odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 28th April 2026, ২৮th April ২০২৬
নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা ও সংকটের ভেতর থেকেও ইরান কীভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান, নারীশিক্ষা, গবেষণা ও কারিগরি দক্ষতাকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দিয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারকে কী প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

নিষেধাজ্ঞার আগুনে পুড়েও যে দেশ গড়েছে অদম্য প্রগতি: শিক্ষার শক্তিতে বাংলাদেশ কোথায়?│অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন আয়োজন │পর্ব -০১

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৮ April ২০২৬ ০৩:৩৭

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৮ April ২০২৬ ০৩:৩৭

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন আয়োজন পর্ব -০১

শিক্ষার নদী: প্রবহমান রাখো — ইরান ও বাংলাদেশ সিরিজ

নিষেধাজ্ঞার আগুনে পুড়েও ইরান কীভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নারীশিক্ষা, গবেষণা ও কারিগরি দক্ষতায় অদম্য প্রগতি গড়েছে, এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের জন্য কী শেখার আছে, তা যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি দেখা গেছে নিষেধাজ্ঞার আগুনে পুড়েও ইরান থামেনি। তারা শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নারীশিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতাকে করেছে আত্মনির্ভরতার হাতিয়ার। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সংকটকে অজুহাত বানাব, নাকি শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে নতুন করে গড়ব?এই ফিচার নিবন্ধে তার সাহিত্যিক-একাডেমিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

ভূমিকা: দুই শিক্ষানদীর সামনে এক আয়না দশ আঁচলে বিশেষ পাঠ

কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার পাঠ্যপুস্তকের পাতায় আটকে থাকে না। শিক্ষা আসলে একটি জাতির স্মৃতি, ক্ষত, ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি, শ্রম, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার সম্মিলিত নদী। সেই নদী কখনো রাজদরবারের পাশ দিয়ে বয়ে যায়, কখনো মাদ্রাসার উঠোন ছুঁয়ে যায়, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে ঢুকে পড়ে, আবার কখনো গ্রামের কাঁচা রাস্তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনিতে জেগে ওঠে। ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখলে তাই আমরা শুধু দুই দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবরণ পাই না; পাই দুই সভ্যতার দীর্ঘ আত্মকথা। একদিকে প্রাচীন পারস্যের মরু, পাহাড়, অগ্নিমন্দির, সাম্রাজ্য, ফারসি কবিতা, ইসলামি পাণ্ডিত্য, বিপ্লব এবং নিষেধাজ্ঞার আগুনে গড়ে ওঠা আত্মনির্ভরতার কঠিন আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে বাংলার নদী, বৌদ্ধ মহাবিহার, সংস্কৃত টোল, মক্তব-মাদ্রাসা, ঔপনিবেশিক স্কুলঘর, ভাষা আন্দোলনের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিশপথ, নারীশিক্ষার সংগ্রাম এবং ডিজিটাল যুগের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি। এই দুই নদী ভিন্ন ভূগোল থেকে বের হলেও তাদের প্রশ্ন এক: শিক্ষা কি শুধু সনদ দেবে, নাকি জাতিকে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে?

ইরানের শিক্ষা-অভিযাত্রাকে বুঝতে হলে তাকে কেবল পরিসংখ্যানের টেবিলে বসিয়ে দেখা যায় না। তাকে দেখতে হয় আগুনে পোড়া ধাতুর মতো, যে ধাতু আঘাত পেয়ে ভাঙেনি, বরং আরও কঠিন হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার দেয়াল ইরানের চারদিকে যত উঁচু হয়েছে, দেশটি ততই নিজের ভেতরে খুঁজেছে জ্ঞানের কূপ, গবেষণার হাতিয়ার, স্থানীয় উদ্ভাবনের মাটি এবং মানবসম্পদের শক্তি। নিষেধাজ্ঞা সাধারণত একটি দেশকে থামিয়ে দেওয়ার অস্ত্র। অর্থনীতি শুকিয়ে যায়, গবেষণাগার নিঃশব্দ হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা সংকুচিত হয়, প্রযুক্তির পথ বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু ইতিহাসে কিছু দেশ আছে, যারা অবরোধকে কেবল আঘাত হিসেবে নেয়নি; নিয়েছে আত্মনির্ভরতার কঠিন পাঠ হিসেবে। ইরান সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার আগুনে পুড়েও দেশটি শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, নারীশিক্ষা, গবেষণা এবং কারিগরি দক্ষতার এমন এক পথ নির্মাণ করেছে, যা বিস্ময় জাগায়, প্রশ্ন তোলে এবং শিক্ষা দেয়।

তবে এই আলোচনা কোনো অন্ধ প্রশংসাপত্র নয়। ইরানকে এখানে কোনো নিখুঁত মডেল হিসেবে হাজির করা হচ্ছে না। ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেও সীমাবদ্ধতা আছে, আদর্শিক টানাপোড়েন আছে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ক্ষত আছে, পাঠ্যক্রম ও স্বাধীন গবেষণা নিয়ে বিতর্ক আছে। আছে প্রশাসনিক জটিলতা, মতপ্রকাশের প্রশ্ন, এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্নতার মূল্য। তবুও একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন: কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাঝেও ইরান শিক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কেন্দ্রে বসাতে পেরেছে। তারা বুঝেছে, তেল, গ্যাস, অস্ত্র বা কূটনীতি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, শিক্ষিত, দক্ষ ও গবেষণামুখী মানুষ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এই কারণেই ইরানের অভিজ্ঞতাকে “মডেল” নয়, বরং “কেস স্টাডি” হিসেবে দেখা জরুরি; যেখানে কৌশল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ করা যায় না।

এই ফিচার নিবন্ধের আলোচনাকে দশটি “আঁচল”-এ সাজানো হয়েছে। আঁচল শব্দটি এখানে কেবল অধ্যায়ের অলংকার নয়; এটি আশ্রয়, স্মৃতি, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার রূপক। মায়ের আঁচলে যেমন শিশুর নিরাপত্তা থাকে, তেমনি জাতির শিক্ষা-আঁচলে থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বীজ। ইরানের শিক্ষা-আঁচলে একদিকে আছে নিষেধাজ্ঞার ক্ষত, অন্যদিকে আছে “ওমিদ” উপগ্রহের মতো আশার উড্ডয়ন; একদিকে আছে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের অভাব, অন্যদিকে আছে ঘরোয়া প্রযুক্তির উত্থান; একদিকে আছে পাঠ্যক্রম ও আদর্শ নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে আছে নারীশিক্ষা, গবেষণা, TVET ও দক্ষতাভিত্তিক উন্নয়নের বিস্ময়কর প্রসার। এই দশ আঁচল মিলিয়ে আমরা দেখতে চাই, সংকট কীভাবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, বিজ্ঞানমনস্কতা, কারিগরি দক্ষতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

প্রথম আঁচল খুলে দেবে ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘ শিকড় অনুসন্ধানের দরজা। সেখানে দেখা যাবে, ইরান কেন শিক্ষাকে বহু সময় রাষ্ট্রীয় শক্তি, সাম্রাজ্যিক শৃঙ্খলা এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখেছে, আর বাংলাদেশ কেন শিক্ষাকে ভাষা, আত্মপরিচয়, সামাজিক ন্যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জুড়ে দেখেছে। দ্বিতীয় আঁচলে দেখা যাবে নিষেধাজ্ঞার দেয়ালের ভেতর দাঁড়িয়ে ইরানের স্বপ্নের পসরা; বাইরের দরজা বন্ধ হলে ভেতরের কারখানা, গবেষণাগার ও শ্রেণিকক্ষ কীভাবে নতুন দরজা বানায়। তৃতীয় আঁচল আলো ফেলবে শিক্ষার বিস্তারে, যেখানে শিক্ষা ব্যক্তির উন্নতি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। চতুর্থ আঁচল দেখাবে নারীশিক্ষার উড়ান, যেখানে নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক ধারণার অন্ধকার ভেদ করে লাখ লাখ মেয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও উচ্চশিক্ষার আকাশে নিজেদের স্থান তৈরি করেছে।

পঞ্চম আঁচলে থাকবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহসী রূপান্তর; কীভাবে বাধা হয়ে উঠেছে পুঁজি, আর প্রত্যাবর্তিত মেধা, জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি ও দেশীয় গবেষণা ইরানকে ন্যানোটেক, স্টেম সেল, বায়োটেক, AI ও ঘরোয়া প্রযুক্তির পথে এগিয়ে নিয়েছে। ষষ্ঠ আঁচলে থাকবে TVET ও দক্ষতার বাস্তব পাঠ; কারণ নিষেধাজ্ঞা ইরানকে শিখিয়েছে, শুধু তত্ত্ব দিয়ে রাষ্ট্র চলে না, দরকার মেরামত করতে জানা হাত, তৈরি করতে জানা মস্তিষ্ক, এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা। সপ্তম আঁচলে থাকবে প্রতিকথা, যেখানে ইরানের সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক, পাঠ্যক্রমের আদর্শিকীকরণ, গবেষণা সহযোগিতার বাধা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন আলোচিত হবে। অষ্টম আঁচল ফিরিয়ে আনবে বাংলাদেশের করণীয়ের দিকে; সংকটকে অজুহাত না বানিয়ে উদ্ভাবনের জ্বালানি করার পথ কী হতে পারে। নবম আঁচল দুই দেশের শিক্ষা অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করবে, আর দশম আঁচল তুলবে ভবিষ্যতের সেই মৌলিক প্রশ্ন: শিক্ষা কি শুধু সনদ থাকবে, নাকি সভ্যতার চরিত্র হয়ে উঠবে?

বাংলাদেশের জন্য এই তুলনা বিশেষভাবে জরুরি। আমাদের আছে বিপুল তরুণ জনসংখ্যা, শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের বিস্তার, নারীশিক্ষায় অগ্রগতি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি, ডিজিটাল উদ্যোগ এবং উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু একই সঙ্গে আছে মানের সংকট, গবেষণার দুর্বলতা, কারিগরি শিক্ষার অবমূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, সনদমুখী সংস্কৃতি, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা এবং নীতি ও বাস্তবায়নের গভীর ব্যবধান। আমরা স্কুল বাড়িয়েছি, কিন্তু শেখা কি গভীর হয়েছে? আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বাড়িয়েছি, কিন্তু গবেষণা কি সমাজ ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে? আমরা সনদ দিচ্ছি, কিন্তু দক্ষতা কতটা তৈরি করছি? আমরা ডিজিটাল বলছি, কিন্তু সব শিশুর হাতে কি সমানভাবে শেখার জানালা খুলছে? তাই ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে: সংকটকে কি আমরা অজুহাত বানাব, নাকি উদ্ভাবনের জ্বালানি করব?

সিরিজ সম্পর্কে পড়ুন : শিক্ষার নদী: প্রবহমান রাখো — ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ │ সিরিজ সম্পাদকীয় ভূমিকা (Editor's Note) │ অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন আয়োজন

শেষ পর্যন্ত এই লেখার কেন্দ্রে আছে একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রস্তাব: শিক্ষা নদীর মতো। তাকে প্রবহমান রাখতে হয়। শিকড়ের জলও লাগে, ভবিষ্যতের সাগরও লাগে। ইরান তার মরুতে কূপ খুঁড়েছে; বাংলাদেশ নদীর দেশ হয়েও অনেক সময় তৃষ্ণার্ত। ইরান দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আগুনেও শিক্ষার নদী শুকিয়ে যেতে হয় না, যদি রাষ্ট্র জানে কোথায় বাঁধ দিতে হবে, কোথায় সেচ খুলতে হবে, কোথায় নতুন জলধারা খনন করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন নিজের নদী চিনে নেওয়ার সময়। কোথায় জল আছে, কোথায় পলি জমেছে, কোথায় সেতু দরকার, কোথায় বাঁধ ভাঙতে হবে,

প্রথম আঁচল: ইরান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার শিকড়, ইতিহাস বিবর্তন: উৎস, পথপরিক্রমা, সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক পাঠ

ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, দুটি ভিন্ন ভূদৃশ্যের ওপর দিয়ে দুটি দীর্ঘ কাফেলা এগিয়ে চলেছে। একটির পায়ের নিচে পারস্যের পাহাড়, মরু, অগ্নিমন্দির, সাম্রাজ্য ও দার্শনিক বিতর্কের ধুলো; অন্যটির পায়ের নিচে বাংলার নদী, কাদা, বৌদ্ধ বিহার, টোল, মক্তব, ঔপনিবেশিক স্কুলঘর এবং ভাষা-আন্দোলনের রক্তমাখা পথ। ইরানের শিক্ষা যেন এক প্রাচীন দরবারি আয়না, যেখানে রাজনীতি, ধর্ম, সাম্রাজ্য, কবিতা ও বিজ্ঞানের মুখ পাশাপাশি দেখা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা যেন এক নদীবাহী পালতোলা নৌকা, যার গায়ে পাল যুগের মহাবিহার, মধ্যযুগের মক্তব, ব্রিটিশ আমলের পাঠশালা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের অগ্নি এবং ডিজিটাল যুগের নীল আলো একসঙ্গে লেগে আছে। দুই দেশের শিক্ষা ইতিহাস আলাদা ভূগোলের সন্তান হলেও তাদের গভীরে আছে একই মানবিক প্রশ্ন: জ্ঞান কাদের জন্য, কোন ভাষায়, কোন উদ্দেশ্যে, কোন নৈতিক ভিত্তিতে, এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক কতটা মুক্ত বা কতটা নিয়ন্ত্রিত?

প্রাচীন উৎস: সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা বনাম নদীমাতৃক জ্ঞানপ্রবাহ

ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার শিকড় প্রাচীন পারস্যের রাষ্ট্রচিন্তা, সাম্রাজ্য পরিচালনা, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আখেমেনীয় ও পরবর্তী সাসানীয় ধারায় শিক্ষা ছিল শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির পাথেয় নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রের শিরা-উপশিরায় রক্তপ্রবাহ সচল রাখার উপায়। রাজদরবার, পুরোহিত শ্রেণি, অভিজাত পরিবার এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষা মানে ছিল শৃঙ্খলা, সত্যবাদিতা, যুদ্ধকৌশল, অশ্বচালনা, রাজস্ব, আইন, ধর্মতত্ত্ব ও রাষ্ট্ররক্ষার কৌশল শেখা। প্রাচীন পারস্যে জ্ঞান যেন রাজদণ্ডের ছায়ায় বড় হওয়া এক বৃক্ষ, যার শিকড় ধর্মে, কাণ্ড প্রশাসনে, আর ডালপালা সাম্রাজ্যের বিস্তারে।

বাংলাদেশের প্রাচীন শিক্ষা শিকড় ইরানের তুলনায় বেশি বহুস্বরী, কম সাম্রাজ্যকেন্দ্রিক এবং বেশি ধর্ম-দর্শন-সমাজনির্ভর। পাল যুগের বৌদ্ধ বিহার, সোমপুর মহাবিহার, জগদ্দল, ময়নামতি, বিক্রমপুরের জ্ঞানকেন্দ্রগুলো বাংলার শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক মানচিত্রে স্থাপন করেছিল। সেই শিক্ষা ছিল আশ্রমিক, তর্কনির্ভর, দর্শনমুখী এবং আন্তঃআঞ্চলিক। বাংলার প্রাচীন শিক্ষা তাই একক রাজদরবারের হাতিয়ার নয়; বরং বহু সংস্কৃতি, বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক জ্ঞাননদী। এখানে শিক্ষা যেমন ধর্মীয় সাধনার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তেমনি যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, চিকিৎসা ও দর্শনের চর্চাও ছিল। এই জায়গায় ইরান ও বাংলাদেশ উভয়ের মিল হলো, দুই দেশের প্রাচীন শিক্ষাই ধর্ম ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু অমিল হলো, ইরানে শিক্ষা অধিকতর রাষ্ট্র-সাম্রাজ্যিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বাঁধা ছিল, আর বাংলায় তা অধিকতর বিহার, টোল, পাঠশালা ও স্থানীয় জ্ঞানপ্রবাহের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল।

ধর্মীয় জ্ঞান ভাষার রাজনীতি: জরথুস্ত্র, ইসলাম, সংস্কৃত, ফারসি বাংলা

ইরানের শিক্ষা ইতিহাসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং পরে ইসলামের আগমন এক গভীর রূপান্তর ঘটায়। সাসানীয় যুগে ধর্মীয় শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যার মিলিত চর্চা ইরানি শিক্ষাকে এক ধরনের প্রাচীন জ্ঞান-সংলাপের রূপ দেয়। ইসলামের আগমনের পর আরবি ভাষা ধর্মতত্ত্ব, আইন, ফিকহ ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার বাহন হয়ে ওঠে, কিন্তু পারস্য ভাষা দ্রুতই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক প্রকাশের প্রাণ হিসেবে পুনরুত্থিত হয়। এই দ্বৈত ভাষিকতা ইরানকে এক অনন্য সভ্যতাগত শক্তি দেয়: ধর্মীয় জ্ঞান আরবির মাধ্যমে বিস্তৃত হলো, অথচ সাংস্কৃতিক আত্মা ফারসির ভেতর দিয়ে টিকে থাকল। ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, নাসিরুদ্দিন তুসি, ওমর খৈয়ামের মতো মনীষীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, ইসলামী যুগে ইরানের শিক্ষা শুধু ধর্মীয় পাঠে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দর্শন, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে এক সঙ্গে ধারণ করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষার স্তর আরও বহুভাগে বিভক্ত। বৌদ্ধ বিহার, হিন্দু টোল, সংস্কৃত চতুষ্পাঠী, মুসলিম মক্তব-মাদ্রাসা, সুফি খানকাহ এবং গ্রামীণ পাঠশালা, সবগুলো মিলিয়ে বাংলার শিক্ষা এক বহু-ধর্মীয় ও বহু-ভাষিক চরিত্র লাভ করে। সংস্কৃত ছিল শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের ভাষা, ফারসি ছিল দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক ও দরবারি ভাষা, আর বাংলা ধীরে ধীরে লোকজ সাহিত্য, পুঁথি, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও পরবর্তীতে জাতীয় আত্মপরিচয়ের ভাষা হয়ে ওঠে। এখানে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল হলো, দুই দেশই ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার পরিচয় নির্মাণ করেছে। ইরানে ফারসি যেমন আরবি ধর্মীয় জ্ঞানের পাশে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশে বাংলা তেমনি সংস্কৃত, ফারসি, আরবি ও ইংরেজির চাপের মধ্যে নিজেকে জনগণের ভাষা, পরে জাতির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। পার্থক্য হলো, ইরানে ফারসি রাষ্ট্রীয় ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতার শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দীর্ঘকাল টিকে থাকে; বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত সংগ্রাম প্রয়োজন হয়েছিল।

মাদ্রাসা, টোল জ্ঞানপরম্পরা: শিক্ষক শুধু পাঠদাতা নন, বংশপরম্পরার ধারক

ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সাদৃশ্য হলো, উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষক ছিলেন শুধু পাঠদাতা নন; তিনি ছিলেন জ্ঞানপরম্পরার ধারক। ইরানের মাদ্রাসায় ছাত্ররা কোনো খ্যাতিমান আলেম, দার্শনিক বা চিকিৎসকের কাছে শিক্ষা নিতে দূরদূরান্ত থেকে আসত। জ্ঞান ছিল ব্যক্তিত্বনির্ভর, বিতর্কনির্ভর এবং গুরু-শিষ্য সম্পর্কনির্ভর। একইভাবে বাংলার টোল, পাঠশালা, মক্তব ও মাদ্রাসায় শিক্ষক ছিলেন স্থানীয় সমাজের জ্ঞানপ্রতিনিধি। তাঁর কাছে শুধু অক্ষর নয়, আচরণ, নৈতিকতা, ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও জীবনযাপনের পাঠও শেখা হতো।

তবে অমিলও ছিল স্পষ্ট। ইরানের মাদ্রাসা ও জ্ঞানকেন্দ্রগুলো অনেক সময় বৃহত্তর ইসলামী জ্ঞানসভ্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল; ফলে পারস্য, আরব, গ্রিক, ভারতীয় ও সিরীয় জ্ঞানের মেলবন্ধন সেখানে শক্তিশালী ছিল। বাংলাদেশের জ্ঞানপরম্পরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থানীয়, নদীভিত্তিক, গ্রামীণ, লোকজ এবং ধর্মীয়-সামাজিক বাস্তবতায় বাঁধা ছিল। বাংলার শিক্ষা ছিল জনজীবনের সঙ্গে মিশ্রিত; জমির হিসাব, পুঁথি পাঠ, ধর্মীয় পাঠ, গ্রামীণ আদালত, বাজারের হিসাব, চিঠিপত্র, কাব্য ও লোকজ স্মৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। ফলে ইরানের শিক্ষা যেখানে একাধিক সময়ে সাম্রাজ্যিক ও দার্শনিক উচ্চতায় উঠেছে, বাংলাদেশের শিক্ষা সেখানে জনজীবনের মাটিতে পা রেখে আত্মপরিচয়, ভাষা ও সামাজিক জাগরণের দিকে বেশি প্রবাহিত হয়েছে।

আধুনিকতার আগমন: দারুলফুনুন বনাম ঔপনিবেশিক স্কুলঘর

ইরান ও বাংলাদেশ উভয়ের শিক্ষা ইতিহাসে আধুনিকতার আগমন বাইরের চাপ, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন এবং ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থার প্রভাবে ঘটে। ইরানে কাজার যুগে দারুলফুনুন প্রতিষ্ঠা আধুনিক শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। সেখানে সামরিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, বিদেশি ভাষা ও আধুনিক প্রশাসনিক জ্ঞান শেখানো হতো। পুরোনো মাদ্রাসাভিত্তিক জ্ঞানধারার পাশে দাঁড়াল আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রীয় শিক্ষা। ইরানের আধুনিকতা ছিল এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক আধুনিকতা: ইউরোপীয় শক্তির সামনে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিজ্ঞান, সামরিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আধুনিক শিক্ষার আগমন মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে। ইংরেজি শিক্ষা, ম্যাকলে-ধারা, কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা, মিশনারি বিদ্যালয়, জেলা স্কুল, হিন্দু কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এই সবই আধুনিক শিক্ষার কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু এখানে আধুনিকতার চরিত্র ছিল দ্বিমুখী। একদিকে এটি তৈরি করে নতুন মধ্যবিত্ত, সংবাদপত্র, সাহিত্য, আইনজীবী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মী, জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও সমাজসংস্কার। অন্যদিকে এটি ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রয়োজনমাফিক গঠিত এক শ্রেণি-নির্ভর শিক্ষা, যেখানে শহর, অভিজাত সমাজ ও পুরুষের প্রবেশাধিকার বেশি ছিল। এই তুলনায় ইরানের আধুনিক শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন থেকে বেশি চালিত, আর বাংলার আধুনিক শিক্ষা ছিল উপনিবেশিক শাসনের কাঠামোর মধ্যে জন্ম নেওয়া, তবে পরে সেটিই জাতীয় জাগরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

নারীশিক্ষা সামাজিক রূপান্তর: দুটি সমাজের ধীর কিন্তু গভীর অগ্রযাত্রা

ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা বিবর্তনে নারীশিক্ষা এক গুরুত্বপূর্ণ তুলনাক্ষেত্র। দুই সমাজেই নারীশিক্ষা শুরুতে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধার মুখে পড়ে। ইরানে পাহলভী যুগে রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তার পায়। পরবর্তীতে ইসলামি বিপ্লবের পর শিক্ষা ব্যবস্থায় আদর্শিক পুনর্গঠন হলেও নারীশিক্ষার বিস্তার থেমে যায়নি; বরং উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। আজকের ইরানে নারীশিক্ষা এক দ্বৈত বাস্তবতা বহন করে: একদিকে উচ্চ শিক্ষাগত অংশগ্রহণ, অন্যদিকে সামাজিক-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সীমা।

বাংলাদেশে নারীশিক্ষার পথ আরও সামাজিক সংগ্রামনির্ভর। বেগম রোকেয়া, বিদ্যাসাগর, মুসলিম সমাজসংস্কারক, মিশনারি উদ্যোগ, পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই ও মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নারীশিক্ষাকে বিস্তার দেয়। বাংলাদেশে নারীশিক্ষা শুধু শিক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি পরিবার, বাল্যবিবাহ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। মিল হলো, উভয় দেশে নারীশিক্ষা আধুনিকতার সূচক হয়ে উঠেছে। অমিল হলো, ইরানে নারীশিক্ষা বহু সময় রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণ ও আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এগিয়েছে, আর বাংলাদেশে তা সামাজিক সংস্কার, উন্নয়ন প্রকল্প, দারিদ্র্য হ্রাস এবং লিঙ্গসমতার আন্দোলনের সঙ্গে বেশি যুক্ত।

রাষ্ট্র, আদর্শ শিক্ষানিয়ন্ত্রণ: কেন্দ্রীয়তা বনাম বহুধারার জটিলতা

ইরানের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, আর উচ্চশিক্ষা বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং চিকিৎসাশিক্ষা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত হয়। ইরানের আনুষ্ঠানিক স্কুল কাঠামোয় সাধারণভাবে ছয় বছর প্রাথমিক এবং ছয় বছর মাধ্যমিক শিক্ষা আছে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন নথিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।  এই কেন্দ্রীয়তা ইরানকে পাঠ্যক্রম, ভাষা, আদর্শ, মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে একীভূত কাঠামো দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি মুক্তচিন্তা, পাঠ্যক্রমের বৈচিত্র্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুমতের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোবদ্ধ, তবে বাস্তবে এটি বহুধারাবাহিক ও বহুপ্রশাসনিক। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বর্ণনায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, এই তিন প্রধান স্তরে বিভক্ত বলে উল্লেখ আছে কিন্তু বাস্তব ছবিটি আরও জটিল: সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কলেজ, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সব মিলিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষা এক বহু-মাথাওয়ালা বৃক্ষ। এর ফলে প্রবেশাধিকার ও সামাজিক বৈচিত্র্য বাড়ে, কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণ, সমতা, জাতীয় লক্ষ্য, মূল্যায়ন ও দক্ষতা নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়। ইরানের শিক্ষা যেখানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের শক্ত হাতের নিচে একরৈখিকতা পায়, বাংলাদেশের শিক্ষা সেখানে বহুধারার বিস্তারে সমৃদ্ধ হলেও সমন্বয়ের অভাবে প্রায়ই দিশাহীন হয়।

বিপ্লব, ভাষা জাতির আত্মা: ১৯৭৯ বনাম ১৯৫২ ১৯৭১

ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে রাজনৈতিক মোড়গুলো গভীরভাবে শিক্ষার চরিত্র বদলে দিয়েছে। ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন আদর্শিক ছাঁচে ঢেলে দেয়। পাঠ্যক্রমে ইসলামি মূল্যবোধ, বিপ্লবী চেতনা, রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হয়। স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও উদ্দেশ্য বদলে যায়; শিক্ষা হয়ে ওঠে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র নির্মাণের হাতিয়ার। ব্রিটানিকার বর্ণনায়ও বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষানীতিতে ইসলামি মূল্যবোধ জোরদার এবং সহশিক্ষা সীমিত করার প্রসঙ্গ রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শিক্ষা-রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু দুটি: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলন শিক্ষাকে ভাষা, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে রূপান্তরিত করে। মুক্তিযুদ্ধ শিক্ষা দর্শনে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং গণমুখী শিক্ষার স্বপ্ন যোগ করে। কুদরত-ই-খুদা কমিশনের ভাবনা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের শিক্ষা-আত্মা নির্মাণের এক বড় প্রচেষ্টা। এই তুলনায় ইরানের শিক্ষা বিপ্লব-পরবর্তী ধর্মীয়-আদর্শিক রাষ্ট্রগঠনের পথে হাঁটে, আর বাংলাদেশের শিক্ষা ভাষা-ভিত্তিক জাতীয় আত্মপরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক রাষ্ট্রচেতনার পথে এগোয়। দুই দেশেই শিক্ষা জাতির আত্মা নির্মাণের মঞ্চ, কিন্তু ইরানে সেই আত্মা ধর্মীয়-বিপ্লবী রাষ্ট্রের ভাষায় বেশি সংজ্ঞায়িত, বাংলাদেশে ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির ভাষায়।

সাক্ষরতা, বিস্তার গুণগত সংকট: সংখ্যার আলো, মানের ছায়া

বর্তমান সময়ে ইরান ও বাংলাদেশ উভয়ই শিক্ষাবিস্তারে উল্লেখযোগ্য পথ অতিক্রম করেছে। বিশ্বব্যাংকের UNESCO-ভিত্তিক ডেটা পোর্টালে উভয় দেশের সাক্ষরতা সংক্রান্ত সূচক পাওয়া যায়, যা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাবিস্তারের অগ্রগতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস।  তবে সাক্ষরতার পরিসংখ্যান শিক্ষার পূর্ণ মানদণ্ড নয়। একটি মানুষ পড়তে ও লিখতে পারে, কিন্তু সে কি সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে পারে? সে কি বিজ্ঞানমনস্ক? সে কি নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে? সে কি শ্রমবাজারে দক্ষ? সে কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে, না প্রযুক্তির হাতে ব্যবহৃত হয়? এই প্রশ্ন ইরান ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই প্রাসঙ্গিক।

ইরানে শিক্ষা বিস্তার, বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে অংশগ্রহণ, নারীশিক্ষা এবং গবেষণার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দৃশ্যমান। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, মেধাপাচার, কর্মসংস্থানের চাপ এবং পাঠ্যক্রমের আদর্শিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষার সম্ভাবনাকে বাঁধা দেয়। বাংলাদেশে স্কুলে প্রবেশাধিকার, মেয়েদের শিক্ষা, বই বিতরণ, উপবৃত্তি, ডিজিটাল উদ্যোগ, উচ্চশিক্ষা প্রসার উল্লেখযোগ্য অর্জন। কিন্তু মানের সংকট, মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণের দুর্বলতা, শহর-গ্রামের বৈষম্য, গবেষণার দুর্বলতা এবং বহুধারার মানগত বিচ্ছিন্নতা বড় বাধা। দুই দেশই সংখ্যার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছে, কিন্তু মানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

আধুনিক প্রযুক্তি পাঠ্যক্রম: ডিজিটাল আকাঙ্ক্ষা, বাস্তবতার কাঁটা

ইরান ও বাংলাদেশ উভয়ই একুশ শতকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দিকে এগিয়েছে। ইরানে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং গবেষণার প্রতি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। তবে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ গবেষণার মুক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, শিক্ষক বাতায়ন, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন ভর্তি, ফল প্রকাশ এবং পাঠ্যক্রম সংস্কারের উদ্যোগ শিক্ষা প্রশাসনকে আধুনিকতার দিকে টেনে এনেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছে, ডিজিটাল শিক্ষা শুধু প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই হয় না; দরকার বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিভাইস, শিক্ষকদক্ষতা, পরিবারিক সহায়তা এবং সামাজিক সমতা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নতুন ও সংশোধিত কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের প্রসঙ্গ জাতীয় আলোচনায় এসেছে।

এই জায়গায় দুই দেশের মিল হলো, উভয়ই আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার দিকে যেতে বাধ্য। অমিল হলো, ইরানের প্রযুক্তি-শিক্ষা অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় গবেষণা, প্রকৌশল ও উচ্চশিক্ষা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত; বাংলাদেশের প্রযুক্তি-শিক্ষা এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, শ্রেণিকক্ষের উপকরণ, আইসিটি দক্ষতা এবং শ্রমবাজারমুখী দক্ষতার সন্ধানে। ইরান জ্ঞান-রাষ্ট্র হতে চায়, বাংলাদেশ দক্ষতা-সমৃদ্ধ উন্নয়নরাষ্ট্র হতে চায়। দুই আকাঙ্ক্ষার ভাষা আলাদা, কিন্তু উদ্বেগ একই: শিক্ষা যদি কর্মদক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা না দেয়, তবে ডিজিটাল পর্দা শুধু নতুন চকবোর্ড হয়ে থাকবে।

সাদৃশ্য: দুই দেশের শিক্ষার অভিন্ন সুর

ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে প্রথম বড় সাদৃশ্য হলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গভীর ভূমিকা। ইরানের অগ্নিমন্দির, মাদ্রাসা, মসজিদ, ধর্মতাত্ত্বিক কেন্দ্র যেমন শিক্ষার শিকড় তৈরি করেছে, বাংলাদেশের বিহার, টোল, মক্তব, মাদ্রাসা, খানকাহও তেমনি শিক্ষাকে ধর্মীয় ও নৈতিক পরিসরে নির্মাণ করেছে। দ্বিতীয় সাদৃশ্য হলো ভাষার কেন্দ্রীয়তা। ইরানে ফারসি, বাংলাদেশে বাংলা, দুই ভাষাই শিক্ষা ও জাতিসত্তার আত্মা হয়ে উঠেছে। তৃতীয় সাদৃশ্য হলো আধুনিক শিক্ষার আগমন বাইরের চাপ ও অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের সংমিশ্রণে। চতুর্থ সাদৃশ্য হলো নারীশিক্ষার ধীর কিন্তু শক্তিশালী বিস্তার। পঞ্চম সাদৃশ্য হলো শিক্ষাবিস্তারের সাফল্যের সঙ্গে মানগত সংকটের সহাবস্থান। ষষ্ঠ সাদৃশ্য হলো রাষ্ট্রের শিক্ষাকে জাতি-গঠনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা। দুই দেশেই শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, ধর্ম, ভাষা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির কেন্দ্রীয় মঞ্চ।

বৈসাদৃশ্য পার্থক্য: সাম্রাজ্যের স্মৃতি বনাম মুক্তিযুদ্ধের আত্মপরিচয়

তবে পার্থক্যও ততটাই গভীর। ইরানের শিক্ষা ইতিহাসের প্রাচীন ভিত্তি সাম্রাজ্য, রাজদরবার, জরথুস্ত্রীয় নৈতিকতা এবং ফারসি সভ্যতার ধারাবাহিকতায় দাঁড়ানো। বাংলাদেশের প্রাচীন শিক্ষা ভিত্তি অধিকতর বৌদ্ধ বিহার, সংস্কৃত টোল, গ্রামীণ পাঠশালা, মক্তব-মাদ্রাসা এবং লোকজ জ্ঞানধারার সম্মিলনে তৈরি। ইরানের ভাষা-আত্মা ফারসি বহু সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেছে, এবং ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষা-জাতীয়তা এক অনন্য রাজনৈতিক শক্তি পেয়েছে। ইরান আধুনিকতা পেয়েছে কাজার-পাহলভী রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণ এবং পরে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ আধুনিকতা পেয়েছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা, বাঙালি নবজাগরণ, পাকিস্তানি বৈষম্যবিরোধী সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

বর্তমান কাঠামোগত পার্থক্যেও বিষয়টি স্পষ্ট। ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী; পাঠ্যক্রম, ভাষা ও আদর্শে রাষ্ট্রের দখল স্পষ্ট। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বাস্তবে শিক্ষা বহুধারায় বিভক্ত, যেখানে সাধারণ, মাদ্রাসা, কওমি, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার নানা ধারা পাশাপাশি চলে। ইরানের সমস্যা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের ঘনত্বে; বাংলাদেশের সমস্যা অনেক সময় সমন্বয়ের দুর্বলতায়। ইরানে শিক্ষা রাজনৈতিক-আদর্শিক সীমার সঙ্গে লড়ছে; বাংলাদেশে শিক্ষা লড়ছে মান, জবাবদিহি, বৈষম্য, পরীক্ষানির্ভরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সঙ্গে। ইরান মরুভূমির মতো কঠোর কেন্দ্র ধরে রাখতে চায়; বাংলাদেশ নদীর মতো ছড়ায়, কিন্তু ছড়াতে ছড়াতে অনেক সময় দিক হারায়।

ইনডিফারেন্সবা উদাসীনতার ক্ষেত্র: যেখানে দুই দেশই নিজেদের প্রশ্ন এড়িয়ে যায়

তুলনামূলক আলোচনায় একটি সূক্ষ্ম ক্ষেত্র আছে, যাকে বলা যেতে পারে “ইনডিফারেন্স” বা প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা। ইরান ও বাংলাদেশ উভয় দেশই শিক্ষা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু অনেক সময় শিক্ষার্থীর বাস্তব শেখা, মানসিক স্বাধীনতা, শিক্ষক-দক্ষতা, গবেষণার মৌলিকতা এবং কর্মসংস্থানের সত্যিকারের সামর্থ্যের প্রশ্নে নীরবতা দেখা যায়। ইরান তার আদর্শিক আত্মবিশ্বাসের আড়ালে কখনো মুক্তচিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে যথেষ্ট আত্মসমালোচনা করে না। বাংলাদেশ তার শিক্ষাবিস্তারের সাফল্যের আড়ালে শেখার মান, শিক্ষকতার মর্যাদা, সনদ-নির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় কঠোরতায় মুখোমুখি হতে চায় না।

আরও একটি উদাসীনতা দুই দেশে দেখা যায়: শিক্ষা-নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ফাঁক। ইরানে রাষ্ট্রীয় নীতি শক্তিশালী, কিন্তু শিক্ষার্থীর স্বাধীন অনুসন্ধান সব সময় সমান শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশে নীতি, কমিশন, পরিকল্পনা, কারিকুলাম, ডিজিটাল ঘোষণা অনেক আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা দুর্বল। দুই দেশেই শিক্ষার নামে অনেক সময় কাঠামো সাজে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের প্রাণ জাগে না। দুই দেশেই সনদ, পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, ডিগ্রি, প্রযুক্তি ও নীতির মিছিল আছে; কিন্তু মানুষ গড়ার গভীর নৈতিক ও বৌদ্ধিক সাধনা সবসময় সমান গুরুত্ব পায় না।

দ্বিতীয় আঁচল: নিষেধাজ্ঞার দেয়াল, এক স্বপ্নের পসরা

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের ওপর নেমে আসে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কঠোর নিষেধাজ্ঞা। প্রথম দিকে প্রভাব পড়েছিল শিক্ষা ও গবেষণায়। ইরানি শিক্ষার্থীরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত না। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমদানি প্রায় বন্ধ। গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য পশ্চিমা জার্নালগুলো ইরানি প্রতিষ্ঠানের সদস্য পদ প্রত্যাখান করত।

বহু বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হবে। কিন্তু ঘটল উল্টো।

নিষেধাজ্ঞার দেয়াল ইরানের নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করল দেশীয় সমাধান খুঁজতে। আর সেই বাধ্যবাধকতা একসময় পরিণত হলো ‘স্থানীয় উদ্ভাবনী শক্তি’য়। ইরান বুঝতে শিখল—বাইরের জগৎ যদি না দেয়, তবে নিজের হাতে তৈরি করতে হবে, নিজের মেধায় বানাতে হবে, নিজের মাটিতেই দাঁড়াতে হবে।

একটি উদাহরণ দিই। ইরান যখন মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, পশ্চিমা বিশ্ব কঠোর আপত্তি তুলে। প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইরানি বিজ্ঞানীরা নিজেরাই তৈরি করে নেন ‘সাফির’ নামক ক্যারিয়ার রকেট। ২০০৯ সালে সেই রকেট ইরানের প্রথম উপগ্রহ ‘ওমিদ’—যার ফার্সি অর্থ 'আশা'—মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। পৃথিবী দেখল, নিষেধাজ্ঞার দেশটি এখন স্পেস টেকনোলজির এক অনন্য উদাহরণ।

রূপকটা দিই: নিষেধাজ্ঞা যেন এক কঠিন প্রাচীর। ইরান সেই প্রাচীরের গায়ে হাত বুলিয়ে খুঁজে নিয়েছে ফাটল, তাক লেগেছে দাঁড়ানোর জায়গা, আর লিখেছে—‘অসম্ভব আমাদের অভিধানে নেই।’

তৃতীয় আঁচল: শিক্ষার পরিধিসবার জন্য, দেশের জন্য

ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ব্যাপ্তি ও সমতার মিশেল। ১৯৭৯ সালে ইরানের শিক্ষার হার ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ। আজ তা দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশের ওপরে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে। প্রায় ৮০ লাখ শিক্ষার্থী প্রাথমিকে, আরও প্রায় ৭০ লাখ মাধ্যমিকে। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় দুই কোটি—যা মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ থেকে জনসংখ্যার অনুপাতে দেখলে ইরানের শিক্ষার হার অনেকটাই এগিয়ে। আর মজার ব্যাপার হলো—বাংলাদেশের তুলনায় ইরানে মাথাপিছু আয় কম ছিল দীর্ঘদিন, শিক্ষা বাজেটও কম ছিল শতাংশের নিরিখে; তারপরও আউটপুট হয়েছে ভালো। তাহলে কোথায় ফারাক? ফারাক প্রক্রিয়ায়, ফারাক পরিকল্পনায়, ফারাক শিক্ষাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা' হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করে, শিক্ষা শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, এটি দেশের জাতীয় স্বার্থের অঙ্গ। তাই নিষেধাজ্ঞার সময়েও শিক্ষার বাজেট কাটা হয়নি কখনও তলানিতে। এমনকি কঠিন মুদ্রাস্ফীতির সময়েও শিক্ষকদের বেতন ও প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দ অটুট রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই শুনি—‘বাজেট কম, কী করব!’ ইরান দেখিয়েছে, বাজেটের চেয়েও বড় কথা হলো অগ্রাধিকার ও সঠিক ব্যবহার।

চতুর্থ আঁচল: নারীশিক্ষাঅর্ধেক আকাশের উড়ানইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্ভবত সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অগ্রগতি হয়েছে নারীশিক্ষায়। ইসলামি বিপ্লবের পর বহির্বিশ্বের ধারণা ছিল, ইরানে নারীরা স্কুলে যেতে পারবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পাবে না। তথ্য বলছে উল্টো।

 

২০১০ সালের পর প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি ছিলেন নারী। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মেডিসিন—যেখানে প্রচলিত ধারণা ‘পুরুষের ডেরা’, সেখানেও নারীরা উল্লেখযোগ্য অংশীদার। ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট নারী। যে সংখ্যা বিশ্বের প্রায় সব দেশের চেয়ে বেশি।

রূপক: নিষেধাজ্ঞার অন্ধকার মেঘের নিচে ফুটেছে লাখ লাখ মেয়ের লেখাপড়ার জোনাকি

তথ্যটি আরও বিস্ময়কর হয় যখন জানা যায়—গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েরা এখন স্কুলমুখী হয়েছে অভূতপূর্ব হারে। ‘বালিকা শিক্ষা প্রকল্প’ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়েছে। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বাধার দেয়াল ভাঙতে ইরান তৈরি করেছে নারী শিক্ষকদের বিশাল বাহিনী—যাতে পরিবার মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

বাংলাদেশের নারীশিক্ষার অগ্রগতি প্রশংসনীয়, কিন্তু মাধ্যমিকের পর ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলে। ইরানের ‘সমতার অংশগ্রহণ' মডেল আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে—একা সরকার নয়, মসজিদ কমিটি, স্থানীয় নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে শিক্ষার দাওয়াতে।

পঞ্চম আঁচল: বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিবাধাকে পুঁজি করে

ইরানের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার গল্প সত্যিই ‘চমক’ শব্দটিকে নতুন অর্থ দেয়। ১৯৯০-এর দশকে ইরানের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল নগণ্য। ২০২০ সালে এসে দাঁড়ায় বছরে ৬০ হাজারেরও বেশি। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ন্যানোটেকনোলজি ও স্টেম সেল গবেষণায় ইরান বিশ্বের শীর্ষ ৫ দেশের মধ্যে। কৃত্রিম মেধার (AI) গবেষণায়ও ইরানি তরুণরা এগিয়ে।

কীভাবে সম্ভব হলো?

উত্তর হলো: ‘প্রত্যাবর্তিত মেধা’ আর ‘ঘরোয়া প্রযুক্তি’র জোটবন্ধন। অনেক ইরানি পণ্ডিত যারা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছিলেন বা পড়ছিলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ইরান সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। তাদের জন্য তৈরি হয় উচ্চ মর্যাদার গবেষণা কেন্দ্র, বিশেষ বাজেট, স্বাধীনতা। একইসঙ্গে, ইরান শুরু করে ‘জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি’ (Knowledge-based companies) তৈরির উৎসাহ। যারা দেশীয় প্রযুক্তি তৈরি করবে, বিদেশি নির্ভরতা কমাবে।

ফলে আজ ইরান টেকনোলজি পার্কে গমগম করছে দেশীয় উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনে। স্টেম সেল, বায়োটেক, ন্যানোটেক, এমনকি ড্রোন প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই ইরান এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো: আমরা কি এই স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছি? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কি শুধু বিদেশি গবেষণার ভোক্তা, নাকি নির্মাতাও? ইরান দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার অভিশাপকেও কখনো অভিশাপ না ভেবে 'সুযোগ' ভাবলে বিজ্ঞানের বাতাস পালটে যায়।

ষষ্ঠ আঁচল: TVET আর দক্ষতা উন্নয়নকারিগরি হাতেই মোক্ষম দাওয়াই

ইরানে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যখন আমদানি বন্ধ, দরকার হয় মেরামত, পুনঃব্যবহার, পর্যাপ্ত মানবসম্পদ। ইরান সে চাহিদা মেটায় দক্ষ কারিগর তৈরির মাধ্যমে।

প্রায় এক হাজারেরও বেশি কারিগরি স্কুল ও কলেজ সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী TVET-তে পড়ে। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘ফ্যানো ভারঝে’ (University of Applied Science) নামে একটি পৃথক কাঠামো কাজ করে, যা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের।

ইরানের শিল্প মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে নির্ধারণ করে কোন দক্ষতা কোথায় বেশি দরকার। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সেতুবন্ধন প্রাতিষ্ঠানিক।

বাংলাদেশের TVET কাঠামো অনেক ফাঁপা। কারিগরি শিক্ষাকে মর্যাদা না দেওয়া, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, উদ্যোক্তার সঙ্গে সমন্বয়হীনতা—এসব সমস্যার ভিড়ে আমরা পিছিয়ে। ইরানের ‘সাপ্লাই-ডিমান্ড অ্যানালাইসিস’ ও ‘শিল্প ও শিক্ষার চুক্তিবদ্ধ অঙ্গীকার’ বাংলাদেশের জন্য মডেল হতে পারে।

সপ্তম আঁচল: প্রতিকথাইরানের পথে বাধা আর বিতর্ক

ইরানের শিক্ষা কাহিনি কেবল গোলাপি ছবি নয়। নিষেধাজ্ঞা এখনও অনেক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম, গবেষণা সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ কঠিন করেছে। শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে সিরিয়া-আফগান শরণার্থী শিশুদের জন্য। প্রশাসনিক জটিলতায় ভোগে বহু প্রকল্প। আর সমালোচকরা বলেন, পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ কখনো কখনো বৈজ্ঞানিক যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়।

তবে পর্যবেক্ষকরা একমত—ইরান নিষেধাজ্ঞার প্রতিকূলতায় শিক্ষায় যে ধাপ পেরিয়েছে, তা 'টিকে থাকার অসাধারণ কাহিনি'। আর এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক আছে বিশ্বের।

বাংলাদেশের শিক্ষানীতির বড় দুর্বলতা হলো নীতি ও বাস্তবায়নের ফারাক। ইরানের অনেক উদ্যোগ বাস্তবেও কাজ করেছে—আমরা তা শিখতে পারি। কিন্তু বুঝতে হবে— প্রয়োগের প্রসঙ্গ ভিন্ন। ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ ইরানের শিক্ষা দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে; বাংলাদেশ তার নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার গণতান্ত্রিক চেতনায় শিক্ষা চায়। সেখান থেকে শুধু কৌশলগত সাফল্য আয়াত করা যায়, দর্শন বা আদর্শের অনুকরণ নয়।

অষ্টম আঁচল: বাংলাদেশের করণীয়ইরান থেকে যা নেওয়া যায়

ইরান আমাদের শেখায় চারটি কঠিন শিক্ষা:

. নিষেধাজ্ঞা বা সংকট দুর্বলতা নয়সুযোগ: বাংলাদেশও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি—বাজেট সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক মন্দা। ইরান দেখাল, প্রতিকূলতাই সৃজনশীলতার জন্ম দেয়।

. শিক্ষা জাতীয় নিরাপত্তার অংশ: ইরানের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষাকে তেল বা গ্যাসের সমান অগ্রাধিকার দেন। আমাদেরও দরকার শিক্ষা বাজেট না কমানোর বদ্ধমূল সংস্কৃতি।

. স্থানীয় উদ্ভাবনী শক্তি জাগাতে হবে: বিদেশি প্রযুক্তি আমদানির চেয়ে দেশীয় গবেষণা ও দক্ষতা বৃদ্ধি দরকার। ইরানের ‘নলেজ ফান্ড’ ও ‘টেকনোলজি পার্ক’ আমাদের মডেল হতে পারে।

. TVET কে মর্যাদা দিতে হবে: সমাজের চোখে কারিগরি শিক্ষা দ্বিতীয় শ্রেণির নয়। ইরান দেখিয়েছে, দক্ষ কারিগর তৈরি না করলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে দাঁড়ানো যায় না। বাংলাদেশের ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ আরও সক্রিয় ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে।

নবম আঁচল: মূল্যায়ন: ইরান কী শিখিয়েছে, বাংলাদেশ কী দেখিয়েছে

ইরানের শিক্ষা ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি সভ্যতা যদি ভাষা, জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাকে দীর্ঘকাল ধরে ধারণ করে, তবে রাজনৈতিক বিপর্যয়েও তার সাংস্কৃতিক আত্মা টিকে থাকে। ফারসি ভাষার স্থায়িত্ব, মাদ্রাসা ও দার্শনিক ঐতিহ্য, আধুনিক বিজ্ঞান গ্রহণের চেষ্টা এবং উচ্চশিক্ষার বিস্তার ইরানের শক্তি। কিন্তু তার দুর্বলতা হলো অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়তা, আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং তরুণ মেধার জন্য পর্যাপ্ত মুক্ত আকাশের অভাব। ইরান যেন এক পুরোনো গ্রন্থাগার, যার তাকভর্তি অমূল্য পাণ্ডুলিপি, কিন্তু অনেক জানালায় রাষ্ট্রীয় পর্দা টানা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাস আমাদের শেখায়, শিক্ষা কেবল জ্ঞান নয়; এটি ভাষা, স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়, নারী জাগরণ এবং উন্নয়নের পথ। বাংলাদেশের শক্তি হলো শিক্ষার সামাজিক বিস্তার, মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি, ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়, সাধারণ মানুষের শিক্ষা-আকাঙ্ক্ষা এবং বহুধারার অভিযোজনশীলতা। কিন্তু দুর্বলতা হলো মানের সংকট, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণার অভাব, প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি, সনদমুখিতা এবং ধারাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা। বাংলাদেশ যেন এক বিশাল নৌবহর, যেখানে নৌকার সংখ্যা বেড়েছে, যাত্রীও বেড়েছে, কিন্তু সব নৌকার মাঝি, মানচিত্র ও গন্তব্য একভাবে প্রস্তুত নয়।

দশম আঁচল: ভবিষ্যৎ পাঠ  শিক্ষা যদি শুধু সনদ না হয়ে সভ্যতার চরিত্র হয়

ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনা শেষ পর্যন্ত আমাদের এক গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়: শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, ডিগ্রি বা মন্ত্রণালয় নয়। শিক্ষা হলো সভ্যতার চরিত্র নির্মাণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ইরান যদি তার প্রাচীন পারস্যের জ্ঞানগৌরব, ইসলামি পাণ্ডিত্য, আধুনিক বিজ্ঞান এবং তরুণ প্রজন্মের মুক্ত অনুসন্ধানকে একসঙ্গে মিলাতে পারে, তবে সে আবারও জ্ঞানসভ্যতার এক শক্তিশালী কেন্দ্র হতে পারে। বাংলাদেশ যদি তার প্রাচীন মহাবিহারের আলো, বাংলা ভাষার রক্তঋণ, মুক্তিযুদ্ধের মানবিক চেতনা, গণমুখী শিক্ষা এবং একুশ শতকের দক্ষতাকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে, তবে সে শুধু শিক্ষার পরিসংখ্যান নয়, শিক্ষার আত্মাও উদ্ধার করতে পারবে।

দুই দেশই এখন এমন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, যার এক পাশে অতীতের গৌরব, অন্য পাশে ভবিষ্যতের কঠিন প্রতিযোগিতা। ইরানকে দরকার মুক্তচিন্তার জানালা আরও খোলা রাখা; বাংলাদেশকে দরকার মান, জবাবদিহি ও দক্ষতার ভিত মজবুত করা। ইরানকে প্রশ্ন করতে হবে, আদর্শ কি অনুসন্ধানকে শ্বাস নিতে দিচ্ছে? বাংলাদেশকে প্রশ্ন করতে হবে, বিস্তার কি শেখাকে গভীর করছে? দুই দেশেরই প্রশ্ন করতে হবে, সনদ কি সত্যিই শিক্ষার প্রতিফলন, না শুধু কাগজের মুখোশ?

শেষ বিচারে, ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাস দুই ভিন্ন ভাষার দুই দীর্ঘ কবিতা। এক কবিতায় মরু, গম্বুজ, আগুন, ফারসি পাণ্ডুলিপি ও বিপ্লবের স্লোগান; অন্য কবিতায় নদী, বিহার, টোল, মক্তব, বাংলা ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ ও কাঁচা রাস্তার স্কুলঘর। কিন্তু দুই কবিতার অন্তিম প্রার্থনা এক: মানুষ যেন জ্ঞানী হয়, সৎ হয়, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে, নিজের সমাজকে উন্নত করে, আর ভবিষ্যৎকে শুধু কাগজে নয়, চরিত্রে নির্মাণ করে। শিক্ষা যদি এই কাজটি করতে পারে, তবে ইরানের প্রাচীন পারস্য-আত্মা এবং বাংলাদেশের নদীমাতৃক মানবিক চেতনা, উভয়ই নতুন শতাব্দীর আলোয় নতুন অর্থ পাবে।

শেষকথা: আয়নার সামনে বাংলাদেশ

ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার জয়যাত্রা এক বিস্ময়। যেখানে বিশ্ব অস্ত্র ও তেলের দিকেই তাকিয়েছিল, সেখানে ইরান কাঁপিয়েছে বিজ্ঞানের দরবার। তারপরও বিদেশি নিষেধাজ্ঞার চাপ ও অন্তর্দ্ব›দ্ব ইরানের শিক্ষার সব ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে। সকল অগ্রগতি সত্ত্বেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতার প্রশ্ন রয়েই গেছে।

বাংলাদেশের জন্য ইরান কোনো 'আদর্শ' নয়, কিন্তু একটি 'কৌশলগত কেস স্টাডি' হতে পারে। আমরা হয়তো সবার জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা বা জেন্ডার সমতা বা বিজ্ঞান গবেষণায় বিনিয়োগের নীতি ইরানের মতো বাস্তবায়ন করতে পারি—যদি চাই।

আমরা কি চাই? নাকি বরাবরের মতো পরিকল্পনায় শুধু মুখর থাকব, বাস্তবে পিছিয়ে?

প্রথম পর্ব এখানে থামে। পরবর্তী পর্বে আমরা গভীরে যাব—বিপ্লব উত্তর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শিক রূপান্তর, ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া ও আধুনিক চ্যালেঞ্জ।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

বিদ্র: এই ফিচারটি সিরিজের প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্বের জন্য অপেক্ষা করুনযেখানে আমরা ১৯৭৯ বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষানীতি পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ যাচাই করব

Keywords: ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা, বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের অগ্রগতি, ইরান বাংলাদেশ শিক্ষা তুলনা

#ইরান_শিক্ষা_সাফল্য #নিষেধাজ্ঞার_জয়গান #বাংলাদেশ_করণীয় #নারীশিক্ষা_ইরান #TVET_সংস্কার #বিজ্ঞান_গবেষণা #স্থানীয়_উদ্ভাবন #ফিচার_সিরিজ_প্রথম #বাংলাদেশ #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষাসংস্কার #ইরানের_শিক্ষা #বাংলাদেশের_শিক্ষা #নিষেধাজ্ঞা #অদম্য_প্রগতি #শিক্ষার_নদী #তুলনামূলক_বিশ্লেষণ #শিক্ষানীতি #উচ্চশিক্ষা #বিজ্ঞান_ও_প্রযুক্তি #গবেষণা #নারীশিক্ষা #কারিগরিশিক্ষা #TVET #দক্ষতা_উন্নয়ন #স্থানীয়_উদ্ভাবন #আত্মনির্ভরতা #জাতীয়_নিরাপত্তা #শিক্ষার_মান #সনদ_নয়_দক্ষতা #অধিকারপত্র #শিক্ষাসংস্কার_ধারাবাহিক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: