা চোখে পড়ে। আমরা ক্রমেই সনদ, ফলাফল ও জিপিএ-৫–এর সংখ্যাতাত্ত্বিক সাফল্যের দিকে এমনভাবে ঝুঁকে পড়েছি যে শিক্ষার প্রকৃত নির্যাস—নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক বোধ—অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এক বড় অংশ যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, যেখানে জ্ঞানের গভীরতা বা চিন্তার স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পরীক্ষার ফলাফল এবং আনুষ্ঠানিক সাফল্যের প্রতীক। ফলে শিক্ষা ক্রমে এমন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে দক্ষ কর্মী তৈরি হলেও প্রকৃত অর্থে চিন্তাশীল, নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

লাইলাতুল কদরের গভীর নীরবতা আমাদের এই সংকটকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার একটি সুযোগ এনে দেয়। এই রজনী মানুষকে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং আত্মঅনুসন্ধানের শিক্ষা দেয়—নিজেকে প্রশ্ন করার এবং নিজের অবস্থান নতুনভাবে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানায়। যদি আমরা সেই আত্মজিজ্ঞাসার আলোয় বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখি, তবে বুঝতে পারি যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি সুসমন্বিত পরিবেশ তৈরি করা আজ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় আমরা হয়তো দক্ষ প্রযুক্তিবিদ বা পেশাজীবী তৈরি করতে পারব, কিন্তু সেই শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের জন্য দায়িত্বশীল, মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।

অতএব, লাইলাতুল কদরের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জ্ঞান কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি আত্মিক বিকাশ, নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং মানবিক চেতনার এক সমন্বিত সাধনা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি এই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের বীজ রোপণ করা যায়, তবে শিক্ষা কেবল চাকরি বা পেশার প্রস্তুতি হয়ে থাকবে না; বরং তা জাতির জন্য দায়িত্বশীল, সৃজনশীল ও আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে।

চিন্তাশীল ও নৈতিক নাগরিক গঠনে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার: সময়ের দাবি

একটি জাতির প্রকৃত শক্তি কেবল তার সেতু, সড়ক বা দালানকোঠায় নিহিত থাকে না; বরং তা নিহিত থাকে তার শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, চিন্তা এবং সম্ভাবনার মধ্যে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেই একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, কারণ তারাই আগামী দিনের চিন্তাশীল নাগরিক, নীতিনির্ধারক এবং সৃজনশীল নেতৃত্ব। কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে না পারি, তবে সেই সম্ভাবনা পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে না। ফলে সময়ের দাবি হলো—শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে তা কেবল সনদপ্রাপ্ত মানুষ তৈরি না করে, বরং চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিক গড়ে তুলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণামুখী দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রচলিত শিক্ষার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মুখস্থনির্ভরতা, যেখানে জ্ঞানের গভীর অনুসন্ধানের পরিবর্তে পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ লাইলাতুল কদরের গভীর তাৎপর্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় চিন্তা, ধ্যান এবং মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে ভাবনার গুরুত্ব। সেই আলোকে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যেন তারা কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ না করে, বরং প্রশ্ন করতে শেখে, অনুসন্ধান করতে শেখে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার সাহস অর্জন করে। গবেষণামুখী শিক্ষা একটি জাতিকে কেবল জ্ঞানগ্রাহী নয়, বরং জ্ঞানস্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান কিংবা পেশাগত দক্ষতা যতই উন্নত হোক না কেন, যদি তার সঙ্গে সততা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা না থাকে, তবে সেই শিক্ষা সমাজকে স্থিতিশীল করতে পারে না। পবিত্র কুরআনের শিক্ষায় যে মানবিক আদর্শের কথা বলা হয়েছে—সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা—সেগুলোকে কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং শিক্ষার্থীদের আচরণ, মনন এবং সামাজিক জীবনে তা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একটি সত্যিকারের শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন জ্ঞান ও নৈতিকতা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

তদুপরি, আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সুষম সমন্বয় ঘটানোও অত্যন্ত জরুরি। আজকের পৃথিবী দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা প্রযুক্তি এবং রোবটিক্সের যুগে প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তারা বৈশ্বিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারে। তবে সেই অগ্রগতি যেন শেকড়চ্যুত না হয়। আধুনিকতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিচয়, নৈতিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা শিক্ষার্থীদের একই সঙ্গে বিশ্বনাগরিক ও দায়িত্বশীল মানবিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলে।

সংস্কারের একটি আধুনিক রূপরেখা

একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল তার অবকাঠামো নয়, বরং তার শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা। লাইলাতুল কদরের তাৎপর্যকে ধারণ করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিচের ক্ষেত্রগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য:

) গবেষণামুখী যৌক্তিক শিক্ষা: কদরের রাতে যেমন মহাবিশ্বের রহস্য ও বিধাতার কুদরত নিয়ে ভাবনার অবকাশ থাকে, আমাদের শিক্ষার্থীদেরও মুখস্থ বিদ্যার আগল ভেঙে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমরা এমন এক প্রজন্ম চাই যারা কেবল উত্তর দেবে না, বরং নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।

) নৈতিকতা মূল্যবোধের একীভূতকরণ: ইসলামি ঐতিহ্যে জ্ঞানার্জন কেবল একটি পেশাগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘আদব’ বা শিষ্টাচারকে ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন ইঞ্জিনিয়ার যখন সেতু বানাবেন, তার মাথায় যেন কেবল ফিজিক্সের সূত্র না থাকে, বরং তার নৈতিকতা যেন তাকে বলে দেয় যে রডের বদলে বাঁশ দেওয়া অপরাধ। এটিই কদরের শিক্ষা—স্রষ্টার প্রতি দায়বদ্ধতা।

) বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা: লাইলাতুল কদরে যেমন রাজা-প্রজা সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে মহান রবের কাছে প্রার্থনা করে, তেমনি আমাদের দেশেও বৈষম্যহীন একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। কওমি, আলিয়া, সাধারণ কিংবা ইংরেজি মাধ্যম—সবখানে যেন মৌলিক মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার একটি সাধারণ মানদণ্ড থাকে। ধনিকের সন্তান আর শ্রমিকের সন্তান যেন একই মানের শিক্ষার সুযোগ পায়।

) প্রযুক্তি ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: আমরা আধুনিক হবো, কিন্তু শেকড়চ্যুত নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের যুগে আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠে। তবে এই যান্ত্রিক উৎকর্ষের সাথে সাথে হৃদয়ে থাকতে হবে ‘কুরআনিক হিকমাহ’ বা প্রজ্ঞা। যন্ত্রের হাতে যেন মানুষের বিবেক বন্দি না হয়। লাইলাতুল কদরের যে আলোকশিখা হেরা থেকে মদিনায় ছড়িয়েছিল, সেই আলো যেন আমাদের ডিজিটাল ক্লাসরুমগুলোতেও প্রবেশ করে।

বিনির্মাণের অঙ্গীকার

লাইলাতুল কদরের পবিত্র রজনী মুসলমানদের কাছে কেবল ইবাদতের রাত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা এবং নতুন করে পথচলার অঙ্গীকারেরও সময়। এই রজনীতে ফেরেশতারা শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন—এটি মানুষের অন্তরে প্রশান্তি, আশা এবং আলোর সঞ্চার করে। সেই আধ্যাত্মিক প্রশান্তির অনুপ্রেরণা যদি আমরা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে দিতে পারি, তবে বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার অর্থেই জ্ঞান ও মানবিকতার আলোকিত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেখানে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে প্রত্যেক শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে। যেখানে জ্ঞান হবে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ নয়, বরং সবার জন্য উন্মুক্ত এক সমৃদ্ধ বাগিচা—যেখানে প্রত্যেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জ্ঞান আহরণ ও সৃজনের সুযোগ পাবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নই নিশ্চিত করে না; এটি সমগ্র সমাজের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে তোলে।

তবে শিক্ষা সংস্কার কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত দৃঢ়তা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। যেমনভাবে রমজানের এক মাসের সাধনা মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রেরণা হয়ে ওঠে, তেমনি লাইলাতুল কদরের এই পবিত্র রজনী আমাদের জন্য হতে পারে একটি নতুন সংকল্পের সূচনা। সেই সংকল্প হবে—একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক এবং নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জ্ঞান, মানবিকতা এবং ন্যায়বোধ একসঙ্গে বিকশিত হয়ে একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণের পথ দেখাবে।

শেষ কথা: লাইলাতুল কদরের অঙ্গীকারএকটি জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসা

লাইলাতুল কদরের এই রজনীতে ফেরেশতারা শান্তি ও বারতা নিয়ে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এই প্রশান্তিকে আমরা আমাদের বিদ্যাপীঠগুলোতে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রত্যাশা করি, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করবে না, যেখানে শিক্ষকরা হবেন প্রকৃত মেন্টর বা অভিভাবক।

অন্ধকার ভেদ করে যেমন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, তেমনি লাইলাতুল কদরের এই মহিমান্বিত আলোকবর্তিকা আমাদের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের পথকে আলোকিত করার এক অনন্য আহ্বান বহন করে। এই রজনী কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা পুণ্য অর্জনের মুহূর্ত নয়; এটি একটি জাতির আত্মজিজ্ঞাসার সময়—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আর আমাদের আগামী প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই।

আজকের এই পবিত্র রাতে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজেদের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা—আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যা কেবল সনদধারী মানুষ নয়, বরং নৈতিক, চিন্তাশীল এবং মানবিক নাগরিক তৈরি করছে? যদি উত্তরটি অনিশ্চিত হয়, তবে এখনই সময় নতুন করে ভাবার। রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা জ্ঞান, ন্যায়বোধ এবং মানবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত।

লাইলাতুল কদরের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির উপকরণ নয়; এটি জাতির মুক্তি ও অগ্রগতির শক্তি। তাই আজকের এই মহিমান্বিত রাতে আমরা কেবল দোয়া নয়, একটি দৃঢ় অঙ্গীকারও করি—আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা দলীয় সংকীর্ণতা, অনৈতিকতা এবং বৈষম্যের ঊর্ধ্বে তুলে ধরব। আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করব, যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও মানবিকতায় পরিপূর্ণ, যারা বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন করলেও নিজেদের নৈতিক শিকড় ভুলে যাবে না। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয় এবং শ্রেণিকক্ষের নীরব আলোকবর্তিকায়। যদি আমরা সেই আলোকে উজ্জ্বল করতে পারি, তবে কদরের এই পবিত্র রজনী সত্যিই হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় পুনর্জাগরণের সূচনা।

আসুন, আজকের এই মহিমান্বিত লগ্নে আমরা প্রার্থনা করি এবং একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—আমাদের মেধা, মনন এবং নৈতিক শক্তি দিয়ে আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে জ্ঞান হবে মুক্তির পথ, ন্যায় হবে সমাজের ভিত্তি, আর আগামী প্রজন্ম হবে একটি আলোকিত বাংলাদেশের নির্মাতা।

 অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

লাইলাতুল কদরের আলোয় জ্ঞান ও নৈতিকতার নতুন অঙ্গীকার—#লাইলাতুল_কদর #শিক্ষা_সংস্কার #ইকরা #জ্ঞানচর্চা #নৈতিক_শিক্ষা #আধুনিক_বাংলাদেশ #শিক্ষা_সম্পাদকীয় #EducationReform #LaylatulQadr #KnowledgeAwakening



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: