odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 30th April 2026, ৩০th April ২০২৬
জাল সনদের টাইম মেশিন, কাগুজে সততার মলাট, কচ্ছপ-গতির ফাইল আর শ্রেণিকক্ষের নৈতিক বিপর্যয়ের রম্য-করুণ বিবরণ

আজব কারিগরের শিক্ষা কারখানা — জাল সনদের মহাকাব্য : শিক্ষার অন্দরমহলে অনাচারের হরিলুট— এক রম্য-তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ (পূর্ব প্রকাশের পরে)

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ১৮:৪০

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ১৮:৪০

দুই পর্বে জাল সনদে শিক্ষকতা-এর দ্বিতীয় পর্ব অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

“আজব কারিগরের শিক্ষা কারখানা — জাল সনদের মহাকাব্য” শিরোনামে দুই পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সনদ জালিয়াতির ভয়াবহতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, কাগুজে ইনটিগ্রিটি পলিসির শূন্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক ঝুঁকির রম্য-ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ। জাল সনদে শিক্ষকতা কেবল ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়; এটি শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পাসপোর্টের মর্যাদা এবং জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত করা এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক রোগ। এই লেখায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে: দায়ী কে? শুধু জাল সনদধারী শিক্ষক, নাকি সেই ব্যবস্থা, যেখানে যাচাই ঘুমায়, ফাইল হাঁটে কচ্ছপের গতিতে, আর নীতিমালা থাকে আলমারির শোপিস হয়ে? লালনের “সময় গেলে সাধন হবে না” দর্শনকে সামনে রেখে লেখাটি নীতিনির্ধারক, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক এবং জেন-জি প্রজন্মকে সতর্ক করে বলছে, এখনই সনদ যাচাই, জবাবদিহি, গবেষণাভিত্তিক নীতি, দৃশ্যমান শাস্তি এবং নৈতিক পুনর্জাগরণের পথে হাঁটতে হবে।

Keywords: জাল সনদে শিক্ষকতা, শিক্ষক সনদ জালিয়াতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অনলাইন সনদ যাচাই

প্রাককথন: মাওলার কারিগরি শিক্ষার গোলকধাঁধা

মাওলা যে কত বড় কারিগর, তা বুঝতে এখন আর ঊর্ধ্বাকাশে তাকানোর প্রয়োজন পড়ে না। সোজা আমাদের শিক্ষা ভবনের সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালেই আপনি ভিরমি খেয়ে বলতে বাধ্য হবেন— ‘মাবুদ, এ তুমি কী আজব কারিগর বানালে!’ পৃথিবীতে কত রকমের কারিগরি আছে—কেউ লোহা পিটিয়ে তলোয়ার বানায়, কেউ মাটি দিয়ে পুতুল। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ভবনের কারিগররা রক্ত-মাংসের মানুষ দিয়ে আস্ত ‘জিপিএ-৫’ মার্কিং করা রোবট আর জাল সনদের জাদুকর বানাতে যে মুন্সীয়ানা দেখাচ্ছেন, তা নাসা-ও ভাবার সাহস পাবে না। আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থাটা অনেকটা সেই আজব কলের মতো, যেখান থেকে শর্ষে ঢোকালে তেল বের হওয়ার কথা থাকলেও, বের হয় ভেজাল পচা ঘি। এখানে জালিয়াতি কোনো ‘ভুল’ নয়, বরং এটা হলো ‘পিএইচডি’ পর্যায়ের একটি নিরন্তর গবেষণার বিষয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার অসাধু রসিকতা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বছরের পর বছর ধরে এক ধরনের অসাধু রসিকতা চলেছে। রসিকতা বলছি, কারণ ঘটনাগুলো এতই অদ্ভুত, এতই বেদনামিশ্রিত এবং এতই অবিশ্বাস্য যে, এগুলোকে শুধু দুর্নীতি বললে যেন ভাষার মর্যাদা কমে যায়। প্রকাশিত তথ্য ও আলোচনার ভাষ্যে দেখা যাচ্ছে, এক হাজারের বেশি শিক্ষকের সনদ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এনটিআরসিএর ভুয়া সনদ ব্যবহার, দীর্ঘদিন জাল সনদে শিক্ষকতা, যাচাইয়ের নামে বছরের পর বছর ফাইলের ঘুম, আর কাগজে-কলমে সততার নীতিমালা, সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত প্রশাসনিক কৌতুকনাট্য।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস একবার তীব্র ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন, জালিয়াতিতে বাংলাদেশ যেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কথাটি শুনতে কৌতুকের মতো লাগলেও এর ভেতরে আছে এক নির্মম আত্মসমালোচনা। কারণ, কাগজে আমাদের আছে ইনটিগ্রিটি পলিসি, সততার শপথ, নৈতিকতার ভাষণ, স্বচ্ছতার পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে কোথাও কোথাও দেখা যায়, নীতির মলাটের ভেতর উইপোকার সংসার। প্রশ্ন তাই উঠতেই পারে, দায়ী কে? ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, নাকি সেই দীর্ঘ নীরবতা, যা অন্যায়কে দেখেও দেখেনি?

পড়ুন- দায়ী কে? যুগ যুগ ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় রসিকতা —দুই পর্বে জাল সনদে শিক্ষকতা-এর প্রথম পর্ব

উদ্ভাবনী শিল্পকলা: সনদ জালিয়াতের মহাকাব্য

পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন মঙ্গলে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখে, আমাদের কারিগররা তখন গবেষণা করছেন কীভাবে একই সনদে দশ বছর বেতন হালাল করা যায়, কিংবা কীভাবে একজন পুরুষের সনদ ব্যবহার করে দিব্যি নারী শিক্ষক সেজে বছরের পর বছর মাসোহারা পকেটস্থ করা যায়। এটা স্রেফ দুর্নীতি নয়, এটা হলো ‘ইনোভেটিভ আর্ট’ বা উদ্ভাবনী শিল্পকলা! ড. ইউনূস এমনি এমনি জালিয়াতের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বলেননি; এই কারিগরদের একেকজনের হাতে যেন পরশপাথর আছে—ছুঁইলেই আসল নকল হয়ে যায়, আর নকল হয়ে যায় সরকারি ফাইলের ধোপদুরস্ত দলিল।

মজার ব্যাপার হলো, এই আজব কারখানায় জালিয়াত শিক্ষকরাই হলেন আবার নতুন প্রজন্মের ওস্তাদ। ভাবুন তো একবার, মালি যখন গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালে, সেই গাছ কেমন হবে? ঠিক তেমনি, সনদ জালিয়াতের মসিহানিদের কাছে দীক্ষা নিয়ে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে, তারা একবিংশ শতাব্দীতে গিয়ে দেখবে তাদের ঝুলিতে কেবল ‘বিবেকের শূন্যতা’ ছাড়া আর কিছুই নেই। আমাদের পাসপোর্টের মান বিদেশের মাটিতে কেন তলানিতে যাচ্ছে? কারণ, জাল সনদের কারিগররা এমন এক ‘সৃজনশীলতা’র জন্ম দিয়েছে যা কেবল ধ্বংসাত্মক কাজেই খাটানো সম্ভব।

ইনটিগ্রিটি পলিসি বনাম বাস্তবতার নগ্ন রূপ

কাগজে-কলমে ‘ইনটিগ্রিটি পলিসি’ বা সততার মলাট যত চকচকে, বাস্তবে এর ভেতরের হরিলুট ততটাই বীভৎস। ডিআইএ (DIA) সাহেবরা চার বছর ধরে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে করতে যখন ‘ফিনিশিং লাইনে’ পৌঁছান, ততক্ষণে জালিয়াত মাস্টাররা পকেট গরম করে পগারপার। এই যে দীর্ঘ অপেক্ষা, এই যে ভেরিফিকেশনের নামে বছরের পর বছর ফাইল আটকে রাখা—এটাই তো আসল জাদুর খেলা! একজন সত্যিকারের ছাত্র বিশ বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে সার্টিফিকেট পায়, আমাদের এই ‘আজব কারিগর’ শিক্ষকরা তার চেয়েও দামী সনদ বানিয়ে ফেলেন এক রাতেই। এটি কেবল জালিয়াত নয়, এটি এক প্রকার ‘টাইম মেশিন’—যা দিয়ে সরকারি কোষাগারের টাকা থেকে শুরু করে নিজের ক্যারিয়ার, সবটাই অতীত ও ভবিষ্যতের সীমানা পেরিয়ে দখল করে নেওয়া যায়।

জাল সনদ কাগজ নয়, টাইম মেশিন

আসল সনদ অনেকটা পোষা বিড়ালের মতো, সারা জীবন এক কোণে বসে থাকে, কেউ তার খোঁজও নেয় না। কিন্তু জালিয়াতির মসিহানিদের তৈরি সনদ হলো বনের বাঘ। এটি পেতে যেমন সাধনা লাগে, টিকিয়ে রাখতে লাগে তার চেয়েও বড় কেরামতি। একজন সত্যিকারের ছাত্র বিশ বছর পড়াশোনা করে একটি সার্টিফিকেট পায়; কিন্তু আমাদের এই “আজব কারিগর” শিক্ষকরা জালিয়াতির যে একেকটি স্তর পার করেন, তা কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম নয়। ভাবুন তো, ডিআইএ যখন চার বছর ধরে ফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ততদিনে জালিয়াতির সেই “অমর চারাগাছ” মহীরুহ হয়ে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকার ফল পেড়ে ফেলছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা, এই ভেরিফিকেশনের নামে বছরের পর বছর ফাইল আটকে রাখা, এটাই তো আসল জাদুর খেলা। আমি অপার হয়ে ভাবি, এই জাল সনদ তো কেবল এক টুকরো কাগজ নয়; এটি যেন এক একটি টাইম মেশিন। একজন নারী শিক্ষক দিব্যি একজন পুরুষের সনদ ব্যবহার করে দশ বছর পার করে দিচ্ছেন। এ কেবল জালিয়াতি নয়; ব্যঙ্গ করে বললে, এটি লিঙ্গান্তরের এক অতিপ্রাকৃত ডিজিটাল কারিশমা! আমাদের কারিগররা এমনভাবে জাল সনদ বানান যে, সেটি “ভেরিফিকেশন” নামক যন্ত্র-মন্ত্রকেও হার মানায়। বিশবার যাচাই করার পরও যখন জালিয়াতি ধরা পড়ে না, তখন বুঝতে হয় এই জালিয়াতির পেছনে যে গবেষণা হয়েছে, তা কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণাগারের গবেষণাকেও লজ্জায় ফেলতে পারে।

মাওলার কারিগরি আর শিক্ষা ভবনের বিস্ময়

মাওলা যে কত বড় কারিগর, সেটা বুঝতে হলে আপনাকে আর আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। সোজা আমাদের শিক্ষা ভবনের সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালেই ভিরমি খেয়ে বলতে বাধ্য হবেন, “মাবুদ, তুমি সত্যিই এক আজব কারিগর!” দুনিয়ায় কত রকমের কারিগরি আছে। কেউ লোহা পেটায়, কেউ কাঠে নকশা কাটে, কেউ মাটি দিয়ে পুতুল বানায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষার কারিগররা রক্ত-মাংসের মানুষ দিয়ে আস্ত “জিপিএ-৫” মার্কা রোবট আর জাল সনদের জাদুকর বানাতে যে মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছেন, তা নাসাও হয়তো ভাবার সাহস পাবে না।

আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা সেই আজব কলের মতো, যেখানে শর্ষে ঢোকালে তেল বের হওয়ার কথা, অথচ বের হচ্ছে ভেজাল পচা ঘি। এখানে জালিয়াতি কোনো সাধারণ “ভুল” নয়; বরং এটি যেন পিএইচডি পর্যায়ের এক নিরন্তর গবেষণা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন মঙ্গলে যাচ্ছে, আমাদের কারিগররা তখন গবেষণা করছেন কীভাবে একই সনদে দশ বছর বেতন খাওয়া যায়, কিংবা কীভাবে একজন পুরুষের সনদ দিয়ে দিব্যি নারী শিক্ষক সেজে বছরের পর বছর মাসোহারা পকেটস্থ করা যায়। এটা স্রেফ দুর্নীতি নয়; ব্যঙ্গ করে বলতে গেলে, এটি এক ধরনের “ইনোভেটিভ আর্ট” বা উদ্ভাবনী শিল্পকলা। এই কারিগরদের একেকজনের হাতে যেন পরশপাথর আছে। ছুঁইলেই আসল নকল হয়ে যায়, আর নকল হয়ে যায় ঝকঝকে-তকতকে সরকারি ফাইল।

জালিয়াত শিক্ষক কারিগরের ওস্তাদ

মজার ব্যাপার হলো, এই আজব কারখানায় জালিয়াত শিক্ষকরাই আবার কারিগরদের ওস্তাদ। ভাবুন তো একবার, মালি যদি গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালে, সেই গাছের পরিণতি কী হবে? ঠিক তেমনি, সনদ জালিয়াতির এই মসিহানিদের কাছে দীক্ষা নিয়ে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে, তারা একবিংশ শতাব্দীতে গিয়ে দেখবে তাদের ঝুলিতে “বিবেকের শূন্যতা” ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। তারা হয়তো পরীক্ষায় নম্বর পাবে, সার্টিফিকেট পাবে, বক্তৃতায় বড় বড় শব্দ ব্যবহার করবে; কিন্তু সততা, দায়িত্ববোধ আর নৈতিক সাহসের জায়গায় থাকবে এক অদৃশ্য ফাঁক।

আমাদের পাসপোর্টের দাম বিদেশের মাটিতে কেন তলানিতে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও এই জাল সনদের কারখানার ভেতরেই লুকিয়ে আছে। জাল সনদের কারিগররা এমন এক “সৃজনশীলতা”র জন্ম দিয়েছে, যা আলোর কাজে নয়, বরং ধ্বংসাত্মক কাজেই বেশি খাটে। যে মেধা গবেষণাগারে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি যাচ্ছে জাল কাগজ বানানোর টেবিলে। যে দক্ষতা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে লাগার কথা ছিল, সেটি লাগছে ভেরিফিকেশন ফাঁকি দেওয়ার কৌশলে। এ যেন প্রদীপের তেল দিয়ে আগুন লাগানোর মতো এক ভয়ংকর কৌতুক।

কাগজের সততা, ভেতরের হরিলুট

শেষমেশ কথা একটাই, কারিগররা কেবল কাগজের ওপর “ইনটিগ্রিটি পলিসি” বা সততার মলাট লাগিয়ে রেখেছেন, কিন্তু ভেতরে চলছে জালিয়াতির হরিলুট। ডিআইএ সাহেবরা চার বছর ধরে একটি রিপোর্ট বানান, আর ততক্ষণে জালিয়াত মাস্টাররা পকেট গরম করে পগারপার। এই যে আজব সিস্টেম, যেখানে চোরকে বলা হয় “সৃজনশীল উদ্ভাবক” আর জাল সনদকে বলা হয় “যোগ্যতা”, এমন কারিগরি মাওলা ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যাবে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে ঢোকে মানুষ, কিন্তু অনেকেই বের হয় জালিয়াতির মহীরুহ হয়ে।

লালন সাঁই বলে গেছেন, “অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়।” আজকালকার শিক্ষা ব্যবস্থার হাল দেখে কোনো খাঁটি শিক্ষাবিদ যখন চোখ বোজেন, তখন এই গানটি তাঁর কাছে কেবল আধ্যাত্মিক সুর হয়ে আসে না; বরং এক ভয়াবহ “ক্রাইম থ্রিলার” হিসেবে ধরা দেয়। আমি দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে ভাবি, ওহে দয়াময়, তোমার সৃষ্টিতত্ত্বের চেয়েও জাঁদরেল কারিগর দেখি আমাদের এই মর্ত্যের শিক্ষা ভবনে বসে আছে! যে দেশে আসল সনদ বানাতে লাগে ঘাম, মেধা ও সময়, সেখানে জাল সনদ বানাতে লাগে দুর্ধর্ষ মেধা, অপার্থিব নেটওয়ার্ক এবং নির্লজ্জ সাহস। ভাবুন তো একবার, একটা আসল কাগজের চেয়ে একটা নকল কাগজের ক্ষমতা কত বেশি হয়ে উঠেছে!

শ্রেণিকক্ষের বিমূর্ত নাট্যমঞ্চ

হে দয়াময়, তোমার দুনিয়ায় সবাই মুখে সত্যের উপাসনা করে; কিন্তু আমাদের এই আজব কারখানায় জালিয়াতিই যেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে শিক্ষক নিজে জাল সনদের নৌকায় চড়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, তিনি যখন ক্লাসে গিয়ে “সদা সত্য কথা বলিবে” শেখান, তখন সেই ক্লাসরুম এক বিমূর্ত নাটকের মঞ্চে পরিণত হয়। ছাত্ররা বই দেখে, শিক্ষক দেখে, বোর্ড দেখে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দেখে আচরণ। শিক্ষক যদি নিজের জীবনেই অসততার সনদ ঝুলিয়ে রাখেন, তাহলে তাঁর মুখের নীতিবাক্য ছাত্রদের কাছে কেবল নাটকের সংলাপ হয়ে থাকে। আমরা এখন এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে “আসল” মানেই যেন পচা-গলা পুরোনো ব্যবস্থা, আর “নকল” মানেই প্রচণ্ড উদ্ভাবনী শক্তির এক ডিজিটাল বিস্ফোরণ। আমি ভাবি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি, হে দয়াময়, এই আজব কারিগরদের তুমি কবে ধরবে? নাকি এরা জালিয়াতির বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের মেডেল গলায় ঝুলিয়েই পরপারে পাড়ি দেবে?

শিক্ষা ব্যবস্থায় চেপে বসা দুর্নীতির ভূত: সনদ জালিয়াতির ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

  • . আধুনিক ভূতের আবির্ভাব: শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাড়ে যে দুর্নীতির ভূত চেপে বসেছে, সে আর গ্রামের পুরোনো বটগাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা নিরীহ ভূত নয়। এ ভূত বেশ আধুনিক। তার হাতে ল্যাপটপ, পকেটে সিল-মোহর, মুখে উন্নয়নের বুলি, আর বগলে কয়েকখানা চকচকে সনদ। রাতের অন্ধকারে সে আর শ্মশানে ঘোরে না; ঘোরে নিয়োগ বোর্ডে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, দপ্তরের ফাইলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, এমনকি বিদেশগামী তরুণের পাসপোর্টের পাতায়ও। আগে ভূত দেখলে মানুষ দৌড়াত। এখন ভূত নিজেই চেয়ার টেনে বসে বলে, “যোগ্যতা পরে দেখা যাবে, আগে কাগজটা ঠিক করি।” এই কাগজ ঠিক করার খেলাই আজ সনদ জালিয়াতি নামে এমন এক রম্য-করুণ নাট্য মঞ্চস্থ করছে, যেখানে দর্শক হাসতে হাসতে শেষে বুঝতে পারে, নিজের ভবিষ্যতের পকেটটাই কাটা গেছে।
  • . একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জে সাজানো জাতি, প্রস্তুত জাতি নয়: একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যেখানে দরকার ছিল চিন্তাশীল মস্তিষ্ক, প্রযুক্তিবোদ্ধা তরুণ, নৈতিক সাহস, গবেষণার সংস্কৃতি, ভাষা ও বিজ্ঞানের দক্ষতা, সেখানে আমরা অনেক জায়গায় সাজিয়ে রেখেছি সনদের কাঁচের আলমারি। আলমারি খুললেই ডিগ্রি বের হয়, কিন্তু মাথা খুললে চিন্তা বের হয় না। যেন কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে বন্দুকের বদলে বাঁশের লাঠিতে সোনালি রং করে বলছে, “দেখতে তো বেশ অস্ত্রের মতোই!” পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু সংকট, সাইবার নিরাপত্তা, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, মহাকাশ গবেষণা আর উদ্ভাবনের দৌড়ে ছুটছে, তখন সনদ জালিয়াতির এই ভূত আমাদের পিঠে বসে কানে কানে বলছে, “এত কষ্ট করে শেখার কী দরকার, একটা কাগজ হলেই তো হলো।” ফলে জাতি প্রস্তুত হচ্ছে না, সাজছে মাত্র। আর সাজগোজ দিয়ে বিয়ের মঞ্চে ওঠা যায়, কিন্তু ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া সেতু বানানো যায় না, হাসপাতালের ভুল রিপোর্ট ঠিক করা যায় না, কিংবা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার টেবিলে সম্মানের সঙ্গে বসা যায় না।
  • . জালিয়াত শিক্ষকের হাতে অসৎ প্রজন্মের আশঙ্কা: সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যটি দেখা যায় শ্রেণিকক্ষে। সেখানে যদি শিক্ষকই হন জাল সনদের যাত্রী, তবে তিনি জ্ঞানের ফেরিওয়ালা নন, বরং নকল মুদ্রার দোকানি। তাঁর হাতে যে প্রজন্ম তৈরি হবে, তারা শিখবে গণিতের সূত্রের চেয়েও সহজ এক সূত্র: “যোগ্যতা না থাকলেও চলবে, পথ জানলেই হবে।” শিশুরা বইয়ের অক্ষর থেকে যত না শেখে, শিক্ষকের আচরণ থেকে তার চেয়ে বেশি শেখে। যে শিক্ষক নিজের জীবনের প্রথম পাঠেই প্রতারণাকে পাস করিয়েছেন, তিনি ছাত্রের খাতায় সততার নম্বর দেবেন কীভাবে? এটা অনেকটা এমন, চোরকে তালা বানানোর কারখানার প্রধান করে দেওয়া হলো, তারপর আশা করা হলো ঘরে আর চুরি হবে না। জালিয়াত শিক্ষকের হাতে তৈরি প্রজন্ম তাই কেবল দুর্বল হবে না, ধীরে ধীরে অসৎ ও সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠতে পারে। তারা ভাববে, পরিশ্রম বোকাদের কাজ, শর্টকাটই বুদ্ধিমানের রাস্তা। আজ যে ছাত্র নকল সনদের গল্প শুনে হাসে, কাল সে নকল প্রকল্প, নকল ওষুধ, নকল গবেষণা, নকল নীতি, এমনকি নকল দেশপ্রেম তৈরি করতেও কুণ্ঠিত হবে না।
  • . পাসপোর্টের পাতায় সন্দেহের ছায়া: এই সনদ জালিয়াতির বিষ শুধু দেশের ভেতরেই ঘুরে বেড়ায় না, তা পাসপোর্টের পাতায় চেপে বসে বিদেশের ইমিগ্রেশন কাউন্টারেও গিয়ে দাঁড়ায়। একজন সত্যিকারের মেধাবী, পরিশ্রমী, নির্দোষ বাংলাদেশি যখন বিদেশে পড়তে, কাজ করতে বা সম্মেলনে যেতে চান, তখন তাঁর কাগজও সন্দেহের চশমায় দেখা হয়। কারণ কয়েকজন জালিয়াতের কারণে পুরো জাতির নথিপত্র যেন আদালতে দাঁড়ানো অভিযুক্তের মতো হয়ে যায়। আগে যেখানে পাসপোর্ট মানে ছিল পরিচয়, এখন অনেক জায়গায় তা হয়ে উঠতে পারে প্রশ্নের খাতা। “আপনার সনদ সত্যি তো? আপনার অভিজ্ঞতা আসল তো? আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কি যাচাই করা?” এই সন্দেহের ধোঁয়া একবার উঠলে তা সহজে নামে না। বিদেশে বাংলাদেশের ভিসা ও পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা কমে গেলে ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়, ক্ষতি জাতীয় মর্যাদারও। যে দেশের তরুণ সত্যিকারের যোগ্যতা নিয়ে দুনিয়ার দরজায় কড়া নাড়ে, তাকেও তখন জাল কাগজের বাজারের দায় কাঁধে নিয়ে দাঁড়াতে হয়। এ যেন পাড়ার এক লোক দুধে পানি মেশাল, আর পুরো গ্রামের গাভীরাই বদনাম খেল।
  • . সৃজনশীলতার আলো যখন অন্ধকারের সরঞ্জাম হয়: আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো, সৃজনশীলতা যেখানে আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, সেখানে তা অনেক সময় ধোঁয়ার মতো অন্ধকার বানাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের তরুণেরা অসাধারণ মেধাবী। তারা দ্রুত শেখে, প্রযুক্তি বোঝে, পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু সেই মেধা যদি নৈতিকতা ছাড়া বড় হয়, তবে তা প্রদীপ নয়, আগুন। যে হাত সফটওয়্যার বানাতে পারত, সে জাল সনদের টেমপ্লেট বানায়। যে মস্তিষ্ক গবেষণাপত্র লিখতে পারত, সে প্লেজিয়ারিজম ঢাকার কৌশল শেখে। যে কল্পনা নতুন শিল্প, নতুন উদ্যোগ, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারত, তা ব্যবহৃত হয় সিল, স্বাক্ষর, ডেটাবেস ও যাচাইকরণ পদ্ধতি ফাঁকি দেওয়ার কারখানায়। সৃজনশীলতা তখন কবির বাঁশি নয়, তালাচাবি ভাঙার সরঞ্জাম। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে যে, একটি জাতির উদ্ভাবনী শক্তি ভবিষ্যৎ নির্মাণের বদলে ভবিষ্যৎ নষ্ট করার কাজে নিযুক্ত হয়?
  • . জাল সনদ মঞ্চসজ্জা নয়, জীবনের ওপর জুয়া: সনদ জালিয়াতির ভূতকে অনেকেই ছোটখাটো দুষ্টুমি মনে করেন, যেন পাড়ার নাটকে নকল গোঁফ লাগিয়ে জমিদারের চরিত্রে অভিনয়। কিন্তু বাস্তব জীবনের সনদ কোনো মঞ্চসজ্জা নয়। এটি রোগীর শয্যার পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসকের বিশ্বাস, সেতুর নকশা করা প্রকৌশলীর দায়িত্ব, শিশুর মনের ভেতর আলো জ্বালানো শিক্ষকের নৈতিকতা, আদালতে সত্য প্রতিষ্ঠার আইনজ্ঞের যোগ্যতা, রাষ্ট্র চালানোর প্রশাসকের সততা। এখানে নকল মানে শুধু কাগজের মিথ্যা নয়, মানুষের জীবনের ওপর জুয়া খেলা। একটি জাল সনদ একদিন জাল সিদ্ধান্ত তৈরি করে, জাল সিদ্ধান্ত একদিন বাস্তব দুর্ঘটনা ঘটায়, আর সেই দুর্ঘটনার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আমরা বলি, “এমন হলো কী করে?” অথচ ভূতটি তখনও ঘাড়ে বসে খিলখিল করে হাসে, কারণ তাকে নামানোর সাহস আমরা আগে দেখাইনি।
  • . ভূত তাড়াতে ওঝাগিরি নয়, দরকার জবাবদিহি: শিক্ষা ব্যবস্থার এই ভূত তাড়াতে কেবল ধূপধুনা, বক্তৃতা, কমিটি আর ফাইলের ওঝাগিরি যথেষ্ট নয়। দরকার সত্যিকারের যাচাই, কঠোর জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা, নিয়োগে সততা, প্রতিষ্ঠানের নৈতিক সাহস এবং সামাজিকভাবে জালিয়াতিকে ঘৃণা করার অভ্যাস। কারণ দুর্নীতির ভূত তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ তাকে ভয় পায় না, বরং সুবিধার জন্য একটু জায়গা করে দেয়। সে প্রথমে বলে, “শুধু একবার।” তারপর বলে, “সবাই তো করে।” শেষে বলে, “এটাই নিয়ম।” আর নিয়ম যখন অনিয়মের হাতে বন্দি হয়, তখন বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজলেও শিক্ষা জাগে না, শুধু কাগজের শব্দ হয়।
  • . ভবিষ্যতের ঝুঁকি দেয়ালে ডিগ্রি, ভেতরে শূন্যতা: ভবিষ্যতের ঝুঁকি তাই স্পষ্ট। সনদ জালিয়াতি চলতে থাকলে আমরা এমন এক সমাজের দিকে হাঁটব, যেখানে দেয়ালে ডিগ্রি ঝুলবে, কিন্তু কাজে দক্ষতা থাকবে না; মুখে নীতি থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্তে সততা থাকবে না; পাসপোর্ট থাকবে, কিন্তু বিশ্বাস কমে যাবে; মেধা থাকবে, কিন্তু তা ভুল পথে ব্যবহৃত হবে। একদিন হয়তো শিশুরা রচনা লিখবে, “আমার জীবনের লক্ষ্য”, আর নিচে লিখবে, “সঠিক সুযোগ পেলে শর্টকাটে সফল মানুষ হব।” সেই দিনটি আসার আগেই ঘাড়ের ভূতটিকে নামাতে হবে। কারণ শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে জাল সনদ সেই মেরুদণ্ডে ঢুকে পড়া ঘুণপোকা। বাইরে মানুষ সোজা দাঁড়িয়ে আছে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কাঠ ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। আর ফাঁপা কাঠে যত রং লাগানো হোক, ঝড় এলে তার আসল পরিচয় প্রকাশ পেতেই বাধ্য।

কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে সতর্কবার্তাকচ্ছপ-গতির ফাইল আর জালিয়াতির মহীরুহ

শিক্ষা ভবনের গদিতে আসীন আমাদের দয়ালু কারিগরদের উদ্দেশে আমি এই অভাজন একখানা “সতর্কবার্ষিকী” পেশ করতে চাই। দাদারা, আপনারা যে জালিয়াতির এই মস্ত বড় আজব কারখানা খুলে বসেছেন, যেখানে আসল আর নকলের পার্থক্য করতে করতে একেকটি ফাইলের গায়ে সাদা দাড়ি গজে যাচ্ছে, সেখানে এবার একটু চুন-সুরকি লাগানো দরকার। আপনাদের ওই ধীরলয়ে চলা ডিআইএ ফাইলগুলো অনেকটা সেই কচ্ছপের মতো, যে জালিয়াতির খবর নিয়ে দৌড় শুরু করেছে, কিন্তু ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেখা যায় জালিয়াত মাস্টাররা বেতন-ভাতার সব মালকড়ি নিয়ে রিটায়ারমেন্টে চলে গেছেন।

সাবধান দাদারা! আপনারা যাকে কেবল “কাগজের টুকরো” ভাবছেন, সেই জাল সনদ আসলে একেকটি টাইম-বোমা। এই বোমা যখন ফাটবে, তখন কেবল শিক্ষা ভবন নয়, পুরো জাতির মেরুদণ্ড কড়কড় করে ভেঙে পড়বে। আপনারা ন্যাশনাল ইনটিগ্রিটি পলিসির মলাট দিয়ে জালিয়াতির উইপোকা ঢাকতে চাইছেন, কিন্তু মনে রাখবেন, উইপোকা যখন একবার আলমারিতে ঢোকে, তখন সে আইন আর নিয়ম চেনে না। আপনারা নিয়ম করছেন অনলাইনে সনদ যাচাই করার, কিন্তু আপনাদের ডিজিটাল জানালা দিয়ে তো বাতাসের চেয়ে জালিয়াতির মশাই বেশি ঢুকছে। এই আজব কারিগরির হাত থেকে যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে না বাঁচান, তবে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হবে, যারা অঙ্ক কষবে জালিয়াতির হিসাবে আর ইতিহাস পড়বে জোচ্চুরির অভিধান খুলে।

উটপাখির নীতিমালা আর ফুটো পাসপোর্ট

শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে বলছি, আপনারা কি সেই গল্পের উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে ভাবছেন ঝড় থেমে গেছে? ঝড় তো কেবল শুরু। আপনাদের “নীতিমালা” আর “অ্যাকশন প্ল্যান”গুলো এখন আলমারিতে রাখা শোপিসের মতো, দেখতে সুন্দর কিন্তু কাজের বেলায় ঠনঠন। জালিয়াত শিক্ষকরা যখন ক্লাসে নীতিবিদ্যার বয়ান দেন, তখন দেয়ালগুলোও ভয়ে ঘামতে শুরু করে। মনে রাখবেন, বিদেশের মাটিতে আমাদের লাল-সবুজ পাসপোর্টের ইজ্জত কিন্তু এই জাল সনদের কারণেই ফুটো হয়ে যাচ্ছে। আজ যদি আপনারা কঠোর না হন, তবে আগামী দিনে সার্টিফিকেটের চেয়ে বাজারের লিফলেট বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে। তাই হে দয়াময় কর্তৃপক্ষ, এবার একটু আরামকেদারা ছেড়ে লাঠিটা শক্ত করে ধরুন। জালিয়াতির এই মহাকাব্য আর বাড়তে দেবেন না। দয়া করে এমন এক ভেরিফিকেশন সিস্টেম বানান, যা ফাইল চালাচালির চক্করে পড়ে দম হারাবে না। নতুবা আপনাদের এই “ইনটিগ্রিটি পলিসি” একদিন হাস্যকৌতুকের খোরাক হয়ে ইতিহাসের ডাস্টবিনে জায়গা পাবে। সময় থাকতে যদি ওই আজব কারিগরদের কলকব্জা না থামান, তবে একদিন হয়তো দেখবেন আপনাদের নিজেদের চেয়ারগুলোও জালিয়াতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর আপনারা টেরই পাননি।

আমাদের শিক্ষা সংস্কারের প্রেক্ষাপটে এখনই করণীয়

লালন সাঁইজির এই অমর বাণী—সময় গেলে সাধন হবে না—আমাদের শিক্ষা সংস্কারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল একটি গান নয়, বরং একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যখন জালিয়াতি আর অদক্ষতার চোরাবালিতে আটকে আছে, তখন এই গানের গূঢ় অর্থগুলো নীতিনির্ধারকদের জন্য এক একটি ‘পলিসি গাইডলাইন’ হতে পারে। নিচে লালনের দর্শনের আলোকে শিক্ষা সংস্কার ও সময়ের গুরুত্বের তাৎপর্য তুলে ধরা হলো:

  • . সুযোগের সদ্ব্যবহারদিন থাকতে দ্বীনের সাধন”: শিক্ষা সংস্কারের জন্য এখন এক সুবর্ণ সময় বা ‘মহা জোগ’ চলছে। জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা আর পরিবর্তনের হাওয়া যখন বইছে, তখনই যদি আমরা জালিয়াতিমুক্ত, প্রমাণ-ভিত্তিক (Evidence-based) ব্যবস্থা গড়ে না তুলি, তবে এই সুযোগ আর ফিরে আসবে না। দিন থাকতে যদি আমরা দুর্নীতির আগাছা পরিষ্কার না করি, তবে ভবিষ্যতে কেবল অনুশোচনাই সার হবে।
  • . প্রাতিষ্ঠানিক শুষ্কতাখালে বিলে থাকে না মিল জল শুকালে”: লালন বলছেন, জল শুকিয়ে গেলে যেমন মাছ বা প্রাণ থাকে না, তেমনি একটি শিক্ষা ব্যবস্থার ‘সততা’ ও ‘মান’ যদি শুকিয়ে যায়, তবে সেখানে ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য থাকে না। আজ যে ১,১৫৬ জন জালিয়াত শিক্ষকের কথা আমরা শুনছি, তারা আসলে আমাদের শিক্ষা-জলাশয়ের সেই জল শুকিয়ে ফেলারই কারিগর। মেধার জল শুকিয়ে গেলে কেবল জালিয়াতির ‘শুকনা মোহনা’ পড়ে থাকবে, যা দিয়ে জাতি গঠন সম্ভব নয়।
  • . অসময়ের বাঁধকি হবে আর বাঁধা দিলে শুকনা মোহনা”: যখন পুরো সিস্টেম জালিয়াতির ঘুণপোকায় খেয়ে শেষ করে ফেলবে, তখন বড় বড় ইনটিগ্রিটি পলিসি বা অনলাইন ভেরিফিকেশন দিয়ে কোনো লাভ হবে না। মোহনা শুকিয়ে যাওয়ার পর বাঁধ দেওয়া যেমন বৃথা, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার পর সংস্কারের ‘হাই জাম্প’ দেওয়াও অর্থহীন। তাই সময় থাকতেই জালিয়াতির ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে।
  • . সংস্কারের মহা যোগঅমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়”: শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন যে আঁধার বা ‘অমাবস্যা’ চলছে (জালিয়াতি, দুর্নীতি, আস্থার সংকট), একেই সংস্কারের মাধ্যমে ‘পূর্ণিমা’ বা আলোতে রূপান্তর করার সময়। লালন বলছেন, বিশেষ সময়েই মহা যোগের উদয় হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার জন্য তথ্য-প্রমাণ ভিত্তিক যে কৌশলের (Evidence-based strategy) কথা আপনি বলছেন, সেটাই হলো এই সময়ের ‘মহা যোগ’।
  • . দ্বন্দ্বহীন লক্ষ্যতাহলে আর দ্বন্দ্ব রয় না”: সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে সংস্কার নিয়ে কোনো দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব থাকে না। আমরা যদি আজ কালক্ষেপণ না করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করি, তবে শিক্ষক, অভিভাবক এবং আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তা ঘুচে যাবে।

সনদ জালিয়াতি দুর্নীতির ভূতেদের জন্য বিশেষ নসিহত

  • . উদ্বেগের মেঘে হাস্যরসের বজ্রপাত: আমরা গভীর উদ্বেগ, খানিক বিস্ময়, আর সামান্য ব্যঙ্গমিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দেখলাম, কীভাবে একদল তথাকথিত বুদ্ধিমান মানুষ নিজেদের প্রখর মেধাকে সমাজকল্যাণে নয়, বরং সমাজবিরোধী কৌশলের চরম অপপ্রয়োগে ব্যয় করে প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁদের মস্তিষ্ক ছিল, পরিকল্পনা ছিল, ছক ছিল, সাহসও ছিল। শুধু একটি জিনিসের বড় অভাব ছিল, সেটি হলো নৈতিকতা। কথায় বলে, “চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা।” কিন্তু এই প্রবাদবাক্যের ভেতরেই আছে চোরের চিরন্তন ট্র্যাজেডি। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর কোনো চুরি, কোনো জালিয়াতি, কোনো অপরাধই শেষ পর্যন্ত “পারফেক্ট ক্রাইম” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। চোরের পায়ের শব্দ যতই মোলায়েম হোক, রাত যতই গভীর হোক, তালা যতই নিঃশব্দে খোলা হোক, ভোরের আলোয় একদিন না একদিন মুখোশের সেলাই খুলেই যায়। সনদ জালিয়াতির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যারা ভেবেছিলেন, কাগজে-কলমে কয়েকটি সিল, স্বাক্ষর, নম্বর, নাম আর পদবির কারুকাজ করলেই জীবনের সিঁড়ি লাফ দিয়ে উঠে যাওয়া যায়, তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, সিঁড়ি যত নকলই হোক, পা কিন্তু আসল। আর আসল পা যখন নকল সিঁড়িতে পড়ে, তখন পতনের শব্দটি অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়।
  • . শিক্ষাবিদের প্রার্থনা রাষ্ট্রযানের চালক: একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে এবং একজন অনুশীলনকারী মুসলমান হিসেবে আমার দিনের শুরু হয় সুবহে সাদেকের কোমল আলোয়, ফজরের নামাজের মাধ্যমে। দিনের প্রথম প্রার্থনায় আমি বারবার সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ জানাই, হে মালিক, আমাদের এমন একজন সৎ, দক্ষ ও দূরদর্শী চালক দিন, যিনি এই রাষ্ট্রযানকে দুর্নীতির কাদা থেকে তুলে ন্যায়, জবাবদিহি ও মানবিক উন্নয়নের সড়কে নিয়ে যেতে পারেন। আমাদের দরকার এমন একজন নেতৃত্বদায়ী মানুষ, যিনি কেবল বক্তৃতার মঞ্চে দুর্নীতিবিরোধী ভাষণ দেবেন না, বরং নীতি, কাঠামো, প্রশাসন ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে পারবেন। অনেকেই বলেন, আমাদের একজন মাহাথির মোহাম্মদ দরকার। এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি শিক্ষা প্রশাসনকে অন্তত নীতিগতভাবে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করার সাহস দেখাবেন। কিন্তু বিধি বাম। মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা সবই দেখছেন। হয়তো তিনি মুচকি মুচকি হাসছেনও। কেননা আমরা প্রতিদিন প্রার্থনা করি, আর প্রতিদিনই প্রমাণ করি, প্রার্থনার সঙ্গে চরিত্রের তেমন গভীর সম্পর্ক আমরা এখনো স্থাপন করতে পারিনি। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কত সরকার এল, কত সরকার গেল, কত মন্ত্রী এলেন, কত উপদেষ্টা গেলেন, কত কমিশন হলো, কত কমিটি হলো, কত নীতিমালা লেখা হলো। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর যেন আজও নাগালের বাইরে রয়ে গেল। কেন জানি মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা আমাদের ওপর খানিকটা রুষ্ট। হয়তো তিনি বলছেন, “তোমরা আগে নিজেরা মানুষ হও, তারপর মাহাথির চাইতে এসো।”
  • . একই নাটক, নতুন অভিনেতা, পুরোনো মঞ্চ: এই দেশে যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, আমরা একই গল্প, একই দৃশ্যপট, একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেখে যাচ্ছি। চরিত্র বদলায়, অভিনেতা-অভিনেত্রী বদলায়, পোশাক বদলায়, স্লোগান বদলায়, ব্যানারের রং বদলায়, কিন্তু নাটকের কাহিনি বদলায় না। নতুন কেউ ক্ষমতার চেয়ারে বসেন। প্রথম দিনেই তিনি ঘোষণা দেন, দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। দ্বিতীয় দিন বলেন, শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। তৃতীয় দিন বলেন, মেধা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া হবে। চতুর্থ দিন থেকে দেখা যায়, পুরোনো ফাইলের ধুলো ঝাড়ার বদলে নতুন ফাইলের ওপর নতুন ধুলো জমতে শুরু করেছে। আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে যেন এক অদ্ভুত বাক্য চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে, “যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।” ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় মানুষ যে ভাষায় ন্যায়, সততা ও সংস্কারের কথা বলেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসেই সেই ভাষা বদলে যায়। আগে যেখানে তিনি আগুনের মতো জ্বলতেন, পরে সেখানে কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে যান। আগে যেখানে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, পরে সেখানে তিনি তদন্ত কমিটির নরম বালিশে মাথা রেখে বলেন, “দেখা হচ্ছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এই “ব্যবস্থা নেওয়া হবে” বাক্যটি আমাদের প্রশাসনিক সাহিত্যের এক অপূর্ব কবিতা। এর শুরু আছে, মাঝখান আছে, কিন্তু শেষ নেই।
  • . দরবেশ, দপ্তর দুর্নীতির অলৌকিক কাব্য: শিক্ষা খাতে যখন প্রকৃত সংস্কারের প্রয়োজন, তখন আমরা অনেক সময় দেখি, পেশাদার শিক্ষাবিদ, শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানী, পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞ, মূল্যায়ন গবেষক ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাশে সরিয়ে দিয়ে একদল তথাকথিত দরবেশকে আহ্বান করা হয়। তাঁদের পরিচয় রহস্যময়, তাঁদের যোগ্যতা অলৌকিক, তাঁদের আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। তাঁরা এসে বলেন, “হক মাওলা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” তারপর দেখা যায়, ধ্যানভঙ্গের ক্ষতিপূরণ বাবদ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কিংবা শিক্ষা খাতের বিভিন্ন স্তর থেকে কোটি কোটি টাকার হিসাব অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা হতে থাকে। কোথাও চারশ কোটি, কোথাও সাতশ কোটি, কোথাও আরও অজানা অঙ্ক। সংখ্যাগুলো যেন ছায়ার মতো ঘোরে, আর সাধারণ মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। শিক্ষার কর্তা ব্যক্তিরা প্রথমে লম্ফঝম্প করেন। তাঁরা টেবিল চাপড়ান, মাইক্রোফোন কাঁপান, নীতির ভাষায় নৈতিকতার ফুলঝুরি ছড়ান। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা যায়, সেই নৈতিকতার ফুল শুকিয়ে গেছে, আর দুর্নীতির লতাগুল্ম প্রশাসনিক জানালা বেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আমরা আসলে দুর্নীতির এমন এক দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি, যেখানে প্রত্যেক নতুন ঘোষণাই প্রথমে আশার প্রদীপ জ্বালায়, তারপর কিছুদিনের মধ্যে সেই প্রদীপের তেল কে খেয়ে ফেলল, সেটি খুঁজতে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। জাতির বুক ভরা প্রত্যাশা আবার ভাঙে। ব্যক্তির হৃদয় ভাঙে। আর ভাঙা হৃদয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বক্তৃতা শুরু হয়।
  • . কাবার মালিক সব দেখছেন: অদ্ভুত বিষয় হলো, যাঁরা শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকেন, তাঁরা অনেক সময় ভুলে যান যে কেবল মানুষ নয়, সৃষ্টিকর্তাও দেখছেন। সভাকক্ষের দরজা বন্ধ থাকলেও দেখা বন্ধ হয় না। ফাইলের নোটশিটে ভাষা যতই সুশৃঙ্খল হোক, নিয়তের অক্ষর কিন্তু আড়াল করা যায় না। আমার মনে হয়, শিক্ষা কর্তা ব্যক্তি, প্রশাসক ও ব্যবস্থাপকদের হেঁয়ালি, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অবহেলার কারণে অসংখ্য স্বপ্নচারী তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীর মন ভেঙে যায়। তারা মেধা নিয়ে আসে, শ্রম নিয়ে আসে, স্বপ্ন নিয়ে আসে। তারপর দেখে, যোগ্যতার সিঁড়ির পাশে আরেকটি গোপন লিফট আছে, যেখানে ওঠার জন্য মেধা লাগে না, লাগে সংযোগ, সুপারিশ, সনদ জালিয়াতি অথবা অনৈতিক লেনদেন। এই দৃশ্য তরুণ প্রজন্মের ভেতরে আগুন ধরায়। বঞ্চনার আগুন। অপমানের আগুন। অবিশ্বাসের আগুন। যে তরুণ একদিন দেশের জন্য কাজ করতে চেয়েছিল, সে একদিন দেশকেই সন্দেহ করতে শেখে। যে তরুণ একদিন শিক্ষাকে মুক্তির পথ ভাবত, সে দেখে শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরেই অন্যায়ের গর্ত খোঁড়া। মানুষের মন ভাঙা সহজ কাজ নয়। আর মানুষের মন ভাঙার দায়ও ছোট দায় নয়। আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক চেতনায় মানুষের হৃদয়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাই কোনো প্রশাসনিক দুর্নীতি যখন হাজারো তরুণের আশা ভেঙে দেয়, তখন সেটি কেবল আর্থিক অপরাধ থাকে না; সেটি নৈতিক অপরাধে পরিণত হয়।
  • . মাথা পবিত্র না হলে শরীর সুস্থ হয় না: কথায় বলে, মাথা ঠিক থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে। রাষ্ট্রও তেমনই। শিক্ষা প্রশাসনও তেমনই। মাথায় যদি স্বচ্ছতা থাকে, নিচের স্তরগুলোতে শৃঙ্খলা নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর মাথাতেই যদি পচন ধরে, তাহলে নিচের দেহে ওষুধ মাখিয়ে লাভ কম। দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা প্রশাসন গড়তে হলে আমাদের এমন নেতৃত্ব দরকার, যিনি মাথা হিসেবে থাকবেন শতভাগ নয়, যেন এক হাজার দুইশ ভাগ পুতপবিত্র। এখানে “পবিত্রতা” বলতে কেবল ধর্মীয় ধার্মিকতার বাহ্যিক রূপ বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে নৈতিক সাহস, পেশাগত সততা, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা, আত্মীয়করণ থেকে মুক্ত মন, এবং ব্যক্তিগত লাভের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু এখানেই আমার নিজের প্রশ্ন আমার নিজের বুকেই ফিরে আসে। আমরা কতদিন একজন মাহাথির মোহাম্মদের অপেক্ষায় থাকব? কতদিন কোনো দেবদূতের আগমনের জন্য রাষ্ট্রীয় দরজায় মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকব? কতদিন ভাবব, কেউ একজন আসবেন, পরশপাথর ছুঁইয়ে দেবেন, আর রাতারাতি দুর্নীতির লোহা সততার সোনায় পরিণত হবে? বাস্তবতা হলো, কোনো একক নায়ক এসে জাতিকে উদ্ধার করবেন, এই ভাবনা নিজেই কখনো কখনো অলসতার আশ্রয়। নেতৃত্ব দরকার, কিন্তু জনগণের নৈতিক অংশগ্রহণও দরকার। প্রশাসনিক কাঠামো দরকার, কিন্তু সামাজিক জবাবদিহিও দরকার। আইন দরকার, কিন্তু আইনের প্রয়োগের সাহস আরও বেশি দরকার।
  • . আশার ভেলা সতর্কতার শঙ্খধ্বনি: তবুও আশা ছাড়ার সুযোগ নেই। কথায় আছে, আশা মানুষের চিরন্তন ভেলা। ইংরেজিতে বলা হয়, “Hope is the eternal spring of the human mind.” মানুষ আশাতেই বাঁচে। কিন্তু অন্ধ আশা নয়, কর্মমুখী আশা চাই। হাত গুটিয়ে বসে থাকা আশা নয়, সম্মিলিত উদ্যোগের আশা চাই। এখন সময় এসেছে সম্মিলিতভাবে সতর্ক হওয়ার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, নিয়োগ কর্তৃপক্ষ, যাচাইকারী সংস্থা, শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজ, সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন। সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে যারা চাকরি, পদ, বেতন, সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, জাল সনদের আয় শেষ পর্যন্ত বিষফলের মতো ফিরে আসে। যারা ধরা পড়বেন, তাঁদের শুধু চাকরি হারালেই হবে না; অনৈতিকভাবে গ্রহণ করা বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সুদে-আসলে ফেরত দেওয়ার দাবি উঠবে। আইনি দায় থাকবে, প্রশাসনিক দায় থাকবে, সামাজিক দায় থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবার, সমাজ ও নিজের বিবেকের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। মানুষ ধনী হতে চায়, সফল হতে চায়, সম্মানিত হতে চায়। এতে দোষ নেই। কিন্তু “There is no shortcut way to be rich” কথাটি আমাদের হৃদয়ে লিখে রাখা উচিত। শর্টকাট পথ কখনো কখনো দ্রুত নিয়ে যায়, কিন্তু কোথায় নিয়ে যায়? সম্মানের মঞ্চে নয়, বরং লজ্জার অন্ধকার ঘরে। সততা ধীরগামী হতে পারে, কিন্তু তার পা মজবুত। অসততা দ্রুতগামী হতে পারে, কিন্তু তার হাঁটু দুর্বল।
  • . বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারচুরি নয়, কল্যাণে: মানুষের বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টিকর্তার এক মহামূল্যবান দান। সেই বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কেউ সেতু বানায়, কেউ বই লেখে, কেউ বিজ্ঞান আবিষ্কার করে, কেউ রোগের ওষুধ খুঁজে পায়, কেউ শিক্ষার্থীর মন খুলে দেয়। আবার কেউ সেই বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সনদ জাল করে, নকল স্বাক্ষর বানায়, তথ্য গোপন করে, সিস্টেমকে ফাঁকি দেয়। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের মেধাকে কোন পথে ব্যবহার করব? চুরিবিদ্যার অন্ধ গলিতে, নাকি মানুষের কল্যাণের প্রশস্ত প্রান্তরে? যে মানুষ জালিয়াতির কৌশল আবিষ্কার করতে পারে, সে চাইলে বৈধ উদ্ভাবনের পথও খুঁজে পেতে পারে। যে মানুষ নকল নথি তৈরি করার মতো সময়, শ্রম ও বুদ্ধি ব্যয় করে, সে চাইলে সত্যিকারের দক্ষতা অর্জন করতে পারত। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় ফল চাই, প্রক্রিয়া চাই না। সম্মান চাই, যোগ্যতা চাই না। চেয়ার চাই, চরিত্র চাই না। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কেবল আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না। শিক্ষাব্যবস্থার গভীর পরিবর্তন দরকার। নৈতিক শিক্ষা, পেশাগত সততা, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এই কাজ কাল নয়, আজই শুরু করতে হবে।
  • . হাতুড়ে চিকিৎসক দিয়ে জাতির বুকে ছুরি: খুব অবাক লাগে, আমাদের দেশে যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান জানানো হয় না। শিক্ষা কর্তা ব্যক্তিদের অনেকেই মনে করেন, তাঁরাই সব জানেন। যেন শিক্ষা একটি দপ্তরি ফাইল, পাঠ্যক্রম একটি অফিস আদেশ, আর শিক্ষার্থী হলো পরিসংখ্যানের টেবিলে বসানো সংখ্যা। কিন্তু শিক্ষা তো শুধু বই ছাপানো নয়। শিক্ষা হলো মন গঠন, চিন্তা তৈরি, মূল্যবোধ নির্মাণ, দক্ষতা বিকাশ এবং নাগরিক চরিত্রের দীর্ঘ সাধনা। এই কাজের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ, পাঠ্যক্রমবিদ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, ভাষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক-প্রশিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সম্মিলিত জ্ঞান। দুঃখের বিষয়, তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করলে যেন অনেকের জাত যায়। যেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ। অথচ বাস্তবতা উল্টো। যে রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞকে সম্মান করে, সে রাষ্ট্র ভুল কম করে। যে প্রশাসন জানে যে সে সব জানে না, সেই প্রশাসন শেখার পথ খোলা রাখে। আমরা আর কতদিন হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে জাতির বুকে ছুরি চালাব? ওপেন হার্ট সার্জারির বিশেষজ্ঞ ঘরে বসে থাকবেন, আর পাশের গলির হাতুড়ে এসে বলবেন, “চিন্তা নাই, আমি সব পারি”, এভাবে কি জাতির মেধা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে পরিচালনা করা যায়?
  • ১০. গিনিপিগ আখ্যান:  কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে অদক্ষ হাতে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো যাবে। শিক্ষা কোনো দরবেশি তাবিজ নয়, যেখানে ফুঁ দিলেই উন্নয়ন ঘটবে। শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, নৈতিক দায়িত্ব এবং সভ্যতার ভিত্তি। এই ভিত্তিতে যদি জাল সনদের ইট, দুর্নীতির বালি আর অবহেলার সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের ভবন একদিন ধসে পড়বেই।
  • ১১. চেতনা দরকার সনদ নয়, সততা মানুষকে বড় করে: সনদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সনদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সততা। ডিগ্রি দরকার, কিন্তু ডিগ্রির চেয়েও দরকার যোগ্যতা। পদ দরকার, কিন্তু পদের চেয়েও দরকার চরিত্র। জেনারেশন জেডকে যারা উপদেশ দিতে চান, তাঁদের আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখা উচিত। যারা নিজেরাই সনদ জালিয়াতি, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকারে হাঁটেন, তাঁদের মুখে তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতা নিয়ে বক্তৃতা বড় বেমানান শোনায়। ভূত যদি ব্রহ্মচার্যের উপদেশ দেয়, শেয়াল যদি হাঁসের নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান হয়, আর জাল সনদের বাহক যদি মেধার গুরুত্ব বোঝায়, তাহলে সমাজে হাসি না কান্না, কোনটি হবে, তা বোঝা কঠিন। তবুও আমরা হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না। আমাদের চাই সৎ নেতৃত্ব, দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছ যাচাইব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞনির্ভর শিক্ষানীতি এবং সামাজিক নৈতিকতার পুনর্জাগরণ। আমাদের চাই এমন শিক্ষা, যা শুধু চাকরি দেয় না, মানুষও তৈরি করে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে সনদ নয়, সততা। পদ নয়, প্রজ্ঞা। সম্পদ নয়, চরিত্র। আর যে জাতি চরিত্রকে হারায়, সে জাতি একদিন সনদের পাহাড় বানিয়েও জ্ঞানের আলো খুঁজে পায় না।

নীতিনির্ধারকদের জন্য পরামর্শ: ভূত তাড়াতে আগে ঘরের মানচিত্র দেখুন

নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত নিবেদন, শিক্ষা ব্যবস্থার এই সনদ-জালিয়াতির ভূতকে তাড়াতে গিয়ে যেন আবার নতুন ভূত আমদানি না হয়। আমাদের দেশে এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে: কোথাও মেঝেতে পানি পড়লে আমরা আগে ছাদ ভাঙতে যাই, পরে দেখি কলটাই খোলা ছিল। নিয়ম বদলানো সহজ, বিজ্ঞপ্তি জারি করা আরও সহজ, কিন্তু সমস্যার আসল ছিদ্র কোথায়, তা খুঁজে বের করা কঠিন। আর কঠিন কাজটাই যদি এড়িয়ে যাই, তবে সংস্কারের নামে শুধু চেয়ার বদলাবে, ভূত কিন্তু একই থাকবে। তাই হুট করে নতুন নিয়ম, নতুন ফরম, নতুন সার্কুলার, নতুন কমিটি বানানোর আগে দরকার তথ্য-উপাত্তের ঠান্ডা মাথার বিশ্লেষণ। কোন পর্যায়ে জাল সনদ ঢুকে পড়ছে, কারা তা যাচাই করছে, কোন দপ্তরে ফাইল ঘুমিয়ে থাকে, কোন অনলাইন পোর্টাল শুধু নামেই অনলাইন, আর কোথায় মানুষের হাতের ফাঁকে দুর্নীতির পিঁপড়া ঢুকে যাচ্ছে, তা আগে স্পষ্ট করে দেখতে হবে। রোগ নির্ণয় না করে ওষুধ দিলে যেমন রোগীর জ্বর কমার বদলে পেট ব্যথা শুরু হয়, তেমনি তথ্য ছাড়া নীতি করলে শিক্ষা ব্যবস্থার মাথাব্যথা কমবে না, বরং নতুন নতুন জটিলতা জন্ম নেবে।

যে কোনো বড় পরিবর্তনের আগে গবেষণা নির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন আর সৌখিনতার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বেঁচে থাকার শর্ত। আমাদের নীতিমালা অনেক সময় এমনভাবে নামে, যেন বজ্রপাত হলো আর সবাই ছাতা খুঁজতে দৌড়াল। অথচ বড় সিদ্ধান্তের আগে ছোট পরিসরে পাইলট প্রকল্প চালিয়ে দেখা যায়, পদ্ধতিটি বাস্তবে কাজ করছে কি না। কাগজে যে ব্যবস্থা সুন্দর, মাঠে তা অনেক সময় হাঁটুতে কাদা মেখে বসে পড়ে। ধরুন, একটি ডিজিটাল সনদ যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হলো। সেটি কি গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ব্যবহার করতে পারবেন? জেলা শিক্ষা অফিসে ইন্টারনেট থাকবে? তথ্যভান্ডার আপডেট হবে? দুর্নীতিবাজ কর্মচারী কি ভেতর থেকে সেটি বদলে ফেলতে পারবে না? এসব না দেখে যদি শুধু উদ্বোধনী ফিতা কাটা হয়, তবে সেটা প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তির মুখোশ। তাই আগে পরীক্ষা, পরে বিস্তার। আগে ফলাফল, পরে ঘোষণা। আগে প্রমাণ, পরে প্রশংসা। নইলে সংস্কারও একদিন দুর্নীতির নতুন জামা পরে এসে বলবে, “আমি কিন্তু আগের ভূত নই, আমি আধুনিক ভূত।”

স্বচ্ছ নজরদারির কথাও আলাদা করে বলা দরকার। অনলাইন ভেরিফিকেশন যদি শুধু ওয়েবসাইটে একটি বক্স, একটি ক্যাপচা আর একটি ঘুমন্ত সার্ভারের নাম হয়, তবে তা জালিয়াতি ঠেকাবে না, বরং জালিয়াতদের নতুন খেলাঘর বানিয়ে দেবে। যাচাই ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত, দ্রুত, নিরাপদ এবং জনবান্ধব করতে হবে। সাধারণ নাগরিক, অভিভাবক, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, বিদেশি দূতাবাস, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দপ্তর যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারে কোন সনদ আসল আর কোনটি কাগজের ছদ্মবেশী প্রতারক। এই ব্যবস্থা যদি চার বছর ধরে “প্রক্রিয়াধীন” থাকে, তবে জালিয়াতরা চার বছরে চারতলা ভবন বানিয়ে ফেলবে। সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থায় ব্লকচেইন লাগুক কি না, কিউআর কোড লাগুক কি না, জাতীয় ডেটাবেসের সঙ্গে সংযোগ লাগুক কি না, সেটা বিশেষজ্ঞরা বলবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা একটাই: এমন দরজা চাই, যেখানে চোর ঢুকতে গেলেই ঘণ্টা বাজবে, আর দারোয়ান ঘুমিয়ে থাকবে না।

কর্তাদের প্রতি বিশেষ নিবেদন: হাই জাম্প নয়, মাটিতে পা রাখুন

শিক্ষা ভবনের দয়ালু কারিগরদের প্রতি আমার সবিনয় নিবেদন, দাদারা, দিদিরা, স্যারেরা, ম্যাডামেরা, মাননীয়ারা! গদিতে বসেই হুটহাট “হাই জাম্প” দেওয়ার অভ্যাসটা এবার একটু কমান। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তো আর অলিম্পিকের ট্র্যাক নয় যে, কোনো গবেষণা বা প্রস্তুতি ছাড়াই এক লাফে আকাশ ছোঁয়ার কসরত করবেন। আপনারা যখন বাছবিচার ছাড়া নতুন নতুন নীতিমালার হাই জাম্প দেন, তখন নিচে পড়ে থাকা সাধারণ ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকরাই চ্যাপ্টা হয়ে যান। এই যে হুটহাট পদ্ধতি বদলানো আর গালভরা বুলি আওড়ানো, এটি অনেকটা সেই আনাড়ি ড্রাইভারের মতো, যে ব্রেক কষার কায়দা জানে না, কিন্তু এক্সিলারেটরে পা দিয়ে দিগ্বিজয় করতে চায়।

এবার একটু থামুন। আকাশকুসুম কল্পনা আর কাগুজে ইনটিগ্রিটি পলিসির হাই জাম্প না দিয়ে মাটির দিকে তাকান। এখন দরকার “এভিডেন্স-বেইজড” বা তথ্য-প্রমাণভিত্তিক কৌশল। যদি ১ হাজার ১৫৬ জন জালিয়াত শিক্ষক সত্যিই আপনার নাকের ডগায় বসে সরকারি কোষাগার সাবাড় করে থাকে, তবে সেটি কোনো আকাশ থেকে পড়া অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি নড়বড়ে নজরদারির অকাট্য প্রমাণ। আপনারা যখন বড় বড় লম্ফঝম্প দেন, তখন এই জালিয়াতরাই অন্ধকারে মই লাগিয়ে আপনাদের ঘরের সিঁদ কাটে। তাই হুট করে নতুন কোনো “বিপ্লব” ঘটানোর আগে দেখুন, অতীতে কোন ফুটো দিয়ে জালিয়াতির ইঁদুর ঢুকেছে।

কবিরাজি দাওয়াই নয়, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা: আসলে আমাদের শিক্ষা প্রশাসন এখন অনেকটা সেই কবিরাজের মতো হয়ে গেছে, যে নাড়ি না টিপেই দাওয়াই লিখে দেয়। আপনারা বড় বড় অঙ্কের প্রকল্প হাতে নেন, কিন্তু সেই প্রকল্পের ফল কী হবে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনেক সময় চোখে পড়ে না। দয়া করে এবার একটু গবেষণার পথে হাঁটুন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে গিনিপিগ বানানো বন্ধ করে তথ্য-উপাত্তের ওপর দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা সাজান। কোন পদ্ধতিতে পড়ালে জালিয়াতি কমবে, কীভাবে সনদ যাচাই করলে দুর্নীতিবাজরা ভয়ে কাঁপবে, কোন পর্যায়ে মানবিক তদারকি দরকার, কোথায় প্রযুক্তি লাগবে, কোথায় শাস্তি দরকার, আর কোথায় প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি, সেই দাওয়াই এখন দরকার। পরিশেষে বলি, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কারিগররা যদি প্রমাণভিত্তিক কৌশল বাদ দিয়ে কেবল আন্দাজে হাই জাম্প দিতে থাকেন, তবে সেই লম্ফঝম্পে একদিন পুরো জাতির মেরুদণ্ডই মটকে যাবে। আপনারা নীতিমালার বড় বড় ফানুস ওড়ান, কিন্তু সেই ফানুসে দুর্নীতির সুঁই লাগলে ধপাস করে পড়তে সময় লাগে না। তাই দোহাই আপনাদের, গালভরা বুলির মায়াজাল বাদ দিয়ে এবার বাস্তবের মাটিতে পা রাখুন। জালিয়াতি থামানোর জন্য চাই ইস্পাত-কঠিন প্রমাণ, বিজ্ঞানসম্মত নজরদারি, দ্রুত যাচাই, দৃশ্যমান শাস্তি এবং নৈতিক সাহস। স্রেফ হুটহাট লাফালাফি দিয়ে এই ভূত নামবে না।

অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশনা: জালিয়াতির হাটে সাবধান

হে সম্মানিত অভিভাবককুল, আপনারা যারা সন্তানদের মানুষ করার জন্য মাসের বাজার ছোট করেন, নিজের শখ গিলে ফেলেন, কোচিং ফি, স্কুলের বেতন, বই, খাতা, পরীক্ষা ফি, ইউনিফর্ম, প্রাইভেট টিউটরের বিল জোগাতে গিয়ে জীবনকে কিস্তিতে ভাগ করে ফেলেন, আপনাদের জন্য এই সময়ের সবচেয়ে জরুরি উপদেশ হলো: চোখ খোলা রাখুন। সন্তানকে ভালো স্কুলে দিলেই কাজ শেষ নয়, ভালো টিউটর রাখলেই দায়িত্ব শেষ নয়, নামী প্রতিষ্ঠানের চকচকে সাইনবোর্ড দেখলেই নিশ্চিন্ত হওয়ার দিনও শেষ। আপনার সন্তানের শিক্ষক সত্যিই জ্ঞানের প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, নাকি জাল সনদের মই বেয়ে উঠা এক সুবিধাবাদী কাগুজে মহারথী, তা অন্তত সামান্য যাচাই করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ যে শিক্ষক নিজের জীবনেই সততার পরীক্ষায় নকল করে পাশ করেছেন, তিনি আপনার শিশুকে সততার পাঠ দেবেন কীভাবে? এটা অনেকটা এমন, পাড়ার কুখ্যাত তালা-ভাঙা লোকটিকে বাড়ির নিরাপত্তা উপদেষ্টা বানিয়ে তারপর আলমারির চাবি তার হাতে তুলে দেওয়া।

শিক্ষকের প্রোফাইল যাচাই করা এখন আর অহংকার বা সন্দেহপ্রবণতার বিষয় নয়, বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার সাধারণ বুদ্ধি। আপনি যেমন শিশুকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার আগে জানতে চান তিনি সত্যিই ডাক্তার কি না, তেমনি শিক্ষক সম্পর্কেও ন্যূনতম খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি কোথায় পড়েছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা কী, প্রতিষ্ঠান তাঁকে কীভাবে নিয়োগ দিয়েছে, তাঁর শিক্ষাদানের ধরন কেমন, তিনি ছাত্রদের চিন্তা শেখান নাকি শুধু মুখস্থের বস্তা কাঁধে চাপিয়ে দেন, এসব জানতে হবে। সন্তান যে মানুষের কাছে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাটায়, তার চরিত্র ও যোগ্যতা সম্পর্কে অভিভাবকের অন্ধ থাকা মানে নিজের হাতে শিশুর মনের দরজা খুলে অচেনা লোককে ভেতরে বসতে দেওয়া। শিক্ষা শুধু অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞান নয়; শিক্ষা হলো চরিত্রের নীরব সংক্রমণ। শিক্ষক যদি অসততার জীবন্ত বিজ্ঞাপন হন, তবে ছাত্রের খাতায় যতই সুন্দর হস্তাক্ষর থাকুক, মনে একদিন শর্টকাটের বাঁকা অক্ষর লিখে যাবে।

আর একটি কথা, সততার পাঠ ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। স্কুল যদি কোনো দিন জালিয়াতির কারখানায় পরিণত হয়, তবে ঘরকে হতে হবে সত্যের দুর্গ। সন্তানকে শেখাতে হবে, জিপিএ-৫ ভালো, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা রাখা তার চেয়েও বড়। পরীক্ষায় নম্বর দরকার, কিন্তু নকল করে পাওয়া নম্বর হলো মাটির হাঁড়িতে সোনার রং। বাইরে থেকে চকচক করবে, ভেতরে একটু চাপ পড়লেই ভেঙে যাবে। শিশুকে এমনভাবে বড় করতে হবে, যেন সে বোঝে যোগ্যতা ছাড়া সাফল্য আসলে ঋণ করা সম্মান, যার সুদ একদিন অপমান হয়ে ফেরত আসে। আজ যে বাবা-মা শুধু ফলাফল দেখে খুশি হন, তারা অজান্তে সন্তানকে শেখান, “যেভাবেই হোক জিততে হবে।” এই “যেভাবেই হোক” কথাটাই একদিন সমাজের সর্বনাশ করে। তাই ফলাফলের সঙ্গে মেধা, মেধার সঙ্গে পরিশ্রম, পরিশ্রমের সঙ্গে সততা, আর সততার সঙ্গে আত্মসম্মানকে জুড়ে দিতে হবে।

জালিয়াতির বাজারে শর্টকাটের দোকান সবসময় খোলা থাকে। সেখানে লেখা থাকে, “কম পরিশ্রমে বেশি সাফল্য”, “সহজ পথে বড় ডিগ্রি”, “নিশ্চিত ফলাফল”, “বিশেষ ব্যবস্থায় ভর্তি”, “প্রশ্নপত্র সাজেশন”, “প্রমাণপত্র প্রস্তুত”। এসব দোকান দেখতে অনেক সময় আলোকিত, ভেতরে এসি, দেয়ালে সার্টিফিকেট, মুখে মিষ্টি কথা। কিন্তু এই বাজারের পণ্য হলো ভবিষ্যৎ নষ্ট করার সরঞ্জাম। অভিভাবক যদি শুধু সামাজিক প্রতিযোগিতার ভয়ে সন্তানকে সেই বাজারে ঠেলে দেন, তবে সন্তান হয়তো কিছুদিন এগিয়ে যাবে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়বে। তাকে শেখাতে হবে, ধীর পথ লজ্জার নয়; নিজের যোগ্যতায় পাওয়া ছোট সাফল্যও ধার করা বড় সাফল্যের চেয়ে মহৎ। কারণ চরিত্রের উপর দাঁড়ানো মানুষ দেরিতে হলেও দূর যায়, আর জালিয়াতির মই বেয়ে ওঠা মানুষ যত উঁচুতেই উঠুক, পায়ের নিচে সবসময় ভাঙা বাঁশের ভয় থাকে।

আমাদের সাধারণ প্রত্যাশা: কাগজের সততা নয়, বাস্তবের প্রতিফলন

সবশেষে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা আকাশ থেকে সোনার বৃষ্টি চায় না, প্রতিটি স্কুলে মহাকাশ গবেষণাগারও চায় না, প্রতিটি দপ্তরে দেবদূত বসুক সেটাও আশা করে না। তারা চায় সামান্য স্বচ্ছতা, সামান্য জবাবদিহি, সামান্য ন্যায়বোধ। তারা চায়, শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা যেন শুধু টেলিভিশনের পর্দায় নীতিমালার ফানুস না ওড়ান। ফানুস দেখতে সুন্দর, কিন্তু বাতাস বদলালেই দিক হারায়। জনগণের প্রত্যাশা হলো এমন ব্যবস্থা, যেখানে সনদ মানে সত্যের দলিল, ডিগ্রি মানে যোগ্যতার পরিচয়, শিক্ষক মানে চরিত্রবান পথপ্রদর্শক, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানে জ্ঞানচর্চার জায়গা, কাগজ তৈরির প্রেস নয়। কাগজের ইনটিগ্রিটি নয়, বাস্তবের প্রতিফলন চাই। সনদে যে নাম লেখা থাকবে, তার পেছনে যেন সত্যিকারের শিক্ষা, পরিশ্রম, দক্ষতা ও নৈতিকতার ছাপ থাকে।

  • প্রথম প্রত্যাশা হলো দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। এমন ব্যবস্থা, যা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকবে না, চার বছর ধরে “পরীক্ষামূলকভাবে চালু” বলে নিঃশ্বাস নেবে না, বরং কয়েক সেকেন্ডেই জাল সনদকে রেড সিগন্যাল দেখাবে। একজন নিয়োগকর্তা, একজন অভিভাবক, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, এমনকি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানও যেন সহজে যাচাই করতে পারে সনদটি আসল কি না। জালিয়াতি তখনই ফুলে-ফেঁপে ওঠে, যখন যাচাই কঠিন, শাস্তি অনিশ্চিত, আর দপ্তরগুলো একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপায়। তাই একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার দরকার, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য নিরাপদভাবে যুক্ত থাকবে। প্রযুক্তি যেন কেবল উদ্বোধনী ব্যানারের ছবি না হয়, বরং প্রতিদিনের কাজের বিশ্বস্ত হাতিয়ার হয়।
  • দ্বিতীয় প্রত্যাশা হলো দৃশ্যমান শাস্তি। জালিয়াত শিক্ষক বা কর্মকর্তা ধরা পড়লে শুধু বদলি, সতর্কীকরণ, বা নরম চিঠির ভদ্র ভাষায় বিষয়টি শেষ করা যাবে না। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে, ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাস নিয়ে যারা প্রতারণা করেছে, তাদের কাছ থেকে জনগণের অর্থ কড়ায়-গণ্ডায় ফেরত নিতে হবে। আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, পেশাগত নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে, এবং সেই শাস্তি এমনভাবে দৃশ্যমান হতে হবে যাতে অন্যরা বুঝতে পারে, জালিয়াতি কোনো দুষ্টুমি নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। সমাজে এক ধরনের হাস্যকর ধারণা তৈরি হয়েছে, “ধরা পড়লে দেখা যাবে।” এই “দেখা যাবে” সংস্কৃতিকে বদলে “ধরা পড়লে ছাড় নেই” সংস্কৃতি আনতে হবে। নইলে জালিয়াতরা হাসতে হাসতে বলবে, “কাগজ নকল করেছি, জীবন তো নকল করিনি।” অথচ বাস্তব হলো, তারা শুধু নিজের জীবন নয়, বহু শিক্ষার্থীর জীবনপথে বিষ ঢেলেছে।
  • তৃতীয় প্রত্যাশা হলো গবেষণা, এভিডেন্স ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখা। পৃথিবীর নানা দেশে সনদ যাচাই, পেশাগত লাইসেন্সিং, ডিজিটাল রেজিস্ট্রি, শিক্ষক নিবন্ধন, চাকরির ব্যাকগ্রাউন্ড চেক, একাডেমিক সততা রক্ষার নানা পদ্ধতি চালু আছে। সেগুলো অন্ধভাবে কপি করার দরকার নেই, কিন্তু কী কাজ করেছে, কী কাজ করেনি, কেন করেছে, কোন বাস্তবতায় করেছে, তা দেখে আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। আন্দাজে হাই জাম্প দিলে পা ভাঙার ঝুঁকি থাকে। তাই তথ্যভিত্তিক সংস্কার, পাইলট প্রকল্প, স্বাধীন মূল্যায়ন, বিশেষজ্ঞ মতামত, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং নাগরিক প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার রোগ বহু পুরোনো, তার চিকিৎসাও হতে হবে গভীর। শুধু মাথায় তেল মেখে জ্বর সারানো যায় না।
  • চতুর্থ প্রত্যাশা হলো দেশের মর্যাদা রক্ষা। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট যেন সন্দেহের কাচের নিচে রাখা পোকা না হয়ে যায়। একজন সত্যিকারের মেধাবী বাংলাদেশি ছাত্র, গবেষক, শ্রমিক, পেশাজীবী বা উদ্যোক্তা যখন বিদেশে যায়, তখন তার সনদ, তার পরিচয়, তার পাসপোর্ট যেন অকারণে অবিশ্বাসের বোঝা না বইতে হয়। কয়েকজন জালিয়াতের কারণে পুরো জাতির কপালে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসে গেলে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় অপমান। তাই সনদ জালিয়াতি বন্ধ করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়; এটি পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রযুক্তি, প্রশাসন, আইন, বিশ্ববিদ্যালয়, বোর্ড, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নৈতিকতার সম্মিলিত প্রশ্ন। জাতির পাসপোর্টের মর্যাদা কেবল কূটনৈতিক ভাষণে বাড়ে না, বাড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে। আর বিশ্বাসযোগ্যতা আসে সত্যিকারের শিক্ষা, স্বচ্ছ যাচাই এবং কঠোর জবাবদিহি থেকে।

শিক্ষা কারখানার কারিগররা যদি এবারও ঘুমিয়ে থাকেন, তবে সাধারণ মানুষ একদিন সেই ঘুম ভাঙাতে তাদের দুয়ারে কড়া নাড়বেই। কারণ সন্তান হারালে মা চুপ থাকে না, ভবিষ্যৎ হারালে জাতিও চুপ থাকবে না। মাওলা হয়তো সব দেখেন, কিন্তু পৃথিবীর হিসাব পৃথিবীতেই মেলাতে হয়। সনদ জালিয়াতির এই মহাকাব্য আর চলতে দেওয়া যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাড়ে বসা দুর্নীতির ভূতকে নামাতে হলে ওঝার ঢোল নয়, দরকার সত্যের আলো, তথ্যের লণ্ঠন, আইনের লাঠি, আর সমাজের সম্মিলিত সাহস। নইলে একদিন দেখা যাবে, দেয়ালে সনদ ঝুলছে, মঞ্চে বক্তৃতা হচ্ছে, ফাইলে অনুমোদন আছে, কিন্তু জাতির ভেতরটা ফাঁপা। আর ফাঁপা জাতি ঝড়ের দিনে টিকে না; সে শুধু নিজের পতনের শব্দ শুনে অবাক হয়।

উপসংহার: শেষ আহ্বান

লালনের এই দর্শনের মূল নির্যাস হলো—প্রো-অ্যাক্টিভ অ্যাকশন। শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে যে, চার বছর ধরে ডিআইএ রিপোর্ট বানানো বা ফাইল চালাচালি করা মানে হলো ‘সময় পার করে দেওয়া’। যখন জালিয়াতি ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়বে, তখন আর কোনো ওষুধ কাজ করবে না।

তাই হে দয়ালু কারিগরগণ, সময় গেলে সাধন হবে না—এই ধ্রুব সত্যকে সামনে রেখে আজই জালিয়াতির মূলে কুঠারাঘাত করুন এবং মেধা ও প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার বীজ বপন করুন। দিন থাকতে সাধন না করলে, আগামীর প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

এ প্রজন্মের প্রিয় জেন-জি (Gen Z), তোমাদের উদ্দেশ্যে আমার এই শেষ বেলার ‘সতর্কবার্তা’। লালন সাঁইজির সেই গানের সুরেই বলি—সময় থাকতে খুব খেয়াল করো, কারণ তোমাদের চারপাশের এই ঝলমলে দুনিয়ার নিচেই কিন্তু জালিয়াতির এক বিশাল গর্ত খোঁড়া হয়েছে। তোমরা যারা ল্যাপটপের কিবোর্ডে ঝড় তোলো আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের স্বপ্ন দেখো, তোমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব যাদের হাতে ছিল, তাদের অনেকেরই ‘ফাউন্ডেশন’ বা ভিত্তি তৈরি হয়েছে জাল সনদের ওপর। তোমরা যখন একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কোমর বাঁধছো, তখন তোমাদের শিক্ষাগুরুদের বড় একটা অংশ জালিয়াতির কারখানায় ডিগ্রি ছাপিয়ে বসে আছে। সময় থাকতে যদি এই সত্যটা না বোঝো, তবে তোমাদের সব দৌড়ঝাঁপ ওই ‘শুকনা মোহনায়’ গিয়ে আছাড় খাবে।

মনে রেখো, সময় গেলে কিন্তু এই জালিয়াতির খেসারত তোমাদেরই দিতে হবে। তোমরা হয়তো ভাবছো, ডিজিটাল বাংলাদেশে সব কিছু হাতের মুঠোয়, কিন্তু তোমাদের অজান্তেই তোমাদের মেধার পাসপোর্ট আর ভিসার গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক বাজারে তলানিতে নামছে। জালিয়াতি যখন সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যায়, তখন মেধার চেয়ে জোচ্চুরির দাম বেড়ে যায়। তোমাদের এই যে সৃজনশীলতা, সেটা যদি এই জালিয়াতির জাঁতাকলে পড়ে ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তোমাদের সব অর্জন কেবল ‘কাগজের ফুল’ হয়ে থাকবে, তাতে কোনো সুবাস থাকবে না। তাই সময় থাকতে খুব খেয়াল করো—কাকে তোমরা আদর্শ মানছো আর কার কাছে দীক্ষা নিচ্ছো।

পরিশেষে বলি, লালনের সেই ‘মহা যোগ’ কিন্তু তোমাদের হাতেই। তোমরা যদি এখনই প্রশ্ন না তোলো, যদি জালিয়াতির এই মসিহানিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হও, তবে অমাবস্যার আঁধার কোনোদিন পূর্ণিমায় রূপ নেবে না। তোমাদের সময়টা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সিস্টেমের এই ‘আজব কারিগরদের’ চোখে চোখ রেখে জবাবদিহিতা আদায় করো। জেন-জি হিসেবে তোমরা অনেক বেশি স্মার্ট, কিন্তু মনে রেখো—স্মার্টনেস আর ইন্টিগ্রিটি (সততা) যখন হাত ধরাধরি করে চলে না, তখন কেবল জালিয়াতির এক অন্ধকার গহ্বর তৈরি হয়। দিন থাকতে এই জালিয়াতির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে না এলে, সময় পার হয়ে গেলে আর কোনো ‘সাধন’ তোমাদের এই জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না। খুব খেয়াল, সময় কিন্তু দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে!

চূড়ান্ত প্রতিফলন

জাল সনদে শিক্ষকতা শুধু কাগজের প্রতারণা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিবেক, দক্ষতা ও দেশের মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাড়ে বসা এই দুর্নীতির ভূত নামাতে এখনই দরকার স্বচ্ছ যাচাই, কঠোর জবাবদিহি ও নৈতিক সাহস।

জাল সনদের এই মহাকাব্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কেবল কাগজের নয়, চরিত্রের। যে শ্রেণিকক্ষে সত্য শেখানোর কথা, সেখানে যদি প্রতারণার ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেরুদণ্ড দুর্বল হবেই। সনদ জালিয়াতি তাই কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি প্রশাসনিক অবহেলা, নৈতিক অবক্ষয় এবং জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার সম্মিলিত ফল।

এখন সময় দোষ চাপানোর নয়, দায় স্বীকারের। অনলাইন যাচাই, কঠোর শাস্তি, স্বচ্ছ নিয়োগ, গবেষণাভিত্তিক নীতি এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া এই ভূত নামবে না। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডে জালিয়াতির ঘুণপোকা রেখে উন্নয়নের গান গাওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।

শেষ কথা একটাই: সময় গেলে সাধন হবে না। আজই জাল সনদের জাল ছিঁড়তে হবে, নইলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। সততা ছাড়া সনদ কাগজ মাত্র; আর চরিত্র ছাড়া শিক্ষা কেবল সাজানো অন্ধকার।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)


#জালসনদ #জালসনদে_শিক্ষকতা #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষাসংস্কার #দুর্নীতিরভূত #আজবকারিগর #সনদজালিয়াতি #ভুয়াসনদ #শিক্ষকজালিয়াতি #এনটিআরসিএ #ডিআইএ #ইনটিগ্রিটিপলিসি #জবাবদিহিতা #সনদযাচাই #অনলাইনভেরিফিকেশন #শিক্ষামন্ত্রণালয় #শিক্ষার_মেরুদণ্ড #জাতিরভবিষ্যৎ #অভিভাবকসতর্কতা #জেনজি #সময়গেলেসাধনহবেনা #অধিকারপত্র #শিক্ষাসংস্কারধারাবাহিক #দুইপর্বে_জালসনদে_শিক্ষকতা #দায়ীকে



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: