odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 12th April 2026, ১২th April ২০২৬
লঙ্কার রাবণ আর কুম্ভকর্ণের পাঠশালা: রাষ্ট্র সংস্কারের আড়ালে শিক্ষার শ্লীলতাহানি। আর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের সংস্কার বনাম শূন্য পকেটের শিক্ষা—২০২৬-এর আইনি তামাশার ব্যবচ্ছেদ।

শিক্ষার মহাসাগরে হারানো স্মৃতি: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রাবণদের জন্য বিস্মৃতির গল্প

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১১ April ২০২৬ ২১:২২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১১ April ২০২৬ ২১:২২

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

ব্রিটিশ আমলের পুলিশ কোড চললেও হারিয়ে গেছে ১৯৩১-এর শিক্ষা কোড। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেন আজ কোনো স্থায়ী আইনি কাঠামো ছাড়াই খুঁড়িয়ে চলছে? ২০২৪-এর সংস্কার থেকে ২০২৬-এর তথাকথিত 'শিক্ষা আইন' অধ্যাদেশ—জাতির মেরুদণ্ড নিয়ে চলমান রাজনৈতিক তামাশা ও বাস্তব সংকটের এক তিল তিল ব্যবচ্ছেদ।...শিক্ষার অধিকার কি কেবল কাগজে-কলমে? প্রতিবেশীরা যেখানে এগিয়ে গেছে দুই দশক আগে, আমরা কেন আজও ব্রিটিশ আমলের ধুলোবালি ঘাঁটছি? আমলাতন্ত্রের কুম্ভকর্ণ মার্কা ঘুম আর সংস্কারের নামে কোটি টাকার মহোৎসব—শিক্ষা নিয়ে এই অদ্ভুত আঁধার কি কাটবে না? পড়ুন এক বিস্ফোরক বিশ্লেষণ।

আইনি অরণ্যে পথ হারানো শিক্ষা: একটি মহাকাব্যিক অবহেলার আখ্যান

২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি। আমাদের রচিত দৈনিক যুগান্তরের সেই সকালের উপসম্পাদকীয়টি শুরু হয়েছিল এক অমোঘ সত্যের স্বীকারোক্তি দিয়ে—আমাদের দেশের বিশাল এই শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক অদ্ভুত শূন্যতায় দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কম্প্রিহেনসিভ বা যুগোপযোগী আইনি কাঠামো ছাড়াই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে আগামীর মেরুদণ্ড গড়ার এই কারখানা। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বৃটিশ রাজত্ব শেষ হওয়ার সময় তারা প্রশাসনের জন্য রেখে গিয়েছিল বহু শক্তিশালী বিধিবিধান। ১৮৯৫ সালের বেঙ্গল পুলিশ কোড থেকে শুরু করে ১৮৬০ সালের পেনাল কোড কিংবা ১৮৭২ সালের এভিডেন্স অ্যাক্ট—আমরা পরম মমতায় আগলে রেখেছি সব।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যার সাথে এ দেশের প্রতিটি পরিবারের নাড়ির টান, সেই শিক্ষার বেলায় আমাদের মমত্ববোধের বড় অভাব। ৫৬৭ পৃষ্ঠার বিশাল দালিলিক ভিত্তি ‘দ্য বেঙ্গল এডুকেশন কোড-১৯৩১’ আজ ইতিহাসের ধুলোয় ধূসর। শিক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেন শেষ হতেই চায় না। একদিকে নীতিনির্ধারকদের বিস্মৃতি, অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সংবিধানে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতির দৃষ্টান্ত—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা আজ বিচার করব, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আসলেই মুক্তির পথে আছে, নাকি এটি স্রেফ এক ‘চলছে গাড়ি যাত্রা বাড়ি’র নামান্তর?

৫৬ বছর পেরিয়েও শিক্ষা কি আমাদের অধিকার, নাকি কেবল এক টুকরো করুণা?

স্বাধীনতার ৫৬ বছর পেরিয়ে এসে আজ এক বিষণ্ণ মোহনায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়—শিক্ষা কি এ দেশে সত্যিই নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় ‘অধিকার’, নাকি রাষ্ট্র কর্তৃক ছুড়ে দেওয়া দয়া বা করুণার এক টুকরো উচ্ছিষ্ট? মানচিত্র বদলের অর্ধশতাব্দী পরেও যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতিটি স্তরে অভিভাবককে সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়, যখন একটি সুসংহত ‘শিক্ষা আইন’ পেতে আমাদের দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হয়, তখন ‘অধিকার’ শব্দটি কেবল অভিধানের পাতায় এক করুণ বিদ্রূপ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে সাংবিধানিক বর্মে শিক্ষাকে সুরক্ষিত করেছে, সেখানে আমরা এখনো ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া জীর্ণ বিধিমালার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আগামীর স্বপ্ন খুঁড়ছি। আমাদের সংবিধানে শিক্ষা আজও কেবল ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’র খাঁচায় বন্দি, যা রাষ্ট্র চাইলে দেয়, না চাইলে নেই। এই কাঠামোগত দুর্বলতাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র শিক্ষাকে তার দায়বদ্ধতা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক মর্জির এক ‘দান’ হিসেবে দেখে আসছে। ফলে ৫৬ বছর আগের সেই অন্ধকার আর আজকের এই জৌলুসপূর্ণ ডিজিটাল অন্ধকারের মধ্যে তফাৎ কেবল এটুকুই—আগে শিক্ষার অভাবে মানুষ নিরক্ষর থাকত, আর এখন শিক্ষার নামে এক অধিকারহীন যান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হয়ে মানুষ তার সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। অধিকারের মর্যাদা না পেলে শিক্ষা কখনোই মুক্তির পথ হতে পারে না, তা বড়জোর টিকে থাকার এক নিরুপায় করুণা হয়েই থেকে যায়।

স্মৃতির অতল গহ্বর এবং একটি নিখোঁজ দলিলে

২০২০ সালের ১০ জানুয়ারির এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর পাতায় আমরা এক বিষণ্ণ সত্যের অবতারণা করেছিলাম। আমাদের সেই যৌথ উপসম্পাদকীয়র শুরুটা ছিল অনেকটা এরকম—এক বিশাল মহীরুহ যেমন শেকড়হীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও ঠিক তেমনি কোনো পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী আইনি কাঠামো ছাড়াই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আমরা অনেকেই বলে থাকি, শিক্ষার সাথে আমাদের নাড়ির টান; কিন্তু সত্যটা বড় রূঢ়। যার সাথে সবার সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা, সম্ভবত তার সাথেই আমাদের মমত্ববোধের সম্পর্ক সবচেয়ে ক্ষীণ। যে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ডকেই আমরা আগলে রাখার মতো কোনো মজবুত বর্ম আজ অবধি তৈরি করতে পারিনি।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও আইনি মরীচিকা

ব্রিটিশরা এ দেশ শাসন করেছে ১৯০ বছর। তারা যখন বিদায় নিল, রেখে গেল লাল ফিতার শাসনের এক বিশাল মহাফেজখানা। আমরা নিজেদের প্রয়োজনে তাদের তৈরি বহু বিধিবিধানকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছি। ১৮৯৫ সালের ‘বেঙ্গল পুলিশ কোড’ থেকে শুরু করে ১৮৬০ সালের ‘ইন্ডিয়ান পেনাল কোড’ (IPC), কিংবা ১৮৭২ সালের ‘এভিডেন্স অ্যাক্ট’—সবই আমাদের প্রশাসনিক ধমনীতে আজও রক্ত সঞ্চালন করছে। আমরা দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার জটিল মারপ্যাঁচ সামলাতে ১৯০৮ সালের ‘সিভিল প্রসিডিউর কোড’ (CPC) আগলে রেখেছি।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের এই ‘দয়া-মায়া’র বড্ড অভাব। নীতিনির্ধারকরাও বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দিয়েছেন ৫৬৭ পৃষ্ঠার সেই বিশালাকার দলিল—‘দ্য বেঙ্গল এডুকেশন কোড-১৯৩১’। ১৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত সেই সমৃদ্ধ আইনি কাঠামোটি আজ কোনো রেফারেন্সেও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ যেন এক অদ্ভুত বিস্মরণ, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘চলছে গাড়ি, যাত্রা বাড়ি’র মতো এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দিয়েছে।

প্রতিবেশীর জাগরণ ও আমাদের অধিকারহীনতার দীর্ঘশ্বাস

স্বাধীনতা মানে কি কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন? ব্রিটিশ শাসন শেষে ২৪ বছরের পাকিস্তানি শোষণ এবং তারপর স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও আমরা শিক্ষাকে ‘অধিকার’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে পারিনি। অথচ আমাদের পাশেই ভারত ২০০২ সালে তাদের সংবিধানের ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ‘আর্টিকেল ২১এ’ (Article 21A) যোগ করে তারা ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় বাধ্যতামূলক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমরা যখন এখনো ‘শিক্ষা আইন’-এর খসড়া নিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ফাইল চালাচালি করছি, ভারত তখন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে শিখরে পৌঁছে দিচ্ছে। আমাদের দেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ‘বাংলার বাঘ’ খ্যাত ফজলুল হক মহোদয়ও কি এই দায় এড়াতে পারেন? সেই যে অবহেলার শুরু, তার খেসারত আজও দিয়ে যাচ্ছে এ দেশের কোটি শিক্ষার্থী।

সংস্কারের নামে অর্থহীন মহোৎসব

সময়ের পরিক্রমায় ২০২৪ সাল এল। ক্ষমতার পালাবদল হলো, গঠিত হলো সংবিধান সংশোধন কমিটি। রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞে আলী রীয়াজ গংদের ওপর দায়িত্ব বর্তালো। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৯ মাসে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এক বিশাল ফিরিস্তি আমরা দেখলাম। কেবল আপ্যায়ন আর সভা করতেই ব্যয় হলো কোটি কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, রাষ্ট্রের এই ‘শাপমোচন’ করার কোনো প্রকৃত সদিচ্ছা সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। ভারতের মতো শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার কোনো জোরালো প্রস্তাব সেই বিশাল দলিলে ঠাঁই পায়নি। আলী রীয়াজ কিংবা ড. ইউনূস—তারা নিজেরাও তো শিক্ষক ছিলেন। অথচ তাদের সময়েও শিক্ষার সেই কাঙ্ক্ষিত ‘অধিকারের মর্যাদা’ অধরাই থেকে গেল। একে যদি শিক্ষাব্যবস্থার ‘শ্লীলতাহানি’ বলা হয়, তবে কি খুব ভুল হবে?

সংস্কারের নামে তামাশা বর্তমান দশা: অধিকারের কফিনে শেষ পেরেক

২০২৪ সালে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশ যখন রাষ্ট্র সংস্কারের রঙিন স্বপ্নে বিভোর, তখন আমরা আরও একবার বুকভরা আশা নিয়ে তাকিয়েছিলাম এক নতুন ভোরের দিকে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীনতার দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর অন্তত এবার শিক্ষার অধিকার আমাদের সংবিধানে একটি স্থায়ী, সুসংহত ও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি পাবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল কর্মযজ্ঞে গঠিত হলো সংবিধান সংশোধন কমিটি, চলল নজিরবিহীন অর্থব্যয়ের মহোৎসব। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংস্কারের নামে মাত্র ৯ মাসে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা; যেখানে কেবল সংবিধান সংস্কার কমিটির আপ্যায়ন আর রুদ্ধদ্বার সভার পেছনেই খরচ হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। ড. আলী রীয়াজসহ প্রথিতযশা তাত্ত্বিক ও শিক্ষাবিদরা এই কমিটির অভিভাবকত্ব করলেন, অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই বিশাল অর্থ ও সময়ের ব্যয়ের আড়ালে ব্রাত্য হয়ে রয়ে গেল জাতির মেরুদণ্ড তথা শিক্ষার সাংবিধানিক দাবির বিষয়টিই।

প্রতিবেশী ভারত দুই দশক আগেই তাদের সংবিধানে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দিয়ে আগামীর ভিত্তি গড়ে তুললেও, আমাদের সংস্কার কমিটি সেই শাপমোচনের কোনো কার্যকরী প্রস্তাব আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ড. ইউনূস কিংবা ড. আলী রীয়াজ—উভয়েই শিক্ষকতার মহৎ পেশা থেকে উঠে আসা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের জমানায় শিক্ষার এই আইনি ‘শ্লীলতাহানি’ বন্ধ করার কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি। অপরদিকে আরেকজন শিক্ষক যিনি  আইন করতে করতে রাত-দিন এক করে ফেলেছিলেন, সেই উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, তিনিও শিক্ষার আইনী কাঠামো করতে সময় পান নাই। এর মানে হচ্ছে শিক্ষার গুরুত্ব তাদের কাছে ছিল না।

—না হয়, তারা সম্ভবত শিক্ষাকে এতটাই ‘পবিত্র’ মনে করতেন যে, একে সাংবিধানিক অধিকারের আইনি জটিলতায় ফেলে ‘বিরক্ত’ করতে চাননি! ফলে একদিকে সংস্কারের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয়ের মহোৎসব চলল, অন্যদিকে শিক্ষার সেই জং ধরা চাকাটি রয়ে গেল আগের মতোই স্থবির।

জাতির সাথে শিক্ষা নিয়ে এই নিষ্ঠুর তামাশার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক কয়েক দিন আগে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ইউনূস সরকার ‘শিক্ষা আইনের’ একটি খসড়া তৈরি করে তা অধ্যাদেশ আকারে পাস করার এক অদ্ভুত তোড়জোড় শুরু করে। বিষয়টি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, শিক্ষা যেন কোনো দীর্ঘমেয়াদি দর্শনের বিষয় নয়, বরং অতি সাধারণ ‘ছেলের হাতের মোয়া’—চামচ দিয়ে বললেই অমনি আইন হয়ে গেল! দীর্ঘ সময় হাতে পেয়েও শিক্ষার আমূল ও মৌলিক সংস্কারে হাত না দিয়ে শেষ বেলায় এমন লোকদেখানো তাড়াহুড়ো মূলত জাতির বিবেকের সাথে এক চরম উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। নীতিনির্ধারকরা যেন এই নাটকীয়তার মাধ্যমে অলিখিতভাবে বুঝিয়ে দিলেন, শিক্ষার প্রকৃত সংস্কার ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলে তো আমজনতাকে আর শোষণ করা যাবে না। তাই সংস্কারের মোড়কে স্রেফ একটি আইনি প্রলেপ দিয়ে তারা শিক্ষার প্রকৃত মুক্তিকে আরও একবার সুদূরপরাহত করে তুললেন। রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল দলিলে শিক্ষার অধিকারকে এভাবে উপেক্ষা করা কেবল একটি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আগামীর প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সাথে এক সুপরিকল্পিত ও ঐতিহাসিক প্রতারণা।

লঙ্কার রাবণ ও কুম্ভকর্ণের পাঠশালা: একটি শিক্ষামূলক কৌতুক

কথায় বলে, ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।’ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সিংহাসনেও যখন যার অভিষেক ঘটে, তার রূপান্তর ঘটে সেই দশানন রাবণের মতোই। সবাই তখন উচ্চস্বরে শিক্ষার জয়গান গান ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে বিমাতাসুলভ আচরণে সেই লঙ্কাকে ছারখার করতে কার্পণ্য করেন না। আর এই রাজকীয় বিড়ম্বনার সবচেয়ে মুখরোচক অংশ হলো—রাবণের স্নেহে সিক্ত আমাদের ‘কুম্ভকর্ণ’ রূপী প্রশাসন। ছয় মাস ঘুমিয়ে আর ছয় মাস হাই তুলে যখনই শিক্ষার কোনো নতুন সংস্কারের গন্ধ পাওয়া যায়, তখনই আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটি দারুণ এক ‘অবকাশ যাপনে’ মগ্ন হয়।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আমাদের তথাকথিত ‘পণ্ডিত’ মহোদয়রা। রাবণের প্রতাপ আর ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের লোভে তারা আজ এমন এক গভীর তন্দ্রায় মগ্ন, যা কুম্ভকর্ণকেও হার মানায়। তারা চোখে ‘প্রগতি’র কালো চশমা আর কানে স্বার্থের কুলুপ এঁটে এমনভাবে ঘুমাচ্ছেন যে, বাইরে শিক্ষাব্যবস্থার ‘শ্লীলতাহানি’ ঘটলেও তাদের নাক ডাকার আওয়াজ বন্ধ হয় না। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে যে তামাশা আমরা দেখলাম, তা তো আসলে একদল ঘুমন্ত মানুষের দিয়ে একদল সজাগ মানুষের স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করার নামান্তর। এই রাবণ-কুম্ভকর্ণের উপাখ্যানে শেষ পর্যন্ত বলি হচ্ছে সেই ক্ষুদ্র ‘বানর সেনা’র মতো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, যারা লঙ্কা জয়ের স্বপ্ন দেখলেও দিনশেষে লঙ্কাকাণ্ডের ধোঁয়ায় পথ হারিয়ে হাহাকার করে।

অপেক্ষার প্রহর এবং ব্রিটিশ আমলের সেই অমোঘ বিধান

অথচ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৩০ সালেই ব্রিটিশরা ‘দ্য বেঙ্গল (রুরাল) প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেছিল। গ্রামীণ বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সেই প্রথম পদক্ষেপে স্থানীয় শিক্ষা বোর্ড গঠনের বিধান ছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন সেই ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছিল। ব্রিটিশদের সেই দূরদর্শী চিন্তা যেখানে ১৯৩০ সালেই অঙ্কুরিত হয়েছিল, আমাদের সেই স্তরে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও দীর্ঘ ৬০ বছর। আজ যখন আমরা একটি ‘কম্প্রিহেনসিভ’ বা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা আইনের স্বপ্নে বিভোর, তখন পেছনে ফিরে তাকালে কেবল অবহেলা আর দীর্ঘশ্বাসের ছবিই ফুটে ওঠে। শিক্ষার প্রতি এই বিমাতাসুলভ আচরণ বন্ধ না হলে, একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি কি আদৌ সম্ভব?

তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: বিস্মৃতির রাজনীতি যান্ত্রিক শিক্ষার অন্তরালে

এই ‘বিস্মৃতির মহাসাগরে ভাসমান পাঠশালা’ কেবল কোনো আইনি শূন্যতা নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে শিক্ষার এক সংকীর্ণ ও যান্ত্রিক দর্শন। তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা পাওলো ফ্রেইরির সেই বিখ্যাত ব্যাংকিং মডেল অফ এডুকেশন(Banking Model of Education)-এর এক চরম সংস্করণ। যেখানে শিক্ষার্থী কেবল একটি রিক্ত পাত্র, আর শিক্ষক সেখানে তথ্যের আমানত জমা করেন—যে তথ্য কোনো চিন্তাশীলতা তৈরি করে না, বরং কেবল পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেওয়ার জন্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে শিক্ষা এখানে জ্ঞান নয়, বরং ‘ইনফরমেশন লোড’ হিসেবে কাজ করে, যা দ্রুত বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিস্মৃতির রাজনীতি(Politics of Forgetfulness); যেখানে একটি জাতিকে তার ঐতিহাসিক আইনি উত্তরাধিকার (যেমন ১৯৩১-এর এডুকেশন কোড) থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়, যাতে সে তার মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে না পারে। যখন শিক্ষা জীবন-বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল ‘পাস-ফেল’-এর পরিসংখ্যানে আটকে যায়, তখন সেখানে সৃজনশীলতার বদলে জন্ম নেয় এক ধরনের অ্যাকাডেমিক অ্যালিয়েনেশনবা শিক্ষা-বিচ্ছিন্নতা। রাকিবের মতো শিক্ষার্থীরা তখন পাঠ্যবইয়ের পাতায় নিজেকে খুঁজে পায় না, বরং এক অর্থহীন তথ্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। এই অন্তঃসারশূন্য আখ্যান মূলত আমাদের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বকেই সমাজদর্পণে প্রতিফলিত করছে।

টিনের ছাউনি ও ফিকে হওয়া শৈশব

শহরের প্রান্তে এক জীর্ণ স্কুলের টিনের ছাউনি দুপুরের কড়া রোদে ঝিমোচ্ছে। ক্লাসরুমের দরজার দিকে তাকালে দেখা যায় কিছু অস্পষ্ট হাতের ছাপ—ছোট্ট নখরে আঁচড় কাটা কোনো এক শৈশবের স্বাক্ষর। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এমন এক ধূসর গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিদ্যার আলো বড্ড ক্ষীণ, কিন্তু বিস্মৃতির অন্ধকার অতল।

ছাত্র রাকিব ভেবেছিল স্কুল মানে বুঝি এক নীল আকাশ, যেখানে বন্ধুদের কলকাকলিতে ডানা মেলবে নতুন নতুন জ্ঞান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই রঙিন স্বপ্ন নোটবুকের লাইনে বন্দি হয়ে ফিকে হয়ে গেছে। সেখানে অর্থহীন মুখস্থবিদ্যার এক রহস্যময় ভাষা চলে, যা কৌতূহল জাগাতে পারে না, কেবল উত্তরহীন প্রশ্নের পাহাড় তৈরি করে।

শিক্ষা কি শুধুই চশমার ফ্রেম?

আমাদের দেশে শিক্ষার আলো এখন অনেকটা দামী চশমার মতো—বাইরে থেকে ঝকঝকে, কিন্তু ভেতরের কাঁচটা ভাঙা। শিক্ষকরা ক্লাসে ঢুকে মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করেন ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই শুরু হয় ‘পরীক্ষার প্রস্তুতি’ নামক যান্ত্রিক মহোৎসব। “আজ পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে হবে”—এই একটি বাক্যই যেন রাকিবদের সৃজনশীলতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

ছাত্রদের মনে প্রশ্ন জাগে, “কেন মুখস্থ করব? এই বিদ্যার সাথে আমার মাটির বা জীবনের সম্পর্ক কোথায়?” কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কোনো আইনি কাঠামো বা আদর্শিক ভিত্তি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। শিক্ষক নিজেও এক ‘নির্ধারিত সিকোয়েন্সের’ বন্দি; যেখানে অধ্যায় পড়ানো মানে সিলেবাস শেষ করা, আর পরীক্ষা মানে হলো শিক্ষার্থীর অন্তর্দৃষ্টির বদলে খাতার পাতায় তথ্যের বমি করা।

প্রযুক্তির মোড়কে বিস্মৃতির খেলা

আধুনিকতার ছোঁয়ায় স্কুলগুলোতে এখন ইলেকট্রনিক বোর্ড ও কম্পিউটার ল্যাব এসেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে কি আদৌ স্পর্শ করতে পেরেছে? রাকিবের অভিজ্ঞতা বলছে—না। ল্যাপটপ খুললে সেখানে জ্ঞানের চেয়ে ইউটিউবের চটকদার ভিডিও আর সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশনই বেশি উঁকি দেয়। শিক্ষকের চোখের দৃষ্টি যখন স্ক্রিনে আটকে থাকে, তখন ছাত্রের মনও অস্থায়ী উদ্দীপনার মোহে ভেসে যায়। প্রযুক্তি এসেছে বটে, কিন্তু তা শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকে শানিত করার বদলে তথ্যের এক ভাগাড়ে পরিণত করেছে। তথ্য আছে অঢেল, কিন্তু তা ব্যবহারের প্রজ্ঞা নেই।

শহর বনাম গ্রাম: বৈষম্যের দুই পিঠ

শহরের স্কুলগুলোতে অন্তত কিছু চকচকে প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছে। কিন্তু গ্রামের সেই কাদা-মাটির স্কুলগুলোর অবস্থা তথৈবচ। সেখানে বই কম, শিক্ষক আরও কম, আর স্বপ্নের আলো সেখানে প্রায় অদৃশ্য। যখন একজন শিক্ষক নিজেই আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না, তখন তার ছাত্রের স্মৃতির খাতা যে ফাঁকাই রয়ে যাবে—তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এই বিভাজন শিক্ষার্থীদের মনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতে এক বিশাল সামাজিক বৈষম্যের বীজ বপন করছে।

যান্ত্রিকতা ও মানবিক শিক্ষার দ্বন্দ্ব

আমাদের শিক্ষা আজ যান্ত্রিক। ছাত্ররা ডাটা মনে রাখে কিন্তু চিন্তা করতে শেখে না। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের আর্তনাদে সেই সত্য ফুটে ওঠে: “আমরা নতুন কিছু করতে চাই, কিন্তু ব্যবস্থার জং ধরা চাকা এতই ভারী যে সব উদ্ভাবন সেই চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে বিস্মৃতির মহাসাগরে হারিয়ে যায়।”

শিক্ষার এই বিস্মৃতি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় সংকট। যখন শিক্ষার মূল অর্থ হারিয়ে যায়, তখন সমাজে দক্ষতা ও উদ্ভাবনের আকাল পড়ে। এর ফলস্বরূপ আমরা পাই একদল ডিগ্রিধারী মানুষ, যাদের মনন যান্ত্রিক কিন্তু হৃদয় সৃজনশীলতাহীন।

বিস্মৃতির মহাসাগরে ভাসমান পাঠশালা: আমাদের শিক্ষার অন্তঃসারশূন্য আখ্যান

ঐতিহাসিক সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখলে, ‘বিস্মৃতির মহাসাগরে ভাসমান পাঠশালা’ কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদেরই ফসল। সমালোচকদের মতে, ঔপনিবেশিক শাসকরা এ দেশে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল যা ‘কেরানি’ তৈরি করতে জানত, কিন্তু ‘নাগরিক’ তৈরি করতে শেখায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরেও আমাদের রাষ্ট্র সেই একই ঔপনিবেশিক কাঠামোর খোলস আঁকড়ে ধরে আছে। ১৯৩১ সালের ‘দ্য বেঙ্গল এডুকেশন কোড’ যে বিশদ আইনি কাঠামো দিয়েছিল, তা গ্রহণ না করে বরং বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—এটি একটি গুরুতর ঐতিহাসিক বিচ্যুতি। সমালোচকরা মনে করেন, ব্রিটিশদের তৈরি করা দণ্ডবিধি বা পুলিশি আইনগুলো আমরা পরম আদরে টিকিয়ে রেখেছি শাসন ও শোষণের সুবিধার্থে, কিন্তু শিক্ষার আইনটি হারিয়ে গেছে কারণ তা জাতিকে অধিকার সচেতন করে তোলার ক্ষমতা রাখত।

পাকিস্তান আমলের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ‘বাংলার বাঘ’ আবুল কাশেম ফজলুল হক থেকে শুরু করে আজকের নীতিনির্ধারক পর্যন্ত—প্রত্যেকেই শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা মূলত ইতিহাসের এক ধারাবাহিক অবহেলার প্রতিফলন। এই ঐতিহাসিক নিষ্ক্রিয়তাই প্রমাণ করে যে, প্রতিটি শাসকগোষ্ঠী শিক্ষাকে একটি ‘যুগোপযোগী হাতিয়ার’ হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে একে নিয়ন্ত্রণহীন ও লক্ষ্যহীন অবস্থায় রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে, যাতে ক্ষমতার গদিতে কোনো তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ না আসে।

ফাইলবন্দি স্বপ্ন গিনিপিগের কারখানা

আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেন এক জাদুকরী ল্যাবরেটরি, যেখানে প্রতি বছর নতুন নতুন ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় কোটি কোটি শিক্ষার্থী। কখনো সৃজনশীল পদ্ধতি, কখনো মূল্যায়ন পদ্ধতি, আবার কখনো তড়িঘড়ি করে আনা কোনো ডিজিটাল খামখেয়ালিপনা—এই সবকিছুর মূলে নেই কোনো আইনি দায়বদ্ধতা। কারণ, একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শিক্ষা আইন’ থাকলে নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। সেই ভয় থেকেই হয়তো ব্রিটিশ আমলের ধুলোপড়া ফাইলগুলো তারা ঝাড়েন না, পাছে তাতে অধিকারের পোকা নড়ে ওঠে! আমলারা যখন এসি রুমে বসে শিক্ষার ‘রোডম্যাপ’ আঁকেন, তখন তারা ভুলে যান যে—কাগজের ম্যাপে আর যাই হোক, মেঠো পথের কাদা আর রাকিবদের চোখের পানি মুছে ফেলা যায় না। এই ব্যবস্থার ‘লবণ-ঝাল’ কেবল সাধারণ মানুষের চোখের জল হয়ে ঝরে, আর ক্ষমতার ড্রয়িংরুমে তা রোস্ট-কাবাবের মশলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রত্যাশা: যুগোপযোগী শিক্ষা আইন আগামীর স্বপ্নের খসড়া

১৯৩০ সালের ‘দ্য বেঙ্গল (রুরাল) প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট’ যে প্রগতির মশাল জ্বেলেছিল, আমরা আজও সেই মশাল পূর্ণাঙ্গরূপে ধারণ করতে পারিনি। আজ যখন ‘শিক্ষা আইনের’ খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার খবর পত্রিকায় দেখি, তখন মনে হয়—অবশেষে কি তবে অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে? কিন্তু এই আইন কেবল কাগজের দলিল হলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি কম্প্রিহেনসিভ আইনি কাঠামো, যা শিক্ষাকে দয়া বা অনুদান নয়, বরং প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।

আগামীর সেই স্বপ্নের খসড়ায় থাকতে হবে আইনি বাধ্যবাধকতা, যাতে রাকিবের মতো কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন মুখস্থবিদ্যার যাঁতাকলে পিষ্ট না হয়। যেখানে প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক, কোনো গোলকধাঁধা নয়। শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষ আর গ্রামের টিনের ছাউনির নিচে বসা ছাত্রের মধ্যে আইনি কোনো বৈষম্য থাকবে না। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া পুলিশ কোড দিয়ে যদি আমরা দেড়শ বছর প্রশাসন চালাতে পারি, তবে কেন একটি যুগোপযোগী ‘শিক্ষা কোড’ দিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারব না?

‘চলছে গাড়ি যাত্রা বাড়ি’—এই মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে এখন সময় হয়েছে শিক্ষার জন্য একটি মজবুত আইনি বর্ম তৈরি করার। যদি এই খসড়া আইনটি কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অর্থেই বাস্তবায়িত হয়, তবেই হয়তো আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের অবহেলার দায় থেকে মুক্তি পাব। বিস্মৃতির অতল থেকে শিক্ষাকে উদ্ধার করে তাকে অধিকারের সিংহাসনে বসানোই হোক এখনকার প্রধান অঙ্গীকার।

শেষ কথা: অন্ধকারের মাঝেও ক্ষুদ্র প্রদীপ

রাকিব আজ স্কুল থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার ছোট খাতাটি শক্ত করে ধরে রাখে। সে জানে ক্লাসে যা শিখেছে তার সিংহভাগই হয়তো একদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে। তবুও সেই খাতার প্রতিটি লাইন তার নিজস্ব সংগ্রামের চিহ্ন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ কোনো শক্তিশালী আইনি কাঠামো ছাড়াই ‘চলছে গাড়ি যাত্রা বাড়ি’র মতো অনিশ্চিত পথে চললেও, রাকিবদের এই নীরব অধ্যবসায়ই হয়তো কোনো একদিন নতুন আকাশের দিশা দেখাবে। তবে সেই দিনটি ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের শিক্ষাকে ‘বিস্মৃতির গহ্বর’ থেকে টেনে তুলে ‘অধিকারের মর্যাদায়’ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে—যেখানে জ্ঞান হবে জীবনের আলো, কেবল পরীক্ষার খাতার কয়েকটা নম্বর নয়।

 অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিক্ষা_অধিকার #রাষ্ট্র_সংস্কার #বিস্মৃতির_পাঠশালা #শিক্ষা_আইন_২০২৬ #বাংলাদেশ #ReformBangladesh #RightToEducation #EducationLaw #TheBengalEducationCode #SystemCrash



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: